ভিড়ের মনস্তত্ত্ব ও প্রোপাগান্ডার ফাঁদ
আজকের এই আর্টিকেল পড়ার আগে একটা ছোট্ট সতর্কবার্তা। আজকের এই আর্টিকেলা আসলে একটা ট্র্যাপ, একটা ফাঁদ। নেক্সট ২০ মিনিট আমি আপনার মগজের উপরে একটা এক্সপেরিমেন্ট করব। ১৩০ বছরের পুরোনো বই ব্যবহার করে। হয়তো আপনি টেরও পাবেন না।আচ্ছা, একটা কথা ভেবে দেখুন তো? স্টেডিয়ামে বসে যখন আপনি খেলা দেখেন, আপনার চারপাশে যখন হাজারো মানুষ চিৎকার করে, তখন আপনার গলা দিয়েও কীভাবে যেন চিৎকার বেরিয়ে আসে, ঠিক কিনা? ঘরে বসে একা খেলা দেখলে এমন আচরণ আপনি কখনোই করতেন না। অথবা ধরুন, রাস্তায় ছেলেধরা সন্দেহে একজনকে ঘিরে ফেলেছে শত শত মানুষ। একা থাকলে যে মানুষটা হয়তো একটা পিঁপড়াও মারে না, সেই মানুষটাই ওই ভিড়ের ভেতরে ঢুকে গেল এবং অবলীলায় একজন মানুষকে স্রেফ সন্দেহের বশে পিটিয়ে মেরে ফেলল।
কেন এমন হয়? কেন আপনার মতো শান্ত, শিক্ষিত মানুষও ভিড়ে ঢুকলে নিজের বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে রীতিমতো দানব হয়ে ওঠে? এই ভয়ংকর মনস্তত্ত্বের উত্তর খুঁজতে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।
১৯৩০-এর দশকের জার্মানি। নুরেমবার্গ শহরের রাত। বিশাল ময়দানে জড়ো হয়েছে লাখখানেক মানুষ। হাজার হাজার মশালের আলোয় পুরো ময়দান আলোকিত। জনসমুদ্র রীতিমতো দুলছে একটা ছন্দে। ঠিক যেন একটা অভিন্ন শরীরের মতো। এক হাতে স্যালুট, এক গলায় স্লোগান, এক হৃদপিণ্ডের মতো স্পন্দন।এই মানুষগুলো কিন্তু অশিক্ষিত ছিল না। এরা সেই জাতি, যে জাতির সেই জেনারেশনই পৃথিবীকে দিয়েছিল আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গের মতো দুনিয়া কাঁপানো সব ব্যক্তিত্ব। মার্টিন হাইডেগারের মতো চিন্তাবিদ। তাহলে ইউরোপের সবচেয়ে শিক্ষিত জাতির এই মানুষগুলো কীভাবে একজনের কথায় গলে গিয়ে একটা হিংস্র দানবে পরিণত হলো? উত্তরটা লেখা আছে এই বইটিতে।
ফ্রান্সের জন্য এই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল এক চরম অপমানের মধ্য দিয়ে। ফ্রান্সের সম্রাট বন্দি হয়েছিল, আর দেশের নতুন সরকার শত্রুপক্ষ তথা জার্মানদের কাছে মাথা নত করে অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু প্যারিসের সাধারণ মানুষ এই আত্মসমর্পণ কিছুতেই মানতে পারল না। ক্ষোভে-অপমানে মাসের পর মাস অনাহারে থাকা প্যারিসবাসী নিজেদের দেশের কাপুরুষ সরকারের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসল। সরকার ভয়ে প্যারিস ছেড়ে পালিয়ে গেল ভার্সাই শহরে। আর প্যারিসের নিয়ন্ত্রণ নিল সাধারণ জনতা, খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের দাবি একটাই—আমরা শত্রুর কাছে মাথা নত করব না, এই শহর এখন জনতার।
ইতিহাসে সাধারণ মানুষের এই অদ্ভুত বিদ্রোহের নাম ‘প্যারিস কমিউন’। কিন্তু নিজেদের শহর দখলের এই উৎসব টিকল মাত্র কয়েক মাস। ১৮৭১ সালের মে মাসে ফরাসি সরকার তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে আবার ফিরে এলো। প্যারিস পুনর্দখল করল। শুরু হলো নিজেদের দেশের নাগরিকের উপরেই নির্মম হত্যাযজ্ঞ। হাজার হাজার মানুষ মারা গেল। কারো কারো মতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ইতিহাসে সেটা স্থান পেল ‘ব্লাডি উইক’ বা ‘রক্তাক্ত সপ্তাহ’ নামে।
আর তখনই ঘটল সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা। সেনাবাহিনীর তাণ্ডব দেখে প্যারিসের সাধারণ জনতা ভয় এবং ক্ষোভে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেল। শত্রুর হাতে মরার চেয়ে আমরা আমাদের শহর নিজেরাই পুড়িয়ে ফেলব! এরপর ল্য বঁ নিজের চোখে দেখলেন এক হরর শো। সাধারণ মানুষ আগুন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর শুরু করল। তুইলারি রাজপ্রাসাদ জ্বলতে লাগল, জ্বলছে লুভ্যরের লাইব্রেরি, সিটি হল, আদালত। পৃথিবীর তথাকথিত সভ্য শহর পুড়তে লাগল নিজ মানুষের হাতেই।
ডাক্তার ল্য বঁ-র মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরতেছে—এই যে মানুষগুলো আগুন দিচ্ছে, খুন করতেছে, এরা তো খারাপ ছিল না। এরা কালকের সেই দোকানদার, সেই শিক্ষক, সেই কেরানি। একা থাকলে যে মানুষ হয়তো একটা পিঁপড়াও মারে না, সেই মানুষটাই ভিড়ে ঢুকে শহর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে কীভাবে? মানুষটা কেন চেঞ্জ হয়ে যায়? নাকি ভিড়ে ঢুকলে আসল মানুষটা কোথাও হারিয়ে যায়?
এই এক প্রশ্নের পেছনে ল্য বঁ ছুটেছিল দুই দশক। এরপর ১৮৯৫ সালে লিখল এমন এক বই, যেটা আজ ১৩০ বছর পরও প্রাসঙ্গিক। বইটি কেমন হিট হয়েছিল একটু আন্দাজ দেই। কয়েক বছরের মধ্যে অনুবাদ হলো ডজনখানিকেরও বেশি ভাষায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে ইউরোপের জেনারেলরা, ক্ষমতার টেবিলে টেবিলে ঘুরতে লাগল এই বই। একাডেমিক দুনিয়ায় লেখক তেমন পাত্তা পেল না, কিন্তু তাতে কি! শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মনস্তত্ত্বের বইগুলোর একটা লিখে গেছে এই আউটসাইডার, একজন ডাক্তার।ল্য বঁ-র প্রথম আবিষ্কারটাই ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। তিনি বললেন, ভিড় মানে অনেকগুলো মানুষের যোগফল নয়। ভিড় মানে সম্পূর্ণ নতুন একটা প্রাণী। যার নিজস্ব মন আছে, নিজস্ব মেজাজ আছে, কিন্তু বিবেক নাই। যেমন হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন দুটোই গ্যাস, কিন্তু জোড়া লাগলে সেটা হয়ে যায় পানি। পানির বৈশিষ্ট্য কিন্তু হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষও তাই। হাজারটা ‘আমি’ জোড়া লেগে যে জিনিসটা তৈরি হয়, সেটা আর কোনো ‘আমি’ থাকে না, সেটা হয়ে যায় ‘আমরা’। আর এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করে তিনটি ডাইনামিকস।
প্রথমটি হলো: Anonymity (নামহীনতা)। একা রাস্তায় আপনি হয়তো একটা ঢিলও ছুড়বেন না, কারণ সবাই দেখবে দায়টা আপনার। কিন্তু যদি দেখেন আশেপাশের সবাই ঢিল ছুড়তেছে, তখন আপনিও পিছপা হবেন না। কারণ তখন আপনি আর আপনি না, আপনি ভিড়ের ভেতরে একটা বিন্দুমাত্র। ঢিলটা কে ছুড়ল? জনতা ছুড়েছে। দায় যখন সবার, দায় তখন আসলে কারোরই না। আজকের ভাষায় ভাবুন, একটা ভুয়া খবর শেয়ার হলো ১০ হাজার বার। আর তার জোরে একটা মানুষের জীবন গেল। দোষী কে? ১০ হাজার জনের প্রত্যেকেই বলবে, আমি তো শুধু শেয়ার দিয়েছিলাম, আমাকে কেন ধরতেছেন, বাকি সবাইকে ধরেন।
দুই নম্বর হলো: সংক্রমণ (Contagion)। ইমোশন ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসের মতো। স্টেডিয়ামে খেয়াল করবেন, একজন চিৎকার করলে আপনার গলা দিয়েও চিৎকার বেরিয়ে আসে। হাসি ছড়ায়, কান্না ছড়ায়, আর সবচেয়ে দ্রুত যে জিনিসটা ভাইরাল হয় বা ছড়ায়, সেটা হলো রাগ, হিংসা এবং ঘৃণা।
তিন নম্বর হলো: সাজেশন (Suggestion)। ল্য বঁ বললেন, ভিড়ের ভেতরে মানুষ প্রায় হিপনোটাইজড অবস্থায় ঢুকে যায়। যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা হারিয়ে বসে। যা শোনে তাই বিশ্বাস করে, যা বলা হয় তাই করে। এজন্যই বলা হয়, ভিড়ে ঢুকলে আইকিউ অর্ধেক হয়ে যায়। চিন্তাটা তখন আর আপনার মাথায় হয় না, হয় ভিড়ের মাথায়।
যেমন এই যে ধরুন ঘাসফড়িং, মূলত তৃণভোজী। এরা একা থাকলে সাধারণত ঘাস, গাছের পাতা এবং লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। একা থাকা অবস্থায় এরা অত্যন্ত লাজুক এবং নিরীহ প্রাণী। কিন্তু যখন খরা বা অন্য কোনো কারণে একটা ছোট্ট জায়গায় অনেকগুলো ঘাসফড়িং এক হয়ে যায়, তখন তাদের শরীরে একে অপরের সাথে ক্রমাগত ধাক্কা লাগে। এই ফিজিক্যাল কন্টাক্টের কারণে তাদের ব্রেনে সেরোটোনিন হরমোনের বিশাল একটা স্পাইক হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভেতরে তাদের ব্রেনের কেমিস্ট্রি এবং শারীরিক গঠন চেঞ্জ হতে শুরু করে। তাদের গায়ের রং চেঞ্জ হয়ে যায়, পেশি বড় হয়ে যায় এবং আগের স্বভাব পুরোপুরি ভুলে গিয়ে একটা বিশাল সোয়ার্ম (Swarm) বা ঝাঁক তৈরি হয়। তখন এরা আর নিরীহ পাতা খাওয়া ঘাসফড়িং থাকে না, এরা হয়ে যায় পঙ্গপাল। এবং তখন তারা সামনে যা পায়—মাইলের পর মাইল ফসলের মাঠ, গাছপালা সব গিলে খায়।কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশে ছেলেধরা গুজবে নিরাপরাধ মানুষকে পিটিয়ে মারল সাধারণ মানুষের ভিড়। ভিড়ের ভেতরে থাকা প্রত্যেকেই কারো না কারো বাবা, কারো ভাই, কারো বন্ধু। একা পেলে হয়তো আহত মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেত। কিন্তু সেদিন ওখানে কোনো একজন ছিল না, ছিল শুধু স্রোত।
এবার কল্পনা করুন, আপনি একটা রুমে বসে খুব জরুরি একটা পরীক্ষা দিচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন এসি-র ভেন্ট দিয়ে কালো ধোঁয়া ঢুকতেছে। আপনি একা থাকলে কি করতেন? লজিক বলে আপনি দুই সেকেন্ডের মধ্যে লাফ দিয়ে ফায়ার অ্যালার্ম বাজাতেন অথবা দৌড়ে রুম থেকে পালাতেন, তাই তো? কিন্তু এবার দৃশ্যটা একটু চেঞ্জ করুন। রুমে আপনি একা নন, আপনার সাথে আরো তিনজন বসে আছে। আপনি তাদের বললেনও, ওই দেখো ধোঁয়া বের হচ্ছে! তারা পাত্তাই দিল না। তারা গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। জানেন তখন আপনার ব্রেনে কি হবে? আপনার ব্রেনের সারভাইভাল ইন্সটিঙ্কট সুইচ অফ হয়ে যেতে পারে। আপনি ভাববেন, বাকিরা যখন পালাচ্ছে না তার মানে এটা নিশ্চয় বিপদের কিছু না। হয়তো এসির স্বাভাবিক ধোঁয়া, হয়তো আপনি বেশি প্যানিক করতেছেন। এটা কোনো থিওরি না কিন্তু ভাই! ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির করা বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। আপনার সাথে বসে থাকা ওই তিনজন ছিল গবেষকদের ভাড়া করা অভিনেতা। ওই তিনজনের এই অভিনয় শুধু আপনার বুদ্ধিই কমায়নি, আপনার বেঁচে থাকার যে ইন্সটিঙ্কট সেটাকেও সুইচ অফ করে দিয়েছে। ভিড়ের সাথে তাল মেলানোর এই ভয়ংকর মনস্তত্ত্বের নাম সোশ্যাল কনফরমিটি (Social Conformity)।সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকান। ফেসবুকে কোনো ইস্যু নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হয়, খেয়াল করবেন শুরুতে সবাই একটা নির্দিষ্ট দিকে ঝুঁকে পড়ে। একজন পাল তোলে, আর বাকিরা সেই পালে অন্ধের মতো হাওয়া দেয়। তখন সবাই যা বলতেছে আপনার যুক্তি তার বিপরীত হলেও আপনি কিছু বলতে ভয় পান। আপনি বুঝতে পারতেছেন যে মানুষ ভুল বলতেছে, কিন্তু পাবলিক শেমিং বা গালি খাওয়ার ভয়ে আপনি চুপ করে বসে থাকেন। এরপর হঠাৎ কেউ একজন সাহস করে ভিন্ন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে দেয়। ব্যস, তখন আস্তে আস্তে কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি হতে থাকে। সেই কাউন্টার ন্যারেটিভের পক্ষেও যখন অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে যায়, তখন আপনি সাহস পেয়ে নিজের মতো একটা লিখে দেন। এখন খেয়াল করুন, ফেসবুকে দেখলে প্রথমে মনে হচ্ছিল সবাই বলতেছে সাদা, অথচ কিছুক্ষণ পর মনে হচ্ছে সবাই বলতেছে কালো! হোয়াট আ টার্ন অ্যারাউন্ড!
ল্য বঁ লিখেছিলেন, ভিড় যুক্তি বোঝে না। ভিড় দেখে ছবি, ইমেজ, আইকন। আপনি ভিড়কে পরিসংখ্যান দেন—তারা হাই তুলবে। একটা গল্প দিন, একটা দৃশ্য দিন—জ্বলে উঠবে। শিশু মৃত্যুর হার ২ শতাংশ বাড়ছে—এই বাক্যে ভাই মিছিল হবে না। কিন্তু একটা শিশুর একটা ছবি দেশ কাঁপিয়ে দিতে পারে। ক্রাউডের কাছে হাজারটা ডেটার চেয়ে একটা ছবির দাম বেশি।
এই যেমন ধরুন, একজন মানুষ একা একটা ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। এটা একটা বিখ্যাত ছবি—তিয়ানয়ানমেন স্কয়ারের সেই ‘ট্যাংক ম্যান’। তিয়ানয়ানমেন স্কয়ারে ছাত্র আন্দোলনে হাজারো ছাত্র নিহত হয়েছিল, কিন্তু আজও ওই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ইমেজ হয়ে গেছে এটাই। কোনোদিন যদি চায়নায় কমিউনিস্ট পার্টির পতন হয়, সেদিন দেখবেন এই ছবিটাই চীনে সেলিব্রেট করা হবে।
বাংলাদেশে ৯০-এ এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে সবচেয়ে সিম্বলিক ছবি কোনটি? অবশ্যই নূর হোসেনের সেই ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ছবিটা, রাইট? অনেকেই মনে করে নূর হোসেন মাঠে নামল, তাকে হত্যা করা হলো, আর তাতেই মনে হয় এরশাদ সরকারের পতন হয়ে গেল, রাইট? কিন্তু না, নূর হোসেন ১৯৮৭ সালে মারা যায়। তার মৃত্যুর পরও এরশাদ কিন্তু বেশ কয়েক বছর টিকে ছিল।
কিন্তু, তবে, হয়তো, হতে পারে, হয়তো সম্ভব—এসব শব্দ ক্রাউড নিতে পারে না। ভিড়ের দুনিয়া সাদা-কালো। হিরো, নয়তো ভিলেন। বন্ধু, নয়তো দুশমন। মাঝামাঝি বলে ভিড়ের অভিধানে কোনো শব্দই নেই।
তারপর ল্য বঁ দিলেন সেই কুখ্যাত রেসিপিটা। ভিড়কে বশ করার তিনটি অস্ত্র।
- অস্ত্র নম্বর ১: Assertion (দাবি)। প্রমাণ দিও না, দাবি করো। কোনো গবেষণায় দেখা গেছে বা কোনো ‘সম্ভবত’ টাইপের শব্দ না বলে সরাসরি নিঃসন্দেহ নিয়ে বলো, আত্মবিশ্বাসের সাথে বলো। তুমি নিজে জানো তুমি ভুল বলতেছো, কিন্তু বলার সময় এমনভাবে বলো যেন তুমি তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করো—এটা যেন অডিয়েন্স বোঝে। ভিড় প্রমাণ মাপে না, ভিড় মাপে আত্মবিশ্বাস।যেমম হিটলার তার মেইন কাম্প বইয়ে বলেছিল "তুমি যদি মিথ্যা বারবার আত্নবিশ্বাসের সাথে বলতে পারে তাহলে সবাই সেটা সত্য হিসেবে মেনে নেবে।"
- অস্ত্র ২: Repetition (পুনরাবৃত্তি)। একই কথা বলো, বারবার বলো, আবারও বলো। ল্য বঁ-র মতে, বারবার শোনা কথা একসময় মগজে ঢুকে নিজের বিশ্বাস হয়ে বসে থাকে। মানুষ ভুলেই যায় কথাটি তাকে শোনানো হয়েছে বারবার। ভুল ইতিহাস বারবার বলো, সেই ইতিহাসের সাথে ক্রাউডের আত্মসম্মান, অস্তিত্ব, অর্জন, শ্রেষ্ঠত্ব এবং দুশমনের প্রতি বিদ্রূপ বা ঘৃণা—এসব কিছু একটা জুড়ে দাও। ব্যস, সেটাই মানুষ মনেপ্রাণে ধারণ করতে শুরু করবে।
- অস্ত্র ৩: Prestige (প্রতিপত্তি)। কথাটা কে বলেছে সেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বড় নাম, বড় পদ, বড় পোশাক—বক্তার ওজনই কথার প্রমাণ। একই কথা পাড়ার দোকানে যখন বলা হয় তখন সেটা গুজব, কিন্তু টিভিতে স্যুট পরা কোনো ব্যক্তি যখন বলে তখন সেটা ইনফরমেশন।
এই তিন অস্ত্র—অর্থাৎ দাবি, পুনরাবৃত্তি এবং প্রতিপত্তি। মনে রাখবেন তিনটাকে।
আরেকটা গোপন জিনিস, সেটা হলো Magic Words বা জাদু শব্দ। ল্য বঁ দেখেছিলেন কিছু শব্দ আছে যেগুলোর মিনিং যত ঝাপসাই হোক না কেন, ক্ষমতা ভয়ংকর। যেমন: চেতনা, ইনসাফ, আজাদী, স্বাধীনতা, ষড়যন্ত্র, ওরা, দেশের শত্রু। এই শব্দগুলোর সংজ্ঞা কেউ ঠিকমতো দিতে পারুক আর না পারুক, শব্দগুলো আপনি জনতার মাঝে ছুড়ে দেন—বিদ্যুতের মতো কাজ করবে। কারণ ঝাপসা শব্দের ভেতরে প্রত্যেকে বসিয়ে নেয় নিজের নিজের রাগ, নিজের নিজের স্বপ্ন, ক্ষোভ এসব। একটা শব্দ লাখো মানুষের লাখো ক্ষোভের কমন কনটেইনার হয়ে যায়। স্লোগান জিনিসটা এজন্যই যুক্তির চেয়েও শক্তিশালী।
ল্য বঁ ভেবেছিল তিনি রোগ চিনিয়ে দিচ্ছেন, মানুষ সাবধান হবে। কিন্তু বইটি পড়ে একদল মানুষ সম্পূর্ণ উল্টো জিনিস শিখল। দেখল, আরে বাহ! এতো ক্ষমতায় যাওয়ার রেসিপি! ইতালির ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটর মুসোলিনি নিজেই স্বীকার করেছিল যে ল্য বঁ-র এই বই তিনি পড়েছিলেন বারবার, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আর জার্মানিতে নুরেমবার্গের সেই মশাল মিছিল, সেই এক ছন্দের স্লোগান, প্রচারযন্ত্রের সেই মূলনীতি—মিথ্যা বলো, বড় করে বলো, বারবার বলো। বইয়ের পাতার সাথে মেলালে মনে হবে যেন চ্যাপ্টার বাই চ্যাপ্টার হোমওয়ার্ক করে কেউ এগুলো করতেছে।আমেরিকায় এক তরুণ বসে বইটি পড়েছিল অন্য চোখে। নাম এডওয়ার্ড বার্নেস (Edward Bernays)। পরিচয়: সিগমুন্ড ফ্রয়েডের আপন ভাগ্নে। বার্নেস ভাবল, জনতাকে ম্যানিপুলেট করে যদি যুদ্ধে পাঠানো যায়, অনিষ্ট করানো যায়, ভোট দেয়ানো যায়—তাহলে জিনিসপত্র কেনানো যাবে না কেন? আফটার অল, গবেষণায় তো দেখা গেছে ভিড়ে ঢুকলে মানুষের আইকিউ অর্ধেক হয়ে যায়!
১৯২৯ সালের ঘটনাটা শুনুন। তখন আমেরিকায় মেয়েদের প্রকাশ্যে ধূমপান ছিল সামাজিক ট্যাবু। এখন সিগারেট কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জিনিসটা খেয়াল করে দেখুন, বাজারের অর্ধেক ক্রেতাই তো মিসিং তাদের জন্য! বার্নেস কি করল? বিজ্ঞাপন দিল না। সে নিউইয়র্কের ইস্টার্ন প্যারেডে ভাড়া করল একদল সুন্দরী ফ্যাশনেবল তরুণীকে। ক্যামেরার সামনে তারা একসাথে সিগারেট জ্বালাল। আর বার্নেস প্রেসকে আগেই খবর দিয়ে রেখেছিল যে তারা এমনটি করবে এবং সময়মতো তোমরা ছবি তুলবা। সাথে বলে রেখেছিল যে পত্রিকায় শিরোনাম করবা—এই সিগারেটগুলো আসলে ‘স্বাধীনতার মশাল’, নারী স্বাধীনতার প্রতীক। পরদিন সারাদেশের পত্রিকায় সেই ছবিগুলো ছাপা হলো। ব্যস, ধূমপান হয়ে গেল বিদ্রোহ, সিগারেট হয়ে গেল মুক্তি এবং কোম্পানির ক্যাশ বাক্সে নামল টাকার ঢল। আপনি দেখবেন ইতালিয়ান অভিনেত্রী মনিকা বেলুচির সিগারেট খাওয়ার ভিডিও বেশ প্রচার হয়, ভাইরালও হয়। খেয়াল করুন, একটা ছবি, একটা আবেগ—এক ফোঁটা যুক্তি না কিন্তু!
আবার ধরুন যেমন, কিছুদিন আগে ইরানে যে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলো, তাতে অনেক মানুষ মারা গেল। বহু ঘটনা ঘটল তাতে। কিন্তু এ সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা জিনিস কিন্তু ভাইরাল হলো, মনে আছে এই ছবিগুলো?
বেশ কয়েকজন মেয়ে খামেনির ছবিতে আগুন দিয়ে সেই আগুনে সিগারেট ধরাতে লাগল। বিষয়টা এমনভাবে পোর্ট্রে করা হলো যেন নারীরা মুক্ত হচ্ছে, স্বাধীন হচ্ছে, আর সিগারেটে আগুন ধরিয়ে তারা সেই স্বাধীনতা সেলিব্রেট করতেছে। সি! এতে কোনো যুক্তি নাই, জাস্ট ইমোশন। কেউ বলবে এটা একটা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট, কিন্তু যেটাই বলুক—সিগারেট তো ধরাইছে, মেয়েরা সিগারেট খাচ্ছে, দ্যাট ইজ অ্যান আর্ট অব লিবারেশন, রাইট? মেসেজটা তো ওরকমই ছিল।
আবার ধরুন ‘Heavy Breakfast’। হেভি ব্রেকফাস্ট লিখে গুগল করেন, দেখবেন এই টাইপের ছবি আসবে। এতে থাকে ডিম, বেকন, আলু, টোস্ট এসব। আমেরিকানদের সকালের আদর্শ নাস্তার এই ধারণা কিন্তু ওই বার্নেসেরই বানানো। এক বেকন কোম্পানির হয়ে সে হাজার হাজার ডাক্তারদের সই জোগাড় করল, আর নিউজপেপারে ছাপা হলো যে ডাক্তাররা বলেছে ভারী নাস্তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বেকন বিক্রি কিন্তু একলাফে আকাশে! ল্য বঁ-র বই এবার রাজনীতির ময়দান থেকে নেমে এলো আপনার বাজারের ব্যাগে, এমনকি নাস্তার প্লেটে।
ভাইরে, আজকাল প্রোপাগান্ডার নতুন নামও আছে। নাম হলো ‘পাবলিক রিলেশন’। প্রোপাগান্ডা তো একটা নেতিবাচক শব্দ, কিন্তু পাবলিক রিলেশন? ইটস আ গুড ওয়ার্ড, রাইট?আচ্ছা, এসব তো পুরোনো আমলের কথা। এখন মানুষ শিক্ষিত, হাতে হাতে ইন্টারনেট। ভিড় জমাতে আগে একটা ময়দান লাগত, রাস্তা লাগত। মিছিল শেষ, ভিড়ও শেষ। মানুষ ঘরে ফিরে গেলে আবার একজন হয়ে যেত। আর এখন ভিড়টা আপনার পকেটে—২৪ ঘণ্টা। আপনি কখনোই আর ওই একজন হন না। ফেসবুক বা টুইটার খুললেই আবার সেই জনতা। ফেসবুক এবং টুইটার মূলত কয়েক হাজার মানুষের ওই তাৎক্ষণিক এক ভিড়, ভার্চুয়াল ভিড়। সেখানেও ল্য বঁ-র সেই তিনটি রসায়নই হাজির।
- নামহীনতা: আছে। অনেকেই বেনামে, ছদ্মবেশে বট বাহিনী বানিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।
- সংক্রমণ: সেটাও আছে। ভালো জিনিস ভাইরাল হয় না, কিন্তু রাগ, ক্ষোভ, বিকৃত জিনিস দ্রুত ভাইরাল হয়।
আর সবচেয়ে বড় ভয়ংকর জিনিসটা হলো, এই ভিড় আর নিজে নিজে জমে না। এটা জমায় একটি মেশিন—অ্যালগরিদম। আর এই অ্যালগরিদমের একটাই ধর্ম, আপনাকে স্ক্রিনে আটকে রাখা। আর মেশিনটা কোটি কোটি মানুষের ডাটা ঘেঁটে আবিষ্কার করতেছে ঠিক সেই সত্যগুলো যা ল্য বঁ লিখে গিয়েছিল কম্পিউটারের জন্মেরও আগে। ছবি বা ফটোকার্ড যুক্তিকে হারায়, রাগ সবার আগে ছড়াচ্ছে, আর ভিড়ে ঢোকা মানুষের আইকিউ অর্ধেক নেমে আসতেছে। মানে এঙ্গেজমেন্ট ডাবল! ল্য বঁ যেটা বর্ণনা করেছিলেন, সিলিকন ভ্যালি সেটাকে বানিয়ে ফেলেছে বিজনেস মডেল।
এবার একটা সত্যিকারের গবেষণার কথা বলি। ২০১৮ সালে এমআইটির গবেষকরা টুইটারে কোটি কোটি পোস্ট ঘেঁটে বের করলেন এক ভয়ংকর সত্য। মিথ্যা খবর সত্যি খবরের চেয়ে ছড়ায় চার গুণ দ্রুত, পৌঁছায় বহু গুণ বেশি মানুষের কাছে। কিন্তু কেন? কারণ মিথ্যা বানানোই হয় চমক দেয়ার জন্য। আর চমক, রাগ, ভয়—ভিড়ের প্রিয় খাবার। সত্য বেচারা তো প্রায়ই একঘেয়ে।
আর এই ডিজিটাল ভিড় শুধু ঝগড়াই করে না, বাজারও চালায়। এই যেমন ক্রিপ্টো উন্মাদনা। সবাই কিনতেছে, আমি বাদ যাব কেন? এই যে বুকের ভেতরের চাপটা, এর নামই তো ভিড়ের টান। শেয়ার বাজারে ধস মানে আসলে স্রোতের দিকবদল। ফোঁটাগুলো ভাবছে না, ভাসছে।
এবার আরেকটা দিক বলি। ল্য বঁ নিজে মানুষ হিসেবে মোটেও ফেরেশতা ছিল না। তার লেখায় সেই যুগের জঘন্য বর্ণবাদ আছে, নারীদের প্রতি এমন সব মন্তব্য আছে যেগুলো আজ পড়লে কান লাল হয়ে যাবে। দ্বিতীয় কথা হলো বিজ্ঞান বা সায়েন্স। গত ৫০ বছরের গবেষণা ল্য বঁ-র মূল ছবিটাকে অনেকখানি শুধরে দিয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলতেছে, ভিড়ে মানুষ মগজহীন হয় না, বরং তার পরিচয়টা চেঞ্জ হয়ে যায়। ‘আমি’ থেকে সে হয়ে যায় ‘আমরা’-র সদস্য। আর তারপর সে মেনে চলে সেই ‘আমরা’-র নিয়ম। মানে ভিড় দাঙ্গাও করতে পারে, আবার সেই একই রসায়নে ভিড় অসম্ভবকে সম্ভবও করতে পারে মহৎ কাজের জন্য।
বিশ্বাস হচ্ছে না? বন্যার সময় দেখেননি অচেনা মানুষ বুক পানিতে নেমে অচেনা মানুষকে টেনে তুলতেছে? ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে খালি হাতে পাথর সরাচ্ছে শত শত লোক? ওটাও তো ভিড়, ওটাও সংক্রামক, তবে সাহসের সংক্রমণ। আধুনিক দুর্যোগ গবেষণা তো আরও অবাক করা তথ্য দিচ্ছে। সিনেমায় দেখবেন দেখাবে বিপদ এলেই মানুষ পাগলের মতো পদদলিত করে একে অপরকে। বাস্তবে ডাটা বলতেছে উল্টো। বেশিরভাগ দুর্যোগে মানুষ লাইন মানে, পথ ছাড়ে এবং অপরিচিতদের কাঁধে তুলে সাহায্য করে। প্যানিকের চেয়ে ঢের বেশি দেখা যায় সহযোগিতা।
ল্য বঁ রোগটা ধরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু রোগীকে ভেবেছিলেন শুধুই দানব। রোগী আসলে আমরা সবাই। আর আমরা একসাথে মিলে ভালো হতে পারি, আবার সম্মিলিতভাবে চরম খারাপও হতে পারি। আমাদের একক চরিত্র একরকম, কিন্তু আমরা যখন সম্মিলিতভাবে থাকি তখন সেই সম্মিলিত চরিত্র সম্পূর্ণ ইউনিক হয়।
ভিড় তো এড়ানো যাবে না, ভিড় ছাড়া সমাজই হয় না। উপায় একটাই—স্রোতে নামার আগে বোঝা কখন আপনি সাঁতার কাটতেছেন আর কখন ভেসে যাচ্ছেন। যখন দেখবেন আপনার মাথায় ‘আমি কি ভাবতেছি’-র জায়গায় শুরু হয়ে গেছে ‘ওরা বা আমরা কি ভাবতেছি’, তখনই সাবধান! স্রোত আপনাকে ধরে ফেলেছে। কোনো একটা বিষয়ে যদি নিজেকে ১০০% রাইট মনে হয় আর বিপক্ষের সবাইকে লাগে হয় বোকা নয় বিক্রি হয়ে যাওয়া, তাহলে বুঝবেন চিন্তা আর আপনি একা করতেছেন না। আপনি তখন কোনো না কোনো গ্রুপে বিলং করেন এবং সম্মিলিতভাবে একটি ভাবনা আপনাকে প্রভাবিত করতেছে।
কোনো খবর দেখার সাথে সাথে যদি আঙুল নিশপিশ করে এখুনি শেয়ার করতে হবে, ঠিক তখনই ২৪ ঘণ্টার একটা ব্রেক চাপুন। যেটা আজকে শেয়ার না করলে মিথ্যা হয়ে যায়, সেটা সম্ভবত আজও মিথ্যা। আর ব্রেক চেপে নিজেকে তিনটা প্রশ্ন করুন:
- কথাটা বলতেছে কে? আর এতে তার লাভ কি?
- প্রমাণটা কোথায়? নাকি শুধু গলার জোর?
- এই খবরটা কি আপনার রাগটাকে ব্যবহার করতে চাইতেছে?
তিনটা প্রশ্নের এই ফিল্টার—এটাই ভিড়ের যুগে আপনার মগজের সিটবেল্ট।
আর্টিকেলে শুরুতে বলেছিলাম না আপনার উপরেও পরীক্ষা চালাব? চালিয়েছি কিন্তু, তিনটা!
- পরীক্ষা এক: আমি এই আর্টিকেলে অন্তত তিনবার ভরা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছি ভিড়ে ঢুকলে মানুষের আইকিউ অর্ধেক হয়ে যায়। কোনো গবেষণার নাম দেইনি কিন্তু, কোনো সূত্র দেখাইনি। সংখ্যাটা আসলে আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। ল্য বঁ তার বইতে বুদ্ধি কমার কথা বলেছিল ঠিকই, কিন্তু অর্ধেক মাপার কোনো মিটার তো নেই, ওটা আমি বানিয়েছি। এমআইটির যে আসল গবেষণাটার কথা বলেছিলাম, ওটার সময় কিন্তু আমি নাম, সাল, প্ল্যাটফর্ম সব বলছি। কিন্তু আইকিউ অর্ধেক হয়ে যায়—এই ভুয়া দাবিটার বেলায় শুধু বলেছি ‘বিজ্ঞান বলে’ বা ‘গবেষণায় দেখা যায়’, গলাটা একটু গম্ভীর করে বলছি। মনে রাখবেন, সত্যের প্রমাণ লাগে, মিথ্যার লাগে শুধু ভঙ্গি।
- পরীক্ষা দুই: পুরো আর্টিকেলটা খেয়াল করুন, আমি আপনাকে বুঝিয়েছি কি দিয়ে? কেবলই কথা? কেবলই যুক্তি? না, ছবি আছে, বিড়াল আছে। আমার এডিটর এসব ছবি দিয়ে আপনার অ্যাটেনশন ধরে রাখছে। আমি যদি খালি আর্টিকেলটিতে এসে কথা বলতাম আপনার অ্যাটেনশন চলে যেত দ্রুত।
- পরীক্ষা তিন: পুরো আর্টিকেল জুড়ে আমি নিজেও একটা ‘আমরা’ বানিয়ে ফেলছি। আপনি এবং আমি—আমরা সমঝদার, আমরা সবই বুঝি, বাকি মানুষেরা তারা বোঝে না, তারা সব বেকুব। শুধু বুদ্ধিমান আমি আর আপনি। এই যে নিজেকে ভিড়ের চেয়ে আলাদা বুদ্ধিমান ভাবার আরামটা, এটাই ‘ইন-গ্রুপের’ টান। আপনাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা মাত্র।
রাগ কইরেন না ভাই, বরং এটাই আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। অস্ত্রগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, যে ভিডিও অস্ত্র চেনায় সেই ভিডিওই চলে এই অস্ত্রে। তবে একটা পার্থক্য মনে রাখবেন—আমি শেষে এসে ধরিয়ে দিলাম সব, আসল খেলোয়াড়েরা অর্থাৎ রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞাপনদাতারা কোনোদিন সেটা ধরিয়ে দেবে না।
গুস্তাভ ল্য বঁ লিখে গিয়েছিলেন, সামনের যুগটা হবে ভিড়ের যুগ। ১৩০ বছর পর দাঁড়িয়ে স্বীকার করতেই হয় বুড়ো ঠিকই বলছিল। শুধু সে জানত না ভিড়টা একদিন ঢুকে যাবে মানুষের পকেটে, আর ভিড় জমানোর কাজটা করবে একদিন মেশিন। এবং সেটাও করবে মুনাফা বা লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে।
ইতিহাসের শেষ আয়রনিটা দেখুন, যে যে শাসক এই বইটিকে অস্ত্র বানিয়েছিল তাদের প্রত্যেকের সাম্রাজ্য ধসে গেছে। মুসোলিনির লাশ ঝুলেছিল রাস্তার মোড়ে, নুরেমবার্গের সেই ময়দানে যেখানে নাৎসি পার্টির মিছিল হতো সেখানেই পরে তাদের বিচার হয়েছিল। ক্রাউডকে ম্যানিপুলেট করে যারা উপরে উঠছে, ভিড়ের নিয়মেই তারা নেমে গেছে। কারণ ল্য বঁ এটাও লিখে গিয়েছিল যে, ভিড়ের ভালোবাসা যত তীব্র, তার মুখ ফেরানোর সময়টাও তত দ্রুত।
ল্য বঁ বলে গেছেন, প্রথম কয়েকটা কণ্ঠই ঠিক করে দেয় পরের ১০০ সুর। রাগ দিয়ে শুরু হলে রাগের বন্যা বয়ে যায়, প্রশ্ন দিয়ে শুরু হলে ভাবনার মিছিল।
তো আজ এ পর্যন্তই। ক্ষমতায় গেলে কেন মানুষ পাল্টে যায়? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে থাকে একরকম, কিন্তু ক্ষমতায় বসলেই কেন সে অন্যরকম হয়ে যায়?




