খিচুড়ির ইতিহাস ||সিন্ধু সভ্যতা থেকে আজকের ডাইন টেবিলে কিভাবে এলো?

খিচুড়ির ইতিহাস ||সিন্ধু সভ্যতা থেকে আজকের ডাইন টেবিলে কিভাবে এলো?
বাঙালিদের অন্যতম আবেগীয় খাবার খিচুড়ি 


​"আজ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, শরীরটা একটু ম্যাচম্যাচ করছে, তখন কোন খাবারটার কথা আপনার মাথায় সবার আগে আসবে? উত্তরটা খুবই সহজ—এক থালা গরম গরম খিচুড়ি। সাথে একটু ঘি, আলু ভাজা আর যদি তার সাথে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই।

​কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, এই যে চাল আর ডালের অতি সাধারণ এক মিলন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস? খিচুড়ি কেবল একটা খাবার নয়, এটা একটা আবেগ। 

এটা যেমন গরিবের ঘরে পেট ভরানোর ভরসা, তেমনি রাজার প্রাসাদেও এর ছিল রাজকীয় কদর। আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাস যতখানি পুরনো, খিচুড়ির ইতিহাসও ঠিক ততটাই প্রাচীন। আজ আমরা এই ভিডিওতে খিচুড়ির সেই আদি-অনন্ত গল্পটাই জানব। একদম সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত খিচুড়ি কীভাবে রাজত্ব করে চলেছে, সেই সফরটাই আজ আমরা জানব।

খিচুড়ির উৎপত্তি

​তাহলে শুরু করা যাক একদম গোড়া থেকে। খিচুড়ি শব্দটা কোথা থেকে এলো? ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কৃত শব্দ 'খিচ্চা' থেকে এই খিচুড়ি শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো চাল আর ডালের তৈরি একটি পদ।এটি ভাত জাতীয় একধরনের খাবার।

এই খাবারটি উৎপত্তিস্থল হলো ভারত উপমহাদেশ। তবে খাবারটি বাংলাদেশ ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশে বিখ্যাত।  এবার পিছিয়ে যাওয়া যাক আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার সময়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা খননকার্য চালিয়ে জানতে পেরেছেন যে, সেই সময়েও ভারতীয় উপমহাদেশে চাল আর বিভিন্ন ধরনের ডাল একসাথে ফুটিয়ে খাওয়ার একটা প্রচলন ছিল। তবে লিখিতভাবে এর প্রথম উল্লেখ আমরা পাই আমাদের প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে। আমাদের আদি বেদ এবং উপনিষদে চাল, ডাল আর ঘি একসাথে রান্না করে দেব-দেবীকে উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। 

প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও খিচুড়ির এক বিশাল ভূমিকা ছিল। মহর্ষি চরক এবং সুশ্রুত সংহিতাতেও খিচুড়িকে বলেছেন 'ত্রিদোষ নাশক'। অর্থাৎ আমাদের শরীরের তিনটি প্রধান উপাদান—বাত, পিত্ত এবং কফ, এই তিনটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে খিচুড়ির জুড়ি মেলা ভার। এটি যেমন সহজে হজম হয়, তেমনি শরীরকে দেয় প্রচুর শক্তি। তাই প্রাচীন ভারতে রোগ নিরাময়ের জন্য এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে খিচুড়িকে একটি পরম ঔষধের হিসেবে দেখা হতো।

​শুধু তাই নয়, আমাদের মহান মহাকাব্য মহাভারতেও খিচুড়ির উল্লেখ আছে। অজ্ঞাতবাসের সময়ে দ্রৌপদী যখন কাম্যক বনে ছিলেন, তখন সূর্যদেবের দেওয়া সেই অক্ষয় পাত্র থেকে তিনি যে খাবারটি পরিবেশন করতেন, তা ছিল চাল, ডাল এবং শাকসবজি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের অন্ন, যা আজকের খিচুড়িরই আদি রূপ। 

এমনকি শ্রীকৃষ্ণের পরম বন্ধু সুদামা যখন তার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তখন চালের যে উপহার এনেছিলেন, তা নিয়েও কিন্তু এই চাল-ডালের রান্নার এক সুন্দর যোগসূত্র পাওয়া যায়।

বৈদিক যুগে খিচুড়ি

​এবার সময় একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী। গ্রিক বীর আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন তার সাথে এসেছিলেন বিখ্যাত সেলুকাস নিকেটর। গ্রিক ঐতিহাসিকরা ভারতের মাটি আর মানুষের বিবরণ দিতে গিয়ে অবাক হয়ে এক খাবারের কথা লিখেছিলেন। তারা লিখেছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে এমন এক খাবার খাওয়া হয় যা চাল এবং বিভিন্ন ধরনের কলাই বা ডাল একসাথে সেদ্ধ করে তৈরি করা হয়। গ্রিকরা একে বলত 'পিন্ডা' বা এক ধরনের চাল-ডালের মিশ্রণ।

 দক্ষিণ ভারতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দরবারে গ্রিক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিস এসেছিলেন। তিনি তার বিখ্যাত 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন যে, রাজকীয় ভোজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরে চাল এবং ডাল একসাথে ফুটিয়ে তৈরি করা এই পদটি সেই সময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। আবার চাণক্যের অর্থশাস্ত্রেও কিন্তু রাজকীয় সৈন্যদের ডায়েটের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, সৈন্যদের সুস্থ এবং শক্তিশালী রাখতে চাল, ডাল, ঘি এবং নুন দিয়ে তৈরি খাবার দেওয়া হতো; কারণ এটি কম খরচে এবং কম সময়ে তৈরি করা যেত, আবার পুষ্টিগুণেও ছিল ভরপুর।

মুঘল আমলের শাহি খিচুড়ি

​এতক্ষণ আমরা যে খিচুড়ির কথা বলছিলাম, তা ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং নিরামিষ। কিন্তু খিচুড়ির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টুইস্ট এলো মুঘল আমলে। যা ছিল সাধারণ মানুষের খাবার, তা হয়ে উঠল শাহি দরবারের প্রধান আকর্ষণ। 

প্রথমে মুঘল সম্রাট আকবরের কথা ধরা যাক। আকবরের দরবারের নবরত্নের অন্যতম আবুল ফজল তার বিখ্যাত বই 'আইন-ই-আকবরি'-তে খিচুড়ির সাত-সাতটি রেসিপির কথা উল্লেখ করেছেন। সম্রাট আকবর নিজে নিরামিষ খেতে খুব ভালোবাসতেন এবং সপ্তাহের কয়েকটা দিন তিনি মাংস খেতেন না। সেই দিনগুলোতে তার প্রিয় খাবার ছিল নানা ধরনের মশলা, জাফরান এবং শুকনো ফল বা ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে তৈরি শাহি খিচুড়ি। 

গল্প এখানেই শেষ নয়, আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর তো খিচুড়ির প্রেমে একদম হাবুডুবু খেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি গুজরাটে গিয়ে এক বিশেষ ধরনের খিচুড়ি খেয়েছিলেন, যার নাম ছিল 'লাজিজা'। এই লাজিজা তৈরিতে চাল আর ডালের সাথে মেশানো হতো পেস্তা, বাদাম, কিশমিশ এবং হরেক রকমের দামি মশলা। জাহাঙ্গীর তার আত্মজীবনী 'তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী'-তে লিখেছেন যে, এই লাজিজা খিচুড়ি তার এতটাই প্রিয় ছিল যে তিনি প্রায়শই রাতের খাবারে এটি খেতেন। 

এরপর এলেন শাহজাহান এবং ঔরঙ্গজেব। ঔরঙ্গজেবকে সাধারণত খুব কড়া এবং সাদামাটা শাসক হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু খাবারের ব্যাপারে তারও একটা দুর্বলতা ছিল। তিনি 'আলমগিরি খিচুড়ি' নামের একটি পদ খুব পছন্দ করতেন, যেখানে খিচুড়ির সাথে মাংস এবং ডিমের ব্যবহার করা হতো। মুঘলরাই প্রথম এই সাধারণ চাল-ডালের পদটির সাথে মাংস এবং ডিমের ফিউশন ঘটায়, যা পরে 'খেচড়া' বা আজকের বিরিয়ানির আদি পুরুষ হিসেবে পরিচিতি পায়।

ব্রিটিশদের Kedgeree

​এত সময় না হয় গ্রিক থেকে শুরু করে মুঘলদের গল্প শুনলেন, এবার আসা যাক ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশরা যখন ভারতে এলো, তারা এখানকার সংস্কৃতি আর খাবারের প্রেমে না পড়ে পারল না। তারা দেখল, ভারতীয়রা সকালের জলখাবারে এক অদ্ভুত, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে। ব্রিটিশ সাহেবদের এই খাবারটা এতটাই পছন্দ হয়ে গেল যে তারা এর নাম দিল 'কেজেরি' (Kedgeree)। তবে ব্রিটিশরা একটু নিজেদের মতো করে এর রেসিপি বদলে নিল।

 তারা চাল আর ডালের সাথে যোগ করল সেদ্ধ ডিম, স্মোকড ফিশ (সাধারণত স্যামন বা হ্যাডক মাছ) এবং প্রচুর মাখন আর ক্রিম। অর্থাৎ যে খিচুড়ি ভারতের গ্রামের গরিব মানুষের ঘরে জন্ম নিয়েছিল, তা ব্রিটিশদের হাত ধরে লন্ডনের রাজপ্রাসাদেও পৌঁছে গেল।

আধুনিক খিচুড়ি

​ব্রিটিশরা তো চলে গেল, কিন্তু খিচুড়ির যাত্রা সেখানে থেমে থাকেনি। এরপর এলো ১৯৪৭ সাল—দেশভাগ। এই দেশভাগের ফলে ভারতবর্ষের মানচিত্র যেমন বদলালো, তেমনি বদলে গেল আমাদের খাদ্যাভ্যাসও। এপার বাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন ওপারে গেলেন, তারা সঙ্গে করে নিয়ে এলেন তাদের নিজস্ব রান্নার ঘরানা; আর তখনই জন্ম নিল ভুনা খিচুড়ির মতো জিভে জল আনা পদ।

​আর আজ? একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি কিন্তু আর শুধু অসুস্থ মানুষের পথ্য বা বর্ষাকালের সস্তা খাবার নয়। আজ খিচুড়ি পৌঁছে গেছে ফাইভ স্টার হোটেলের শেফদের এক্সপেরিমেন্টাল কিচেনে। শেফরা আজ তৈরি করছেন কিনোয়া খিচুড়ি, ওটস খিচুড়ি, এমনকি বিদেশি মশলার ফিউশনে তৈরি গুর্মে খিচুড়িও। ভাবতে পারেন, যে খাবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ৪,০০০ বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার এক মাটির হাঁড়িতে, তা আজ আধুনিক যুগের ডায়েট কনশাস বা ফিটনেস ফ্রিকদের কাছেও সুপারফুড হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। যুগ বদলেছে, রাজত্ব বদলেছে, রান্নার পদ্ধতিও বদলেছে; কিন্তু খিচুড়ির প্রতি মানুষের ভালোবাসা এক চুলও কমেনি।

​তাহলে দেখলেন তো? গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের সৈন্যদল থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাট আকবরের শাহি দরবার, ব্রিটিশদের ব্রেকফাস্ট টেবিল থেকে আজকের ফাইভ স্টার হোটেল—খিচুড়ির এই হাজার বছরের সফর কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। খিচুড়ি কেবল একটি রেসিপি নয়, এটি আসলে আমাদের ভারতবর্ষের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি; যেখানে নানা ভাষা, নানা মতের মানুষ যেমন একসাথে মিলেমিশে থাকে, ঠিক তেমনি চাল, ডাল, সবজি আর মশলা একসাথে মিলেমিশে তৈরি করে এক অপূর্ব একতা।

​আজকের পর যখনই আপনি এক চামচ গরম গরম খিচুড়ি মুখে তুলবেন, মনে রাখবেন—আপনি কেবল খাবার খাচ্ছেন না, আপনি স্বাদ নিচ্ছেন হাজার হাজার বছর পুরনো এক জীবন্ত ইতিহাসের।

​খিচুড়ির এই রূপান্তর আপনার কেমন লাগল? আর আপনার বাড়িতে খিচুড়ির সাথে কোন পদটা মাস্ট—আলু ভাজা, পাঁপড়, নাকি ইলিশ মাছ ভাজা? কমেন্ট করে আমাকে অবশ্যই জানাবেন। আর্টিকেলটা ভালো লাগলে লাইক করুন, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, আর এইরকম আরও মজাদার ভারতীয় খাদ্য ইতিহাসের গল্প জানতে আমাদের সাথেই থাকুন । দেখা হচ্ছে পরের  নতুন কোনো ইতিহাসের গল্প নিয়ে। ততক্ষণ ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর গরম গরম খিচুড়ি উপভোগ করতে থাকুন। ধন্যবাদ।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন