সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধ: আমার একটি পছন্দের স্থান
আমি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। বর্তমানে জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের যান্ত্রিক কর্মব্যস্ততায় দিন কাটে আমার। গাজীপুরে চাকরি করা মানেই প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট রুটিনে বাঁধা থাকা। সকালবেলা তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া, সারাদিন কাজের চাপ, আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরা—এই একঘেয়েমি মাঝে মাঝে ভীষণ ভারী হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই ছুটির খবরটা যেন মনে নতুন প্রাণ এনে দেয়। ছুটি মানেই গ্রামে ফেরা, বাবা-মার সঙ্গে সময় কাটানো, পরিচিত মুখগুলো দেখা আর সেই সঙ্গে চায়না বাঁধে ঘুরে আসাসকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেশিনের শব্দ আর ফাইলের ভিড়ে দম বন্ধ হয়ে আসাটাই স্বাভাবিক। ।কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও আমার মনের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জ। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রাম—যেখানে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং যেখানে আমার হৃদস্পন্দন মিশে আছে।
যখনই কর্মক্ষেত্র থেকে কয়েকদিনের ছুটি পাই, ব্যাগ গুছিয়ে সোজা রওনা দেই নাড়ির টানে। আর বাড়িতে পা রাখার পর যাঁর ডাক আমি উপেক্ষা করতে পারি না, সেটি হলো প্রমত্তা যমুনার তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধ। এটি কেবল একটি নদী রক্ষা বাঁধ নয়, এটি আমার মতো হাজারো সিরাজগঞ্জবাসীর আবেগ আর প্রশান্তির এক মিলনস্থল।
যমুনার বিশালতা ও চায়না বাঁধের প্রেক্ষাপট
সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ বা সাধারণ মানুষের ভাষায় ‘চায়না বাঁধ’ তৈরি করা হয়েছিল শহরকে যমুনার ভাঙন থেকে রক্ষা করতে। চাইনিজ একটি কোম্পানি এই বাঁধের নির্মাণকাজ তদারকি করেছিল বলেই এর নাম হয়ে গেছে চায়না বাঁধ। সিরাজগঞ্জ সদর সংলগ্ন এই বাঁধটি এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার লম্বা এই কংক্রিটের বাঁধটি যখন দেখি, তখন মনে হয় মানুষের শ্রম আর প্রকৃতির বিশালতা একবিন্দুতে এসে মিলেছে।
কেন এটি আমার প্রিয় স্থান?
গাজীপুরের ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে যখন আমি বাড়িতে ফিরি, আমার ফুসফুস তখন একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন খোঁজে। আর চায়না বাঁধ হলো সেই অক্সিজেনের খনি। এখানে প্রিয় কিছু কারণ তুলে ধরছি:
- মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া: যমুনার ওপর দিয়ে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া যখন গায়ে লাগে, তখন মনে হয় শহরের সব দূষণ আর ক্লান্তি মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে গেল। এই প্রশান্তি আপনি দামী কোনো এয়ার কন্ডিশনার রুমে পাবেন না।
- দিগন্তজোড়া জলরাশি: বাঁধের ওপর দাঁড়ালে একদিকে দেখা যায় যমুনার উত্তাল জলরাশি, আর অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ শহরের ব্যস্ততা। বর্ষাকালে যমুনার রূপ যখন পূর্ণ যৌবন পায়, তখন মনে হয় সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি।
- স্মৃতি আর আড্ডা: তামাই গ্রাম থেকে বন্ধুদের সাথে মোটরবাইক নিয়ে বা সিএনজিতে করে বাঁধের দিকে রওনা দেওয়াটাই এক বড় আনন্দের ব্যাপার। বাঁধের ওপর বসে চা আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা—এটি আমার ছুটির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চায়না বাঁধের একটি বিকেল
