একটা নাম যাকে কেউ দেবতা বলে এবং কেউ বলে শয়তান। "Baal/Bael". Baal শব্দটি ভাষা এবং প্রেক্ষাপটভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। হিব্রু ভাষা (Hebrew) হিব্রু ভাষায় Baal (בַּעַל) একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এর মূল অর্থ হলো: মালিক বা প্রভু,স্বামী, দেবতা ইত্যাদি ।
প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যে বা লোকগাঁথায় 'Baal' বা 'Bael' কে নরকের একজন শক্তিশালী সেনাপতি বা শয়তান হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং এশিয়া মাইনরের বিস্তৃত এলাকায় শহরসমূহের রক্ষক কে বাআল নামে সম্বোধন করা হত। বাআল উপাসকগণ বা যারা বাআলের পূজা করত তারা বাআলাইত নামে পরিচিত ছিলো।প্রায় ৩০০০ বছর আগে তাকে সম্মানের সাথে পূজা করত এই বাআলাইত।
আজকের দিনে স্পেশালিস্ট সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য এই নামটা শুনলে আমাদের মাথায় আসে ভয়ংকর একটি দৃশ্য। "Baal" "Bael"কি আসলেই এমন ছিল? কিছু পুরনো ইউরোপের বইয়ে বিশেষ করে "আর্স গোটিয়া" নামে বইয়ে ''Baal " কে দেখানো হয়েছে একজন দেবতা হিসেবে এবং তাকে বলা হয় দৈত্যদের রাজা।,বর্ণনা অনুযায়ী তার তিনটি মাথা। মানুষ, ব্যাঙ আর বিড়ালের। সে অদৃশ্য হতে পারতো এবং মানুষের উপর তার প্রভাব ফেলতে পারতো। এই বর্ণনাগুলো এতই ভয়ংকর যে মানুষ ধরে নিয়েছিল "Baal" আসলেই শয়তান।
ইতিহাস একটু পিছনে গেলে ইমেজটা পুরোপুরি বদলে যায়। প্রাচীন কেনান অঞ্চলে হাজার হাজার বছর আগে মানুষ "Baal" কে পূজা করত।কারণ সে ছিল বৃষ্টি দেবতা, ঝড়ের দেবতা এবং ফসল রক্ষকের দেবতা। ভাবেন একটা সময় যখন বৃষ্টি হতো না তখন ফসল বাচাতে তাকে পুজো করা হতো।তার সবচেয়ে পরিচিত রূপ বাআল হাদাদ।একজন শক্তিশালী দেবতা যিনি বজ্রপাত কন্ট্রোল করে,ঝড় তুলত আর মানুষকে রক্ষা করতো।
প্রশ্ন হলো একজন দেবতা যে সবাইকে রক্ষা করতো হঠাৎ করে শয়তান কিভাবে হয়ে গেল? এ পরিবর্তন আসে সময়ের সাথে নতুন ধর্ম আসে নতুন বিশ্বাস তৈরি করা হয়। বিশেষ করে হিব্রু বা বাইবেলে বাআল কে দেখানো হয় ভুল দেবতা হিসেবে।তার পুজো করা নিষিদ্ধ করা হয় এবং এখান থেকে তার ইমেজ বদলাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে মানুষের তাকে ভুল বলে থামেনি তাকে ভয় পেতে শুরু করেছে। বাআল' এর আসল গল্প এখানেই শেষ না। তার সবচেয়ে সেই ইন্টারেস্টিং অংশ তার যুদ্ধ, যা আসলে মৃত্যুর প্রতীক ।
এই যুদ্ধ ছিল জীবন বনাম মৃত্যু। যখন বাল জিততো ফসল হতো আর যখন মৃত্যৃর দেবতা "মত" জিততো বৃষ্টি হতো না এবং ফসল শুকিয়ে যেত।তাদের একটি বিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনি আছে যেখানে বাআল মৃত্যুর দেবতা 'মুত' (Mot)-এর সাথে লড়াই করেন।যখন বাআল হেরে যেতেন এবং পাতালে চলে যেতেন, তখন পৃথিবীতে খরা হতো।আবার যখন তিনি ফিরে আসতেন, তখন বৃষ্টি হতো এবং ফসলে মাঠ ভরে যেত।
এই চক্রটিই ছিল সে সময়কার মানুষের কাছে ঋতু পরিবর্তনের ব্যাখ্যা।পরবর্তীতে বাআল 'বিলজিবাফ' নামই শয়তানের অন্যতম প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক প্রাচীন সভ্যতায় বাআলকে সূর্যের প্রতীক মনে করা হতো। লেবাননের বিখ্যাত বালবেক (Baalbek) শহরটি আসলে বাআলের নামেই নামকরণ করা হয়েছিল। রোমানরা যখন এই শহর দখল করে, তারা সেখানে 'জুপিটার'-এর মন্দির তৈরি করে, যা আজও বিশ্বের অন্যতম বড় পাথুরে স্থাপত্য হিসেবে টিকে আছে।এই গল্পটা প্রকৃতির গল্প।
এখন আবারো প্রশ্ন আসে বাআল আসলে কি? যার আসলে একটাও উত্তর নেই। ইতিহাস বলে সে দেবতা, ধর্ম বলে সে ভুল পথ,আধুনিক গল্পে বলা হয় শয়তান। বর্তমানে সবচেয়ে ভাইরাল ঘটনা epstein files এর সাক্ষী Jefry Epstein তার ব্যাংক একাউন্ট খুলেছিল "Baal"নামে।বাআল পূজার কারণে ইহুদি রা সঠিক পথ হারিয়ে ছিল বলেও দারনা করা হয়।
বাআল কে কেন মাছিদের দেবতা বলা হয়?
প্রাচীনকাল থেকেই পচা মাংস বা নোংরা স্থানে মাছির আনাগোনা বেশি থাকত। মাছিকে ধরা হতো রোগ এবং অপবিত্রতার বাহক হিসেবে। তাই বাআলকে মাছির দেবতা বলে ইহুদিরা বোঝাতে চেয়েছিল যে, এই দেবতার পূজা করা মানে নোংরা বা অপবিত্র কিছুর উপাসনা করা।বাআলের মন্দিরে পশুবলি দেওয়া হতো। ধারণা করা হয়, মন্দিরে পশুর রক্ত ও মাংসের কারণে প্রচুর মাছির উপদ্রব হতো। এই দৃশ্য দেখে বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে বলত, "এ তো দেবতাদের রাজা নয়, এ হলো মাছির রাজা!" বলা হয়ে থাকে অনেক গর্ভবতী নারীদের পেট চীরে সন্তান ভূমিষ্ট করা হতো এবং সেই সন্তান কে বাআল দেবতার সামনে বলি দেওয়া হত।
আজও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে শিশু বলি দেওয়া হয়। বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ফ্যাশনে এটার পরিচিত তুলে দরা হয় যেমন :Balenciaga। যারা মানুষের মধ্যে বেহায়াপনা ও শয়তানী কর্মকান্ড ছরিয়ে দিচ্ছে।
নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) গিয়ে এই 'Beelzebub' নামটি সরাসরি শয়তান বা 'Prince of Demons'-এর একটি নাম হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাহিত্যে: জন মিল্টনের বিখ্যাত মহাকাব্য প্যারাডাইস লস্ট (Paradise Lost)-এ 'বিলজিবাফ'কে শয়তানের প্রধান সেনাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিছু লিপি থেকে জানা যায় প্রাচীন আরব দেবতা হাদাদকে বাআল নামে সম্বোধন করা হত। হাদাদ ছিলেন বজ্রপাত, উর্বরতা, কৃষি এবং স্বর্গের দেবতা। কিন্তু সেই সময়ে শুধু মাত্র ধর্মযাজকগণ তার পবিত্র নাম উচ্চারণের অনুমতি পেতেন। সেজন্য জনসাধারণ তাকে বাআল নামে সম্বোধন করত।
সেমেটিক ও প্রাচীন মেসোপটেমীয় ইতিহাস
Baal' শব্দটি মূলত একটি সেমেটিক শব্দ, যার মূল অর্থ ছিল 'প্রভু', 'মালিক' বা 'স্বামী'দেবতা ইত্যাদি ।
কানানীয় সভ্যতা: প্রাচীন সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে (Canaanite) 'বাল' ছিলেন ঝড়, বৃষ্টি এবং উর্বরতার প্রধান দেবতা। কৃষিপ্রধান ওই সমাজে বৃষ্টির জন্য বালের পূজা করা হতো।
কার্থেজ ও ফোনীশীয়রা: উত্তর আফ্রিকায় এই দেবতার প্রভাব এতটাই ছিল যে, বিখ্যাত সেনাপতি হানিবাল (Hannibal)-এর নামের অর্থ ছিল "বালের অনুগ্রহপ্রাপ্ত"।
বাইবেলীয় প্রেক্ষাপট: হিব্রু বাইবেলে ইসরায়েলিদের সাথে বাল পূজারীদের দ্বন্দ্বের অনেক বর্ণনা আছে। সেখানে 'বাল' শব্দটি মূলত "মিথ্যা উপাস্য" বা পৌত্তলিকতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
কুরআনের উল্লেখ: পবিত্র কুরআনের সূরা আস-সাফফাত (আয়াত ১২৫)-এ ইলিয়াস (আঃ)-এর গোত্রের কথা বলা হয়েছে, যারা 'বাল' নামক মূর্তির পূজা করত। সেখানে বলা হয়েছে: "তোমরা কি 'বাল'-এর পূজা করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে ত্যাগ করবে?"
ইংরেজি শব্দ 'Beelzebub' (নরকের দেবতা বা শয়তান) আসলে 'Baal-Zebub' থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ছিল "মাছিদের প্রভু"। প্রাচীনকালে হিব্রু জাতিরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অন্য ধর্মের দেবতা 'বাল'কে এই নামে ডাকত।

