পহেলা বৈশাখ: বাঙালির ঐতিহ্য ও বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

 পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির ঐতিহ্য ও বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের সবথেকে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব।।যেখানে সব ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে উৎসব টি পালন করে।বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসের প্রথম দিনকে বলা হয় পহেলা বৈশাখ। 

এই দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ উৎসব ও আয়োজনের মাধ্যমে গ্রহন করে।পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। তাছাড়া এটি সরকারি ছুটির দিনও বটে।পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে প্রথম শুরু হয় পুরান ঢাকা মুসলিম মাহিফরাস সম্পাদয়ের মাধ্যমে। 

সমগ্র বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মায়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনাম এর মতো দেশের জন্য এই দিনটি উৎসবমুখর। বিভিন্ন আয়োজন জন ও মেলা বসানো হয় এই দিনটিকে ঘিরে। তাছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত রাঙ্গামাটি , বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব সহ তিন দিন পালিত হয় ‘বৈসাবি’। বাংলাদেশে এটা পালন করা হয় এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে আর ভারতে পালন করা হয় ১৫ ই এপ্রিল।

গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে বাংলাদেশের প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়।বাংলাদেশের অন্য তম স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৪ ই এপ্রিল দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা বার্ষিক ক্যালেন্ডার  অনুসারে ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়।এই দিনটি শোভাযাত্রা, মেলা,পান্তা-ভাত,হালখাতার মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি শুরু করা হয়। এই দিনের জন্য সবার শুভেচ্ছা বাক্য হয় "শুভ নববর্ষ "।

২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা শোভাযাত্রার আয়োজন করে।পরে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রা কে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা দেয়।যা আমাদের জন্য সম্মানিত অর্জন।

আগে পহেলা বৈশাখ ধরা হত ১৪ ই এপ্রিল সূর্যোদয় থেকে। পরর্বতী কালে ১৪০২ বঙ্গাব্দে ১ লা বৈশাখ বাংলা একাডেমি এই নিয়ম টি বাতিল করে,ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে মিল রেখে রাত ১২ টার পর থেকে পহেলা বৈশাখ গণনা করা হয়। 

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস 

বলা হয়ে থাকে ​বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তার মধ্যে পহেলা বৈশাখ একটি। এই অসংখ্য উৎসবের মধ্যে এটিই একমাত্র উৎসব যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে এক সুতোয় বেধে রেখেছে । এটি কেবল  বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর দিন নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত দলিল।

​১. পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক পটভূমি

​বাংলা নববর্ষের সূচনা নিয়ে ঐতিহাসিকবিদদের মধ্যে নানা মতভেদ থাকলেও প্রধানত দুটি মতবাদ সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।

​ক) সম্রাট আকবর ও ‘তারিখ-ই-এলাহি’:

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদটি হলো মোগল সম্রাট আকবরের সময়কালকে নিয়ে। মোগল আমলে মোগল সম্রাট হিজরি বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী কৃষি খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন যেহেতু চাঁদের উপর নির্ভরশীল তাই কৃষকদের ফসল কাটার সময়ের সাথে হিজরি সনের মিল ছিল না। ফলে অসময়ে খাজনা দিতে গিয়ে কৃষকরা চরম বিপদের সম্মুখীন হত।

​এই জটিল সমস্যা দূর করতে সম্রাট আকবর সেই সময়ে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির নির্দেশ দেন। সিরাজি সৌর বছর ও চন্দ্র বছরের সমন্বয় ঘটিয়ে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে নতুন এই পঞ্জিকা চালু করেন। তবে এটি কার্যকর করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬  খ্রিষ্টাব্দ থেকে। নতুন এই বর্ষপঞ্জির নাম ছিল ‘তারিখ-ই-এলাহি’। যা পরে পরিবর্তিত হয়ে  ‘বাংলা সন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

খ) রাজা শশাঙ্কের অবদান:

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সপ্তম শতাব্দীতে বাংলার রাজা শশাঙ্ক নববর্ষের প্রচলন করেছিলেন। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন গণনা শুরু হয়েছিল ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শশাঙ্কের রাজত্বকালের সাথে সংগতিপূর্ণ। তবে মোগল আমলেই এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

​২. হালখাতা: নববর্ষের আদিকথা

​পহেলা বৈশাখের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘হালখাতা’। এটিই হলো নববর্ষের প্রধান অনুষঙ্গ। মোগল আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত পুরনো সব হিসাব মিটিয়ে দিতেন। আর বৈশাখের প্রথম দিনে খোলা হতো নতুন হিসাবের খাতা—যার প্রচ্ছদ হতো লাল শালু কাপড়ের।

​দোকানিরা হালখাতা উপলক্ষে তাদের গ্রাহকদের মিষ্টি মুখ করাতেন এবং নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। আজও পুরান ঢাকা বা গ্রামবাংলার অনেক জায়গায় এই ঐতিহ্য পরম মমতায় টিকে আছে। অনেক জায়গায় তো মিষ্টির বদলে দই ও চিড়া দেওয়া হয়। বর্তমান মান এতোটাই আপডেট হয়েছে যে এখন আর মিষ্টি বা দই-চিড়া নয় বরং বিরিয়ানি দেওয়ার রীতিও চালু হয়েছে। 

​৩. পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

​আধুনিককালে পহেলা বৈশাখের একটা বিশেষ অংশ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর ইতিহাস খুব বেশি পুরনো না । ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট ছাত্রদের উদ্যোগে প্রথম এই শোভাযাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মানুষের মনকে প্রফুল্ল করতে এবং অপশক্তির বিনাশ কামনার এই শোভাযাত্রা ছিল একটা প্রতীকি আন্দোলন ।

​২০১৬ সালে ৩০ শে নভেম্বর জাতীয়সঙ্গের অন্যতম সংস্থা ইউনেস্কো এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশালাকার মাছ, পাখি, পালকি, বাঘের মুখোশ ইত্যাদি এই শোভাযাত্রায় দেখা যায়। যা বাঙালি সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।

​৪. রমনার বটমূল ও সাংস্কৃতিক জাগরণ

​পহেলা বৈশাখের সকাল মানেই ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রসংগীত নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে রমনার বটমূলে ছায়ানট নববর্ষ বরণের আয়োজন শুরু করে। সেই থেকে আজ অবধি রমনার বটমূল হয়ে উঠেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক। ভোরের সূর্যের সাথে সাথে শুদ্ধ সংগীতের মূর্ছনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।

বৈশাখী মেলায় আরো দেখ যায় জারিগান, কবিগান, গাজীর গান, গম্ভীরা গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীততো আছেই। আরো আছে বাউল-মারফতি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি ইত্যাদি আঞ্চলিক গানের এক মনোরম পরিবেশ। ইউসুফ-জুলেখা, লায়লা-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ তাদের কাহিনিও এই মেলায় উপস্থাপিত করা হয়।। নাগরদোলা, নাটক, পুতুলনাচ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সার্কাস ইত্যাদি থাকে মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে । এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ,যা এখন আর খুব বেশি দেখা যায় না ।

খাদ্যাভ্যাস ও বৈশাখী মেলা


​৫. খাদ্যাভ্যাস ও বৈশাখী মেলা

​পহেলা বৈশাখ মানেই খাবারের উৎসব। যদিও ‘পান্তা-ইলিশ’ নিয়ে ইদানীং নানা বিতর্ক আছে (কারণ চৈত্র-বৈশাখ ইলিশ প্রজননের সময়), তবুও নাগরিক জীবনে এটি একটি ভাইরাল ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রামীণ মেলায় এখনো জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা আর খই-এর রাজত্ব আগেও ছিল এখনো আছে ।তাছাড়া বাঙালি বউয়েরা এই দিন পিঠা-পুলি,পায়েস ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। 

​দেশের আনাচে-কানাচে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় নাগরদোলা, পুতুলনাচ এবং মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও গ্রামীন শিল্পের সমাহার ঘটে। কুটির শিল্প ও মৃৎশিল্পের প্রসারে এই মেলার ভূমিকা অপরিসীম।আর এই মেলাকে বলা হয় বৈশাখী মেলা।

​৬. অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক

​পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সার্বজনীনতা। এটি কোনো ধর্মের উৎসব নয়, এটি শান্তি প্রিয় বাঙালিদের উৎসব। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টাব্দ—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই দিনটি উদযাপন করে। বৈশাখী পোশাকে লাল-সাদার আধিপত্য বাঙালির আবেগের রং হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণের দেয়াল ভেঙে সবাই যখন এক মিছিলে পা মেলায়, তখনই সার্থক হয় পহেলা বৈশাখের মূল চেতনা।

পহেলা বৈশাখের সকালে প্রথম কাজ হলো বাড়ি-ঘরের আঙ্গিনা পরিষ্কার করা।পহেলা বৈশাখের সকাল বেলা সবাই নতুন পোশাক পরে বন্ধু, বান্ধব ও আত্নীয় স্বজন নিয়ে সবাই মেলায় উপস্থিত হয়।কয়েকটি গ্রাামের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তৈরি হয় এক বিরাট  মেলা। যেখানে দেখা যায় গ্রাামীন শিল্পের উপস্থিতি। অনেক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এই দিনে ইলিশ ও পান্তা ভাতের আয়োজন করে থাকে। 

পহেলা বৈশাখের বিকালে বাঙালি মেতে উঠে আরেক উৎসবে।কারন এই দিন বিকালে প্রায় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন খেলা যেমন,লাঠ খেলা,কুস্তি,হাডুডু। তাছাড়া অনেক নদীর পাশে তৈরি হয় নৌকা বাইচ।অনেক খাল বিলে এই দিনে মাছ ধরার চাই, মাথাল, লাঙল এবং মাছের ডোলা নিয়ে মাছ ধরার ধুম পরে যায়।

বউ মেলা

ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে দেখা যায় আরেক টা সাংস্কৃতিক মেলা বসে যার নাম বউমেলা, এটি এলাকা বাসীদের কাছে "বটতলার মেলা" নামেও পরিচিত। ধারনা করা হয় এই মেলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়েজন করা হয়।আর এই মেলার বয়স প্রায় ১০০ বছর। প্রাচীন একটি বিশাল বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে।যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজোর জন্য এখানে একত্রিত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা তাদের মনের ইচ্ছা পূরণে জন্য এই পূজা করে থাকে। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার দেবীর উদ্দেশ্য নিবেদন করে । পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো এখানে অনেক পুরনো।

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির ঐতিহ্য ও বাংলা নববর্ষের ইতিহাস


এই সোনারগাঁওয়ে আরেক টা মেলার আয়োজন করা হয় তাহল ঘোড়ার মেলা।বলা হয়ে তাকে প্রাচীন কালে যামিনী সাধক নামের এক সন্ন্যাসী ঘোড়ার পিঠে করে এখানে আসত। তিনি নববর্ষের এই দিনে এখানে এসে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।  যামিনী সন্ন্যাসী মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তার স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়ে তাকে স্বরণ করে তার ভক্তবৃন্দ। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এই স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে সন্ন্যাসীর স্বরণে।যা পরর্বতী কালে মেলা ঘোড়ার মেলা হিসেবে আয়োজন করা হয়।  এ মেলার বিশেষ  আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় করে খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকে কলাপাতায় সেই খিচুড়ি দেওয়া হয় খাওয়ার জন্য। 

পহেলা বৈশাখ ও পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আধুনিক মিথ

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ নিয়ে আমরাদের জানার শেষ নাই তারপরেও বাংলার রাস্তাঘাটে এমন কিছু সত্য লুকিয়ে আছে যা আমাদের কে অবাক করে দেবে । নিচে কিছু পরিচিত সত্য তুলে দরলাম:

​১.  বাংলা সন প্রর্বতন সম্রাট আকবর নন,তাহলে কে?

​আমরা জানি সম্রাট আকবর ফসলি সনের সূচনা করেন। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এর সূচনা আকবরের আগে। গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল যখন সিংহাসনে বসেন তখন থেকেই বাংলাসন গণনা শুরু হয়। আকবর কেবল সেটাকে সংস্কার  ও পরিমার্জিত করে রাষ্ট্রীয় রূপ দিয়েছিলেন।

​২. হিন্দু ও হিজরি ক্যালেন্ডারের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ

​বাংলা বর্ষপুঞ্জিকা  আসলে একটি সৌর-চন্দ্র ক্যালেন্ডার। এটি প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু সৌর ক্যালেন্ডার এবং ইসলামিক হিজরি (চন্দ্র) ক্যালেন্ডারের একটি হাইব্রিড বা মিশ্র সংস্করণ। আকবরের  রাজসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিরজীর বুদ্ধিতে বাংলা সন চালু হয়েছিল যাতে কৃষকদের কর দিতে সুবিধা হয়।যেহেতু হিজরি ও ভারতীয় হিন্দু সৌর ক্যালেন্ডারের সাথে আমাদের ঋতুর মিল নেই তাই এটা তৈরি করা হয়। 

​৩. মঙ্গল শোভাযাত্রার আদি নাম ও স্থান

​অনেকে মনে করেন মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছে। আসলে এর প্রকৃত জন্ম ১৯৮৫ সালে যশোরে। তৎকালীন চারুপীঠ নামক একটি প্রতিষ্ঠান সর্বপ্রথম শোভাযাত্রা শুরু করে । সেই সময় এর নাম ছিল 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'।  যা পরিবর্তিত হয়ে "মঙ্গল শোভযাত্রা" রাখা হয়। ১৯৮৯ সালে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে শুরু হয়। পরবর্তীতে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।

​৪. চৈত্র সংক্রান্তি ও নীল পূজা

আগে ​পহেলা বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে 'গাজন' উৎসব বা নীল পূজা পালন করা হত। ৯৯% মানুষ জানে না যে, এই উৎসবে একসময় শরীরের বিভিন্ন অংশে বড়শি বিঁধিয়ে চড়ক গাছে ঘোরার প্রথা ছিল। যা এখন অনেক জায়গায় সরকার দ্বারা নিষিদ্ধ। এটি ছিল মূলত আদিম তান্ত্রিক সাধনা।  কৃষিজীবী সমাজের  চড়ক গাছে ঘোরার মাধ্যমে বৃষ্টি জন্য প্রার্থনা হিসেবে গন্য করত।

​৫. প্রথম বৈশাখী মেলা বনাম আজকের মেলা

​প্রাচীনকালে বৈশাখী মেলা একদিনেই শেষ হতো না। সাধারনত গ্রামের মেলাগুলো চলত পুরো সপ্তাহ জুড়ে। মজার ব্যাপার হলো, আজকের মতো পান্তা-ইলিশের খাওয়ার মতো কোনো রীতির চল তখন ছিল না। তখন মেলার মূল আকর্ষণ ছিল 'বাতাসা', 'কদমা' এবং মাটির খেলনা। পান্তা-ইলিশের সংস্কৃতিটি অনেক পরে মূলত ৮০-এর দশকে রমনার বটমূল থেকে শহুরে আভিজাত্য হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে।

​৬. ৯৬৩ সংখ্যাটির রহস্য

​অনেকেই জানেন না যে বঙ্গাব্দের প্রথম বছর আসলে '১' ছিল না। সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে, ৯৬৩ হিজরি এই ক্যালেন্ডার সংস্কার করেন।তখন সেই সময়  হিজরি সন ৯৬৩-কে ভিত্তি ধরে বঙ্গাব্দ চালু করেন। মানে বাংলা ক্যালেন্ডারের জন্মই হয়েছিল ৯৬৩ বছর থেকে। এ জন্য হিজরি ও বাংলা সনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান সবসময় একই থাকে।

​৭. বৈশাখী মেলা ও 'পুণ্যাহ' উৎসব

​বর্তমানে বৈশাখী মেলা বিনোদনের কেন্দ্র হলেও, অতীতে এর মূল ভিত্তি ছিল 'পুণ্যাহ'। জমিদার আমলে পহেলা বৈশাখে প্রজারা জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা মিটিয়ে দিতেন।তাি জমিদাররা খুশি হয়ে প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং উৎসবের আয়োজন করতেন। এই খাজনা আদায়ের দিনটিকে ঘিরেই মূলত মেলা ও জনসমাগমের শুরু হয়েছিল।

​৮. পান্তা-ইলিশের 'আধুনিক' ইতিহাস

​বাঙালি সংস্কৃতিতে পান্তা-ভাত হাজার বছরের পুরনো হলেও, পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতিটি খুব বেশি পুরনো নয়। এটি ১৯৮৩ সালে রমনার বটমূলে কয়েকজন সংস্কৃতিমনা কর্মীদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। এর আগে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী খাবার ছিল জিলাপি, রসমালাই,বাতাসা, চিড়া, দই, গুড় এবং নানা ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবার ।

​৯. কেন অগ্রহায়ণ নয়, বৈশাখ প্রথম মাস হল?

​৯৬৩ হিজরির আগে বছরের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। 'অগ্রহায়ণ' শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে পাওয়া যায় 'অগ্র' যার অর্থ প্রথম। 'হায়ন' অর্থ বছর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং ফসল কাটার সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিরজী বছরের শুরুটা বৈশাখ মাসে পিছিয়ে নেন। আর এখন পযন্ত এই নিয়মই চালু রয়েছে। 

​১০. ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নাম

​পহেলা বৈশাখ শুধু বাংলাদেশেপালন করা হয় এরকম ভাবলে আপনি ভুল করেছেন। এই দিনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে নববর্ষ পালিত হয়। যেমন:

​থাইল্যান্ডে: সংক্রান (Songkran)

​মিয়ানমারে: থিংইয়ান (Thingyan)

​শ্রীলঙ্কায়: আলুথ আবুরুদ্ধা (Aluth Avurudda)

​পাঞ্জাবে: বৈশাখী (Vaisakhi)

সবগুলো উৎসবই মূলত কৃষি এবং নতুন ফসলি বছরকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয়।

​১১. হালখাতার লাল খাতাই কেন ব্যবহার হয়?

​হালখাতায় ব্যবহৃত লাল খাতাটি কেন লাল রঙের হয় জানেন? প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, লাল রঙ হলো সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। ব্যবসায়ীরা মনে করত লাল খাতার মাধ্যমে বছরের হিসাব শুরু করলে ব্যবসায় বরকত আসবে এবং দেনা-পাওনার হিসাব পরিষ্কার থাকবে।এই বিশ্বাসের কারণে সবাই লাল খাতা ব্যবহার করে।

​১২. কেন বৈশাখের প্রথম দিনটিকেই বেছে নেওয়া হলো?

​সম্রাট আকবরের সময় যখন কর আদায়ের দিন নির্ধারণ করা হলো তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখল হিন্দু সৌর ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস 'বৈশাখ'। তাছাড়া হিজরি ক্যালেন্ডারের মাসের অবস্থান বৈশাখের  জায়গায় ছিল যা ফসল কাটার সাথে পুরোদমে মিলে যায়। বৈশাখে সবাই শস্য ঘরে তুলত ফলে কৃষকের হাতে তখন নগদ টাকা থাকতো। তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই বৈশাখকে বেছে নেওয়া হয় যাতে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা না চাপে।

​১৩. আমানি: নববর্ষের হারানো খাবার

​পান্তা-ইলিশের ভিড়ে আমরা 'আমানি' নামক একটি অত্যন্ত প্রাচীন খাবারের কথা ভুলে গেছি। আগেকার দিনে চৈত্র সংক্রান্তির রাতে মানে বৈশাখের আগের রাতে এক হাড়ি পানিতে পরিষ্কার আতপ চাল ভিজিয়ে রাখা হতো। আর তাতে একটি কচি নিম গাছের ছোট ডাল রাখা হতো। পহেলা বৈশাখের ভোরে সেই চাল ভেজানো জল (আমানি) বাড়ির সবাইকে পান করানো হতো।  তখন করা কুসংস্কারে ভেতরে এটা বিশ্বাস করা হতো এটি সারা বছর শরীরকে রোগমুক্ত এবং শীতল রাখবে।

​১৪. ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পহেলা বৈশাখ

​ব্রিটিশ আমলের শেষের দিকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা বাঙালির জন্য শুধু উৎসবের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না। তখন এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ। সেসময় ব্রিটিশ সংস্কৃতির বিপরীতে নিজেদের বাঙালি পরিচয় ফুটিয়ে তোলার জন্য এই দিনটিতে সবাই দেশি পোশাক পরে রাস্তায় নামতো এবং নিজেদের ঐক্য প্রদর্শন করতো।

​১৫. হিন্দু এবং মুসলিম ক্যালেন্ডারের ক্যালকুলেশন।

​ বাংলা সন বের করার সূত্র ছিল সেই সময়ে সবচেয়ে জটিল গনিত। হিজরি সাল যেহেতু চান্দ্র মাস ৩৫৪ দিন মেনে চলে এবং বাংলা সাল সৌর মাস ৩৬৫ দিন মেনে চলে, তাই  স্বাভাবিকভাবে প্রতি ৩৩ বছরে হিজরি সাল ১ বছর করে এগিয়ে যায়। আকবরের সময় যে সামঞ্জস্য তৈরি করা হয়েছিল, সেটি বজায় রাখতে এখনো গাণিতিক সূক্ষ্মতা প্রয়োজন হয়।

​১৬. 'বৈশাখ' নামের পেছনের রহস্য

​বাংলার প্রতিটি মাসের নাম রাখা হয়েছে একেকটি নক্ষত্রের নামানুসারে। বৈশাখ মাসের নামটি এসেছে 'বিশাখা' নামক নক্ষত্র থেকে। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, এই সময়ে চাঁদ যখন বিশাখা নক্ষত্রের অবস্থানে থাকে, তখনই এই মাসটি শুরু হয়।

​১৭. ব্যবসায়ীদের 'গাধা' পূজা? (একটি লোককথা)

​পুরনো ঢাকা এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বিশেষ প্রথা ছিল যা অনেকেই জানে না। আর তা হলো হালখাতার দিন তারা লক্ষ্মী-গণেশের সাথে সাথে অনেক সময় বাড়ির পোষা প্রাণীদেরও বিশেষ যত্ন নিতেন। অনেক জায়গায় একে লোকমুখে 'গাধা পূজা' বা প্রাণীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো বলা হতো। সেই সময় বিশ্বাস করা এই সব প্রাণীরাই পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের সাহায্য করতো।তাই তাদের পূজা করা হতো।

​১৮. বাংলা সন সংস্কারে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকা

​১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা  ক্যালেন্ডা সংস্কারণ করা হয় । কারণ লিপইয়ার বা অধিবর্ষের কারণে তারিখ উল্টোপাল্টা হয়ে যেত। তার সুপারিশ অনুযায়ী, এখন বছরের প্রথম ৫ মাস ৩১ দিন এবং বাকি ৭ মাস ৩০ দিন। অধিবর্ষে ফাল্গুন ৩১ দিন হিসেবে গণনা করা হয়। এই সংস্কারটি হয়েছিল যাতে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে ১৪ই এপ্রিলে পড়ে।

​১৯. 'নববর্ষ' বনাম 'হালখাতা': কোনটি আগে?

হালখাতার শুরু হয় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। হালখাতা শুরু হয় মুসলিমদের হাতে। আগের দিনে হালখাতা বা লালখাতায় লেখা থাকত "বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম" ও "এলাহি ভরসা" এরকম শব্দ । হালখাতার হাল ফার্সি শব্দ। এর অর্থ হলো নতুন।

অনেকে মনে করেন পহেলা বৈশাখ আর হালখাতা একই সাথে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে হালখাতা প্রথাটি নববর্ষ উদযাপনের চেয়েও পুরনো। মোঘল আমলের অনেক আগে থেকেই বাংলার ব্যবসায়ীরা চৈত্র মাসের শেষে ব্যবসার হিসাব মেলাতেন। সম্রাট আকবর যখন বাংলা সন চালু করেন, তখন তিনি এই প্রথাকেই রাজকীয় স্বীকৃতি দিয়ে বৈশাখের সাথে জুড়ে দেন।

​২০. বৈশাখী মেলায় 'পুতুল বিয়ে'

​এক সময় গ্রামীণ বৈশাখী মেলার অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল পুতুল বিয়ে। ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের পুতুলের বিয়ে দিত। মেলায় আগত বড়রা তাতে অভিভাবক হিসেবে যোগ দিতেন। এটি ছিল সামাজিক মেলবন্ধনের একটি অনন্য উপায়। যা আজ পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে।

​২১. মঙ্গল শোভাযাত্রার 'মুখোশ' এর প্রতীকী অর্থ

​৯৯% মানুষ মনে করে মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশগুলো কেবল সাজসজ্জা। আসলে প্রতিটি মুখোশের পেছনে গভীর অর্থ রয়েছে। যেমন:

​পেঁচা: বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার প্রতীক।

​বাঘ: সাহসিকতা ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক।

​মাছ বা পাখি: শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

এটি মূলত লোকজ সংস্কৃতির মাধ্যমে অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি নীরব প্রতিবাদ।

​২২. ঢাকার 'চৈতি ঘোড়া' নাচ

​পুরানো ঢাকার একটি হারানো ঐতিহ্য হলো 'চৈতি ঘোড়া' নাচ। পহেলা বৈশাখের ভোরে বাঁশ ও কাপড় দিয়ে তৈরি ঘোড়া নিয়ে শিল্পীরা পাড়ায় পাড়ায় নাচতেন। এর সাথে থাকতো ডোলের আওয়াজ। এখনকার যান্ত্রিক জীবনে এই দৃশ্য মেলা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। 

​২৩. প্রথম 'বৈশাখী কার্ড' বা শুভেচ্ছা বিনিময়

​আজকাল আমরা হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু আপনি কি জানেন, ১৯ শতকের শেষের দিকে কলকাতার বাবুরা এবং ঢাকার নবাবরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ হাতে আঁকা কার্ড ছাপাতেন? সেই কার্ডগুলোতে থাকত কুশল বিনিময় এবং আগামী বছরের মঙ্গল কামনা। এটি ছিল বাঙালির নিজস্ব স্টাইলে 'উইশিং কার্ড' ব্যবহারের প্রথম দিককার উদাহরণ।প্রথম বৈশাখী শুভেচ্ছা বার্তা

​প্রচলন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৯৪ সালে ১৩০১ বঙ্গাব্দ শান্তিনিকেতনে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ পালন করা হয়। তার আগে এটি মূলত ব্যবসায়িক 'হালখাতা' য় সীমাবদ্ধ ছিল। 

​২৪. ‘ফসলি সন’ থেকে ‘বঙ্গাব্দ’ নামের রূপান্তর

​শুরুতে এই সনের নাম কিন্তু বঙ্গাব্দ ছিল না। মোঘল আমলে এর দাপ্তরিক নাম রাখা হল ‘তারিখ-ই-এলাহি’। যেহেতু এটি মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, তাই সাধারণ মানুষ একে ‘ফসলি সন’ বলত। অনেক পরে বাঙালির জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হওয়ার সময় এটি 'বঙ্গাব্দ' বা 'বাংলা সন' হিসেবে পরিচিতি পায়।

​২৫. বৈশাখের সাথে ‘নিম’ ও ‘হলুদের’ সম্পর্ক

​গ্রামীণ বাংলায় পহেলা বৈশাখের ভোরে গায়ে হলুদ মেখে স্নান করার একটি প্রাচীন রীতি ছিল। এছাড়া অনেকে নিমের পাতা কাঁচা চিবিয়ে খেত। বিজ্ঞানসম্মতভাবে এর কারণ হলো—চৈত্র-বৈশাখ মাসে বসন্ত বা জলবসন্তের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। নববর্ষের শুরুতে শরীরকে জীবাণুমুক্ত রাখতে আমাদের পূর্বপুরুষরা এই ভেষজ নিয়মটি উৎসবের অংশ করে নিয়েছিলেন।

​২৬. মঙ্গল শোভাযাত্রার ইউনেস্কো স্বীকৃতি কেন অনন্য?

​২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৯৯% মানুষ জানে না যে এই স্বীকৃতির একটি মূল কারণ ছিল—এটি কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (Secular) উৎসব। যা একটি পুরো জাতিকে একত্রিত করে। বিশ্বের খুব কম উৎসবই এমন বিশুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার স্বীকৃতি পেয়েছে।

​২৭. সূর্য সিদ্ধান্তের প্রভাব

​বাংলা ক্যালেন্ডারের গণনার মূলে রয়েছে প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ 'সূর্য সিদ্ধান্ত'। অবাক করা তথ্য হলো, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল টেলিস্কোপ ছাড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদরা সূর্যের গতিবিধি মেপে বৈশাখ মাসের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেছিলেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়।

​২৮. ভারতের সাথে বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখের ১ দিনের পার্থক্য কেন?

​অনেকেই খেয়াল করেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ সাধারণত বাংলাদেশের একদিন পরে ১৫ই এপ্রিল পালিত হয়। এর কারণ হলো:

​বাংলাদেশ: ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ক্যালেন্ডার সংস্কার করে বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিন লিপইয়ারে ফাল্গুন ৩১ দিন স্থায়ী করা হয়। এর ফলে তারিখটি ১৪ই এপ্রিলে স্থির থাকে।

​ভারত: পশ্চিমবঙ্গ এখনো প্রাচীন 'তিথি' বা জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করে, যেখানে সূর্যের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হতে পারে।

​২৯. কড়ির মাধ্যমে লেনদেন

​আজ থেকে কয়েকশ বছর আগেও বৈশাখী মেলায় ধাতব মুদ্রার চেয়ে কড়ির (Cowrie shells) প্রচলন বেশি ছিল। বিশেষ করে মাটির পুতুল বা মন্ডা-মিঠাই কেনার জন্য ছোট ছোট কড়ি ব্যবহার করা হতো। এই কড়ি প্রথাটি বৈশাখের গ্রামীণ বাণিজ্যের একটি ঐতিহাসিক চিহ্ন।

​৩০. ‘গাজন’ ও ‘চড়ক’ এর তফাৎ

​অনেকেই গাজন আর চড়ককে এক মনে করেন। আসলে গাজন হলো উৎসবের নাম যা কয়েক দিন ধরে চলে আর চড়ক হলো সেই উৎসবের চূড়ান্ত ও সমাপনী আনুষ্ঠানিকতা। এটি মূলত শিব এবং কালীর মিলনের উৎসব হিসেবে পালিত হয়, যেখানে ভক্তরা আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে কৃচ্ছ্রসাধন করে।

​৩১.  বৈশাখের সাথে 'ইলিশের' কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই

​এটি শুনলে অনেকে অবাক হবেন, কিন্তু পহেলা বৈশাখের সাথে ইলিশ মাছের কোনো সম্পর্ক নেই। ইলিশ হলো বর্ষাকালের মাছ। বৈশাখ মাসে ইলিশ ধরা জাটকা সংরক্ষণের পরিপন্থী। ১৯৮৩ সালে রমনার বটমূলে পান্তার সাথে ইলিশ খাওয়া শুরু হয়েছিল স্রেফ শখের বশে, যা পরে ভািরাল হয়ে ট্রেন্ডে পরিণত হয়। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি এই দিনে তেতো নিম পাতা বা করলা দিয়ে খাবার শুরু করত যাতে সারা বছর রোগবালাই না হয়।

​৩২.‘চৈত্র সেল’ এর প্রকৃত কারণ

​এখন আমরা বৈশাখ উপলক্ষে যে 'চৈত্র সেল'  তার পেছনে একটি অর্থনৈতিক ইতিহাস আছে। আগেকার দিনে যেহেতু বৈশাখে নতুন খাতা খোলা হতো, তাই ব্যবসায়ীরা চাইতেন চৈত্র মাসের মধ্যে তাদের পুরনো সব স্টক শেষ করে হিসাব পরিষ্কার করত। এই হিসাব ক্লোজিং থেকেই মূলত 'চৈত্র সেল' বা সস্তায় পণ্য বিক্রির প্রথা শুরু হয়েছিল।

​৩৩.  ভিন্ন ধর্মে পহেলা বৈশাখ

​শুধু হিন্দু ধর্মে নয়, শিখ ধর্মেও এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। ১৬৯৯ সালের এই দিনে গুরু গোবিন্দ সিং 'খালসা' পন্থ প্রবর্তন করেছিলেন। তাই তারা একে 'বৈশাখী' (Vaisakhi) হিসেবে বিশাল উৎসব করে পালন করে। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এই সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

​৩৪.  মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রথম স্লোগান

​১৯৮৯ সালে যখন প্রথম ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়, তখন এর নাম ছিল 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'। সেই প্রথম মিছিলে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, তবে একটি বিশাল ম্যাকারল মাছ এবং একটি বক তৈরি করা হয়েছিল। যা ছিল গ্রাম বাংলার সাধারণ জীবনের প্রতীক।

​পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে, আমাদের শিকড় কোথায়। বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে বিদেশি সংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করতে চাইছে, সেখানে বাংলা নববর্ষ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার শক্তি যোগায়। এটি কেবল আনন্দ-উল্লাসের দিন নয়, এটি নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন—অশুভকে পেছনে ফেলে সুন্দরের পথে এগিয়ে যাওয়ার দিন।

​আসুন, নববর্ষের এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা গড়ি এক সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।

​শুভ নববর্ষ!


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন