কেন বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারা হয় ঘসেটি বেগম কে?
বাংলার ইতিহাসে কুচক্রি এক চরিত্র তিনি।ক্ষমতা লোভে তিনি মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।ছিলের স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজুদ্দৌলা কে হত্যার নিলনকশা তৈরির অন্যতম কারিগর। তার নাম ঘসেটি বেগম। ইতিহাস যাকে তকমা দিয়েছে কুচক্রি নারী হিসেবে। তবে ছল চাতুরী সুখ এনে দেয়নি ঘসেটি বেগম কে। শেষ পযন্ত স্বপক্ষের লোকজনের হাতেই করুন মৃত্যু হয় তার।
কে এই ঘসেটি বেগম?
ঘসেটি বেগমের প্রকৃত নাম মেহেরুন্নেসা বা মেহের উন নেসা বেগম সিরাজুদ্দৌলার নানা আলী বর্দি খার ছিল তিন কন্যা।ক্রমানুসারে তাদের নাম ছিল
১. মেহেরুন্নেসা বেগম
২.মায়মুনা বেগম এবং
৩. সিরাজুদ্দৌলার মা আমেনা বেগম
ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি অঘাত সম্পত্তির মালিক হন।স্বামী সন্তান না থাকলেও প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তারের লোক ছিল ঘসেটি বেগম।তিনি চাইতেন সিরাজ নয় মেজবোন মায়মুনা বেগমের পুত্র শওকত জং বাংলা বিহার ও ঐড়িশার নবাব হোক।
তবে আলি বর্দি খার ইচ্ছায় তার মৃত্যুর পর সিরাজুদ্দৌলা সিংহাসনে আরোহন করেন।কিন্তু বিষয় টি মেনে নিতে পারেনি ঘসেটি বেগম।
যে কারণে ষড়যন্ত্রের অংশ নেন ঘসেটি বেগম?
বাংলা পিডিয়া বলছে নিজের প্রভাব কাছে লাগিয়ে বিপুল বিত্তের মালিক হন ঘসেটি বেগম। এছাড়া ১৭৫৫ সালে স্বামীর মৃত্যুর পরেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর অর্থের মালিক হয়েছিলেন। তার স্বামী নওয়াজিস মুহম্মদ শাহমাত জং ঢাকায় নায়েব নাজিম ছিলেন। কিন্তু মূলত ঢাকা পরিচালনা করতেন ঘসেটি বেগম।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন "ঢাকার স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী " বইয়ে লিখেছেন ঢাকা শাসনভার প্রকৃত পক্ষে ছিল ঘসেটি বেগম ও তার বিশ্বস্ত দেওয়ান অনেকের মতে প্রনয়ী হোসেন কুলি খানের হাতে।কারন নওয়াজিস ছিলেন দূর্বল প্রকৃতির লোক।এদিকে নবাব আলি বর্দি খানের মৃত্যুর পর সিরাজুদ্দৌলা নবাব হয়ে ঘসেটি বেগম কে বন্দী করেছিলেন।সে সময় সিরাজুদ্দৌলা ঢাকা আয় ও ব্যয়ের হিসেব চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজ ভান্ডার বা অর্থনীতিক দায়িত্বে থাকা রাজ বল্লব সঠিক হিসেব দিতে ব্যর্থ হন।
রাজ বল্লব রাজকোষ থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। তার ছেলে কৃষ্ণ বল্লব সিরাজুদ্দৌলার কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে কলকাতার ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির র্ফোট উইলিয়ামে আশ্রয় নেন।
কৃষ্ণ বল্লব কে ফেরত চেয়ে কলকাতায় ইংরেজ গর্ভনরের কাছে চিঠি লেখেন সিরাজুদ্দৌলা।কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কৃষ্ণ বল্লব কে ফেরত দিতে রাজি হয়নি।এদিকে সিরাজুদ্দৌলার সেনাপতি মির জাফর ছিলেন নবাব আলিবর্দি খানের সেনাপতি।তরুণ নবাবের সাথে ব্যাক্তিত্বের সংঘাতের কারণে সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে নামে তিনি। তখন মীরজাফরের সাথে সঙ্গ দেন ঘসেটি বেগম।
ষড়যন্ত্র আরো যুক্ত হয় ব্যবসায়ী জগৎ শেঠ এবং উর্মি চাঁদ। সবার অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল নবাব উৎখাত করা।বঙ্গপিডিয়া বলা হয়েছে সিরাজউদ্দৌলা কে উৎখাতের পরিল্পনায় ঘসেটি বেগম প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন।
অবশেষে ১৭৫৭ সালে ২৩ ই জুন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজি বাহিনীর কাছে হেরা যান বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা।
যেভাবে মৃত্যু হয় ঘসেটি বেগমের?
পলাশীর প্রান্তরে ১৭৫৭ সালে ২৩ ই জুন তারিখে যুদ্ধ সংগঠিত হয়।পলাশীর আম্রকাননের সেই যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলা পরাজিত হন।ভারতবর্ষে শুরু হয় ইংরেজ শাসন। নতুন বাংলার নবাব হন মির জাফর।
শ্রী পারাবত এর লেখা " আমি সিরাজের বেগম" বইয়ে বলা হয়েছে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হবার খবর মুর্শিদাবাদে পৌছার পরই ঘসেটি বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।মিরজাফর নবাব হওয়ার পরেই ঘসেটি বেগম কে বন্দী করেন।কিছু দিন তিনি মতিঝিলে বন্দী ছিলেন আর পরর্বতিতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করা হয়।
সেখানে ঘসেটি বেগমের সাথে সিরাজুদ্দৌলার মা আমেনা বেগম কে মৃত্যুর আগ পযন্ত তারা দুজনই সেখানে বন্দী ছিল।ঘসেটি বেগমের মৃত্যু নিয়ে দুরকম তথ্য প্রচলিত আছে।
কোথাও বলা আছে মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয় এবং সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলা পিডিয়ায় উল্লেখ মিরজাফরের ছেলে মিরন এর পরিকল্পনায় ১৭৬০ সালে জুন মাসে ঘসেটি বেগম ও আমেনা বেগম কে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘসেটি বেগম ও আমেনা বেগম কে মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বুড়িগঙ্গা নদীতে বড় একটা বজরাতে তুলে দেওয়া হয়।যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরে আমেনা বেগম ও ঘসেটি বেগম কে নিয়ে যাওয়া বজরা টি মাঝ নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
এই সময় ঘসেটি বেগম তার নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও আমেনা বেগম তা করেনি। আমেনা বেগমের মুখে তখন অভিশাপের বাণী।
কথিত আছে, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে আমেনা বেগম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন:
"হে আল্লাহ, এই পাষণ্ড (মীরণ) যেভাবে আমাকে পানিতে ডুবিয়ে মারছে, তুমি যেন তাকে আসমানি গজব অর্থাৎ বজ্রপাতে মৃত্যু দিও।"
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনার ১ মাস পরেই অর্থাৎ ১৭৬০ সালের জুলাই মাসে বিহারে ব্রিটিশদের সাথে এক অভিযানে থাকা অবস্থায় মীরণের মৃত্যু হয়। সরকারি নথিপত্রে এবং ঐতিহাসিক তথ্যে বলা হয়, মীরণ তাঁর তাঁবুর ভেতরে বজ্রপাতে দগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
অনেকে একে আমেনা বেগমের সেই অভিশাপের ফল হিসেবেই গণ্য করেন।যা বাংলার ইতিহাসে এক রহস্যময় এবং আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। তবে সেই সময়ে অনেকেই ভাবত তাকে ইংরেজ রা হত্যা করেছে।