আমার প্রিয় সময় হলো বিকেলবেলা। যখন সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন চায়না বাঁধ এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। নদীর ঢেউগুলো যখন বাঁধে এসে ধাক্কা খায়, তখন এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হয়। আমি প্রায়ই বাঁধের ব্লকের ওপর বসে থাকি। দূরে দেখা যায় জেলেরা নৌকা নিয়ে জাল ফেলছে, আর মাঝেমধ্যে বড় বড় বাল্কহেড বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা সশব্দে পার হয়ে যাচ্ছে।
সূর্যাস্তের সময় আকাশটা যখন লালচে-বেগুনি রঙ ধারণ করে এবং সেই প্রতিচ্ছবি যখন যমুনার পানিতে পড়ে, তখন মনে হয় কোনো বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস দেখছি। এই দৃশ্যটি দেখার জন্যই আমি বারবার এখানে ফিরে আসি।
স্থানীয় স্বাদ ও চা-চক্র
চায়না বাঁধে ঘুরতে গিয়ে সেখানকার খাবার না খাওয়া মানে ভ্রমণটাই অপূর্ণ রাখা। বাঁধের আশেপাশে ছোট ছোট অনেক টং দোকান আছে। এখানকার স্পেশাল মালাই চা আর মুড়ি মাখানো আমার কাছে অমৃত মনে হয়। এছাড়া নদীর তাজা মাছ ভাজা দিয়ে গরম ভাত বা বিকেলের নাস্তায় পেঁয়াজু-বেগুনি খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। তামাইয়ের তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য যেমন আমাদের গর্ব, তেমনি চায়না বাঁধের আতিথেয়তাও আমাদের পরিচয়ের অংশ।
বর্ষা ও শীতের দুই রূপ
চায়না বাঁধের সৌন্দর্য ঋতুভেদে পাল্টে যায়। বর্ষাকালে যমুনা যখন দুকূল ছাপিয়ে বয়ে চলে, তখন বাঁধের রূপ হয় কিছুটা ভয়ঙ্কর অথচ রোমাঞ্চকর। চারদিকে পানি আর পানি। আবার শীতে যখন যমুনার বুক চিরে বিশাল চড় জেগে ওঠে, তখন বাঁধের চেহারা হয় শান্ত ও স্নিগ্ধ। চরের বালুকা বেলায় তখন ছোট ছোট ঘরবাড়ি বা ফসল দেখা যায়। শীতের কুয়াশার চাদরে মোড়া চায়না বাঁধ যেন এক রহস্যময়ী রূপ ধারণ করে।
গাজীপুরের যান্ত্রিকতা বনাম চায়না বাঁধের নিস্তব্ধতা
গাজীপুরে যখন কাজ করি, তখন চারিদিকে কেবল ভবন আর যানবাহন দেখি। সেখানে আকাশ দেখার সুযোগ মেলা ভার। কিন্তু চায়না বাঁধ আমাকে সেই বিশাল আকাশ দেখার সুযোগ দেয়। যমুনার উত্তাল তরঙ্গের শব্দ আমার কানে গানের মতো বাজে। এটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আমার কাছে একটি রিচার্জিং স্টেশন। এখান থেকে শান্তি নিয়ে আমি আবার গাজীপুরের ব্যস্ত জীবনে ফেরার শক্তি পাই।
পর্যটকদের জন্য কিছু তথ্য
আপনারা যারা সিরাজগঞ্জের বাইরে থেকে আসতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি:
- কিভাবে আসবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে সিরাজগঞ্জ আসা যায়। সিরাজগঞ্জ শহরের ভেতর থেকে রিকশা বা সিএনজি যোগে সহজেই চায়না বাঁধে পৌঁছানো যায়।
- সাবধানতা: নদীর পাড়ে ঘোরার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকবেন, বিশেষ করে বর্ষাকালে পানির স্রোত খুব বেশি থাকে। পরিবেশ রক্ষার খাতিরে কোনো প্লাস্টিক বা ময়লা নদীতে ফেলবেন না।
সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধ আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি জায়গা। তামাই গ্রাম আমার অস্তিত্ব, আর চায়না বাঁধ আমার প্রশান্তি। যতবারই বাড়িতে যাই, ততবারই যমুনার এই বিশালতার কাছে নিজেকে সঁপে দেই। যারা প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালোবাসেন এবং নদীর বিশালতা উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধ একটি অনন্য গন্তব্য।
কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে নিজের জেলা, নিজের গ্রাম আর নিজের মাটির মানুষের কাছে ফিরে আসার এই আনন্দ লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধ সবসময়ই আমার তালিকার শীর্ষে থাকবে।
