ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু জাতি আছে, যাদের নাম শুনলেই মনের মধ্যে একটা বিশেষ ছবি ভেসে ওঠে। শিং লাগানো শিরস্ত্রাণ পরা বিশালদেহী যোদ্ধা, জ্বলন্ত গ্রামের ওপর দিয়ে ছুটে আসা লং শিপ আর নিরীহ মানুষের আর্তচিৎকার। হ্যাঁ, আমরা কথা বলছি ভাইকিংদের নিয়ে। হলিউডের সিনেমা, টেলিভিশনের সিরিজ আর শৈশবের গল্পের বইগুলো আমাদের মাথায় এই একটাই ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে ভাইকিংরা ছিল নিষ্ঠুর, বর্বর এবং শুধুমাত্র লুটপাটকারী একটি জাতি। তারা নাকি যেখানেই গেছে, সেখানেই ধ্বংস আর রক্তপাত রেখে গেছে। কিন্তু সত্যিটা কি এতটাই সরল?
ইতিহাস কখনো একরঙা হয় না এবং ভাইকিংদের ইতিহাস তো আরও বেশি জটিল, আরও বেশি বিস্ময়কর আর আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। আসলে, ভাইকিংরা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সেরা নাবিক। তারা ছিল দক্ষ ব্যবসায়ী, চতুর কূটনীতিবিদ, প্রতিভাবান কারিগর এবং অসাধারণ অভিযাত্রী।
ভাইকিংরা কি আমেরিকায় গিয়েছিল
কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রায় ৫০০ বছর আগে ভাইকিংরা উত্তর আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছিল। তারা আরব বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করেছিল, বাইজেন্টাইন সম্রাটের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছিল এবং রাশিয়া নামক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছিল। তাহলে কেন আমরা এতকাল শুধু তাদের লুটেরা হিসেবেই চিনে এসেছি? কারণটা অত্যন্ত সহজ।
ইতিহাস সবসময় বিজয়ীরা লেখে না, ইতিহাস লেখে যারা লিখতে জানে। আর মধ্যযুগে লেখাপড়া জানা মানুষদের বেশিরভাগ ছিলেন খ্রিস্টান পাদ্রি এবং সন্ন্যাসী, যারা ভাইকিংদের আক্রমণের সরাসরি শিকার। স্বাভাবিকভাবেই তারা যা লিখেছেন, তা ছিল ভয় আর ক্ষোভের কথা। কিন্তু আজ আমরা সেই একপাক্ষিক ইতিহাসের বাইরে বেরিয়ে আসব। প্রত্নতত্ত্ব, নর্স সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোয় দেখব ভাইকিংদের আসল পরিচয়।
প্রায় ৩০০ বছর ধরে এই জাতি ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের উত্তরাধিকার আজও আমাদের ভাষায়, আমাদের সংস্কৃতিতে, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও জীবিত। তাহলে চলুন, শুরু করি এই অসাধারণ যাত্রা। আজকের এই ডকুমেন্টারিতে আমরা জানব ভাইকিংদের জন্মের পেছনের বাস্তবতা, তাদের সমাজ, তাদের ধর্ম, তাদের যুদ্ধনীতি, তাদের আবিষ্কার, তাদের পতন এবং তাদের চিরস্থায়ী উত্তরাধিকারের গল্প। এটা শুধু একটি জাতির গল্প নয়, এটা মানুষের সীমাহীন সাহস আর অদম্য মনবলের গল্প।
ভাইকিংসদের জন্ম
এই গল্পটা শুরু করতে হলে প্রথমে যেতে হবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সেই কঠোর, হিমশীতল ভূমিতে, যেখানে ভাইকিং জাতির জন্ম হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা কল্পনা করুন। ইউরোপের একদম উত্তরে, যেখানে শীতকালে সূর্য মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য দেখা দেয়, যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ২০-৩০ ডিগ্রিতে নেমে যায়, যেখানে পাথুরে পর্বত আর গভীর ফিওর্ড দিয়ে ঘেরা উপকূল, সেখানে বাস করত একটি জাতি যাদের টিকে থাকতে হতো প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে।
নরওয়ে, সুইডেন আর ডেনমার্ক মিলিয়ে যে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপদ্বীপ, সেটি ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। নরওয়ের বেশিরভাগ অংশ ঢাকা পর্বতমালায়। চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত সমতল ভূমি অত্যন্ত সীমিত, মাত্র মোট ভূমির ৩ থেকে ৪ শতাংশ। সুইডেনের অভ্যন্তরীণ অংশে বিশাল বন আর জলাভূমি। ডেনমার্ক তুলনামূলকভাবে সমতল হলেও শীতের তীব্রতা এখানেও সমানভাবে প্রকট। এই পরিবেশে টিকে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
খাদ্য উৎপাদন ছিল সীমিত। ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ের ঢালে যতটুকু সম্ভব শস্য ফলাত, পশুপালন করত, কিন্তু শীতকাল এলে সেইসব মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যেত। এই সংকট প্রতিবছর ফিরে আসত এবং প্রতিবছর মানুষকে উপায় খুঁজতে হতো। কিন্তু প্রকৃতি এই মানুষদের একটা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার উপকূল ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ আর গভীর ফিয়র্ডে ভরা (ফিয়র্ড=হলো সমুদ্রের এমন একটি লম্বা, সরু ও গভীর খাঁড়ি, যার দুই পাশে খাড়া পাহাড় বা পাথুরে ক্লিফ থাকে।)।
এই ফিওর্ডগুলো পাহাড়ের ভেতরে গভীরভাবে ঢুকে থাকা সংকীর্ণ সমুদ্রপথ। এগুলো স্বাভাবিকভাবেই চমৎকার বন্দর হিসেবে কাজ করত এবং সমুদ্র ছিল খাদ্যের একটি বিশাল উৎস। মাছ ধরা ছিল অপরিহার্য। এইভাবেই এই মানুষগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো সমুদ্রের সন্তানে। সমুদ্রই ছিল তাদের জীবন, সমুদ্রই ছিল তাদের পথ এবং সমুদ্রই একদিন হয়ে উঠল তাদের পরিচয়। প্রাথমিক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সমাজ ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ভিত্তিক।
প্রতিটি গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বাস করত এবং একজন স্থানীয় নেতা বা চিফটেইনের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ হতো। জমি, পশু, মহিলা এবং সম্মানের জন্য লড়াই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এই যুদ্ধংদেহী পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই শক্ত আর সাহসী হয়ে উঠত। যুদ্ধবিদ্যা, শিকার আর সমুদ্রযাত্রা ছিল জীবনের অপরিহার্য অংশ। কাঠের প্রাচুর্য এই অঞ্চলে জাহাজ নির্মাণকে সহজ করেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা তাদের জাহাজ নির্মাণ দক্ষতা পরিমার্জন করেছে, উন্নত করেছে এবং এই দক্ষতাই একদিন পুরো পৃথিবীকে চমকে দেবে।
সমাজের এই কাঠামো, এই পরিবেশগত চাপ, এই সমুদ্রনির্ভরতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই বিস্ফোরক মিশ্রণ যা একদিন ইতিহাসের পাতায় ভাইকিং নামে পরিচিত হবে। কিন্তু শুধু পরিবেশই কি যথেষ্ট ছিল? ভাইকিং যুগের সূচনার পেছনে আরও কিছু কারণ ছিল, আরও কিছু ঘটনা ছিল যেগুলো বুঝলে পুরো চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
অষ্টম শতকের ইউরোপের দিকে একটি চোখ ফেরানো যাক। সেই সময়ের ইউরোপ ছিল অস্থির। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে ক্ষমতার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে ধীরে ধীরে নতুন রাজ্য আর সাম্রাজ্য মাথা তুলছিল। শার্লমেইনের ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। খ্রিস্টধর্ম ইউরোপ জুড়ে তার আধিপত্য বিস্তার করছিল। মঠ আর গির্জাগুলো হয়ে উঠছিল সম্পদের কেন্দ্র।
এই একই সময়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছিল। প্রথমত, জনসংখ্যা বাড়ছিল, কিন্তু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ছিল না। ফলে অনেক পরিবার, বিশেষত যারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাচ্ছিল না, তারা অন্য পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছিল। আরব বিশ্বে ইসলামী খেলাফতের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য পথগুলো নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। রুপা, মসলা, রেশম—সব কিছুরই চাহিদা ছিল। আর এই বাণিজ্যে অংশ নেওয়ার জন্য দরকার ছিল সঠিক জিনিসপত্র এবং সঠিক পথ। এই তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভাইকিংরা এই সময় তাদের জাহাজ প্রযুক্তিতে এমন একটি অগ্রগতি সাধন করল, যা তাদের সমসাময়িক যেকোনো জাতির চেয়ে এগিয়ে নিয়ে গেল।
লং শিপ: জাহাজ প্রযুক্তির এক যুগান্তকারী বিপ্লব
লং শিপ—এই নামটি শুনলেই বুকে একটা শিহরন জাগে। আগের জাহাজগুলো থেকে লং শিপ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এটি ছিল লম্বা, সরু এবং অগভীর খসড়ার একটি নৌযান, যা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়েও দ্রুত চলতে পারত এবং একই সঙ্গে অগভীর নদীতেও প্রবেশ করতে পারত। এই দ্বৈত ক্ষমতা ছিল এক অভূতপূর্ব সামরিক এবং বাণিজ্যিক সুবিধা। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা, সম্পদের সন্ধান আর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মিলিয়ে তৈরি হলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের পরিস্থিতি। এবং সেই মুহূর্ত এলো ৭৯৩ সালে।
ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে লিন্ডিসফার্ন নামের একটি ছোট্ট দ্বীপে ছিল একটি খ্রিস্টান মঠ। পবিত্র দ্বীপ নামে পরিচিত এই জায়গাটি ছিল সম্পদে পরিপুর্ণ। সোনার পাত্র, রুপার অলঙ্কার, সূক্ষ্ম কারুকাজের পোশাক, হাতির দাঁতের মূর্তি—সব কিছু মজুদ ছিল সেই মঠে। জুন মাসের এক ভোরবেলা সমুদ্রের ধূসর কুয়াশার মধ্য থেকে হঠাৎ দেখা গেল কতগুলো লম্বা, সরু জাহাজ। সেগুলো এত দ্রুত আসছিল, এত অপ্রত্যাশিতভাবে আসছিল যে মঠের মানুষদের পালানোরও সুযোগ হলো না।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ। মঠ লুণ্ঠিত, সন্ন্যাসীরা হতাহত বা বন্দী আর সেই জাহাজগুলো ততক্ষণে আবার সমুদ্রের কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা লেখা হলো আতঙ্কের ভাষায়। উত্তর থেকে এলো অজানা বিধর্মীরা।
খ্রিস্টান ইউরোপ প্রথমবার ভাইকিং আক্রমণের মুখোমুখি হলো এবং এটাই ছিল ভাইকিং যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা। পরবর্তী প্রায় তিন শতক বছর ধরে এই জাতি পুরো পৃথিবীকে নতুনভাবে গড়ে দেবে। কিন্তু এই যোদ্ধারা শুধু অভিযানে বেরিয়েই জীবন কাটাত না। তাদের দেশে, তাদের ঘরে, তাদের পরিবারের মধ্যে ছিল একটা সম্পূর্ণ জীবন, একটা সুগঠিত সমাজ।
ভাইকিং সমাজের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে তাদের শ্রেণিবিন্যাসের কথা। সমাজের একদম ওপরে ছিলেন রাজা, নর্স ভাষায় যাকে বলা হতো কুনুঙ্গর। তবে ভাইকিং যুগের প্রথম দিকে সব অঞ্চলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাজা ছিলেন না। অনেক সময় একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন শক্তিশালী জার্ল, অর্থাৎ স্থানীয় প্রভু বা আর্ল। জার্লদের নিচে ছিল কার্লরা। এরা ছিল স্বাধীন কৃষক, কার্লদের নিচে ছিল দাসরা, নর্স ভাষায় থ্রেল। এরা যুদ্ধবন্দী অথবা ঋণে ডুবে স্বাধীনতা হারানো মানুষ।
দাস ব্যবসা ছিল ভাইকিং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি নিঃসন্দেহে তাদের সভ্যতার সবচেয়ে অন্ধকার দিক। ভাইকিং সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে আমাদের আজকাল বিস্মিত হতে হয়। মধ্যযুগের ইউরোপের অন্যান্য সংস্কৃতির তুলনায় ভাইকিং নারীরা অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত। একজন ভাইকিং নারী সম্পত্তি রাখতে পারত, বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারত, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারত এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে গোটা গৃহস্থালি আর সম্পদ পরিচালনার দায়িত্ব বহন করত।
সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এমন কিছু সমাধি পাওয়া গেছে, যেখানে নারীদের পাশে সমাহিত করা হয়েছে অস্ত্র, ঢাল এবং যুদ্ধসরঞ্জাম। এই শিল্ড মেইডেন বা ঢালবাহিনী যোদ্ধা নারীদের অস্তিত্ব আজ ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কের বিষয় হলেও নর্স সাগা এবং কিছু ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক ছিল না।
ভাইকিং পরিবার
ভাইকিং পরিবারগুলো ছিল বড় এবং ঘনিষ্ঠ। বিস্তৃত পরিবারের ধারণা যেখানে তিন-চার প্রজন্ম একসঙ্গে থাকে, ছিল সাধারণ ব্যাপার। শিশুদের কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে তাদের শৈশব ছিল কঠোর। ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই শিখত তলোয়ার চালানো, নৌকা বাওয়া, শিকার করা। মেয়েরা শিখত কাপড় বোনা, রান্না, গবাদি পশু পালন এবং সংসার পরিচালনা। তবে উভয়েই শুনত নর্স পুরাণের গল্প, কবিতা আর বীরগাথা, যা তাদের পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
ভাইকিংস দের আইন
এবার আসি ভাইকিং আইন ব্যবস্থার কথায়, যা সত্যিই চমকপ্রদ। ভাইকিংদের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা ছিল যা 'থিং' নামে পরিচিত একটি সভার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। থিং ছিল মূলত একটি উন্মুক্ত সভা, যেখানে সমাজের স্বাধীন পুরুষরা একত্রিত হতো। এখানে বিরোধ মেটানো হতো, আইন প্রণয়ন করা হতো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
আইসল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত অলথিং ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সংসদগুলোর একটি। ৯৩০ সালে স্থাপিত এই সভা ছিল সত্যিকারের গণতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আইসল্যান্ডের সকল গোষ্ঠী প্রতিনিধি পাঠাত এবং সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিত। থিং শুধু আইনের জায়গা ছিল না, এটি ছিল একটি সামাজিক মিলনমেলাও।
বিভিন্ন গোষ্ঠী এখানে মিলত, বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হতো, ব্যবসায়িক চুক্তি হতো এবং খবরাখবর বিনিময় হতো।
রক্তের বদলা: সম্মান রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব
ভাইকিং সমাজে সম্মান ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একজন মানুষের সম্মান তার জীবনের চেয়েও দামি। এই কারণে রক্তের বদলা নেওয়া ছিল পরিবারের পবিত্র দায়িত্ব।
কেউ অপমানিত হলে বা কোন আত্মীয় নিহত হলে প্রতিশোধ না নিলে পরিবারের মান থাকত না। এই সমাজেই বেড়ে উঠত ভাইকিং যোদ্ধারা। এই মূল্যবোধই তাদের সাহসী, অদ্যম এবং একই সঙ্গে কঠোর করে তুলত। এই মানুষগুলো কিন্তু শুধু যুদ্ধ আর বেঁচে থাকার জন্য বাঁচত না, তাদের ছিল একটি সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক জগত। একটি পুরো মহাবিশ্বের ধারণা যা তারা নিজেরা তৈরি করেছিল।
ভাইকিংস দের দেবতা
নর্স পুরাণ পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং কল্পনাপ্রবণ পৌরাণিক ঐতিহ্যগুলোর একটি। ভাইকিংরা বিশ্বাস করত নয়টি পৃথক জগতের অস্তিত্বে, যেগুলো একটি বিশাল গাছ দিয়ে সংযুক্ত। এই গাছের নাম ইগড্রাসিল। ইগড্রাসিলের শিকড় পৌঁছে যেত সৃষ্টির একদম গভীরে, আর ডালপালা ছড়িয়ে যেত দেবতাদের রাজ্য পর্যন্ত। এই দেবতাদের রাজ্যের নাম অ্যাসগার্ড। আর সবচেয়ে উঁচুতে বসেছিলেন স্বয়ং ওডিন। ওডিন ছিলেন ভাইকিং দেবমন্ডলীর প্রধান দেবতা। জ্ঞান, যুদ্ধ, কবিতা এবং মৃত্যুর দেবতা। তার সম্পর্কে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি হলো জ্ঞান অর্জনের জন্য তার নিজের চোখ বলি দেওয়ার কাহিনী।
জ্ঞানের কুপ মিমিরের কাছ থেকে পানীয় পেতে ওডিন তার একটা চোখ উৎসর্গ করেছিলেন। এই গল্পটি ভাইকিং মূল্যবোধের একটি মূল নীতি প্রকাশ করে—জ্ঞান এবং বিজয়ের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিতেও পিছপা হওয়া উচিত নয়।
ওডিনের ছেলে থর ছিলেন বজ্র এবং শক্তির দেবতা। তার হাতুড়ি মিওলনির ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র। থর ছিলেন সাধারণ ভাইকিংদের সবচেয়ে প্রিয় দেবতা। যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে থরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করত। আজকের দিনে বৃহস্পতিবারের ইংরেজি নাম থার্সডে (Thursday) আসলে এসেছে থরস ডে (Thor's Day) থেকে।
লোকি ছিলেন সবচেয়ে জটিল চরিত্র। চালাকি, ছলচাতুরি এবং রূপান্তরের দেবতা। কখনো দেবতাদের বন্ধু, কখনো শত্রু। লোকির চরিত্রটি ছিল মানব স্বভাবের দ্বৈততার প্রতীক।
ফ্রেয়া ছিলেন প্রেম, সৌন্দর্য এবং যুদ্ধের দেবী। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন মৃত যোদ্ধাদের অর্ধেককে তার রাজ্য ফোকভাঙ্গ-এ নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাকি অর্ধেক যেতেন ওডিনের কাছে। ওডিনের সেই বাসস্থানের নাম ভালহালা। হ্যাঁ ভালহালা, সেই রহস্যময় মৃত্যুপরবর্তী জগত যার নাম আজও আমাদের কানে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়।
ভাইকিং বিশ্বাস অনুযায়ী যে যোদ্ধা যুদ্ধে বীরের মৃত্যুবরণ করত সে সরাসরি ভালহালায় যেত। সেখানে প্রতিদিন এই বীর যোদ্ধারা আবার লড়াই করত, মারা যেত, আবার জীবিত হয়ে উঠত এবং সন্ধ্যায় ভোজসভায় মিলিত হতো। এই চক্র চলত র্যাগনারকের আগ পর্যন্ত।
র্যাগনারক ছিল নর্স পুরাণের মহাপ্রলয়, দেবতা আর দানবদের মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ, যেখানে সবাই ধ্বংস হবে এবং পৃথিবী আবার নতুন করে সৃষ্টি হবে। এই ধারণাটি ছিল ভাইকিং মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পরিণতি যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়াই বীরের কাজ। এই বিশ্বাসই ভাইকিং যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে এত নির্ভীক করে তুলত।
মৃত্যুকে তারা পরাজয় মনে করত না যদি সেটি বীরের মৃত্যু হয়। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে বলিদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ উৎসব বা অভিযানের আগে পশু এবং কখনো কখনো মানুষও বলি দেওয়া হতো দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় উপসালা ছিল সবচেয়ে বড় ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রতি নয় বছর পর পর এখানে বিশাল উৎসব হতো। এই সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক জীবনই ভাইকিংদের দিয়েছিল একটি গভীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, একটি উদ্দেশ্যবোধ এবং মৃত্যুকে ভয় না পাওয়ার সাহস।
আর সেই সাহস সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠত যুদ্ধক্ষেত্রে। ভাইকিং যুদ্ধনীতি ছিল অত্যন্ত কার্যকর এবং তার সময়ের জন্য অত্যাধুনিক।
ভাইকিংসদের কি ধরনের অস্ত্র ছিল?
একজন ভাইকিং যোদ্ধার মূল অস্ত্র ছিল তলোয়ার, কুড়াল, বল্লম এবং ঢাল। তলোয়ার ছিল সবচেয়ে মূল্যবান। একটি ভালো তলোয়ার তৈরি করতে দক্ষ কারিগরের কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত এবং এর মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।
তাই তলোয়ার শুধু অস্ত্র ছিল না, এটি ছিল সম্মানের প্রতীক। কুড়াল ছিল বেশি সাধারণ এবং বেশি ব্যবহৃত। এমনকি সাধারণ কৃষকেরাও কাজের কুড়াল নিয়ে যুদ্ধে যেত। রক্ষার জন্য ব্যবহার হতো গোলাকার কাঠের ঢাল, যার কেন্দ্রে থাকত ধাতব নাভি। ধনী যোদ্ধারা পড়ত চেইন মেল, অর্থাৎ ধাতব আংটার তৈরি বর্ম। শিরস্ত্রাণও পড়ত তারা, তবে সেটি ছিল সরল গোলার্ধাকার ধাতব টুপি। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার—ভাইকিং শিরস্ত্রাণে কোনো শিং ছিল না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ মিথ, যা ১৯ শতকে ভুল চিত্রকলার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শিং লাগানো শিরস্ত্রাণ যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত অব্যবহার্য হতো। ভাইকিং যুদ্ধ কৌশলের সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল শিল্ড ওয়াল বা ঢাল দেওয়াল। যোদ্ধারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাদের ঢাল একসঙ্গে জুড়ে দিত, তৈরি করত একটি অটুট প্রতিরক্ষা দেওয়াল। শত্রুপক্ষও যদি একই কাজ করত, তাহলে তৈরি হতো একটি মুখোমুখি সংঘর্ষ যেখানে শক্তি, সংখ্যা এবং মনোবলই নির্ধারণ করত ভাগ্য। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল বারসার্কাররা।
বারসার্ক—এই শব্দটি থেকেই ইংরেজিতে এসেছে বাজার্ক (berserk) শব্দ, যার অর্থ পাগলামো বা হিংস্র আক্রমণ। বারসার্কাররা ছিল ভাইকিং এলিট যোদ্ধা। তারা যুদ্ধের আগে একটি বিশেষ ট্রান্সে প্রবেশ করত, চিৎকার করত, নিজেদের আঘাত করত, হয়তো কিছু বিশেষ উদ্ভিজ্জাত পদার্থ সেবন করত এবং তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে যেত মৃত্যুর ভয় শূন্য হয়ে।
ব্যথা অনুভব করত না, পরিস্থিতি বিচার করত না, শুধু আঘাত করত। শত্রুপক্ষের কাছে তারা ছিল আক্ষরিক অর্থেই আতঙ্ক। ভাইকিং আক্রমণের পদ্ধতিও ছিল বিশেষভাবে কার্যকর। তারা অতর্কিতে আসত, দ্রুত লুণ্ঠন করত এবং শত্রু সংগঠিত হওয়ার আগেই পালিয়ে যেত।
লং শিপের গতি এবং অগভীর খসড়া তাদের এই কাজে অসাধারণ সুবিধা দিত। সপ্তম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে ইউরোপের বেশিরভাগ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য সমুদ্রের দিক থেকে আসা যেকোনো আওয়াজ মানেই ছিল আতঙ্ক। গির্জার ঘণ্টা বাজত সতর্কবার্তা দিতে, মানুষ পালিয়ে যেত বনে, পাহাড়ে।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে একটি বিশেষ প্রার্থনা প্রচলিত হয়েছিল—হে ঈশ্বর, উত্তরের মানুষের ক্রোধ থেকে আমাদের রক্ষা করো। কিন্তু এই আক্রমণ সম্ভব করে তুলেছিল মূলত একটি জিনিস, আর সেটি হলো লং শিপ। লং শিপকে অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলগত কীর্তিগুলোর একটি, এবং এই দাবি অতিরঞ্জিত নয়।
একটি লং শিপের গঠন বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে এর নির্মাণ দর্শন। এটি ছিল মূলত হালকা এবং নমনীয়। মধ্যযুগের অন্যান্য জাহাজ ছিল ভারী, শক্ত কাঠের মোটা পাটাতন দিয়ে তৈরি। কিন্তু লং শিপ ছিল উল্টো—পাতলা কিন্তু ওভারল্যাপিং পদ্ধতিতে সাজানো কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি এর কাঠামো একটি বিশেষ নমনীয়তা দিত। এই নমনীয়তা ছিল মূল রহস্য। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে একটি কঠিন জাহাজ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু লং শিপ ঢেউয়ের সঙ্গে বাঁকত, মিশে যেত এবং ক্ষতি এড়িয়ে যেত। এটি ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে না যেয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার একটি প্রকৌশলগত দর্শন।
লং শিপের আরও একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর অগভী খসড়া। একটি পূর্ণ মাপের লং শিপ মাত্র এক থেকে দেড় মিটার গভীর পানিতে ভাসতে পারত। এর অর্থ হলো এটি সরাসরি সমুদ্র সৈকতে তীরে ভিড়তে পারত এবং নদীর গভীরে প্রবেশ করতে পারত। এই ক্ষমতাই ছিল সবচেয়ে বিপ্লবী।
ইউরোপের অনেক শহর এবং মঠ নদীর তীরে ছিল, সমুদ্র থেকে অনেক ভেতরে। তারা মনে করত সমুদ্র থেকে দূরে থাকলে নিরাপদ, কিন্তু লং শিপ নদী দিয়ে সেই অভ্যন্তরেও পৌঁছে যেত। প্যারিস নগরী নদীর তীরে, ভাইকিংরা তিন বার প্যারিস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। লং শিপ দাঁড় আর পালের সাহায্যে চলত। বাতাস থাকলে পাল তুলে দিত, না থাকলে মাঝিরা দাঁড় টানত। একটি মাঝারি লং শিপে থাকত ৬০ থেকে ৮০ জন মাঝি।
জাহাজ নির্মাণে ব্যবহৃত প্রধান কাঠ ছিল ওক। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় বনে ওক গাছের প্রাচুর্য ছিল। কারিগরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাঠের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিল। সঠিক বাঁকে সঠিক কাঠ বেছে নেওয়ার এই দক্ষতা ছিল অনন্য। লং শিপের পাল ছিল সাধারণত উলের তৈরি বা লিনেন কাপড়ের। রঙ করা হতো বিভিন্ন রঙ বা ডোরাকাটা নকশায়। দূর থেকে একটি রঙিন পাল দেখা মানে ছিল একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা নেতার আগমন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার আগে প্রস্তুতি নেওয়া হতো সুচিন্তিতভাবে।
শুকনো খাবার, বিয়ার, পানির ব্যারেল এবং অস্ত্রশস্ত্র জাহাজে তোলা হতো। পথ নির্ণয়ের জন্য তারা ব্যবহার করত সূর্যের অবস্থান, তারার দিক নির্দেশনা, সমুদ্রের রঙ আর পাখির উড়ে যাওয়ার দিক। কম্পাসের আবিষ্কারের আগেই ভাইকিং নাবিকরা এই প্রাকৃতিক সংকেতগুলো পড়ে উত্তর আটলান্টিকের অজানা জলপথ পার হয়ে গেছে। এটি শুধু সাহস ছিল না, এটি ছিল বিজ্ঞানসম্মত পর্যবেক্ষণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত জ্ঞান।
লং শিপ ছাড়া ভাইকিং বিজয় ছিল অকল্পনীয়। এটি ছিল তাদের সামরিক সুবিধা, তাদের বাণিজ্যিক হাতিয়ার এবং তাদের সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক।
এই লং শিপে চড়েই ভাইকিংরা একের পর এক ইউরোপীয় দেশে পৌঁছে যায় এবং প্রতিটি জায়গায় তারা শুধু লুট করেই চলে যায়নি, অনেক জায়গায় থেকে গেছে, বসতি গড়েছে এবং ইতিহাস পরিবর্তন করে দিয়েছে।
ইংল্যান্ডের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। ৭৯৩ সালে লিন্ডিসফার্ন আক্রমণের পর থেকে ইংল্যান্ড ছিল ভাইকিংদের প্রধান লক্ষ্যস্থলগুলির একটি। প্রথম কয়েক দশক ছিল মূলত লুটপাটের অভিযান, কিন্তু ৮৬৫ সালে সব বদলে গেল। সেই বছর এলো 'দ্য গ্রেট হিদান আর্মি'। এটি কোনো সাধারণ লুটেরা দল ছিল না, এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বিজয় বাহিনী যার নেতৃত্বে ছিলেন রাগ্নার লদব্রকের পুত্ররা। এই বাহিনী ইংল্যান্ডের পূর্ব ও উত্তর অংশ দখল করে নিল।
ইংল্যান্ডের রাজা আলফ্রেড দ্য গ্রেটের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর একটি চুক্তি হলো। ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব অংশে তৈরি হলো 'ডেনল' বা ডেনেন ল, অর্থাৎ ডেনিশ আইনের দেশ। এই অঞ্চলে ভাইকিং আইন, ভাইকিং ভাষা এবং ভাইকিং সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল।
ইংরেজি ভাষাতে ভাইকিংসদের অবদান
ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ভাইকিং প্রভাব এতটাই গভীর যে আজও ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য শব্দ আছে যার উৎস নর্স ভাষা। স্কাই (sky), নাইফ (knife), এগ (egg), উইন্ডো (window), হাজব্যান্ড (husband)—এই সব শব্দ এসেছে ভাইকিং ভাষা থেকে।
ফ্রান্সের কথা বলতে গেলে বলতে হয় সেই সীন নদীর কথা। ভাইকিং দল বারবার এই নদী ধরে প্যারিসের কাছে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা ৮৮৫ সালে, যখন সম্ভবত ৩০ হাজারের বেশি ভাইকিং সৈন্য প্যারিস অবরোধ করেছিল। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি আসে ৯১১ সালে।
ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় চার্লস একজন শক্তিশালী ভাইকিং নেতা রলোর সঙ্গে একটি চুক্তি করলেন। রলো এবং তার অনুসারীদের দেওয়া হলো ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিম অংশ। এই অঞ্চলের নাম হলো নরম্যান্ডি, অর্থাৎ নর্থ ম্যানদের দেশ। নরম্যান্ডি—এই নামটি মনে রাখুন, কারণ এই নামটিই পরবর্তী ১৫০ বছরে পুরো ইউরোপীয় ইতিহাস পাল্টে দেবে।
পূর্ব দিকে তাকালে দেখা যায় আরও বিস্ময়কর ইতিহাস। সুইডিশ ভাইকিংরা, যারা রুস নামে পরিচিত ছিল, পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। বাল্টিক সমুদ্র পেরিয়ে, রুস নদী বেয়ে তারা প্রবেশ করেছিল পূর্ব ইউরোপে। স্থানীয় স্লাভিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে তারা নোভগোরোদ এবং কিয়েভে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কিইভান রুস—এটিই হলো আধুনিক রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের ঐতিহাসিক ভিত্তি। রাশিয়া নামটি এসেছে সম্ভবত সেই রুস থেকেই। এই পথে যেতে যেতে রুস ভাইকিংরা পৌঁছে গেল কনস্টান্টিনোপল, অর্থাৎ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানীতে। বাইজেন্টাইন সম্রাটরা ভাইকিং যোদ্ধাদের বিশ্বস্ততা এবং যুদ্ধ ক্ষমতার কথা শুনেছিলেন। তারা এই যোদ্ধাদের নিজেদের বিশেষ দেহরক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ দিলেন। এই বাহিনীর নাম ছিল ভারাঙ্গিয়ান গার্ড।
সম্রাটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রক্ষীবাহিনী। নর্স সাগাগুলোতে এই গার্ডের সেবা করাকে মনে করা হতো সর্বোচ্চ সম্মানের। আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডেও ভাইকিং আক্রমণ এবং বসতি স্থাপন হয়েছিল। ডাবলিন শহরের প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন মূলত ভাইকিং। বর্তমান আয়ারল্যান্ডের অনেক শহরের নাম নর্স ভাষায়। ইউরোপ জয়ের এই কাহিনী অসাধারণ। কিন্তু ভাইকিংদের সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযান ছিল পশ্চিম দিকে, সেই অজানা আটলান্টিকের দিকে যেখানে তখন পরিচিত পৃথিবীর শেষ বলে মনে করা হতো। এই অভিযানের শুরু হয়েছিল ধাপে ধাপে।
প্রথমে আইসল্যান্ড। ৮৭৪ সালের দিকে নরওয়েজিয়ান ভাইকিংরা আইসল্যান্ডে স্থায়ী বসতি স্থাপন করল। এই দ্বীপটি আগে থেকেই মাঝে মাঝে আইরিশ সন্ন্যাসীরা পরিচিত ছিলেন, কিন্তু স্থায়ী বসতি গড়েননি। ভাইকিংরা সেই শূন্য ভূমিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজ গড়ে তুলল। আইসল্যান্ড আগ্নেয়গিরির দ্বীপ, কঠোর পরিবেশ, কিন্তু সমুদ্রে মাছের প্রাচুর্য এবং বিস্তৃত চারণভূমি ছিল। ভাইকিংরা ধীরে ধীরে এই দ্বীপে গড়ে তুলল নিজেদের সমাজ এবং সেই বিখ্যাত অলথিং সংসদ। কিন্তু কিছু বিদ্রোহী আত্মা এখানেও থামল না।
এরিক থরভালদসন, পরিচিত নাম এরিক দ্য রেড, তার লাল চুলের কারণে এই নাম। আইসল্যান্ডে একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলেন এবং তিন বছরের জন্য নির্বাসিত হলেন। সেই নির্বাসনের তিন বছরে এরিক যা করলেন, তা ইতিহাস বদলে দিল। তিনি পশ্চিম দিকে যাত্রা করলেন এবং খুঁজে পেলেন একটি বিশাল দ্বীপ। এই দ্বীপের অনেকটাই বরফে ঢাকা, তবে পশ্চিম উপকূলে কিছু সবুজ চারণভূমিও আছে।
এরিক চতুর ছিলেন, তিনি এই দ্বীপের নাম দিলেন গ্রিনল্যান্ড, অর্থাৎ সবুজ দেশ। কারণ সুন্দর নাম শুনলে বেশি মানুষ আসতে রাজি হবে। কৌশলটা কাজ করল—আইসল্যান্ড থেকে অনেক পরিবার গ্রিনল্যান্ডে গেল, সেখানে দুটো বড় বসতি গড়ে উঠল। কয়েক শতক ধরে ভাইকিংরা গ্রিনল্যান্ডে বাস করল। কিন্তু এরিকের পুত্র লিফ এরিকসন আরও এগিয়ে গেলেন।
প্রায় ১০০০ সাল নাগাদ লিফ এরিকসন গ্রিনল্যান্ড থেকে পশ্চিমে যাত্রা করলেন। বলা হয় কিছুটা আকস্মিকতাই, হয়তো ঝড়ে পথ হারিয়ে, হয়তো অ্যাডভেঞ্চারের তৃষ্ণায়। এবং তিনি পৌঁছলেন এক অজানা ভূমিতে। সেই ভূমির নাম তিনি রাখলেন ভিনল্যান্ড, কারণ সেখানে নাকি প্রচুর বুনো আঙুর ফলের লতা দেখা গেছে। এটি উত্তর আমেরিকার নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছাকাছি অঞ্চল বলে আধুনিক গবেষকরা মনে করেন।
কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে লঁস ও মেডোজ (L'Anse aux Meadows) নামের একটি স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করে পাওয়া গেছে ভাইকিং বসতির স্পষ্ট নিদর্শন। কাঠের ঘরবাড়ি, লোহার তৈরি বস্তু, নৌকা মেরামতের সরঞ্জাম—এগুলোর বয়স প্রায় হাজার বছর।
কলম্বাস তথাকথিতভাবে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন ১৪৯২ সালে, ভাইকিংরা গিয়েছিল ৫০০ বছর আগে। তাহলে কেন ভাইকিংরা আমেরিকায় স্থায়ী বসতি গড়তে পারল না? কারণ ছিল কয়েকটি—প্রথমত, স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক, ভাইকিংরা তাদের নর্স ভাষায় স্ক্রেলিং বলে ডাকত। প্রথমে কিছু বাণিজ্য হলেও দ্রুতই সহিংসতা শুরু হলো। ভাইকিংদের তুলনায় স্থানীয় জনসংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
দ্বিতীয়ত, দূরত্ব—গ্রিনল্যান্ড থেকে ভিনল্যান্ড অনেক দূর, নিয়মিত সরবরাহ ও যোগাযোগ রক্ষা করা ছিল কঠিন। তৃতীয়ত, গ্রিনল্যান্ডের বসতিগুলো নিজেরাই বেঁচে থাকার সংগ্রামে ছিল। ভিনল্যান্ড পরিত্যক্ত হলো, কিন্তু সেই যাত্রার স্মৃতি রয়ে গেল নর্স সাগায়, পাথরে লেখা রুন লিপিতে এবং শেষ পর্যন্ত আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে।
ভাইকিংরা শুধু যোদ্ধা ছিল না, শুধু অভিযাত্রী ছিল না, তারা ছিল অসাধারণ ব্যবসায়ীও। বরং বলা যায়, বেশিরভাগ ভাইকিং যারা সমুদ্রে বেরোত তারা প্রথমে ব্যবসায়ী। আক্রমণ ছিল সুযোগ পেলে, ব্যবসা ছিল উদ্দেশ্য। ভাইকিং বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ছিল অবিশ্বাস্য রকম বিস্তৃত। পশ্চিমে আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড থেকে শুরু করে পূর্বে কনস্টান্টিনোপল, এমনকি বাগদাদ পর্যন্ত। স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে রপ্তানি হতো পশম, হাতির দাঁত, অ্যাম্বার, ওয়ালরাস শিং, মাছ এবং দাস। বিনিময়ে আসত রুপা, মসলা, রেশম, মদ, কাঁচ এবং বিভিন্ন বিলাসবহুল পণ্য। রুপা ছিল মুদ্রার বিকল্প।
ভাইকিং ব্যবসায়ীরা রুপার টুকরো বা মোচড় দিয়ে পেঁচানো রুপার বার বহন করত, ওজন করে বিনিময় হতো। ইসলামী খেলাফতের সঙ্গে ভাইকিং বাণিজ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভলগা নদীপথে রুস ভাইকিংরা বাগদাদ পর্যন্ত পৌঁছাত। বাগদাদের খেলাফত তখন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ কেন্দ্রগুলোর একটি। আরব পরিব্রাজক ইবনে ফাদলান ৯২২ সালে রুস ভাইকিংদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছিলেন এবং বিস্তারিত বিবরণ লিখেছিলেন। তার লেখায় ভাইকিং ব্যবসায়ীদের বর্ণনা পাওয়া যায়।
তিনি লিখেছিলেন যে তারা অসাধারণ শক্তিশালী, লম্বা এবং তারা প্রতিদিন সুন্দরভাবে পোশাক পরে। তার বর্ণনায় একটি ভাইকিং নেতার সমাধি অনুষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণও আছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় খনন করে পাওয়া মুদ্রার মধ্যে অনেকেই আরব দিরহাম। কিছু মুদ্রায় পাওয়া গেছে আরবীয় অক্ষর, এমনকি কিছু গহনায় আরবী লিপি উৎকীর্ণ পাওয়া গেছে। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সভ্যতা—একটি উত্তরের বরফের দেশ থেকে এবং অন্যটি মরুভূমির মাঝের সমৃদ্ধ খেলাফত বাণিজ্যের সুতোয় বাঁধা পড়েছিল।
ভাইকিং বাণিজ্যিক শহরগুলো ছিল জমজমাট—হেডেবি, বিরকা, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় ও বিদেশী ব্যবসায়ীরা মিলত। ভাষা, সংস্কৃতি এবং পণ্যের এক অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল এই শহরগুলোতে। ভাইকিংরা শুধু নিজেরা ভ্রমণ করেনি, তারা পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাভাবনা, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক উপাদানও পরিবহন করেছে। এই অর্থে তারা ছিল মধ্যযুগের বৈশ্বিকায়নের অন্যতম প্রধান কারিগর।
কিন্তু প্রতিটি যুগেরই একটি সমাপ্তি আসে। ভাইকিং যুগও এর ব্যতিক্রম ছিল না। একসময়ের সর্বশক্তিমান ভাইকিং শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকল এবং এই পতনের পেছনে ছিল কয়েকটি কারণ।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ। নবম শতাব্দীর শেষ থেকে ধীরে ধীরে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাজারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করলেন। এই ধর্মান্তরের পেছনে ছিল রাজনৈতিক কারণও। ইউরোপীয় খ্রিস্টান রাজাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইলে খ্রিস্টধর্মী হওয়া ছিল সহজ পথ।
ডেনমার্কের রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথ—হ্যাঁ আমাদের পরিচিত ব্লুটুথ প্রযুক্তির নাম এসেছে তাঁরই নাম থেকে—তিনি দশম শতাব্দীতে ডেনমার্কে খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করেছিলেন।
নরওয়েতে রাজা ওলাফ ট্রাইগভাসন এবং পরে ওলাফ হ্যারাল্ডসন জোর করে খ্রিস্টধর্ম প্রসার করেছিলেন। মঠ, গির্জা তৈরি হলো, পুরনো মন্দির ভাঙা হলো, ওডিন আর থরের পরিবর্তে ক্রুশ স্থান নিল। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসলো মানসিকতায়। গির্জা লুটপাট ছিল ভাইকিংদের একটি প্রধান কাজ, কিন্তু নিজেরা খ্রিস্টান হলে আর অন্য খ্রিস্টান গির্জা লুটপাট করা যায় না, অন্তত ধর্মীয়ভাবে বৈধ থাকে না।
দ্বিতীয় কারণ হলো স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্রের উদ্ভব। আগে স্থানীয় জার্ল এবং চিফটেইনরা স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনা করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাজা উঠে আসলেন। তারা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেন, স্বেচ্ছাচারী অভিযান কমে গেল।
তৃতীয় কারণ হলো ইউরোপীয় প্রতিরোধ শক্তির বৃদ্ধি। প্রথম দিকে ইউরোপীয় দেশগুলো ভাইকিং আক্রমণের মোকাবেলা করতে পারত না, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা শিখল। পাথরের দুর্গ তৈরি হলো, উপকূলে প্রহরা বসল। সেতু তৈরি হলো নদীপথে ভাইকিং জাহাজ আটকে দিতে। ক্যাভালরি বা অশ্বারোহী বাহিনী শক্তিশালী হলো। ভাইকিংদের অতর্কিত আক্রমণের সুবিধা ক্রমে কমে গেল।
চতুর্থ কারণ ছিল অর্থনৈতিক। ইউরোপের বাণিজ্য পথ ও ব্যবস্থা পরিবর্তিত হলো। মুদ্রা অর্থনীতি শক্তিশালী হলো, লুটের চেয়ে বৈধ বাণিজ্য হয়ে উঠল বেশি লাভজনক। এই সব কারণ মিলিয়ে ভাইকিং যুগ তার প্রভাব হারাতে থাকল এবং সব কিছুর পরিসমাপ্তি ঘটল।
১০৬৬ সালে একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধে ইংল্যান্ডের সিংহাসনের দাবি করে নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ড হার্ডরাডা সেনাবাহিনী নিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমণ করলেন। ইংরেজ রাজা হ্যারাল্ড গডউইনসন তার মোকাবেলা করতে ছুটলেন উত্তরে। ২৫শে সেপ্টেম্বর ১০৬৬, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনী নরওয়েজিয়ানদের সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করল। হ্যারাল্ড হার্ডরাডা নিহত হলেন। এটিই শেষ বড় ভাইকিং সামরিক অভিযান যা পরাজয়ে শেষ হলো। ঐতিহাসিকরা স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধকেই ভাইকিং যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই হেস্টিংসের যুদ্ধে নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম ইংল্যান্ড জয় করেন। আর এই উইলিয়াম কিন্তু রলোর বংশধর, ভাইকিং রক্তের উত্তরাধিকারী। সেই অর্থে ভাইকিং প্রভাব ১০৬৬ সালে শেষ হয়নি, বরং রূপ বদলে চলতে থেকেছে। ভাইকিং যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার শেষ হয়নি। বরং তাদের প্রভাব আজও আমাদের চারপাশে এতটাই গভীরভাবে মিশে আছে যে আমরা সাধারণত টের পাই না।
ভাইকিংসদের ব্যবহৃত শব্দ যা এখন ইংরেজিতে ব্যবহার করা হয়
ভাষার কথা দিয়েই শুরু করা যাক। ইংরেজি ভাষায় প্রায় হাজারের বেশি শব্দ এসেছে নর্স ভাষা থেকে। কিছু উদাহরণ দিই—অ্যাঙ্গার (anger), ব্যাগ (bag), বারসার্ক (berserk), ব্লান্ডার (blunder), কেক (cake), কল (call), কাস্ট (cast), ক্লাব (club), ডার্ট (dirt), এগ (egg), ফেলো (fellow), ফ্ল্যাট (flat), ফ্লাউন্ডার (flounder), ফ্রেকল (freckle), গেপ (gape), গ্যাপ (gap), গেট (gate), গিট (get), গিভ (give), হ্যাপ (hap), হাজব্যান্ড (husband), ইল (ill), নাইফ (knife), ল (law), লেগ (leg), লিফট (lift), লোন (loan), লুজ (loose), লাম্প (lump), মিক (meek), মাক (muck), অড (odd), রেস (race), রেজ (raise), রটেন (rotten), রাগড (rugged), সেম (same), স্ক্যান্ট (scant), স্কেয়ার (scare), স্কাউল (scowl), স্কিন (skin), স্কাল (skull), স্কাই (sky), স্লটার (slaughter), স্লিক (sleek), স্নেয়ার (snare), স্প্রিন্ট (sprint), স্ট্যাগার (stagger), টেক (take), দেয়ার (their), দেম (them), দে (they), থ্রিল (thrill), টাইট (tight), ট্রাস্ট (trust), আগলি (ugly), ওয়ান্ট (want), উইক (weak), উইন্ডো (window), উইং (wing), রং (wrong)।
এই শব্দগুলো প্রতিদিন আমরা ব্যবহার করি এবং জানি না যে এগুলো এসেছে সেই উত্তরের মানুষদের কাছ থেকে। সপ্তাহের নামের কথা বলি—টিউজডে (Tuesday) এসেছে নর্স দেবতা টিউর থেকে, ওয়েনসডে (Wednesday) এসেছে ওডিনের অন্য নাম ওডেন থেকে, থার্সডে (Thursday) এসেছে থর থেকে এবং ফ্রাইডে (Friday) এসেছে ফ্রিগা বা ফ্রেয়া থেকে। ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে ভাইকিং প্রভাব অপরিসীম।
নরম্যান্ডি থেকে আসা নরম্যানরা ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড জয় করে। এই নরম্যান বিজয় ইংল্যান্ডের রাজনীতি, আইন, ভাষা এবং সংস্কৃতিকে চিরতরে বদলে দেয়। নরম্যানরাই ইংল্যান্ডে পার্লামেন্টের ভিত্তি ঢাকেন। নরম্যানরা একই সময় দক্ষিণ ইতালি এবং সিসিলিও জয় করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রুসেড আন্দোলনে নরম্যান নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ভিত্তি যে কিইভান রুস, তার প্রতিষ্ঠায় ভাইকিং ভূমিকার কথা আগেই বলেছি। আধুনিক রাশিয়া এবং ইউক্রেনের নামও সেই ভাইকিং ঐতিহ্য বহন করছে। আইসল্যান্ডের অলথিং আজও পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সক্রিয় সংসদ। আইসল্যান্ডের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভাইকিং সভ্যতার সরাসরি উত্তরাধিকার।
আধুনিক জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ভাইকিংদের উপস্থিতি বিশাল। মার্ভেল সিনেমার থর এবং লোকি, টিভি সিরিজ ভাইকিংস, লাস্ট কিংডম, দ্য উইচার, বহু ভাইকিং উপাদান থেকে নিয়েছে।
নর্স পুরাণ আজও লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং গেম ডিজাইনারদের অনুপ্রেরণার উৎস। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সিনেমা এবং টেলিভিশনের ভাইকিং আর বাস্তবের ভাইকিং এক নয়। শিং লাগানো শিরস্ত্রাণ নেই, অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা অতিরঞ্জিত। বাস্তবে তারা ছিল অনেক বেশি সূক্ষ্ম, অনেক বেশি বিচক্ষণ এবং অনেক বেশি মানবিক। প্রত্নতত্ত্ব আমাদের বাস্তব চিত্র দিচ্ছে।
ভাইকিং বসতির খনন থেকে পাওয়া যাচ্ছে সূক্ষ্ম গহনা, খেলার ছক, শতরঞ্জের মোহরা, লেখার স্তম্ভ, রঙিন কাপড়ের নমুনা। এগুলো কোনো বর্বর জাতির নিদর্শন নয়, এগুলো একটি পরিশীলিত সভ্যতার প্রমাণ। ভাইকিং সাহিত্য, বিশেষত নর্স সাগাগুলো মানব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ।
নিজেলস সাগা, ভলসুঙ্গা সাগা, এই রচনাগুলোতে প্রেম, প্রতিশোধ, বিশ্বাসঘাতকতা, বীরত্ব এবং ভাগ্যের জটিল বুনন আছে। জে. আর. আর. টলকিয়েন তাঁর মিডল আর্থের অনেক উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন এই নর্স পুরাণ থেকে। এবং এখন আমরা এসে পৌঁছেছি আমাদের যাত্রার শেষ প্রান্তে।
ইতিহাসের পথ দিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছি আমরা। সেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমশীতল উপকূল থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকার অজানা তীর, আরবের মরুভূমির শহর থেকে বাইজেন্টাইনের সোনালী গম্বুজ পর্যন্ত। প্রশ্নটা ছিল একটাই—ভাইকিংরা আসলে কারা ছিল?
এই দীর্ঘ যাত্রার পর উত্তরটা কি এখন স্পষ্ট? হ্যাঁ, তারা লুটপাট করেছিল; হ্যাঁ, তারা হত্যা করেছিল; হ্যাঁ, তারা দাস ব্যবসা করেছিল। এই সত্যগুলো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং করা উচিতও নয়। কিন্তু এটাই কি সম্পূর্ণ সত্য?
একেবারেই না। ভাইকিংরা ছিল সেই মানুষ যারা স্রেফ বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে থেকে পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পরিবেশে এমন একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল যা সমকালীন ইউরোপের যেকোনো সংস্কৃতির সমতুল্য ছিল। তারা ছিল সেই মানুষ যারা কম্পাস ছাড়া, জিপিএস ছাড়া, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া আটলান্টিকের অজানা জলে ঝাঁপ দিয়েছিল।
যারা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তারা ছিল সেই মানুষ যারা মধ্যযুগে গণতান্ত্রিক সভা পরিচালনা করেছিল, যাদের সমাজে নারীরা তুলনামূলক বেশি অধিকার ভোগ করত। তারা ছিল সেই মানুষ যাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অবদান আজও পৃথিবীর বহু দেশে জীবিত।
রাশিয়া নামটি আছে, ইংরেজি ভাষায় হাজার শব্দ আছে, সপ্তাহের চারটি দিনের নামে তাদের দেবতারা আছে, নরম্যান্ডি আছে, আইসল্যান্ডের সংসদ আছে—এগুলো কোনো বর্বর জাতির উত্তরাধিকার নয়, এগুলো একটি অসাধারণ সভ্যতার ছাপ।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষের যে অদম্য সাহস, যে জানা-অজানা সীমানা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার তৃষ্ণা, যে কঠিন পরিস্থিতিতেও হার না মানার মনোবল, সেটি ভাইকিংদের চরিত্রের কেন্দ্রে ছিল। একটা মুহূর্তের জন্য চিন্তা করুন সেই নাবিকের কথা যে প্রথমবার আটলান্টিকের দিকে তার লং শিপ ঘুরিয়েছিল। সামনে ছিল অজানা সমুদ্র, ইউরোপের মানচিত্রে সেই দিকে লেখা ছিল 'এখানে দানব আছে', পেছনে ছিল পরিচিত ঘর—সে এগিয়ে গিয়েছিল।
এই এগিয়ে যাওয়ার সাহসটাই হলো ভাইকিং আত্মার সারকথা। এটাই তাদের আলাদা করে দেয়, এটাই তাদের ইতিহাসে অমর করে দিয়েছে। আজ থেকে হাজার বছর পরে যখন মানবজাতি মহাকাশের অজানায় প্রথম পদক্ষেপ দেয়, যখন কোনো বিজ্ঞানী অজানা রোগের চিকিৎসা আবিষ্কারে রাতের পর রাত কাজ করে, যখন কোনো সাধারণ মানুষ অসাধারণ পরিস্থিতিতে হার না মেনে লড়ে যায়, সেই প্রতিটি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ভাইকিং আত্মার একটা প্রতিধ্বনি থেকে যায়।
উত্তরের মানুষদের ক্রোধ থেকে রক্ষা করো—এই প্রার্থনা করেছিল ভয়ার্ত ইউরোপ। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখে অন্য কথা, মনে রাখে সেই নির্ভীক অভিযাত্রীদের কথা যারা অজানার পথে বেরিয়ে পড়েছিল, যারা বিশ্বকে ছোট করে দিয়েছিল এবং আজকের পৃথিবী তার ভাষায়, তার ইতিহাসে, তার সীমানায় সেই সাহসী মানুষদের কাছে চিরঋণী।
ভাইকিংরা লুটেরা ছিল না, ভাইকিংরা ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিযাত্রী, সবচেয়ে দুঃসাহসী নাবিক, সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা নির্মাতাদের একটি এবং তাদের গল্প আরও অনেক কারণে আজও চলমান।
এই অসাধারণ ইতিহাসের যাত্রায় আপনাদের সঙ্গী হতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ। ইতিহাসের এমন আরও অনেক অজানা গল্প নিয়ে আমরা আসব, তাই আমাদের আর্টিকেলটি আপনার পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন, কারণ ইতিহাস শুধু পাঠ্যপুস্তকে নয়, ইতিহাস লুকিয়ে আছে আমাদের প্রতিটি দিনের মধ্যে।
