জুতো পরলেই বিপদ! এক রহস্যময় গ্রাম
পায়ের সুরক্ষা মানেই দামী ব্র্যান্ডের স্নিকার্স বা মজবুত বুট। কিন্তু ভারতের মানচিত্রের এক কোণে এমন এক জনপদ রয়েছে, যেখানে এই ধারণাটি পুরোপুরি উল্টো। যেখানে মাটির স্পর্শই হলো পরম পবিত্রতা। আজ আমরা জানবো তামিলনাড়ুর মাদুরাই জেলার সেই রহস্যময় গ্রাম আন্দামানপুট্টি (Andamanpatti) সম্পর্কে, যেখানে বংশপরম্পরায় মানুষ জুতো পরাকে ‘পাপ’ মনে করেন।
১. ঐতিহ্যের আঙিনায় এক কদম: আন্দামানপুট্টির প্রথম দর্শন
ভেবে দেখুন তো, চৈত্র মাসের তপ্ত দুপুর। পিচঢালা রাস্তা আগুনের মতো গরম, কিংবা বর্ষার কর্দমাক্ত পথ—আপনার পায়ে কোনো জুতো নেই। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে, তাই না? ইটের টুকরো বা কাঁচের কুচি লাগার ভয়ে আমরা তো ঘরের বাইরে এক কদমও জুতো ছাড়া কল্পনা করতে পারি না।
কিন্তু আন্দামানপুট্টি গ্রামে প্রবেশ করলে আপনার এই চিরচেনা অভ্যাসটি এক নিমেষে বদলে যাবে। গ্রামের সীমানায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই আপনি দেখবেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। ধনী-দরিদ্র, আবালবৃদ্ধবনিতা—সবার পা খালি। এমনকি যারা দামি গাড়িতে করে গ্রামে প্রবেশ করেন, তারা গাড়ি থেকে নামার আগেই জুতো জোড়া খুলে হাতে নিয়ে নেন। এটি কোনো জোরজবরদস্তি নয়, বরং কয়েকশো বছরের এক অটল বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
২. ভৌগোলিক অবস্থান ও পৌঁছানোর উপায়
মাদুরাই—যাকে বলা হয় মন্দিরের শহর। এই ঐতিহাসিক শহর থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রাম আন্দামানপুট্টি। গ্রামটি মূলত কৃষিপ্রধান হলেও এর পরিচিতি এখন বিশ্বজুড়ে।
- কীভাবে যাবেন: মাদুরাই বিমানবন্দর বা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্যাক্সি বা লোকাল বাসে করে খুব সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। গ্রামের চারপাশে সবুজ ফসলের ক্ষেত আর নারকেল গাছের সারি আপনাকে এক শান্তিময় পরিবেশের জানান দেবে। তবে মনে রাখবেন, গ্রামের মূল ফটক বা সীমানা চিহ্নের কাছে পৌঁছালেই আপনার সাধের জুতো জোড়া খুলে ফেলতে হবে।
৩. কেন এই অদ্ভুত নিয়ম? ভক্তি ও লোকগাথার মিশেল
অনেকে ভাবতে পারেন, হয়তো চরম দারিদ্র্যের কারণে এই গ্রামের মানুষ জুতো পরেন না। কিন্তু বাস্তবতা একদম ভিন্ন। আন্দামানপুট্টির মানুষ বেশ স্বচ্ছল, শিক্ষিত এবং আধুনিক মনস্ক। অনেকেই বড় বড় সরকারি-বেসরকারি পদে কর্মরত। তবুও কেন এই নিয়ম? এর মূলে রয়েছে তাদের পরম আরাধ্য দেবতা মুথুয়্যালসামি (Muthuyalsamy)।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, পুরো আন্দামানপুট্টি গ্রামটি দেবতা মুথুয়্যালসামির পায়ের নিচের পবিত্র ভূমি। তারা মনে করেন, জুতো পরে গ্রামের মাটিতে হাঁটা মানে সরাসরি দেবতাকে অপমান করা। তাদের মতে, চামড়া বা কৃত্রিম উপাদানে তৈরি জুতো অপবিত্র, যা গ্রামের পবিত্রতা নষ্ট করে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। যুগ যুগ ধরে এই বিশ্বাসটি তাদের রক্তে মিশে গেছে।
৪. ছোটবেলা থেকেই এক অনন্য পাঠ
এই গ্রামের শিশুদের জন্য জুতো না পরা কোনো নিয়ম নয়, বরং এটি তাদের জীবনযাত্রার অংশ। প্রচণ্ড রোদে যখন খুদে স্কুলপড়ুয়ারা খালি পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যায়, তখন কোনো পর্যটক তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা এক গাল হেসে উত্তর দেয়, "এটা তো আমাদের ভক্তি, এতে কোনো কষ্ট নেই।" মাটির সাথে এই যে নিবিড় সম্পর্ক, তা তারা শৈশব থেকেই রপ্ত করে নেয়। ফলে তাদের পা অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত ও সহ্যক্ষমতাসম্পন্ন।
৫. বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস: খালি পায়ে হাঁটার বিস্ময়কর উপকারিতা
গ্রামবাসীরা হয়তো ভক্তির টানে জুতো পরেন না, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এই ‘আন্দামানপুট্টি লাইফস্টাইল’-এর পেছনে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক খুঁজে পায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Grounding’ বা ‘Earthing’।
- রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি: খালি পায়ে হাঁটলে পায়ের পাতার বিশেষ কিছু স্নায়ু সক্রিয় হয়, যা পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়।
- মানসিক প্রশান্তি: মাটির সাথে সরাসরি সংযোগ মানুষের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
- শরীরের ভারসাম্য: জুতো ছাড়া হাঁটলে পায়ের পেশিগুলো প্রাকৃতিক গঠনে শক্তিশালী হয়, যা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। আন্দামানপুট্টির মানুষের দীর্ঘায়ু এবং সুস্বাস্থ্যের পেছনে এই ‘খালি পায়ে হাঁটা’ বড় ভূমিকা রাখে বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
৬. বার্ষিক উৎসব: যখন ভক্তি জনসমুদ্রে রূপ নেয়
আন্দামানপুট্টির আসল রূপ দেখা যায় তাদের বার্ষিক উৎসবের সময়। এই সময় পার্শ্ববর্তী গ্রাম এবং দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ দেবতাকে প্রণাম জানাতে আসেন। উৎসবের কয়েকদিন পুরো গ্রাম এক মেলায় পরিণত হয়। মজার বিষয় হলো, বাইরের হাজার হাজার মানুষ যখন গ্রামে প্রবেশ করেন, তারাও কোনো প্রশ্ন ছাড়াই জুতো বাইরে রেখে আসেন। শত শত মানুষের পদচারণায় মুখরিত গ্রামটিতে তখন এক অদ্ভুত নীরব ভক্তি খেলা করে। মাটির ধুলো তখন আর ময়লা থাকে না, হয়ে ওঠে দেবতার আশীর্বাদ।
৭. পরিবর্তনশীল সমাজ ও বর্তমান প্রজন্ম
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, নতুন প্রজন্মের তরুণরা কি এই নিয়ম মেনে চলছে? উত্তর হলো—হ্যাঁ, তবে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে।
গ্রামের অনেক যুবকই এখন মাদুরাই বা চেন্নাইয়ের মতো শহরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তারা যখন কর্মস্থলে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই জুতো-মোজা এবং ফরমাল পোশাক পরেন। কিন্তু যখনই তারা সপ্তাহান্তে বা ছুটিতে গ্রামের সীমানায় পা রাখেন, সাথে সাথে সব আধুনিকতা ঝেড়ে ফেলে পুরনো ঐতিহ্যকে আলিঙ্গন করেন। তারা বিশ্বাস করেন, "শহর আমাদের জীবিকা দেয়, আর গ্রাম আমাদের পরিচয় ও আত্মিক শান্তি দেয়।"
৮. পর্যটকদের অভিজ্ঞতা: এক কাল্পনিক জবানবন্দি
একজন পর্যটকের চোখে গ্রামটি কেমন? কল্পনা করুন রিয়াদ নামের এক ভ্রমণপিপাসু যুবকের কথা। তিনি প্রথমবার যখন আন্দামানপুট্টিতে পা রাখলেন, তার অভিজ্ঞতা ছিল এমন:
"আমি যখন গ্রামের কাছে পৌঁছালাম, দেখলাম রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে শত শত জুতো রাখা আছে। কেউ পাহারা দিচ্ছে না, অথচ কারও জুতো চুরি হচ্ছে না। আমি দ্বিধায় ছিলাম আমার দামী স্নিকার্সটি নিয়ে। কিন্তু যখন খালি পায়ে তপ্ত ধুলোমাখা পথে হাঁটতে শুরু করলাম, প্রথম ৫ মিনিট খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মাটির সেই উষ্ণতা আমার শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। মনে হচ্ছিল, আমি প্রকৃতির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।"
৯. শ্রদ্ধা বনাম শাস্তি
আন্দামানপুট্টি গ্রামের একটি অনন্য দিক হলো তাদের নম্রতা। এখানে কোনো পর্যটক ভুল করে জুতো পরে ঢুকে পড়লে তাকে কোনো শারীরিক শাস্তি বা জরিমানা করা হয় না। বরং গ্রামের মুরব্বিরা বিনয়ের সাথে তাকে দেবতার মাহাত্ম্য এবং গ্রামের ঐতিহ্যের কথা বুঝিয়ে বলেন। এই ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কারণেই পর্যটকরাও সানন্দে এই নিয়ম মেনে নেন।
মাটির টানে বেঁচে থাকা
আন্দামানপুট্টি কেবল একটি গ্রাম নয়, এটি আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আমাদের শেকড়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যেখানে আমরা ব্র্যান্ডেড জুতোর মোহে পড়ে মাটির স্পর্শ ভুলে গেছি, সেখানে এই মানুষগুলো ত্যাগের মাধ্যমে এক বিশাল শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। এটি আমাদের শেখায় যে, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস থাকলে মানুষ যে কোনো প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে।
