ডায়েরির পাতা থেকে: এক অচেনা মোড়ে শৈশবের সুহৃদ

ডিপ্রেশন: কারণ, উপসর্গ, প্রতিকার ও সুস্থ জীবনের গাইডলাইন" (মূল: ড. ইসমাইল আরাফাহ, অনুবাদ: সাজ্জাদ হুসাইন)।


তারিখ: ৫ আগস্ট, ২০২৬

স্থান: মাওনা (শ্রীপুর, গাজীপুর) থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রাপথ

লেখক: জাহিদুল ইসলাম জাহিদ

১. ছুটির নীরব সকাল ও মাওনার দিনলিপি

​আজকের সকালটা অন্য আর দশটা সাধারণ কর্মব্যস্ত সকালের মতো ছিল না। আমি জাহিদ। প্রতিদিনের মতো শ্রীপুরের মাওনায় কারখানার সাইরেন, যান্ত্রিক জীবনের একটানা কোলাহল আর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার ব্যস্ততা থেকে আজ যেন একটু মুক্তির আমেজ ছিল। টানা তিন দিনের ছুটি পাওয়া মানেই যেন এক টুকরো মেঘহীন মুক্ত আকাশ হাতে পাওয়া। কারখানা থেকে ছুটির চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য। শেকড়ের টান জিনিসটাই বোধহয় এমন, যা ইট-কাঠ-পাথরের এই জীবনের সমস্ত ক্লান্তি আর মানসিক চাপকে মুহূর্তের মধ্যে ম্লান করে দেয়।

​সকাল সকাল ব্যাগ গুছিয়ে মাওনা থেকে রওনা দিলাম। বাস স্ট্যান্ডে মানুষের দীর্ঘ সারি, বাসগুলোর অবিরাম হর্ন আর কন্ডাক্টরদের চিৎকার—সবকিছুর মাঝেও ভেতরে এক ধরনের নীরব প্রশান্তি কাজ করছিল। বাড়ি যাচ্ছি, মা-বাবার হাসিমুখ দেখব, শৈশবের স্মৃতিলীন পথ ধরে একটু হেঁটে আসব—এই ভাবনাটাই মনকে ভরিয়ে রাখছিল। মাওনা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার পথটুকু যেন এক চিরচেনা ক্যানভাস। বাসের জানালার পাশে বসে বাহিরের ছুটন্ত দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই কত অতীত ভাবনা মনের কোণে ভিড় জমায়।

২. চৌরাস্তার কোলাহল ও অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ

​গাজীপুর চৌরাস্তা বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অফুরন্ত জ্যাম, বাসের তীব্র হর্ন, চারপাশের ধুলোবালি আর শত শত পথচারীর ব্যস্ত যাতায়াত। গাড়ি থেকে নেমে যখন গ্রামের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক তখনই ঘটে গেল জীবনের এক অদ্ভুত সুন্দর ও অবিশ্বাস্য ঘটনা। মানুষের এই বিশাল ভিড়ের মাঝে আচমকায় একজনের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। অত্যন্ত মার্জিত পোশাক, চোখে বেশ কিছুটা পেশাদারিত্বের ছাপ, হাতে একটি অফিসিয়াল ব্যাগ—কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে কোথায় যেন এক পরিচিত দীপ্তি!

​কয়েক সেকেন্ডের নীরব নিঃশব্দ চাহনি। মন যেন ভেতর থেকে বলে উঠল—'এটা কি সম্ভব?' ঠিক তখনই সেও আমার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে এল। আমরা দুজনেই এক মুহূর্তে, এক পলকেই একে অপরকে চিনে ফেললাম। মুখ থেকে একসাথে যেন শব্দ ফুটে বের হলো—"সিজান?" "জাহিদ?"

​কত দীর্ঘ বছর পর! তামাই যুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেষ একসাথে ক্লাস করেছিলাম। fourth grade (৪র্থ শ্রেণি)-এ পড়ার সময় হঠাৎ করেই সিজানদের পরিবার তাদের নিজেদের পৈতৃক বাড়িতে চলে যায়। তারপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। শৈশবের সেই খেলাধুলার সাথী, প্রাইমারি স্কুলের এক বেঞ্চে বসা দোস্ত, হঠাৎ করে জীবনের এই অচেনা মোড়ে দাঁড়িয়ে যাবে—তা কে জানত! আমরা দুজনেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। চৌরাস্তার চরম ব্যস্ততা ও কোলাহলের মাঝে আমাদের এই মিলন যেন এক মুহূর্তের জন্য সময়কে থমকে দিয়েছিল।

৩. এক কাপ চা ও দীর্ঘ অতীতের স্মৃতিচারণ

​পথের কোলাহল এড়িয়ে আমরা দুজন গাজীপুর চৌরাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চা-স্টলে গিয়ে বসলাম। মাটির না হলেও সাধারণ কাঁচের কাপে গরম ধোঁয়া ওঠা চা আর সাথে পুরানো স্মৃতির ডালি। সিজান জানালো, সে এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এ কর্মরত। শুনে এক বুক গর্বে মনটা ভরে গেল। প্রাইমারি স্কুলের সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে কিনা অংক ক্লাসে মাঝেমধ্যে খাতা লুকিয়ে রাখত, সে আজ দেশের অর্থনীতির এত বড় এক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা!

​চা খেতে খেতে কথার ঝুড়ি খুলে গেল। প্রাইমারি স্কুলের সেই ধুলোবালি মাখা মাঠ, টিফিনের ঘণ্টায় একসাথে দৌড়াদৌড়ি, শিক্ষকের বেতের ভয়, বৃষ্টি নামলে কাগজের নৌকা বানানো আর পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা—সব যেন একে একে ফিরে এল। কত সুখ, কত ছোট্ট ছোট দুঃখ-বেদনা আমরা সেসময়ে ভাগ করে নিতাম! কথা প্রসঙ্গে উঠে এল আমাদের জীবনের বর্তমান বাস্তবতার গল্প। শেয়ার বাজারের নিত্যদিনের জটিল হিসাব-নিকাশ, মানসিক টানাপোড়েন আর কর্পোরেট মানসিক চাপের কথা সে বলল। আমিও আমার মাওনায় গার্মেন্টস ও কাজের জগতের দিনগুলোর কথা বললাম। জীবনের এই ভিন্ন দুই পথ সত্ত্বেও আমাদের শৈশবের বন্ধনটি যে এতটুকু ফিকে হয়নি, তা অনুভব করে ভেতরটা ভিজে উঠছিল।

৪. একটি অমূল্য উপহার ও মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর শিক্ষা

​কথার একপর্যায়ে সিজান তার ব্যাগ থেকে পরম মমতায় একটি বই বের করল। বইটি আমার হাতে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

"জাহিদ, জীবনে সাফল্য কিংবা ব্যস্ততা যা-ই আসুক না কেন, মানসিক শান্তিটা সবচেয়ে বড়। আমি জানি এই যান্ত্রিক যুগে আমরা সবাই কম-বেশি মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগি। বইটা তোকে উপহার দিলাম, সময় পেলে পড়িস।"

​বইটির প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে নামটা পড়লাম—

"ডিপ্রেশন: কারণ, উপসর্গ, প্রতিকার ও সুস্থ জীবনের গাইডলাইন" (মূল: ড. ইসমাইল আরাফাহ, অনুবাদ: সাজ্জাদ হুসাইন)

বইটি হাতে নিয়ে আমি এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেলাম। প্রচ্ছদে শুকিয়ে যাওয়া গাছের একটি ডাল আর দিগন্তের আভা—যেন মানবমনের গভীর বিষাদ আর আশার আলোকের এক চমৎকার প্রতীক। এটি কেবল কোনো বই ছিল না, এটি ছিল আমার বন্ধুর পক্ষ থেকে এক পরম ভালোবাসার সুহৃদ উপহার।

"জীবনের যান্ত্রিক দৌড়ে আমরা অনেক সময় নিজেদের ভেতরের কান্না আর অবসাদকে আড়াল করে রাখি। কিন্তু বন্ধু হলো সেইজন, যে কথা না বলেও হৃদয়ের ভেতরের ক্লান্তিটুকু টের পায়।"


৫. বিদায় ও অন্তরের অনুভূতি

​চায়ের কাপ খালি হয়ে এসেছিল, কিন্তু আমাদের কথা যেন শেষ হতেই চাইছিল না। তবে সময় ও দূরত্বের নিজস্ব বাধ্যবাধকতা থাকে। আমাকে গ্রামের উদ্দেশ্যে বাস ধরতে হবে, আর সিজানকেও তার গন্তব্যে ফিরে যেতে হবে। একে অপরকে বিদায় জানানোর মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। আলিঙ্গন করে সে বলল, "এবার আর যোগাযোগ হারানো যাবে না, জাহিদ।"

​গ্রামে ফেরার পথে বাসে বসে পুরো সময়টা আমি উপহার পাওয়া বইটি হাতে ধরে রেখেছিলাম। বারবার প্রচ্ছদটি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—আজকের দিনটি সত্যিই আমার ডায়েরির পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততার মাঝে সিজানের সাথে এই আকস্মিক দেখা এবং তার এই thoughtful উপহারটি যেন আমাকে এক নতুন জীবনবোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। বিষণ্নতা কাটানোর জন্য ওষুধ নয়, কখনো কখনো এমন একজন পুরোনো সুহৃদ আর একটি শুভাকাঙ্ক্ষী উপহারই যথেষ্ট।

— জাহিদ

মাওনা, শ্রীপুর, গাজীপুর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন