মৃত্যুকেও হার মানায় যে প্রাণী – তারদিগ্রেড
পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী কোনটি?সিংহ? নীল তিমি? নাকি ডাইনোসর?
আমরা সবাই জানি, ডাইনোসর লাখ লাখ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একটা বড় গ্রহাণুর আঘাতে তারা শেষ হয়ে যায়।কিন্তু আজ এমন এক প্রাণীর গল্প বলব, যাকে মারার ক্ষমতা এই মহাবিশ্বের কারও নেই!
অগ্নিকাণ্ড, বরফ যুগ, এমনকি পারমাণবিক বোমা—কোনো কিছুই একে ধ্বংস করতে পারবে না।সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় কী জানেন? এই প্রাণীটি হয়তো এখনই আপনার ঘরের ঠিক পাশের শ্যাওলাটায় বসে হাসছে!
হ্যাঁ, এরা আমাদের চারপাশেই আছে। কিন্তু আমরা এদের খালি চোখে দেখতে পাই না।বিজ্ঞানের জগতের সবচেয়ে বড় রহস্য—'তারদিগ্রেড' বা 'জল-ভাল্লুক'।
চলুন, সময়ের চাকা একটু পেছনে ঘোরানো যাক।
সাল ১৭৭৩। জার্মান বিজ্ঞানী জোহান গোয়েজে প্রথম এই প্রাণীকে আবিষ্কার করেন।মাইক্রোস্কোপে এর হাঁটার স্টাইল দেখে বিজ্ঞানী চমকে যান। দেখতে অবিকল ভাল্লুকের মতো! তাই তিনি এর নাম দিলেন 'লিটল ওয়াটার বেয়ার' বা ছোট্ট জল-ভাল্লুক।
পরে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী লাজ্জারো স্পালানজানি এর নাম দেন 'তারদিগ্রেড'। এই শব্দের অর্থ 'ধীর গতির পথচারী'।এদের সাইজ কেমন জানেন? মাত্র ০.৫ মিলিমিটার! একটা সুঁইয়ের ডগায় এদের কয়েকশ ধরে যাবে।
এদের আটটি পা আছে। আর পায়ের মাথায় আছে ছোট ছোট নখ।এরা দেখতে বেশ কিউট। কিন্তু এদের ক্ষমতা কোনো সুপারহিরোর চেয়ে কম নয়।
গল্পটা এখানে সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আসল টুইস্ট এবার শুরু।যেকোনো সাধারণ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য পানি দরকার। পানি ছাড়া আমরা কয়েকদিনও বাঁচব না।কিন্তু তারদিগ্রেডের সামনে যদি খাবার বা পানি না থাকে, তবে তারা এক অদ্ভুত চাল চালে।
তারা নিজেদের শরীর থেকে ৯৯% পানি বের করে দেয়।মাথা আর পাগুলো শরীরের ভেতরে গুটিয়ে নেয়। এরা তখন দেখতে একটি শুকনো কিসমিসের মতো হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা এই অবস্থার নাম দিয়েছেন 'টান' (Tun)। আর এই প্রক্রিয়াকে বলে 'ক্রিপ্টোবায়োসিস'।এই অবস্থায় এদের শরীরের সব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। এরা তখন মৃতও নয়, আবার জীবিতও নয়।
এভাবে এরা ৩০ বছর ধরে কোনো খাবার বা পানি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে!যখনই এদের ওপর এক ফোঁটা পানি পড়ে, এরা ম্যাজিকের মতো আবার জেগে ওঠে। যেন মাত্র ঘুম থেকে উঠল!
বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন এটা হয়তো কোনো সাধারণ কৌশল। তাই তারা একে ল্যাবরেটরিতে চরম পরীক্ষা করা শুরু করলেন।
তারা একে মাইনাস ২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখলেন। এটা মহাবিশ্বের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার কাছাকাছি। তারদিগ্রেডের কিছুই হলো না।
এরপর একে রাখা হলো ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ফুটন্ত গরমে। সেখানেও তারা দিব্যি বেঁচে রইল!
বিজ্ঞানীরা এখানেই থামলেন না। তারা একে নিয়ে গেলেন সমুদ্রের সবচেয়ে গভীরতম অংশ, মারিয়ানা ট্রেঞ্চে।সেখানকার পানির চাপ একটা সাধারণ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে পিষে ফেলবে।
কিন্তু আমাদের জল-ভাল্লুক সেই চাপকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিল। এরা সমুদ্রের তলার চেয়েও ৬ গুণ বেশি চাপ অনায়াসে সহ্য করতে পারে।
এমনকি পারমাণবিক বোমার বিকিরণ বা রেডিয়েশনও এদের ডিএনএ নষ্ট করতে পারে না।২০০৭ সালের কথা। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, পৃথিবীতে তো সব পরীক্ষা হলো। এবার একে মহাকাশে পাঠানো যাক।
একটি রকেটে করে কিছু তারদিগ্রেডকে মহাশূন্যে পাঠানো হলো।সেখানে কোনো বাতাস নেই, তীব্র ঠান্ডা আর মারাত্মক মহাজাগতিক বিকিরণ। স্পেস স্যুট ছাড়া মানুষ সেখানে এক সেকেন্ডও বাঁচবে না।
বিজ্ঞানীরা এদের খোলা মহাকাশে ১০ দিন রেখে দিলেন।১০ দিন পর যখন এদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হলো, বিজ্ঞানীরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন!
তারদিগ্রেডগুলো কেবল জীবিতই ছিল না, তারা ডিম পেড়ে নতুন বাচ্চার জন্মও দিচ্ছিল!কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব? বিজ্ঞানীদের কাছে এর পুরো উত্তর আজও নেই।
তবে তারা একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছেন। এদের শরীরে এক বিশেষ ধরনের প্রোটিন থাকে। একে বলে 'ডি-সাপ' (Dsup) বা ড্যামেজ সাপ্রেসর।
এই প্রোটিন এদের ডিএনএ-র চারপাশে একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে। ফলে কোনো বিকিরণ এদের ক্ষতি করতে পারে না।
আজ চিকিৎসা বিজ্ঞান এই ছোট্ট প্রাণীর ওপর গবেষণা করছে।যদি এদের এই সুরক্ষাকবচের রহস্য মানুষ পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে, তবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ বদলে যাবে। ক্যানসারের চিকিৎসা থেকে শুরু করে মহাকাশ ভ্রমণ—সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
পৃথিবীতে কত শত বড় বড় ডাইনোসর এলো আর গেল। কিন্তু এই ছোট্ট জীবটি কোটি কোটি বছর ধরে টিকে আছে।প্রকৃতির এই রহস্য সত্যিই আমাদের অবাক করে।
তারদিগ্রেড সম্পর্কে অবিশ্বাস্য তথ্য
আপনার কী মনে হয়? তারদিগ্রেড কি আসলে এই পৃথিবীর প্রাণী, নাকি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে? কমেন্ট করে জানান।
আর্টিকেলটি ভালো লাগলে লাইক দিন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। এমন আরও রহস্যময় আর্টিকেল দেখতে সাইটটি ইমেইল দ্বারা সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।
আজ এই পর্যন্তই। দেখা হবে পরের কোনো আর্টিকেলে। ধন্যবাদ!
