বিটকয়েনের আসল ইতিহাস

বিটকয়েনের আসল ইতিহাস


​ধরুন, আপনার দাদার আমলের জমি। ২০ বিঘা। দলিল আছে, খতিয়ান আছে, দাগ নম্বর আপনার মুখস্থ। তারপর একদিন আপনি ভূমি অফিসে গিয়ে দেখলেন, রেকর্ডের মালিকের ঘরে অন্য কারও নাম। কীভাবে সম্ভব? কারণ একটা নির্মম সত্য হলো—আপনার মালিকানার আসল প্রমাণ আপনার হাতের ওই দলিলটি নয়। আসল প্রমাণ হলো সরকারের একটা খাতা। সেই খাতা যার হাতে, ক্ষমতা তার হাতে।

​একটু ডিপলি ভেবে দেখুন। মোঘল আমলে কারও ফার্সি ভাষায় লেখা দলিল ছিল, ব্রিটিশ আমলে ছিল বিশাল জমিদারি। আজ স্বাধীন ব্যাংকগত ক্ষমতার বিচারে ভূমি অফিস কি সেই পুরোনো দলিলের মূল্য দেবে? মোটেই না। দেশ বদলালে আগের দলিল এক রাতে স্রেফ কাগজ হয়ে যায়। ব্যাংকের টাকাও তেমনই। আপনার অ্যাকাউন্টে ১ লাখ টাকা আসলে ব্যাংকের খাতায় লেখা একটি লাইন। খাতা বলবে আছে—তো আছে, খাতা বলবে নেই—তো নেই।

​এখন একটা প্রশ্ন করি। এমন একটা খাতা কি বানানো সম্ভব, যেটা কেউ ঘষামাজা করতে পারবে না? কোনো মাতব্বর না, কোনো ব্যাংক না, এমনকি কোনো দেশের সরকারও না! দেশ বা ক্ষমতা পাল্টে গেলেও যার রেকর্ড কেউ মুছতে পারবে না? শুনতে অসম্ভব মনে হচ্ছে, তাই না?

​৩১ অক্টোবর ২০০৮। ক্রিপ্টোগ্রাফারদের একটি অখ্যাত ইমেইল লিস্টে মাত্র ৯ পাতার একটি ডকুমেন্ট এলো। যেটার নাম—‘বিটকয়েন পেপার’। পাঠিয়েছিল এক ভদ্রলোক, নাম—‘সাতোশি নাকামোতো’। সমস্যা হলো, এই মানুষের বাস্তব অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এফবিআই খুঁজেছে, সাংবাদিকরা খুঁজেছে, হ্যাকাররা খুঁজেছে—কেউ পায়নি। অথচ এই ভূতুড়ে মানুষটার বানানো জিনিসের আজকের বাজারমূল্য বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতির প্রায় তিনগুণ!

​আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, তার নিজের কাছে জমা আছে আনুমানিক ১১ লাখ বিটকয়েন। আজকের দামে যা প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান! ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, সে তার নিজের বিটকয়েনে আজ পর্যন্ত হাতও দেয়নি! একটুও খরচ করেনি! কে এই মানুষ? কেন সে বানালো এই জিনিস? আর কীভাবে-ই বা একটা ভার্চুয়াল কয়েন লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়? চলুন, আজ বিটকয়েন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির পুরো মেশিনটা একদম স্ক্রু খুলে ডিকোড করি।

​১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮, নিউ ইয়র্ক। ১৫৮ বছরের পুরোনো ব্যাংক ‘লেম্যান ব্রাদার্স’—আমেরিকার চতুর্থ বৃহত্তম ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, হঠাৎ এক রাতের মধ্যে দেউলিয়া! কিন্তু লেম্যান ব্রাদার্স তো একা ডোবেনি, সে ছিল ডোমিনোর প্রথম গুটি। ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর মানুষের জমানো টাকা নিয়ে জুয়া খেলতেছিল। সাবপ্রাইম মর্গেজ বা ঝুঁকিপূর্ণ হাউজিং লোনের জুয়া। যতদিন লাভ হয়েছে, লাভ গেছে ব্যাংকারদের পকেটে—বোনাস, ইয়ট, প্রাইভেট জেট—এসব নিয়ে তারা আমোদ-ফুর্তি করেছে। আর যেদিন জুয়ায় হারলো, সেদিন সরকার বলল, এই ব্যাংকগুলো এত বড় যে এদের ডুবতে দেওয়া যাবে না—‘টু বিগ টু ফেল’। আমেরিকান সরকার ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট প্যাকেজ ঘোষণা করল।

​এখন টাকাটা কার? জনগণের, ট্যাক্সের টাকা। ভালো করে খেয়াল করুন সিস্টেমটা—লাভ হলে ব্যাংকের, লস হলে জনগণের। কোটি মানুষ চাকরি হারাল, বাড়ি হারাল, সঞ্চয় হারাল; আর যারা আগুনটা লাগিয়েছিল, তারা সরকারি টাকায় বোনাস পেল। লোভী ব্যাংকারদের দেখা দিল শতাব্দীর প্রথম গ্লোবাল ইকোনমিক ক্রাইসিস। ঠিক এই সময়ে পৃথিবীর কোনো এক কোণায় বসে একজন মানুষ ঠান্ডা মাথায় কোড লিখতেছিল। তার রাগটা ব্যাংকের ওপর যতটা না, তার চেয়ে বেশি ছিল সিস্টেমের ওপর। তার প্রশ্নটা ছিল সহজ—টাকা লেনদেন করতে মাঝখানে ব্যাংক লাগবে কেন? দুজন মানুষ সরাসরি কেন লেনদেন করতে পারবে না? যেভাবে হাতে হাতে ক্যাশ টাকা লেনদেন হয়, সেভাবে?

​লেম্যান ব্রাদার্সের ধসের ৪৬ দিন পর, ৩১ অক্টোবর ২০০৮, সেই ৯ পাতার ডকুমেন্টটা প্রকাশ পেল। নাম—‘বিটকয়েন: পেয়ার-টু-পেয়ার ইলেকট্রনিক ক্যাশ সিস্টেম’। সাথে ছিল সাতোশি নাকামোতোর এক লাইনের ঘোষণা—"আমি এমন একটি ইলেকট্রনিক ক্যাশ সিস্টেম বানিয়েছি, যেখানে কোনো বিশ্বস্ত থার্ড পার্টির দরকারই নেই।" মানে হলো—ব্যাংকেরই দরকার নেই!

​তারপর ৩ জানুয়ারি ২০০৯, সাতোশি বিটকয়েন নেটওয়ার্কের প্রথম ব্লকটি চালু করল। নাম—'জেনেসিস ব্লক'। আর এই প্রথম ব্লকের ভেতরেই কোডের গভীরে সে চিরদিনের জন্য খোদাই করে দিল একটি লাইন। লাইনটি ছিল—"The Times 03/Jan/2009 Chancellor on brink of second bailout for banks"। এটা সেদিনের লন্ডনের 'দ্য টাইমস' পত্রিকার হেডলাইন। যার মানে হলো—ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকার দ্বিতীয় বেলআউটের প্যাকেজ ঘোষণার পথে। চিন্তা করে দেখুন, এটা কোনো টেকনিক্যাল প্রয়োজনে জেনেসিস ব্লকের ভেতরে লেখার কোনো দরকারই ছিল না। এটা ছিল একটা বার্তা, অনেকটা পাথরে খোদাই করা প্রতিবাদের মতো। সাতোশি বলে দিল—আমি ঠিক কোন জিনিসটার বিরুদ্ধে এই মেশিনটা (সিস্টেম) বানিয়েছি।

​কিন্তু দাঁড়ান, মাঝখানে ব্যাংক লাগবে না—মুখে বলা যত সহজ, কিন্তু বাস্তবে ব্যাংক না থাকলে হিসাব রাখবে কে? আপনার টাকা আপনার—এটা প্রমাণ করবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে চলুন আমরা সেই জমিদারের হিসাব-কিতাবে আবার ফিরে যাই।

​একটি প্রশ্ন করি—মালিকানা জিনিসটা আসলে কী? আপনি বলবেন, কেন—দলিল? না, দলিলটা স্রেফ একটা কাগজ, প্রমাণের ফটোকপি মাত্র। আসল মালিকানা থাকে ভূমি অফিসের রেকর্ডে, খতিয়ানে, সরকারের খাতায়। সমাজ এবং দেশ যে খাতাটাকে বিশ্বাস করে, সত্য সেটাই। আপনার জমি আপনার, কারণ রাষ্ট্রের খাতা বলতেছে এটা আপনার। এখন উল্টো দিকটা চিন্তা করুন—খাতায় যদি ঘষামাজা হয়? তহশিলদার যদি ঘুষ খেয়ে লাইনটা চেঞ্জ করে দেয়? আপনার হাতে দলিল থাকবে, জমিতে আপনার ধান থাকবে, কিন্তু আইনের চোখে জমিটা আর আপনার না।

​আরও বড় করে ভাবুন, ইতিহাসে যতবার আরেকটা দেশ দখল হয়েছে, নতুন শাসক প্রথমে কী করলো? সৈন্য পাঠানোর পর সবার আগে দখল করেছে খাতা—ভূমি রেকর্ড, রাজস্ব হিসাব। কারণ শাসক জানে জমি দখলের দরকার নেই, খাতা দখল করলেই জমি তার, এলাকা তার! আর পুরোনো মালিকের দলিল এক রাতে স্রেফ কাগজ হয়ে যাবে।

​এবার আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসি। আপনার অ্যাকাউন্টে কথার কথা—১ লাখ টাকা আছে। টাকাটি কোথায় আছে? ভল্টে? না। আপনার নামে বানানো কোনো সিন্দুকে? না। টাকাটা আসলে ব্যাংকের কম্পিউটারের একটা লাইন—'অমুক: ১ লাখ টাকা'। আপনি যখন কাউকে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠান, আপনি আসলে আপনার ব্যাংকটিকে অনুরোধ করেন—"আমার লাইন থেকে এত কমাও, ওর লাইনে এত বাড়াও।" ব্যাংক রাজি হলে লেনদেন হয়, রাজি না হলে হবে না। অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, লেনদেন ব্লক, টাকা তোলার লিমিট—সবই একটা জিনিস প্রমাণ করে, খাতাটা আপনার না।

​ভাবছেন বাড়িয়ে বলতেছি? তাহলে একটা তারিখ শুনুন—৮ নভেম্বর ২০১৬, রাত ৮টা ১৫ মিনিট। ইন্ডিয়ান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হঠাৎ লাইভ টেলিভিশনে আসলেন এবং একটা ঘোষণা করলেন—আজ রাত ১২টার পর থেকে ৫০০ এবং ১০০০ রুপির নোট বাতিল! তার মানে হলো, রাত ১২টার পর দোকান বা বাজারে এই নোট দিয়ে কোনো ইন্ডিয়ান একটা চকলেটও কিনতে পারবে না। ওসব হয়ে যাবে স্রেফ কাগজের টুকরো। তবে ভারত সরকার একটা ছোট্ট রাস্তা খোলা রাখল—ভারতীয়দের কাছে যে পুরোনো ব্যাংক নোটগুলো আছে, সেগুলো ব্যাংকে জমা দিয়ে তার বদলে নতুন সচল নোট তুলে নিতে পারবে।

​ব্যাস, পরদিন সকাল হতেই শুরু হলো আসল হাহাকার! কোটি কোটি ভারতীয় ছুটে গেল ব্যাংকের দিকে। নিজের পকেটে, বালিশের নিচে, বাসায়, আলমারিতে জমানো ফিজিক্যাল রুপি এক রাতেই তো অবৈধ হয়ে গেছে। এখন সেই রুপিগুলো ব্যাংকে গিয়ে পাল্টে নিয়ে অথবা নিজের অ্যাকাউন্টে ভরে সচল করার জন্য মানুষ পাগলের মতো ব্যাংকের দরজায় লাইন ধরে দাঁড়াল। যদি এই নোটগুলো ব্যাংক পাল্টে না দেয় বা জমা না নেয়, তবে সারা জীবনের সব সঞ্চয় এক সেকেন্ডে জিরো হয়ে যাবে! লাইনে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গরমে হার্ট অ্যাটাকে মানুষ মারা পর্যন্ত গেল। খেয়াল করুন, শুধু খাতার মালিক একটা ঘোষণা দিছে, তাতেই এই অবস্থা! এটাই সেন্ট্রালাইজড লেজারের ক্ষমতা। জমির রেকর্ড হোক, ব্যাংকের খাতা হোক, টাকার নোট হোক—সিস্টেমটা একই; মাঝখানে একজন মাতব্বর, খাতা তার হাতে, আর আপনি বিশ্বাস করা ছাড়া নিরুপায়।

​এই যে দেখুন, আমার হাতে একটা বাংলাদেশের ৫০০ টাকার নোট। উপরে লেখা—'বাংলাদেশ ব্যাংক, চাহিবামাত্র ইহার বাহককে ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে।' নিচে সই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। আর এই টাকায় একটা ইউনিক নম্বর আছে, যেটা আর কোনো ৫০০ টাকার নোটের সাথে মিলবে না। প্লাস, এটা যাতে কেউ কপি করতে না পারে, সেজন্য আরও নানান সিকিউরিটি ফিচারস আছে এতে। এটা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া একটি লিখিত প্রতিশ্রুতি, অর্থনীতির ভাষায়—'প্রমিজরি নোট'। এর মূল্য আইনি বাধ্যবাধকতা, রাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গ্যারান্টি, আর আমাদের বিশ্বাস এবং আস্থার ওপর। এর কোনো একটি যদি মিসিং থাকে, তাহলে এর কোনো ভ্যালু নেই। বিশ্বাস না হলে, ১৯৭১ সালের আগের একটা পাকিস্তানি নোট নিয়ে আজ ঢাকার বাজারে কেনাকাটা করার ট্রাই করে দেখুন, একটা চকলেটও কিনতে পারবেন না।

​যাহোক, সাতোশি নাকামোতোর প্রশ্নটা এবার বুঝতেছেন? মাতব্বরকে বাদ দেওয়া যায়? অবশ্যই যায়। কিন্তু মাতব্বর বাদ দিলেই একটা ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি হয়, যেটার সমাধান করতে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের লেগেছে ৩০ বছর! খেয়াল করুন, ভার্চুয়াল জিনিসের একটা কমন বিড়ম্বনা আছে—ভার্চুয়াল জিনিস অসীমভাবে কপি করা যায়। আপনার ফোনের একটা ছবি ১০ জনকে পাঠানো যায়; ছবিটা আপনার কাছেও আছে, সেটা আবার ১০ জনের কাছে কপি হয়ে চলে গেল। একটা গান, একটা পিডিএফ, একটা ভিডিও—সব তা-ই। এবার ভাবুন, টাকা যদি একটা ডিজিটাল ফাইল হতো? ধরুন, ১০০০ টাকা নামের একটা ফাইল আপনার কাছে আছে, আপনি সেটা রহিমকে পাঠালেন, আবার সেই একই ফাইল করিমকেও পাঠালেন; একই ১০০০ টাকা দুই জায়গায় খরচ হলো, চাইলে হাজার জায়গায় খরচ করা যাবে! এটাই হলো 'ডাবল স্পেন্ডিং প্রবলেম' (Double Spending Problem)।

​যে টাকা কপি করা যায়, সেই টাকার দাম তো শূন্য। কাগজের নির্ভেজাল ১০০০ টাকার নোট রহিমের হাতে দিলে নোটটি আর আপনার হাতে নেই। ব্যাংকের ডিজিটাল ওয়ালেটেও সমস্যা নেই, কারণ সেখানে মাতব্বর ব্যাংক আছে। ব্যাংকের খাতা বলে দেয় আপনার লাইন থেকে এত মাইনাস হয়েছে এবং সেটা অমুকের লাইনে চলে গেছে। তাহলে দাঁড়ালো কী? ডিজিটাল টাকা ম্যানেজ করতে মাতব্বর লাগবে, অর্থাৎ ব্যাংক লাগবে। কিন্তু সেটা আবার অনেকে চাচ্ছে না। এই দেয়ালে ধাক্কা খেয়েই ৩০ বছর ধরে একের পর এক জিনিয়াস মুখ থুবড়ে পড়েছে।

​দুটো নাম শুনুন—১৯৮৯ সাল, ডেভিড চম, কিংবদন্তি ক্রিপ্টোগ্রাফার, বানালো 'ডিজিক্যাশ' (DigiCash)। ম্যাথের দিক দিয়ে অসাধারণ, ডয়েচে ব্যাংক পর্যন্ত চুক্তি করেছিল, কিন্তু সিস্টেমটা চলতে ব্যাংকের ওপর ভরসা করতে হতো, মাতব্বর রয়েই গেল। ১৯৯৮ এ এসে সেটা দেউলিয়া হলো।

​দ্বিতীয় গল্পটি আরও ইন্টারেস্টিং—১৯৯৬ সাল, ফ্লোরিডা। ডগলাস জ্যাকসন নামের এক ডাক্তার বানালো 'ই-গোল্ড' (e-gold)। আসল সোনা দিয়ে ব্যাকড ডিজিটাল কারেন্সি, ভালোই চলছিল। ৫০ লাখ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল, পিক সময়ে বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের লেনদেনও হতো। তারপর ২০০৭ সালে আমেরিকান সরকার মামলা ঠুকে দিল, ২০০৮ এ কোম্পানি শেষ! কিন্তু কেন? কারণ ই-গোল্ড একটা কোম্পানি ছিল, একটা অফিস ছিল, সার্ভার ছিল, একটা ঠিকানা ছিল। আর যার ঠিকানা আছে, তার দরজায় নক করা যায়! মাঝখানে যতক্ষণ কেউ আছে—কোম্পানি, ব্যাংক বা সার্ভার, সেটার একটা গলা আছে; আর গলা থাকলে গলা চেপেও ধরা যায়!

​সাতোশি নাকামোতো এই ইতিহাসটা জানতো। বিটকয়েন রিলিজ করার সময় সে নিজেই লিখেছিল, ৯০-এর দশক থেকে ট্রাস্টেড থার্ড পার্টি নির্ভর সিস্টেমগুলো একের পর এক ফেইল করতে করতে মানুষ আশাই ছেড়ে দিয়েছে। তার দাবি, তার বিটকয়েনই প্রথম সিস্টেম যেখানে কাউকে বিশ্বাস করতে হবে না। কিন্তু কীভাবে? মাতব্বর ছাড়া, অর্থাৎ ব্যাংক ছাড়া বা কোম্পানি ছাড়া ডাবল স্পেন্ডিং ঠেকাবেন কীভাবে?

​সাতোশির উত্তরটা এতই সিম্পল যে শুনলে মনে হবে—এটা তো আমিও ভাবতে পারতাম! সাতোশির উত্তর হলো—"খাতাটাই সবাইকে দিয়ে দাও!"

​সাতোশির আইডিয়াটা জমির ভাষায় একটু বুঝিয়ে বলি। ভূমি অফিসের সমস্যা কী ছিল? খাতা একটা, আর সেটা একজনের হাতে। এখন কল্পনা করুন, দেশে ভূমি রেকর্ডের হুবহু কপি আছে প্রতিটি নাগরিকের কাছে! আপনার ঘরে এক কপি, রহিমের ঘরে এক কপি, ১৭ কোটি মানুষের ঘরে ১৭ কোটি কপি। এখন তহশিলদার ঘুষ খেয়ে তার কপিতে নাম চেঞ্জ করে ফেলল, লাভ কী হলো? বাকি ১৬ কোটি ৯৯ লাখ কপিতে তো আসলে মালিকের নাম একই লেখা! সবাই মিলিয়ে দেখবে—এই একটি কপি বাকি সবার সাথে মিলছে না, সুতরাং ওটা বাতিল। দখলদার বাহিনীও এখন অসহায়, খাতা দখল করতে হলে ১৭ কোটি ঘরে ঢুকতে হবে একসাথে! এটাই বিটকয়েনের প্রথম স্তম্ভ—‘ডিডিসেন্ট্রালাইজড লেজার’ (Decentralized Ledger)।

​কোনো হেড অফিস নেই, পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো কম্পিউটার বা নোডে প্রত্যেকের কাছে পুরো খাতার ফুল কপি। এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—কম্পিউটার মানে কোন কম্পিউটার? আমার কম্পিউটার? বাসাবাড়ির কম্পিউটার? কাদের কম্পিউটার এগুলো? উত্তরটা শুনলে অবাক হবেন—যেকোনো কম্পিউটার! আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো কম্পিউটার। বিটকয়েনের সফটওয়্যার ফ্রি, ইন্টারনেটে ওপেন পড়ে আছে। আপনি চাইলে এখনই বিটকয়েনের ওয়েবসাইটে গিয়ে ডাউনলোড করে রেখে দিতে পারেন। চালু করলেই আপনার কম্পিউটার নেটওয়ার্কের অন্যদের সাথে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যাবে। আপনি পুরো খাতাটা নামিয়ে নিতে পারবেন—জেনেসিস ব্লক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেন ডাউনলোড হয়ে যাবে আপনার কম্পিউটারে। সাইজ কত জানেন? ৮০০ গিগাবাইটেরও বেশি! আপনি বিটকয়েনের ওয়েবসাইটে গিয়ে এখনই সফটওয়্যারটা ডাউনলোড করার ট্রাই করে দেখুন আপনার পিসিতেই। যখনই ডাউনলোড করবেন, সেই মুহূর্ত থেকে আপনি খাতার একজন রক্ষক! অর্থাৎ বিটকয়েন চলতেছে পৃথিবীর অগণিত কম্পিউটারে।

​কে চালায় এই কম্পিউটারগুলো? আমি, আপনি। কেউ টোকিওতে বসা প্রোগ্রামার, কেউ টেক্সাসের কোম্পানি, কেউ বার্লিনের শখের ছাত্র—কেউ কাউকে চেনে না। কারও অনুমতি লাগেনি, কেউ বেতনও পায় না, তবুও হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় খাতা পাহারা দিচ্ছে। কেন? কারণ যার কয়েন আছে, খাতা বাঁচলে তারই লাভ! কীভাবে, সেগুলো পরে বুঝবেন।

​কেউ বিটকয়েন পাঠালে সে চুপিচুপি পাঠায় না, পুরো নেটওয়ার্কে ঘোষণা দিয়ে পাঠায়—মাইকে ঘোষণার মতো। সবাই শোনে, সবাই নিজের খাতায় লেখে। কিন্তু ঘোষণাটা পৌঁছায় কীভাবে? মাঝখানে তো কোনো হেড অফিস নেই, কোনো সার্ভার নেই, কোনো অথরিটি নেই যে সবাইকে ঘোষণাটা বা খবরটা পাঠাবে। (আমি কিন্তু রূপক অর্থে বলতেছি যাতে আপনি কানেক্ট করতে পারেন)। সিস্টেমটা চলে অনেকটা গুজবের নিয়মে—সিরিয়াসলি! গ্রামে একটা খবর কীভাবে ছড়ায়, ভাবুন তো? আপনি বললেন পাশের তিনজনকে, সেই তিনজন বলল তাদের পাশের তিনজনকে; এভাবে একসময় পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বিটকয়েনের নেটওয়ার্কও ঠিক তাই। প্রতিটি কম্পিউটার ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকে শুধু তার কাছের কয়েকটি কম্পিউটারের সাথে। নতুন লেনদেনের খবর পেলেই সে পাশের গুলোকে জানিয়ে দেয়, তারা জানিয়ে দেয় তাদের পাশের গুলোকে; কয়েক সেকেন্ডে খবরটা টোকিও থেকে টেক্সাস—পুরো পৃথিবী ঘুরে ফেলে। কেন্দ্র নেই, তবুও সবাই যুক্ত। এই ব্যবস্থার নাম—'পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক' (Peer-to-Peer Network)। মানুষ থেকে মানুষে, মুখে থেকে মুখে। এই কারণেই জিনিসটা বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব; গুজব থামাতে হলে প্রতিটি মুখ বন্ধ করতে হবে। ধরুন একটা দেশ নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধ করল, কিন্তু বাকি পৃথিবীর কম্পিউটারগুলো দিব্যি চলতে থাকবে।

​তো খাতা সবার হাতে পৌঁছে গেল, কিন্তু আসল জাদু এখনো বাকি! এখন প্রশ্ন হলো—খাতায় লেখাটা হয় কীভাবে? প্রতিটি লেনদেন আলাদা পাতায় লেখা হয় না। কিছুক্ষণ পর পর জমে থাকা লেনদেনগুলো একসাথে জড়ো করে একটা পূর্ণ পাতা লেখা হয়। এই এক পাতা লেনদেনের নামই—'ব্লক' (Block)। ব্লক মানে খাতার একটি পাতা (মনে রাখবেন, আমি বোঝানোর জন্য এগুলো বলতেছি রূপক অর্থে)। প্রতিটি পাতা শেষ হলে তার নিচে একটা সিল বসে, তবে রাবার স্ট্যাম্পের সিল না—গাণিতিক সিল! পাতার ভেতরের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি সংখ্যা, প্রতিটি কমা—সব একসাথে একটা ফর্মুলায় ঢুকিয়ে বানানো হয় একটি ইউনিক কোড। এই কোডের নাম—'হ্যাশ' (Hash)। হ্যাশের ক্যারেক্টারটা বুঝুন—পাতার ভেতরে কেউ যদি একটা মাত্র অক্ষর বদলায় (ধরুন রহিম পেল ১০কে, যদি কেউ বানিয়ে ফেলে রহিম পেল ২০), তাহলে সিলটা চেঞ্জ হয়ে যাবে! মানে হ্যাশ আসলে একটা টেম্পার অ্যালার্ম, ঘষামাজা করলেই বেজে ওঠে।

​কিন্তু সাতোশি এখানে থামেনি, সে আরেকটা মাস্টারস্ট্রোক দিল। প্রতিটি নতুন পাতা নিজের হিসাব লেখার আগে সবার উপরে লিখে রাখে আগের পাতার সিলটা! অর্থাৎ, পাতা ২ বহন করে পাতা ১-এর সিল, পাতা ৩ বহন করে পাতা ২-এর সিল, পাতা ৪ বহন করে পাতা ৩-এর সিল... প্রতিটি পাতা আগের পাতার সাথে গাঁথা—লিংক করা। পাতা মানে 'ব্লক', আর এই গাথুনি মানে 'চেইন'—'ব্লকচেইন'! পেজগুলো ব্লক হলে খাতা হলো ব্লকচেইন। পুরো টেকনোলজির নামের রহস্য এটুকুই!

​এখন খেয়াল করে দেখুন ডিজাইনটা কি ভয়ঙ্কর! ধরুন একজন প্রতারক ১০০ পাতা আগের একটি রেকর্ড চেঞ্জ করতে চাইল। সেটা করা মাত্রই সেই পাতার সিল কিন্তু চেঞ্জ হয়ে গেল, কিন্তু পরের পাতায় তো পুরোনো সিলটি লেখা! মিললো না, অ্যালার্ম বেজে উঠলো! ঠিক করতে হলে পরের পাতার সিলও চেঞ্জ করতে হবে, তাহলে তার পরের পাতা মিলবে না, তার পরেরটা মিলবে না... একটা রেকর্ড বদলে গেলে তার পরের প্রতিটি পাতা নতুন করে লিখতে হবে! এবং এত কিছু করেও লাভ নেই, কারণ তার নষ্ট করা কপিটা হাজার হাজার কপির মধ্যে মাত্র একটা! নেটওয়ার্ক এক নিমেষেই সেটা শনাক্ত করে ছুড়ে ফেলবে। এই কারণেই বলা হয়—ব্লকচেইনের রেকর্ড অপরিবর্তনীয়।

​কিন্তু দাঁড়ান, পুরোনো পাতা বদলানো যায় না—মানলাম, কিন্তু নতুন পাতা লিখতেছে কে? মাতব্বর তো নেই, মনে আছে তো? হাজার হাজার কম্পিউটারের ভেতরে কে ঠিক করবে পরের পাতায় কোন লেনদেনগুলো উঠবে, লেখা হবে? যে কেউ লিখতে পারলে তো মিথ্যাবাদীরাও পাতা লিখবে! সাতোশির এই সমাধানটাই পুরো সিস্টেমের হৃৎপিণ্ড, আর এটা বুঝতেই সবচেয়ে বেশি ভুল করে মানুষজন। জিনিসটার নাম—'ক্রিপ্টো মাইনিং' (Crypto Mining)। না, মাটি খুঁড়ে কয়েন তোলা না, ব্যাপারটা অনেকটা লটারির মতো!

​এখন প্রশ্নটা মনে আছে তো—খাতায় নতুন পাতা লিখবে কে? সাতোশির উত্তর—যে কেউ, কিন্তু একটা শর্ত আছে। চলুন শর্তটা নিজের চোখে দেখি। ধরুন আজ রাতে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি বিটকয়েন মাইনিং করবেন। এখন সফটওয়্যার তো ফ্রি, সুতরাং ডাউনলোড করলেন। কারও অনুমতি লাগলো না, কোনো অফিস, কোনো নিয়োগপত্র—কিছুই না। চালু করা মাত্র আপনার কম্পিউটার নেটওয়ার্কে কানেক্ট হয়ে গেল। মনে আছে তো, প্রতিটি লেনদেন গুজবের মতো ছড়ায়? এখন রহিম করিমকে পাঠালো ২ কয়েন, সালমা রফিককে পাঠালো ৫ কয়েন। এখন প্রশ্ন—এই ট্রানজাকশন রিকোয়েস্ট বা ঘোষণাগুলো জমা হয় কোথায়? কোনো হেড অফিস তো নেই! সুতরাং নেটওয়ার্কের প্রতিটি কম্পিউটারে (আপনারটা সহ) নিজের কাছে রাখে একটা অপেক্ষা বা রিকোয়েস্টের ঝুড়ি। অর্থাৎ গুজবে যে লেনদেনই কানে আসে, টুক করে ঝুড়িতে রেখে দেওয়া হয়। এগুলো এখনো খাতায় তোলা হয়নি, ঝুড়িতে বসে অপেক্ষা করতেছে। কেউ একজন এদের খাতার পাতায় তুলবে। সেই 'কেউ একজন'টা আজ রাতে আপনিও হতে চান!

​আপনার কম্পিউটার ঝুড়ি থেকে লেনদেনগুলো তুলে একটা খসড়া পাতা সাজালো, আর পাতার একদম প্রথম লাইনে লিখে দিল অদ্ভুত একটা কথা—"এই পাতা লেখার পুরস্কার ৩.১২৫ নতুন কয়েন পাবে আমার ঠিকানা।" দাঁড়ান দাঁড়ান! তার মানে কি আপনি নিজের স্যালারি বা বেতন (অর্থাৎ এই বিটকয়েন মাইনিং করে আপনি যা পাবেন) আপনি নিজেই লিখে দিচ্ছেন? প্রশ্নটা ধরে রাখুন, উত্তরটা এই গল্পের শেষে।

​তো খসড়া পাতা রেডি, কিন্তু এই পাতা খাতায় ঢোকানো যাবে না—যতক্ষণ না একটা তালা খোলে! হ্যাঁ, তালা—স্যুটকেসের সেই নম্বর তালা দেখেছেন তো? চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সঠিক কোড মেলাতে হয়, সঠিক কোড মিলে গেলেই খুলে যায়। সাতোশির রুলবুক প্রতিটি নতুন পাতার সাথে ঝুলিয়ে দেয় ঠিক একটা করে তালা। তফাৎ একটাই—স্যুটকেসের তালার চাকা তিনটা (মানে ০০০ বা ১১১ এই টাইপের কম্বিনেশনগুলো মিলিয়ে নিলেই লক খুলে যায়, কম্বিনেশনের পসিবিলিটি বড়জোর হাজারখানেক)। কিন্তু এই তালায় এত ঘর যে সম্ভাব্য কোডের সংখ্যা আকাশের তারার চেয়েও বেশি! কোডটা কেউ জানে না—সাতোশিও না, রুলবুকও না, জানার কোনো রাস্তাই নেই। একটাই উপায়—ঘোরাতে থাকো, টানো; খোলেনি? পরের কম্বিনেশন ট্রাই করো; খোলেনি? পরেরটা ট্রাই করো... এভাবে চলতে থাকে।

​আপনার কম্পিউটার ঠিক এটাই করতে শুরু করল—সেকেন্ডে কোটি কোটি কম্বিনেশন! টেকনিক্যাল ভাষায় এই খেলাটার নাম—'হ্যাশ পাজল' (Hash Puzzle)। কিন্তু সমস্যা হলো, এই একই তালা খুলতে আজ রাতে নেমেছে পৃথিবীজুড়ে লাখ লাখ মেশিন—কাজাখস্তানের গুদামে, টেক্সাসের কারখানায়, আইসল্যান্ডের বরফের নিচে! সবাই পাগলের মতো চাকা ঘোরাচ্ছে। যার মেশিন যত পাওয়ারফুল বা যত দ্রুত, সে সেকেন্ডে তত বেশি কম্বিনেশন ট্রাই করতে পারে। মানে লটারিতে যত বেশি টিকিট কিনবেন, ওই লটারিতে জিতার প্রবাবিলিটি আপনার তত বেড়ে যাবে। এই দৌড়ের নামই—মাইনিং!

​আচ্ছা, একটা খটকা লাগতেছে, তাই না? তালাটা বানালো কে? আর তালাটা সহজ বা কঠিনই বা করলো কে? উত্তর হলো—কেউ না! নিয়মটা সেই সফটওয়্যারের ভেতরেই, যার হুবহু কপি চলতেছে প্রতিটি কম্পিউটারে। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অংশ—তালাটা নিজেই নিজেকে অ্যাডজাস্ট করে! ধরুন লাখ লাখ নতুন মাইনার নামলো একদিনে, তাহলে কি তালা খুব তাড়াতাড়ি খুলবে? রুলবুক তালায় আরেকটা চাকা যোগ করে দেবে, রাতারাতি খোলা ১০ গুণ কঠিন হয়ে যাবে! আবার মাইনার যদি কমে যায়, তাহলে চাকা কমে যাবে। উদ্দেশ্য একটাই—পৃথিবীতে যত মেশিনই নামুক, তালা খুলবে গড়ে ঠিক ১০ মিনিটে একবার! মেশিন নিজেই নিজের রেফারি।

​তো ফিরে আসি আপনার ঘরে। রাত গভীর, আপনার কম্পিউটার ট্রাই করেই যাচ্ছে, ঘুরিয়েই যাচ্ছে... আর ঠিক তখনই—'ক্লিক'! তালা খুলে গেছে! কোটি কোটি কম্বিনেশনের ভিড়ে আপনার মেশিনই পেয়ে গেছে কোডটি! আপনি জিতছেন ভাই! এক মুহূর্ত দেরি না করে আপনার কম্পিউটার চিৎকার করে উঠলো, পুরো নেটওয়ার্কে ঘোষণা দিয়ে দিল—"পাতা লেখা হয়ে গেছে! এই যে পাতা, এই যে কোড!"

​এবার আসল পরীক্ষা। কারণ পৃথিবীর কম্পিউটারগুলো তো আপনাকে চেনে না, বিশ্বাসও করে না; তারা যাচাই করবে। আর এখানেই তালা খোলার সবচেয়ে সুন্দর দিক—কোড খুঁজে বের করতে না হয় লাখ লাখ কোটি কোটি বার চেষ্টা করা লাগে, কিন্তু কেউ কোড বলে দিলে সেটা তালায় লাগিয়ে মিলিয়ে খুলতে—এক সেকেন্ড! প্রতিটি কম্পিউটার আপনার পাতা নিয়ে মেলালো—কোডে কি সত্যিই তালা খোলে? হ্যাঁ, খুলে গেছে। পাতার প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল সই কি আসল? হ্যাঁ, আসল। কেউ কি একই কয়েন দুইবার খরচ করছে? না, করেনি। আর আপনার লিখে দেওয়া বেতনটা (অর্থাৎ ৩.১২৫) ঠিক আছে তো? হ্যাঁ, ঠিক আছে! ব্যাস, আপনি পাস!

​আপনি যদি লোভ করে লিখতেন ১০০ কয়েন, প্রতিটি কম্পিউটার রুলবুক মিলিয়ে পুরো পাতাটাই ছুড়ে ফেলতো! তালা খোলার এত খাটুনি, এত বিদ্যুতের বিল—সব জলে যাবে। মানে সিস্টেমটা আপনাকে সৎ থাকতে বাধ্য করতেছে না, সৎ থাকাটাকেই লাভজনক বানিয়ে দিচ্ছে! চুরির চেষ্টা = নিশ্চিত লস; নিয়ম মানা = বেতন! সাতোশির আসল যে মাস্টারস্ট্রোক, সেটা কোডে না—মানুষের লোভটাকে সে বানিয়ে ফেলেছে ওই খাতার পাহারাদার!

​তো যাচাই শেষ, এবার পৃথিবীর প্রতিটি কম্পিউটার আপনার ওই পাতাটা নিজের খাতায় জুড়ে নিল। ঠিক এই মুহূর্তে সব খাতা আবার হুবহু এক! ঠিক এই মুহূর্তে করিমের ফোনে 'টুং' করে একটা মেসেজ গেল—২ কয়েন ঢুকেছে! ঝুড়ির সেই অপেক্ষমাণ লেনদেনগুলো অবশেষে কনফার্মড! আর ঠিক পরের সেকেন্ডেই পৃথিবীর সব মেশিন ঝাঁপিয়ে পড়ল নতুন তালায়! প্রতি ১০ মিনিটে একই নাটক—আবার, আবার, আবার... ২০০৯ সাল থেকে একটানা এক সেকেন্ডের জন্যও এটা থামেনি!

​এবার খেয়াল করুন, ওই এক পাতা লিখে আপনি যে জিতলেন (অর্থাৎ ৩.১২৫ বিটকয়েন), ওটা কোনো ভল্ট থেকে আসেনি, কেউ ছাপায়নি, কেউ পাঠায়নি—কয়েনগুলো স্রেফ জন্ম নিল! পৃথিবীতে নতুন বিটকয়েন আসার এটাই একমাত্র দরজা, এই কারণেই এর নাম মাইনিং।

​তবে এই বেতন চিরকাল ৩.১২৫ কিন্তু থাকবে না। সাতোশি কোডে লিখে গেছে—প্রতি ২ লাখ ১০ হাজার পাতা পর পর (মোটামুটি রাফলি ৪ বছর পর পর) পুরস্কার অর্ধেক হয়ে যাবে। শুরুতে ছিল ৫০ বিটকয়েন, ২০১২ সালে সেটা ২৫ হয়ে গেল, তারপরে হয়ে গেল সাড়ে ১২, সাড়ে ৬, এবং এখন ৩.১২৫। এটার নাম—'হাভিং' (Halving)। এভাবেই অর্ধেক হতে হতে মোট কয়েন কোনোদিনই ২ কোটি ১০ লাখ ছাড়াবে না—অর্থাৎ ২১ মিলিয়ন, গণিতে বাঁধা! প্রায় ২ কোটি ইতিমধ্যেই মাইনিং হয়ে গেছে, শেষ কয়েকটা কয়েন আসবে আনুমানিক ২১৪০ সালে!

​ও হ্যাঁ, আপনার ল্যাপটপের ভাগ্যটাও বলে দিই। ২০০৯ থেকে ২০১০ সালের দিকে সত্যিই ল্যাপটপ দিয়ে বিটকয়েন মাইনিং করা যেত, কারণ তখন তো প্রতিযোগিতা ছিল না! তারপর মাইনাররা টের পেল যে গেম খেলার গ্রাফিক্স কার্ড (যেটা একসাথে লাখো পিক্সেল আঁকে), সেটা ওই তালার চাকাও ঘোরাতে পারে শত-সহস্র গুণ! আর আজ খেলা চলে গেছে ASIC-এর হাতে—এমন মেশিন, যার জন্মই হয়েছে শুধু এই তালা ঘোরাতে, অর্থাৎ ক্রিপ্টো মাইনিং করতে! এদের পাশে আপনার ল্যাপটপ ওই লবণের চামচ দিয়ে পাহাড় কাটার মতো! তাই একা না পেরে মাইনাররা দল বাঁধে—'মাইনিং পুল' (Mining Pool) যাকে বলে। লাখো মানুষের টিকিট এক বক্সে, জিতলে খাটুনি অনুযায়ী ভাগাভাগি। মাইনিং আজ আর শুধু শখ না, গুদামভর্তি মেশিনের ইন্ডাস্ট্রি! সস্তা বিদ্যুতের খোঁজে দেশ থেকে দেশে ছোটা কারখানা! আর এই বিশ্বজোড়া তালা ঘোরানোর মোট কারেন্ট বিল কত? পুরো বাংলাদেশ সারা বছরে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তার চেয়েও বেশি! একটা দেশের সমান বিদ্যুৎ খাচ্ছে ক্রিপ্টো মাইনিং!

​মনে আছে? পুরোনো পাতা চেঞ্জ করতে গেলে পরের সবগুলো পাতা চেঞ্জ করতে হয়? মানে ইতিহাসের এক লাইন বদলাতে আপনাকে একা পৃথিবীর সব মাইনারের বিরুদ্ধে তালার পর তালা খুলে জিততে হবে! খরচ—একটা দেশের বিদ্যুতের বাজেট! আর জিতলেও লাভ নেই, নিজেই যদি সিস্টেম নষ্ট করেন, তাহলে আপনার চুরির কয়েনেরও কোনো মূল্য থাকবে না আপনারই কাছে! কারণ এই সিস্টেমটা ভাঙা যায় না বলেই আপনি এটার ভ্যালু দিচ্ছেন।

​এখন একটা প্রশ্ন করি—আপনার বিটকয়েন থাকে কোথায়? আপনার কয়েন থাকে খাতায়—সেই গ্লোবাল খাতায়, যার কপি হাজার হাজার কম্পিউটারে। খাতায় শুধু লেখা—'এই ঠিকানায় আছে ২ বিটকয়েন', ব্যাস! কয়েন বলতে এটুকুই—খাতার একটা লাইন! আর আপনার ওয়ালেটে থাকে ‘কী’ (Key) বা চাবি। ব্যাপারটা আবার জমির ভাষায় বুঝিয়ে বলি।

​বিটকয়েনের সিস্টেমে আপনার দুটো জিনিস আছে। প্রথমটি হলো—'পাবলিক অ্যাড্রেস' (Public Address)। এটি আপনার জমির দাগ নম্বরের মতো। সবাই দেখতে পারে এই দাগে কত কয়েন আছে, কবে কোথা থেকে এসেছে; পুরো খাতাটাই তো খোলা! কেউ টাকা পাঠাতে চাইলে এই ঠিকানাতেই দেবে। আর দ্বিতীয়টি হলো—'প্রাইভেট কী' (Private Key)। এটি একটা লম্বা গোপন সংখ্যা। এটাকে ভাবুন পৃথিবীর একমাত্র কলম, যেটা দিয়ে এই জমির হস্তান্তর দলিলে সই করা যায়! আপনি যখন কাউকে বিটকয়েন পাঠান, আপনার ওয়ালেট এই গোপন চাবি দিয়ে লেনদেনটার একটা ডিজিটাল সই করে। এখানে ম্যাজিকটা হলো—পুরো নেটওয়ার্ক যাচাই করে দেখে আপনার এই সই সঠিক কিনা। তো সিস্টেমটা দাঁড়ালো—দাগ নম্বর সবার জানা, কিন্তু সই করার কলম শুধু যার যারটা তার তার হাতে।

​এবার অন্ধকার দিকটা শুনুন। ব্যাংকের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে কী করেন? ফরগেট পাসওয়ার্ড দেন, ওটিপি আসে অথবা ব্রাঞ্চে যান। বিটকয়েনে? কিছুই নেই! কোনো কাস্টমার কেয়ার তো নেই, কোনো 'ভুলে গেছি' বাটন নেই, কোনো হেড অফিস নেই—মনে আছে তো? সুতরাং 'কী' বা চাবি হারানোর মানে—কয়েনগুলো খাতায় থাকবে, সবাই দেখবে, কিন্তু কেউ কোনোদিন ছুঁতে পারবে না! আপনি টোটাল জিনিসটাই হারাবেন!

​এই জিনিসটা কতটা নিষ্ঠুর, সেটা একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। এক ভদ্রলোকের নাম—জেমস হাওয়েলস (James Howells)। ওয়েলসের এক আইটি ইঞ্জিনিয়ার। ২০০৯ সালে বিটকয়েনের একদম শুরুতে, যখন পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মাইনার ছিল, সে তার ল্যাপটপে মাইন্ড করেছিল ৮০০০ বিটকয়েন! তখন এগুলোর দাম প্রায় কিছুই না। তার প্রাইভেট কী ছিল তার একটা হার্ডড্রাইভে। ২০১৩ সালে ঘর পরিষ্কারের সময় দুটো একই রকমের দেখতে হার্ডড্রাইভের মধ্যে তার ভুল হয়ে গেল! ভুল ড্রাইভটা সে ফেলে দিল ময়লার ব্যাগে! ময়লার ব্যাগ সমেত সেই হার্ডড্রাইভ চলে গেল নিউপোর্ট শহরের ভাগাড়ে—লাখ লাখ টন আবর্জনার নিচে! এরপর এক যুগ ধরে লোকটা সিটি কাউন্সিলের কাছে ভিক্ষা চেয়েছিল—"আমাকে শুধু খুঁড়তে দাও, খরচ আমি দেব! হার্ডড্রাইভটা খুঁজে পেলে শহরের মানুষকে টাকার ভাগ দেব!" কাউন্সিল রাজি হয়নি। সে মামলা করলো পরে, প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ডের! ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোর্ট মামলা খারিজ করে দিল। সে আবার আপিল করলো, সেটাও খারিজ হয়ে গেল! শেষে লোকটা পুরো ভাগাড়টাকে কিনে নিতে চাইল ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে, তাতেও লাভ হয়নি! ২০২৫-এর আগস্টে সে ঘোষণা দিল—"হাল ছেড়ে দিলাম!"

​আর সবচেয়ে নিষ্ঠুর অংশটি কি জানেন? তার ওয়ালেটের অ্যাড্রেসটা তো পাবলিক! সে চাইলে আজও যেকোনো মুহূর্তে ফোন খুলে দেখতে পারে তার সেই ৮০০০ কয়েন! খাতায় ঠিকই লেখা আছে, আজকের দামে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার—চোখের সামনে, কিন্তু তার হাতের নাগালের বাইরে! চিন্তা করে দেখুন ভদ্রলোকের অবস্থা! সে দেখতেছে সে অর্ধ বিলিয়ন ডলারের মালিক, কিন্তু কিছুই করতে পারতেছে না!

​হাওয়েলস একা না, গবেষকদের অনুমান—এখন পর্যন্ত মাইন্ড হওয়া বিটকয়েনের প্রায় ২০% এভাবেই চিরতরে হারিয়ে গেছে! কারও চাবি হারিয়ে গেছে, কেউ আবার হয়তো মারাই গেছে! মনে রাখবেন, ক্রিপ্টোতে স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব একই প্যাকেজে আসে। ব্যাংকের মতো কোনো কিছু না থাকায় আপনার টাকা আটকাবে না, কিন্তু ব্যাংক না থাকায় আপনি ভুল করলে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না! কারণ আপনিই মালিক, আপনিই ম্যানেজার, আপনিই সিকিউরিটি গার্ড।

​ধরুন আপনি এমন এক দেশে থাকেন যেখানে ক্রিপ্টো লেনদেন বৈধ। আপনি একটা ছাগল বিক্রি করবেন, দাম ২০,০০০ টাকার সমান। ক্রেতা বলল—"ভাই, ক্রিপ্টোতে দিই?" আপনি কী করবেন? প্রথমে ফোনে একটা ওয়ালেট অ্যাপ নামাবেন (ফ্রি)। অ্যাপটি আপনার জন্য বানিয়ে দেবে সেই দুইটা জিনিস—একটা পাবলিক ঠিকানা, আরেকটা হলো আপনার প্রাইভেট কী। কোনো ফর্ম নেই, ছবি নেই, এনআইডি নেই, ব্যাংকের সই নেই—৩০ সেকেন্ডে আপনার অ্যাপ রেডি! এবার অ্যাপে চাপ দিলেই আপনার ঠিকানাতে ভেসে উঠবে একটা কিউআর কোড। ক্রেতা তার ফোন দিয়ে কোডটি স্ক্যান করল, অ্যামাউন্ট বসাল, সেন্ড বাটনে চাপ দিল। তার অ্যাপ দিয়ে, তার প্রাইভেট কী দিয়ে লেনদেনটায় একটা ডিজিটাল সই করে দিল। কোনো এক মাইনার সেই লেনদেনটা বিটকয়েনের পরের পাতায় তুলে দিল। মিনিট দশেক পরে আপনার অ্যাপে 'টুং' করে একটা শব্দ হলো—খাতায় লেখা হয়ে গেছে, এই কয়েন এখন আপনার ঠিকানায়! ব্যাস, ছাগল দিয়ে দিলেন, কয়েন এসে গেল!

​খেয়াল করুন, পুরো ঘটনায় কার কার অনুমতি লাগলো? কোনো ব্যাংকের না, কোনো সরকারেরও না! দুজন মানুষের, দুটো ফোন, আর মাঝখানে শুধুই গণিত!

​যাহোক, মেশিনটা এখন সম্পূর্ণ। খাতা আছে, পাহারাদার আছে, চাবি-তালা আছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন এখানে ঝুলতেছে—২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন এই মেশিন বা সিস্টেমটা চালু হলো, একটা বিটকয়েনের দাম কত ছিল বলুন তো? ১ টাকা? ১ পয়সা? না—শূন্য! আক্ষরিক অর্থেই জিরো! তাহলে জিরো থেকে লাখ টাকা—এই জার্নিটা কীভাবে হলো? উত্তরটা লুকিয়ে আছে দুটো পিজ্জার মধ্যে!

​২০০৯ সালের জানুয়ারি, সিস্টেম চালু হয়ে গেছে, জেনেসিস ব্লক লেখা হয়ে গেছে; আর গোটা পৃথিবীতে এই জিনিসের ইউজার তখন মাত্র কয়েকজন। কোনো এক্সচেঞ্জ নেই, কোনো দাম নেই, কেনার লোক নেই, বেচার লোকও নেই। ১ বিটকয়েন = ০ টাকা, আক্ষরিক অর্থেই শূন্য! ঠিক যেমন এখন বাতাসের দাম শূন্য। কেউ যদি আপনাকে এক বোতল বাতাস বিক্রি করতে চায়, আপনি কি কিনে নেবেন? দাম দেবেন? দেবেন না। কিন্তু পরিবেশ যদি খারাপ হয়ে যায়, ওয়েদার যদি নষ্ট হয়ে যায় যে বিশুদ্ধ বাতাসের এতই অভাব যে আপনি পাচ্ছেন না, তখন কিন্তু আপনি এক বোতল বাতাসও কিনবেন—কথার কথা, উদাহরণ দিয়ে বললাম। অর্থাৎ ডিমান্ড তৈরি না হলে তো সেই জিনিসের দাম আসবে না, রাইট? ওকে, তাহলে এবার দেখি শূন্য থেকে বিটকয়েনের ডিমান্ড কীভাবে তৈরি হলো!

​শুরুতে সাতোশি নাকামোতোর পাশে তখন দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র কয়েকজন মানুষ। যেমন একজন হলো হেল ফিনি (Hal Finney)—ক্যালিফোর্নিয়ার কিংবদন্তি ক্রিপ্টোগ্রাফার, পিজিপি এনক্রিপশনের অন্যতম নির্মাতা। সফটওয়্যারটা যেদিন রিলিজ হলো, সেদিনই সে এটা ডাউনলোড করেছিল। ১১ জানুয়ারি ২০০৯, তখনকার টুইটারে দুই শব্দের একটা পোস্ট করল তিনি—"Running bitcoin"। ক্রিপ্টোর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত টুইট! পরদিন ১২ জানুয়ারি, সাতোশি তাকে পাঠাল ১০ বিটকয়েন—ইতিহাসের প্রথম বিটকয়েন লেনদেন! বিটকয়েনের খোলা খাতায় ১৭০ নম্বর পাতায় আজও এই জিনিসটা আছে, চাইলে আপনিও দেখতে পারবেন—খাতা তো খোলা! কিন্তু খেয়াল করুন, এটা প্রথম লেনদেন, কিন্তু বাণিজ্য না; এটা ছিল কাইন্ড অব মেশিন টেস্টের মতো। ১০ বিটকয়েনের দাম তখনও শূন্য!

​কিন্তু দাম তৈরি হলো কীভাবে? ২০০৯ সালের অক্টোবর, 'নিউ লিবার্টি স্ট্যান্ডার্ড' নামের এক অখ্যাত ওয়েবসাইট প্রথমবারের মতো একটা হিসাব কষলো। হিসাবটা ছিল ভয়ঙ্কর রকমের সহজ—একটা কম্পিউটার চালিয়ে ১ বিটকয়েন মাইন্ড করতে যত টাকার বিদ্যুৎ পড়ে, সেটাই বিটকয়েনের দাম! ফলাফল—১ ডলারে ১৩০৯ বিটকয়েন! মানে হলো, ১ বিটকয়েনের দাম তখন ১ পয়সারও কম! সেই মাসেই ইতিহাসের প্রথম ট্রেডটা হলো—ফিনল্যান্ডের এক তরুণ ডেভেলপার ৫০৫০ বিটকয়েন বিক্রি করল পেপালে, মোট ৫ ডলার ২ সেন্টে! হাসবেন না, এই ৫ ডলারের লেনদেনটাই মানব ইতিহাসের প্রথম মাইলফলক! চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো একজন মানুষ আসল টাকা খরচ করল একটা খাতায় কয়েকটা লাইন তোলার জন্য—ওই বিটকয়েনের খাতায়! সেই মুহূর্তে বিটকয়েনের দাম তৈরি হলো, শূন্য থেকে সে বেরিয়ে এলো।

​কিন্তু দাম থাকা এক জিনিস, আর টাকা হওয়া আরেক জিনিস! টাকা তো সেটাই, যেটা দিয়ে জিনিসপত্র কেনা যায়। সেই ঘটনাটা ঘটলো আরও ৭ মাস পর—২২ মে ২০১০, ফ্লোরিডা। লাসলো হেনিয়েস (Laszlo Hanyecz) নামের এক কম্পিউটার প্রোগ্রামার একটি ফোরামে পোস্ট করল যে—"কেউ আমাকে দুটো পিজ্জা কিনে পাঠাবে? বিনিময়ে দেব ১০,০০০ বিটকয়েন!" চারদিন কেউ রাজি হয়নি, শেষে এক তরুণ রাজি হলো। ২৫ ডলার খরচ করে পাপা জনস (Papa John's) থেকে দুটো পিজ্জা পাঠাল, আর পকেটে ভরল ১০,০০০ বিটকয়েন! সেই ১০,০০০ বিটকয়েনের আজকের দাম কত জানেন? ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি! টাকায় ৭,০০০ কোটি টাকার উপরে—দুটো পিজ্জার জন্য! মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দামি লাঞ্চ! এজন্য ক্রিপ্টো দুনিয়ায় আজও প্রতিবছর ২২ মে-তে দিনটি পালন করা হয় 'বিটকয়েন পিজ্জা ডে' নামে।

​এখন সবাই লাসলোকে নিয়ে হাসে, কিন্তু সত্যিটা হলো লাসলো বোকা ছিল না, লাসলো ছিল পালোয়ান/পায়োনিয়ার! কারণ ওই দিনটার আগে বিটকয়েন ছিল কম্পিউটার গিকদের খেলনা, ওই দিনটার পর থেকে বিটকয়েন হয়ে গেল টাকা! কারণ ওই দিনটির পর প্রমাণ হয়ে গেল যে, এই বিটকয়েনের খাতায় লাইন লিখিয়ে বাস্তব পৃথিবীতেও পেট ভরানো যায়!

​এরপর চাকা ঘুরতে শুরু করল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিটকয়েন ছুয়ে গেল প্রথমবারের মতো ১ ডলার—পিজ্জা কেনার মাত্র ৯ মাস পর! তারপর গল্পটি আপনারা জানেন।

​কিন্তু দাঁড়ান, এখানে একটা গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। পিজ্জাওয়ালা কেন ১০,০০০ বিটকয়েন নিল? ফিনল্যান্ডের ছেলেটার কয়েন কেউ কেন ৫ ডলারে কিনলো? জিনিসটা তো খাওয়া যায় না, পরা যায় না, ধরা যায় না! একটা খাতার লাইনের দাম আসে কোথা থেকে? উত্তরটা শুনলে আপনার পকেটের টাকাগুলোকেও আর আগের মতো লাগবে না! মনে আছে, কিছুক্ষণ আগে ৫০০ টাকার নোটটা আপনাদের দেখিয়েছিলাম? এক টুকরো কাগজ, ছাপার খরচ সামান্য; খাওয়া যায় না, পরা যায় না। তবুও ওই কাগজটির জন্য আপনি সারামাস অফিস করেন, রোদে পোড়েন, বসের ঝারি খান! কিন্তু কেন? কারণ আপনি জানেন দোকানদার এটা নেবে। আর দোকানদার নেয় কেন? কারণ সে জানে তার পাইকার এটা নেবে। পাইকার জানে ব্যাংক এটা নেবে! খেয়াল করুন, কাগজটার নিজের কোনো দাম নেই, দামটি আসলে একটা সামাজিক চুক্তি! আমরা একসাথে বিশ্বাস করি বলেই কাগজটার দাম আছে, সেটি টাকা! কিন্তু যেদিন বিশ্বাসটি ভাঙবে—যেমনটি ভেঙেছিল জিম্বাবুয়েতে বা ভেনেজুয়েলায়, সেদিন এক বস্তা নোট দিয়ে একবেলার বাজারও হবে না!

​গোল্ডের গল্পও কিন্তু তেমনই। হাজার বছর ধরে স্বর্ণ মূল্যবান, খুব বেশি কাজে লাগে না কিন্তু স্বর্ণ! স্বর্ণ মূল্যবান কারণ—এক, সেটার দুষ্প্রাপ্যতা (চাইলেই বানানো যায় না); আর দ্বিতীয়ত হলো—সবাই মানে যে সেটা মূল্যবান, ব্যাস এই দুটোই! অর্থাৎ সহজে পাওয়া যায় না + সম্মিলিত বিশ্বাস = দাম।

​এবার বিটকয়েনকেও একই পাল্লায় তুলুন। দুষ্প্রাপ্যতা? সোনার চেয়েও কড়া! স্বর্ণের নতুন খনি পাওয়া গেলে সাপ্লাই তো বাড়ে; বিজ্ঞানীরা কোনোদিন সমুদ্রের তলা থেকে স্বর্ণ তোলার সস্তা উপায় বের করলে সোনার বাজার পড়ে যাবে। কিন্তু বিটকয়েন? ২ কোটি ১০ লাখ! কোনো উপায় নেই, কোনো আবিষ্কার নেই, কোনো সরকার নেই যে সংখ্যাটি বাড়াতে পারবে! নিয়মটা কম্পিউটার কোডে লেখা, আর কোডটা পাহারা দিচ্ছে হাজার হাজার কম্পিউটার। আর টাকার সাথে তুলনা করলে, এখানেই সাতোশির সবচেয়ে জোরালো খোঁচাটা—সরকার চাইলে টাকা ছাপাতে পারে, যত খুশি! ২০০৮-এ কী হয়েছিল মনে আছে? ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে শত শত ডলার ছাপানো হলো। বেশি টাকা ছাপালে কী হয়? আপনার পকেটের টাকার কেনার ক্ষমতা কমে যায়, চাল-ডাল-তেলের দাম বেড়ে যায়। আসলে জিনিসের দাম বাড়ে না, আপনার টাকার ভ্যালুটা কমে! ইনফ্লেশন আসলে একটা নীরব ট্যাক্স, যেটা আপনার অনুমতি ছাড়াই আপনার সঞ্চয় থেকে কেটে নেওয়া হয়, আপনি টের ও পান না—কারণ সংখ্যা তো চেঞ্জ হয় না!

​বিটকয়েন এখানে এসে বলে—"আমার ক্ষেত্রে এটা কেউ পারবে না! কোনো প্রেসিডেন্ট নেই, কোনো গভর্নর নেই, কোনো শাসককে বিশ্বাস করো না—গণিতকে করো! Don't Trust, Verify!" টাকার পেছনে আছে গভর্মেন্টের আশ্বাস বা বিশ্বাস, গোল্ডের পেছনে ৫,০০০ বছরের অভ্যাস, আর বিটকয়েনের পেছনে এখনো পর্যন্ত কয়েক কোটি মানুষের বিশ্বাস আর মাত্র ১৭ বছরের ইতিহাস! এই কারণেই বিটকয়েনের দাম এমন পাগলা ঘোড়া! জিনিসের সাপ্লাই পাথরে বাঁধা, কিন্তু বিশ্বাস এখনো দুলতেছে। বিশ্বাস বাড়ে—দাম রকেট; বিশ্বাস কমে—দাম খাদে! এক বছরে দাম দ্বিগুণ হয়েছে, আবার এমন বছরও গেছে যে এক বছরে দাম অর্ধেক হয়ে গেছে!

​আর ঠিক এখানেই অন্ধকারটা শুরু। কারণ যেখানেই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার গল্প আছে, সেখানেই ওত পেতে থাকে হাঙরের দল! মনে রাখবেন, সিস্টেম এক জিনিস, আর সিস্টেমের চারপাশের বাজার সম্পূর্ণ আরেক জিনিস। এবার সেই বাজারের পাঁচটা নির্মম সত্য বলি—

সত্য নম্বর ১: পাগলা ঘোড়া। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এক বিটকয়েনের দাম উঠেছিল ১ লাখ ২২ হাজার ডলারেরও বেশি, আর আজ ৮/৭/২০২৬ সেটা কমে হয়ে গেছে ৬৩ হাজার ডলারের ঘরে! এক বছরে প্রায় দাম অর্ধেক কমছে! এখন চিন্তা করে দেখুন, কেউ যদি পিক সময়ে জমি বেচে, লোন করে বিটকয়েনের ধান্দায় ঢুকতো, তাহলে কী হতো? সে তো সর্বস্বান্ত!

সত্য নম্বর ২: সাধারণ মানুষ বিটকয়েন হাতের পায় কীভাবে? মাইন্ড করা তো ইন্ডাস্ট্রির কাজ, তাহলে রাস্তা মূলত দুইটা—এক হলো কেউ আপনাকে পাঠালে (আপনি কাউকে কিছু বিক্রি করবেন এবং বিটকয়েন বিনিময়ে পাবেন, যে কেউ পৃথিবীর যেকোনো কোণা থেকে সরাসরি কয়েন পাঠাতে পারে); আর দুই হলো কিনে নেওয়া, মানে হলো নগদ টাকা দিয়ে বিটকয়েন কেনা। আর এখানেই বাজারে ঢুকে পড়ছে এক নতুন ব্যবসা—'ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ' (Crypto Exchange)। বিদেশে যাওয়ার আগে যেমন টাকা দিয়ে আমরা ডলার কিনি বা থাই বাত কিনি, এক্সচেঞ্জে তেমন সাধারণ টাকা দিয়ে বিটকয়েন কেনাবেচা যায়—বাইন্যান্স, কয়েনবেস এসব নাম তো শুনছেনই। এরা অ্যাপ বানিয়েছে, এই ক্রিপ্টো বেচাকেনা সহজ করেছে, বিনিময়ে প্রতি লেনদেনে কমিশন কাটতেছে! কোটি কোটি মানুষের জন্য ক্রিপ্টোর দুনিয়ায় ঢোকার দরজা এখন এই এক্সচেঞ্জগুলোই।

​বিটকয়েনের নেটওয়ার্ক আর এই এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলো এক জিনিস না! নেটওয়ার্কটা মাতব্বরহীন, কিন্তু এক্সচেঞ্জগুলো রীতিমতো কোম্পানি—অফিস আছে, মালিক আছে, সার্ভার আছে, ঠিকানাও আছে। অর্থাৎ সাতোশি নাকামোতো মাতব্বর তাড়াতে মেশিনটি বানালো, আর মানুষ কী করল—নিজের কয়েন রাখার ঝামেলা এড়াতে কয়েনগুলো তুলে দিল এক্সচেঞ্জের নামের নতুন মাতব্বরের হাতে! ফলাফল—টোকিওর 'এমটি গক্স' (Mt. Gox)। একসময় পৃথিবীর ৭০ ভাগ বিটকয়েনের ট্রেড হতো এখানে। ২০১৪ সালে জানা গেল, হ্যাকাররা বছরের পর বছর ধরে চুপিচুপি সরিয়ে নিয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ বিটকয়েন! গ্রাহকরা পথে বসলো, অনেকেই এক যুগ পরেও টাকা ফেরতের অপেক্ষায় আছে!

​২০২২ সাল, 'FTX'—পৃথিবীর অন্যতম বড় এক্সচেঞ্জ। মালিক শ্যাম ব্যাংকম্যান ফ্রাইড (Sam Bankman-Fried)। ভেতরে ভেতরে সে গ্রাহকের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার নিজের জুয়া খেলায় লাগিয়ে দিয়েছিল! কোম্পানি ধসে পড়ল, সে এখন জেলে। ক্রিপ্টো দুনিয়ায় তাই একটা প্রবাদ আছে—"Not your keys, not your coins!" খেয়াল করুন, দুটি ঘটনার কোনোটিতেই বিটকয়েনের ব্লকচেইন হ্যাক হয়নি কিন্তু, ভুল বুঝবেন না; খাতা অটুট আছে, ধসে পড়েছে মাঝখানের কোম্পানিগুলো!

সত্য নম্বর ৩: যেখানে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার গল্প আছে, সেখানেই প্রতারক আছে। বিটকয়েন ছাড়াও হাজার হাজার ভুয়া কয়েন তৈরি হয়েছে, যেগুলোর পেছনে না আছে কোনো টেকনোলজি, না আছে কোনো আইডিয়া। সেলিব্রিটি দিয়ে হাইপ তোলা হয় এসব কয়েনের, দাম বাড়ানো হয়, তারপরে বানানেওয়ালারা বেচে দিয়ে পালায়। ক্রিপ্টোর নাম ভাঙিয়ে আসলে সেই পুরোনো পনজি স্কিম (Ponzi scheme)!

সত্য নম্বর ৪: বর্তমানে বিটকয়েন নেটওয়ার্কের পেছনে এক বছরের বিদ্যুৎ খরচ পুরো বাংলাদেশের বার্ষিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি! সমর্থকরা বলে—এটাই তো নিরাপত্তার দাম! কিন্তু সমালোচকরা বলে—পৃথিবীর মানুষ এখনো লোডশেডিংয়ের কষ্টে ভোগে, সেখানে একটা পাতায় বা খাতায় এই লেখালেখি করার জন্য এত বিদ্যুৎ পোড়ানো হইতেছে?

সত্য নম্বর ৫: গতি। ভিসা বা মাস্টারকার্ডের নেটওয়ার্কে সেকেন্ডে হাজার হাজার লেনদেন হয়, বিটকয়েনের মূল নেটওয়ার্ক সেকেন্ডে মোটে এক অঙ্কের ঘরের লেনদেন সামলায়! সেই ১০ মিনিটে এক পাতা লেখা হয়, মনে আছে তো? চা কিনে বিটকয়েনের দাম দিতে গেলে চা ঠান্ডা হয়ে যাবে! সমাধানের ট্রাই করা হচ্ছে, কিন্তু দৈনন্দিন টাকা হওয়ার দৌড়ে বিটকয়েন এখনো অনেক পিছিয়ে।

​এছাড়া আছে জমানো টাকার ফাঁদ, এটা সূক্ষ্ম—কিন্তু মন দিয়ে শুনুন। মনে আছে, ২ কোটি ১০ লাখের বেশি বিটকয়েন কোনোদিনই হবে না, মূল্যস্ফীতি নেই—দারুণ ব্যাপার, তাই না? কিন্তু কয়েনের এপিঠ থাকলেও ওপিঠ তো আছে! পৃথিবীর অর্থনীতি প্রতিবছর বাড়তেছে—নতুন মানুষ, নতুন ব্যবসা, নতুন জিনিসপত্র আসতেছে; কিন্তু বিটকয়েনের সংখ্যা স্থির! ধরে নিন পৃথিবীতে আর কোনো কারেন্সি নেই, খালি বিটকয়েনই আছে; তাহলে কী হবে? বিটকয়েনের সংখ্যা তো নির্দিষ্ট, ফলাফল—বিটকয়েনের হিসাবে সবকিছুর দাম শুধু কমতে থাকবে, আর কয়েনের দাম বাড়তে থাকবে! এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন—যে টাকার দাম আগামীকাল বাড়বে বলে আপনি বিশ্বাস করেন, সেটা কি আপনি আজ খরচ করবেন? করবেন না, জমিয়ে রাখবেন! লাসলোর কথা চিন্তা করুন, আজকের হিসাবে সে ওই দুটো পিজ্জা কিনতে ৬০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করছিল, তাই না? পুরো পৃথিবী তাকে নিয়ে হাসে! আর এই হাসিটাই সমস্যা—সবাই যদি খরচের বদলে শুধু বিটকয়েন কিনে কিনে জমায়, তাহলে কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যাবে তো! ব্যবসা স্থবির হয়ে যাবে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে!

​আর আরেকটা জিনিস খেয়াল করুন—আধুনিক অর্থনীতি চলে ঋণের ওপরে। ব্যবসায়ীরা লোন নেয়—কারখানা বানায়, মানুষ লোন নেয়—বাড়ি বানায়; আর ব্যাংক যখন লোন দেয়, সে আসলে খাতায় নতুন টাকা তৈরি করে দেয়, অর্থনীতির রক্তে সঞ্চালন বাড়ে। কিন্তু বিটকয়েনে? আপনার কয়েন আপনি কাউকে ধার দিতেই পারেন, কিন্তু সিস্টেমে নতুন কয়েন তৈরি করার ক্ষমতা তো আপনার নাই—দরকারের সময়ও নাই, সংকটের সময়ও নাই! এখন আপনি আপনার জমানো বিটকয়েন অন্যকে ধার কেন দেবেন? ওটা তো আপনার কাছে থাকলেই ওর ভ্যালু বাড়বে! যে কঠোরতা বিটকয়েনকে মূল্যস্ফীতি থেকে বাঁচায়, সেই একই কঠোরতা তাকে একটা চলমান অর্থনীতির রক্ত হতে দেয় না। এটাই সাতোশি নাকামোতোর ডিজাইনের সবচেয়ে গভীর ট্রেড অফ (Trade-off)।

​বিটকয়েন ছাড়াও তো হাজারো ক্রিপ্টো দেখি, এগুলো কী? খেয়াল করুন, এইমাত্র যে লিমিটেশনগুলো শুনলেন—স্লো লেনদেন, পাগলা দাম, বিদ্যুতের বিপুল খরচ—নতুন কয়েনের বেশিরভাগেরই জন্ম এই লিমিটেশনগুলোর কথা চিন্তা করে। সবচেয়ে বড় নামটি হলো—'ইথেরিয়াম' (Ethereum)। ২০১৫ সালে ভিটালিক বুতেরিন (Vitalik Buterin) নামের এক তরুণ প্রোগ্রামারের হাতে এটির জন্ম। তার আইডিয়া ছিল—ব্লকচেইনের খাতায় শুধু টাকার হিসাব কেন থাকবে, চুক্তিও তো লেখা যায়! এমন চুক্তি, যেটা সত্য পূরণ হলেই নিজেই কার্যকর হবে—কোনো উকিল-আদালত লাগবে না, ‘স্মার্ট কন্ট্রাক্ট’ (Smart Contract) যাকে বলে। আবার দামের পাগলামি ঠেকাতে এসেছে 'স্টেবল কয়েন' (Stablecoin), যার দাম আবার মার্কিন ডলারের সাথে বাঁধা! তো তাহলে আর কী হলো? হ্যাঁ, কিছু প্রজেক্টের পেছনে সত্যি কারেরই ইঞ্জিনিয়ারিং আছে।

​তাহলে ভবিষ্যৎ কী? ক্রিপ্টো কি একদিন ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি রিপ্লেস করবে? সত্য উত্তর হচ্ছে—সম্ভাবনা কম, অন্তত এখন পর্যন্ত। বেশিরভাগ মানুষ বিটকয়েনকে দেখে টাকা হিসেবে না, 'ডিজিটাল গোল্ড' হিসেবে। আপনি স্বর্ণ দিয়ে তো চা কেনেন না, জমি কেনেন না—রেখে দেন; বিটকয়েনও তেমন।

​সাতোশির কয়েন জিতুক বা হারুক, সাতোশির আইডিয়া ইতিমধ্যে জিতে গেছে! আজ গোটা পৃথিবীতে ব্লকচেইন নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, খোদ সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো নিজেদের ডিজিটাল কারেন্সি বানাচ্ছে! যে মাতব্বরের বিরুদ্ধে মেশিনটি বানানো হয়েছিল, সেই মাতব্বরেরাই আজ সাতোশির ডিজাইন কপি করতেছে!

​সবার শেষে বলি সেই সাতোশি নাকামোতোর কথা। ২০১০ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সে নিয়মিত কোড লিখেছে, ফোরামে উত্তর দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে নীরবতা। ২০১১ সালের এপ্রিলে শেষবারের মতো ইমেইলে এক ডেভেলপারকে সে জানিয়েছিল যে, সে এখন অন্য কাজে ব্যস্ত। এরপর আর কোনোদিন কিছু না! কোনো ইন্টারভিউ না, কোনো দাবি না, কোনো বিজয় মিছিল না, কোনো র্যালি না—তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি! তার ওয়ালেটে ১১ লাখ বিটকয়েন আজও জমে আছে, আজকের দামে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! সে কিন্তু এগুলো টাচও করেনি, খরচও করেনি।

​ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লবীর একটা মুখ থাকে—'আমাকে দেখো', 'স্বীকৃতি দাও', 'ইতিহাসে আমাকে স্থান দাও' টাইপের বিষয় থাকে। আর এই লোকটা টাকার সংজ্ঞাই চেঞ্জ করে দিছে, অথচ নিজে আলো নিভিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেছে! হয়তো সে জানতো, তার মুখটাই সিস্টেমের শেষ দুর্বলতা! মনে আছে, সেই ই-গোল্ডের ঠিকানা ছিল বলেই দরজায় কড়া পড়েছিল? সাতোশি নিজেকেই নিজে মুছে দিয়ে শেষ দরজাটাও বন্ধ করে দিয়েছে। সিস্টেমটা এখন সত্যিই কারও না!

​বিটকয়েনের শেষমেশ কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়। কিন্তু একটা জিনিস প্রমাণ হয়ে গেছে—মাতব্বর ছাড়াও খাতা রাখা সম্ভব! আর এই এক প্রমাণই ব্যাংক, সরকার এবং টাকার ৫০০ বছরের খেলাটা চিরদিনের জন্য চেঞ্জ করে দিছে!

​একটা জরুরি কথা বলি—বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশে ভার্চুয়াল কারেন্সির লেনদেন বা ট্রেডিং অনুমোদিত নয়। তাই এই আর্টিকেলটি কোনো বিনিয়োগের পরামর্শ না, এটা শুধু বিটকয়েন টেকনোলজি এবং তার ইতিহাস বোঝার একটা আর্টিকেল। কারণ যে জিনিস পৃথিবীর অর্থনীতি নাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটা না বোঝাটাই বিরাট বড় ঝুঁকি!

​তো আজ এ পর্যন্তই। আর্টিকেলটি ভালো লাগলে এমন কাউকে শেয়ার করবেন, যে ক্রিপ্টো শব্দটা শুনলে মাথা চুলকায়! দেখা হবে পরের আর্টিকেলে, সে পর্যন্ত সুস্থ থাকুন, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন