জাহিদ নোটস উপন্যাসের সারসংক্ষেপে আরো একবার আমন্ত্রণ। আমাদের আজকের উপন্যাস সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’।
সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা যারা গর্ভধারিণী পড়েছেন তাদের কাছে নিশ্চয়ই জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ আর কল্যাণ—এই চারজনের নাম স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যাবার নয়। এবং সেই স্মৃতির পাতায় সেই স্মৃতির জায়গাটাকে আরো একবার ধরতে চাই এবং যারা নতুন করে শুনছেন তাদের মধ্যে গর্ভধারিণী পড়ার অনুপ্রেরণা জাগবে, সেই প্রত্যাশা রইল।
জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ আর কল্যাণ—এই চারটা ছেলে-মেয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়েছে। প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় তারা পরস্পরে বন্ধু হয়ে ওঠে। মানবিক মূল্যবোধ থেকে সমাজ সচেতনতা উঁকি দেয় সদ্য যৌবনে পা রাখা এই চার বন্ধুর, এবং সেটা স্বতন্ত্রভাবে। এবং সমাজের অসম অর্থনৈতিক যে অবকাঠামো, সেটা ভেঙে দিতে চায় তারা। সব দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে হাত-পা গুটিয়ে সেই পুরোনো মানুষদের মতো বাঁচতে তাদের বিবেকে বাধে। অন্তত কিছুটা হলেও নাড়া দিতে চেয়েছে ওরা। এই চুপসে পড়া, এই সংস্কারগ্রস্ত বাঙালি অবিচারের বিরুদ্ধে তারা কণ্ঠ তোলে। তবে ওরা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নয়, এমনকি কোনো বাম দলের সাথেও জড়িত নয়।
চারজনের ভেতর সুদীপ রগচটা, খানিকটা খেয়ালি। আনন্দ ঠান্ডা মস্তিষ্কের ছেলে; ওর কথা খুব সহজেই অন্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। আর জয়িতা বিপদে বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এবং জয়ীকে ওরা মেয়ে বলেই মনে করে না, সে যে কেবলই বন্ধু। কল্যাণ সবচেয়ে ভালো ছাত্র; সে মনে করে এখনো তার মধ্যে বহু মধ্যবিত্ত সংস্কার রয়ে গেছে। আনন্দটা ছাড়া বাকি সবার চিন্তা-ভাবনা পরিবারের সাথে অসমতুল। জয়িতার বিত্তশালী মা-বাবা ভোগ-বিলাসে মত্ত, সুদীপের বাপ অসৎ উকিল আর বিত্তহীন কল্যাণের ঘরে তেল-নুন-কাপড় নিয়ে ঝগড়া-খিস্তি চলে।
একসময় এই ভেঙে পড়া ন্যুব্জ সমাজের বিরুদ্ধে তারা অ্যাটাকে নামে। প্রথম আক্রমণ করে ‘প্যারাডাইস’-এ। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ আর অসাধারণেরা যাবতীয় অশ্লীল অনৈতিক কাজকর্মের আখড়া খুলেছিল শহরতলীতে। প্যারাডাইসের মালিকসহ চারজন নিহত এবং বাংলোটি বোমায় বিধ্বস্ত। পুলিশের সন্দেহে আসে না ওরা। প্রথমবার বেশ সফল বলা চলে।
দ্বিতীয় মিশনে ওরা একটি জাল ওষুধ কারখানায় গ্রেনেড ফাটায়। বুদ্ধি করে আগেই সব নিরীহ শ্রমিককে সরিয়ে দেয়ায় কোনো আদমের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে জয়িতার উপস্থিত বুদ্ধির কারণে কল্যাণ বেঁচে গেলেও হাত ভেঙে যায় ওর।
ঠাকুরপুকুরের এক পুরোনো বাড়িতে আশ্রয় নেয় ওরা, আর লক্ষ্য করতে থাকে মানুষের প্রতিক্রিয়া। সরকারি নেতাকর্মী বিদ্রোহী ডাকাত বললেও সাধারণ মানুষের অনেকেই বাহবা দিতে থাকে; তবে অবশ্য জনসমক্ষে নয়। একসময় পুলিশের নজরে চলে আসে এরা। ছবিসহ পত্রিকায় ছাপা হয়। পালানোর আগে এক মুন্সীকে শেষ করে যায় ওরা, যে কিনা মুখে সাম্যবাদের বুলি আওড়ায় আর ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো, সন্ত্রাসী শেল্টার, ঘুষ আদান-প্রদান—এসবই ছিল তার মূল মন্ত্র।
এবার শুরু হয় নতুন সংগ্রাম—ফেরারি জীবন। চারজনের টিম দুভাগ হয়ে শিলিগুড়ি চলে যায়। কলকাতা ছাড়ার আগে বেশ কিছু টাকা, জামাকাপড়, প্রচুর ওষুধসহ মাস দেড়েকের রসদ নিয়ে নেয় সুদীপ। শিলিগুড়ি থেকে জিপে করে দার্জিলিং। সর্বত্র পুলিশের ভয়, যেখানে-সেখানে পুলিশ হানা দেয়। তাই ওরা প্ল্যান করে ভারতীয় পুলিশের আওতার বাইরে এমন কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে। ম্যাপ দেখে নেপাল বর্ডারের চাংথাপু গ্রামকে টার্গেট করে।
ভোর না হতেই তারা দার্জিলিং হতে চলে আসে সান্দাকফুতে। ট্রেকিং করে সান্দাকফুতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ক্লান্ত, কুয়াশা সরে গিয়ে যখন তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় নয়নাভিরাম কাঞ্চনজঙ্ঘা, তাদের চোখ শীতল হয়ে আসে। সব অবসাদ মিলিয়ে যায়। মনে হয় এক হাজার বছর কাটিয়ে দেয়া যাবে এই নৈসর্গের সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে পুলিশের কাছে ধরা পড়ার ভয়—একটাকে ধরতে পারলে নেড়ি কুত্তার মতো চিবিয়ে খাবে ওরা ভালো করেই জানে; আর অপরদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমরেশ বাবুর বর্ণনা। এখানে এসে এই থ্রিল উপভোগ করতে কোনো পাঠকই কৃপণতা করবে না।
সান্দাকফু থেকে বরফের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ফালুট। এখানেই পুলিশের সর্বশেষ ফাঁড়ি। ফালুট অতিক্রম করলে আর ভারতীয় পুলিশের ভয় নেই। ফালুট থেকে ওরা হাঁটছে, হাঁটছে... প্রচণ্ড কুয়াশা, এক হাত সামনে কিছুই দেখা যায় না। হাঁটছে তো হাঁটছে সারাদিন। একসময় আনন্দ উপলব্ধি করে ওরা পথ ভুল করেছে। ফালুট থেকে চাংথাপু তিন কিলোমিটার পথ, আর ওরা কমপক্ষে ত্রিশ কিলোমিটার চলে আসার পরও কোনো গ্রামের আনাগোনা নেই। কিন্তু ফালুট ফিরে যাওয়ার শক্তি নেই আর গায়ে। তাছাড়া ওয়াংদে ছেলেটা গিয়ে বলে দিতে পারে ওদের কথা।
একসময় পাহাড়ি কিছু লোকের সাথে পরিচিত হয়ে ওরা চলে আসে তাপলেং। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একখানা গ্রাম। সভ্যজগতের আলো এখনো এখানে এসে পৌঁছায়নি। শীত বলতে এতদিন তারা যা বুঝতো সেগুলো ছিল নস্যি। এবার শুরু হয় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই। মনে হয় আজকের দিনটা বাঁচতে পারলে আর মরব না। গ্রামবাসীর সাথে একদিন থাকার চুক্তি হলেও পর্যায়ক্রমে ওরা চারজনই ওদের আপন হতে থাকে।
তাপলেংয়ের মানুষের সাথে ভাষা আদান-প্রদানের পালদেমই একমাত্র মাধ্যম। গলগণ্ড, মুখে ঘা, জ্বর-জারিতে এখানে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে, আর এরা ভাবে দানবের অভিশাপ। একদিন পালদেমের ছেলেকে জ্বর থেকে সারিয়ে তোলে আনন্দ ওদের সাথে নিয়ে আসা ওষুধগুলো দিয়ে। গ্রামবাসীরা ভাবে ওদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে। এমনকি ওদের কাহ্নুও তাদের ভক্তি করতে শুরু করে। যার যার রোগ-শোক আছে দলে দলে আসতে থাকে। এমন একসময় সবার ওষুধের ব্যবস্থা করতে গ্রামের একটি ছেলেকে নিয়ে দার্জিলিং যায় কল্যাণ। সাত দিন পর ফিরে আসার কথা থাকলেও আট দিন পর ছেলেটি কল্যাণের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে ফিরে। পুলিশের গুলিতে মারা পড়ে কল্যাণ। তবে সে ওষুধের বস্তাটা ঠিকই ছেলেটির হাতে দিতে পেরেছিল। যাওয়ার আগে রাগ করে সুদীপকে বলেছিল, ‘জীবন নিতে না পারি, জীবন বাঁচাতে তো পারব।’
আনন্দ-জয়িতা একসময় খেয়াল করল, ওরা যে সমাজব্যবস্থার কথা এতদিন ভাবছিল, এখানে সেরকম অনেকটাই আছে, শুধু একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে নিতে হবে। এখানে একজন পালা বা দলপতি আছে। এরা পিছিয়ে আছে মূলত জ্ঞানের অভাবে, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা আর রোগের প্রকোপে। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করে জয়ী, আনন্দ। কিছুদিনের ভেতর এখানকার মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমে আসে। সুদীপের টাকাগুলো কাজে লাগিয়ে ওদেরকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তুলতে থাকে। এই প্রথম ওরা টাকার মুখ দেখল।
মাঝখানে অবশ্য পুলিশের একটা ইউনিট খুঁজতে এসেছিল তাদের। তবে পালদেম, লাসিরিংরা ওদের পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে রাখে। পাশের গ্রামের লোকেরাও বাধ্য করে পুলিশকে হতাশ ফিরতে।
শীতের প্রকোপে বরফের ঝড় থেকে রক্ষা করতে আনন্দ গড়ে তোলে যৌথ ঘর, যৌথ খামার এবং যৌথ চাষবাসের ব্যবস্থা। এদিকে জয়িতা সকল নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় সজাগ করতে থাকে। একসময় গ্রামের মানুষদের চোখে ওরা দেবতুল্য হয়ে ওঠে। বছরখানিকের মধ্যে পুরো তাপলেংয়ের চেহারা ওরা পাল্টে দেয়। কৃষির ফলন তরতর করে বেড়ে যায়। পাশের গ্রামের রোলনদের সাথে প্রায় প্রায় যে ঝগড়া, খুনোখুনি, লুটপাট হতো, সেটাও জয়িতা সুন্দরভাবে মীমাংসা করে এমন এক অবস্থায় এনেছে যে দুই গ্রামে এখন যথেষ্ট শান্তি।
জয়িতাকে আদর করে তারা নাম দিয়েছে ‘ড্রিমিত’। সে এখন ওদের পোশাকই পরে। রাতে তক্তার ওপর শুয়ে ওদের মনে হয় ভারতবর্ষের বৃহৎ পরিসরে ওরা যে স্বপ্ন দেখেছে, সেটা এখানে সার্থক করতে পেরেছে। অপরপক্ষে তাপলেংবাসীরা ভয়ে থাকে, ‘হায়! ওরা চলে গেলে আমাদের কি হবে? আমরা পুনরায় নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে যাব।’ গ্রামের মানুষ যাতে নিজেরাই নিজেদের উন্নতি ত্বরান্বিত করতে পারে, সেই লক্ষ্যে গ্রামবাসীর সমর্থনে দশজনের দল নির্বাচিত হয়। গ্রামবাসীরা ড্রিমিতকেও দশজনের ভেতর টেনে নেয়। এভাবেই চলতে থাকে গল্প।
সুপ্রিয় শ্রোতা, এখানেই শেষ করছি সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস ‘গর্ভধারিণী’র সারসংক্ষেপ। ভালো থাকবেন সবাই। আগামী উপন্যাসের সারসংক্ষেপ শোনার আমন্ত্রণ। ধন্যবাদ।
