অন্ধপ্রেম - মাসুদ রানা: কাজী আনোয়ার হোসেন

 

কাজী আনোয়ার হোসেন ও এক কিংবদন্তির জন্মকথা

কাজী আনোয়ার হোসেন ও এক কিংবদন্তির জন্মকথা 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে থ্রিলার এবং গোয়েন্দা কাহিনীর জগতে এক অবিসংবাদিত নাম কাজী আনোয়ার হোসেন। সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে যে পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন, তার তুলনা মেলা ভার। আজ আমরা আলোচনা করব তাঁর অমর সৃষ্টি মাসুদ রানা সিরিজের অন্যতম রোমাঞ্চকর বই ‘অন্ধপ্রেম’ নিয়ে।

​তবে এই আলোচনাটি গভীর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাই আপনার জন্য আমি একটি বিস্তারিত আর্টিকেলের পরিকল্পনা করেছি। 

​বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের কিশোর থেকে শুরু করে প্রৌঢ়—সবার ড্রয়িংরুমে বা বালিশের নিচে একটি বইয়ের উপস্থিতি কমন ছিল, আর তা হলো ‘মাসুদ রানা’। এই স্বপ্নের কারিগর কাজী আনোয়ার হোসেন। যাঁকে ভক্তরা আদর করে ‘কাজীদা’ বলে ডাকতেন। আজ আমরা এই মহান লেখকের বর্ণিল জীবন ও কর্ম নিয়ে বিস্তারিত জানব।

​১. জন্ম ও পারিবারিক ঐতিহ্য: সংস্কৃতির আঁতুড়ঘরে বেড়ে ওঠা

​কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকার বিখ্যাত এক পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন যুক্তিনির্ভর চিন্তা এবং সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ।

​তাঁর জন্মকালীন পরিবেশ ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক। ঢাকার সেগুনবাগিচায় তাঁদের আদি বাসভবনটি ছিল লেখক-লেখিকা ও বুদ্ধিজীবীদের মিলনমেলা। কাজী আনোয়ার হোসেন বড় হয়েছেন এমন এক পরিবেশে যেখানে গান, গণিত এবং গল্প—সবকিছুই সমান্তরালভাবে চলত। তাঁর ভাইবোনদের মধ্যে অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে দিকপাল (যেমন—কাজী মোতাহের হোসেনের কন্যা সনজীদা খাতুন এবং মাহমুদা খাতুন)।

​২. শিক্ষাজীবন ও সংগীতের প্রতি অনুরাগ

​কাজী আনোয়ার হোসেনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে বিএ (অনার্স) ও এমএ সম্পন্ন করেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, লেখক হওয়ার আগে তাঁর পরিচয় ছিল একজন সুকণ্ঠী গায়ক হিসেবে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বেতারের একজন নিয়মিত সংগীতশিল্পী ছিলেন। বিশেষ করে পল্লীগীতি ও আধুনিক গানে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। তবে শেষ পর্যন্ত কলম এবং প্রকাশনার নেশা তাঁকে গানের জগৎ থেকে সরিয়ে আনে।

​৩. কর্মজীবন ও সেবা প্রকাশনীর বিপ্লব

​কাজী আনোয়ার হোসেনের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো ‘সেবা প্রকাশনী’ প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৬৩ সালের মে মাসে তিনি ‘সেগুনবাগান প্রকাশনী’ নামে এর যাত্রা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ‘সেবা প্রকাশনী’ নামে পরিচিতি পায়।

​সে সময় বাংলাদেশে বিনোদনমূলক সস্তা ও সহজলভ্য সাহিত্যের দারুণ অভাব ছিল। তিনি সেই শূন্যতা পূরণ করেন। বিদেশি ধ্রুপদী অনুবাদ এবং মৌলিক থ্রিলার উপহার দিয়ে তিনি একটি প্রজন্মকে বই পড়তে শিখিয়েছেন।

​"আমি চেয়েছিলাম মানুষ যাতে অল্প পয়সায় ভালো মানের বই পড়তে পারে।" — কাজী আনোয়ার হোসেন।


​৪. মাসুদ রানা ও কুয়াশা: অমর চরিত্র সৃষ্টি

​১৯৬৬ সালে তিনি সৃষ্টি করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ চরিত্র মাসুদ রানা। সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেন। মাসুদ রানা কেবল একটি গোয়েন্দা চরিত্র নয়, বরং এটি ছিল প্রতিটি বাঙালির কাছে সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। এছাড়াও ‘কুয়াশা’ সিরিজের মাধ্যমে তিনি রহস্য ও রোমাঞ্চকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

​৫. লেখক জীবনের চড়াই-উতরাই ও সম্মাননা

​কাজী আনোয়ার হোসেন পর্দার আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি প্রচারে বিমুখ ছিলেন। তাঁর লেখনী এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অনেকে মনে করতেন তিনি বোধহয় সত্যিকারের কোনো গোয়েন্দা। কর্মজীবনে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:

  • বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৪): শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য।
  • বাচসাস পুরস্কার: চলচ্চিত্র ও সংগীতে অবদানের জন্য।
  • একুশে পদক (মরণোত্তর): তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্র তাঁকে ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করে।

​৬. প্রয়াণ ও উত্তরসূরি

​২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি এই মহান কথাসাহিত্যিক পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অপূরণীয়। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সেবা প্রকাশনী’ আজও নতুন লেখকদের জায়গা দিচ্ছে এবং পুরনো পাঠকদের নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলছে।

​কেন কাজী আনোয়ার হোসেন আজও অতুলনীয়? 

​আপনি যদি বাংলাদেশে থ্রিলার সাহিত্যের ইতিহাস খুঁজেন, তবে সবার আগে আসবে তাঁর নাম। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সম্পাদক এবং মেন্টর। তাঁর হাত ধরেই রকিব হাসান, শেখ আব্দুল হাকিম এবং কাজী মায়মুর হোসেনের মতো জনপ্রিয় লেখকরা আত্মপ্রকাশ করেছেন।

​কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখনীতে সবসময় ভৌগোলিক সঠিকতা (Geographical Accuracy) এবং টেকনিক্যাল ডিটেইলিং থাকত। ‘অন্ধপ্রেম’ বইটিতেও আমরা দেখতে পাই কীভাবে তিনি সূক্ষ্ম তথ্যের মাধ্যমে পাঠকদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখেন।


উপরে আমরা জেনেছি সেবা প্রকাশনীর স্থপতি কাজী আনোয়ার হোসেনের বর্ণিল জীবন সম্পর্কে। এখন আমরা প্রবেশ করব তাঁর সৃষ্টি করা এক রহস্যময় ও আবেগী গোলকধাঁধায়। আমাদের আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মাসুদ রানা সিরিজের সেই অবিস্মরণীয় বই—‘অন্ধপ্রেম’

​অন্ধপ্রেম – মাসুদ রানা: দেশপ্রেম ও আবেগের এক জটিল সমীকরণ 

​মাসুদ রানা সিরিজের শত শত বইয়ের মধ্যে কিছু বই থাকে যা পাঠককে কেবল রোমাঞ্চ দেয় না, বরং মানসিকভাবে নাড়িয়ে দেয়। ‘অন্ধপ্রেম’ ঠিক তেমনই একটি বই। যেখানে স্পাই থ্রিলারের খোলসের নিচে লুকিয়ে আছে মানুষের অবদমিত আবেগ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং কর্তব্যের টানাপোড়েন।

​১. কেন লেখা হয়েছে এই বই? (পটভূমি ও উদ্দেশ্য)

​কাজী আনোয়ার হোসেন যখন ‘অন্ধপ্রেম’ লিখছিলেন, তখন মাসুদ রানা চরিত্রটি বাংলাদেশে একটি ‘আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত রানা মানেই আমরা বুঝি জেমস বন্ডের মতো অজেয় এক নায়ক। কিন্তু লেখক চেয়েছিলেন রানার ভেতরের রক্ত-মাংসের মানুষটাকে তুলে ধরতে।

​এই বইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে, একজন গোয়েন্দা বা স্পাই যখন ব্যক্তিগত আবেগ বা প্রেমের মুখোমুখি হয়, তখন তার পেশাদারিত্ব কীভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ‘অন্ধপ্রেম’ মূলত জেমস বন্ড সিরিজের ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ (Casino Royale) এর ছায়া অবলম্বনে রচিত হলেও, কাজী আনোয়ার হোসেন এতে দেশীয় প্রেক্ষাপট এবং রানার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমনভাবে মিশিয়েছেন যে এটি একটি মৌলিক স্বাদ পায়।

​২. কাদের জন্য এই বই? (টার্গেট অডিয়েন্স)

​এই বইটি কেবল অ্যাকশন প্রেমীদের জন্য নয়। এটি তাদের জন্য যারা:

  • ​থ্রিলারের সাথে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন পছন্দ করেন।
  • ​মাসুদ রানার জীবনের মানবিক ও দুর্বল দিকগুলো দেখতে চান।
  • ​যারা দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংঘাত বুঝতে আগ্রহী।
  • ​তরুণ পাঠক, যারা প্রথমবারের মতো স্পাই থ্রিলারের স্বাদ নিতে চাচ্ছেন।

​৩. কাহিনী সংক্ষেপ ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা (Experience)

​‘অন্ধপ্রেম’ শুরু হয় রানার এক বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। এক ভয়ংকর জুয়াড়ির আসরে রানাকে পাঠানো হয় দেশের স্বার্থে একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের জন্য। কিন্তু সেখানে তার দেখা হয় এমন একজনের সাথে, যে তার জীবনের সমস্ত হিসেব নিকেশ ওলটপালট করে দেয়।

​বইটির প্রতিটি পাতায় আছে সাসপেন্স। আপনি যখন পড়বেন, তখন অনুভব করবেন সেই ক্যাসিনোর ধোঁয়াটে পরিবেশ, কার্ডের চাল আর পর্দার আড়ালে চলতে থাকা ষড়যন্ত্র। রানার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটির সাক্ষী হতে হয় পাঠককে এই বইতে। অন্ধভাবে কাউকে বিশ্বাস করা বা ভালোবাসা একজন এজেন্টের জন্য কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, লেখক তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

​৪. বই লিখতে গিয়ে লেখকের চ্যালেঞ্জ (Technical & Creative Struggle)

​কাজী আনোয়ার হোসেনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রানাকে "সুপারহিউম্যান" ইমেজ থেকে বের করে আনা। ‘অন্ধপ্রেম’-এ রানা ভুল করে, রানা কাঁদে এবং রানা প্রতারিত হয়। একজন লেখকের জন্য তার প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী নায়ককে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল।

​এছাড়া, ক্যাসিনোর জটিল খেলা ‘ব্যাকারাট’ (Baccarat) এর নিয়মগুলো বাঙালি পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলা ছিল এক বিশাল টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ। তিনি এতটাই সফলভাবে তা করেছেন যে, পাঠক নিজে না খেললেও ডেস্কে বসা রানার উত্তেজনা স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারে।

​৫. কেন ‘অন্ধপ্রেম’ একটি মাস্টারপিস? 

​একজন সফল লেখকের সার্থকতা সেখানেই যেখানে তিনি পাঠককে গল্পের চরিত্রের সাথে হাসাতে বা কাঁদাতে পারেন। ‘অন্ধপ্রেম’ পড়ার পর পাঠকদের মনে রানার প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি তৈরি হয়। এখানে ভিলেন কেবল একজন অপরাধী নয়, বরং পরিস্থিতিও অনেক সময় ভিলেন হয়ে দাঁড়ায়।

​বইটির ভাষা সহজ কিন্তু শক্তিশালী। অনুবাদের ক্ষেত্রে কাজী আনোয়ার হোসেনের যে দক্ষতা, অর্থাৎ বিদেশি প্রেক্ষাপটকে দেশীয় পাঠকদের মজ্জায় ঢুকিয়ে দেওয়া—তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এই বইটি।

ব্যক্তিগত অনুভূতি

​‘অন্ধপ্রেম’ কেবল একটি বই নয়, এটি মাসুদ রানার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটি পড়ার পর আপনি রানাকে আর আগের মতো কেবল একজন ‘কিলার’ হিসেবে দেখবেন না, বরং একজন নিঃসঙ্গ যোদ্ধা হিসেবে চিনবেন।

উপরে আমরা কাজী আনোয়ার হোসেনের কিংবদন্তি জীবন এবং ‘অন্ধপ্রেম’ বইটির ভেতরের রোমাঞ্চকর জগৎ নিয়ে আলোচনা করেছি।এখন আমরা পৌঁছে গিয়েছি আমাদের এই বিশেষ আর্টিকেলের শেষ প্রান্তে। এখন আমরা দেখব কেন ‘অন্ধপ্রেম’ দশকের পর দশক ধরে পাঠকদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে এবং কেন এটি বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের এক অপরিহার্য অধ্যায়।

​অন্ধপ্রেম – মাসুদ রানা: শেষ কথা ও এক চিরন্তন ট্র্যাজেডির মহাকাব্য 

​একটি ভালো বই পড়ার পর পাঠকদের মনে যে রেশ থেকে যায়, ‘অন্ধপ্রেম’ সেই রেশ ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে আজীবন। মাসুদ রানা সিরিজের কয়েকশ বইয়ের ভিড়ে কেন এই বইটি আজও ‘কাল্ট ক্লাসিক’ হিসেবে বিবেচিত, আজ আমরা সেই রহস্যেরই উন্মোচন করব।

​১. পাঠকদের ওপর বইটির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

​মাসুদ রানা মানেই আমরা জানি—অ্যাকশন, পিস্তলের লড়াই, আর টানটান উত্তেজনা। কিন্তু ‘অন্ধপ্রেম’ বইটির সমাপ্তি পাঠকদের এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে, যা সচরাচর থ্রিলার বইতে পাওয়া যায় না। এখানে রানা জয়ী হয়েও পরাজিত। পাঠকরা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে, একজন সিক্রেট এজেন্টের জীবন কেবল রোমাঞ্চে ভরা নয়, বরং এটি চরম একাকীত্ব এবং বিসর্জনের গল্প। এই মানবিক দিকটিই বইটিকে পাঠকদের কাছে পরম নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য (Trust & Authority) করে তুলেছে।

​২. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘অন্ধপ্রেম’ ও কিশোর-তরুণ সমাজ

​সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের কিশোর ও তরুণদের কাছে মাসুদ রানা ছিল আধুনিকতা ও সাহসিকতার প্রতীক। ‘অন্ধপ্রেম’ পড়ার মাধ্যমে অনেক পাঠক প্রথম অনুধাবন করে যে, অন্ধ আবেগ কীভাবে একজন মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে পারে। বইটির শিক্ষা কেবল বিনোদন নয়, বরং বাস্তব জীবনের জটিলতা সম্পর্কে এক ধরণের সতর্কবার্তা।


​আপনি যদি গুগলে বা অন্য কোনো সার্চ ইঞ্জিনে ‘সেরা মাসুদ রানা সিরিজ’ বা ‘বাংলা রোমাঞ্চকর বই’ লিখে সার্চ করেন, তবে ‘অন্ধপ্রেম’ বইটির নাম উপরের দিকেই পাবেন। এর কারণ হলো:

  • গল্পের গাঁথুনি: এর প্লট এতটাই সুসংহত যে একে নিয়ে প্রচুর ব্লগ ও আলোচনা হয়েছে।
  • চরিত্রায়ন: রানার মানবিক সত্তা একে একটি অনন্য লিটারেচার ভ্যালু দিয়েছে।
  • ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট: কাজী আনোয়ার হোসেন যেভাবে বিদেশের পটভূমি বর্ণনা করেছেন, তাতে স্থানীয় পাঠকদের কাছে তা এক ধরণের ‘ভার্চুয়াল ট্যুর’ হিসেবে কাজ করে।

​৩. অন্ধপ্রেম: একটি সমাপ্তি নাকি নতুন শুরু?

​বইটির শেষ পাতায় এসে রানা যখন সব হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন পাঠক হিসেবে আপনার মনে হবে—এটাই কি শেষ? আসলে ‘অন্ধপ্রেম’ রানাকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এরপরের বইগুলোতে আমরা যে রানাকে পাই, সে অনেক বেশি সতর্ক এবং ইস্পাতের মতো কঠিন। তাই ‘অন্ধপ্রেম’ কেবল একটি একক গল্প নয়, এটি রানার চরিত্রের বিবর্তনের একটি মাইলফলক।

​কেন আপনি আজই ‘অন্ধপ্রেম’ পড়বেন?

​বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের এই অমূল্য রত্নটি নিয়ে আমাদের আলোচনার সারমর্ম হলো—কাজী আনোয়ার হোসেন কেবল একটি অনুবাদ বা রূপান্তর করেননি, তিনি একটি কালজয়ী আবেগের জন্ম দিয়েছেন। আপনি যদি একজন বইপ্রেমী হয়ে থাকেন, তবে ‘অন্ধপ্রেম’ আপনার সংগ্রহে থাকা আবশ্যক। এটি আপনাকে শেখাবে:

  • ​কর্তব্যের খাতিরে কতটা কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
  • ​আবেগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে চেনার ক্ষমতা।
  • ​এবং পরিশেষে, একাকীত্বের মাঝেও মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াই।

​আপনার জন্য একটি সমাপ্তি প্রশ্ন 

​মাসুদ রানার জীবনের এই যে বিয়োগান্তক অভিজ্ঞতা, আপনি কি মনে করেন রানা যদি সেই রহস্যময়ী নারীকে ক্ষমা করে দিত বা তার সাথে পালিয়ে যেত, তবে কি গল্পটি আরও সুন্দর হতো? নাকি এই বিচ্ছেদই রানাকে প্রকৃত ‘মাসুদ রানা’ করে তুলেছে?

​আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান। আপনার প্রতিটি মন্তব্য আমাদের পরবর্তী আর্টিকেলে অনুপ্রেরণা যোগাবে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন