জানুন 'দ্য আলকেমিস্ট' বইয়ের আসল রহস্য
"যদি তুমি মন থেকে কিছু চাও তাহলে পুরো পৃথিবী তোমাকে সেই জিনিস তোমাকে পাইয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রের লিপ্ত হয়।" এই কথা টি বিখ্যাত লেখক পাওলো কোহেলো তার বিখ্যাত বই আলকেমিস্ট থেকে নেওয়া।
আপনি কি কখনও অনুভব করেছেন যে আপনার জন্য আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে—এমন কিছু যা আপনার নাগালের বাইরে, আপনাকে একটি বড় উদ্দেশ্যের দিকে ডাকছে?
আলকেমিস্ট একটা গল্প নয়।এটা আপনার জন্য হবে পথপ্রদর্শক।
এই বইটির নাম করনের পিছে একটা সুন্দর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। সাধারণ ভাষায় আলকেমিস্ট হলো যিনি লোহাকে সোনায় রুপান্তর করতে পারে।যা আসলে রুপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বইয়ে আলকেমিস্ট বলতে বোঝানো হয়েছে কিভাবে সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ মানুষ হওয়া যায়।
আপনি যদি এই আর্টিকেলটি নাও পড়েন তাহলেও আপনি আমাকে একটা বই সাজেস্ট করতে বলেন তাহলে যে বই টি যেকোনো পেশা,যেকোনো ব্যাক্তি পড়তে পারে।মানে আপনি ছাত্র হোন বা শিক্ষক,গৃহীনি বা অফিস কর্মচারী সবার জন্যই এই বইটা হবে একটা আর্দশ বই।আমি সাজেস্ট করব "আলকেমিস্ট " বই পড়ার জন্য। বইটি ১৯৮৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।১৯৯৩ সালে এই বইটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ পায়।
এই বই টা আমার এত পছন্দ যে আমি এই বইটি ৩য় বারের মতো বইটি পড়া শেষ করেছি।আলকেমিস্ট পড়া মানে হলো ঘুম থেকে জেগে উঠা যখন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে। আর আমার মনে হয় আলকেমিস্ট বইটি যেকোনো পেশার মানুষই যদি পড়ে তাহলে তার পেশা বা তার লাইফের জন্য কোনো না কোনো ম্যাসেজ পাবে বা ইতিবাচক চেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
সান্তিয়াগো নামে এক তরুন রাখাল বালকের মাধ্যমে পাওলো কোয়েলহো জ্ঞান, স্থিতিস্থাপকতা এবং আত্ম-আবিষ্কারের সাথে সমৃদ্ধ একটি রুপকথা গল্প তৈরি করেছেন।
এই বইটি ১৫ কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। তাছাড়া সবচেয়ে ৮১+ ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ক্লিনেস রেকর্ড অফ বুকে পাওলো কোয়েলহো নাম আছে। কারন তার এই রচিত বই ৮১+ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে যখন এর লেখক জীবিত। অন্য কোনো লেখকের বই তার জীবীত অবস্থায় এত ভাষায় প্রলাশ পায় নও।
কিন্তু এই বই নিয়ে আরেকটা মজার গল্প আছে।১৯৮৮ সালে যখন লেখক তার এই বইটি পর্তুগীজ ভাষায় প্রকাশ করে তখন তিনি মাত্র ৯০০ পিস কপি তৈরি করছিল। এর থেকে বেশি বিক্রি হতে পারে এরকম ধারনা তার ছিল না।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী এই বইটির ১৫০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। এটি সেরা ১০ টি বইয়ের স্থান পেয়েছে যে বই গুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।
আরো একটা মজার ব্যাপার হলো পাওলো কোয়েলহো এই বইটি মাত্র ১৪ দিন বা ২ সপ্তাহের ভেতর লিখে কম্পিল করেছিল।
পাওলো কোয়েলহো তার বইটি অনলাইন জগতে একদম ফ্রী করে দিয়েছিল।তার বিশ্বাস ছিল যখন মানুষ তার অনলাইন কপি পড়ে মজা পাবে তখন তারা হার্ডকপিও কিনবেন। আর সত্যি সত্যি তার এই বিশ্বাস বাস্তবে রুপায়িত হয়।
বই টির আকাশচুম্বী সফলতা দেখে হলিউড এটা নিয়ে একটা মুভি তৈরি করতে চেয়েছিল।ওয়ার্নার ব্রাদার্স নব্বইয়ের দশকে বইটির স্বত্ব কিনেছিল। কিন্তু লেখক পাওলো কোয়েলহো তাদের মুভি তৈরির ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ছিলেন।
পাওলো কোয়েলহো এর ইচ্ছে ছিল লেখক হওয়ার কিন্তু তার বাবা মা এতে রাজি হন নি। বলা হয় পরে পাওলো কোয়েলহো তার বাবা মাকে তিন বার মানসিক হাসপাতালে পাঠায়।শুধু মাত্র তাকে লেখক হতে মা দেওয়ার জন্য।
আলকেমিস্ট বই টি প্রত্যেক বছর প্রায় ১ মিলিয়ন করে বেচা হচ্ছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বইটি প্রকাশের ৩৫ বছর পরও এই বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আপনহারা মার্কিন অভিনেতা উইলি স্মিথের মাম তো শুনেই থাকবেন।তিনি তার সফলতার পেছনের গল্প শোনাতে অনেক বার এই বইয়ের নাম বলেছে।
মার্কিন টেলিভিশন উপস্থাপক ওপরা উইনফ্রি আলকেমিস্ট বই কে তার প্রিয় বইয় জায়গা দিয়েছে।
আমাদের সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নিজেও এই ধরণের অনুপ্রেরণামূলক দর্শনে বিশ্বাস করেন। অনেকেই মনে করেন রোনালদো মাদিরা থেকে ওল্ড ট্রাফোর্ড বা রিয়াল মাদ্রিদে যাত্রার গল্পটি অনেকটা সান্তিয়াগোর নিজের স্বপ্নের সন্ধানের মতোই।
তবে এই বইটা প্রথম যখন পাওলো কোয়েলহো প্রকাশের সিধান্ত নেয় তখন প্রকাশক তাকে সরাসরি না বলে দেন।প্রকাশকের মতে," এমন বই কখনো বিক্রি হবে না।" তাছাড়া এর আগেও পাওলো কোয়েলহো দুটি বই প্রকাশ করে যা ১০০ কপিও বিক্রি হয়নি।এখন আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে এই বই টি ১৫০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হলো কিভাবে?
উত্তর টা হলো এই বইটি বিশ্ববিখ্যাত প্রকাশনী হার্পার কলিন্স (Harper Collins) এর হাতে পরে।তারা এটিকে পড়ে ভালো মনে করে এবং তাদের নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করে। আর সেইখান থেকেই ১৫০ মিলিয়ন কপি বিক্রির ধুম পড়ে যায়।আর এই প্রকাশনী আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় আলকেমিস্ট বইকে আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি।বলে রাখা ভালো হার্পার কলিন্স(Harper Collins) প্রকাশনী নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি প্রকাশনী।
বইটির মূল প্লট টি আরব্য বই "সহস্র এক আরব্য রজনী" এবং বিখ্যাত সুফি কবি জালালুদ্দিন রুমির ছোট গল্প গোপন গুপ্তধন খোজা থেকে পাওলো কোয়েলহো অনুপ্রানীত হয়েছে। বইটি রুপকথার আলোকে তৈরি হলেও এর বেশি ভাগ পাঠক প্রাপ্তবয়স্করা।
বই থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা নিচে তুলে দরা হলো:
১.নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করা
২হৃদয়ের কথা শোনা
৩.আধ্যাত্মিকতা বাস্তব জীবনেরই অংশ
৪.ব্যর্থতার ভয়কে জয় করা
৫.অধ্যবসায়ী হওয়া
৬.ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া
৭.স্বপ্নপূরণে সহায়ককে ‘ভালোবাসা
৮.সত্যকে মেনে নেওয়া
দ্য আলকেমিস্ট’ বইটি কেন এত জনপ্রিয়?
বইটি আসল উদ্দেশ্য হলো নিজের স্বপ্নের পিছনে ছোটা।প্রত্যেক ব্যাক্তি চায় তার স্বপ্ন পূরন করতে কিন্তু কিভাবে করবে,কোথা থেকে করবে এগুলো কেউ জানেনা। আর লেখক পাওলো কোয়েলহো দা আলকেমিস্ট বইয় এটাকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরেচ
আপনি যদি ইন্টারনেটে “যে বইগুলো আমার জীবন বদলে দিয়েছে” লিখে অনুসন্ধান করেন, তবে অনেকেই পাওলো কোয়েলহোর লেখা ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ বইটিকে এমন একটি বই হিসেবে উল্লেখ করবেন যা আপনার জীবনকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করবে।
‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ ১৫০ পৃষ্ঠারও কম একটি ছোট উপন্যাস।এই উপন্যাস পড়তে একদিনও সময় লাগে না। এটি এমন একটি ছেলের গল্প, যে গুপ্তধন খুঁজতে এবং তার স্বপ্ন পূরণ করার উদ্দেশ্য এক যাত্রায় বের হয়। যে যাত্রায় তার এমন কিছু মানুষের সাক্ষাৎ হয় যারা তাকে জীবন সম্পর্কে তার ধারণার চেয়েও বেশি কিছু শিখিয়ে দেয়। এই বইটা আত্নউন্নয়নমূলক বই।যা আমাদের মনের ভেতর থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করবে।এই বইয়ে নায়ক সান্তায়িগো ৭ বার তার সফলতায় পৌঁছাতে হোঁচট খায় এবং প্রত্যেক বারই নতুন উদ্যম নিয়ে আবার শুরু করেন।আর ৮ম বারে তার কাঙ্ক্ষিত সফলতা তার হাতে ধরা পরে।
আলকেমিস্ট সংক্ষিপ্ত আকার তুলে ধরলাম :
সান্তিয়াগো একজন মেষপালক। তিনি তার মেস নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরায়। হঠাৎ শান্তিয়াগো একটি স্বপ্ন দেখে তাহলো "দূর পিরামিডের নিচে সে অনেক গুপ্তধন পাবে। "
এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা সবার কাছে জানতে চায়। কিন্তু কেউ তাকে বলতে পারেনা। হঠাৎ তার সাথে পরিচয় হয় এক ভদ্রমহিলা যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইলে তিনি সান্তিয়াগো কে মিশরে যেতে বলেন কারণ সেখানে তার গুপ্তধন খুঁজে পাবে। সান্তিয়াগো প্রথমে কথাটি বিশ্বাস করে না।
হঠাৎ তার সাথে দেখা হয় একটি রাজার।রাজা তাকে অনেক উপদেশ দেয় কিভাবে সে গুপ্তধন পাবে। তাকে পথপ্রদর্শক সহ দুইটি পাথর উপহার দেয় সেই রাজা যা সান্তিয়াগো কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। সান্তিয়াগো রাজার কথামতো মিশরের দিকে রওনা হয়।
এই যাত্রায় তাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিন্তু সে প্রত্যেকবারই উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। অনেকদিন ধরে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে সে পৌছায় তার স্বপ্নের মিশরে।স্বপ্নে দেখা জমিতে সান্তিয়াগো মাটি খনন করতে শুরু করে। এবং হঠাৎ তার সাথে ডাকাতের দেখা হয়। যারা তাকে জিজ্ঞেস করে সে কেন এখানে খনন করছে।
সান্তিয়াগো তখন বলে যে এর নিচে গুপ্তধন আছে। ডাকাতরা তখন সেখানে আবারও খুঁড়তে শুরু করে। শেষমেষ তারা হতাশা ফিরে যায় কারণ সেখানে কোন গুপ্তধন ছিল না। ঢাকার দলের সরদার সান্তিয়াগো কে তোমাকে কে বলছে এখানে গুপ্তধন আছে। সান্তিয়াগো তখন বলে যে আমি স্বপ্নে যুগে দেখছি এখানে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখা আছে।
ডাকাতরা তখন তাকে অনেক বকাঝকা করে এবং আঘাত করে ফেলে রেখে যায়। যাওয়ার আগে ডাকাতের সরদার বলে যায় আমিও অনেক আগে স্বপ্নে দেখেছি ছিলাম গাছটির নিচে গুপ্তধন আছে। তাই বলে আমি এত বোকা নই যে স্বপ্ন দেখাকে সত্য মনে করে সেখানে খনন কাজ শুরু করব।
ডাকাত চলে গেল। সান্তিয়াগো তখন বুঝতে পারল সে ভুল জায়গায় খুড়ছে।আর ডাকাত সরদার এর স্বপ্নে গাছের নিচে গুপ্ত ধনের কথায় বুঝতে পারল গুপ্তধন আসলে গাছটির নিচে আছে। তাই সান্তিয়াগো গাছটির নিচে খনন করতে শুরু করে এবং তার কাঙ্ক্ষিত গুপ্তধন পেয়ে যায়।
দা আলকেমিস্ট বইয়ের সেরা উক্তি গুলো নিম্নরুপ :
১.তুমি যখন কিছু চাও সমস্ত মহাবিশ্ব তোমাকে একটি অর্জনে সহায়তা করার জন্য কোমর বেঁধে নামবে।
২.তুমি যদি এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করো যা তোমার কাছে এখনো নেই তবে তুমি তা পাওয়ার ইচ্ছা হারাবে।
৩.যখন তুমি প্রথমবার তাস খেলবে তখন তোমার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৪.আমার কাছে ফাতিমা আছে, আমার জেতা সবচেয়ে বড় গুপ্তধন।
৫.মানুষের মুখে যা প্রবেশ করে তা মন্দ নয়, তাদের মুখ থেকে যা বের হয় তা মন্দ।
৬.জীবন জীবনকে আকর্ষণ করে।
৭.দুঃখ কষ্টের ভয় কষ্টের চেয়েও খারাপ।
৮.পৃথিবীতে প্রত্যেকেরই গুপ্তধন আছে যা তার জন্য অপেক্ষা করছে.।
৯.মানুষের হৃদয় কেন তাদের স্বপ্নকে অনুসরণ করতে দেয় না? কারণ এটি হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় আর হৃদয় কষ্ট পেতে পছন্দ করেনা।
১০.প্রতিটি অনুসন্ধান শুরু হয় শিক্ষানবিশের সৌভাগ্য দিয়ে।প্রতিটি অনুসন্ধান শেষ হয় বিজয়ের কঠিন পরীক্ষায়।
১১.রাতের অন্ধকারতম সময়টি ভোরে ঠিক আগে আসে ।
