সক্রেটিসের একটা অসাধারণ উক্তি হচ্ছে "No evil can happen to a good man, either in life or after death." অর্থাৎ একটা ভালো মানুষের সাথে এই জীবনে অথবা তার মৃত্যুর পরে কখনোই খারাপ কিছু হওয়া সম্ভব না। কিন্তু আমরা তো অনেক সময় দেখি অনেক ভালো মানুষের সাথে অনেক খারাপ কিছুও হয়। তাহলে সক্রেটিসের এই কথাটার কি দীপার কোনো ফিলোসফিক্যাল মিনিং আছে?
কেমন হয় যদি আমি আপনাকে বলি সক্রেটিসের কথার সেই ডীপার ফিলোসফিক্যাল মিনিংটাই আসলে এই বিখ্যাত পেইন্টিংটার মধ্যে লুকিয়ে আছে? কিন্তু অসম্ভব এই পাওয়ারফুল কথাটার মানে বুঝতে হলে আমাদেরকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে জানতে হবে। সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সাল। ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের জন্মভূমি গ্রিসের রাজধানী এথেন্স শহরে সেদিন একটা বিশেষ দিন। কারণ এথেন্সের লোকজন সেদিন তাদের গ্রেটেস্ট ফিলোসফার সক্রেটিসের বিচার করতে যাচ্ছে।
৫০০ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত এই আদালতে আজকে রায় দেওয়া হবে সক্রেটিস কি দোষী নাকি নির্দোষ। চারিদিকে উৎসুক জনতার ভিড়, আর সেই সাধারণ জনগণের মাঝে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সক্রেটিসের সবথেকে পছন্দের ছাত্র প্লেটো। এবং পরবর্তীতে প্লেটোর লেখা ফিলোসফির ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত বই 'অ্যাপোলজি' থেকে আমরা সক্রেটিসের বিচার সম্পর্কে বিস্তারিত, অর্থাৎ সক্রেটিসের বিচারের সময় এক্সাক্টলি কি হয়েছিল এবং সক্রেটিস তার বিচারকার্যের সময় এক্সাক্টলি কি বলেছিলেন, সেটা জানতে পারি।
এখন প্রথম প্রশ্নটা হচ্ছে প্লেটোর এই বইয়ের নাম 'অ্যাপোলজি' কেন? সক্রেটিস কি তার বিচারের সময় ক্ষমা চেয়েছিলেন? না, এই 'অ্যাপোলজি' শব্দটা এসেছে গ্রিক ওয়ার্ড 'অ্যাপোলজিয়া' থেকে, যেটার মানে হচ্ছে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যখন কোনো অভিযোগ আনা হয়, তখন সেই ব্যক্তি নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য রাখে সেটাকেই বলা হয় অ্যাপোলজিয়া। অর্থাৎ অ্যাপোলজি মানে হচ্ছে নিজেকে ডিফেন্ড করা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করা। অর্থাৎ বুঝতেই পারতেছেন প্লেটোর অ্যাপোলজি বইতে সক্রেটিসের বিচার কার্যের সময় সক্রেটিস তার আত্মপক্ষ সমর্থন করে কি কি বলেছিলেন সেটাই উল্লেখ করা আছে।
আর্টিকেলের শুরুতেই বলেছি গণতন্ত্রের জন্মভূমি হচ্ছে এথেন্স। সক্রেটিসের বিচার কার্যের মাত্র পাঁচ বছর আগে এই এথেন্স এবং গ্রিসের আরেকটা শহর স্পার্টার ভেতরের যে যুদ্ধ, অর্থাৎ পেলোপনেশিয়ান ওয়ার শেষ হয় এবং সে যুদ্ধে কিন্তু এথেন্স হেরে যায়। এবং স্পার্টার কাছে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরে এথেন্সের ক্ষমতা চলে যায় হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের কাছে এবং এথেন্সে ডেমোক্রেসি বন্ধ হয়ে অলিগার্কি শুরু হয়। কিন্তু তারা মানুষের উপরে এতটাই অত্যাচার করা শুরু করে যে কিছুদিনের ভেতরেই তাদেরকে সরিয়ে এথেন্সে আবার ডেমোক্রেসি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
কিন্তু এথেন্সে গণতন্ত্রের অবস্থা তখনও নরবড়ে, তাই সরকার বা পলিটিক্যাল অথরিটিকে প্রশ্ন করা বা বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করাটাকে তখনও ভালো চোখে দেখা হতো না। অন্যদিকে সক্রেটিসের কাজই হচ্ছে প্রশ্ন করা। সমাজের যে সকল মানুষজনকে সবাই খুব জ্ঞানী ব্যক্তি বলে মনে করতো, অথবা যে সকল মানুষজন নিজেরা নিজেদেরকে অনেক বেশি জ্ঞানী বলে মনে করতো, সক্রেটিসের কাজই ছিল তাদেরকে প্রশ্ন করে করে তাদের ভুল বিশ্বাস বা তাদের অজ্ঞানতাটা তাদেরকে ধরিয়ে দেওয়া। এবং দীর্ঘদিন ধরে এইভাবে প্রশ্ন করে করে সক্রেটিস সমাজের তথাকথিত জ্ঞানী লোকজন, যেমন কবি-সাহিত্যিক, পলিটিশিয়ান, গভর্মেন্ট অফিশিয়াল এবং আরো অনেক পাওয়ারফুল লোকজনের যে জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে সমাজে সুনাম ছিল, সেই সুনামটা ধুলায় মিশিয়ে দেয়।
কখন থেকে এবং কি কারণে সক্রেটিস আসলে মানুষকে এত প্রশ্ন করা শুরু করল সেটা জানতে হলে আপনারা আমার এই আর্টিকেলটা সম্পূর্ণ পড়তে হবে।
অন্যদিকে এথেন্সের যুবসমাজও আস্তে আস্তে সক্রেটিসের অনুসারী হয়ে ওঠে এবং তারাও এরকম সমাজের অন্যান্য তথাকথিত জ্ঞানী মানুষদের প্রশ্ন করতে থাকে এবং সমাজের বিভিন্ন অযৌক্তিক রীতিনীতিগুলাকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করার ফলে সমাজে সক্রেটিসের প্রচুর শত্রু হয়ে যায় এবং সমাজের বিভিন্ন পাওয়ারফুল লোকজন একসাথে হয়ে সক্রেটিসকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
সক্রেটিসকে দুইটা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়— এক, যুবসমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করা, এবং দুই, এথেন্স শহরের লোকজন যেই গডে বিশ্বাস করে, সেই গডে বিশ্বাস না করে অন্য গডে বিশ্বাস করা। প্রাচীন গ্রিসে বিচারের নিয়ম ছিল আপনার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ আনা হয়, তাহলে কোর্টে আপনার নিজেকেই নিজের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটা ভালো স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে অনেক কান্নাকাটি করা, ইমোশনাল কথাবার্তা বলা বা নিজের পরিবারের লোকজনদেরকে এনে একটা ইমোশনাল পরিবেশ তৈরি করে নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু সক্রেটিস সেটা করে নাই। এমনকি আত্মপক্ষ সমর্থন হয় এমন কথা না বলে সে তার নিজের স্বাভাবিক ফিলোসফিক্যাল ভঙ্গিতে এথেন্সের মানুষের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে থাকে, যেটা ছিল তাদের জন্য অনেকটা ইনসাল্টের মতো। আর একটু পরেই আমরা জানতে পারব এই ৫০০ জন বিচারকের কতজন সক্রেটিসের পক্ষে এবং কতজন সক্রেটিসের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল।
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ছিল যুবসমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করা। সেটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সক্রেটিস বলা শুরু করেন, "শুধুমাত্র প্রশ্ন করার কারণে আজকে আমি অনেক শত্রুর জন্ম দিয়েছি, এবং আমাকে দেখে এথেন্সের যুবসমাজও এখন প্রশ্ন করতে শিখেছে। তারা যখন প্রশ্ন করা শুরু করেছে, তারা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পেরেছে এই সকল তথাকথিত জ্ঞানী লোকজনের কেউই আসলে জ্ঞানী না। কিন্তু এই তথাকথিত জ্ঞানী লোকজন তাদের অজ্ঞানতার জন্য তাদের উচিত ছিল তাদের নিজেদের উপরে রাগ হওয়া, কিন্তু সেটা না করে তারা আসলে আমার উপরে রেগে যাচ্ছে।"
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এথেন্সের লোকজন যেই গডে বিশ্বাস করে সক্রেটিস সেই গডে বিশ্বাস করে না। কিন্তু বিচারের এক পর্যায়ে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় সক্রেটিস আসলে সম্পূর্ণভাবে নাস্তিক বা এথিস্ট। কিন্তু আপনারা যদি এই অ্যাপোলজি বইটা পড়ে থাকেন, তাহলে দেখবেন সক্রেটিস তার কথার মধ্যে বারবার এই গড শব্দটা উল্লেখ করেছে এবং বলেছে সে আসলে গডে বিশ্বাস করে।
সক্রেটিসের মতে মানুষের সোল বা আত্মা হচ্ছে অমর বা ইম্মোর্টাল এবং মানুষের এই সোল বা আত্মার উন্নতি সাধনের একমাত্র উপায় হচ্ছে সত্য এবং জ্ঞানের চর্চা করা। সুতরাং সক্রেটিস বলতেছে, "আমি যেটা করেছি সেটা গডের নির্দেশেই করেছি এবং গডকে খুশি করার জন্য এর থেকে ভালো কোনো কাজ এই শহরে আর হয় নাই। সুতরাং আমি যে যুক্তিতর্ক এবং প্রশ্ন করার মাধ্যমে তোমাদেরকে যে জ্ঞান চর্চা করার জন্য উৎসাহিত করেছি, this is for the greatest improvement of your soul."
সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন সক্রেটিস বলতে চাচ্ছে যে সে নাস্তিক না, বরং গডের তরফ থেকেই তাকে এথেন্স শহরের মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে। সে সবসময় তাদেরকে উইজডম এবং ভার্চুয়াস লাইফের কথা শিখিয়েছে এবং তাদেরকে কোনো কিছু শেখানোর জন্য কোনো পরিমাণ টাকাপয়সা নেয় নাই। সক্রেটিস বলেছে যে, "আমি যে তোমাদের কাছ থেকে কখনো কোনো টাকাপয়সা নেই নাই এটার সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমার দরিদ্রতা।"
সক্রেটিস একটা পর্যায়ে আরো বলে, "ও এথেন্সের লোকজন, তোমাদের কি লজ্জা হয় না যে তোমরা সবসময় টাকাপয়সা, সম্মান এবং খ্যাতির পেছনে দৌড়াচ্ছ? কিন্তু সত্য এবং জ্ঞানের মাধ্যমে যে তোমাদের আত্মার উন্নতি হওয়া সম্ভব ছিল, অর্থাৎ the greatest improvement of the soul হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, সেটার প্রতি তোমাদের কোনো খেয়াল নাই।"
বুঝতেই পারতেছেন তারা এক্সপেক্ট করেছিল সক্রেটিস তাদের কাছে হয়তো মাফ চাইবে অথবা নিজেকে পরিবর্তন করে নেওয়ার কথা বলবে। কিন্তু হয়েছে তার সম্পূর্ণ উল্টা। সক্রেটিস বরং আরো দ্বিগুণ উৎসাহে সত্য, ন্যায় এবং জ্ঞানের পক্ষে কথা বলেছে। এবং ফলাফল যা হবার তাই হয়, এই ৫০০ জন বিচারকের মধ্যে ২৮০ জন সক্রেটিসকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ২২০ জন সক্রেটিসকে নির্দোষ বলে ভোট দেয়।
এ তো গেল ফার্স্ট রাউন্ডের ভোটিং। ফার্স্ট রাউন্ডের ভোটিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোনো একজন কি দোষী নাকি নির্দোষ, সো বুঝতেই পারতেছেন এখানে সক্রেটিসকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপরে হবে সেকেন্ড রাউন্ডের ভোটিং। সেকেন্ড রাউন্ডের ভোটিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে যে সক্রেটিসের এখন শাস্তি কি হবে? যারা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে তাদের দাবি হচ্ছে সক্রেটিসের শাস্তি হতে হবে মৃত্যুদণ্ড। এবং এরপরে সক্রেটিসও বলার সুযোগ পাবে যে সে যে অপরাধ করেছে, এই অপরাধের জন্য তার কি শাস্তি হওয়া উচিত এবং সেটার পক্ষে সে যুক্তি দেওয়ারও সুযোগ পাবে। এবং এরপরে আবার ভোটাভুটি হবে যে সক্রেটিসের আসলে কি শাস্তি হওয়া উচিত।
সক্রেটিস সেকেন্ড রাউন্ডে কথা বলতে উঠে প্রথমেই বলে, "এথেন্সের লোকজন যে আমার বিপক্ষে ভোট দিবে সেটা আমি আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু আমি খুবই সারপ্রাইজড যে আমি এতগুলো ভোট পাইছি, অর্থাৎ আমি যে ২২০টা ভোট পাইছি।" সুতরাং সক্রেটিস এখানে বলতে চাইতেছে সাধারণ মানুষ তো সত্য এবং ন্যায়ের কথা বোঝেই না, তারা তো জ্ঞানের কথা বোঝেই না, তারা জ্ঞানের পক্ষে ভোট কি দিবে? সক্রেটিস বলতে চাচ্ছে, সে যে ২২০টা ভোট পাইছে তারা সবাই যে জেনে-বুঝে সক্রেটিসকে ভোট দিছে, সেইটা আসলে বিশ্বাস করতে রাজি না। অর্থাৎ কোনো একজন জ্ঞানী লোক ছাড়া অন্য কেউ যদি না বুঝে সক্রেটিসের পক্ষ নেয়, সেটাও সক্রেটিস আসলে গ্রহণ করতে রাজি না।
এবার সক্রেটিসের কি শাস্তি হওয়া উচিত সেইটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সক্রেটিস বলে যে, "আমি প্রপোজ করব না যে আমাকে এথেন্স ছেড়ে অন্য কোথাও পাঠায় দেওয়া হোক। কেন প্রপোজ করব না? কারণ আমি এথেন্স ছেড়ে যেখানেই যাই না কেন, অর্থাৎ আমি পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, আমি কখনোই সত্য, ন্যায় এবং জ্ঞানের পক্ষ ছাড়া অন্য কোনো কথা বলতে পারব না। অর্থাৎ আমার যে প্রশ্ন করার যে অভ্যাস, সেটা আমি কখনোই বন্ধ করতে পারব না। আর যেখানে আমার নিজের শহরের লোকজনই আমাকে সহ্য করতে পারল না, সেখানে অন্য শহরের লোকজন যে আমাকে সহ্য করবে সেটার তো প্রশ্নই ওঠে না। আর আমি যদি আমার মুখ বন্ধ রাখি, সেটা হবে গডের অবাধ্য হওয়া। যেই জীবনে আমি নিজেকে এবং অন্যকে প্রশ্ন করতে পারব না, সেই জীবন রেখে আসলে কোনো লাভ নাই।"
এবং এরপরেই সক্রেটিস বলেন ফিলোসফির ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত একটি কথা— "The unexamined life is not worth living."
সক্রেটিস প্রপোজ করে, "আমি তোমাদের জন্য এবং এই শহরের জন্য যা করছি, সেটার জন্য তোমাদের উচিত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাকে বাকি জীবন ফ্রি খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা।" দেখেন সবাই যেখানে তার মৃত্যুদণ্ডের কথা ভাবতেছে, সেই সময় সক্রেটিস বলতেছে রাষ্ট্র থেকে তার ফ্রি খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য। সে এমন একটা জিনিস চাইছে যেটা কিনা ওই সময় অলিম্পিক গেমসে এথেন্স থেকে যারা বিজয়ী হতো, তাদের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। কারণ সক্রেটিসের মতে অলিম্পিক গেমসের বিজয়ীরা তোমাদেরকে কোনো রিয়েল হ্যাপিনেস দিতে পারে না, অন্যদিকে আমি তোমাদেরকে যেটা দিই সেটা হচ্ছে রিয়েল। সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন সক্রেটিস রিয়েল হ্যাপিনেস বলতে ইমপ্রুভমেন্ট অফ দ্য সোল বা আত্মার উন্নতির কথা বলতেছেন।
সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন এই ধরনের কথাবার্তা সাধারণ মানুষজন আসলে খুব ভালো চোখে দেখে নাই। সুতরাং সেকেন্ড রাউন্ডের ভোটিংয়ে ফার্স্ট রাউন্ডে যতজন মানুষ আসলে সক্রেটিসকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করেছিল, তার থেকেও বেশি মানুষ সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড চায়। অর্থাৎ ফার্স্ট রাউন্ডে যে ২২০ জন সক্রেটিসকে নির্দোষ হিসেবে ভোট দিয়েছিল, তাদের মধ্যেও অনেকে এখন সেকেন্ড রাউন্ডে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড চায়। এখন হয়তো আর আপনাদের বুঝতে বাকি নাই সক্রেটিস কেন ফার্স্ট রাউন্ডে ২২০ ভোট পেয়ে অবাক হয়েছিল। কারণ সাধারণ মানুষ আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয় না, সাধারণ মানুষ আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পপুলার ব্যক্তিকে ভোট দেয়।
মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত হওয়ার পরেও সক্রেটিস একইভাবে কথা বলতে থাকে। সক্রেটিস বলে, "তোমরা যে আমাকে বলতেছ মৃত্যুদণ্ড আমার জন্য একটা শাস্তি, তোমরা আসলে কিভাবে জানো মৃত্যু যে একটা শাস্তি? মৃত্যুর পরে দুইটা অপশন হতে পারে। এক, মৃত্যুর পরে কোনো কিছুই আর নাই, সুতরাং এইটা হবে একটা শান্তির ঘুম। তো সেটা যদি সত্যি হয়, সেটা তো আসলে কোনো শাস্তি না, এটা বরং একটা পুরস্কার। অথবা দ্বিতীয় অপশন হতে পারে, মৃত্যুর পরে আমার এই সোল বা আত্মা এই পৃথিবী থেকে মৃত্যুর পরের যে জগত আছে সেখানে চলে যাবে এবং সেখানে আমি সব জ্ঞানী মানুষজনের সাথে একসাথে থাকার সুযোগ পাব।"
এবং সক্রেটিস আরো বলতেছে, "কি অসীম আনন্দের হবে সেই ব্যাপারটা যে আমি তাদের সবার সাথে কথা বলতে পারব, প্রশ্ন করতে পারব, এবং ওই দুনিয়াতে কেউ প্রশ্ন করার জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিবে না। এবং সবথেকে বড় কথা হচ্ছে সেই জগতটা হচ্ছে অনন্তকালের, অর্থাৎ সেই জগতে আমরা সবাই ইম্মোর্টাল। অর্থাৎ এই অপশনটাও যদি সত্যি হয়, তাহলে তো মৃত্যু আমার জন্য কোনো শাস্তি না, বরং এটাও আমার জন্য একটা রিওয়ার্ড।"
এরপরে সক্রেটিস তার সেই অসাধারণ কথাটা বলে— "No evil can happen to a good man, either in life or after death."
মৃত্যুতে যে ভালো মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু বেঁচে থাকা অবস্থায়? দেখেন, সক্রেটিসের মতে একটা মানুষের সবথেকে বড় সম্পদ হচ্ছে তার সোল বা তার আত্মা। অর্থাৎ আপনি বেঁচে থাকা অবস্থায় কোনো মানুষই আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আপনার সোল বা আত্মার কোনো ক্ষতি করতে পারবে। অর্থাৎ কোনো একজন মানুষ আপনাকে টাকাপয়সার দিক থেকে ঠকাতে পারে, আপনাকে ফিজিক্যালি টর্চার করতে পারে, এমনকি আপনাকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারে; কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আপনাকে এত কিছু করার পরেও সত্য, জ্ঞান এবং ন্যায়ের পথ থেকে সরিয়ে আনতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু সে আপনার যে সোল বা আত্মা সেটার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তাই কোনো মানুষ বা কোনো জিনিস যদি আপনাকে আপনার ভার্চুয়াস লাইফ থেকে সরিয়ে আনতে পারে, অর্থাৎ আপনাকে যদি আপনার সত্য, ন্যায় এবং জ্ঞানের পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারে, তাহলেই কিন্তু আপনার আত্মা বা সোল কলুষিত হয়ে যাবে এবং সেটাই হচ্ছে আপনার প্রকৃত ক্ষতি। সক্রেটিসের মতে সোল বা আত্মা যেহেতু ইম্মোর্টাল, তাই সোলকে প্রোটেক্ট করা এবং ইমপ্রুভ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একদম শেষে সক্রেটিস সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, "তোমরা যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ অথবা যারা আমার বিপক্ষে ভোট দিয়েছ, তাদের উপরে আমার কোনো রাগ নাই। কারণ তোমরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারো নাই।" অর্থাৎ তারা সবাই মিলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, যেহেতু তারা তাকে ন্যায় বা সত্যের পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারে নাই, সুতরাং তারা তার সোল বা আত্মার কোনো ক্ষতি করতে পারে নাই।
এরপরে সক্রেটিস তার বন্ধুদের বলে, "আমি আমার তিনটা ছেলেকে রেখে যাচ্ছি। তোমরা যদি কখনো দেখো তারা ভার্চুয়াস লাইফের দিকে ফোকাস না করে টাকাপয়সা এবং ধনসম্পত্তির পেছনে দৌড়াচ্ছে, তাহলে তোমরা তাদেরকে তিরস্কার করে শাস্তি দিও। আর সেটা যদি করতে পারো, তাহলেই বুঝবা যে আমি এবং আমার সন্তানেরা তোমাদের কাছে ন্যায়বিচার পেয়েছি।"
এবং এরপরে সক্রেটিস সবার কাছ থেকে বিদায় নেয় এবং বিদায় নেওয়ার সময় বলে— "The hour of departure has arrived and we go our ways; I to die and you to live. Which is better, God only knows."
![]() |
| ডেভিডের আঁকা এই বিখ্যাত পেইন্টিংটার নাম হচ্ছে "দ্য ডেথ অফ সক্রেটিস" |
এখন এই বিখ্যাত পেইন্টিংটাতে কিভাবে সেই ডিপ ফিলোসফিক্যাল ব্যাপারটা অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে সেটা ব্যাখ্যা করব। কিন্তু তার আগে একটু বলে রাখি, এথেন্সে কিন্তু ওই সময় ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি ছিল। অর্থাৎ সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব ভোটাররা একসাথে ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিত। এমনকি সক্রেটিসের বিচারেও ৫০০ জন বিচারক ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, মেজরিটির ভোটে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড হয়। সক্রেটিসের মৃত্যু এইটা প্রমাণ করে যে জনগণের ভেতরে যদি এডুকেশন, উইজডম, র্যাশনালিটি, টলারেন্স এবং অ্যাওয়ারনেস না থাকে, তাহলে কিন্তু গণতন্ত্র সেখানে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আর এই সবকিছুই ঘটে সক্রেটিসের প্রিয় ইয়াং স্টুডেন্ট প্লেটোর চোখের সামনে। প্লেটো এমনিতেই ডেমোক্রেসির ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল ছিলেন এবং তারপরে মেজরিটির ভোটে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড প্লেটোর উপরেই একটা বিশাল প্রভাব ফেলে। সক্রেটিসের মৃত্যুর পরে প্লেটো এথেন্স ছেড়ে চলে যায় এবং ১২ বছর পরে আবার ফেরত আসে। এবং পরবর্তীতে প্লেটো তার 'দ্য রিপাবলিক' বইতে ডেমোক্রেসি যদি না হয় দেন হোয়াট শুড বি দ্য বেস্ট ফর্ম অফ গভর্মেন্ট, সেটা আলোচনা করে। ভবিষ্যতের কোনো একটা আর্টিকেলে হয়তো সেটা ব্যাখ্যা করব।
ডেভিডের আঁকা এই বিখ্যাত পেইন্টিংটার নাম হচ্ছে 'দ্য ডেথ অফ সক্রেটিস'। এইখানে একদম মাঝখানের ফিগারটা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সক্রেটিস, যিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই হ্যামলক বিষ পানে মৃত্যুবরণ করবেন। পেইন্টিংয়ের এই সাইডটাতে যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন সক্রেটিসের ছাত্র এবং বন্ধুরা সক্রেটিসের মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে হতাশা এবং শোকে ভারাক্রান্ত। সক্রেটিসের একদম পাশে, সক্রেটিসের পায়ের উপরে হাত দিয়ে বসে আছেন সক্রেটিসের একজন ছাত্র এবং বন্ধু ক্রিতো, যিনি এথেন্সের একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন।
সক্রেটিস জেলখানায় থাকা অবস্থায় এই ক্রিতো জেলখানার পাহারাদারদের ঘুষ দিয়ে সক্রেটিসকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সব ধরনের ব্যবস্থা করে রাখলেও, সক্রেটিস কোনোভাবেই এই জেলখানা থেকে পালাতে রাজি হননি। এই ক্রিতো অনেক প্রকার যুক্তিতর্ক, অনুনয়-বিনয় এবং ইমোশনাল কথাবার্তা বলেও সক্রেটিসকে পালাতে রাজি করতে পারেননি। দেখেন এখানে ক্রিতোর হাত সক্রেটিসের পায়ের উপরে অনেকটা শক্ত করে ধরা, এখানে একটা ইমোশনাল আর্চ বা একটা রিকোয়েস্ট বোঝানো হয়েছে। একটা বন্ধুর তরফ থেকে আরেকটা বন্ধুর প্রতি রিকোয়েস্ট যে, "সক্রেটিস তুমি চলো, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।"
অন্যদিকে সক্রেটিসের হাতে যে হ্যামলক নামক বিষটা তুলে দিচ্ছে, সেও কিন্তু সক্রেটিসের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না, তার ভেতরেও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। এইখানে আবার সক্রেটিসের স্ত্রী শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে যখন জেলখানা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখনো সক্রেটিস কিন্তু তাঁর বন্ধুদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং তাঁর দর্শনের কথা বলে যাচ্ছেন।
এই পেইন্টিংটার সবচেয়ে দুর্দান্ত দুটি দিক খেয়াল করুন:
১. হ্যামলক বিষের পেয়ালা এবং সক্রেটিসের হাত: সক্রেটিস কিন্তু বিষের পেয়ালাটার দিকে তাকাচ্ছেনও না। তিনি তাঁর এক হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিষটা নেওয়ার জন্য, আর অন্য হাতটি আকাশের দিকে তুলে রেখেছেন। এই আকাশের দিকে তোলা আঙুলটি নির্দেশ করছে তাঁর আদর্শ, সত্য, এবং অমর আত্মার (Soul) উচ্চতর দর্শনকে। তিনি বোঝাচ্ছেন, শরীর নশ্বর হলেও তাঁর সত্য ও দর্শন অমর।
২. পায়ের কাছে বসে থাকা প্লেটো: সক্রেটিসের পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বিষণ্ণ মনে যিনি বসে আছেন, তিনি হলেন প্লেটো। মজার ব্যাপার হলো, সক্রেটিসের মৃত্যুর সময় প্লেটো কিন্তু বেশ তরুণ ছিলেন। কিন্তু চিত্রশিল্পী ডেভিড এখানে প্লেটোকে একজন বৃদ্ধ এবং গম্ভীর মানুষ হিসেবে এঁকেছেন। এর পেছনের কারণ হলো, প্লেটো তাঁর পরিণত বয়সে এসে এই পুরো ঘটনাটি বই আকারে ('অ্যাপোলজি' এবং 'ক্রিতো' সংলাপে) স্মৃতিচারণ করছিলেন। প্লেটোর এই শান্ত এবং চিন্তামগ্ন রূপটি মূলত সক্রেটিসের রেখে যাওয়া দর্শনের উত্তরাধিকারকে ফুটিয়ে তোলে।
বিষের পেয়ালা হাতে নেওয়ার আগে সক্রেটিস তাঁর কান্নারত বন্ধুদের শান্ত হতে বলেন এবং মনে করিয়ে দেন যে, একজন প্রকৃত দার্শনিকের মৃত্যুতে ভয় পাওয়া সাজে না। এরপর তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে সেই হ্যামলক বিষ পান করেন। বিষ পানের কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসতে থাকে।
মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর শেষ কথাটি ছিল তাঁর বন্ধু ক্রিতোর উদ্দেশ্যে। তিনি বলেছিলেন:
"ক্রিতো, অ্যাসক্লেপিয়াস (গ্রিক আরোগ্যের দেবতা)-এর কাছে আমি একটি মোরগ ঋণ ছিলাম। তোমরা কি দয়া করে সেই ঋণটি শোধ করে দেবে?"
গ্রিক সংস্কৃতিতে কোনো রোগ থেকে মুক্তি পেলে আরোগ্যের দেবতার উদ্দেশ্যে মোরগ উৎসর্গ করা হতো। সক্রেটিস এখানে মৃত্যুর মাধ্যমে এই নশ্বর পৃথিবীর অজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের সব কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বুঝিয়েছেন—যে মুক্তিতে তাঁর আত্মা চিরতরে স্বাধীন ও রোগমুক্ত হচ্ছে। আর এই শেষ ইচ্ছাটুকু প্রকাশ করার পর পরই মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই দার্শনিক চিরদিনের জন্য চোখ বন্ধ করেন।
সক্রেটিসকে শারীরিকভাবে হত্যা করা গেলেও, তাঁর সেই সত্য ও প্রশ্নের দর্শনকে কিন্তু এথেন্সের শাসকেরা স্তব্ধ করতে পারেনি। প্লেটোর লেখনীর মাধ্যমে সক্রেটিস আজ আড়াই হাজার বছর পরেও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন এবং তাঁর সেই অমর বাণী আজও প্রতিধ্বনিত হয়: "The unexamined life is not worth living."
প্লেটোর এই বিখ্যাত 'অ্যাপোলজি' ও সক্রেটিসের জীবন দর্শন নিয়ে আপনার মতামত কী? বা পরবর্তীতে প্লেটোর 'দ্য রিপাবলিক' বইয়ের সেই আদর্শ রাষ্ট্রের (Best Form of Government) ধারণা নিয়ে জানতে চান?

