![]() |
| ফুকুশিমা দাইইচি পরমাণু দুর্ঘটনার অংশিক চিত্র। |
অধ্যায় এক: যখন প্রকৃতি আঘাত হানে
১১ই মার্চ ২০১১। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৬ মিনিট। জাপানের তোহোকু অঞ্চলের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের তলদেশে ঘটে গেল এক দানবীয় আলোড়ন। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার সেই ভূমিকম্প ছিল জাপানের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এই প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে জাপানের মূল ভূখণ্ড প্রায় ২.৪ মিটার পূর্বে সরে যায় এবং পৃথিবীর অক্ষ প্রায় ১০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু তা ছিল প্রকৃতির ভয়াবহতার শুরু মাত্র। ভূমিকম্পের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে প্রকাণ্ড এক জলপ্রাচীর—সুনামি। কোথাও কোথাও যার উচ্চতা ছিল চার থেকে পাঁচ তলা ভবনের সমান, প্রায় ১৪ থেকে ১৫ মিটার।
এই সর্বগ্রাসী জলোচ্ছ্বাস জাপানের পূর্ব উপকূল বরাবর শত শত কিলোমিটার এলাকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের পথেই দাঁড়িয়ে ছিল ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে চলেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক পারমাণবিক দুঃস্বপ্নে।
এই ঘটনাকে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক ঘটনা স্কেল বা INES-এ সর্বোচ্চ মাত্রা—লেভেল সেভেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর যা ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঘটনা। কিন্তু কিভাবে একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পারমাণবিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ালো? ঠিক কি ঘটেছিল ফুকুশিমা দাইচিতে? আর এই বিপর্যয়ের পরিণতিই বা কতটা ভয়াবহ হয়েছিল? এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করব Jahid Notes এর আজকের পর্বে।
টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ফুকুশিমা জেলার ওকুমা শহরে অবস্থিত ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করত টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি বা টেপকো (TEPCO)। কেন্দ্রটিতে মোট ছয়টি জেনারেল ইলেকট্রিক বলিং ওয়াটার রিঅ্যাক্টর ছিল। যেগুলোর মধ্যে ১ থেকে ৫ নম্বর চুল্লি ছিল মার্ক ওয়ান (Mark I) মডেলের এবং ৬ নম্বর চুল্লিটি ছিল মার্ক টু (Mark II) মডেলের। এই মার্ক ওয়ান ডিজাইনটি ষাটের দশকে তৈরি, যা তুলনামূলকভাবে ছোট এবং দুর্বল কনটেইনমেন্ট কাঠামোর জন্য পরিচিত ছিল।
১১ই মার্চ ২০১১ তারিখে ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় এর ১, ২ এবং ৩ নম্বর চুল্লি পুরোদমে চালু ছিল। অন্যদিকে, ৪, ৫ এবং ৬ নম্বর চুল্লি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আগে থেকেই বন্ধ বা কোল্ড শাটডাউনে (Cold Shutdown) ছিল।
ভূমিকম্প আঘাত করার সাথে সাথেই কেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা স্ক্র্যাম সিস্টেম (SCRAM System) কাজ করা শুরু করে। ১, ২ এবং ৩ নম্বর চুল্লির ভেতরে থাকা কন্ট্রোল রডগুলো নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন বন্ধ করে দেয়। এটি ছিল প্রত্যাশিত এবং পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি স্বাভাবিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়া। একই সাথে ভূমিকম্পের কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে জাপানের জাতীয় গ্রিডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু একটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দিলেই তার বিপদ শেষ হয়ে যায় না। চেইন রিঅ্যাকশন বন্ধ হলেও চুল্লির ভেতরে থাকা পারমাণবিক জ্বালানির মধ্যে ফিশন উপাদানগুলোর রেডিওঅ্যাক্টিভ ডিকে (Radioactive Decay) বা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের কারণে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হতে থাকে, যাকে বলা হয় ডিকে হিট (Decay Heat)। এই তাপ যদি দ্রুত অপসারণ করা না হয়, তাহলে চুল্লির কোর (Core) বা কেন্দ্র গলে যেতে পারে, যা একটি পারমাণবিক মেল্টডাউনের (Meltdown) শামিল। এই ডিকে হিট অপসারণ করার জন্য চুল্লির কুলিং সিস্টেম (Cooling System) বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।
জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর এই কুলিং সিস্টেম চালু রাখার জন্য কেন্দ্রের নিজস্ব জরুরি ব্যবস্থা ছিল—ডিজেল জেনারেটর। ভূমিকম্পের পরপরই সেই জেনারেটরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় এবং চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা রাখার প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন পর্যন্ত সবকিছুই ছিল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। কর্মীরা ভেবেছিলেন সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো কেটে গেছে। কিন্তু আসল বিপদ তখনও উপকূলে পৌঁছায়নি।
ভূমিকম্পের প্রায় ৫০ মিনিট পর ফুকুশিমা দাইচি কেন্দ্রে আঘাত হানে দানবীয় এক সুনামি। কেন্দ্রটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ছিল এবং এর সামনে ছিল মাত্র ৫.৭ মিটার উঁচু একটি সমুদ্র প্রাচীর বা সি-ওয়াল (Sea Wall)। কিন্তু ধেয়ে আসা সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪ মিটার। অর্থাৎ, কেন্দ্রের সুরক্ষা প্রাচীর এই বিপুল জলরাশিকে আটকানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট ছিল না।
ফলে অবধারিতভাবেই সুনামির পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং চুল্লি ভবন ও টারবাইন ভবনগুলোর নিচতলা প্লাবিত করে দেয়। আর এখানেই ছিল ফুকুশিমার ভয়াবহতম দুর্বলতা। কেন্দ্রের ১৩টি জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ১২টি এবং বিদ্যুৎ বিতরণের সুইচগিয়ারগুলো রাখা হয়েছিল টারবাইন ভবনের পানি-অপ্রতিরোধী বেজমেন্টে। সুনামির নোনা পানি মুহূর্তের মধ্যে এই জেনারেটরগুলোকে অকেজো করে দেয়।
ফলাফল, একই সাথে জাতীয় গ্রিড এবং জরুরি জেনারেটর বিকল হয়ে যাওয়ায় পুরো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি একযোগে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। প্রকৌশলীর ভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় স্টেশন ব্ল্যাকআউট (Station Blackout)। বিদ্যুৎ না থাকার অর্থ হলো চুল্লির কোর ঠাণ্ডা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কুলিং পাম্পগুলো আর কাজ করবে না। ফুকুশিমা দাইচি তখন সময়ের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ দৌড়ে নামলো।
অধ্যায় দুই: রেস এগেইনস্ট ডুম (Race Against Doom)
স্টেশন ব্ল্যাকআউটের পর চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা রাখার শেষ অবলম্বন হিসেবে ছিল ব্যাটারিচালিত কিছু ব্যবস্থা। কিন্তু এই ব্যাটারিগুলো ১ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, যতক্ষণ না মূল বিদ্যুৎ বা জেনারেটর পুনরায় চালু হয়। কিন্তু ফুকুশিমার ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। মোবাইল জেনারেটর এনে বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়, কারণ প্লাবিত এলাকায় সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব ছিল না।
বিদ্যুৎ না থাকায় ফুকুশিমার কুলিং সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়। ১, ২ ও ৩ নম্বর চুল্লির ভেতরে ডিকে হিটের কারণে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। চুল্লির কোরে থাকা পানি ফুটতে শুরু করে এবং বাষ্পে পরিণত হয়। যার ফলে চুল্লির ভেতরের চাপও ভয়ংকরভাবে বাড়তে থাকে। একই সাথে পানির স্তর নিচে নামতে থাকায় পারমাণবিক জ্বালানি রডগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
এই জ্বালানি রডগুলোর বাইরের আবরণ বা ক্ল্যাডিং (Cladding) তৈরি ছিল জারকোনিয়াম সংকর ধাতু দিয়ে। যখন এই রডগুলো অনাবৃত হয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রা ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে চলে যায়, তখন জারকোনিয়াম ক্ল্যাডিং প্রচণ্ড উত্তপ্ত বাষ্পের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে। এই বিক্রিয়ায় তৈরি হতে থাকে বিপুল পরিমাণে হাইড্রোজেন গ্যাস। এই হাইড্রোজেন গ্যাস একদিকে যেমন ভয়ংকরভাবে দাহ্য এবং বিস্ফোরক, তেমনি এর উৎপাদন প্রক্রিয়াটিও তাপ তৈরি করে, যা চুল্লির কোরকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে এবং গলনের প্রক্রিয়াকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
চুল্লির কর্মীরা তখন এক অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি। চুল্লির ভেতরের চাপ এতটাই বেড়ে যাচ্ছিল যে যেকোনো মুহূর্তে চুল্লির মূল কাঠামো বা রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (Reactor Pressure Vessel) বিস্ফোরিত হতে পারত। এমনটা হলে চুল্লির সমস্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ত, যা চেরনোবিলের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত।
এই বিস্ফোরণ ঠেকানোর জন্য কর্মীরা একটি মরিয়া সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তারা চুল্লির ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রিতভাবে বাষ্প এবং হাইড্রোজেন গ্যাস বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যাকে বলা হয় ভেন্টিং (Venting)। এটি ছিল একটি উভয় সংকট। ভেন্টিং করলে চুল্লির চাপ কমবে, কিন্তু এর সাথে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে। আর না করলে চুল্লি বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি।
শেষ পর্যন্ত তারা কম মন্দের পথটি বেছে নেন। কিন্তু ততক্ষণে দেরি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১ নম্বর চুল্লির কোর গলতে শুরু করে। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ২ নম্বর এবং ৩ নম্বর চুল্লির কোরও আংশিক বা সম্পূর্ণ গলে যায়। মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পারমাণবিক মেল্টডাউন তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা নয়, বাস্তবতা।
অধ্যায় তিন: বিস্ফোরণ, মেল্টডাউন এবং বিষাক্ত ছড়িয়ে পড়া
১২ই মার্চ, বিপর্যয়ের একদিন পর। ১ নম্বর চুল্লি থেকে ভেন্টিং করে বের করা হাইড্রোজেন গ্যাস চুল্লির বাইরের কংক্রিটের ভবন বা সেকেন্ডারি কনটেইনমেন্ট বিল্ডিংয়ের (Secondary Containment Building) উপরের অংশে জমা হয়। সেখানে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে ঘটে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণে ১ নম্বর চুল্লির বাইরের ভবনের ছাদ এবং দেয়াল উড়ে যায়। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের এটিই ছিল প্রথম বড় আঘাত।
১৪ই মার্চ, এবার ঘটে আরো শক্তিশালী বিস্ফোরণ। ৩ নম্বর চুল্লিতে মজুদ হাইড্রোজেন গ্যাস একইভাবে বিস্ফোরিত হয় এবং এর বাইরের ভবনটিও পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। এই বিস্ফোরণটি ছিল আরো বেশি শক্তিশালী, কারণ ৩ নম্বর চুল্লিতে মক্স ফুয়েল (MOX Fuel) বা মিশ্র অক্সাইড জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বেশি তাপ এবং হাইড্রোজেন উৎপন্ন করে।
১৫ই মার্চ, পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। সকালে ২ নম্বর চুল্লির কনটেইনমেন্ট ভেসেলের নিচের অংশে বা সাপ্রেশন চেম্বারে (Suppression Chamber) একটি বিস্ফোরণ হয় বলে ধারণা করা হয়, যা এর কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিঃসরণের একটি সরাসরি পথ তৈরি করে দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই ৪ নম্বর চুল্লিতে আরেকটি বড় বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ৪ নম্বর চুল্লিটি তখন বন্ধ ছিল এবং এর সমস্ত জ্বালানি রড একটি স্পেন্ট ফুয়েল পুলে (Spent Fuel Pool) রাখা ছিল। পরবর্তীতে তদন্তে জানা যায়, ৩ নম্বর চুল্লি থেকে নির্গত হাইড্রোজেন গ্যাস একটি কমন ভেন্টিং পাইপের মাধ্যমে ৪ নম্বর চুল্লির ভবনে প্রবেশ করে এবং এই বিস্ফোরণ ঘটায়।
এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ফলে চুল্লিগুলোর কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিপুল পরিমাণে তেজস্ক্রিয় কণা—বিশেষ করে আয়োডিন-১৩১ (Iodine-131), যার অর্ধায়ু ৮ দিন, এবং সিজিয়াম-১৩৭ (Caesium-137), যার অর্ধায়ু ৩০ বছর—তা সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে ভেতরে তখন ঘটে গেছে চূড়ান্ত বিপর্যয়। ইতিমধ্যে ১, ২ এবং ৩ নম্বর চুল্লির কোর সম্পূর্ণ গলে গেছে। গলিত পারমাণবিক জ্বালানি, যাকে বলা হয় কোরিয়াম (Corium), তা চুল্লির ইস্পাতের তৈরি মূল পাত্র বা আরপিসি (RPV) ভেদ করে নিচের কংক্রিটের কাঠামো বা প্রাইমারি কনটেইনমেন্ট ভেসেলের (Primary Containment Vessel) উপর জমা হয়েছে। এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মেল্টডাউন এবং মেল্ট-থ্রু (Melt-through)।
এই পরিস্থিতিতে টেপকো এবং জাপান সরকার চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা করার জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে সমুদ্রের পানি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফায়ার ইঞ্জিন, সামরিক যান এবং এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে চুল্লিগুলোর উপর লক্ষ লক্ষ গ্যালন সমুদ্রের পানি ঢালা হয়। সমুদ্রের নোনা পানি চুল্লিগুলোকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেবে জেনেও তেজস্ক্রিয়তার বিস্তার কমানোর জন্য এটিই ছিল একমাত্র উপায়। এই দুঃসাহসিক কাজে যারা অংশ নিয়েছিলেন, সেই কর্মী এবং দমকল কর্মীরা ইতিহাসে "ফুকুশিমা ৫০" (Fukushima 50) নামে পরিচিত হয়ে আছেন। যদিও বাস্তবে এই সংখ্যাটি ছিল আরো অনেক বেশি।
অধ্যায় চার: দ্য ফলআউট (The Fallout)
ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী এবং বহুমাত্রিক। প্রথমত, তেজস্ক্রিয়তার নিঃসরণ। ফুকুশিমা থেকে বিপুল পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে নির্গত তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ ছিল চেরনোবিল বিপর্যয়ের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু ফুকুশিমার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সামুদ্রিক পরিবেশে। চুল্লি ঠাণ্ডা করার জন্য ব্যবহৃত লক্ষ লক্ষ গ্যালন দূষিত পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানির সাথে যা মিশেছিল, তা প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে। এটি মানব ইতিহাসের বৃহত্তম একক তেজস্ক্রিয় দূষণের ঘটনা।
দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যার স্থানান্তর। তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি এড়াতে জাপান সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে প্রথমে ৩ কিলোমিটার, পরে ১০ এবং অবশেষে ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি এক্সক্লুশন জোন (Exclusion Zone) বা নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করে। প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি, জমি এবং জীবিকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য করা হয়। এদের অনেকেই আর কখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
যদিও ফুকুশিমা বিপর্যয়ের কারণে সরাসরি তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কোনো সরকারি রেকর্ড নেই, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব ছিল ব্যাপক। জাপান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২৩০০ জনেরও বেশি মানুষ বিপর্যয় সম্পর্কিত মৃত্যুর শিকার হন। এর কারণ ছিল—বিশৃঙ্খলা এবং তাড়াহুড়ো করে লোকজনদের সরিয়ে নেয়ার সময় সৃষ্ট শারীরিক ও মানসিক চাপ, হাসপাতালে চিকিৎসার অভাব এবং পরবর্তীতে সৃষ্ট মানসিক আঘাত ও আত্মহত্যা। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের বাড়ি, সম্প্রদায় এবং মানসিক শান্তি হারিয়েছেন।
এদিকে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম কণা বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, বন এবং জলাশয়কে দূষিত করে দেয়। জাপান সরকারকে লক্ষ লক্ষ টন দূষিত মাটি অপসারণ করতে হয়েছে। যদিও এতে করে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের মৎস্য সম্পদ এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষকদের গবেষণা আজও চলছে।
অধ্যায় পাঁচ: দ্য লাস্ট চ্যাপ্টার (The Last Chapter)
ফুকুশিমা বিপর্যয় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, এটি ছিল একটি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়—প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার সম্মিলিত ফলাফল। জাপানের সংসদের স্বাধীন তদন্ত কমিশন বা এনএএআইসি (NAAIC) তাদের রিপোর্টে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, বিপর্যয়টি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল এবং এর মূল কারণ ছিল জাপানি সংস্কৃতিতে গেঁথে থাকা অবাধ্যতা, কর্তৃপক্ষের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস এবং সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও টেপকোর মধ্যে এক অশুভ আঁতাত।
তাহলে ফুকুশিমা বিপর্যয়ের মূল ব্যর্থতাগুপলো কি ছিল?
- প্রথমত: সুনামির ঝুঁকির অবমূল্যায়ন। টেপকো এবং জাপানের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ২০০৮ সালের মধ্যেই জানত যে এই অঞ্চলে ১৫.৭ মিটার উঁচু সুনামি আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্যকে উপেক্ষা করে তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সি-ওয়ালের উচ্চতা পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃদ্ধি করেনি।
- দ্বিতীয়ত: নকশাগত ত্রুটি। জরুরি ডিজেল জেনারেটর এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলোকে সুনামির পানি থেকে অরক্ষিত নিচু স্থানে রাখা ছিল একটি মারাত্মক নকশাগত ভুল।
- তৃতীয়ত: নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা। জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি অনৈতিক আঁতাত ছিল, যা "রেগুলেটরি ক্যাপচার" (Regulatory Capture) নামে পরিচিত। এর ফলে স্বাধীন এবং কঠোর নজরদারির অভাব ছিল। জাপানের পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিরাপদ—এই অন্ধ বিশ্বাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক অহংকারই শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
- এবং চতুর্থত: দুর্বল সংকট ব্যবস্থাপনা। বিপর্যয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে টেপকোর প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর এবং অসংগঠিত। তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছিল।
আরও পড়ুন: বিশ্বসেরাদের সংগ্রাম.
ফুকুশিমা বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। জার্মানির মতো দেশ পারমাণবিক শক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যান্য দেশগুলো তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়।
ফুকুশিমা বিপর্যয়ের আজ ১৪ বছরেরও বেশি সময় পর ফুকুশিমায় ডিকমিশনিং (Decommissioning) বা চুল্লিগুলোকে নিষ্ক্রিয় এবং ভেঙে ফেলার বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, যা সম্পূর্ণ হতে ৩০ থেকে ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। গলিত জ্বালানি বা কোরিয়াম অপসারণের জন্য অত্যাধুনিক রিমোট নিয়ন্ত্রিত রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এক বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
এই ক্লিনআপ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় এবং সাম্প্রতিক বিতর্ক হলো চুল্লি থেকে নির্গত হওয়া দূষিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা রাখতে ব্যবহৃত মিলিয়ন টনেরও বেশি পানি অ্যাডভান্সড লিকুইড প্রসেসিং সিস্টেমের (ALPS) মাধ্যমে শোধন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ট্রিটিয়াম ছাড়া প্রায় সব তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ অপসারণ করা হয়। জাপান সরকার এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) এই শোধিত পানিকে নিরাপদ বলে দাবি করে ২০২৩ এর আগস্ট থেকে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে ফেলা শুরু করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী এবং চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।
ফুকুশিমা বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পারমাণবিক শক্তির অপরিসীম ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে অপরিসীম ঝুঁকিও। আর প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে। মানুষের সামান্য ভুল বা অবহেলা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে—ফুকুশিমা দাইচি তার এক নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষী হয়ে থাকবে।
