![]() |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা। |
দোয়েল: বাংলাদেশের জাতীয় পাখির পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নাম হলো দোয়েল। গ্রামবাংলার সকাল, নদীর পাড়, বাঁশঝাড় কিংবা বাড়ির আশপাশে টুকটুক করে লাফিয়ে বেড়ানো এই পাখিটি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় পাখি।
বৈজ্ঞানিক পরিচয়
দোয়েল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis। এটি প্যাসেরিফরম (Passeriformes) বা চড়াই-প্রতিম বর্গের অন্তর্গত একটি প্যাসারিন পাখি। ইংরেজিতে একে বলা হয় Oriental Magpie-Robin।
একসময় দোয়েলকে থ্রাশ পরিবার (Turdidae)-এর সদস্য হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হলেও আধুনিক গবেষণায় একে Old World Flycatcher হিসেবে গণ্য করা হয়, যা পাখিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
সংরক্ষণ অবস্থা
LC
ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত (IUCN 3.1)
বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস
| জগৎ | Animalia |
| পর্ব | কর্ডাটা |
| শ্রেণি | পক্ষী |
| বর্গ | Passeriformes |
| পরিবার | Muscicapidae |
| গণ | Copsychus |
| প্রজাতি | C. saularis |
দ্বিপদী নাম
Copsychus saularis (Linnaeus, 1758)
প্রতিশব্দ
Gracula saularis Linnaeus, 1758
দোয়েল পাখির ডাক:
![]() |
| যমুনা ইকো পার্ক থেকে তোলা। |
গঠন ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য
দোয়েলের দেহ ছোট হলেও এর রঙের বৈপরীত্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কালো ও সাদা রঙের সমন্বয়ে গঠিত এই পাখির সবচেয়ে লক্ষণীয় অংশ হলো এর লম্বা লেজ। মাটিতে চলাফেরা করার সময় কিংবা কোনো ডালে বসে থাকলে দোয়েল প্রায়ই লেজ সোজা করে রাখে—যা সহজেই নজর কেড়ে নেয়।
দোয়েল পাখির বাহ্যিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য
| দেহের আকার | ছোট আকারের প্যাসারিন পাখি; দেহ সরু ও হালকা |
| রঙের বিন্যাস | দেহের উপরের অংশ কালো এবং নিচের অংশ সাদা; রঙের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে |
| লেজ | লম্বা লেজ; মাটিতে চলাফেরা বা ডালে বসার সময় লেজ সোজা করে রাখে |
| ডানা | মাঝারি আকারের ডানা; উড়ার সময় ডানায় সাদা দাগ স্পষ্ট দেখা যায় |
| ঠোঁট | ছোট ও সূচালো; পোকামাকড় ধরার জন্য উপযোগী |
| চোখ | গাঢ় কালো; দৃষ্টিশক্তি তীক্ষ্ণ |
| পা ও নখর | পাতলা কিন্তু শক্ত; ডালে আঁকড়ে ধরতে ও দ্রুত লাফানোর জন্য উপযোগী |
| চলাচলের ধরন | খুবই চঞ্চল; মাটিতে ও গাছের ডালে দ্রুত লাফিয়ে চলাচল করে |
| ডাক | মধুর ও পরিষ্কার স্বর; ভোরবেলা বেশি শোনা যায় |
ভাষা ও নামের বৈচিত্র্য
দোয়েলের বাংলা নামটির সঙ্গে ইউরোপীয় ভাষার নামেরও চমৎকার মিল রয়েছে।
ফরাসি ভাষায় দোয়েল পরিচিত Shama dayal নামে
ওলন্দাজ ভাষায় একে বলা হয় Dayallijster
এই নামগুলোর সঙ্গে “দয়াল” বা “দোয়েল” শব্দের সাদৃশ্য লক্ষণীয়, যা পাখিটির পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
দোয়েল পাখির ভিন্ন ভাষায় নামের বৈচিত্র্য
| ভাষা | নাম |
|---|---|
| বাংলা | দোয়েল |
| ইংরেজি | Oriental Magpie-Robin |
| ফরাসি | Shama dayal |
| ওলন্দাজ | Dayallijster |
| হিন্দি | দয়াল / Dayal |
| উর্দু | ডায়াল (Dayal) |
| তামিল | Karuppu Vellai Kuruvi |
| সিংহলি | Pandi Kurulla |
| বৈজ্ঞানিক নাম | Copsychus saularis |
আবাসস্থল ও বিস্তৃতি
দোয়েল বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে সর্বত্রই দেখা যায়। গ্রাম, বাগান, ঝোপঝাড়, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির আশপাশে এরা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে। শহরের তুলনায় গ্রামবাংলায় দোয়েলের উপস্থিতি বেশি হলেও বর্তমানে অনেক শহুরে এলাকাতেও এদের দেখা মেলে।বাংলাদেশ ও ভারতের জনবসতির আশেপাশে দেখতে পাওয়া অসংখ্য ছোট পাখির মধ্যে দোয়েল একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় নাম।বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও চীনের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত এদের বিচরণ বিস্তৃত। মূলত কাঠসমৃদ্ধ ঘন বন কিংবা চাষাবাদকৃত উর্বর জমির আশেপাশে এদের আনাগোনা বেশি থাকলেও, মানুষের সান্নিধ্যে থাকতে এরা দারুণ পছন্দ করে। ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এবং লোকালয়ের অতি সন্নিকটে চঞ্চল এই পাখির দেখা মেলে সবচেয়ে বেশি, যা আমাদের চিরচেনা গ্রামীণ প্রকৃতিতে যোগ করে এক ভিন্ন মাত্রা। অস্থির স্বভাবের এই পাখিটি সারাক্ষণই গাছের ডাল থেকে মাটিতে, আবার মাটি থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়ায় খাবারের সন্ধানে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ভোরের নীরবতা ভেঙে দোয়েলের সুমধুর কলকাকলি যেন নতুন দিনের বার্তা নিয়ে আসে। সবুজ প্রকৃতি, কাঁচা রাস্তা আর কুয়াশামাখা সকালের সঙ্গে দোয়েলের উপস্থিতি গ্রামবাংলার সৌন্দর্যকে আরও প্রাণবন্ত ও অপরূপ করে তোলে, যা মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তি ও আপন ভাব জাগিয়ে দেয়।
![]() |
| বাংলার প্রকৃতির চিরচেনা সুরের জাদুকর — আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল। |
জাতীয় পাখি হিসেবে গুরুত্ব
দোয়েল শুধু একটি পাখি নয়—এটি বাংলাদেশের পরিচয় ও আবেগের প্রতীক। এর কিচিরমিচির ডাক, সরল জীবনযাপন ও সর্বত্র বিচরণ আমাদের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই কারণেই দোয়েলকে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের রূপ ও প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক হলো দোয়েল, যাকে ইংরেজিতে "ম্যাগপাই রবিন" বলা হয়। সুন্দর ও বুদ্ধিমান এই পাখিটি শুধু আমাদের পল্লী অঞ্চলের গহিন বন বা আনাচে-কানাচেই নয়, বরং ঢাকার মতো ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ শহরেও মানিয়ে নিয়ে টিকে আছে। প্রাণিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, সারাদেশের সর্বত্র বিচরণের এই অসামান্য ক্ষমতার কারণেই দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এই পাখির গুরুত্ব এতটাই যে আমাদের জাতীয় প্রতীক, মুদ্রা এবং ঢাকা শহরের বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক "দোয়েল চত্বর"-এ এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিশেষ করে দুই টাকার নোটে দোয়েলের ছবি একে বিশ্বসেরা সুন্দর নোটগুলোর তালিকায় স্থান করে দিয়েছে। ইলিশ মাছের মতোই ব্যাপক পরিচিত এই পাখিটি তার সৌন্দর্য আর রহস্যময়ী স্বভাবের মাধ্যমে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে।
দোয়েল দেখতে কেমন?
বাংলার প্রকৃতিতে দোয়েল এক অতি পরিচিত ও মোহনীয় নাম। আমাদের জাতীয় পাখি এই দোয়েল আকারে প্রায় ১৫-২০ সেন্টিমিটার বা ৭-৮ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে এবং এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর লম্বা লেজটি, যা পাখিটি অধিকাংশ সময় বেশ গর্বের সাথে খাড়া করে রাখে। পুরুষ ও স্ত্রী দোয়েলের রূপের মাঝে এক চমৎকার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়—পুরুষ দোয়েলের গায়ের উপরিভাগ ও গলার নিচের অংশ গভীর কালো রঙের হলেও পেট ধবধবে সাদা এবং ডানার দুই পাশে সাদা রঙের আকর্ষণীয় প্যাঁচ থাকে; অন্যদিকে, স্ত্রী-দোয়েলের গায়ের উপরিভাগ ও গলার নিচ হয় ছাই-রঙা এবং পেটের সাদা ভাবটিও পুরুষের তুলনায় কিছুটা ফিকে। রঙের এই ভিন্নতা থাকলেও এদের চঞ্চলতা আর সুমিষ্ট ডাক যেকোনো মানুষের মন ভরিয়ে দেয়, যা এদের করে তুলেছে অপরূপ সুন্দর ও অনন্য।
জাতীয় পাখি দোয়েলের শারীরিক বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| দৈর্ঘ্য | ১৫-২০ সেন্টিমিটার (৭-৮ ইঞ্চি) |
| লেজ | লম্বা এবং অধিকাংশ সময় খাড়া থাকে |
| পুরুষ দোয়েল | শরীরের উপরিভাগ ও গলার নিচে কালো, পেট সাদা এবং ডানায় সাদা প্যাঁচ থাকে |
| স্ত্রী দোয়েল | শরীরের উপরিভাগ ও গলার নিচে ছাই-রঙা, পেট কিছুটা ফিকে সাদা |
| সামগ্রিক রূপ | অত্যন্ত চঞ্চল ও অপরূপ সুন্দর |
দোয়েলের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি: প্রকৃতির এক অনিন্দ্য আয়োজন
দক্ষিণ এশিয়ায় মার্চ থেকে জুলাই এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দোয়েলের প্রজননকাল চলে। এই সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েলের জীবনযাত্রায় এক বিশেষ পরিবর্তন আসে। পুরুষ দোয়েল নিজেকে আরও উজ্জ্বল বর্ণে সাজিয়ে গাছের ডালে বসে হরেকরকম সুরেলা ডাকে স্ত্রী দোয়েলকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। ডিম পাড়ার প্রায় ৭ দিন আগে থেকেই এরা গাছের কোটর বা ছাদের কার্নিশে নিপুণভাবে বাসা তৈরি করে। সাধারণত ৫-৬টি ফিকে নীলচে-সবুজ রঙের ডিম দেয় তারা, যার ওপর থাকে সুন্দর বাদামী ছোপ। মা পাখি (স্ত্রী দোয়েল) একনিষ্ঠভাবে ডিমে তা দেয় এবং প্রায় ৮ থেকে ১৬ দিন পর ছানাগুলো বের হয়ে আসে। এই প্রজনন মৌসুমে পুরুষ দোয়েল অত্যন্ত আত্মরক্ষামূলক ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে, নিজের বাসার সীমানায় অন্য কোনো পাখিকে সে পা রাখতে দেয় না।
দোয়েলের স্বভাব ও প্রকৃতি
দোয়েল অত্যন্ত চঞ্চল এবং সাহসী স্বভাবের পাখি। এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো খাবারের খোঁজে এরা সারাক্ষণ ঝোপঝাড় বা মাটিতে ঘুরে বেড়ায় এবং এদের লম্বা লেজটি বারবার ওপর-নিচে নাড়ায়। এরা খুব ভালো শিস দিতে পারে এবং ভোরবেলায় এদের সুরেলা ডাক শোনা যায়। দোয়েল সাধারণত লোকালয়ের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে এবং এরা বেশ একাকী স্বভাবের, তবে প্রজনন মৌসুমে এরা জোড়া বাঁধে। নিজেদের এলাকা বা বাসা রক্ষায় এরা খুবই সচেতন এবং তখন অন্য পাখিদের প্রতি বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
দোয়েল পাখির লোকগাথা: লোকজ বিশ্বাস ও গল্প
আমাদের গ্রামবাংলার লোককথা অনুযায়ী, দোয়েলকে ধরা হয় সতর্কতা এবং চঞ্চলতার প্রতীক। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, দোয়েল পাখি যখন খুব ভোরে কোনো বাড়ির উঠোনে এসে লেজ নাচিয়ে ডাকাডাকি করে, তখন তা সেই বাড়ির জন্য কোনো শুভ বার্তার ইঙ্গিত বহন করে। আবার অনেক অঞ্চলে মনে করা হয়, দোয়েল পাখির শিসের সুরে প্রকৃতির ঘুম ভাঙে, তাই একে 'প্রভাতের বার্তাবাহক' বলা হয়।
আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো, দোয়েল খুব অভিমানী পাখি। যেহেতু এরা মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে কিন্তু ধরা দেয় না, তাই অনেক গ্রামীণ রূপকথায় একে এমন এক 'রাজপুত্তুর' বা 'বনবালিকা'র সাথে তুলনা করা হয় যে লোকালয়ে ঘুরতে এসে অভিমানে পাখি হয়ে গেছে। এদের কালো ও সাদা রঙের বৈপরীত্য নিয়েও নানা কাল্পনিক গল্প প্রচলিত আছে, যেখানে একে সত্য ও মিথ্যার বা আলো ও আঁধারের ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
দোয়েল পাখিকে নিয়ে আমাদের গ্রামবাংলার লোকজ গল্পগুলো যেমন রহস্যময়, তেমনি শ্রুতিমধুর। অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে, যার কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শ্বেত-শুভ্রতার প্রতীক ও পবিত্রতার গল্প
অনেক গ্রামীণ লোককথায় বলা হয়, দোয়েল আগে পুরোপুরি সাদা ছিল। কোনো এক ধার্মিক বা কামেল ব্যক্তির দোয়া বা আশীর্বাদ নিতে গিয়ে পাখিটি তার ডানায় কালো রঙের ছোঁয়া পায়। সেই থেকে দোয়েলের পিঠ কালো আর বুক সাদা। গ্রামবাংলার মানুষ একে 'শান্তির প্রতীক' হিসেবে গণ্য করে এবং বিশ্বাস করে যে বাড়িতে দোয়েল বাসা বাঁধে, সেখানে পারিবারিক কলহ কম হয়।
২. অভিশপ্ত রাজপুত্রের রূপকথা
একটি প্রচলিত রূপকথা অনুযায়ী, এক চঞ্চল রাজপুত্র ছিল যে সারাক্ষণ শিস দিয়ে গান গেয়ে বেড়াত। তার চঞ্চলতায় অতিষ্ঠ হয়ে এক বনদেবী তাকে পাখি হওয়ার অভিশাপ দেন। তবে রাজপুত্রের গানের মায়ায় পড়ে দেবী তাকে বর দেন যে, সে পাখি হয়েও মানুষের খুব কাছাকাছি থাকবে এবং তার গানের সুরে মানুষের মন জয় করবে। এই গল্প থেকেই মনে করা হয় দোয়েল কেন মানুষের বসতির এতো কাছে থাকে অথচ ধরা দেয় না।
৩. অতিথির আগমন বার্তা
এটি কোনো সুনির্দিষ্ট গল্প না হলেও বাংলার একটি শক্তিশালী লোক-বিশ্বাস। বলা হয়, বাড়ির উঠোনে বা বারান্দায় বসে দোয়েল যদি বারবার লেজ নাচায় এবং শিস দেয়, তবে বুঝতে হবে বাড়িতে কোনো প্রিয় মানুষ বা অতিথি আসতে চলেছে। মা-চাচিরা এই ডাক শুনে অনেক সময় খুশিতে পিঠা বানানোর প্রস্তুতিও নিতেন।
লোকগাথা: দধিয়াল থেকে দোয়েল (যশোরের প্রচলিত গল্প)
যশোর অঞ্চলে প্রচলিত এক লোককথা অনুযায়ী, এক সময়ে এক দধিয়াল ছিল যার দই ছিল স্বাদে অতুলনীয় এবং ধবধবে সাদা। দেশটির রাজা এক সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করে এক পুরীতে বন্দি করে রাখেন, যেখানে দধিয়াল প্রতিদিন দই পৌঁছে দিত। দইয়ের স্বাদে মুগ্ধ রানী আর দধিয়ালের মধ্যে একসময় গভীর প্রেম গড়ে ওঠে। রাজা যখন এই সম্পর্কের কথা জেনে তাদের দেখা করা বন্ধ করে দেন, তখন এক রাতে দধিয়াল দুটি কালো হাঁড়িতে দই নিয়ে রানীর পুরীর সামনে এসে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে থাকে। রানীর আকুল প্রার্থনায় তারা দুজনই পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে উড়ে চলে যান অন্য রাজ্যে। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই দধিয়াল আর রানীই আজকের দোয়েল পাখি। তাদের গায়ের সাদা রং সেই জাদুকরী দইয়ের প্রতীক আর কালো রং দইয়ের হাঁড়ির কালির স্মৃতি বহন করছে।
দোয়েল পাখি কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল একসময় গ্রামবাংলা ও শহরের আনাচে-কানাচে অহরহ দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। দোয়েল পাখির বিলুপ্তির প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় দোয়েলের ভূমিকা অপরিসীম হলেও আধুনিক সভ্যতার চাপে এই পাখিটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। এর প্রধান কারণ হলো পরিবেশ দূষণ ও নগরায়ন। দোয়েল সাধারণত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে, কিন্তু কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে তাদের প্রধান খাদ্য উৎস বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে অথবা ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া ঝোপঝাড় এবং পুরাতন দালান বা কোটরযুক্ত গাছ কমে যাওয়ায় তারা বাসা তৈরির নিরাপদ স্থান হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিকারিদের উপদ্রবও এই চঞ্চল পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ।
সিঙ্গাপুরে ১৯২০-এর দশকে এরা প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত, কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে এদের সংখ্যা হ্রাস পায়। ধারণা করা হয়, বহিরাগতভাবে আনা কমন মাইনা পাখির সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণেই এই পতন ঘটে। এছাড়া পোষা পাখির বাণিজ্যের জন্য শিকার করা এবং আবাসস্থলের পরিবর্তনও এদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে আইন দ্বারা এরা স্থানীয়ভাবে সুরক্ষিত।
এই প্রজাতির শিকারি পাখি খুব কম। তবে এদের মধ্যে বিভিন্ন রোগজীবাণু ও পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এই প্রজাতি থেকে এভিয়ান ম্যালেরিয়া পরজীবী আলাদা করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে H4N3 ও H5N1 ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। চোখে বসবাসকারী পরজীবী নেমাটোড-এর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা
দোয়েল পাখি নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা
দোয়েল পাখির কোনো রাজনৈতিক বা যুদ্ধের মতো ইতিহাস না থাকলেও, বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কিছু চমৎকার কারণ ও প্রেক্ষাপট রয়েছে:
১. জাতীয় পাখি হওয়ার ইতিহাস ও কারণ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যখন জাতীয় প্রতীকগুলো নির্ধারণ করা হচ্ছিল, তখন দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কাজী জাকির হোসেন দোয়েলকে জাতীয় পাখি করার প্রস্তাব করেছিলেন। এর প্রধান কারণগুলো ছিল:
- সর্বব্যাপী উপস্থিতি: দোয়েল এমন একটি পাখি যা বাংলাদেশের সর্বত্র—শহর, গ্রাম, বন এমনকি মানুষের ঘরের আঙিনায় দেখা যায়।
- শান্ত স্বভাব: এটি খুবই নিরুপদ্রব এবং মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, যা বাঙালির সহজ-সরল ও শান্তিপ্রিয় প্রকৃতির প্রতীক।
- সুরেলা কণ্ঠ: দোয়েলের সুমধুর গান বা শিস গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২. সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
- দোয়েল চত্বর: বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি বিখ্যাত ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে, যা 'দোয়েল চত্বর' নামে পরিচিত। স্থপতি আজিজুল জলিল পাশা এটি নির্মাণ করেন।
- টাকা ও স্ট্যাম্প: বাংলাদেশের মুদ্রা (যেমন: ২ টাকার নোট) এবং ডাকটিকিটে দোয়েল পাখির ছবি ব্যবহার করা হয়, যা এর রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব প্রমাণ করে।
- সাহিত্য ও গান: বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবিতায় এবং বিভিন্ন লোকসংগীতে দোয়েলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস
- দোয়েলের বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis।
- আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পাখির বাংলা নামের সাথে ফরাসি (Shama dayal) এবং ওলন্দাজ (Dayallijster) নামের মিল রয়েছে।
- আগে এটি 'থ্রাশ' (Thrush) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি 'ফ্লাইক্যাচার' (Old World flycatcher) পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃত।
মজার তথ্য: দোয়েল শুধু সুন্দরীই নয়, এটি বেশ বুদ্ধিমানও। এরা অন্য পাখির ডাক নকল করতে পারে এবং নিজেদের এলাকা রক্ষায় বেশ সাহসী হয়।
দোয়েল পাখি নিয়ে কিছু অজানা তথ্য
দোয়েল পাখি সম্পর্কে আমাদের ধারণা সাধারণত এর মিষ্টি শিস আর সাদা-কালো রঙের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এর আড়ালে এমন কিছু অদ্ভুত এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে যা সত্যিই বিস্ময়কর। নিচে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হলো যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা:
১. এরা "কণ্ঠশিল্পী" নয়, বরং "নকলবাজ"
আমরা ভাবি দোয়েল শুধু নিজের সুরে গান গায়। আসলে দোয়েল অত্যন্ত দক্ষ নকলবাজ (Mimicry artist)। এরা অন্য পাখির ডাক, এমনকি মাঝে মাঝে আশেপাশে থাকা পশু বা যান্ত্রিক শব্দ হুবহু নকল করতে পারে। এদের নিজস্ব শিস মূলত নিজেদের এলাকা (Territory) রক্ষা করার জন্য একটি সংকেত।
২. রাতেও গান গায়?
সাধারণত পাখিরা দিনে ডাকাডাকি করে, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে প্রজনন ঋতুতে পুরুষ দোয়েল অনেক সময় মাঝরাতেও গান গায়। বিশেষ করে পূর্ণিমা রাতে বা আশেপাশে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো (যেমন স্ট্রিট লাইট) থাকলে তারা অন্য পুরুষ দোয়েলকে সতর্ক করতে বা সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করতে রাতভর গান গেয়ে যেতে পারে।
৩. এদের লেজের বিশেষ ভাষা
খেয়াল করলে দেখবেন, দোয়েল বসার পর ঘনঘন লেজ ওপর-নিচে নাড়ায়। এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। এটি এক ধরনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। লেজের এই মুভমেন্টের মাধ্যমে তারা তাদের মেজাজ এবং সতর্কবার্তা অন্য পাখিদের জানায়। যদি লেজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে, তবে বুঝতে হবে পাখিটি কোনো কারণে উত্তেজিত বা শঙ্কিত।
৪. আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখলে আক্রমণ করে
দোয়েল তাদের এলাকা নিয়ে খুব সচেতন। মজার বিষয় হলো, জানালার কাঁচ বা আয়নায় যদি দোয়েল নিজের প্রতিফলন দেখে, সে এটিকে অন্য কোনো প্রতিযোগী দোয়েল মনে করে। অনেক সময় দেখা যায় এরা আয়নার সাথে যুদ্ধ করছে বা নিজের প্রতিচ্ছবিকে ঠোকরাচ্ছে। একে প্রাণিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Shadow Boxing’ বলা হয়।
৫. গায়ের রং আসলে সবসময় কালো নয়
আমরা যে পুরুষ দোয়েলকে কুচকুচে কালো দেখি, তা আসলে আলোর প্রতিসরণের কারণে। এদের পালকের গঠন এমন যে, নির্দিষ্ট কোণে আলো পড়লে অনেক সময় কালোর বদলে গাড় নীল বা বেগুনি আভা দেখা যায়। একে 'Structural coloration' বলা হয়।
৬. খাবার সংগ্রহের বিশেষ কৌশল
দোয়েল পাখি মাঝে মাঝে মাটির ওপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং কান পেতে থাকে। তারা মাটির নিচে থাকা পোকা-মাকড়ের নড়াচড়া শুনতে পায় এবং এক ঝটকায় মাটি খুঁড়ে শিকার ধরে ফেলে। এদের শ্রবণশক্তি অসাধারণ তীক্ষ্ণ।
৭. বিলুপ্তির নীরব আশঙ্কা
বাংলাদেশের জাতীয় পাখি হলেও, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ঝোপঝাড় কমে যাওয়ার কারণে প্রকৃতিতে এদের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া এখন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
আপনি কি জানেন? দোয়েল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক ভুল ছিল! লিনিয়াস যখন এই নাম দেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন এরা ভারতের 'সোলার' (Saul) নামক গাছের আশেপাশে থাকে, কিন্তু আসলে সেই গাছের সাথে দোয়েলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না।
দোয়েল কি সারা বছর বাংলাদেশেই থাকে, নাকি পরিযায়ী?
বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল আমাদের অতি পরিচিত একটি পাখি। এর মিষ্টি শিস আর চঞ্চল স্বভাব গ্রামীণ বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দোয়েল সম্পর্কে আপনার মনে আসা এই প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
দোয়েল কি পরিযায়ী পাখি?
সরাসরি বলতে গেলে— না, দোয়েল পরিযায়ী পাখি নয়। এটি বাংলাদেশের একটি আবাসিক (Resident) পাখি। অর্থাৎ, দোয়েল সারা বছরই বাংলাদেশে অবস্থান করে এবং এখানেই তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে।
শীতকালে যখন অনেক বিদেশি পাখি (যেমন বালিহাঁস বা খঞ্জন) সুদূর সাইবেরিয়া বা হিমালয় অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে, তখন দোয়েল কিন্তু দেশ ছাড়ে না। এরা এ দেশের আবহাওয়াতেই অভ্যস্ত এবং বারো মাস আমাদের আশেপাশেই বিচরণ করে।
দোয়েলের বৈশিষ্ট্য ও জীবনধারা
কেন দোয়েলকে পরিযায়ী বলা হয় না এবং তারা কীভাবে আমাদের প্রকৃতিতে টিকে থাকে, তার কিছু মূল কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. খাদ্যাভ্যাস
দোয়েল মূলত পতঙ্গভুক পাখি। এরা ঝোপঝাড়, বাগানের কোণ বা ঘরের ভেন্টিলেটরে বাসা বাঁধে। যেহেতু বাংলাদেশে সারা বছরই নানা ধরনের ছোটখাটো পোকা-মাকড় পাওয়া যায়, তাই খাদ্যের সন্ধানে এদের অন্য কোনো দেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
২. বিচরণ ক্ষেত্র
এরা সাধারণত লোকালয়ের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক শহরের পার্ক বা বড় গাছের সারিতেও এদের দেখা মেলে। এরা মাটির খুব কাছাকাছি খাবার খুঁজে বেড়ায়, যা এদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।
৩. প্রজননকাল
দোয়েলের প্রজনন সময় সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত। এই সময়ে পুরুষ দোয়েল খুব ভোরে গাছের মগডালে বসে উচ্চৈঃস্বরে গান গায়, যা মূলত অন্য পাখিদের নিজের এলাকা (Territory) সম্পর্কে জানান দেওয়া এবং সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য।
৪. রূপের পরিবর্তন
শীতকালে দোয়েলের গায়ের রঙের খুব একটা পরিবর্তন হয় না, তবে এদের চাঞ্চল্য কিছুটা কমতে পারে। পুরুষ দোয়েলের পিঠ কালো এবং বুক ও পেট সাদা হয়, আর স্ত্রী দোয়েলের ক্ষেত্রে কালোর বদলে কিছুটা ধূসর রঙ দেখা যায়।
কেন আমাদের জন্য দোয়েল গুরুত্বপূর্ণ?
- জাতীয় প্রতীক: ১৯৭৩ সালে দোয়েলকে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমাদের টাকা ও মুদ্রাতেও এর ছবি দেখা যায়।
- পরিবেশ রক্ষায়: ফসলের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে দোয়েল কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধুর মতো কাজ করে।
- সংস্কৃতিতে: বাংলার লোকসংগীত, কবিতা এবং সাহিত্যে দোয়েলের মিষ্টি ডাক ও চঞ্চলতার বর্ণনা বারবার উঠে এসেছে।
সতর্কবার্তা: যদিও দোয়েল পরিযায়ী নয়, তবুও নগরায়ন এবং ঝোপঝাড় কমে যাওয়ার কারণে এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পাখির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
দোয়েল পাখির ডাক এত মধুর কেন? এর কোনো বিশেষ কারণ আছে?
দোয়েল পাখির ডাক আমাদের কানে এত মধুর লাগে কারণ এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, বরং এটি সুরের একটি জটিল এবং বিজ্ঞানসম্মত বিন্যাস। দোয়েলের এই সুমিষ্ট গানের পেছনে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও জৈবিক কারণ রয়েছে:
১. 'থ্রাশ' পরিবারের উত্তরাধিকারী
দোয়েল পাখি Muscicapidae পরিবারের অন্তর্গত, যাদের একসময় Turdidae বা থ্রাশ (Thrush) পরিবারের সদস্য মনে করা হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে সুকণ্ঠী পাখিগুলো (যেমন নাইটিংগেল) এই থ্রাশ পরিবারেরই সদস্য। ফলে জিনগতভাবেই দোয়েল একটি জটিল এবং সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী।
২. সুরের বৈচিত্র্য (Complex Repertoire)
অন্যান্য অনেক পাখির ডাক যেখানে একই রকম একঘেয়ে হয়, দোয়েল সেখানে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন সুর বা 'নোট' তৈরি করতে পারে। এরা শিস দেওয়ার মতো করে ডাকতে পারে এবং দ্রুত লয়ে সুর পরিবর্তন করতে পারে, যা আমাদের কানে সংগীতের মতো মনে হয়।
৩. অনুকরণ করার ক্ষমতা (Mimicry)
দোয়েল অত্যন্ত বুদ্ধিমান পাখি। এরা শুধু নিজের সুরই নয়, বরং আশেপাশের অন্য পাখির ডাকও হুবহু নকল করতে পারে। এই বহুমুখী গায়কী গুণের কারণে এদের ডাক অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও মধুর শোনায়।
৪. প্রজনন ও এলাকা রক্ষার কৌশল
দোয়েলের মিষ্টি গানের প্রধান কারণ হলো যোগাযোগ:
- সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করা: প্রজনন ঋতুতে (মার্চ-জুলাই) পুরুষ দোয়েল তার কণ্ঠের জাদু দিয়ে স্ত্রী দোয়েলকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করে। যার সুর যত বেশি শক্তিশালী ও মধুর, তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
- সীমানা নির্ধারণ: দোয়েল অত্যন্ত আঞ্চলিক পাখি। তারা গানের মাধ্যমে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ পাখিদের জানিয়ে দেয় যে এটি তার এলাকা।
৫. গায়কীর সময় (Dawn Chorus)
দোয়েল সাধারণত খুব ভোরে গান গায়। ভোরের শান্ত পরিবেশে যখন বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে, তখন শব্দের তরঙ্গ অনেক দূর পর্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছাতে পারে। এই নিস্তব্ধতায় তাদের শিস আরও বেশি স্নিগ্ধ ও শ্রুতিমধুর মনে হয়।
একটি মজার তথ্য: দোয়েল যখন গান গায়, তখন তারা তাদের লেজটি বিশেষ ভঙ্গিতে নাচায়, যা তাদের পরিবেশনাকে আরও দর্শনীয় করে তোলে।
একটি দোয়েল গড়ে কত বছর বাঁচে?
প্রকৃতিতে একটি বন্য দোয়েল গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর বেঁচে থাকে। তবে এটি অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
নিচে দোয়েলের জীবনকাল এবং এর ওপর প্রভাব ফেলে এমন কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
জীবনকাল নিয়ে বিস্তারিত
- বন্য পরিবেশে: খোলা প্রকৃতিতে দোয়েলকে অনেক প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়। শিকারি পাখি বা প্রাণীর আক্রমণ এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এদের গড় আয়ু সাধারণত ৩-৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
- অনুকূল পরিবেশে: যদি পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায় এবং বড় ধরনের কোনো বিপদ না আসে, তবে কোনো কোনো দোয়েল ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্তও বাঁচতে পারে।
- বন্দি অবস্থায়: খাঁচায় বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (যেমন চিড়িয়াখানা বা গবেষণা কেন্দ্রে) সঠিক যত্ন পেলে এরা আরও বেশি সময় বাঁচে। রেকর্ড অনুযায়ী, উপযুক্ত পরিবেশে এরা ১২-১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তবে দোয়েল মুক্ত আকাশে উড়তে পছন্দ করে বলে খাঁচায় এদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
কেন এদের আয়ু কমে যায়?
দোয়েলের আয়ু কমে যাওয়ার পেছনে কিছু প্রধান কারণ রয়েছে:
- শিকারি প্রাণী: বিড়াল, সাপ, বড় ঈগল বা বাজপাখি এবং বনবিড়াল দোয়েলের প্রধান শত্রু। বিশেষ করে বাচ্চা দোয়েলরা প্রায়ই এদের শিকারে পরিণত হয়।
- বাসস্থানের অভাব: পুরনো গাছের কোটর বা দেয়ালের ফোকর কমে যাওয়ায় এরা নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে ভোগে।
- কীটনাশকের ব্যবহার: আমরা জমিতে যে বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করি, সেই বিষাক্ত পোকা খেয়ে অনেক সময় দোয়েল মারা যায় অথবা তাদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়।
- রোগবালাই: অন্যান্য পাখির মতো দোয়েলও বিভিন্ন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা বন্য পরিবেশে চিকিৎসা ছাড়াই তাদের মৃত্যুর কারণ হয়।
জেনে রাখা ভালো: দোয়েলের ছানারা ডিম থেকে ফোটার পর প্রায় ১০-১৫ দিনের মধ্যেই বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে। জীবনের এই প্রাথমিক সময়টাই তাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
দোয়েল পাখি কি জোড়া বাঁধলে সারাজীবন একসাথে থাকে?
দোয়েল পাখির দাম্পত্য জীবন বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। এক কথায় বলতে গেলে— না, দোয়েল পাখি সাধারণত সারাজীবন এক সঙ্গীর সাথে থাকে না। তবে প্রজনন ঋতুতে তারা বেশ একনিষ্ঠ থাকে।
নিচে এদের সম্পর্কের ধরণটি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. সিজনাল মনোগ্যামি (Seasonal Monogamy)
দোয়েল পাখিরা সাধারণত 'সিজনাল মনোগ্যামিস্ট'। এর অর্থ হলো, একটি নির্দিষ্ট প্রজনন ঋতুতে (সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই) একটি পুরুষ দোয়েল এবং একটি স্ত্রী দোয়েল জোড়া বাঁধে। সেই ঋতুতে তারা একসাথে বাসা তৈরি করে, ডিমে তা দেয় এবং ছানা বড় করে। কিন্তু পরবর্তী বছর বা পরবর্তী প্রজনন ঋতুতে তারা আবার নতুন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারে।
২. কেন তারা সঙ্গী বদলায়?
বন্য পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক সময় এক সঙ্গী মারা যায় বা কোনো কারণে হারিয়ে যায়। তাই বংশধারা টিকিয়ে রাখতে তারা নতুন সঙ্গী বেছে নিতে দ্বিধা করে না। এছাড়া বংশগত বৈচিত্র্য রক্ষার জন্যও অনেক পাখি প্রতি বছর নতুন সঙ্গী খোঁজে।
৩. এলাকার প্রতি আনুগত্য
মজার বিষয় হলো, দোয়েল তার সঙ্গীর চেয়ে তার এলাকার (Territory) প্রতি বেশি বিশ্বস্ত। একটি পুরুষ দোয়েল সাধারণত একটি নির্দিষ্ট এলাকা দখল করে রাখে এবং বছরের পর বছর সেখানেই থাকে। যদি গত বছরের স্ত্রী সঙ্গীটি আবার সেই এলাকায় ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে পুনরায় জোড়া বাঁধার সম্ভাবনা থাকে। তবে এটি ভালোবাসার চেয়ে 'চেনা জায়গা' ব্যবহারের সুবিধার জন্যই বেশি হয়।
৪. প্রজনন পরবর্তী বিচ্ছেদ
ছানারা যখন উড়তে শেখে এবং স্বাবলম্বী হয়ে যায়, তখন বাবা-মায়ের মধ্যকার সেই নিবিড় বন্ধনটি আর থাকে না। তারা তখন আলাদাভাবে বিচরণ করতে শুরু করে এবং পরবর্তী ঋতু পর্যন্ত এককভাবেই জীবন কাটায়।
সংক্ষেপে দোয়েলের সম্পর্ক:
দোয়েল কোন ঋতুতে ডিম পাড়ে?
যেকোনো পাখির বংশবৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের প্রয়োজন হয়, যখন প্রকৃতিতে প্রচুর খাবার (বিশেষ করে পোকামাকড়) পাওয়া যায়। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েলের ক্ষেত্রে এই সময়টি হলো গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালের শুরু।
নিচে দোয়েলের ডিম পাড়া ও প্রজনন ঋতু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
প্রজনন ঋতু ও সময়কাল
দোয়েল পাখি সাধারণত মার্চ মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তবে এদের প্রজনন কার্যক্রমের মূল পর্যায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
- শুরু (মার্চ - এপ্রিল): এই সময়ে পুরুষ দোয়েল উঁচু ডালে বসে গান গেয়ে তার এলাকা নির্ধারণ করে এবং স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ করে। এই সময় থেকেই তারা বাসা তৈরির কাজ শুরু করে।
- মধ্য সময় (মে - জুন): এটিই দোয়েলের ডিম পাড়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বেশিরভাগ দোয়েল এই সময়েই ডিম পাড়ে।
- শেষ সময় (জুলাই): বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে তাদের প্রজনন মৌসুম শেষ হয়ে আসে। জুলাইয়ের পর সাধারণত এদের নতুন করে ডিম পাড়তে দেখা যায় না।
ডিম ও বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত কিছু তথ্য
- ডিমের সংখ্যা: একটি স্ত্রী দোয়েল একবারে সাধারণত ৪ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে।
- ডিমের রঙ: এদের ডিমের রঙ হালকা নীলাভ-সবুজ বা ফ্যাকাশে সবুজ হয়, যার ওপর লালচে-বাদামী রঙের ছোট ছোট ছোপ থাকে।
- ডিমে তা দেওয়া: স্ত্রী দোয়েল একাই ডিমে তা দেয়। ডিম থেকে ছানা ফুটতে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে।
- ছানা লালন-পালন: ছানা ফুটে বের হওয়ার পর বাবা ও মা—উভয়ে মিলেই ছানাদের পোকামাকড় খাওয়ায়। ছানারা প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে উড়তে শেখে।
কেন এই ঋতুতেই ডিম পাড়ে?
এর প্রধান কারণ হলো খাদ্যের সহজলভ্যতা। মার্চ থেকে জুলাই মাসের মধ্যে প্রকৃতিতে প্রচুর পরিমাণে শুঁয়োপোকা, ফড়িং এবং অন্যান্য ছোট পতঙ্গ জন্মায়। এই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারগুলো ছানাদের দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একটি মজার তথ্য: দোয়েল খুব চতুরতার সাথে বাসা লুকায়। এরা সাধারণত গাছের কোটর, পুরনো দালানের ফোকর, এমনকি আপনার বাড়ির ভেন্টিলেটরেও বাসা বাঁধতে পারে। তবে তাদের বাসা চেনার উপায় হলো—এরা বাসা তৈরিতে শিকড়, চুল এবং ঘাস ব্যবহার করে।
দোয়েল সংরক্ষণের জন্য আমরা কী করতে পারি?
আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল একসময় বাংলাদেশের সর্বত্র দেখা গেলেও, বর্তমানে নগরায়ন এবং পরিবেশ দূষণের কারণে এদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে আসছে। দোয়েল সংরক্ষণে আমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি:
১. প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা
দোয়েল ঝোপঝাড় এবং পুরনো গাছের কোটরে থাকতে পছন্দ করে।
- গাছ লাগানো: বাড়ির আশেপাশে বা ছাদবাগানে দেশি ফলের গাছ এবং ঘন পাতার গাছ লাগান।
- ঝোপঝাড় না কাটা: বাগানের একটি কোণ একটু অপরিচ্ছন্ন বা ঝোপালো রাখতে পারেন, যেখানে তারা নিরাপদে লুকোতে ও বাসা বাঁধতে পারে।
- পুরনো দেয়াল রক্ষা: পুরনো বাড়ির ফোকর বা দেয়ালের গর্তে এরা বাসা বাঁধে। সংস্কারের সময় খেয়াল রাখা উচিত যেন সেখানে কোনো পাখির বাসা না থাকে।
২. কৃত্রিম বাসার ব্যবস্থা করা (Bird Boxes)
শহরে গাছের অভাব থাকায় দোয়েলরা বাসা তৈরির জায়গা পায় না।
- আপনার বারান্দায় বা গাছের ডালে কাঠের তৈরি পাখির বাসা (Nest Box) ঝুলিয়ে দিতে পারেন। দোয়েলরা খুব সহজেই এই কৃত্রিম বাসায় অভ্যস্ত হয়ে যায়।
৩. কীটনাশকের ব্যবহার কমানো
দোয়েল মূলত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।
- কৃষিজমিতে বা বাগানে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করলে দোয়েলের খাদ্য উৎস ধ্বংস হয়। বিষাক্ত পোকা খেয়ে অনেক সময় পাখিও মারা যায়। তাই জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া প্রয়োজন।
৪. খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা
তীব্র গরমে বা খাদ্যের সংকটে পাখির মৃত্যু হতে পারে।
- বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় ছোট পাত্রে পরিষ্কার পানি রাখুন।
- শীতকালে বা খাবারের অভাব দেখা দিলে ভাতের মাড় বা ছোট শস্যদানা দিতে পারেন (যদিও তারা মূলত পতঙ্গভুক)।
৫. সচেতনতা বৃদ্ধি করা
- পাখি শিকার বা জাল দিয়ে ধরা থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদের সচেতন করা।
- শিশুদের মধ্যে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা।
মনে রাখবেন: বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী যেকোনো দেশি পাখি ধরা, শিকার করা বা খাঁচায় বন্দি রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ।
উপসংহার: আমাদের ঐতিহ্য ও প্রকৃতি রক্ষা
পরিশেষে বলা যায়, দোয়েল কেবল আমাদের জাতীয় পাখি নয়, বরং এটি আমাদের শৈশব, লোকগাথা এবং বাংলার চিরচেনা প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের অসাবধানতা আর আধুনিকতার দাপটে যদি এই সুরেলা পাখিটি প্রকৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, তবে তা হবে আমাদের পরিবেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এখনো সময় আছে দোয়েলের কিচিরমিচির আর মিষ্টি শিসকে বাঁচিয়ে রাখার। কৃষিজমিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো, বাড়ির আশেপাশে নিরাপদ ঝোপঝাড় বা গাছ বজায় রাখা এবং পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা পারি আমাদের এই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করতে। আসুন, আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত ও সুরেলা বাংলা রেখে যেতে আমরা সবাই সচেতন হই।










