ডিম পাড়ে আবার দুধও দেয়! পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী প্ল্যাটিপাস

ডিম পাড়ে আবার দুধও দেয়! পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী প্ল্যাটিপাস
প্ল্যাটিপাস যার আছে পাখির, সন্ত্যপায়ী,জলচর ও একই সাথে স্থলচর প্রাণীর বৈশিষ্ট্য। 

প্ল্যাটিপাস বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী, যা ডিম পাড়ে, দুধ দেয়, আবার বিষও ছড়াতে পারে। শুধু তাই নয়, এই প্রাণীটির গঠন, আচরণ আর শিকার ধরার অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর এই রহস্যময় প্রাণীটির নাম প্ল্যাটিপাস।

​এটি এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রথমবার বিজ্ঞানীরা যখন এটিকে দেখেছিলেন, তারা ভেবেছিলেন এটা একটা ফেক। প্ল্যাটিপাসকে বলা হয় নেচার্স পাজল। কারণ এর শরীরে আছে একাধিক প্রাণীর বৈশিষ্ট্য। এর মুখ হাঁসের মতো, দেহটা বিভারের মতো, আর পা অনেকটা উটপাখির মতো। এমন অদ্ভুত মিশ্রণ পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।

​সবচেয়ে বড় রহস্য, প্ল্যাটিপাস একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী; কিন্তু এটি ডিম পাড়ে। সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা বাচ্চা জন্ম দেয়, কিন্তু প্ল্যাটিপাস সেই নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। এরা ছোট ছোট ডিম পাড়ে, তারপর সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। আরও বিশ্বয়কর বিষয়, প্ল্যাটিপাস দুধ দেয়, কিন্তু এর কোনো স্তন নেই। তাহলে বাচ্চারা দুধ খায় কীভাবে? এর শরীরের চামড়া থেকে দুধ বের হয়, আর বাচ্চারা সেটি চেটে খায়। সৃষ্টিকর্তা এখানে একেবারে অন্যরকম নিয়ম বানিয়েছে।

​ভাবছেন এই প্রাণীর রহস্য এখানেই শেষ? না, আসল ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, পুরুষ প্ল্যাটিপাসের পায়ের পিছনে থাকে একটি বিষাক্ত স্পার। এই স্পার দিয়ে এটি শত্রুকে আক্রমণ করতে পারে। এর বিষ মানুষের জন্য মারাত্মক না হলেও ব্যথা এত তীব্র হয় যা অনেকদিন পর্যন্ত থাকে।

প্ল্যাটিপাস পানির নিচে চোখ,কান,নাক বন্ধ করে শিকার করে
প্ল্যাটিপাসের সামনের অংশ হাঁসের মতো দেখা যায় যদিও এটা তাদের রাডার হিসেবে কাজ করে। 


​ছাড়াও প্ল্যাটিপাসের আরেকটি সুপারপাওয়ার আছে। এরা পানির নিচে চোখ, কান, নাক সব বন্ধ রাখে, তবুও শিকার খুঁজে পায়। কিন্তু কীভাবে? এর ঠোঁটে আছে ইলেকট্রো-রিসেপশন ক্ষমতা। মানে এটি শিকারদের শরীর থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক সিগন্যাল অনুভব করতে পারে। একেবারে লাইভ রাডারের মতো কাজ করে।

বাইরে থেকে দেখতে হাঁসের মতো মনে হলেও, প্ল্যাটিপাসের ঠোঁট বা বিলটি পাখির ঠোঁটের মতো শক্ত বা হাড়ের তৈরি নয়। এটি আসলে খুবই নরম, নমনীয় (flexible) এবং চামড়ার মতো এক ধরণের সংবেদনশীল অঙ্গ। এই নরম ঠোঁটের ভেতরেই থাকে হাজার হাজার ইলেকট্রো-রিসেপ্টর ও মেকানো-রিসেপ্টর কোষ, যা পানির নিচে এদের রাডারের মতো কাজ করতে সাহায্য করে।

​এই অদ্ভুত প্রাণীটি পৃথিবীর সব জায়গায় নেই। এটি পাওয়া যায় শুধু অস্ট্রেলিয়ার নির্দিষ্ট কিছু নদী ও লেকে। এদের জীবনযাপন এতটাই গোপন যে আজও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি এদের সব আচরণ।

​প্ল্যাটিপাসের ডিএনএ-ও একদম অদ্ভুত। এদের মধ্যে পাওয়া যায় স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, এমনকি পাখির জিনের মিশ্রণ। মানে এটি যেন বিবর্তনের এক জীবন্ত উদাহরণ।

​যখন ১৭৯৯ সালে প্রথম প্ল্যাটিপাস আবিষ্কৃত হয়, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাসই করতে পারেননি এটা আসল। তারা ভেবেছিলেন কেউ হয়তো বিভিন্ন প্রাণীর অংশ জোড়া দিয়ে একটি ফেক বানিয়েছে।

২০২০ সালের শেষের দিকে আমেরিকান বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে এক অভাবনীয় বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়। সাধারণ আলোতে প্ল্যাটিপাসকে বাদামী দেখালও, আল্ট্রাভায়োলেট (UV) লাইটের নিচে এদের গায়ের পশম বা ফার থেকে সবুজ-নীল (Cyan-Blue) রঙের এক অদ্ভুত আলো বের হয়। একে বায়োফ্লুরোসেন্স বলে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, রাতের অন্ধকারে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে বা শিকারী প্রাণীদের চোখ ফাঁকি দিতে এই অদৃশ্য গ্লো বা আলো সাহায্য করে।

​প্ল্যাটিপাসের কোনো দাঁত নেই, তাহলে খাবার খায় কীভাবে? এরা নদীর নিচ থেকে ছোট পাথর আর কাঁকর মুখে নেয়, আর সেই পাথর দিয়েই খাবার গুঁড়িয়ে খায়। একদম প্রাচীন যুগের ন্যাচারাল ব্লেন্ডার।

প্ল্যাটিপাসের বিবর্তনের অন্যতম অদ্ভুত বিষয় হলো—এদের শরীরে কোনো নির্দিষ্ট পাকস্থলী (Stomach) নেই। এদের খাদ্যনালী সরাসরি অন্ত্রের (Intestine) সাথে যুক্ত। যেহেতু এরা নদী বা লেকের তলদেশ থেকে কেবল নরম পোকা, চিংড়ি বা কাদা-মাটি ও পাথর একসাথে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে, তাই খাবার হজম করার জন্য এদের তীব্র এসিডযুক্ত পাকস্থলীর প্রয়োজনই হয় না। বিবর্তনের ধারায় এরা তাদের পাকস্থলীর জিনটি হারিয়ে ফেলেছে।

​প্ল্যাটিপাস যদিও স্তন্যপায়ী, তবুও এর শরীরের তাপমাত্রা অনেক কম—প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীর তুলনায় অনেক কম। এই কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটিই হয়তো বিবর্তনের এক মধ্যবর্তী ধাপ।

যেহেতু প্ল্যাটিপাসের কোনো স্তনবৃন্ত নেই এবং এদের দুধ সরাসরি পেটের চামড়ার ঘাম গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়, তাই দুধটি বাইরের ধুলোবালি ও ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে সহজে চলে আসে। বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য প্রকৃতি এদের দুধে এক বিশেষ ধরণের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রোটিন যুক্ত করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই প্রোটিনের গঠন নিয়ে ল্যাবে গবেষণা করে দেখেছেন যে, এটি মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী মারাত্মক 'সুপারবাগ' (Superbugs) ধ্বংস করতে সক্ষম। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি নতুন ওষুধ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

​মানুষের থাকে দুটি সেক্স ক্রোমোজোম—X Y, কিন্তু প্ল্যাটিপাসের আছে দশটি। মানে এর জেনেটিক সিস্টেম এত জটিল যা আজও বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় রহস্য।

​প্ল্যাটিপাস মাটির নিচে লম্বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে থাকে। এই সুড়ঙ্গ কখনো কখনো ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং এর ভেতরে থাকে আলাদা আলাদা চেম্বার; যেখানে তারা ঘুমায়, বাচ্চা বড় করে আর লুকিয়ে থাকে। একদম আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি।

ফসিল বা জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্ল্যাটিপাসের পূর্বপুরুষরা আজ থেকে প্রায় ১১ কোটি বছর আগের (Cretaceous Period) ডাইনোসরদের যুগেও পৃথিবীতে টিকে ছিল। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আদিমতম দল 'মনোট্রিম' (Monotreme)-এর সদস্য হিসেবে এরা কোটি কোটি বছর ধরে নিজেদের মূল শারীরিক গঠন প্রায় অপরিবর্তিত রেখে বেঁচে রয়েছে।

​এত কিছু জানার পরও প্ল্যাটিপাস এখনও বিজ্ঞানীদের জন্য এক অমীমাংসিত রহস্য। সৃষ্টিকর্তার এই অসাধারণ সৃষ্টি নিয়ে কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না। আর এমন রহস্যময় ও অবিশ্বাস্য তথ্য জানতে আমাদের সাথেই থাকুন। কারণ পৃথিবীতে এমন আরও অনেক অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে, যা জানলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন