খেলার মাঠ ও শৈশব

 

আসসালামু আলাইকুম! আমি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। আজ আমি  ফিরে গেলাম সেই ধূলামাখা দিনগুলোতে, যেখানে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়েছি। আজকের বিষয়: খেলার মাঠ ও শৈশব

​খেলার মাঠ ও শৈশব: আমার তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই সোনালী দিনগুলো
তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ

​শৈশব মানেই এক চিলতে রোদ, পকেটে কয়েকটা মার্বেল, আর বিকেলে মাঠের ওই সবুজ ঘাসের ঘ্রাণ। আজ যখন ল্যাপটপের সামনে বসে টাইপ করছি, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সেই চিরচেনা তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠটি। আমার শৈশবের সিংহভাগ আবেগ, উত্তেজনা আর স্মৃতি মিশে আছে ওই ধুলোবালি মাখা মাটির প্রতিটি কোণায়।

​স্মৃতির জানালায় তামাই স্কুল মাঠ

​আমাদের তামাই স্কুল মাঠটা শুধু একটা খেলার জায়গা ছিল না; ওটা ছিল আমাদের এক মুক্ত আকাশ। চারদিকে বড় বড় গাছ, মাঝখানে বিশাল এক সবুজ গালিচা। ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই আমাদের যে দৌড় শুরু হতো, তার গন্তব্য ছিল ওই মাঠ। পিঠে স্কুল ব্যাগ নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা যেন জীবনের সব ক্লান্তি ভুলে যেতাম।

​শৈশবের সেই দিনগুলোতে আমাদের কোনো দামী গেমিং কনসোল ছিল না, ছিল না স্মার্টফোনের আসক্তি। আমাদের ছিল এক টুকরো মাঠ আর এক দলা আনন্দ। তামাই স্কুলের সেই মাঠেই আমি প্রথম শিখেছিলাম দলগত কাজ কী, হার মেনে নিয়ে হাসিমুখে করমর্দন করা কী, আর ধুলোবালি মাখা শরীরে বিজয়োল্লাস করার তৃপ্তি কেমন।

​ফুটবল: আমাদের বর্ষাকালের উন্মাদনা

​বর্ষাকালে যখন মাঠটা কর্দমাক্ত হয়ে যেত, তখন আমাদের আসল উৎসব শুরু হতো। তখন আমরা ফুটবল খেলতাম। খালি পায়ে কাদার ভেতর বল নিয়ে দৌড়ানো, আছাড় খেয়ে সারা গায়ে কাদা মেখে ভূতের মতো হওয়া—এগুলোই ছিল আমাদের পরম আনন্দ।

​তামাই স্কুলের সেই বড় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর কথা আজও মনে পড়ে। পুরো গ্রামের মানুষ এসে মাঠের চারপাশে ভিড় করত। বড় ভাইদের খেলা দেখে হাততালি দেওয়া আর ভাবা—"কবে আমি ওই বড় টিমে খেলতে পারব?" সেই স্বপ্নগুলোই ছিল আমাদের বড় হওয়ার জ্বালানি। বল যখন একবার গোলপোস্টের ভেতরে ঢুকত, সেই যে চিৎকার আর উল্লাস, তার তুলনা আজকের কোনো ভার্চুয়াল গেম দিতে পারবে না।

​ক্রিকেট এবং শীতের সকালের কুয়াশা

​শীতের সকালে যখন চারদিকে ঘন কুয়াশা, তখন আমরা ব্যাটে-বলে যুদ্ধ শুরু করতাম। তামাই স্কুলের মাঠে শীতের রোদে পিঠ দিয়ে বসে নিজের ব্যাটিংয়ের সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করার একটা আলাদা মজা ছিল। টেনিস বল কস্টেপ দিয়ে মুড়িয়ে আমরা তৈরি করতাম আমাদের 'ডিউস বল'। মাঝে মাঝে বল পাশের বাড়ির ছাদে বা পুকুরে চলে গেলে সেটা উদ্ধার করাও ছিল এক রোমাঞ্চকর মিশন।

​সেই দিনগুলোতে আউট হওয়া নিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া, আর তারপর আবার কাঁধে হাত রেখে বাড়ি ফেরা—এটাই ছিল আমাদের বন্ধুত্ব। মাঠ আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়।

​মাঠ হারানোর বেদনা ও বর্তমান প্রজন্ম

​আজকাল যখন আমি গ্রামে যাই, দেখি মাঠগুলো যেন আগের মতো আর মুখরিত হয় না। বর্তমান প্রজন্মের শৈশব বন্দি হয়ে গেছে চার দেয়ালের মাঝে, মোবাইল স্ক্রিনে। তারা ফিফা বা পাবজি খেলে ঠিকই, কিন্তু মাঠের সেই ঘামের গন্ধ তারা চেনে না। তারা জানে না, দৌড়াতে গিয়ে হাঁটু ছড়ে যাওয়ার পর সেই ব্যথার মাঝেও যে বীরত্ব আছে, তা কোনো ভিডিও গেমে পাওয়া সম্ভব নয়।

​তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটি আজও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেখানে আমাদের সেই প্রাণের স্পন্দন কি আগের মতো আছে? আমরা যখন ছোট ছিলাম, মাঠ ছিল আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ওখানেই আমাদের আড্ডা হতো, ওখানেই আমাদের সব পরিকল্পনা হতো।

​আমার নাম  জাহিদ, আর আমার হৃদয়ে আজও সেই তামাই স্কুলের মাঠের ধুলো লেগে আছে। আমি বিশ্বাস করি, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য শুধু পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়, তার জন্য প্রয়োজন একটি খেলার মাঠ। খেলার মাঠই শিশুকে আত্মবিশ্বাসী, সহনশীল এবং সুস্থ সবল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

​আমার শৈশব ছিল তামাই স্কুলের সেই বিশাল মাঠের ঋণী। সেই ধুলোবালি, সেই রোদ আর সেই বন্ধুদের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। আজও চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই সেই মাঠের শোরগোল, আর নিজেকে দেখি সেই ছোট জাহিদ হিসেবে, যে এক মনে বলের পেছনে ছুটছে।

আর্টিকেলটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ!

আপনার শৈশবের খেলার মাঠের স্মৃতি কেমন? কমেন্ট করে আমাকে জানাতে পারেন। আপনার জীবনের সেই প্রিয় মাঠটি কোথায় ছিল?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন