![]() |
| ছবিটা রুপক অর্থে ব্যাবহৃত। |
২৫ মে ২০২৬।
ঈদের ছুটির সেই সকালটা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত নরম অনুভূতি জেগে ওঠে। শহরের ব্যস্ততা, কারখানার শব্দ, ধোঁয়া আর ক্লান্তির জীবন পেছনে ফেলে আমি ফিরছিলাম নিজের গ্রামে—তামাই গ্রামে।
গাজীপুরের কর্মব্যস্ত জীবন মানুষকে বদলে দেয়। সেখানে সকাল মানেই তাড়াহুড়া, দুপুর মানেই দায়িত্ব, আর রাত মানেই অবসন্ন শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা। কিন্তু গ্রামের সকাল আলাদা। সেখানে বাতাসের গায়ে মাটির গন্ধ থাকে, পাখির ডাক থাকে, আর থাকে শৈশবের স্মৃতি।
সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বাস থেকে নামলাম। আকাশ তখনো ধূসর হয়ে ছিল। ঈদের আগের দিনের মতো গ্রামজুড়ে এক ধরনের অলস আনন্দ ছড়িয়ে ছিল। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানে মানুষ বসে চা খাচ্ছে। কেউ গরু কিনতে যাচ্ছে, কেউ বাজার থেকে সেমাই নিয়ে ফিরছে। দূরে বাঁশবাগানের মাথা দুলছিল হালকা বাতাসে।
বাসা পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, কতদিন পরে যেন আমি নিজের শ্বাসটা ঠিকভাবে নিতে পারছি।
বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই মা দরজা খুলে বের হলেন। তাঁর চোখে সেই পুরোনো মায়া।
— “এসেছিস বাবা?”
একটা ছোট্ট প্রশ্ন। অথচ সেই প্রশ্নের ভেতরে কত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল!
আমি ব্যাগ নামিয়ে উঠানে দাঁড়ালাম। মাটির গন্ধটা গভীরভাবে টেনে নিলাম বুকের ভেতর। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় ফিরে এসেছি।
সকালের খাবার টেবিলে ছিল গরম ভাত, ডাল, ডিম ভাজি আর মায়ের হাতের মাছ ভাজি । গাজীপুরে যত ভালো খাবারই খাই না কেন, মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ কখনো কোনো কিছুর সাথে মেলে না। আমি খেতে খেতে গ্রামের নানা খবর শুনছিলাম। কে বিদেশ গেছে, কার বিয়ে হয়েছে, কে নতুন দোকান দিয়েছে—সব গল্প যেন আমার অনুপস্থিতির সময় জমে ছিল।
কিন্তু খাবার শেষ হতে না হতেই হঠাৎ আকাশটা অন্ধকার হয়ে এলো।
প্রথমে টুপটাপ। তারপর মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।
টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ এমনভাবে পড়ছিল যেন হাজারো ঢোল একসাথে বাজছে। উঠানের ধুলো মুহূর্তেই কাদায় পরিণত হলো। দূরের গাছগুলো ঝাপসা হয়ে গেল বৃষ্টির পর্দায়।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগলাম।
আজ ভেবেছিলাম বন্ধুদের সাথে দেখা করব। অনেকদিন পর আড্ডা হবে। কিন্তু বৃষ্টি যেন পুরো পরিকল্পনাটাই আটকে দিল।
মনে হলো, প্রকৃতি কখনো কখনো মানুষকে থামিয়ে দেয় শুধু কিছু অনুভব করানোর জন্য।
ঘরের ভেতর একটা অলস দুপুর নেমে এলো। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। পাশের মসজিদ থেকে সমুদুর কন্ঠে মুয়াজ্জিনের আযশান ভেসে আসছিল। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকছিল। আর আমি জানালার পাশে বসে পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে করছিলাম।
এই তামাই গ্রামেই তো আমাদের শৈশব কেটেছে।
এই রাস্তাগুলোতেই আমরা দৌড়াতাম।
এই মাঠেই ফুটবল খেলতাম।
এই দোকানেই প্রথম চা খাওয়া শিখেছিলাম।
সময় মানুষকে বড় করে দেয়, কিন্তু ভেতরের কিছু স্মৃতি কখনো বড় হয় না। সেগুলো ঠিক আগের মতোই ছোট্ট, সরল আর উজ্জ্বল থেকে যায়।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি আরও জোরে নামল। চারপাশে কেবল পানির শব্দ। বিদ্যুতের খুঁটি বেয়ে পানি ঝরছে। দূরের পুকুরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করছে।
আমি মোবাইল হাতে নিয়ে সিয়ামকে মেসেজ দিলাম।
— “বের হবি?”
ও রিপ্লাই দিল,
— “বৃষ্টি থামুক আগে।”
মোহাম্মদ আলীও একই কথা বলল।
তারপর আবার অপেক্ষা।
সন্ধ্যার একটু আগে হঠাৎ বৃষ্টিটা কমতে শুরু করল। আকাশে এক টুকরো কমলা আলো ফুটে উঠল। পশ্চিম দিকের মেঘগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
আমি দ্রুত একটা শার্ট পরে বাইরে বের হলাম।
গ্রামের ভেজা রাস্তার সৌন্দর্য আলাদা। কাদার গন্ধ, ভেজা পাতার গন্ধ, দূরের রান্নার ধোঁয়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি।
রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের রঙ প্রতিফলিত হচ্ছিল। ছেলেরা খালি পায়ে পানি মাড়িয়ে হাঁটছিল। কেউ কেউ বৃষ্টির পর মাছ ধরতে বের হয়েছে।
গ্রামের মোড়ে পৌঁছাতেই সিয়ামকে দেখলাম। মাথার চুল এখনো ভেজা। আমাকে দেখেই হাসল।
— “ওরে! শহুরে মানুষ ফিরছে অবশেষে!”
আমি হেসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো—অনেকদিন দেখা না হলেও দূরত্ব তৈরি হয় না।
কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ আলীও এলো। তার মুখে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী হাসি।
— “চল, বাইক নিয়ে বের হই।”
তার কালো রঙের বাইকটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টির পানিতে চকচক করছিল পুরো গা।
মোহাম্মদ সামনে বসল। আমি আর সিয়াম পেছনে।
বাইক স্টার্ট হতেই গ্রামের নীরব রাস্তা কেঁপে উঠল।
সন্ধ্যার বাতাস তখন ঠান্ডা হয়ে গেছে। রাস্তার দুই পাশে ধানক্ষেত। ভেজা মাটির গন্ধ নাকে আসছিল বারবার। দূরে দূরে জোনাক জ্বলছিল। মাঝে মাঝে কাদার পানি ছিটকে এসে পায়ে লাগছিল।
আমরা যাচ্ছিলাম আদাচাকী চায়ের দোকানে।বলতে গেলে এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত আড্ডার জায়গা।
ছোট্ট টিনের চালা। সামনে কয়েকটা বেঞ্চ। একটা পুরোনো কেটলি সবসময় চুলোর ওপর ফুটতে থাকে। দোকানের চারপাশে চায়ের গন্ধ আর মানুষের গল্প মিশে থাকে।
দোকানে পৌঁছে দেখি কয়েকজন আগেই বসে আছে। কেউ মোবাইলে খেলা দেখছে, কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে।
চাচা আমাদের দেখে বললেন,
— “এই যে শহরের ছেলে আইছে!”
আমরা হেসে বেঞ্চে বসলাম।
মোহাম্মদ বলল,
— “চাচা, তিনটা চা দেন। কড়া করে।”
চায়ের কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছিল। দোকানের আলোয় সেই ধোঁয়া দেখতে দারুণ লাগছিল। বাইরে ভেজা রাস্তার ওপর হালকা কুয়াশার মতো বাষ্প জমেছিল।
কিছুক্ষণ পর তিনটা কাঁচের কাপ এসে হাজির হলো।
আমি কাপটা হাতে নিলাম। গরম চায়ের স্পর্শে হাত উষ্ণ হয়ে গেল। চায়ের ভেতর আদার ঝাঁঝালো গন্ধ ছিল। প্রথম চুমুকেই মনে হলো—এই স্বাদ শহরের কোনো ক্যাফেতে পাওয়া যায় না।
তারপর শুরু হলো আড্ডা।
বিষয়—ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬।
মোহাম্মদ ব্রাজিলের সমর্থক। ওর বিশ্বাস, নেইমার এখনো ম্যাজিক দেখাতে পারে।
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে তর্ক শুরু করল।
— “আর্জেন্টিনার টিম এবারও শক্তিশালী। তরুণ প্লেয়ার অনেক।”
আমি হেসে বললাম,
— “তোরা যতই বলিস, পর্তুগাল এবার চমক দিবে।”
মোহাম্মদ টেবিলে হাত মেরে বলল,
— “নেইমার থাকলে ব্রাজিলের খেলা আলাদা।”
সিয়াম হাসল।
— “নেইমার আগে ইনজুরি ছাড়া পুরো টুর্নামেন্ট খেলুক।”
আমরা সবাই হেসে উঠলাম।
চায়ের দোকানের আলোয় তখন আমাদের মুখগুলো ঝলমল করছিল। চারপাশে গ্রামের সন্ধ্যা আরও গভীর হয়ে উঠছিল।
দূরে মসজিদ থেকে এশার আজান ভেসে এলো।
কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই চুপ হয়ে গেলাম।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—এই মুহূর্তটাই আসলে জীবন।
না আছে কোনো অফিসের চাপ।
না আছে শহরের শব্দ।
না আছে ক্লান্তি।
শুধু বন্ধু, চা আর গল্প।
মোহাম্মদ হঠাৎ বলল,
— “জানিস, ছোটবেলায় ভাবতাম আমরা কখনো আলাদা হব না।”
আমি চুপ করে রইলাম।
সিয়াম ধীরে ধীরে বলল,
— “কিন্তু জীবন সবাইকে আলাদা পথে নিয়ে যায়।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতর হালকা একটা ব্যথা লাগল।
সত্যিই তো।
কেউ কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ পরিবার নিয়ে।
কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায়।
তবু এই ধরনের একটা সন্ধ্যা সব দূরত্ব মুছে দেয়।
বৃষ্টির পরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছিল। দোকানের পাশের গাছে জমে থাকা পানি মাঝে মাঝে টুপ করে পড়ছিল।
চাচা আবার কেটলিতে পানি ঢাললেন।
আমি চারপাশে তাকালাম।
একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। অথচ এখানে কত গল্প জমে আছে!
কত প্রেমের গল্প।
কত স্বপ্নের গল্প।
কত ব্যর্থতার গল্প।
কত বন্ধুত্বের গল্প।
গ্রামের চায়ের দোকান আসলে একটা ছোট্ট পৃথিবী।
মোহাম্মদ আবার শুরু করল,
— “দেখিস, ব্রাজিল এবার কাপ নিবে।”
আমি বললাম,
— “ক্রিস্টিয়ানো যদি শেষ বিশ্বকাপে কিছু করে দেখায়?”
সিয়াম হেসে বলল,
— “তোদের দুইজনেরই আবেগ বেশি।”
তারপর আমরা খেলোয়াড়দের নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম। কে ফর্মে আছে, কে দলে থাকবে, কার কোচিং ভালো—সব নিয়ে তর্ক চলল।
কিন্তু সেই তর্কের ভেতরেও ছিল এক ধরনের উষ্ণতা।
কারণ আমরা কেউ কাউকে হারানোর জন্য তর্ক করছিলাম না। আমরা শুধু মুহূর্তটাকে উপভোগ করছিলাম।
রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল।
দোকানের সামনে দিয়ে মাঝে মাঝে মানুষ হাঁটছিল। কেউ সালাম দিচ্ছিল। কেউ দাঁড়িয়ে দুই মিনিট কথা বলে আবার চলে যাচ্ছিল।
গ্রামে সময় যেন একটু ধীরে চলে।হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।চারপাশ অন্ধকার।
শুধু দোকানের চুলোর আগুন লাল হয়ে জ্বলছিল।
সেই আলোয় আমরা তিনজন একে অপরের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম।
কী অদ্ভুত সুন্দর ছিল সেই দৃশ্যটা!
আমি মনে মনে ভাবছিলাম—একদিন হয়তো আমরা সবাই আরও দূরে চলে যাব। হয়তো এই আড্ডাগুলো কমে যাবে। হয়তো জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই সন্ধ্যাটা থেকে যাবে।
চায়ের কাপে জমে থাকা উষ্ণতা হয়ে।বৃষ্টির গন্ধ হয়ে।বন্ধুত্বের স্মৃতি হয়ে।
বিদ্যুৎ আবার ফিরে এলো।
দোকানের সাদা বাতি জ্বলে উঠতেই মনে হলো আমরা বাস্তবে ফিরে এলাম।
মোহাম্মদ উঠে দাঁড়াল।
— “চল, অনেক রাত হয়েছে ।”
মোহাম্মদ আলী বিলটা দিয়ে দিল।
চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে দেখি আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। মেঘ সরে গিয়ে অসংখ্য তারা দেখা যাচ্ছে।
গ্রামের রাতের আকাশ শহরের মতো না। এখানে আকাশ অনেক বড় লাগে।
আমরা ধীরে ধীরে বাইকের দিকে হাঁটলাম।হালকা বাতাস বইছিল। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে সিয়াম হঠাৎ বলল,
— “এই সন্ধ্যাটা মনে থাকবে।”
আমি তাকালাম ওর দিকে।
হ্যাঁ, সত্যিই থাকবে।
কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো সাধারণ হয়।
এক কাপ চা।
দুজন বন্ধু।
বৃষ্টির পরের একটা সন্ধ্যা।
এতেই কখনো কখনো পুরো জীবন লুকিয়ে থাকে।
