মাত্র ১৬ বছর বয়সে Apple হ্যাক! তারপর যা ঘটেছিল, অবাক হবে পুরো বিশ্ব

 

“১৬ বছরেই APPLE HACK!”

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সিকিউরিটি সিস্টেম অ্যাপল। হাজার হাজার সাইবার বিশেষজ্ঞ কোটি কোটি ডলারের নিরাপত্তা প্রাচীর। এমন একটি দুর্গ যেটা ভাঙা অসম্ভব বলে পৃথিবী মনে করত।
২০১৭ সাল, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। রাত গভীর, একটি ছোট্ট শোবার ঘর। জানালার পর্দাটানা, ঘরে আলো নেই। শুধু একটি ল্যাপটপের নীলাভ আভা একটি কিশোরের মুখে কাঁপছে। তার বয়স মাত্র ১৬ আর সে এইমাত্র সেই দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। স্কুলের হোমওয়ার্কের ফাঁকে একা নিজের ঘরে বসে। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এটা সত্যি।


প্রযুক্তির জগতে একটা কথা আছে—সবচেয়ে বিপজ্জনক হ্যাকার সে নয়, যার কাছে সবচেয়ে বেশি টাকা আছে কিংবা আধুনিক সরঞ্জাম আছে; সবচেয়ে বিপজ্জনক হ্যাকার সে, যার কাছে আছে অদম্য কৌতূহল এবং অফুরন্ত সময়। এই ছেলেটির কাছে দুটোই ছিল। তার নাম প্রকাশ করা হয়নি, আদালতের নির্দেশে তার পরিচয় গোপন করা হয়েছে, কারণ সে যখন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তখন সে নাবালক।

আরো পড়ুন : গুগলের আসল ইতিহাস 


মিডিয়া তাকে ডাকে শুধু একটি কোড নামে—কিড।
কিড বড় হয়েছিল মেলবোর্নের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা অফিসে চাকরি করেন, মা সংসার সামলান। বাড়িতে তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই, কিন্তু ছোটবেলা থেকে কম্পিউটারের প্রতি তার ছিল একটা অদ্ভুত টান। যে বয়সে অন্য বাচ্চারা খেলনা দিয়ে খেলে, সেই বয়সে কিড কম্পিউটার খুলে তার ভেতরের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করত। যে বয়সে ছেলেরা ক্রিকেট বা ফুটবলে মাতে, সেই বয়সে কিড রাত জেগে কোডিং শিখত। অনলাইন ফোরামে প্রশ্ন করত, ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখত, বই পড়ত। তার কাছে কম্পিউটার শুধু একটি যন্ত্র ছিল না, কম্পিউটার ছিল একটি ভাষা—এবং সে সেই ভাষায় কথা বলতে ভালোবাসতো।

স্কুলে সে একজন ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু গতানুগতিক পাঠ্যক্রম তার জন্য ছিল না। গণিতে সে ছিল দুর্দান্ত, বিজ্ঞানে ভালো, কিন্তু তার আসল ক্লাসরুম ছিল রাত্রিবেলার সেই ছোট্ট ঘরটা, যেখানে একটি ল্যাপটপ আর সীমাহীন কৌতূহল। বয়স তখন ১৩, তখন থেকেই সে হ্যাকিং শিখতে শুরু করে। কিন্তু তার হ্যাকিং ভিন্ন ধরনের ছিল।

সে কারো ক্ষতি করতে চায়নি, সে চেয়েছিল বুঝতে—সিস্টেম কিভাবে কাজ করে, নিরাপত্তা কোথায় দুর্বল, একটি বিশাল কোম্পানির সুরক্ষা কাঠামো কিভাবে তৈরি—এই প্রশ্নগুলো তাকে ঘুমাতে দিত না।
তারপর একদিন সে একটা লক্ষ্য ঠিক করল—অ্যাপল। পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান কোম্পানি, আইফোন, ম্যাক, আইপ্যাড—কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের রক্ষক। তারা দাবি করত তাদের নিরাপত্তা অভেদ্য, তাদের সার্ভার দুর্গের মতো সুরক্ষিত। কিড সিদ্ধান্ত নিল সে এটা পরীক্ষা করবে।

আরো পড়ুন : পুরোনো আমলের নাবিকেরা সমুদ্রে মিষ্টি পানি কীভাবে পেতেন?


হ্যাকিং এর দুনিয়ায় একটি শব্দ আছে—সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এর মানে হলো কম্পিউটারের দুর্বলতা খোঁজার আগে মানুষের দুর্বলতা খোঁজা, কারণ বেশিরভাগ সময়েই নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ফাঁকফোকর থাকে যন্ত্রে নয়, মানুষের মধ্যে। কিন্তু কিড যে পদ্ধতি বেছে নিল, সেটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে শুরু করল একটি কৌশল দিয়ে, যেটাকে সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলেন স্পিয়ার ফিশিং। এটা এমন একটি পদ্ধতি যেখানে হ্যাকার একজন বিশ্বস্ত মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশ ধরে লক্ষ্যের কাছ থেকে তথ্য হাতিয়ে নেয়।

কিড অ্যাপেলের একজন কর্মচারীকে ইমেল পাঠাল। ইমেলের ভাষা এতটাই পেশাদার, এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এটাই শেষ ছিল না, রাতের পর রাত কিড বসে থেকে অ্যাপেলের কোর নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্তর পরীক্ষা করতে লাগল। সে খুঁজছিল একটি নির্দিষ্ট দরজা, একটি ভিপিএন সার্ভার যেটার মাধ্যমে অ্যাপেলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করা সম্ভব। এটাকে বলা হয় ACCS (Apple Corporate Source System)। এটি এমন একটি সিস্টেম যেখানে অ্যাপেলের লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত—আইডি, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যক্তিগত ডেটা—এবং কিড সেটার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল।

সে একটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করল, যেটাকে সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলেন ক্রেডেন্সিয়াল স্টাফিং। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন লিক হওয়া ডেটাবেস থেকে ইউজারনেম আর পাসওয়ার্ড নিয়ে একটির পর একটি চেষ্টা করা হয় যতক্ষণ না কোনোটা কাজ করে। কিড দিনের পর দিন এই কাজ করে গেল, সে কখনো হতাশ হলো না, কখনো থামল না, এবং একটা রাতে সে সফল হলো।

সেই মুহূর্তটা কল্পনা করুন—একটি ১৬ বছরের ছেলে, স্কুলের পরের দিন পরীক্ষা আছে হয়তো, মা হয়তো পাশের ঘর থেকে ডাকছেন রাতের খাবার খেতে, আর এই ছেলেটির স্ক্রিনে তখন ফুটে উঠেছে অ্যাপেলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের একটি দরজা, সে ভেতরে—অ্যাপল করপোরেট সোর্স সিস্টেমের ভেতরে। পরে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, কিড শুধু ভেতরে ঢুকেই থামেনি, সে ধীরে ধীরে, সাবধানে পুরো সিস্টেমটা ঘুরে দেখেছে, সে ডাউনলোড করেছে বিভিন্ন ফাইল, সে দেখেছে কোথায় কী আছে, কিন্তু সে কোনো তথ্য ব্যবহার করেনি, কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেনি, কারো ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করেনি। এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ, সে শুধু জানতে চেয়েছিল সে পারবে কিনা—এবং সে পেরেছিল।

আরো পড়ুন : বিটকয়েনের আসল ইতিহাস 


পরবর্তী কয়েক মাস ধরে কিড মোট ১২টি ভিন্ন সেশনে অ্যাপেলের সিস্টেমে প্রবেশ করে, প্রতিবার সে নতুন কিছু শেখে, নতুন কিছু অনুসন্ধান করে, প্রতিবার সে বের হয়ে আসে কোনো চিহ্ন না রেখে—অন্তত সে মনে করত। কিন্তু প্রতিটি ডিজিটাল পদক্ষেপের একটি ছাপ থাকে, আর কিড জানত না যে অ্যাপেলের সাইবার সিকিউরিটি টিম ইতিমধ্যে কিছু একটা লক্ষ্য করেছে। তারা জানত না কে এটা করছে, তারা জানত না কোথা থেকে এটা হচ্ছে, কিন্তু তারা জানত কেউ একজন তাদের সিস্টেমে আছে—তারা তদন্ত শুরু করল।
এদিকে কিড বাড়িতে বসে আরেকটি রাত পার করছে, ল্যাপটপের স্ক্রিন জ্বলছে, সে কোড লিখছে, স্বপ্ন দেখছে। 

সে জানে না ঘড়ির কাঁটা তার জন্য টিকটিক করছে। সাইবার ক্রাইমের তদন্ত সাধারণ অপরাধের তদন্তের থেকে আলাদা। একজন ব্যাংক ডাকাত পালিয়ে গেলে হয়তো তার মুখ ক্যামেরায় ধরা পড়ে, তার আঙুলের ছাপ থাকে, সাক্ষী থাকে। কিন্তু একজন হ্যাকার, সে ঘরে বসে থাকে, কখনো বের হয় না, কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন রাখে না। তাহলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কিভাবে? আইপি অ্যাড্রেস। প্রতিটি ইন্টারনেট কানেকশনের একটি আইপি অ্যাড্রেস থাকে, এটা অনেকটা বাড়ির ঠিকানার মতো।

কিড এটা জানত, সে ভিপিএন ব্যবহার করেছিল তার আসল আইপি লুকাতে, সে টর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছিল পরিচয় আড়াল করতে, কিন্তু সে একটি ছোট্ট ভুল করেছিল—একবার, মাত্র একবার সে সরাসরি তার নিজস্ব নেটওয়ার্ক থেকে সংযোগ স্থাপন করেছিল। একটি মুহূর্তের অসতর্কতা এবং সেই এক মুহূর্তই যথেষ্ট ছিল। অ্যাপেলের সিকিউরিটি টিম সেই আইপি অ্যাড্রেসটি ধরে ফেলল, তারা এফবিআইকে জানাল, এফবিআই অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশকে জানাল, একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হলো।

এ দিকে কিড এখনো জানে না কিছু, সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে, স্কুলে যাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছে, রাতে ঘরে ফিরে কম্পিউটার খুলছে, কিন্তু একদিন সকালে দরজায় করা নাড়ার শব্দ—অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের কর্মকর্তারা যখন দরজায় এলেন তখন বাড়িতে ছিল কিড আর তার মা। মা দরজা খুললেন, পুলিশকে দেখে থমকে গেলেন। কিড তখন হয়তো ঘুম থেকে সবে উঠেছে, চুলে এলোমেলো, স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে, সে বুঝতে পারল কি হতে চলেছে।

পুলিশ বাড়ি তল্লাশি করল, তারা খুঁজে পেল একটি ল্যাপটপ, একটি ছোট্ট ফোল্ডার যেখানে সংরক্ষিত ছিল অ্যাপেলের সার্ভার থেকে ডাউনলোড করা ফাইল এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—একটি ফোল্ডার যার নাম ছিল "hacky hack hack"। শুনুন এই তিনটি শব্দ আবার: hacky hack hack। এই ছেলেটি ভালোবেসে হ্যাক করেছিল, ধ্বংস করতে নয়, চুরি করতে নয়, শুধু জানতে, শুধু বুঝতে।

পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল, কিড স্বীকার করল সবকিছু। সে লুকানোর চেষ্টা করেনি, মিথ্যে বলেনি, সে বলল হ্যাঁ, আমি এটা করেছি, আমি অ্যাপেলের সার্ভারে ঢুকেছিলাম, কিন্তু আমি কারো ক্ষতি করিনি, আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম। তদন্তকারীরা ক্যালকুলেট করলেন মোট ক্ষতির পরিমাণ। অ্যাপল দাবি করেছে এই হ্যাকিং তদন্ত করতে এবং সিস্টেম পুনরুদ্ধার করতে তাদের লক্ষাধিক ডলার খরচ হয়েছে, কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—কোনো গ্রাহকের তথ্য চুরি হয়নি, কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি, কোনো ডেটা ব্যবহার করা হয়নি। একটি ১৬ বছরের ছেলে শুধু প্রমাণ করতে চেয়েছিল সে পারে এবং সে পেরেছিল।

আরো পড়ুন :হার নিশ্চিত জেনেও যিনি লড়াই থামাননি!

মামলাটি অস্ট্রেলিয়ার আদালতে উঠল। আদালতের বাইরে সাংবাদিক, ক্যামেরা, মানুষের ভিড়—একটি নাবালক ছেলের বিচার, তার পরিচয় গোপন রাখা হলো, প্রসিকিউটররা অভিযোগ উপস্থাপন করলেন। অ্যাপেলের পক্ষ থেকে বলা হলো এটি গুরুতর অপরাধ, সংবেদনশীল কর্পোরেট ডেটায় অননুমোদিত প্রবেশ, এই ধরনের কাজ যদি শাস্তি না পায় তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই এই পথে আসবে। কিন্তু ডিফেন্স লয়ার একটি ভিন্ন ছবি আঁকলেন, তিনি বললেন এই ছেলেটি অপরাধী নয়, সে একজন প্রতিভাবান তরুণ যার কৌতূহল তাকে ভুল পথে নিয়ে গেছে, সে কারো ক্ষতি করেনি, সে শুধু জানতে চেয়েছিল এবং সে যা করেছে তা আসলে একটি দক্ষতার প্রমাণ—এমন দক্ষতা যা অনেক বড় কোম্পানি অর্থ দিয়ে কিনতে পারে না।

বিচারক শুনলেন দুই পক্ষের কথা, তারপর রায় দিলেন। কিডকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো ৯টি অভিযোগে কম্পিউটার ফ্রড অ্যাক্টের অধীনে, কিন্তু কারাদণ্ড হলো না। বিচারক বিবেচনা করলেন তার বয়স, তার অনুশোচনা, তার পূর্ববর্তী রেকর্ড যা শূন্য—কোনো আগের অপরাধ নেই। বিচারক বললেন এই ছেলেটি সমাজের জন্য বিপদ নয়, বরং সঠিক পথে পরিচালিত হলে সমাজের সম্পদ হতে পারে, তাকে দেওয়া হলো কমিউনিটি সার্ভিস এবং সুপারভাইজড রিলিজ।

আদালত থেকে বের হওয়ার সময় তার চোখে কি ছিল—স্বস্তি, লজ্জা নাকি অদ্ভুত কোনো গর্ব? তা কেউ জানে না। 

মন্তব্যসমূহ