চার ভাইয়ের ছোটবেলা

চার ভাইয়ের ছোটবেলা

           চার ভাইয়ের ছোটবেলা

 স্মৃতির পাতা উল্টালে কিছু শৈশব এমনভাবে ধরা দেয়, যা আজীবন অমলিন থাকে। আমাদের সেই দিনগুলো ছিল রূপকথার মতো, যেখানে অভাব থাকলেও আনন্দের কমতি ছিল না। তামাই গ্রামের ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া আমরা চার ভাই—আমি (জাহিদ), মোহাম্মদ আলী, সুজন আর সিয়াম। আজ আপনাদের শোনাব আমাদের সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প।

​আমাদের গ্রাম তামাই ছিল শান্তির নীড়। কিন্তু সেই বয়সে আমাদের কাছে রোমাঞ্চ মানেই ছিল পাশের গ্রামের কোনো মাহফিল বা মেলা। শীতের এক বিকেলে খবর এলো পাশের গ্রাম কদমতলীতে বড় এক মাহফিল হবে। আর মাহফিল মানেই তো শুধু ওয়াজ শোনা নয়, আমাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত 'তবারক'।

​সেদিন আসরের নামাজের পর আমরা চারজন আমাদের প্রিয় বটতলায় বসলাম। মোহাম্মদ আলী আমাদের মধ্যে লম্বায়  একটু বড়, তাই সে-ই ছিল আমাদের অলিখিত লিডার। সে গম্ভীর গলায় বলল, "শোন জাহিদ, সুজন, সিয়াম—আজ রাতে কদমতলীতে মাহফিল। অনেক বড় বড় হুজুর আসবে। আর তবারক হিসেবে দিবে খাসির বিরিয়ানি!"

​খাসির বিরিয়ানির কথা শুনে ছোট সিয়ামের চোখ চকচক করে উঠল। সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত কিন্তু খাবারের নামে তার উৎসাহের শেষ নেই। সুজন একটু চঞ্চল প্রকৃতির, সে লাফিয়ে উঠে বলল, "কিন্তু ভাই, তামাই থেকে কদমতলী তো অনেক পথ! মেঠো পথ দিয়ে যেতে হবে, বিলের ধার দিয়ে হাঁটতে হবে। রাতে তো ভয়ও লাগতে পারে।"

​আমি (জাহিদ) একটু দোটানায় ছিলাম। মা জানলে নির্ঘাত বকুনি দেবেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলীর সেই তেজস্বী কণ্ঠ আমাদের সব ভয় উড়িয়ে দিল। সে বলল, "আরে আমি আছি না? আমরা চার ভাই একসাথে থাকলে কোনো ভূত-প্রেত কাছে আসবে না। আর তবারক না নিয়ে ফিরলে তো তামাইয়ের সম্মান থাকবে না!"

​মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হওয়াটাই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। আমরা ঠিক করলাম, এশার নামাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হব। সিয়াম তার ছেঁড়া চটিজোড়া ঠিক করে নিল, সুজন একটা লাঠি জোগাড় করল আত্মরক্ষার জন্য। আর আমি পকেটে নিলাম একটা ছোট টর্চলাইট, যার ব্যাটারি প্রায় শেষের পথে।

​সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই কুয়াশা পড়তে শুরু করল। আমরা চার ভাই একে অপরের হাত ধরে তামাইয়ের সীমানা পার হলাম। চারপাশ নিঝুম, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা মাহফিলের মাইকের আওয়াজ। সেই আওয়াজ যেন আমাদের এক অজানা আকর্ষণে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

​পথটা সহজ ছিল না। ধানের খেতের সরু আইল দিয়ে আমাদের হাঁটতে হচ্ছিল। কুয়াশার কারণে সামনের পথ ঝাপসা। সিয়াম একবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল, তার হাঁটু ছিলে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। কিন্তু তবারকের নেশা আর বড় ভাইদের সাহচর্যে সে একবারও কাঁদল না। উল্টো দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "কিচ্ছু হয়নি, চলো!"

​মোহাম্মদ আলী সিয়ামের হাত শক্ত করে ধরল। সে সময় আমাদের মাঝে যে বন্ধন ছিল, তা আজকের যান্ত্রিক জীবনে খুঁজে পাওয়া ভার। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছিই। মেঠো পথের দুই পাশে বড় বড় গাছগুলো অন্ধকারে দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমধ্যে শিয়ালের ডাক শুনে আমরা ভয়ে একে অপরের গায়ের সাথে মিশে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই যে—দূরে কদমতলীর মাহফিলের আলো দেখা যাচ্ছে!

​অবশেষে আমরা কদমতলী গ্রামে পা রাখলাম। মাহফিলের প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে রঙিন কাগজ দিয়ে। মাইকে তখন জিকিরের সুর ভেসে আসছে। আমাদের ক্লান্তি এক নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। 

​আমরা প্যান্ডেলের এক কোণে গিয়ে বসলাম। ছোট সিয়াম ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে আছে যেখানে বড় বড় ডেগ সাজানো। আমরা চার ভাই তখন এক নতুন জগতের স্বপ্নে বিভোর।

​কদমতলী গ্রামের সেই বিশাল প্যান্ডেলে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। মাইকে হুজুরের বয়ান চলছে, আর আমরা চার ভাই—মোহাম্মদ আলী, সুজন, সিয়াম আর আমি (জাহিদ)—একেবারে সামনের সারিতে বসার জায়গা না পেয়ে এক কোণে চটের ওপর ঠাঁই নিলাম। পেটে তখন ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি, আর নাকে ভাসছে সেই কাঙ্ক্ষিত খাসির বিরিয়ানির সুবাস।

​মাহফিলের নিয়ম হলো, আখেরি মোনাজাতের আগে তবারক দেওয়া হয় না। মোহাম্মদ আলী আমাদের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "শোন, মোনাজাত শুরু হলেই তোরা গেটের কাছে গিয়ে পজিশন নিবি। ভিড় বাড়লে ছোট সিয়ামকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।"

​সিয়াম তখন ক্লান্তিতে আমার কাঁধে মাথা দিয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। সুজন বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, যদি কোনোভাবে তবারকের ডেকচিগুলো দেখা যায়। মাহফিলের সেই অদ্ভুত পরিবেশ—আগরবাতির ঘ্রাণ, হুজুরের আবেগী কণ্ঠ আর হাজারো মানুষের "আমিন, আমিন" ধ্বনি—আমাদের ছোট মনে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য তৈরি করছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের পুরো মনোযোগ ছিল ওই ডেকচিগুলোর দিকে।

​অবশেষে রাত যখন গভীর, তখন শুরু হলো মোনাজাত। হাজার হাজার হাত একসাথে আকাশের দিকে উঠল। আমরাও হাত তুললাম, কিন্তু আমাদের চোখ ছিল খোলা। মোনাজাত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। প্যান্ডেলের চারপাশ থেকে মানুষ হুড়মুড় করে তবারকের লাইনের দিকে দৌড়াতে লাগল।

​মোহাম্মদ আলী চিৎকার করে বলল, "সুজন, তুই সিয়ামের হাত ধর! জাহিদ, তুই আমার পিছে আয়!"

​সেই ভিড়ের মধ্যে আমরা চারজন একে অপরের জামা খামচে ধরে এগোতে লাগলাম। বড় বড় মানুষগুলো আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল। সিয়াম একবার ভিড়ের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে গেল। সে ডুকরে উঠে বলল, "শোন, আমার তবারক লাগবে না, আমি বাড়ি যাব!"

​কিন্তু সুজন তাকে ছাড়ল না। সে সিয়ামকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। মোহাম্মদ আলী ভিড় ঠেলে একদম ডেকচির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে বিতরণকারীরা বালতি ভরে ভরে ঠোঙায় বিরিয়ানি দিচ্ছে।

​লোকটা বিরক্ত হয়ে চারটা ঠোঙা আমাদের হাতে ধরিয়ে দিল। কিন্তু কপাল খারাপ! সিয়ামের ঠোঙাটা ছিল একদম ছোট, আর তাতে মাংসের টুকরোই পড়েনি। সিয়াম সেটা দেখে প্যান্ডেলের এক কোণে গিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে । তার সেই মন খারাপ আমাদের সবার মনে তীরের মতো বিঁধল। আমরা তিন ভাই নিজেদের প্যাকেট খুলে বড় বড় মাংসের টুকরোগুলো সিয়ামের পাতে তুলে দিলাম। সেই মুহূর্তে আমাদের নিজেদের ক্ষুধা যেন এক নিমিষেই মিটে গেল। ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে?

​খাওয়া শেষ করে যখন আমরা কদমতলী থেকে বের হলাম, তখন রাত আনুমানিক ১২টা। গ্রাম একদম নিঝুম। কুয়াশা এত ঘন হয়েছে যে হাত বাড়ালেই সাদা ধোঁয়া ছোঁয়া যায়। মোহাম্মদ আলী টর্চলাইটটা জ্বালালো, কিন্তু ব্যাটারি শেষ হওয়ার কারণে আলোটা ছিল খুবই ক্ষীণ।

​তামাই যাওয়ার সেই মেঠো পথটা এখন আমাদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর মনে হতে লাগল। দুপাশে বড় বড় বাঁশঝাড় বাতাসের তোড়ে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে। সিয়াম আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। হঠাৎ সুজন থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, "জাহিদ ভাই, ওই দেখ! বিলের মাঝখানে ওটা কী জ্বলছে?"

​আমরা সবাই স্থির হয়ে গেলাম। অন্ধকারের বুক চিরে দূরে একটা নীলচে আলো দপদপ করছে। আমাদের চার ভাইয়ের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল।

কদমতলীর সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাত আর বিলের মাঝখানে দপদপ করা সেই রহস্যময় নীলচে আলো। আমরা চার ভাই—মোহাম্মদ আলী, সুজন, সিয়াম আর আমি (জাহিদ)—একেবারে জমে গিয়েছিলাম। মেঠো পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তবারকের সেই তৃপ্তি মুহূর্তেই আতঙ্কে রূপ নিল।

​চার ভাইয়ের ছোটবেলা

​বিলের ধারের সেই শ্যাওড়া গাছগুলো বাতাসের তোড়ে এমনভাবে দুলছিল, যেন কেউ লম্বা হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। সুজন ফিসফিস করে বলল, "আলী ভাই, ওটা কি আলতি (আলেয়া)? দাদি বলেছিল বিলের ধারে রাতে ওসব দেখা যায়।"

​মোহাম্মদ আলী সাহসী হওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার গলার স্বরে কাঁপন স্পষ্ট। সে টর্চলাইটটা সেদিকে মারল, কিন্তু ক্ষীণ আলো অতদূর পৌঁছাল না। হঠাৎ সেই আলোটা দপ করে নিভে গিয়ে আবার একটু দূরে জ্বলে উঠল। সিয়াম এবার ডুকরে কেঁদে উঠল, "আমি বাড়ি যাব! মা'র কাছে যাব!"

​ভয়ে আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু কুয়াশা এত ঘন ছিল যে হাতের তালুও দেখা যাচ্ছিল না। দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা বুঝতে পারলাম, আমরা চেনা পথ হারিয়ে ফেলেছি। তামাই যাওয়ার সেই সোজা মেঠো পথটা এখন কোথায়? ডানে তাকালে শুধু অন্ধকার বিল, আর বামে গহীন বাঁশঝাড়।

​আমরা একটা বড় গাব গাছের নিচে এসে থামলাম। চারপাশটা একদম অচেনা।  মোহাম্মদ আলী আমাদের সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে বসল। সে বলল, "চিন্তা করিস  না সিয়াম। আমরা চার ভাই একসাথে আছি। আল্লাহ্‌র নাম জপ কর।"

​দৌড়ানোর ফলে আমাদের শরীর ঘামছিল, কিন্তু শীতের বাতাসে সেই ঘামই যেন বরফ হয়ে বিঁধছিল। সুজনের হাতে তবারকের সেই খালি ঠোঙাটা তখনো ধরা। সে হঠাৎ বসে পড়ে বলল, "ভাই, আমার খুব পানির পিপাসা পেয়েছে।"

​বিলের পানি তখন নোনা আর নোংরা। কিন্তু আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। আমাদের কাছে কোনো পানিও ছিল না। তৃষ্ণায় সুজন আর সিয়ামের ছটফটানি দেখে আমার খুব খারাপ লাগল। আমি আমার পকেট হাতড়ে দেখলাম একটা ছোট চকলেট রয়ে গেছে, যেটা মাহফিলের দোকান থেকে কিনেছিলাম। আমি সেটা অর্ধেক করে সুজন আর সিয়ামকে দিলাম। সেই এক টুকরো মিষ্টি যেন তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিল।

​হঠাৎ আমাদের পেছনে শুকনো পাতায় মচমচ শব্দ হলো। কেউ যেন আমাদের দিকে হেঁটে আসছে। আমরা চারজন আষ্টেপৃষ্ঠে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। মোহাম্মদ আলী লাঠিটা উঁচিয়ে ধরল। "কে? কে ওখানে?" সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।

​কোনো উত্তর নেই। শুধু ভারী নিশ্বাসের শব্দ। কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা লম্বা ছায়া ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমাদের মনে হলো আজ আর রক্ষা নেই। সিয়াম আমার পেটের মধ্যে মুখ লুকিয়ে থরথর করে কাঁপছে।

​ছায়াটা যখন একেবারে কাছে চলে এল, মোহাম্মদ আলী টর্চটা শেষবারের মতো ঝাড়া দিয়ে জ্বালালো। আলোর রেখাটা পড়ল একজনের মুখের ওপর। আমরা দেখলাম, ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়ানো এক বৃদ্ধ মানুষ। হাতে একটা লাণ্ঠন, কিন্তু সেটা নিভে গেছে। লোকটা আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ালেন।

​লোকটা খসখসে গলায় বললেন, "তোরা এই মাঝরাতে বিলের ধারে কী করিস বাপ? তোরা কি তামাই গ্রামের?"

​আমরা যেন হাতে স্বর্গ পেলাম! বৃদ্ধ লোকটা ছিলেন কদমতলীর এক প্রান্তিক জেলে, যিনি বিল থেকে মাছ ধরে ফিরছিলেন। তিনি আমাদের পথ হারিয়ে ফেলার কথা শুনে হাসলেন। বললেন, "তোরা তো ভুল পথে অনেকটা ভেতরে চলে এসেছিস। এই পথ ধরে গেলে তোরা অন্য কোনো গ্রামে চলে যেতিস।"

​তিনি আমাদের অভয় দিলেন। তার সেই নিভে যাওয়া লাণ্ঠনটা আবার জ্বালালেন। আগুনের সেই শিখাটা আমাদের কাছে তখন চাঁদের আলোর চেয়েও বেশি উজ্জ্বল মনে হলো। তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।

​ফেরার পথে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা

​বৃদ্ধ লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা যখন বড় রাস্তায় উঠলাম, তখন অনেক রাত। কদমতলী আর তামাইয়ের মাঝামাঝি এই নির্জন রাস্তাটা আমাদের খুব চেনা। কিন্তু পেছনের সেই বিলের ভয় আমাদের মন থেকে যাচ্ছিল না। আমরা দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম।

​হঠাৎ মোহাম্মদ আলী দাঁড়িয়ে গেল। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "শোন, বাড়িতে গিয়ে কেউ যেন না জানে আমরা পথ হারিয়েছিলাম বা ভয় পেয়েছিলাম। তাহলে মা আর কোনোদিন আমাদের মাহফিলে যেতে দেবে না।"

​আমরা সবাই মাথা নাড়ালাম। কিন্তু আমাদের মনে তখন অন্য এক আতঙ্ক—বাড়ি পৌঁছালে আব্বার হাতের পিটুনি থেকে বাঁচব তো?

তামাই গ্রামের সেই মেঠো পথ এখন কুয়াশায় সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। বৃদ্ধ জেলের দেখানো পথ ধরে আমরা চার ভাই বড় রাস্তায় উঠেছি। ভয় কিছুটা কমলেও মনের ভেতর অন্য এক আতঙ্ক দানা বাঁধছে—বাড়িতে পৌঁছালে কী হবে? রাত তখন অনেক, সম্ভবত দুইটা কি আড়াইটা। আমাদের গ্রামের প্রতিটি ঘর অন্ধকার, শুধু দু-একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে।

​চার ভাইয়ের ছোটবেলা

চার ভাইয়ের ছোটবেলা
সবার শেষে রয়েছে সুজন,মাঝখানে চশমা পরা ব্যাক্তিটা আমি জাহিদ,তারপর সিয়াম এবং সবার সামনে রয়েছে মোহাম্মদ আলী। 


​আমরা যখন তামাইয়ের সীমানায় পা রাখলাম, তখন শীতের কামড় আরও তীব্র হয়েছে। সুজন কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আলী ভাই, আব্বা যদি লাঠি নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে থাকে?"

​মোহাম্মদ আলী থামল। সে আমাদের গোল হয়ে দাঁড় করালো। তার চেহারায় এখন বড় ভাইয়ের গুরুগাম্ভীর্য। সে ফিসফিস করে বলল, "শোন, সবাই কানে কান দিয়ে শোন। আমরা কোনো বিলের আলো দেখিনি, আমরা পথ হারাইনি, আর সিয়াম যে কেঁদেছে—এটা একদম গোপন। আমরা বলব মাহফিল অনেক দেরিতে শেষ হয়েছে, তাই ফিরতে দেরি হলো। মনে থাকবে?"

​আমরা সবাই একবাক্যে রাজি হলাম। এটা ছিল আমাদের চার ভাইয়ের এক ঐতিহাসিক 'গোপন চুক্তি'।

​আমাদের বাড়িগুলো পাশাপাশি। প্রথমে সিয়ামের বাড়ির গেট। সিয়ামের বাবা অর্থাৎ আমার ছোট চাচা খুব কড়া মানুষ। সিয়াম ভয়ে আমার হাত ছাড়ছে না। আমরা চারজন পা টিপে টিপে ওর বাড়ির জানালার পাশ দিয়ে গেলাম। ভাগ্য ভালো, চাচা ঘুমে বিভোর, নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সিয়ামকে ওর বারান্দায় তুলে দিয়ে আমরা ইশারায় বিদায় জানালাম। ও অন্ধকারের মিশে গেল।

​এরপর সুজন। সুজনের মা (মেজো চাচি) খুব নরম মনের মানুষ। সুজন ইশারায় জানাল সে ঠিক আছে। বাকি রইলাম আমি আর মোহাম্মদ আলী। আমরা আপন দুই ভাই না হলেও আমাদের সম্পর্ক ছিল আত্মার। 

​আমরা যখন আমাদের উঠানে পা রাখলাম, হঠাৎ টর্চের এক ঝলক আলো সরাসরি আমাদের মুখে পড়ল। আমরা দুজন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেলাম। আলোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আমার আব্বা। তাঁর হাতে একটা মোটা কঞ্চি।

​"এতক্ষণ কোথায় ছিলি তোরা?" আব্বার গলার স্বর শুনে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল।

​মোহাম্মদ আলী আমতা আমতা করে বলল, "ওই যে কদমতলীর মাহফিল... মোনাজাত দেরিতে হয়েছে..."

​আব্বা এক ধাপ এগিয়ে এলেন। "মোনাজাত কি রাত দুইটায় শেষ হয়? তোদের জন্য তোর মা না খেয়ে বসে আছে। ঘরে ঢোক, কাল সকালে তোদের বিচার হবে।" এরপর  মোহাম্মদ আলী তার বাসায় চলে গেল।

​সেই রাতে আর পিটুনি জুটল না ঠিকই, কিন্তু আব্বার ওই শান্ত কণ্ঠের ধমক লাঠির বাড়ির চেয়েও বেশি লাগছিল। আমরা ঘরে ঢুকলাম। মা রান্নাঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে বসে ছিলেন। আমাদের দেখে তাঁর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি এক থালা গরম ভাত আর আলুভর্তা নিয়ে এলেন।

​মা জানতেন আমরা তবারক খেয়ে এসেছি, তাও তিনি আমাকে না খাইয়ে ছাড়বেন না। আমি ভাতের থালার সামনে বসলাম। তবারকের সেই খাসির বিরিয়ানি আর মায়ের হাতের আলুভর্তা—দুটোর স্বাদ যেন মিশে একাকার হয়ে গেল। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "এত রাত করিস না বাবা, কত দুশ্চিন্তা হয় জানিস?"

​মায়ের সেই স্পর্শে আমাদের সব ক্লান্তি, বিলের ভয় আর তবারকের লড়াই যেন ধুয়ে মুছে গেল। মোহাম্মদ আলী যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল। সেই হাসির মানে ছিল—আমরা সফল! আমরা তবারক নিয়ে এসেছি, আমরা একসাথে বিপদ পার করেছি।

​খাওয়া শেষে আমরা যখন বিছানায় শুলাম, সিয়াম আর সুজনের কথা খুব মনে পড়ছিল। ওরা কি খেতে পেরেছে? নাকি বকুনি খেয়ে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে? ছোটবেলায় এই এক অদ্ভুত টান ছিল আমাদের মাঝে—একজনের পেটে ভাত না পড়লে অন্যজনের ঘুম আসত না।

​জানালা দিয়ে বাইরের কুয়াশা দেখছিলাম। বাঁশঝাড়ের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে এখনো মনে হচ্ছিল সেই বিলের সেই নীল আলোটা যেন আমাদের ডাকছে। কিন্তু আমরা তখন নিরাপদ, লেপের ওমে চার ভাই চার জায়গায় থেকেও মনের দিক দিয়ে এক সুতোয় বাঁধা।

​রাত যখন শেষ হয়ে আসছে, পুব আকাশে আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি আর মোহাম্মদ আলী প্রতিজ্ঞা করলাম, কাল ভোরেই আমরা চারজন আবার আমতলায় মিলিত হব। আমাদের অভিযানের শেষটা এখনো বাকি।

ভোর হলো তামাই গ্রামে। কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি, তবে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে গেছে। গতরাতের সেই ভয়ংকর বিলের অভিজ্ঞতা আর তবারকের লড়াই যেন এখন একটা ধোঁয়াটে স্বপ্ন। আমি (জাহিদ) আর মোহাম্মদ আলী যখন আমাদের সেই প্রিয় আমতলায় গিয়ে পৌঁছালাম, দেখলাম সুজন আর সিয়াম আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। তাদের মুখগুলো একটু শুকনো, হয়তো রাতে বকুনি খেয়েছে।

​চার ভাইয়ের ছোটবেলা

​আমরা চারজন আবার একত্র হলাম। মোহাম্মদ আলীর হাতে একটা ছোট মাটির হাঁড়ি। আমরা অবাক হয়ে তাকালাম। সে মুচকি হেসে বলল, "রাতের তবারক থেকে এক প্যাকেট লুকিয়ে রেখেছিলাম। মা সকালে গরম করে দিল। আয়, সবাই মিলে ভাগ করে খাই।"

​সেই সকালের হিমেল হাওয়ায়, আম গাছের গোড়ায় বসে আমরা চার ভাই আবার সেই খাসির বিরিয়ানি খেলাম। কাল রাতে যেটা যুদ্ধের মতো লেগেছিল, আজ সকালে সেটা অমৃতের মতো মনে হলো। সিয়ামের মুখে কালকের সেই কান্নার ছাপ নেই, বরং তবারকের মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে সে বলল, "আলী ভাই, সামনের মাসে তো বেলকুচিতে বড় মাহফিল হবে, ওখানেও কি আমরা যাব?"
​আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। কালকের ভয়ংকর রাতটার কথা ভুলে গিয়ে আমাদের মন আবার নতুন অভিযানের স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু আমাদের সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
​আব্বার ডাক ও সেই 'কঠিন' বিচার
​হঠাৎ দূর থেকে আমার আব্বার গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, "জাহিদ! আলী! তোরা কোথায়?"
​আমাদের বুক ধক করে উঠল। আমরা চারজন লাইন ধরে আব্বার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আব্বা আমাদের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর হাতে সেই কঞ্চিটা নেই, তবে মুখটা খুব গম্ভীর। তিনি বললেন, "তোরা কাল রাতে কদমতলীর বিল দিয়ে এসেছিস কেন? জানিস ওই পথে কত বিপদ হতে পারত? কেউ যদি তোদের তুলে নিয়ে যেত?"
​আমরা মাথা নিচু করে রইলাম। আমাদের সেই 'গোপন চুক্তি' মনে হয় ফাস হয়ে গেছে। বৃদ্ধ জেলের কথা হয়তো গ্রামময় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা ভেবেছিলাম মার খাব, কিন্তু আব্বা হঠাৎ আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন।
​"বড় ভাই হয়েছিস, ছোটদের আগলে রাখা শিখতে হয়। কিন্তু একা এমন পাগলামি আর করবি না।" আব্বার গলায় শাসন ছিল না, ছিল গভীর এক মমতা। তিনি পকেট থেকে চারটা এক টাকার কয়েন বের করে আমাদের হাতে দিলেন। "যাও, দোকানে গিয়ে বিস্কুট কিনে খাও। আর কোনোদিন না বলে অত দূরে যাবি না।"

​সেই এক টাকা হাতে পেয়ে আমাদের আনন্দ আকাশ ছুঁল। আব্বা চলে যাওয়ার পর আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। সিয়ামের চোখে তখন আনন্দের জল। সুজন লাফাতে লাফাতে বলল, "জাহিদ ভাই, আজ আমরা মেলায় যাব!"
​কিন্তু সেই মেলার আনন্দ ছাপিয়ে আমাদের মনে গেঁথে রইল এক গভীর শিক্ষা। সেই রাতে আমরা শুধু তবারক নিয়ে আসিনি, আমরা শিখেছিলাম একে অপরের হাত শক্ত করে ধরা। আমরা শিখেছিলাম বিপদে ভাইদের ছেড়ে না যাওয়া। তামাই গ্রাম থেকে কদমতলী—সেই কয়েক কিলো পথ আমাদের শৈশবকে এক ধাক্কায় অনেকটা বড় করে দিয়েছিল।

​আজ আমরা বড় হয়েছি। আমি জাহিদ এখন শহরে থাকি, মোহাম্মদ আলী তার কর্মব্যস্ত জীবনে ব্যস্ত, সুজন আর সিয়ামও যার যার পথে। এখন আর রাত বিরেতে তবারকের জন্য মেঠো পথ দিয়ে দৌড়াতে হয় না। এখন হাতের কাছে সব পাওয়া যায়, কিন্তু সেই স্বাদ আর কোথাও নেই।
​মাঝেমধ্যে যখন গ্রামে ফিরি, সেই কদমতলীর বিলের দিকে তাকাই। এখন সেখানে বিদ্যুৎ এসেছে, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পথ চেনা যায়। কিন্তু সেই রহস্যময় নীল আলো আর আমাদের চার ভাইয়ের সেই দুরুদুরু বুকের কম্পন যেন আজও ওই কুয়াশার ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
​তামাই গ্রামের সেই ধুলোবালি, সেই আমতলা আর চার ভাইয়ের সেই অবিস্মরণীয় রাত—এসবই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তবারক তো স্রেফ একটা উছিলা ছিল, আসল পাওয়া ছিল আমাদের সেই অটুট ভ্রাতৃত্ব।
​সমাপ্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন