"মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কেউ চাকু চালিয়েছেন নিজের গলায়। কেউ আবার বদ্ধ উন্মাদ হয়ে ঝাঁপ দিয়েছেন কূপে। গলায় বালির বস্তা বেঁধে কাউকে নিক্ষেপ করা হয়েছে দুর্গের চূড়া থেকে। কাউকে ডুবিয়ে মারা হয়েছে নদীর জলে। মীর জাফর, ঘষেটি বেগম কিংবা লর্ড ক্লাইভ—পলাশীর যুদ্ধের কোনো ষড়যন্ত্রকারীরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আজকের এই আর্টিকেলে আমি তুলে ধরব প্রকৃতির সেই নির্মম প্রতিশোধের চিত্র।
বাংলার ইতিহাসের কত ঘটনারই না সাক্ষী এই মুর্শিদাবাদ। এই মুর্শিদাবাদ ষড়যন্ত্রকারীদের আস্ফালন যেমন দেখেছে, তেমনই দেখেছে তাদের করুণ পরিণতিও।
ঘষেটি বেগম
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসন থেকে সরানোর ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম ঘষেটি বেগমের শেষ পরিণতি জানাব শুরুতেই। ঘষেটি বেগম ছিলেন আলীবর্দী খাঁর কন্যা, নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা। ঘষেটি তাঁর পালিত ছেলেকে বাংলার সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন। তাই সিরাজকে নবাবি দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি তিনি। একারণেই লিপ্ত হয়েছিলেন জঘন্য ষড়যন্ত্রে। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতনের পরে ঘষেটির জীবন সুখের হয়নি। যারা ছিলেন ষড়যন্ত্রের দোসর, তারাই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনে। যুদ্ধের পরে মীর জাফরের পুত্র মীরন ঘষেটি বেগমকে ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি করে রাখেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এক ঘোর রাতে জিনজিরার কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিয়ে ঘষেটিকে মেরে ফেলা হয়। নৌকা ডুবার সময় নিস্তব্ধ ভোরে ঘষেটির আর্তনাদ নাকি শুনতে পেয়েছিলেন বুড়িগঙ্গা পারের অনেকেই।
মোহাম্মদী বেগ
রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও আলীবর্দী খাঁর আমল থেকে নবাব পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠেন মোহাম্মদী বেগ। সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে তার সখ্যতাও ছিল বেশ। এই মোহাম্মদী বেগই মীরনের নির্দেশে একটি খঞ্জর দিয়ে সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেন। বলা হয় টাকার লোভে পরে মোহম্মাদী বেগ নবাবা কে হত্যা করে।দিনটি ছিল ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই। হত্যা করার আগে সিরাজউদ্দৌলা তার কাছে দু-রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু মোহাম্মদী বেগ সেই অন্তিম ইচ্ছাও প্রত্যাখ্যান করে হত্যা করেছিলেন সিরাজকে। এই মোহাম্মদী বেগের মৃত্যুও স্বাভাবিক হয়নি। সিরাজকে হত্যার পর তিনি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যান। একদিন একটি কূপে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
ইয়ার লতিফ
ইয়ার লতিফ খান সম্পৃক্ত ছিলেন পলাশী ষড়যন্ত্রের সাথে। তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার একজন সেনাপতি ছিলেন। মীর জাফরের নির্দেশে পলাশীর যুদ্ধে তাঁর বাহিনী নিয়ে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। যুদ্ধের পর উধাও হয়ে যান তিনি। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন ইংরেজরা তাকে গোপনে হত্যা করে।
রায় দুর্লভ
রায় দুর্লভও ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার একজন সেনাপতি। তিনিও ইয়ার লতিফের মতোই লিপ্ত হয়েছিলেন ষড়যন্ত্রে। মীর মদন যখন মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে প্রাণপণ লড়াই করছিলেন, তখনও তিনি তাঁর সৈন্য নিয়ে নির্বিকার ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের পর ভয়াবহ মৃত্যু হয় তার। ১৭৬৫ সালে বক্সারের যুদ্ধের পূর্বে গলায় বালির বস্তা বেঁধে মুঙ্গেরের দুর্গের চূড়া থেকে তাকে জীবন্ত নিক্ষেপ করা হয় গঙ্গা নদীতে।
উমিচাঁদ
লর্ড ক্লাইভ উমিচাঁদকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজের পতন হলে তাকে নবাবের সম্পত্তির চার আনা অংশ দিতে হবে বলে ইংরেজদের সঙ্গে এক জাল চুক্তিপত্র সই করেন এই উমিচাঁদ। ইংরেজ নৌসেনাপতি ওয়াটস ছিলেন এই চুক্তিপত্রের প্রধান ব্যক্তি। পরে ওয়াটস প্রদত্ত এই চুক্তি জাল বলে প্রমাণিত হয়। নবাবের ধনরত্ন ও সম্পত্তি থেকে মোট ৪০ লক্ষ টাকার দাবিদার ছিলেন উমিচাঁদ। কিন্তু দলিল জাল দাবি করে তাকে কোনো টাকা দেয়নি ইংরেজরা। এই অর্থের শোকে উমিচাঁদ বদ্ধ পাগল হয়ে রাস্তায় নেমে যান। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে মুর্শিদাবাদের পথে-প্রান্তরে ছুটে আকাশের দিকে মুখ করে চিৎকার করতেন আর লাভ দিতেন সবসময়। এভাবেই একদিন অকস্মাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। কি নিদারুণ ও দুর্বিষহ তার এই মৃত্যু!
রাজা রাজবল্লভ
মীর জাফর ও ঘষেটি বেগমের সহচর রাজা রাজবল্লভ আমাদের ঢাকারই নবাব ছিলেন। বিশাল অংকের অর্থ আত্মসাৎ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। তাঁর প্ররোচনায় পুত্র কৃষ্ণদাস আত্মসাতকৃত অর্থসহ কলকাতায় পালিয়ে যান এবং ইংরেজদের আশ্রয় গ্রহণ করেন। বিষয়টি পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সিরাজের সশস্ত্র সংঘর্ষের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার সন্দেহে নবাব মীর কাশিম ১৭৬৩ সালে তাকে নদীর জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন।
মীরন
পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মীর জাফরের পুত্র মীরন বেশ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। মীর জাফরকে সামনে রেখে নবাবি করতে লাগলেন মীরন। তাঁরই নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে। শুধু হত্যা নয়, সিরাজউদ্দৌলার লাশ ক্ষতবিক্ষত করে তারই প্রিয় হাতির পিঠে বেঁধে গোটা মুর্শিদাবাদ শহর প্রদক্ষিণ করেছিলেন মীরন। সিরাজের মা আমেনা বেগম তার ছেলের লাশ দেখার জন্য দৌড়ে হাতির কাছে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। সিরাজের লাশ পিঠে নিয়ে হাতিটি আমেনা বেগমের সামনে বসে পড়ে। এ সময় মীরনের লোকজন সিরাজের মাকে চড়-থাপ্পড় মেরে আবারও জেলখানায় বন্দি করে রাখে। পরে সিরাজের মা আমেনা বেগম ও সিরাজের ভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলেন মীরন। বিহারে বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। তখনও মীর জাফর বাংলার নবাব। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তিনি বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে শোনা যায় বজ্রপাতে নয়, ইংরেজরাই হত্যা করেছিল মীরনকে। তাঁবুতে আগুন দিয়ে হত্যা করার পর বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে বলে মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
মীর জাফর
বন্ধুরা আপনারা নিশ্চয়ই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন মীর জাফর কিভাবে মারা গিয়েছিলেন সেই তথ্যটি জানার জন্য। আমি এখন জানাব মীর জাফরের শেষ পরিণতি। মীর জাফর আলী খান ওরফে মীর জাফর, যার নামটিই বিশ্বাসঘাতক শব্দের সমার্থক হয়ে গেছে। পৃথিবী যতদিন থাকবে এই নামটি ততদিনই মানুষ ঘৃণার সঙ্গেই উচ্চারণ করবে। ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাত করে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাকে হারিয়ে দিয়ে যিনি মুর্শিদাবাদের নবাব হয়েছিলেন, সেই বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরকেও শেষমেশ বরণ করতে হয় করুণ পরিণতি। নামেই নবাব ছিলেন তিনি, আসলে ইংরেজদের কারি কারি টাকা দেওয়া আর তাদের কথায় ওঠবস করাই ছিল তার কাজ। সেই সময় তার নাম হয়ে গিয়েছিল 'ক্লাইভের গাধা'। আসলে ইংরেজরা তাকে গাধার মতোই খাটাত। টাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে মীর জাফর নাকি একবার অসহায় কণ্ঠে বলেছিলেন, "আপনাদের কি মনে হয় মুর্শিদাবাদে টাকার বৃষ্টি হয়?" পরে মীর জাফরকে সিংহাসন থেকে ছুঁড়ে ফেলে তার জামাতা মীর কাশিমকে নবাব বানিয়ে দেয় ইংরেজরা। সিংহাসন হারানোর পর মীর জাফর মানসিক যন্ত্রণায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। এ সময় তিনি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। দুরারোগ্য ব্যাধি কুষ্ঠ তার জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। ১৭৬৫ সালে ৭৪ বছর বয়সে ধুঁকে ধুঁকে তিনি মারা যান।
মীর কাশিম
নবাব মীর কাশিম ছিলেন মীর জাফরের জামাতা ও মীরনের ভগ্নিপতি। ভগবানগোলায় পলাতক ছদ্মবেশী সিরাজউদ্দৌলাকে মীর কাশিমই ধরিয়ে দিয়েছিলেন। পরে তিনি বাংলার নবাব হন এবং এ সময় ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ বাঁধে। কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। এরপর তিনি পথে-প্রান্তরে বনে-জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে থাকেন। জঙ্গলে তার দুই পুত্র ইংরেজদের হাতে নিহত হন। ১৭৭৭ সালের ৬ই জুন মীর কাশিম দিল্লির রাজপথে এক বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকেন। একজন নবাবের কি করুণ পরিণতি! কাফনের একটি কাপড়ও মেলেনি তার। গায়ের ময়লা জামাসহ দেওয়া হয় কবর।
লর্ড ক্লাইভ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মীর জাফর, ঘষেটি বেগম ও জগৎশেঠসহ অন্যদের হাত করে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেছিলেন লর্ড ক্লাইভ। পলাশীর যুদ্ধের পর সিরাজের হীরাঝিল প্রাসাদের ধনাগারটি লুটের বখরা বাবদ ক্লাইভ পান ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ তাকে আরও ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দেন মীর জাফর। লর্ড ক্লাইভ অনেকগুলো নৌকা বোঝাই করে ধনরত্ন নিয়ে যান ইংল্যান্ডে। বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, হত্যা, রাহাজানি, ঘুষ ও জালিয়াতির কারণে পরবর্তীতে লন্ডনের হাউস অব কমন্স সভায় ক্লাইভের বিচার হয়। বিচারের রায়ে ক্লাইভের ফাঁসির হুকুম হয়। এই ফাঁসির দণ্ড থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। বহু কষ্টে তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পান। রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যুও মর্মান্তিক ভাবে হয়েছিল। পলাশীর ষড়যন্ত্রের ঘটনা তাকে পরবর্তীতে কোনোদিন মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে দেয়নি। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজের গলায় নিজে খুর চালিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লর্ড ক্লাইভ।
পাপ কখনোই কাউকে ক্ষমা করে না। পলাশীর ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণতি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, অন্যায় করলে মৃত্যুর পর তো বটেই, দুনিয়াতেও ভোগ করে যেতে হয় ফল। একেই বলে প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ।"
