মিশরীয় সভ্যতা হঠাৎ করে হারিয়ে গেল কেন?

 মিশরীয় সভ্যতা হঠাৎ হারিয়ে গেল কেন?


মিশরীয় সভ্যতা হঠাৎ করে হারিয়ে গেল কেন?

প্রাচীন মিসরে ফারাওদেরকে কেবল রাজা নয়, বরং সূর্যের দেবতার পুত্র এবং পৃথিবীতে ঈশ্বরের জীবন্ত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। হাজার হাজার মানুষ তাদের সামনে নতজানু হয়ে ভক্তি প্রদর্শন করত।

​এই সভ্যতার মানুষ বিজ্ঞান ও গণিতের বিশেষ সূত্র ব্যবহার করে বিশাল সব পিরামিড তৈরি করেছিলেন। আধুনিক যুগেও এই স্থাপনাগুলো অনেকের কাছে রহস্যময় মনে হয়।

​মিসরীয় সভ্যতা প্রায় ৩০০০ বছর ধরে টিকে ছিল। কীভাবে একজন মানুষের হাতে এতো ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে এবং কেন এই উন্নত সভ্যতাটি হঠাৎ করে হারিয়ে গেল?চলুন তা আজকে জেনে নেই। 

​প্রায় ৮০০০ বছর আগে নীল নদকে কেন্দ্র করেই এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। মরুভূমির শুষ্ক ও পাথুরে পরিবেশের মাঝে নীল নদই ছিল জীবনের প্রধান উৎস।

 সেই সময়ে নীল নদে প্রতি বছর বন্যা হতো। বন্যার পানি দুকূল ছাপিয়ে ফসলের ক্ষেত ভাসিয়ে দিত।

​বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে এক ধরণের গভীর কালো পলিমাটি পড়ে থাকত। এই মাটি ছিল প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনের আধার।

​ এই উর্বর মাটিতে গম, যব (Barley), ডাল এবং বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো। যখন পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের মানুষ খাদ্য সংকট ও খরায় ভুগছিল, তখন মিশরীয়রা তাদের শস্য ভাণ্ডার ভরপুর করে রাখত।

সভ্যতার বিকাশ

​ যখন সমাজের সবার পেট নিয়মিতভাবে ভরে থাকত, তখন তাদের হাতে নতুন কিছু ভাবার, পরিকল্পনা করার এবং স্বপ্ন দেখার সময় তৈরি হতো। এভাবেই মিশরীয় সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয়।

​ছোট ছোট গ্রামগুলো ধীরে ধীরে রাজ্যে রূপান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

মিশরের একত্রীকরণ (৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)

​ প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে নীল নদের অববাহিকায় মিশর দুটি অংশে বিভক্ত ছিল—উঁচু পাহাড়ী এলাকাকে বলা হতো 'আপার ইজিপ্ট' (Upper Egypt) এবং বদ্বীপ বা ডেল্টা অঞ্চলকে বলা হতো 'লোয়ার ইজিপ্ট' (Lower Egypt)। দুই অংশের আলাদা আলাদা মুকুট, প্রতীক ও দেব-দেবী ছিল।

​রাজা নারমার (যাঁকে অনেকে 'মেনেস' বা Menes নামেও চেনেন) বলপ্রয়োগ এবং রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে মিশরের এই দুই অংশকে একত্রিত করে একটি একক রাজ্যে পরিণত করেন।

​ এই একত্রীকরণ কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি নতুন ধারণা—যেখানে একজনই রাজা এবং একটিই কেন্দ্রীয় শক্তি থাকবে।

ফারাও এবং দেবত্ব

​মিশরীয়রা সূর্যকে দেবতা হিসেবে পূজা করত। নারমার যখন মিশরকে একত্রিত করলেন, তখন মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মাল যে এই অসাধ্য কাজ কোনো ঐশ্বরিক শক্তি ছাড়া সম্ভব নয়।

​এই সময় থেকেই রাজা বা ফারাও-দের কেবল দেবতাদের পুরোহিত নয়, বরং দেবতাদের 'জীবন্ত রূপ' হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ফারাও মানেই দেবতার রূপ—এই ধারণাটি প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।

ফারাও যখন রাজকীয় প্রাসাদ থেকে বের হতেন, তখন মানুষ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো। কারণ তাদের কাছে তিনি ছিলেন একজন মর্ত্যের দেবতা। সেই সময় মিশরে ধর্ম এবং রাজনীতি একই সূত্রে গাঁথা ছিল। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ঘটনাকেও ফারাওদের সাথে মিলিয়ে দেখা হতো।

​যদি বন্যা ঠিকঠাক হতো এবং ফসল ভালো হতো, তবে মানুষ বলত— ফারাও দেবতাদের খুশি রেখেছেন। আর যদি খরা হতো বা মহামারি আসত, তবে মানুষ ভাবত— ফারাওয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই কোনো ত্রুটি হয়েছে।

​এই সবকিছুর মধ্যেই শুরু হয়েছিল 'পিরামিড যুগ'। সময়টা ছিল প্রায় ২৬০০ থেকে ২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সাহারা মরুভূমির কিনারে সোনালী বালুর সমুদ্র, আর তার মাঝখানে তিনটে ত্রিভুজের মতো পাহাড়— গিজার পিরামিড। হাজার হাজার শ্রমিক লাইনে দাঁড়িয়ে পাথর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কারো পা দিয়ে রক্ত ঝরছে, কারো পিঠ দিয়ে ঘাম পড়ছে। কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই— রাজার জন্য এমন এক সমাধি তৈরি করা যা আকাশকেও ছুঁয়ে যাবে।

​প্রতিটি ব্লকের ওজন কয়েক টন! তবুও পিরামিডে সেগুলো বসানোর কোণ বা অ্যাঙ্গেল এতটাই নিখুঁত ছিল যে, আপনি যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ম্যাপ করেন, তবে মনে হবে যেন লেজার দিয়ে সেগুলো সেট করা হয়েছে। পুরো কাঠামোটি উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম দিকের সাথে একদম নিখুঁত লাইনে সারিবদ্ধ। তারা নক্ষত্র দেখে পরিমাপ করত, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ছায়া দেখে হিসাব মেলাত। আর কোনো স্টিল ক্রেন বা ডিজিটাল ড্রয়িং ছাড়াই, শুধুমাত্র মানুষের মস্তিষ্ক আর গায়ের জোরে এই বিশাল পাথরের দালান দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

​আমরা সাধারণত কল্পনা করি যে, পিরামিড তৈরির সবাই ছিল দাস। মার খেয়ে কাজ করত। কিন্তু গবেষণা দেখাচ্ছে— পিরামিড নির্মাণে অনেক দক্ষ শ্রমিক (Skilled Workers) জড়িত ছিলেন যারা সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকতেন। পিরামিড কনস্ট্রাকশন সাইটের পাশেই তাদের জন্য ছোট শহরের মতো ক্যাম্প বানানো হয়েছিল। সেখানে তাদের রুটি, বিয়ার, পেঁয়াজ ও মাছ দেওয়া হতো। এমনকি বলা হয়, এই দক্ষ শ্রমিকদের পরিবারও তাদের সাথেই সেখানে থাকত।

​তবে তারা দাস হোক বা দক্ষ শ্রমিক— সবার মধ্যে একটা বিষয় সাধারণ ছিল, আর সেটা হলো ফারাও-এর নাম।"

প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ও পিরামিড

​প্রাচীন মিশরে মনে করা হতো যে, রাজাদের (ফারাও) সেবা করা মানে পরোক্ষভাবে দেবতাদের সেবা করা। যদি পিরামিড সফলভাবে তৈরি হয়, তবে পরবর্তী জীবনে (Next Life) তাদের নাম ও অস্তিত্ব সুরক্ষিত থাকবে। মিশরীয় লিপি ও শিল্পকলায় বারবার দেখা গেছে যে তারা পরকালীন জীবনকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করত।

মমি তৈরির ইতিহাস ও প্রক্রিয়া

​ফারাও এবং দেবতাদের মৃত্যুর পর তাদের দেহকে মমি করার প্রথা শুরু হয় প্রায় ১৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। মমি তৈরির একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছিল:

মস্তিষ্ক অপসারণ: প্রথমে নাকের ভেতর দিয়ে একটি সরু যন্ত্রের সাহায্যে মস্তিষ্ক বের করে নেওয়া হতো।

অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ: যকৃৎ (Liver), ফুসফুস (Lungs), পাকস্থলী (Stomach) এবং অন্ত্রসমূহ (Intestines) বের করে আলাদা আলাদা পাত্রে (Canopic Jars) সংরক্ষণ করা হতো।

হৃদপিণ্ড: তবে হৃদপিণ্ড বা হার্ট শরীরের ভেতরেই রেখে দেওয়া হতো, কারণ মিশরীয়দের কাছে এটিই ছিল রাজার আসল পরিচয়।

সংরক্ষণ: এরপর দেহটিকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে শুকানো হতো এবং সুগন্ধি ও রেজিন ব্যবহার করা হতো।

প্যাকেজিং: সবশেষে পাতলা কাপড়ের পটি দিয়ে পুরো শরীর পেঁচিয়ে মমি তৈরি করা হতো। চোখের উপর কৃত্রিম চোখ বসানো হতো যাতে পরকালীন জীবনে তারা দেখতে পায়।

সমাধি ও পরকালীন প্রস্তুতি

​মমি করার পর সেটিকে একটি গভীর ও শীতল পাথরের চেম্বারে রাখা হতো। রাজার পরবর্তী জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সেখানে বিভিন্ন জিনিস রাখা হতো, যেমন:

আঙুর, রুটি ও বিয়ার।

​সোনা, অস্ত্র ও গয়না।

​ছোট ছোট দাসের মূর্তি।

​সমাধির দেয়ালে রাজার বিভিন্ন কাজকর্মের (যেমন: চাষাবাদ, শিকার বা পরিবারের সাথে সময় কাটানো) চিত্র আঁকা হতো।

দেবতাদের অভিশাপ

​কিছু মমির সাথে সতর্কবার্তাও লিখে রাখা হতো। সেখানে বলা হতো যে, কেউ যদি এই সমাধির শান্তি বিঘ্নিত করে তবে তার ওপর দেবতাদের অভিশাপ নেমে আসবে।

মিশরীয় সাম্রাজ্যের সংকট

​প্রায় ২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে প্রাচীন মিশরীয় সাম্রাজ্যে ফাটল দেখা দেয়। সে সময় নীল নদে বন্যার পরিমাণ কমে যায় এবং ফসলের ফলন হ্রাস পায়। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে দেবতারা তাদের ওপর রুষ্ট হয়েছেন।

ফারাওদের ক্ষমতার পতন

​প্রাচীন মিশরের এক পর্যায়ে ফারাওদের ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে। এর ফলে কয়েকটি প্রধান সমস্যা দেখা দেয়:​

১.কর (Tax) সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

২.খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।​

৩.স্থানীয় গভর্নরেরা, যারা আগে ফারাওয়ের অধীনে কাজ করতেন, তারা নিজেদেরকে ছোট রাজা বা 'মিনি কিং' মনে করতে শুরু করেন।

৪.তারা নিজ নিজ এলাকায় দুর্গ তৈরি, সেনাবাহিনী গঠন এবং ব্যক্তিগত সমাধি নির্মাণ শুরু করেন।

​এর ফলে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং ঐক্যবদ্ধ মিশর ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত হয়ে পড়ে।

প্রথম অন্তর্বর্তী পর্যায় (First Intermediate Period)

​প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের ইতিহাসে এমন এক শতাব্দী আসে যাকে ঐতিহাসিকরা 'প্রথম অন্তর্বর্তী পর্যায়' বলেন। এই সময়ে দুর্ভিক্ষ, গৃহযুদ্ধ এবং দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মধ্য রাজ্য (Middle Kingdom)

​প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে 'মধ্য রাজ্য' বা মিডল কিংডমের সূচনা হয়। এই সময়ে মেনতুহোতেপ দ্বিতীয় (Mentuhotep II), সেনুসরেট (Senusret) এবং আমেনেমহাট (Amenemhat)-এর মতো শক্তিশালী রাজারা মিশরকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক উন্নয়ন, যেমন:

  • ​খাল খনন এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতি।
  • ​সীমানা রক্ষা এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

​এই সময় ফারাওয়ের ধারণা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের আবার 'মিশরীয় দেবতা' হিসেবে সম্মান দেওয়া হতে থাকে।

হাইক্সোসদের আক্রমণ ও ধর্মীয় সংকট

​প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে নতুন এক জাতি হাইক্সোস (Hyksos) মিশরের ওপর হামলা চালায়। তাদের কাছে ছিল উন্নত প্রযুক্তি:

  • ​ঘোড়ায় টানা রথ (Horse Chariots)।
  • ​শক্তিশালী কম্পোজিট ধনুক।
  • ​উন্নত ধাতব অস্ত্র।

​সহজেই তারা মিশরের প্রায় অর্ধেক এলাকা দখল করে নেয়। এটি মিশরীয়দের জন্য শুধু রাজনৈতিক পরাজয় ছিল না, বরং একটি বিশাল ধর্মীয় সংকটও ছিল। তাদের প্রশ্ন ছিল—ফারাও যদি একজন ‘দেব-রাজা’ হন, তবে কীভাবে অন্য কোনো বিদেশি রাজা, যাদের দেবতারা নির্বাচন করেননি, তারা এই পবিত্র ভূমি শাসন করতে পারেন?

​শেষ পর্যন্ত মিশরীয় পুরোহিতদের প্রার্থনা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান বাড়লেও হাইক্সোসদের উন্নত অস্ত্রের সামনে পুরো মিশরীয় ব্যবস্থা অসহায় হয়ে পড়েছিল।

হাইক্সোসদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও নতুন রাজ্যের উত্থান

​হাইক্সোসদের উন্নত প্রযুক্তি এবং আক্রমণের মুখে মিশরীয়রা প্রথমে অসহায় বোধ করলেও শীঘ্রই তারা ঘুরে দাঁড়ায়। থেবনের মিশরীয় শাসকেরা তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার কাজ শুরু করেন। তারা হাইক্সোসদের কাছ থেকে রথ (Chariots), উন্নত ধনুক এবং বর্ম ব্যবহারের কৌশল আয়ত্ত করেন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর তারা হাইক্সোসদের মিশর থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। এটি ছিল একাধারে প্রতিশোধ এবং মিশরের পুনর্জন্ম।

​এরপর প্রায় ১৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় 'নতুন রাজ্য' (New Kingdom) বা নিউ কিংডমের যুগ। এটি ছিল মিশরের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সময়। এ সময় তারা তামা বা কপারের সরঞ্জাম, উন্নত অস্ত্র এবং পাহাড় কেটে বিশাল সব মন্দির (Carved Temples) তৈরি করে। যেমন ফারাও হাটশেপসুট (Hatshepsut)-এর স্মৃতিতে পাহাড়ের গায়ে নির্মিত মন্দির, যেখানে সিঁড়িগুলো আকাশপানে উঠে গেছে বলে মনে হয়।

ফারাও আখনাতেন ও ধর্মীয় বিপ্লব

​প্রায় ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ফারাও আখনাতেন মিশরের ধর্মীয় ইতিহাসে এক অদ্ভুত পরীক্ষা চালান। তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে মিশরের আর কোনো পুরনো দেব-দেবীর পূজা করা হবে না। তাদের বদলে শুধুমাত্র একজন ঈশ্বর বা ভগবানের উপাসনা করা হবে—আর তিনি হলেন খোদ আখনাতেন

​তার এই নির্দেশের ফলে যা ঘটেছিল:

  • ​মিশরের অন্য সব দেবতার মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয়।
  • ​পুরনো মূর্তিসমূহ ভেঙে ফেলা হয়।
  • ​ধর্মযাজক বা প্রিস্টদের কোণঠাসা (Sideline) করা হয়।
  • ​মিশরের রাজধানী সরিয়ে 'আমারনা' (Amarna) নামক স্থানে নেওয়া হয়।

আখনাতেনের পতনের পরবর্তী অবস্থা

​মিশরীয়রা আখনাতেনের এই একতান্ত্রিক ধর্ম বিশ্বাসকে পছন্দ করত না। তারা কেবল ভয়ের কারণে তাকে পূজা করত। তাই আখনাতেনের মৃত্যুর সাথে সাথেই পরবর্তী শাসকেরা তার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার উদ্যোগ নেন। তারা লিপি ও শিলালিপি থেকে আখনাতেনের নাম মুছে দেন, তার নির্মিত মন্দির ও মূর্তিগুলো গুঁড়িয়ে দেন। আখনাতেনকে যেন কেউ মনে না রাখে, তারা সেই ব্যবস্থাই নিশ্চিত করেছিলেন।

ফ্যারাও রামসেস (Ramesses II) ও শান্তি চুক্তি

​নিউ কিংডম-এর শেষ দিকে প্রায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে ফ্যারাও রামসেস-এর (Ramesses II) শাসনকাল শুরু হয়। তিনি আখেনাতেন-এর (Akhenaten) মতো অনেকটা হলেও রাজ্য পরিচালনায় বেশ দক্ষ ও বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি নিজের বিশালাকার মূর্তি তৈরি করান এবং সর্বত্র নিজের নাম লিখিয়ে দেন।

​কাদেশ-এর যুদ্ধে (Battle of Kadesh) যখন তার সেনাবাহিনী হিট্টাইটদের (Hittites) সাথে মুখোমুখি হয়, তখন কোনো স্পষ্ট বিজয়ী পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত একটি শান্তি চুক্তি (Peace Treaty) স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিহাসের প্রথম লিখিত আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তি হিসেবে পরিচিত। রামসেস নিজেকে যুদ্ধের বীর হিসেবে জাহির করলেও পরবর্তীকালে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এবং এর খরচ বহন করা সম্ভব নয়।

মিশরীয় ধর্ম ও 'বুক অফ দ্য ডেড'

​এই সময় নাগাদ মিশরীয় ধর্মবিশ্বাস আরও গভীর হতে শুরু করে। রচিত হয় 'বুক অফ দ্য ডেড' (Book of the Dead)-এর মতো ধর্মীয় গ্রন্থ। এতে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন বা ‘আফটারলাইফ’-এর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে আত্মাকে কোন কোন দেবতা বা বিচারকের মুখোমুখি হতে হবে তার নির্দেশিকা থাকত।

​এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল ‘অ্যামিট’ (Ammit) নামক এক দেবতার। যিনি সিংহ, কুমির এবং জলহস্তীর মিশ্র রূপ। তার কাজ ছিল যারা জীবনে পাপ করেছে, তাদের আত্মাকে সরাসরি খেয়ে ফেলা। এর মাধ্যমে কোনো টর্চার বা দ্বিতীয় সুযোগ নয়, বরং স্থায়ীভাবে বিলীন করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, যারা পুণ্য করেছে, তারা 'ফিল্ডস অফ রিডস' নামক এক স্বর্গীয় স্থানে শান্তিপূর্ণ জীবন শুরু করতে পারত।

ফ্যারাওদের অভিশাপ (Curse of the Pharaoh)

​মিশরীয়রা তাদের ফ্যারাওদের মমি করার সময় চিত্রকর্মের মাধ্যমে লিখে দিত যে, যারা তাদের বিশ্রামে বাধা দেবে, তাদের ওপর দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে। বিংশ শতাব্দীতে তুতানখামেন-এর (Tutankhamun) সমাধি খোলার পর যখন বেশ কয়েকজন সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যু হয়, তখন ‘ফ্যারাওদের অভিশাপ’-এর বিষয়টি বিখ্যাত হয়ে যায়। যদিও বাস্তবে সেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের মৃত্যু ইনফেকশন, রোগ বা দুর্ঘটনার কারণেই হয়েছিল।

মিশরীয় সাম্রাজ্যের পতন

​১০৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে নিউ কিংডম-এর জৌলুস কমতে শুরু করে। আশেপাশের সাম্রাজ্যগুলো মিশরের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। বাণিজ্য পথ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং প্রশাসনে দুর্নীতি বেড়ে যায়। কর আদায় কমে যাওয়ায় সৈন্যদের বেতন দেওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ফ্যারাওদের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। যেন মনে হয় শক্তিশালী সিংহ খাদ্যের অভাবে ধিরে ধিরে দুর্বল হতে থাকে।

বিদেশি শাসন ও আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট

​৭০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মিশর একটি দাবার বোর্ডের মতো হয়ে যায়। কখনও নুবিয়ান রাজারা, কখনও আসিরিয়ান বা পারস্য শাসকরা এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রত্যেক নতুন বিজেতা মিশরীয় দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখালেও প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতেই ছিল।

​৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন মিশর জয় করেন, তখন মানুষ তাকে মুক্তিদাতার মতো বরণ করে নেয় কারণ তিনি পারস্যদের হঠিয়েছিলেন। তিনি আলেকজান্দ্রিয়া শহর প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরপর তার সেনাপতি টলেমি (Ptolemy) ও তার বংশধররা মিশরের শাসনভার গ্রহণ করে। তারা বাহ্যিকভাবে ফ্যারাওদের মতো আচরণ করলেও প্রাসাদের ভেতর গ্রিক সংস্কৃতি ও ভাষা চর্চা করত।

ক্লিওপেট্রা এবং চূড়ান্ত পতন

​এই রাজবংশের শেষ ও সবচেয়ে বিখ্যাত শাসক ছিলেন ক্লিওপেট্রা সপ্তম (Cleopatra VII)। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। মিশরকে রোমের দাস হওয়া থেকে বাঁচাতে তিনি জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্টনির সাথে বন্ধুত্ব করেন। কিন্তু একটি যুদ্ধে পরাজয়ের পর তিনি বুঝতে পারেন যে তাকে বন্দী করে অপদস্থ করা হবে। সেই গ্লানি এড়াতে বিষধর সাপের কামড়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। আর তার আত্মাহত্যার মধ্যে দিয়েই মিশরীয় সভ্যতার ইতি ঘটে।

​ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পর ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি রোমান প্রদেশে পরিণত হয়। যে সিংহাসনে হাজার বছর ধরে দেবতুল্য ফ্যারাওরা বসেছেন, তা রোমান সম্রাটদের একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদে পরিণত হয়।

​যখন কোনো শাসনব্যবস্থা নিজেদের শাসকদের ভগবান বানিয়ে ফেলে এবং ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যায়, তখন তার পতন অনিবার্য। আজ পিরামিডগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদের ফ্যারাওরা কেবল গল্পের পাতায় রয়ে গেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন