কে ছিলেন আ্যাডলফ হিটলার

 আডলফ হিটলারের জীবনী: অস্ট্রিয়া থেকে নাৎসি সাম্রাজ্য

কে এই রহস্যময় ব্যাক্তি হিটলার?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে পড়লে যার কথা না বললেই নয় তিনি এডলফ হিটলার। হিটলার কে চেনেনা এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জার্মানি উত্থান  এর নায়ক, আবার কারো কারো কাছে মুদ্রার অপর পিঠ।তার সাম্রাজ্যবাদের কারণে ইতিহাসে তিনি এক খলনায়ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়েছে। 

তার উত্থান শাসন এবং পতনে প্রতিটি ধাপ আজও গবেষকদের কাছে আলোচনার বিষয়। সাধারণ মানুষদের মধ্যেও এই মানুষটার প্রতি এখনো বেশ আগ্রহ রয়েছে। তিনি জার্মানের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পযন্ত দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। তখন থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর এক অস্থির পরিস্থিতি। 

কে ছিলেন এই হিটলার 

হিটলার এর পুরো নাম অ্যাডলফ হিটলার(Adolf Hitler)। জন্ম ১৮৮৯ সালে ২০ এপ্রিল অস্ট্রেয়া ব্যাভেরিয়ার মাঝামাঝি ব্রুনাই নামে গ্রামে।এক লোক হিটলার জন্মসূত্র ছিলেন একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। হিটলারের বাবার নাম অলয়েস হিটলার (Alois Hitler)।তিনি ছিলেন স্বপ্ল বেতনের এক সরকারি কর্মচারী। আর তার মা ক্লারা হিটলার (Klara Hitler) ছিলেন একজন গৃহিণী। হিটলার ছিলেন তার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান। ছয় বছর বয়সে তিনি স্থানিক ফিশলহ্যামের (Fischlham) একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ মে ১৮৯৫ সালে তিনি অস্ট্রিয়ার ল্যাম্বাচের কাছে অবস্থিত এই সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন।


ছোটবেলা থেকেই হিটলার ছিল একঘেয়ে, রাগীও জেদি।।সামান্য ব্যাপারে তিনি রেগে যেতেন। অকারনে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে তর্ক করতেন। হিটলারের সেই শিক্ষক ড.এডওর্য়াড হুয়েমার বলেছেন "সে নিঃসন্দেহে মেধাবী ছিল, ভারসাম্যহীন ছিল, তবে সহিংস ছিল না। অবশ্য অবাধ্য হিসেবে বিবেচিত ছিল।আর সে কঠোর পরিশ্রমই ছিল না। " কিন্তু পড়াশোনা থেকে বেশি আকৃষ্ট করতো ছবি আঁকা। যখনই সময় পেতেন তখনই কাগজ পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতেন।
জার্মানির ফুয়েরার
জার্মানির ফুয়েরার
কাজের মেয়াদ
২ আগস্ট ১৯৩৪ – ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫
পূর্বসূরী পল ভন হিন্ডেনবুর্গ
(জার্মানির রাষ্ট্রপতি হিসেবে)
উত্তরসূরী কার্ল ডেনিৎস (রাষ্ট্রপতি হিসেবে)
জার্মানির চ্যান্সেলর
কাজের মেয়াদ
৩০ জানুয়ারি ১৯৩৩ – ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫
রাষ্ট্রপতি পল ভন হিন্ডেনবুর্গ (১৯৩৩–১৯৩৪)
উপ-চ্যান্সেলর ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন (১৯৩৩–১৯৩৪)
পূর্বসূরী কুর্ট ভন শ্লাইখার
উত্তরসূরী জোসেফ গোয়েবলস

 ১১ বছর বয়সে ঠিক করলেন আর পড়াশোনা নয় এবার পুরোপুরি ছবি আঁকতেই মনোযোগী হবেন। স্থানীয় এক আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। এরপর এক বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হলেন। এডলফ হিটলারের ছোটবেলার বন্ধু অগুস্ট কুবিসেক বলেন ,"আত্মীয় স্বজনরা তাকে এমন ফালতু মনে করত, সে কিনা সব ধরনের কঠিন কাজ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখত।

 যার মনে এতটাই ইহুদী বিদ্রেষ তার নাকি প্রথম প্রেম ছিল একই ইহুদি কিশোরী। অ্যাডলফ হিটলার যখন অস্ট্রিয়ার লিনজ (Linz) শহরে স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তখন তিনি প্রথম প্রেমে পড়েছিলেন। সেই মেয়েটির নাম ছিল স্টেফানি আইজ্যাক (Stefanie Isak)।হিটলারের বয়স তখন ১৬ বছর। তবে হিটলারের ঘনিষ্ঠ নারীদের কথা বললে যার কথা সবার আগে চলে আসবে তিনি ইভা ব্রাউন।১৭ বছর বয়সে হিটলারের সাথে তার পরিচয় হয়।

হিটলারের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যার কারনে ৪০ বছর বয়সে হিটলারের প্রতি আকর্ষিত হয় ইভা ব্রাউন। হিটলার তার মায়ের প্রতি খুব দুর্বল ছিলেন।।তাই সব সময় মায়ের ছবি সঙ্গে নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন। ২০০৭ সালে মায়ের মৃত্যুর পর হিটলার পুরোপুরি ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। মায়ের মৃত্যুর পর অর্থের অভাবে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। ভাগ্য অন্বেষণের জন্য বেরিয়ে পরলেন হিটলার। 

প্রথমে যোগ দেন দিনমজুরির কাজে। ১৯১২ সালে হিটলার ভিয়েনা থেকে মিউনিখে যান।এই দুঃখ, কষ্টে আরো দুই বছর কেটে যায়।১৯১৪ সালের শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।তখন হিটলার সৈনিক হিসেবে জার্মানিতে এ যোগ দেয়। এই যুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিলেও কোনো পদোন্নতি হয়নি হিটলারের। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেশ জুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এরমধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে বিভিন্ন বিপ্লবী দল ও রাজনৈতিক দল। এদের উপর দৃষ্টি রাখার জন্য হিটলার কে নিয়োগ করে কতৃপক্ষ। 

সেই সময় প্রধান রাজনৈতিক দল লেবার পার্টি।তিনি সেই পার্টির সদস্য হলেন।অল্প দিনেই পাকাপাকি ভাবে পার্টিতে নিজের স্থান তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি।এক বছরের মধ্যেই তিনি হন লেবার পার্টির প্রধান ব্যাক্তি হয়ে উঠলেন।দলের নতুন নাম রাখা হয় ন্যাশনাল ওয়ার্কাস পার্টি।পরর্বতী কালে এই দল কে বলা হত নাৎসি পার্টি। 

 ১৯২০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারী প্রথম নাৎসি দলের সভা ডাকা হয়।এতেই হিটলার প্রকাশ করলেন তার ২৫ দফা দাবি।এরপরে হিটলার প্রকাশ করলেন স্বস্তিকা (Swastika) চিহ্ন যুক্ত দলের পতাকা।স্বস্তিকা (Swastika) বা জার্মান ভাষায় 'হাকানক্রাজ' (Hakenkreuz)।ধিরে ধিরে নাৎসি দলের জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩ বছরের মধ্যেই সদস্য হলো প্রায় ৫৬ হাজার। 

 হিটলার চেয়েছিলেন মিউনিখে অন্য কোনো দলের অস্তিত্ব যেন না থাকে। এই সময় ১৯২৩ সালে মিউনিখে অভ্যুত্থান করতে গিয়ে তার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো।পুলিশের হাতে ধরা পরলেন। ১৯২৪ সালে জার্মানির লন্ডসবার্গ কারাগারে (Landsberg Prison) তাকে ১ বছরের জন্য বন্দী করা হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার রাজনীতিক ষড়যন্ত্রের কাজে ঝাপিয়ে পড়লেন।

তার উগ্র স্পষ্ট মতবাদ, বলিষ্ঠ বক্তব্য জার্মানদের কে আকর্ষন করত।দলে দলে যুবকেরা তার দলের সদস্য হতে লাগল।সমস্ত দেশে জনপ্রিয় নেতা হবে উঠলেন হিটলার। ১৯৩৩ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না।বুঝতে পারলেন ক্ষমতা অর্জন করতে গেলে অন্য পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়ায় হিটলার পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিলেন। এর শুরু হলো ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত। বিরোধী দলের অনেকে খুন হলেন,অনেকে আবার মিথ্যা অপবাদে জেলে বন্দী করলেন। বিরোধী দলের ভেতর নিজের দলের লোক প্রবেশ করিয়ে, বিরোধী দলের ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেন। অল্প ক'দিনের ভিতরে বিরোধীদল কে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে হিটলার হয়ে উঠলেন শুধু নাৎসি দলের নয় জার্মানির ভাগ্যবিধাতা। 

 জেল খাটার ঠিক ১০ বছর পর ভোটে জিতে জার্মানির ক্ষমতায় আসনে বসেন। ১৯৩৩ সালে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন।১৯৩৪ সালে হিটলার রাষ্ট্রপতুর বদলে জার্মানির ফুয়ারার' (Führer) বা 'সর্বাধিনায়ক' হিসেবে ঘোষণা করেন।অল্প কিছুদিনের ভিতরে তিনি দেশের অবিসংবাদিক নেতা হিসেবে ঘোষণা দিলেন। তার সাফল্যের মূলে ছিল জনগণকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আপনার রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পুনরায় সাজান।সামরিক বাহিনীকে নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে। 

১৯৫৬ হিটলার নতুন আইন চালু করলেন। তাতে দেশের নাগরিককে দুটি ভাগে ভাগ করা হলো। জেন্টিল আর জু।জেন্টিল অর্থাৎ জার্মান বা খাটি আর্য।আর জু হলো ইহুদিরা।তারা শুধু জার্মান দেশের বসবাসকারী নাগরিক নয়।প্রয়োজনে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। দেশ জুড়ে জার্মানদের বিরুদ্ধে তৈরি করা হলো তীব্র ইহুদি বিদ্রোসী মনোভাব। 

হিটলারের চরিত্রে আরো কিছু বিশেষ দিক ছিল যেমন, বিশ্বের প্রথম ধূমপানবিরোধী পরিচালনা করেন। এক জার্মান ডাক্তার ধূমপান ও ফুসফুস ক্যান্সারের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করলে হিটলার তখন ধূমপানের ঘোর বিরোধী হয়ে পড়েন। ১৯৩৯ সালে তিনি প্রথম এন্টিন্স্মোকিং ক্যাম্পিং করেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নিজস্ব মিলিটারিদের মধ্যেও ধূমপান কঠোর নিষিদ্ধ করা হয়। এর কারনে হিটলার নোবেল প্রাইজ এর জন্য মনোনীত হয়েছিল । ১৯৩৯ সালে নোবেল প্রাইচ এর জন্য সুইডেনের পার্লামেন্ট সদস্য এরিক গটফ্রিড ক্রিশ্চিয়ান ব্রান্ড (Erik Gottfrid Christian Brandt) হিটলার কে মনোনীত করেন । তিনি ছিলেন একজন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং কট্টর ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনীতিবিদ। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের কারণে এই মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়েছিল। 

 হিটলার জার্মান জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পোল্যান্ড এর কাছে ডানজিগ পোলিশ করিডোর দাবি করলেন হিটলার যাতে এই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারে। তার নেতৃত্বে ১৯৩৯ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেন। যা পরবর্তীতে পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। হিটলারের সেনাবাহিনীর নাম ছিল ওয়েহারমাচ।যা ছিল জার্মানির নাৎসি বাহিনীর মূল সামরিক নাম। নাৎসি জার্মানির সেনাবাহিনী অর্থাৎ ওয়েহারমাচ একের পর এক ইউরোপীয় দেশ দখল করে নেয়। পোল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, নেদারল্যান্ড সহ অনেক দেশ নাৎসি জার্মান বাহিনীর কাছে আত্মা সমর্পণ করে। এই আক্রমনাত্মক নীতির মাধ্যমে তিনি অতি দ্রুতই ইউরোপীয় আধিপত্য বিস্তার করেন। ফ্রান্সের পতনের পর 1941 সালে ২২শে জুন সমস্ত চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করল।

 হিটলার ভেবেছিলেন রাশিয়া অধিকার করতে পারলে সমস্ত ইউরোপ আপনা আপনি তার অনুগত হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর আক্রমণ করে নাৎসিরা প্রাথমিক সাফল্য পায়। এই সফলতা হিটলার কে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন এখন আর তার পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা। এই আত্মবিশ্বাস থেকে শুরু হয় "ফাইনাল সল্যুশন" নামে এক ভয়ংকর পরিকল্পনা।যার লক্ষ্য ছিল ইউরোপ থেকে সম্পূর্ণ ইহুদী জাতিকে নিঃশেষ করে দেওয়া। 

১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনীর দ্বারা যে হত্যা যোগ্য চালানো হয়েছিল তাই ইতিহাসে "হলোকাস্ট" নামে পরিচিত। হিটলারের রাজ্য জয় ও বর্ণবাদীর আগ্রাসনের কারণে ৬০ লক্ষ বেশি ইহুদী নারী-পুরুষ সকলকে নির্বিশেষে হত্যা করা হয়।

 তিনি ইহুদিদের হত্যা করতে বানিয়েছিলেন অসংখ্য "কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প"। হিটলারের ইহুদি বিদ্রোষ জন্ম নেয় তার শৈশবে। একাডেমি অফ ফাইন আর্টস ভিয়েনা স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে ইহুদী সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রদের প্রভাবে একাধিকবার প্রত্যাখিত হয় হিটলার। অনেকেই মনে করেন এখান থেকে ইহুদীদের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব তৈরি হয়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানের পরাজয়ের জন্য তিনি ইহুদীদের দায়ী করেন। তার বিশ্বাস ছিল ইহুদিরা রাজতন্ত্র উৎখাত করে জার্মানিকে দুর্বল করে দেয়। তাছাড়া হিটলারের মতে জার্মান অর্থনীতি ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে এই ইহুদি ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা ।

 তার কাছে এটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র যা ইহুদী বিদ্বেষ হিসেবে সে কল্পনা করত। এই ষড়যন্ত্রে রুখতে তার আত্মঘাতী ও অমানবিক সিদ্ধান্ত। তবে তার মনে কেন ইহুদী বিদ্রোহের জন্ম নেয় তা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে।

 অনেকের মতে ভিয়েনাতে থাকা অবস্থায় হিটলারের মনে জেগে ওঠে ইহুদি বিদ্রেষ।তখন জার্মানির অধিকাংশ কল কারখানা ও সংবাদপত্রের নিয়ন্তক ছিল ইহুদীরা। দেশের অর্থনীতি অনেকটা অংশ তখন নিয়ন্ত্রণ করত ইহুদীরা। হিটলার কিছুতেই মানতে পারছিল না জার্মান দেশে বসে ইহুদীরা জার্মানদের উপর প্রভুত্ব করবে। হিটলার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, "ইহুদিরা বেইমান জাতি।এদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই। একদিন বিশ্ববাসী বুঝবে ওদের সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা। "

 পৃথিবীর ইতিহাসে তার নাম নাৎসি অনুসারী শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও জার্মানিদের কাছে তিনি মহানায়ক। তো কি কারনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সবাই কেন এত ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন? নাৎসি পার্টির প্রধান হওয়ার পিছনে হিটলারের মনে ছিল অন্য দল থেকে প্রত্যাখিত হওয়ার যন্ত্রণা। জার্মানি সোশ্যাল পার্টিতে যোগ দিতে চেয়েছিল হিটলার। জার্মান সোশ্যাল পার্টি ক্ষমতায় নিজেদের সদস্য হিসেবে হিটলার কে গ্রহণ করেননি। পরে হিটলার নাৎসিদের সঙ্গে যোগ দেয়।১৯২১ সালের ২৯ জুলাই তাদের নেতা হয়ে ওঠেন ও পরের বছর জার্মান সোশ্যাল পার্টিতে বিলুপ্ত করা হয়।

 হিটলার তার শত্রুদের বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিশোধের খেলা খেলেছে। কিন্তু কেন সোশ্যাল পার্টি এর লোকজনেরা হিটলার কে তাদের দলে রাখেনি কারণ হিটলার মতবাদ প্রদানে ছিলেন একদম স্পষ্টবাদী। যদি হিটলার ওই দলে যোগ দিতেন তখন নাৎসিদের ইতিহাস হয়তো এমন হতো না। হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই হতো না। হতো না হলোকাস্ট নামে খেলা।

 জনশ্রুতি আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার নাৎসি বাহিনীদের ভয়াবহতা ও লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু গুপ্ত হত্যা এসব কিছুর গোড়াতে রয়েছে ষড়যন্ত্রকারী এক টেলিফোন। এই টেলিফোন এর মাধ্যমে নাকি একের পর এক নিষ্ঠুরতম নির্দেশ দিয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলার। এই কারণে অনেকে হিটলারের এই ফোনকে অভিশপ্ত বলে থাকেন। 

যতটুকু জানা যায় জার্মানে নাৎসিদের সমন্বিত বাহিনী ওয়েরহারমাস থেকে এই টেলিফোনটি হিটলার কে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। টেলিফোনটি স্বয়ং হিটলার ব্যবহার করতেন। যেখানেই যাক না কেন তিনি এই ফোনটি সবসময় নিজের কাছেই রাখতেন। এই ফোনের মাধ্যমে তিনি যাবতীয় নির্দেশ প্রদান করতেন।এই  টেলিফোন কে বলা হয় device of destruction বা ধ্বংসের যন্ত্র। 

হিটলার কে কম করে হলেও ২৭ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। হিটলার কে যতবারই হত্যা আর চেষ্টা করা হোক না কেন প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৪৫ সালে জার্মানি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালে জানুয়ারি মাস থেকে বাঙ্কারে ছিলেন স্ত্রী সহ হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী সময়ে জায়গা হয়ে উঠেছিল হিটলারের প্রধান কর্মক্ষেত্র।

 এডলফ হিটলার ১৯৪৫ সালে ৩০ এপ্রিল জার্মানের বার্লিন শহরে একটি সুরক্ষিত বাংকারে আত্মহত্যা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে যখন মিত্রবাহিনী জার্মানির রাজধানী ঘিরে ফেলে এবং নাৎসি বাহিনী নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি হয়, তখন তিনি আত্মসমর্পন না করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। তার মৃত্যুর সময় মারা যাওয়ার কিছু ঘণ্টা আগে তিনি তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ইভা ব্রাউনকে বাঙ্কারের মধ্যেই বিয়ে করেন। তারা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই একসাথে আত্মহত্যা করেন। 

হিটলার সায়ানাইড খেয়ে ও মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর পর তার লাশ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ ছিল যাতে তার দেহটুকুও শত্রুর হাতে না পড়ে। যদিও কিছু বিতর্কিত তথ্য এই মানুষটার মৃত্যুকে ঘিরে ভিন্ন কিছু দাবি করে। যেমন: তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন দক্ষিণ আমেরিকায় কিংবা আর্জেন্টিনায়। সেখানে ৯৫ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।"কিন্তু এগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমান নেই। 

 হিটলারের মৃতদেহ জার্মান সৈন্যরা বাঙ্কার থেকে বের করে রাইখ চ্যান্সেলরের বাগানে একটি গর্তে ফেলে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। তার মৃতদেহের কিছু অংশ রুশরা উদ্ধার করে এবং তা মস্কোয় নিয়ে যায়।

কয়েকদিন পর ৭ই মে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। ইউরোপে ছয় বছরের যুদ্ধের অবসান হয়। এভাবেই শেষ হয় বিশ্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী এক শাসকের উপাখ্যান।"

হিটলারের অমর উক্তি বাংলায়


উক্তি সমূহ
১. "যদি কোন মিথ্যাকে তুমি বারবার এবং সাবলীলভাবে বলতে পারো তবেই তা বিশ্বাসযোগ্য হবে।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
২. "একজন খ্রিস্টান হিসেবে প্রতারিত হওয়া আমার কর্তব্য নয়, কর্তব্য হলো সত্য এবং ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করা।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৩. "আমি তোমাদের ভালোবাসায় না গিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি, কারন যুদ্ধে তুমি হয় বাঁচবে না হয় মরবে, কিন্তু ভালোবাসলে না পারবে বাঁচতে না পারবে মরতে।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৪. "একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও। অপছন্দের চেয়ে ঘৃণার স্থায়িত্ব বেশি।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৫. "জার্মানি হবে পৃথিবীর সর্বশক্তিমান নয়তো কিছুই নয়। সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা এবং বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে শত্রুর মনোবল ভেঙে দাও, এটাই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৬. "যে ব্যাক্তি আকাশকে সবুজ দেখে এবং জমিনকে আঁকে নীল রঙে তাকে নপংসুক করে দেয়া কর্তব্য।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৭. "শক্তি প্রতিরোধে নয়, আক্রমণেই প্রকাশিত হয়। কে বলেছে আমি ঈশ্বরের দ্বারা সুরক্ষিত নই।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)
৮. "যে যুবক ভবিষ্যৎকে জয় করে, সে হয় একা।"
এডলফ হিটলার     বই: মাইন কাম্ফ (Mein Kampf)

হিটলারের ডাইরি  

 ১৯৪৫ সালের ৩০শে এপ্রিলে যখন সোভিয়েত রেড আর্মি বার্লিন ঘিরে ফেলেছিল, তখন হিটলার তার বাংকারে সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে এবং নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

ডায়রির আবির্ভাব ও চাঞ্চল্য

​হিটলারের মৃত্যুর ৩৮ বছর পর, ১৯৮৩ সালের ২৫শে এপ্রিল জার্মান ম্যাগাজিন ‘স্টার্ন’ (Stern) এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য সানডে টাইমস’ (The Sunday Times) দাবি করে যে তারা হিটলারের ৬০টি ডায়রির সন্ধান পেয়েছে।

​স্টার্ন ম্যাগাজিন দাবি করে যে এই ডায়রিগুলো ১৯৩২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে লেখা।

​ডায়রিতে এমন ইঙ্গিত ছিল যে হিটলার নাকি ইহুদি গণহত্যা বা হলোকাস্ট সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না—যা প্রচলিত ইতিহাসকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার মতো এক বিস্ফোরক তথ্য ছিল।

ডায়রি পাওয়ার গল্প

​স্টার্নের সাংবাদিক গার্ড হাইডেম্যান (Gerd Heidemann) জানান যে, ডায়রিবাহী একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ডায়রিগুলো উদ্ধার করে খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে তা পূর্ব জার্মানির এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। স্টার্ন এই ডায়রিগুলোর জন্য প্রায় ২৩ লক্ষ পাউন্ড খরচ করেছিল।

জালিয়াতি ধরা পড়া

​বিখ্যাত ইতিহাসবিদ লর্ড ডাক্রে (Hugh Trevor-Roper) শুরুতে ডায়রিগুলোকে আসল মনে করলেও দ্রুতই জালিয়াতি ধরা পড়ে। ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়:

​ডায়রিতে ব্যবহৃত কাগজ, আঠা এবং কালি সবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তৈরি।

​এতে অনেক ঐতিহাসিক ভুল তথ্য ছিল এবং হিটলারের স্বাক্ষরও ছিল জাল।

হোতা এবং ফলাফল

​তদন্তে জানা যায়, এই জাল ডায়রিগুলোর লেখক ছিলেন কনরাড কুজাউ (Konrad Kujau)। তিনি হিটলারের হাতের লেখা নকল করে এগুলো লিখেছিলেন।  ডায়রিগুলো পুরনো দেখাতে সেগুলোর ওপর চা ঢেলে ঘষে নিতেন।

​১৯৮৫ সালে জালিয়াতির দায়ে কুজাউকে সাড়ে চার বছরের এবং সাংবাদিক হাইডেম্যানকে চার বছর আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

​এই কেলেঙ্কারির ফলে স্টার্ন এবং সানডে টাইমসের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা চাকরি হারান এবং পত্রিকা দুটির সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

​শেষে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক এই জালিয়াতি সত্ত্বেও সানডে টাইমস ডায়রিগুলোর খবর প্রচারের মাধ্যমে তাদের পত্রিকা বিক্রিতে ব্যাপক মুনাফা অর্জন করেছিল।

এডলফ হিটলারের জবানিতে তার জীবন কাহিনি

মাইন কাম্ফ (Mein Kampf) হলো এডলফ হিটলার দ্বারা রচিত তার নিজ আত্মাজীবনি।মাইন কাম্ফ (Mein Kampf) যার বাংলা অর্থ হল "আমার সংগ্রাম "।অ্যাডলফ হিটলার তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক ইশতেহার ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'মাইন কাম্ফ' (Mein Kampf বা আমার সংগ্রাম) ১৯২৪ সালে ল্যান্ডসবার্গ কারাগারে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় লিখতে শুরু করেন । বইটির প্রথম খণ্ড ১৯২৫ সালের ১৮ জুলাই ২০২৫ সালে  এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় ।
Download book with Bengali PDF Download

ডাউনলোড করতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন



 

​১. একটি কুখ্যাত বইয়ের রহস্য

​বইটিকে ইতিহাসের এক ‘নিকষ কালো অধ্যায়ের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি একদিকে যেমন নিষিদ্ধ, অন্যদিকে সহজলভ্য—যা মানুষের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল ও ভয়ের জন্ম দেয়।

​২. কারাগারে লেখা ম্যানিফেস্টো

​১৯২৩ সালে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর হিটলার যখন কারাগারে ছিলেন, তখন তিনি এটি লিখেছিলেন। ১৯২৫-২৬ সালে বইটির প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। এটি ছিল হিটলারের আত্মজীবনী ও রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি সংমিশ্রণ।

​৩. ঘৃণার নীল নকশা

​ বইটিকে ‘ঘৃণার ইশতেহার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এর মূল ধারণাগুলো ছিল:

​আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব: আর্যরাই শ্রেষ্ঠ এবং অন্যদের ওপর শাসন করার অধিকারী।

​ইহুদি বিদ্বেষ: ইহুদিদেরকে বিশ্বের জন্য বিপদ হিসেবে চিত্রিত করা।

​লেবেনস্রম (Lebensraum): জার্মানদের বসবাসের জন্য পূর্ব ইউরোপে আরও জায়গা দখল করা।

​গণতন্ত্র বিরোধী: সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করার পরিকল্পনা।

​বিষাক্ত গ্যাসের ব্যবহার: বইটিতে ১২-১৫ হাজার ইহুদি দুর্নীতিবাজকে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে হত্যার কথা বলা হয়েছিল, যা পরে ‘হলোকাস্ট’-এর সময় বাস্তব রূপ পায়।

​৪. প্রচারণার শক্তি

​১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার আগে বইটির বিক্রি ছিল সাধারণ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় করা হয়। নবদম্পতি ও সৈন্যদের এই বই উপহার দেওয়া হতো। ১৯৪৫ সালের মধ্যে ১৮টি ভাষায় বইটির প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল।

​৫. একটি বিতর্কিত উত্তরাধিকার

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তি বইটির কপিরাইট জার্মানির বাভারিয়া রাজ্য সরকারকে দিয়ে দেয় যাতে এর প্রচার বন্ধ করা যায়। তবে দেশভেদে বইটির আইনি অবস্থা ভিন্ন:

​জার্মানি: টিকা বা ব্যাখ্যাসহ সংস্করণের অনুমতি আছে।

​অস্ট্রিয়া ও পোল্যান্ড: সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

​আমেরিকা: মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে এটি বৈধ ও সহজলভ্য।

​৬. ইতিহাস দিয়ে ঘৃণার মোকাবিলা

​২০১৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর বইটির ৭০ বছরের কপিরাইট শেষ হয়। এরপর জার্মান ইতিহাসবিদরা বইটির একটি ‘ক্রিটিক্যাল এডিশন’ প্রকাশ করেন। এতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টিকা বা নোট যুক্ত করা হয়েছে, যা হিটলারের প্রতিটি মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ তথ্যের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও খণ্ডন প্রদান করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলারের আত্মীয়-স্বজনদের কি হয়েছিল?

​হিটলারের বংশধরদের জন্য তার পরিচয় ছিল একটি ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্ন। বিশ্বজুড়ে ঘৃণা ও নিন্দার মাঝে তারা কীভাবে বেঁচে ছিলেন এবং নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এখন তা তুলে ধরব ।

​১. পলা হিটলার (হিটলারের ছোট বোন)

​হিটলারের ছোট বোনের নাম পলা হিটলার (Paula Hitler)। ১৮৯৬ সালের ২১ জানুয়ারি অস্ট্রিয়াতে জন্ম গ্রহন করেন।তিনি ছিলেন এলোইস হিটলার এবং ক্লারা পোলজলের ৬ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট।।তিনি ছিলেন যুদ্ধের পর হিটলারের সবচেয়ে নিকটবর্তী জীবিত আত্মীয়। তিনি নাৎসি শাসনের সময় অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেন।পলা হিটলার জীবনে বিয়ে করেননি এবং তার কোনো সন্তান ছিল না।
​যুদ্ধের পর মার্কিন গোয়েন্দারা তাকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তার ভাই হলোকাস্টের জন্য দায়ী হতে পারেন—এটা তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি।
​পরে যখন জানা যায় নাৎসি কর্মকাণ্ডে তার কোনো ভূমিকা ছিল না, তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

​তিনি নিজের পরিচয় গোপন করতে নাম বদলে 'উলফ' (Wolff) রাখেন এবং নির্জনে জীবনযাপন করেন। ১৯৬০ সালে ১ জুন তার মৃত্যু হয়।

​২. অ্যাঞ্জেলা হিটলার (Angela Hitler) (হিটলারের সৎ বোন)

অ্যাডলফ হিটলারের সৎ বোনের নাম অ্যাঞ্জেলা হিটলার (Angela Hitler)।​তিনি হিটলারের বাবা অ্যালোইস হিটলারের দ্বিতীয় স্ত্রী ফ্রাঞ্জিস্কা মাতজেলসবার্গারের কন্যা ছিলেন। অ্যাঞ্জেলা হিটলার পরে বিয়ে করে অ্যাঞ্জেলা হ্যামিটশ নামেও পরিচিত।

তিনি হিটলারের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং ১৯২০-এর দশকে তার গৃহপরিচালিকা হিসেবে কাজ করতেন।
​তিনি সব সময় তার ভাইয়ের প্রশংসা করতেন এবং দাবি করতেন যে তিনি বা তার ভাই কেউই হলোকাস্ট সম্পর্কে জানতেন না।
​১৯৪৯ সালে জার্মানিতেই তার মৃত্যু হয়।

​৩. অ্যালোইস জুনিয়র (Alois Hitler Jr.)(হিটলারের সৎ ভাই)

​অ্যাডলফ হিটলারের সৎ ভাইয়ের নাম অ্যালোইস হিটলার জুনিয়র (Alois Hitler Jr.)।তিনি ১৮৮২ সালে জন্মগ্রহণ। তিনি তার বোনদের মতো লুকিয়ে না থেকে জনসম্মুখে আসার চেষ্টা করেন। যুদ্ধের পর তিনি জার্মানিতে ফিরে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন।
​তিনি সব সময় অ্যাডলফ হিটলারের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন, কিন্তু 'হিটলার' নামটির কারণে তাকে সারাজীবন মানুষের সন্দেহ ও সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। ১৯৫৬ সালে তার মৃত্যু হয়।

​৪. উইলিয়াম প্যাট্রিক হিটলার (হিটলারের ভাগ্নে)

​তিনি হিটলারের সৎ ভাই অ্যালোইস হিটলার জুনিয়রের (Alois Hitler Jr.) ছেলে।তিনি ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে জন্মগ্রহণ করেন।উইলিয়াম ১৯৩৩ সালে নিজের পারিবারিক পরিচয়ের সুযোগ নিতে জার্মানিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার মামার সাথে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় তিনি জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে যান।

হিটলার তাকে পছন্দ করতেন না এবং "আমার ঘৃণ্য ভাগ্নে" (my loathsome nephew) বলে উল্লেখ করতেন।
​১৯৪৪ সালে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে (US Navy) যোগ দেন এবং নিজের মামার শাসনের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেন।
​যুদ্ধের পর তিনি নিজের নাম বদলে 'স্টুয়ার্ট-হিউস্টন' রাখেন এবং নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটান। ১৯৪৭ সালে তিনি বিয়ে করেন এবং তার চারটি ছেলে ছিল।১৯৮৭ সালের ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

৫.হিটলারের ২য় ভাগ্নে 

হিটলারের আরেকটি ভাগ্নে ছিলেন হাইনরিখ হেইঞ্জ হিটলার (Heinrich Heinz Hitler), যিনি জার্মানির পক্ষে যুদ্ধ করে বন্দি অবস্থায় মারা যান।হাইঞ্জ ছিলেন উইলিয়ামের ছোট সৎ ভাই। তিনি তার চাচা অ্যাডলফ হিটলারের খুব প্রিয় ছিলেন এবং নাৎসি বাহিনীর হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে তিনি রেড আর্মির কাছে ধরা পড়েন এবং ১৯৪২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মস্কোর বুটিরকা সামরিক কারাগারে অজানা কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

অনেকে নিজেকে হিটলারের ভাগ্নে বা মহান ভাগ্নে বলে দাবি করেছেন, যেমন রোমানো লুকাস হিটলার, যিনি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ৭২ বছর বয়সে মারা যান।

​৬. স্টুয়ার্ট-হিউস্টন ভাইদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

​উইলিয়াম প্যাট্রিক হিটলারের চার ছেলে—আলেকজান্ডার, লুই, হাওয়ার্ড এবং ব্রায়ান—আমেরিকান সমাজে নিজেদের পরিচয় গোপন করে বাস করতে থাকেন।

​হিটলারের পরিচয়ের কারণে তারা একটি চরম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন: তারা কখনো বিয়ে করবেন না এবং সন্তান নেবেন না। * এর উদ্দেশ্য ছিল হিটলারের বংশধারা (Bloodline) চিরতরে শেষ করে দেওয়া। তাদের এই স্বেচ্ছাসেবী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অ্যাডলফ হিটলারের রক্তধারা পৃথিবী থেকে মুছে যায়।
​হিটলারের আত্মীয়দের জীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছিল। কেউ কেউ আত্মগোপন করেছিলেন, আবার কেউবা নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তবে স্টুয়ার্ট-হিউস্টন ভাইদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হিটলারের বংশধারা জোর করে নয়, বরং স্বেচ্ছায় শেষ হয়েছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন