পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

 

পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 

হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অতল গহ্বরে কি মিশে আছে কেবল ধ্বংসস্তূপ, নাকি এমন কিছু যা আজও আমাদের রক্ত হিম করে দেয়?

​কল্পনা করুন এমন এক নগরীর কথা, যেখানে প্রতিটি পাথরে লেগে আছে রক্তের দাগ, যেখানে দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া হতো মানুষের প্রাণ। তারা ছিল উন্নত, তারা ছিল শক্তিশালী; কিন্তু তাদের রীতিনীতি ছিল আধুনিক মানুষের কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর। হাজার বছর পর আজ সেই সব সভ্যতার নাম শুনলে কৌতূহলী মন শিউরে ওঠে। সেই হাড়হিম করা রহস্যের খোঁজে আজ আমরা শুরু করছি আমাদের নতুন সিরিজ।

​সভ্যতার তালিকায় থাকা ১০টি ভয়ংকর নাম:

​নিচে সেই ১০টি হারানো সভ্যতার নাম দেওয়া হলো যাদের ইতিহাস ছিল যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই রক্তক্ষয়ী:

​১. অ্যাজটেক সভ্যতা (Aztec Empire’s ): মেক্সিকোর সেই সভ্যতা যারা রক্তক্ষয়ী নরবলির জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত।

২. মায়া সভ্যতা (The Maya Civilization): গাণিতিক উৎকর্ষ আর ভয়ংকর ধর্মীয় আচার যার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৩. ইনকা সভ্যতা (The Inca Empire): পাহাড়ের চূড়ায় লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় ও কঠোর জাতি।

৪. কার্থেজ সভ্যতা (The Carthaginians): প্রাচীন রোমের প্রধান শত্রু, যাদের শিশু বলিদানের প্রথা আজও বিতর্কিত।

৫. অ্যাসিরীয় সভ্যতা (The Assyrians): ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস যুদ্ধবাজ জাতি।

৬. মঙ্গোল সাম্রাজ্য (The Mongols): যাদের ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট হয়েছিল কোটি মানুষের প্রাণ।

৭. ভাইকিং সভ্যতা (The Vikings): সমুদ্রের ত্রাস এবং তাদের 'ব্লাড ঈগল' নামক ভয়ংকর দণ্ড।

৮. কম্বোডিয়ার খেমার রুজ (The Khmer Empire): আংকর ভাটের কারিগরদের আড়ালে থাকা অন্ধকার ইতিহাস।

৯. আনা সাজি সভ্যতা (Ancestral Puebloans): আমেরিকার এক রহস্যময় সভ্যতা যারা হঠাৎ করেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

১০. মিসরীয় সভ্যতা (Ancient Egypt): পিরামিডের অভিশাপ আর মমি তৈরির নেপথ্যের অদ্ভুত সব রহস্য।

পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

​১ম সভ্যতা: অ্যাজটেক সাম্রাজ্য (Aztec Empire)

​মেক্সিকোর গহিন উপত্যকায় গড়ে ওঠা এক সভ্যতা, যারা তাদের স্থাপত্যশৈলী আর বীরত্বের জন্য পরিচিত হওয়ার চেয়ে বেশি পরিচিত ছিল তাদের রক্তহিম করা নরবলি প্রথার জন্য। ১৪ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে বর্তমান মেক্সিকো সিটির আশেপাশে এই সাম্রাজ্য রাজত্ব করত।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​অ্যাজটেক বিশ্বাস করত, সূর্য প্রতিদিন সকালে উদিত হয় কারণ সে মানুষের রক্তের মাধ্যমে শক্তি পায়। যদি তাকে রক্ত না দেওয়া হয়, তবে জগত অন্ধকারে ডুবে যাবে। এই অন্ধ বিশ্বাস থেকেই তারা শুরু করেছিল ইতিহাসের সবথেকে বড় গণ-বলিদান।

  • সূর্য দেবতার তুষ্টি: তাদের প্রধান দেবতা 'হুইজিলোপোচটলি'-কে খুশি করতে হাজার হাজার বন্দিকে মন্দিরের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে জ্যান্ত মানুষের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে আনা হতো।
  • বিশাল মন্দিরের রক্তবন্যা: ঐতিহাসিকদের মতে, তেনোচটিটলান (Tenochtitlan) শহরের 'গ্রেট টেম্পল' উদ্বোধনের সময় মাত্র চার দিনে প্রায় ৮০,০০০ মানুষকে বলি দেওয়া হয়েছিল। মন্দিরের সিঁড়িগুলো বেয়ে সারাক্ষণ রক্তের স্রোত বইত।
  • শিশুদের কান্না: বৃষ্টির দেবতার (Tlaloc) আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য তারা শিশুদের বলি দিত। বিশ্বাস করা হতো, বলিদানের সময় শিশুরা যত বেশি কাঁদবে, বৃষ্টি তত বেশি হবে।

​সভ্যতার পতন:

​এতটা শক্তিশালী হওয়ার পরেও এই সভ্যতার পতন ছিল অত্যন্ত দ্রুত। ১৫২১ সালে স্পেনীয় আক্রমণকারী হার্নান কোর্তেসের হাতে এই সভ্যতার পতন ঘটে। তবে যুদ্ধ ছাড়াও ইউরোপীয়দের সাথে আসা 'স্মল পক্স' বা গুটিবসন্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

​অ্যাজটেক সভ্যতা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধ বিশ্বাস আর নিষ্ঠুরতা একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

​২য় সভ্যতা: মায়া সভ্যতা (The Maya Civilization)

​মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো এবং গুয়াতেমালার গহিন জঙ্গলে যারা গড়ে তুলেছিল গাণিতিক উৎকর্ষ আর বিশাল সব পিরামিড, তারাই হলো মায়া সভ্যতা। কিন্তু তাদের এই উন্নতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অত্যন্ত জটিল এবং ভয়ংকর কিছু আচার-অনুষ্ঠান।

​কেন তারা রহস্যময় ও ভয়ংকর ছিল?

​মায়ানরা যেমন আকাশের নক্ষত্র গুনতে জানত, তেমনি তারা জানত কীভাবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেবতাদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। তাদের কাছে মৃত্যু ছিল কেবল শেষ নয়, বরং এক নতুন যাত্রার শুরু।

  • নরবলি ও রক্তক্ষরণ (Bloodletting): মায়ানদের কাছে রক্ত ছিল অত্যন্ত পবিত্র। কেবল বন্দিদের নয়, রাজপরিবারের সদস্যদেরও নিজেদের শরীর ছিদ্র করে রক্ত বিসর্জন দিতে হতো। তারা বিশ্বাস করত, রাজবংশের রক্ত সরাসরি দেবতাদের ক্ষুধা মেটায়।
  • ভয়ংকর খেলার মাঠ: তারা 'পোক-তা-পোক' (Pok-A-Tok) নামক এক বল খেলা খেলত। এই খেলা কেবল বিনোদনের জন্য ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে পরাজিত দলের অধিনায়ক বা পুরো দলকে খেলার শেষে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো।
  • পবিত্র কুয়া বা 'সেনোতে' (Cenote): মায়ানরা প্রাকৃতিক বিশাল গভীর কূয়া বা 'সেনোতে'-কে পাতালপুরীর প্রবেশদ্বার মনে করত। বৃষ্টির দেবতা 'চাক'-কে সন্তুষ্ট করতে জীবন্ত মানুষকে হাত-পা বেঁধে এই গভীর অন্ধকার কূয়াগুলোতে নিক্ষেপ করা হতো।
  • ভবিষ্যদ্বাণী ও পঞ্জিকা: তাদের তৈরি করা ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা এতটাই নিখুঁত ছিল যে, আধুনিক বিজ্ঞানকেও তা অবাক করে দেয়। ২০১২ সালে পৃথিবী ধ্বংসের যে গুঞ্জন উঠেছিল, তার মূলে ছিল এই মায়ান ক্যালেন্ডার।

​রহস্যময় অন্তর্ধান:

​মায়া সভ্যতার সবথেকে ভয়ংকর দিকটি তাদের রক্তপাত নয়, বরং তাদের হারিয়ে যাওয়া। ৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অত্যন্ত উন্নত এই জাতি হঠাৎ করেই তাদের সাজানো শহরগুলো ছেড়ে গভীর জঙ্গলে মিলিয়ে যায়। কেন তারা শহর ত্যাগ করেছিল—খরা, যুদ্ধ নাকি কোনো মহামারী? এই রহস্য আজও সমাধান হয়নি।



​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 

পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা


মায়া সভ্যতার গভীর রহস্য পার হয়ে এবার আমরা চলে যাব দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালায়, যেখানে মেঘের রাজ্যে রাজত্ব করত এক দুর্ধর্ষ জাতি।

​৩য় সভ্যতা: ইনকা সভ্যতা (The Inca Empire)

​বর্তমান পেরু তথা দক্ষিণ আমেরিকার পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বিশাল ইনকা সাম্রাজ্য। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান ছাড়াই পাহাড়ের ওপর 'মাচু পিচু'-র মতো বিস্ময়কর শহর গড়ে তোলা এই জাতিটি যেমন পরিশ্রমী ছিল, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল তেমনই ভয়ংকর।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​ইনকা সভ্যতার শক্তি আর শৃঙ্খলার মূলে ছিল তাদের কঠোর ধর্মবিশ্বাস। যদিও তারা অ্যাজটেকদের মতো প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে বলি দিত না, কিন্তু তাদের বলিদানের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত করুণ এবং নিখুঁত।

  • কাপাকোচা (Capacocha) বা শিশু বলি: ইনকাদের সবচেয়ে হাড়হিম করা প্রথা ছিল এটি। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সম্রাটের বিজয়ের পর দেবতাকে তুষ্ট করতে সবচেয়ে সুন্দর শিশুদের বেছে নেওয়া হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, শিশুরা পবিত্র এবং তারা সরাসরি দেবতাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে।
  • মৃতদের সাথে বসবাস: ইনকাদের কাছে মৃত্যু ছিল একটি ধাপ মাত্র। তারা মৃত সম্রাটদের মমি করে সিংহাসনে বসিয়ে রাখত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় সিদ্ধান্তে সেই মমির 'পরামর্শ' নেওয়া হতো। এমনকি উৎসবের দিনে মমিগুলোকে বের করে মিছিলও করা হতো।
  • বরফে জমানো মৃত্যু: বলিদানের জন্য নির্বাচিত শিশুদের পাহাড়ের অনেক উঁচুতে (প্রায় ২০,০০০ ফুট) নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের কোকা পাতা বা নেশাজাতীয় পানীয় খাইয়ে অচৈতন্য করা হতো এবং হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বরফের মধ্যে জীবন্ত ছেড়ে আসা হতো। কয়েক শতাব্দী পর আজও সেই শিশুদের অবিকৃত 'মমি' বরফের নিচ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।
  • কঠোর আইন: ইনকা সাম্রাজ্যে অপরাধের শাস্তি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ছোটখাটো চুরির জন্য হাত কেটে ফেলা বা উঁচু পাহাড় থেকে নিচে ফেলে দেওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা।

​সভ্যতার পতন:

​১৫৩২ সালে যখন স্প্যানিশ বিজেতা ফ্রান্সিসকো পিজারো ইনকা সাম্রাজ্যে পা রাখেন, তখন গৃহযুদ্ধ আর গুটিবসন্তের আক্রমণে সাম্রাজ্যটি এমনিতেই দুর্বল ছিল। বিশাল সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও আধুনিক মারণাস্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার কাছে ইনকারা পরাজিত হয় এবং তাদের শেষ সম্রাট আতাওয়ালপাকে হত্যা করা হয়।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

পাহাড়ের চূড়া থেকে এবার আমরা চলে যাব ভূমধ্যসাগরের উপকূলে। যেখানে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং শক্তিশালী এক সাম্রাজ্য, যাদের নাম শুনলে একসময় রোমানদের বুকও কাঁপত।

​৪র্থ সভ্যতা: কার্থেজ সভ্যতা (The Carthaginians)

​বর্তমান তিউনিসিয়ায় অবস্থিত ছিল এই শক্তিশালী নগররাষ্ট্র কার্থেজ। তারা ছিল সমুদ্রপথের রাজা এবং বাণিজ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এই সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এমন এক প্রথা, যা প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য জাতিদের কাছেও ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং ভয়ংকর।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​কার্থেজ সভ্যতার সবচেয়ে অন্ধকার দিক ছিল তাদের ধর্মীয় আচার। ঐতিহাসিকদের মতে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা তাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি বিসর্জন দিত।

  • তোফেত (Tophet) বা শিশু বলিদান: কার্থেজীয়রা তাদের দেবতা 'বাল হামন' (Baal Hammon) এবং দেবী 'তানিত'-কে সন্তুষ্ট করতে নিজেদের প্রথম সন্তানকে বলি দিত। এই প্রথাটি এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, ঐতিহাসিকরা একে 'Tophet' নামক স্থানে শিশুদের গণকবর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
  • বিপদের মুখে বলি: যখনই কার্থেজ কোনো বড় যুদ্ধে হারত বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিত, তখন উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের লাইনে দাঁড়িয়ে আগুনের কুণ্ডে উৎসর্গ করত। তারা বিশ্বাস করত, এর মাধ্যমেই দেবতারা আবার তাদের সহায় হবেন।
  • ভয়ংকর মূর্তির হাত: লোককথা অনুযায়ী, তাদের দেবতা বালের একটি বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি ছিল। মূর্তির দুই হাত ছিল প্রসারিত এবং নিচের দিকে ঢালু। জীবন্ত শিশুকে সেই হাতের ওপর রাখা হতো এবং শিশুটি গড়িয়ে সরাসরি নিচে জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডে গিয়ে পড়ত।
  • রোমানদের সাথে চরম শত্রুতা: কার্থেজের সেনাপতি হ্যানিবাল বার্কা হাতির পিঠে চড়ে আল্পস পর্বত পাড়ি দিয়ে রোম আক্রমণ করেছিলেন, যা ছিল সেই সময়ের অন্যতম দুঃসাহসিক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

​সভ্যতার পতন:

​কার্থেজের এই ক্রমবর্ধমান শক্তি রোমানদের সহ্য হয়নি। টানা তিনটি যুদ্ধের পর (Punic Wars) ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানরা কার্থেজকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। বলা হয়, রোমানরা কার্থেজের প্রতিটি বাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল এবং সেই মাটিতে লবণ ছিটিয়ে দিয়েছিল যাতে সেখানে আর কোনোদিন কোনো ফসল না জন্মায় এবং এই "অভিশপ্ত" সভ্যতা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে এবার আমরা পিছিয়ে যাব আরও প্রাচীন সময়ে, মেসোপটেমিয়ার সেই ঊষর প্রান্তরে যেখানে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের সবথেকে নিষ্ঠুর ও যুদ্ধবাজ এক জাতি।

​৫ম সভ্যতা: অ্যাসিরীয় সভ্যতা (The Assyrians)

​প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের অংশ) অঞ্চলে গড়ে ওঠা অ্যাসিরীয় সভ্যতা ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি। কিন্তু তাদের শক্তির চেয়েও বড় পরিচয় ছিল তাদের চরম নৃশংসতা। তারা যুদ্ধ জয় করার চেয়ে প্রতিপক্ষকে আতঙ্কিত করতে বেশি পছন্দ করত।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​অ্যাসিরীয়রা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে বিশ্বাসী ছিল। তারা চাইত তাদের নাম শুনলেই যেন শত্রুর হৃদকম্পন শুরু হয়।

  • স্তূপাকৃতি মাথার খুলি: কোনো শহর দখল করার পর অ্যাসিরীয়রা সেখানকার বাসিন্দাদের নির্বিচারে হত্যা করত। এরপর বিজিত শহরের ফটকের সামনে নিহতদের কাটা মাথা দিয়ে বিশাল স্তূপ বা পাহাড় তৈরি করে রাখত, যাতে অন্য কোনো শহর তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস না পায়।
  • জীবন্ত চামড়া ছিলে ফেলা: তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দণ্ড ছিল বন্দিদের জীবন্ত চামড়া শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা। এরপর সেই চামড়া তারা শহরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখত। এটি ছিল অবাধ্যদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
  • অমানবিক নির্বাসন: তারা বিজিত অঞ্চলের মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে হাজার মাইল দূরে পাঠিয়ে দিত। এই গণ-নির্বাসন প্রথাটি তারা এতটাই নিখুঁতভাবে করত যে, পুরো একটি জাতির পরিচয় মুছে যেত।
  • উন্নত মরণাস্ত্র: অ্যাসিরীয়রাই প্রথম বড় পরিসরে লোহার অস্ত্র এবং যুদ্ধরথ ব্যবহার শুরু করে। তাদের অবরোধ যন্ত্র বা 'ব্যাটারিং র‍্যাম' দিয়ে তারা যেকোনো দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারত।

​সভ্যতার পতন:

​অ্যাসিরীয়দের এই চরম নৃশংসতাই শেষ পর্যন্ত তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। তাদের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবেশী মেদীয় (Medes) এবং ব্যাবিলনীয়রা ঐক্যবদ্ধ হয়। ৬১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাদের রাজধানী 'নিনেভ' আক্রান্ত হয় এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিন্তু নিষ্ঠুর এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। তাদের লাইব্রেরিগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়, যা হাজার বছর পর আবিষ্কৃত হয়।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

অ্যাসিরীয়দের নৃশংসতা পেছনে ফেলে এবার আমরা প্রবেশ করছি ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে, যখন মধ্য এশিয়ার তৃণভূমি থেকে ধেয়ে আসা এক ঝড় তছনছ করে দিয়েছিল সেকালের পরিচিত পৃথিবীকে।

​৬ষ্ঠ সভ্যতা: মঙ্গোল সাম্রাজ্য (The Mongols)

​ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলিয়া থেকে যে ঝড়ের সূচনা হয়েছিল, তা এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল ভূখণ্ডে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। যদিও তারা একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, কিন্তু তাদের বিজয়ের পথ ছিল রক্তে রঞ্জিত।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​মঙ্গোলরা কেবল যোদ্ধা ছিল না, তারা ছিল ধ্বংসের কারিগর। তাদের যুদ্ধের রণকৌশল এবং নিষ্ঠুরতা আজকেও ঐতিহাসিকদের অবাক করে।

  • গণহত্যাকে রণকৌশল হিসেবে ব্যবহার: মঙ্গোলরা যখন কোনো শহর ঘেরাও করত, তখন তারা আগে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিত। কিন্তু যদি শহরটি বাধা দিত, তবে জয় করার পর সেখানে কোনো প্রাণের চিহ্ন রাখা হতো না। মানুষ তো বটেই, এমনকি কুকুর-বিড়ালকেও তারা মেরে ফেলত।
  • মরদেহের পাহাড় ও নদী পরিবর্তন: নিশাপুর বা বাগদাদ দখলের পর মঙ্গোলরা মৃতদেহের এমন স্তূপ তৈরি করেছিল যে মাইলের পর মাইল পচা লাশের গন্ধে যাওয়া যেত না। কথিত আছে, বাগদাদের জ্ঞানভাণ্ডার ধ্বংস করার সময় বইয়ের কালিতে আর মানুষের রক্তে দজলা নদীর পানি কালো ও লাল হয়ে গিয়েছিল।
  • জৈবিক যুদ্ধের সূচনা: মঙ্গোলরাই প্রথম 'জৈবিক যুদ্ধ' (Biological Warfare) শুরু করেছিল বলে ধারণা করা হয়। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে কাফা শহর অবরোধের সময় তারা প্লেগ রোগে আক্রান্ত মৃতদেহগুলোকে বিশাল যন্ত্রের মাধ্যমে শহরের ভেতরে ছুড়ে মারত, যাতে ভেতরে থাকা মানুষগুলো রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
  • অবিশ্বাস্য গতি ও নিষ্ঠুরতা: তাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী এত দ্রুত এক শহর থেকে অন্য শহরে পৌঁছাত যে শত্রুরা পালানোর সুযোগ পেত না। তারা পরাজিত রাজপুত্রদের পিঠের ওপর তক্তা রেখে তার ওপর বসে ভোজ উৎসব করত, যতক্ষণ না সেই রাজপুত্ররা পিষ্ট হয়ে মারা যেত।

​সভ্যতার পতন:

​চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যটি চার ভাগে ভাগ হয়ে যায় (খানাত)। ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশাল এলাকা শাসনের জটিলতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার ফলে মঙ্গোলদের সেই দুর্ধর্ষ প্রতাপ কমতে থাকে। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে এই বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

মধ্য এশিয়ার তৃণভূমি ছেড়ে এবার আমরা পাড়ি জমাব উত্তর ইউরোপের হিমশীতল সাগরে। যেখান থেকে ড্রাগন নৌকায় চড়ে ধেয়ে আসত একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যাদের নাম শুনলে চার্চের ঘণ্টাধ্বনিও থমকে যেত।

​৭ম সভ্যতা: ভাইকিং সভ্যতা (The Vikings)

​অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়া (বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক) অঞ্চল থেকে আসা এই সমুদ্রচারী যোদ্ধারা পুরো ইউরোপে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। তারা কেবল লুটেরা ছিল না, তারা ছিল দক্ষ নাবিক এবং অকুতোভয় যোদ্ধা যাদের কাছে যুদ্ধে মরাই ছিল পরম সৌভাগ্যের।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​ভাইকিংদের জীবনদর্শন গড়ে উঠেছিল যুদ্ধ আর সাহসিকতাকে কেন্দ্র করে। তাদের কিছু রীতিনীতি ছিল যেমন বিচিত্র, তেমনই নিষ্ঠুর।

  • রক্তাক্ত 'ব্লাড ঈগল' (Blood Eagle): ভাইকিংদের ইতিহাসে সবথেকে ভয়ংকর মৃত্যুদণ্ড ছিল 'ব্লাড ঈগল'। এই পদ্ধতিতে বন্দির পিঠের হাড় কেটে পাখনার মতো মেলে দেওয়া হতো এবং ফুসফুস বের করে আনা হতো। এটি দেখতে অনেকটা ডানার মতো লাগত বলে এর নাম ছিল ব্লাড ঈগল। এটি ছিল তাদের চরম শত্রু বা বিশ্বাসঘাতকদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি।
  • মৃত্যুভয়হীন যোদ্ধা: ভাইকিংরা বিশ্বাস করত, যদি তারা হাতে তলোয়ার নিয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে মরতে পারে, তবেই তারা দেবতাদের রাজা ওডিনের স্বর্গ 'ভালহালা'-তে (Valhalla) স্থান পাবে। এই বিশ্বাসের কারণে তারা মরণপণ যুদ্ধ করত, যা তাদের শত্রুদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করত।
  • বারসার্কার (Berserkers): ভাইকিং বাহিনীর মধ্যে একদল বিশেষ যোদ্ধা ছিল যাদের বলা হতো 'বারসার্কার'। যুদ্ধের আগে তারা এক ধরণের বিশেষ পানীয় বা মাশরুম খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ত এবং হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পশুর মতো হিংস্রভাবে আক্রমণ করত। তারা ব্যথাবোধ করত না এবং বর্ম ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
  • তটস্থ উপকূল: ভাইকিংদের 'লং-শিপ' বা দীর্ঘ নৌকাগুলো এতটাই উন্নত ছিল যে তারা সমুদ্র ছেড়ে খুব অল্প গভীরতার নদীতেও ঢুকতে পারত। এর ফলে তারা অতর্কিতে গ্রামের পর গ্রাম এবং চার্চগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করত।

​সভ্যতার পতন:

​ভাইকিংদের পতন কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বরং একাদশ শতাব্দীর দিকে তারা ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করে এবং তাদের যাযাবর ও লুণ্ঠনকারী জীবনধারা ছেড়ে স্থিতিশীল কৃষিনির্ভর সমাজ ও রাজতন্ত্র গড়ে তোলে। এভাবেই সময়ের সাথে সাথে ভয়ংকর ভাইকিংরা আধুনিক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জাতিতে রূপান্তরিত হয়।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

ইউরোপের বরফশীতল সমুদ্র ছেড়ে এবার আমরা চলে যাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভ্যাপসা গরমে ঘেরা ঘন জঙ্গলে। যেখানে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপত্য আংকর ভাট, কিন্তু যার আড়ালে চাপা পড়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস।

​৮ম সভ্যতা: খেমার সাম্রাজ্য (The Khmer Empire)

​বর্তমান কম্বোডিয়াকে কেন্দ্র করে ৯ম থেকে ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল এই বিশাল খেমার সাম্রাজ্য। স্থাপত্য এবং প্রকৌশলী বিদ্যায় তারা এতটাই উন্নত ছিল যে তাদের তৈরি করা কৃত্রিম জলাধার এবং মন্দিরগুলো আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু এই রাজকীয় জাঁকজমকের নিচে ছিল দাসত্ব এবং নিষ্ঠুরতার এক দীর্ঘ ইতিহাস।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​খেমারদের শক্তি ছিল তাদের একনায়কতন্ত্র এবং বিশাল নির্মাণযজ্ঞের উন্মাদনা।

  • দাসত্বের চরম সীমা: আংকর ভাট বা আংকর থমের মতো বিশাল শহর ও মন্দিরগুলো বানাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মন্দিরগুলো নির্মাণের সময় হাড়ভাঙা খাটুনি আর অপুষ্টিতে মারা গিয়েছিল অসংখ্য শ্রমিক। তাদের জীবন ছিল তুচ্ছ, কেবল রাজার অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষাই ছিল মূখ্য।
  • দেব-রাজা (Devaraja) প্রথা: খেমার সম্রাটরা নিজেদের 'দেব-রাজা' বা সরাসরি দেবতার প্রতিনিধি মনে করতেন। তাদের আদেশের অবাধ্য হওয়ার অর্থ ছিল দেবতার অবমাননা, যার শাস্তি ছিল অবর্ণনীয় মৃত্যু। রাজকীয় বাগান বা মন্দির রক্ষায় তারা অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর আইন প্রয়োগ করত।
  • রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বলিদান: প্রতিবেশী চম্পা (Champa) সাম্রাজ্যের সাথে তাদের বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। এই যুদ্ধে হাতি ব্যবহার করে শত্রুদের পিষে মারা এবং গণ-শিরশ্ছেদ ছিল সাধারণ দৃশ্য। এছাড়া বিভিন্ন প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায়, বিশেষ কিছু ধর্মীয় আচার পালনেও তারা মানব বলিদানের আশ্রয় নিত।
  • প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ: তারা জলসেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই অতি-নিয়ন্ত্রণই শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

​সভ্যতার পতন:

​১৫শ শতাব্দীর দিকে থাইল্যান্ডের আয়ুথয়া সাম্রাজ্যের উপর্যুপরি আক্রমণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের জটিল সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। মহামারী আর দুর্ভিক্ষে জনপদগুলো জনশূন্য হতে শুরু করে। এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ শহরগুলো মানুষ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গল গ্রাস করে নেয় বিশাল সব মন্দিরকে। কয়েকশ বছর পৃথিবী জানতেই পারেনি জঙ্গলের আড়ালে থাকা এই সভ্যতার কথা।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

এশিয়ার জঙ্গল থেকে এবার আমরা চলে যাব আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে। যেখানে লাল পাথরের পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা আছে এমন এক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, যাদের শেষ দিনগুলো ছিল কোনো ভৌতিক সিনেমার চেয়েও বেশি ভয়ংকর।

​৯এম সভ্যতা: আনা সাজি বা পুয়েবলোয়ান (Ancestral Puebloans)

​বর্তমান আমেরিকার অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো এবং কলোরাডো অঞ্চলে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তারা মাটির নিচে ঘর বানিয়ে এবং খাড়া পাহাড়ের গায়ে অবিশ্বাস্য সব স্থাপনা তৈরি করে বাস করত। কিন্তু এই শান্ত স্থাপত্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার সত্য।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​আনা সাজি সভ্যতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের কৌতূহল ছিল সবসময়ই, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কিছু আবিষ্কার বিশ্বকে চমকে দেয়।

  • নরমাংস ভক্ষণ (Cannibalism): তাদের পরিত্যক্ত গুহা এবং ঘরগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন কিছু মানুষের হাড় খুঁজে পেয়েছেন যা সাধারণ কবরের মতো ছিল না। হাড়গুলো ছিল ভাঙা এবং তাতে মাংস ছাড়িয়ে নেওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। এমনকি রান্নার পাত্রে পাওয়া গেছে মানুষের ডিএনএ। ধারণা করা হয়, চরম দুর্ভিক্ষ বা কোনো ধর্মীয় উগ্রতার কারণে তারা নিজেদের স্বজাতিকে খেতে শুরু করেছিল।
  • ভয়ংকর যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ: কলোরাডোর 'কাউবয় ওয়াশ' নামক স্থানে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে জানা যায়, সেখানে এক রাতে পুরো একটি গ্রামকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শিশুদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর।
  • পাহাড়ের খাঁজে বন্দি জীবন: জীবনের শেষ দিকে তারা সমতল ভূমি ছেড়ে পাহাড়ের দুর্গম খাঁজে ঘর বানিয়েছিল। কেন তারা নিজেদের সাধারণ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এত দুর্গম স্থানে চলে গিয়েছিল? তারা কি বাইরের কোনো শত্রুর ভয়ে ভীত ছিল, নাকি তাদের নিজেদেরই কোনো আদিম প্রথা তাদের জীবনকে নরক বানিয়ে তুলেছিল?

​সভ্যতার পতন:

​১২৫০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অত্যন্ত রহস্যময়ভাবে এই জাতি তাদের সুশৃঙ্খল বসতিগুলো ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ বলে দীর্ঘ ৩০ বছরের খরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, আবার কেউ বলে তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর নরখাদক হয়ে ওঠার প্রবণতা তাদের বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছিল। আজও নির্জন পাহাড়ের গায়ে তাদের শূন্য ঘরগুলো এক অপার্থিব আতঙ্ক ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 
পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা

আমেরিকার রহস্যময় মরুভূমি ছেড়ে আমরা এবার ফিরে আসব ইতিহাসের সেই জনপদে, যাকে বলা হয় সভ্যতার সূতিকাগার। নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে শাসন করেছে এবং রেখে গেছে এমন সব চিহ্ন, যা আজও মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক করে।

​১০ম সভ্যতা: প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা (Ancient Egypt)

​পিরামিড, স্ফিংক্স আর মমি—এই শব্দগুলো শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রহস্যময় পৃথিবী। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ স্বর্ণালী সভ্যতার আড়ালে ছিল মৃত্যুর এক বিশাল কারখানা এবং পরকাল নিয়ে এক হাড়হিম করা উন্মাদনা।

​কেন তারা ভয়ংকর ছিল?

​মিসরীয়দের কাছে এই জীবনের চেয়ে পরের জীবন বা 'আফটার লাইফ' ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বিশ্বাসের কারণেই তারা করত কিছু বিচিত্র ও ভয়ংকর কাজ।

  • মমি তৈরির বীভৎস প্রক্রিয়া: মৃতদেহকে অক্ষত রাখতে তারা মস্তিষ্ক আর নাড়িভুঁড়ি বের করে আনত। নাকের ভেতর দিয়ে বিশেষ হুক ঢুকিয়ে ঘিলু টেনে বের করা হতো। এরপর শরীরকে লবণ দিয়ে শুকিয়ে পটি দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হতো। মৃত্যুর পর শরীর নিয়ে এই কাটাছেঁড়া ছিল তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
  • জীবন্ত সমাধি (Retainer Sacrifice): প্রথম দিকের রাজবংশগুলোতে প্রথা ছিল যে, যখন কোনো ফারাও (রাজা) মারা যেতেন, তখন তার সাথে তার প্রিয় ভৃত্য, স্ত্রী এবং দেহরক্ষীদেরও মেরে কবর দেওয়া হতো। বিশ্বাস করা হতো, তারা পরকালেও রাজার সেবা করবে। শত শত মানুষকে এভাবে রাজার সাথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হতো।
  • পিরামিডের অভিশাপ: মমিদের শান্তি রক্ষায় তারা কবরের গায়ে বিভিন্ন অভিশপ্ত কথা লিখে রাখত। বিশ শতকে যখন লর্ড কার্নারভন তুতেনখামেনের কবর আবিষ্কার করেন, তখন তার দলের কয়েকজনের রহস্যময় মৃত্যু এই "মমির অভিশাপ" বা Curse of the Pharaohs-এর কথাকে আজও জনপ্রিয় করে রেখেছে।
  • নিষ্ঠুর দাসত্ব: এক একটি বিশাল পিরামিড বানাতে কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার শ্রমিককে অমানবিক পরিশ্রম করতে হতো। বিশাল ওজনের পাথর টানতে গিয়ে পঙ্গু হওয়া বা পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের ঘটনা।

​সভ্যতার পতন:

​মিসরীয় সভ্যতা হাজার বছর টিকে থাকলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, পারস্য এবং গ্রীকদের আক্রমণ এবং সবশেষে রোমানদের অধীনে চলে যাওয়ার ফলে তাদের গৌরব হারিয়ে যায়। তাদের হায়ারোগ্লিফিক লিপি পড়ার লোক হারিয়ে যায় এবং এক সময়ের প্রতাপশালী দেবতারা বালির নিচে ঢাকা পড়ে যান।


​পৃথিবীর সেরা ভয়ংকর ১০ হারানো সভ্যতা 

অবশেষে আমরা আমাদের রোমাঞ্চকর ও হাড়হিম করা সফরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। ১০টি ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা এবং তাদের অন্ধকার ইতিহাসের মধ্য দিয়ে আমরা যেন এক ভিন্ন পৃথিবীতে ঘুরে এলাম।

​উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা না কি কেবলই আতঙ্ক?

​অ্যাজটেকদের রক্তক্ষয়ী নরবলি থেকে শুরু করে মঙ্গোলদের ধ্বংসযজ্ঞ, কিংবা মিসরীয়দের মমি থেকে আনা সাজি সভ্যতার রহস্যময় বিলুপ্তি—প্রতিটি গল্পই আমাদের একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়: ক্ষমতা এবং সভ্যতা চিরস্থায়ী নয়। এই সভ্যতাগুলো যখন তাদের উন্নতির শিখরে ছিল, তখন তারা হয়তো কল্পনাও করেনি যে একদিন তাদের বিশাল প্রাসাদগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকবে অথবা পর্যটকদের কৌতূহলী চোখে কেবল ধ্বংসাবশেষ হিসেবে ধরা দেবে। তাদের কঠোর ধর্মীয় শাসন, নিষ্ঠুর যুদ্ধকৌশল এবং অদ্ভুত সব রীতিনীতি আজ আমাদের কাছে "ভয়ংকর" মনে হলেও, তাদের কাছে সেটাই ছিল টিকে থাকার পথ। প্রকৃতির ওপর মানুষের অতি-নিয়ন্ত্রণ এবং অন্ধ বিশ্বাসের চরম পরিণতিই ছিল এই সভ্যতাগুলোর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।

​আপনার জন্য একটি প্রশ্ন:

​আমরা এই ১০টি সভ্যতার কথা জানলাম, যারা এক সময় পৃথিবীর বুক কাঁপিয়ে রাজত্ব করত। এখন আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হলো:

"বর্তমান আধুনিক বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি এবং জীবনধারা দেখে আপনার কি মনে হয় যে, ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমাদের এই সভ্যতাও 'হারানো সভ্যতা' হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাবে? যদি হয়, তবে তার প্রধান কারণ কী হতে পারে—যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন নাকি মানুষের সীমাহীন লোভ?"


​আপনার মূল্যবান মতামত বা উত্তরটি নিচে কমেন্ট করে জানান। আমরা আপনার ভাবনার অপেক্ষায় রইলাম!



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন