১৭৫৭ সাল, পলাশীর প্রান্তর। ইতিহাস আপনাকে শিখিয়েছে এক বিশ্বাসঘাতকের নাম—মির জাফর।কিন্তু মির জাফর তো ছিল একটা পুতুলমাত্র। আসল খেলাটা ছিল টাকার!
একটু লজিক্যালি ভেবে দেখুন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে রবার্ট ক্লাইভ শুরুটা করেছিল একজন সামান্য কেরানি হিসেবে। কিন্তু ১৭৫৭ সালের পলাশীর মাঠে তিনি কোম্পানির সেনাপতি। কোম্পানির হয়ে যারা যুদ্ধ করতেছে, তারা কোনো দেশের পেশাদার সেনাবাহিনী ছিল না—একটা কোম্পানির ভাড়াটে যোদ্ধার দল!
তবে রবার্ট ক্লাইভের সবচেয়ে বড় অস্ত্র এসব ভাড়াটে যোদ্ধা, কামান বা বন্দুক ছিল না; তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ছিল ‘ঘুষ’!
মির জাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ—নবাবের ইনার সার্কেল আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এত টাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোথায় পেল? ব্রিটিশ সরকারের কাছে? মোটেই না! এই বিশাল ফান্ডিং এসেছিল বাংলার মাটি থেকেই! এমন এক পরিবারের কাছ থেকে, যাদের তৎকালীন সম্পদের পরিমাণ ছিল পুরো ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মোট মূলধনের চেয়েও বেশি! যাদের কাছ থেকে ধার করত খোদ নবাবরা, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও তাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করত!
তারা শুধু নবাবদের লোনই দিত না, তারা চাইলে নবাবদের গদি থেকে টেনে নামাতে পারত! সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই পরিবারটিকে বলা হতো ‘জগতশেঠ’—অর্থাৎ Banker of the World।
হ্যাঁ, জগতশেঠ একটা পরিবারের টাইটেল। পলাশীর কাহিনীতে যিনি ছিলেন, তার নাম জগতশেঠ মহাতাব রায়।
চলুন, আজ এই জগতশেঠ পরিবারের পুরো কাহিনী উদ্ধার করি।
১৬৫০-এর দশক। রাজস্থানের মারওয়ার থেকে হীরানন্দ সাহু নামের এক ব্যবসায়ী বিহারে এলো। বিহারের পাটনাতে তখন একটি জিনিসের রমবমা ব্যবসা—সোরা বা সল্টপিটার (তথা পটাশিয়াম নাইট্রেট)। এটা বারুদ বা গান পাউডার তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল।
ইউরোপে তখন যুদ্ধ চলতেছে—ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ—সবাই একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতেছে জলে বা স্থলে। এখন যার কাছে বারুদ কম, সে তো যুদ্ধে হেরে যাবে! আর সেই যুগে সারা বিশ্বের সবচেয়ে সেরা মানের এবং সবচেয়ে সস্তা সোরা পাওয়া যেত বিহারের পাটনায়। আজকের যুগের পরাশক্তিদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বা ইউরেনিয়ামের যে দাম, সে যুগে পাটনার সোরার দাম ছিল অনেকটাই তেমনই।
হীরানন্দ সাহু যখন রাজস্থানের মারওয়ার থেকে পাটনায় এসেছিল, তিনি কিন্তু খালি হাতে আসেননি। মারওয়ারিরা জাত ব্যবসায়ী। রাজস্থানে হীরানন্দের বাবার জহুরির ব্যবসা ছিল—মানে গহনা এবং মনি-মুক্তার ব্যবসা। অর্থাৎ হীরানন্দের হাতে আগে থেকেই টাকা ছিল। বিহারে এসে হীরানন্দ নামল সোরার ব্যবসায়।
কিন্তু হীরানন্দ সাহু পাটনায় এসে তো আর নিজে মাটি খুঁড়ে সোরা বের করেননি! পাটনা এবং বিহারের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর সোরা তৈরি হতো। এই সোরা মাটি থেকে আলাদা করার একটা খুব নোংরা এবং কষ্টকর প্রসেস ছিল। এই কাজটা করত স্থানীয় এক অতি দরিদ্র দলিত সম্প্রদায়, যাদেরকে বলা হতো ‘নুনিয়া’। এরা ছিল খেটে খাওয়া দিনমজুর। এরা সারাদিন মাটি সেদ্ধ করে, ফিল্টার করে সোরা বের করত।
ইউরোপীয়রা (মানে ব্রিটিশ এবং ডাচরা) যখন পাটনায় আসত সোরা কিনতে, তারা একটা বড় সমস্যায় পড়ত। তারা তো আর গ্রামে গ্রামে গিয়ে হাজার হাজার গরীব নুনিয়াদের কাছ থেকে এক কেজি, দুই কেজি করে সোরা কিনতে পারবে না! তার উপর আবার তাদের ভাষা আলাদা, কালচার আলাদা, আর এত সময়ও তাদের নাই। ইউরোপীয়দের দরকার ছিল এমন একজন লোক, যে একবারে হাজার হাজার টন সোরা জাহাজে তুলে দেবে।
ঠিক এই সুযোগটাই নিয়েছিল হীরানন্দ সাহু। তিনি ইউরোপিয়ান কোম্পানি এবং গরীব নুনিয়াদের মাঝখানের মিডলম্যান বা ব্রোকার হয়ে গেলেন। তিনি চালু করলেন ‘দাদন সিস্টেম’।
দাদন মানে হলো অ্যাডভান্স টাকা বা ঋণ দেয়া। হীরানন্দ গরীব নুনিয়াদের কাছে গিয়ে বলতেন—তোমাদের সারাবছরের খাওয়ার টাকা আমি অ্যাডভান্স দিয়ে দেব। কিন্তু একটা শর্ত—তোমরা মাটি থেকে যত সোরা বানাবা, সেটা শুধু আমাকেই দিতে হবে, অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবা না। এবং দাম আমি যা ঠিক করব, সেটাই হবে।
গরীব নুনিয়ার টাকার অভাবে এই দাদন নিতে বাধ্য হতো এবং আজীবনের জন্য হীরানন্দের কাছে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যেত। হীরানন্দ তাদের কাছ থেকে একদম কম দরে টন কে টন সোরা কিনে নিজের গোডাউনে স্টক করত।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করি—শুধু নিজের পুঁজি দিয়ে এত বড় দাদন ব্যবসা করা যায় না। এর পেছনে কাজ করেছিল একটি মারাত্মক মেকানিজম: মারওয়ারি সিন্ডিকেট।
মারওয়ারিরা যখন ব্যবসার জন্য অন্য শহরে যেত, তাদের পুরো কমিউনিটি তাদের ব্যাকিং দিত। হীরানন্দ যখন পাটনায় সোরা ব্যবসায় নেমেছিল, তখন রাজস্থান, গুজরাট, দিল্লির অন্য মারওয়ারি ব্যবসায়ীরা তার উপরে ইনভেস্ট করেছিল। কারণ তাদের নিজেদের মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল। অর্থাৎ হীরানন্দের প্রাথমিক পুঁজি শুধু তার নিজের পকেট থেকে আসেনি; এটা ছিল তার পুরো মারওয়ারি কমিউনিটির ভেঞ্চার ক্যাপিটালিজম।
এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন—বাংলা বা বিহারের ব্যবসায়ীরা কেন সেটা পারেনি? মারওয়ারি ব্যবসায়ী হীরানন্দ কেন পারল?
এখন হীরানন্দের উত্থান বুঝতে গেলে মারওয়ারিদের ডিএনএ বুঝতে হবে। ‘মারওয়ারি’ শব্দটা এসেছে রাজস্থানের মারওয়ার অঞ্চল থেকে—বর্তমানে যোধপুর এবং এর আশেপাশের এলাকা। যারা ঐ এলাকা থেকে এসে ব্যবসা করত, তাদেরকে বাঙালিরা মারওয়ারি বলত।
মারওয়ারিদের মধ্যে মূলত দুটি ধর্ম দেখা যেত—হিন্দু এবং জৈন। জগতশেঠের পরিবার ছিল জৈন ধর্মের অনুসারী।
জৈন ধর্মের একটি মূল নিয়ম হলো অহিংসা এবং কোনো জীবের ক্ষতি না করা। এই নিয়মের কারণে জৈনরা কখনোই কৃষিকাজ করতে পারত না—কারণ লাঙল চালালে বা মাটি খুঁড়লে পোকামাকড় মারা যায়। তারা সেনাবাহিনীতেও যোগ দিতে পারত না—কারণ যুদ্ধে মানুষ মারতে হয়। তাহলে তারা খাবে কী?
বেঁচে থাকার একটাই উপায় খোলা ছিল—ব্যবসা এবং হিসাবরক্ষণ (অর্থাৎ অ্যাকাউন্টিং)। ধর্মীয় রেগুলেশনের কারণেই তারা বংশপরম্পরায় শুধু ট্রেডিং এবং ব্যাংকিংয়ের দিকে ফোকাস করতে বাধ্য হয়েছিল।
এছাড়াও তাদের সাফল্যের পেছনে মোটা দাগে চারটি প্রভাবক ছিল:
১. মরুভূমির রুক্ষতা: রাজস্থানের মাটি ছিল অনূর্বর এবং শুষ্ক মরুভূমি। সেখানে ফসল হতো না। বাঙালির মতো তাদের বাড়ির পাশের পুকুর বা আম-কাঁঠালের বাগান ছিল না যে অলস বসে বসে খাবে। রাজস্থানে কাজ না করলে না খেয়ে মরতে হবে। এই ভয়ঙ্কর সারভাইভাল গেম তাদের রক্তে ঢুকে গিয়েছিল। তাই তারা পেটের দায়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে হাজার মাইল দূরের বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা বা গুজরাটে গিয়ে ব্যবসা করতে বাধ্য হতো। এই প্রতিকূলতাই তাদের এক্সট্রিম লেভেলের রিক্স-টেকার বানিয়েছিল।
২. কমিউনিটি ইকোসিস্টেম: একজন বাঙালি বা বিহারী যখন নতুন শহরে ব্যবসা করতে যেত, সে একা। কিন্তু একজন মারওয়ারি কখনোই একা হয় না। তাদের একটা সিস্টেম ছিল, যাকে বলা হতো ‘বাসা’। এটা ছিল এক ধরনের কমিউনিটি হোস্টেল। রাজস্থানের একটা ১৫ বছরের ছেলে যদি ব্যবসা করতে কলকাতা বা মুর্শিদাবাদে আসে, তাহলে সে ওই বাসাতে ফ্রি থাকা-খাওয়া পেত। সিনিয়র মারওয়ারি ব্যবসায়ীরা তাকে নিজের দোকানে কাজ শেখাত। এমনকি প্রথম ব্যবসার জন্য তাকে বিনা সুদে মূলধনও দিয়ে দিত! মারওয়ারিদের নিজেদের ভেতরে ট্রাস্ট বা বিশ্বাস এতটাই স্ট্রং যে, শুধু মুখের কথায় বা একটা কাগজের টুকরায় লাখ লাখ টাকার লেনদেন তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে করে ফেলত। কেউ বেইমানি করলে পুরো মারওয়ারি সমাজ তাকে একঘরে করে দিত। এই কমিউনিটি ব্যাকআপের কারণেই হীরানন্দ সাহুর মতো ব্যবসায়ীরা এত দ্রুত এত বড় ব্যবসা করতে পেরেছিল।
৩. দ্য আল্টিমেট বুক-কিপিং: মারওয়ারিদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় ওয়েপন ছিল তাদের হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, যাকে তারা বলত ‘পার্তা’। আজকের দিনের কর্পোরেট কোম্পানিগুলো প্রতিদিনের প্রফিট বা লসের হিসাব রাখে, মারওয়ারিরা এই কাজটা ৩০০ বছর আগে থেকে করে আসতেছিল! তাদের নিয়ম ছিল প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে দোকানের এক পয়সার হিসাবও মেলাতে হবে। দিনে কত টাকা লাভ হইছে, কত টাকার খরচ—তার একদম নিখুঁত ব্যালেন্স শিট প্রতিদিন তারা তৈরি করত। তাদের বাচ্চারা ছোটবেলায় কবিতা মুখস্থ করার আগে ডাবল এন্ট্রি বুক-কিপিং শিখত!
৪. ক্যাপিটালিস্ট মাইন্ডসেট: বাংলার জমিদাররা যখন টাকা পেত, তারা সেই টাকা দিয়ে প্রাসাদ বানাত, হাতি কিনত, আমোদ-প্রমোদ করত। কিন্তু মারওয়ারিরা ছিল খাঁটি ক্যাপিটালিস্ট বা পুঁজিবাদী। তারা বড়লোক হয়ে গেলেও সাধারণ সুতি কাপড় পড়ত এবং নিয়মিত ডাল-ভাত খেত। তারা প্রফিটের টাকা কখনোই লাক্সারিতে খরচ করত না; তারা সেই লাভটাকে আবার ব্যবসায় রি-ইনভেস্ট করত। টাকার সাথে টাকাকে রোলিং করে তারা চক্রবৃদ্ধি হারে সম্পদ বাড়াত।
তো আবার হীরানন্দের গল্পে ফেরা যাক। হীরানন্দের গোডাউন সোরায় ভর্তি। ওদিকে নদীপথে পাটনায় এসে হাজির হয়েছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ VOC এবং ফ্রেঞ্চ কোম্পানি। সবার আছে বারুদের চাহিদা।
হীরানন্দ সাহু শুরু করতেন নিলাম বা বিডিং। তিনি দেখতেন কে বেশি টাকা দেয়। ডাচরা যদি ৫ টাকা দেয়, ব্রিটিশরা দিত ৬ টাকা। যে সোরা বা সল্টপিটার তিনি গরীব নুনিয়াদের কাছ থেকে ১ টাকায় কিনেছেন, সেটা তিনি ইউরোপিয়ানদের কাছে ৩০০% বা ৪০০% লাভে বিক্রি করতেন!
ইউরোপীয়রা জানত যে হীরানন্দ তাদের ঠকাচ্ছে, কিন্তু ইউরোপীয়দের হাতে কোনো অপশন ছিল না। কারণ পুরো সাপ্লাই চেইনটা হীরানন্দ তার দাদন সিস্টেম দিয়ে ব্লক করে রেখেছে। হীরানন্দ সাহু হয়ে গেছেন সোরার বাজারের একচ্ছত্র অধিপতি!
এই সোরা বেচে হীরানন্দের কাছে ইউরোপ থেকে আসা বস্তা বস্তা সোনা-রুপার কয়েন এবং বুলিয়ান জমতে শুরু করল।
ক্যাপিটালিজমের নিয়ম হলো—ক্যাশ টাকা কখনোই ফেলে রাখতে নেই। হীরানন্দ দেখলেন তার কাছে বিপুল পরিমাণ সোনা-রুপার মুদ্রা জমে গেছে। সেটা দিয়ে তিনি এবার অন্য ব্যবসায়ীদের লোন দিতে শুরু করলেন। এমনকি যে ইউরোপীয়ানরা তার কাছ থেকে সোরা কিনতে আসত, তাদেরও যখন টাকার শর্টেজ পড়ত, হীরানন্দ চড়া সুদে তাদেরকেও লোন দেয়া শুরু করল।
এভাবেই সোরার ব্যবসা থেকে পাওয়া প্রফিটের ক্যাশ ফ্লো ব্যবহার করে একটা সাধারণ মারওয়ারি ব্যবসায়ী পরিবার ধীরে ধীরে মানি লেন্ডার এবং ব্যাংকিং ব্যবসায় ঢুকে গেল। হীরানন্দ হয়ে উঠলেন পাটনার একজন প্রভাবশালী মহাজন।
এখন, টাকা বেশি হয়ে গেলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে হয়; তা না হলে সেই টাকা ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে যায়। আর এখানেই মাস্টারস্ট্রোকটি খেলল হীরানন্দের ছেলে মানিকচাঁদ।
মানিকচাঁদ পাটনা ছেড়ে সোজা চলে গেল ঢাকায়—বাংলার তৎকালীন রাজধানী। সেখানে তার পরিচয় হলো এমন একজনের সাথে, যিনি পুরো বাংলার রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করতেন: বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান।
বাংলা ছিল তখন সুবা বাংলা—মানে মোগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। বাংলার শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামো ছিল দুই ভাগে বিভক্ত: নবাবী এবং দেওয়ানী।
কাগজে-কলমে সব ক্ষমতার উৎস ছিল দিল্লি। বাংলার নবাবরা ছিল কাগজে-কলমে বাংলায় মোগল সম্রাটের প্রতিনিধি। নবাবের কাজ ছিল সেনাবাহিনী পরিচালনা করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, যুদ্ধ করা, বিদ্রোহ দমন করা এবং প্রশাসন চালানো। সহজ ভাষায়, নবাব ছিল গভর্নর + আর্মি চিফ।
আর দেওয়ানের হাতে ছিল রাজস্ব আদায়, জমির হিসাব, খাজনা, অর্থ বিভাগ এবং সম্রাটের কোষাগারে টাকা পাঠানো (আই মিন মোগল সম্রাটের কোষাগারে)। সহজ ভাষায়, দেওয়ান ছিল ফাইনান্স মিনিস্টার এবং রেভিনিউ সেক্রেটারি।
নবাব দেখতেন রাজ্য, আর দেওয়ান দেখতেন টাকা। খাজনা আদায় করে একটা অংশ পাঠিয়ে দেয়া হতো দিল্লি, আর একটা অংশ নবাব পেত রাজ্য পরিচালনার জন্য। এটা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের এক ধরনের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স।
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান হিসেবে পাঠালেন। ওদিকে তখন বাংলার নবাব ছিল আওরঙ্গজেবেরই নাতি আজিম-উস-শান। আজিমের সাথে মুর্শিদকুলি খানের সম্পর্ক ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। ঝামেলা এড়াতে মুর্শিদকুলি খান তার অফিস এবং কার্যালয় ঢাকার বদলে মাকসুদাবাদে সরিয়ে নেন। পরে সেই শহরের নামই হয়ে যায় মুর্শিদাবাদ।
তো মুর্শিদকুলি খান যখন ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে চলে গেলেন, মানিকচাঁদও সেখানে হাজির! আর সেখান থেকেই মানিকচাঁদ ধীরে ধীরে হয়ে উঠল মহাশক্তিধর। কিন্তু কীভাবে? আসুন, সেটা বলি।
আজকের যুগে আপনার কাছে চেক বই আছে, অনলাইনে এক ক্লিকে টাকা ট্রান্সফার করা যায়। কিন্তু আজ থেকে পৌনে চারশো বছর আগে বাংলায়? সে যুগে সাধারণ কৃষক বা আমজনতার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। তারা দৈনন্দিন বাজার-সদাই করত কড়ি বা তামার পয়সা দিয়ে। আর বড় লেনদেন হতো রুপা বা সোনার মুদ্রায়।
তখন গোটা মোগল সাম্রাজ্যে অভিন্ন কোনো মুদ্রা ছিল না। মোগল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের শাসকরা নিজস্ব ডিজাইন এবং ওজনের মুদ্রা বানাত। ফলে বাজারে শত শত রকমের মিশ্র মুদ্রা ঘুরত।
সে সময় মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশ ছিল সুবা বাংলা। আর সেখানে মোগল সম্রাটের নিয়োজিত দেওয়ান ছিলেন মুর্শিদকুলি খান। কিন্তু মুর্শিদকুলি খান বেশ বড় একটা টেনশনে পড়ে গেলেন। তাকে প্রতি বছর দিল্লির মোগল সম্রাটের কাছে বাংলার রাজস্ব বা ট্যাক্স পাঠাতে হতো। আর মোগল সম্রাটের কড়া নির্দেশ ছিল—ট্যাক্সের টাকা হতে হবে একদম খাঁটি ঝকঝকে নতুন রুপার মুদ্রায়!
মুর্শিদকুলি খান পড়লেন মহাবিপদে। এত বিশাল পরিমাণ মিশ্র মুদ্রাকে গলিয়ে খাঁটি মুদ্রায় রূপান্তর করা কোনো সাধারণ কাজ নয়!
ঠিক এই সুযোগটাই নিল হীরানন্দের ছেলে মানিকচাঁদ। তিনি মুর্শিদকুলি খানকে একটা ডিল অফার করলেন। মানিকচাঁদ বলল—টাকশালের দায়িত্ব আমাকে দিয়ে দেন। দিল্লির সম্রাটকে যে খাঁটি মুদ্রা পাঠাতে হবে, তার পুরো গ্যারান্টি আমি দিব! সম্রাটের কাছে টাকা পৌঁছাতেও দেরি হবে না।
মুর্শিদকুলি খান রাজি হয়ে গেল, কারণ এতে তার নিজের গদি বেঁচে গেল! কিন্তু বিনিময়ে মানিকচাঁদ কী পেয়েছিল?
মানিকচাঁদ পেয়ে গেল পুরো বাংলার কারেন্সি এক্সচেঞ্জ করার লিগ্যাল মনোপলি! মুর্শিদাবাদের টাকশাল বা সুবা বাংলার মুদ্রা তৈরির কারখানার কন্ট্রোল মুর্শিদকুলি খান তুলে দিয়েছিলেন মানিকচাঁদের হাতে।
এই টাকশাল থেকে মানিকচাঁদ দুইভাবে টাকা কামাত:
প্রথমত, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে: ধরুন মাদ্রাজ থেকে একজন ব্যবসায়ী তার স্থানীয় মুদ্রা নিয়ে বাংলায় এসেছে মসলিন কিনতে। কিন্তু তার মুদ্রা বাংলায় চলবে না। তাকে সোজা যেতে হবে মানিকচাঁদের টাকশালে মানি এক্সচেঞ্জের জন্য। সেখান থেকে মাদ্রাজ থেকে আনা মুদ্রা জমা দিয়ে বাংলার নতুন মুদ্রা নিতে হবে। এই এক্সচেঞ্জ করার জন্য মানিকচাঁদ যে ফি কেটে নিত, তাকে বলা হতো ‘বাট্টা’।
দ্বিতীয় আয় আসত জমিদারদের কাছ থেকে: দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান নিয়ম করে দিলেন—খাজনা হিসেবে কোনো পুরোনো বা মিশ্র মুদ্রা দেয়া যাবে না; একদম খাঁটি নতুন রুপার মুদ্রা দিতে হবে। জমিদাররাই পড়ে গেল মহাবিপদে। তারা নতুন মুদ্রা পাবে কোথায়? বাধ্য হয়ে জমিদাররা তাদের সংগৃহীত পুরোনো মুদ্রা নিয়ে মানিকচাঁদের টাকশালে যেত। এরপর মানিকচাঁদকে ফি দিয়ে নতুন মুদ্রা নিয়ে দেওয়ানের কোষাগারে খাজনা দিত।
ভাবুন তো, দেশি জমিদার থেকে শুরু করে বিদেশি ব্যবসায়ী—সবাই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে আসতেছে টাকা পাল্টাতে, আর আপনি নিজের ইচ্ছামতো এক্সচেঞ্জ রেট বসাচ্ছেন! এটা ছিল একটা লিগ্যাল মনোপলি।
এবার আরেক মেকানিজমের কথা বলি। ভেবে দেখুন আঠারো শতকে বাংলার রাস্তাঘাট কেমন ছিল। বস্তায় ভর্তি করে রুপার কয়েন নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া মানেই ঠগী বা ডাকাতদের হাতে পড়া! এই সমস্যার একটা সমাধান বের করে দিলেন খোদ মানিকচাঁদ।
বাংলার সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যবসার জন্য যখন দিল্লি বা গুজরাটে যেত, তারা বস্তা বস্তা রুপা সাথে নিত না। তারা মানিকচাঁদের কাছে টাকা দিত; বিনিময়ে মানিকচাঁদ তাদের একটা কাগজে লিখে দিত—এই কাগজের নাম হলো ‘হুন্ডি’।
আগেই বলেছি মারওয়ারিদের বিশাল বিজনেস নেটওয়ার্কের কথা। সে সাথে হীরানন্দ এবং মানিকচাঁদ সোরার ব্যবসা করে সারা ভারতে ইতিমধ্যেই তাদের বিজনেস নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে ফেলেছিল। সুতরাং বাংলার ব্যবসায়ীরা হুন্ডির কাগজ নিয়ে দিল্লি বা গুজরাটে গিয়ে মানিকচাঁদের পারিবারিক ব্যবসার কোনো ব্রাঞ্চ অফিসে সেই কাগজটি দেখালেই সেখানকার স্থানীয় মুদ্রায় টাকা পেয়ে যেত!
মানিকচাঁদ এই সেম গেমটি অফার করল খোদ বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খানকেও। আগে দেওয়ান বাংলার ট্যাক্স গরুর গাড়িতে বস্তা ভরে কড়া পাহারায় দিল্লি পাঠাত। মানিকচাঁদ দেওয়ানকে বললেন—দিল্লিতে বস্তা ভরে রুপা পাঠানোর আর কোনো দরকার নেই আপনার। আপনার রুপার মুদ্রা আমার মুর্শিদাবাদের কোষাগারে জমা রাখুন, আমি হুন্ডি করে দিচ্ছি। মোগল দরবার আমার দিল্লির শাখা থেকে হুন্ডির কাগজ দেখিয়ে টাকা বুঝে নেবে।
ব্যাস! আজকের যুগে আমরা যাকে TT বা টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার বলি, মানিকচাঁদ সেই যুগে রাষ্ট্রের ট্যাক্স পাঠানোর জন্য সেটা করে দেখাল তার হুন্ডি সিস্টেমের মাধ্যমে। এই হুন্ডি সিস্টেম দিয়ে মানিকচাঁদ বিশাল কমিশন খেত।
এভাবেই তার রমরমা ব্যবসা চলতে থাকে। ১৭১৪ সালে মানিকচাঁদ মারা যায়। মানিকচাঁদের নিজের কোনো ছেলে ছিল না, তাই তিনি তার এক ভাগ্নেকে দত্তক নিয়েছিলেন। এই দত্তক ছেলের নাম ফতেহ চাঁদ। মানিকচাঁদের উত্তরাধিকার পান এই ফতেহ চাঁদ।
কিন্তু এতদিন ধরে বাংলার রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন এসে গেছে। ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খানের কাজে খুশি হয়ে মোগল সম্রাট তাকে দেওয়ানের পাশাপাশি নবাব বা সুবেদার পদটিও দিয়ে দেন। অর্থাৎ নবাব এবং দেওয়ান—দুটো ক্ষমতাই এখন মুর্শিদকুলি খানের হাতে চলে আসে।
আর ওদিকে ফতেহ চাঁদ তার বাবার সিস্টেমটাকে একটা বিশাল আকার দিয়ে দেয়। ফতেহ চাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং দিল্লির কোষাগারে হুন্ডির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ট্যাক্স পাঠানোর মেকানিজমে মুগ্ধ হয়ে ১৭২৩ সালে তৎকালীন মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ, ফতেহ চাঁদকে একটি ঐতিহাসিক উপাধি দেন।
এই উপাধিই ছিল ‘জগতশেঠ’—যার মানে হলো বিশ্বের ব্যাংকার বা Banker of the World।
এখান থেকেই এই পরিবারটি আর শুধু মারওয়ায়ারী ব্যবসায়ী রইল না; তারা হয়ে গেল একটা ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট!
আজকের যুগে কোনো একটি দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক (যেমন বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক) কী করে? তারা সরকারের কোষাগার সামাল দেয়, সরকার বিপদে পড়লে লোন দেয়। জগতশেঠরা ঠিক এই কাজটিই করত!
নবাবের কাছে যে ট্যাক্স আসত, সেটা নবাব নিজের ঘরে রাখতেন না; রাখতেন জগতশেঠের কাছে। অনেক সময় জমিদাররা খরা বা বন্যার কারণে ঠিকমতো খাজনা তুলতে পারত না। নবাবের ডেডলাইন মিস করলে তো জমিদারি চলে যাবে, তাই জমিদাররা বাধ্য হয়ে জগতশেঠের কাছ থেকে চড়া সুদে লোন করে নবাবের খাজনা দিত। এমনকি নবাবরাও কখনো যুদ্ধের জন্য এক্সট্রা টাকার দরকার হলে জগতশেঠের কাছে হাত পাতত; জগতশেঠরা নবাবদের লোন দিত।
আর সবচেয়ে ডার্ক রিয়্যালিটি ছিল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো—ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা বাংলায় আসত কাপড় কিনতে, কারণ ইউরোপে তখন শিল্প বিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন শুরু হচ্ছে, আর বাংলার কাপড়ের চাহিদা সেখানে আকাশচুম্বী। কিন্তু সমস্যা হলো ইউরোপীয়দের কাছে তখন বিক্রি করার মতো কোনো প্রোডাক্ট ছিল না যা বাঙালিরা কিনবে। তাই তাদের বাধ্য হয়ে সোনা বা রুপার বার জাহাজে করে আনতে হতো।
এখানেও জগতশেঠ খেলল আরেকটা খেলা। ইউরোপ থেকে সোনা বা রুপার বার নিয়ে জাহাজগুলো যখন বাংলায় পৌঁছাত, তখন সেই সোনা বা রুপা সরাসরি বাংলার বাজারে তো চলত না! ওগুলো গলিয়ে বাংলার মুদ্রায় রূপান্তর করতে হতো। আর পুরো বাংলার টাকশালের মালিক কে? জগতশেঠ!
টাকশালে এই মুদ্রা রূপান্তর করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত। কিন্তু জাহাজগুলো তো আর বসে থাকবে না, কারণ সে সময় ছিল পালতোলা জাহাজ। বাতাসের গতিপথের পরিবর্তন হওয়ার আগেই তাদের আবার ইউরোপে ফিরে যেতে হবে। তাই দ্রুত পণ্য কেনার জন্য তাদের হাতে ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ দরকার বা মুদ্রা দরকার। বাধ্য হয়ে ইংরেজ, ফরাসি এবং ডাচ কোম্পানিগুলো তাদের ইউরোপীয় সোনা এবং রূপা জগৎশেঠের কাছে জামানত রেখে চড়া সুদে নগদ মুদ্রা ধার নিত। চিন্তা করুন অবস্থা, যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পুরো পৃথিবী শাসন করার স্বপ্ন দেখতেছে, তারা সে যুগে বাংলার একটি পরিবারের কাছে টাকা ধার করতে বাধ্য হতো!
এখন এত বস্তা বস্তা সোনা এবং রূপার কয়েন তারা রাখত কোথায়? এটা কিন্তু খুবই ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়। এর জন্য তাদের তিনটা ডিফেন্স মেকানিজম ছিল।
প্রথম স্তরের নাম বরকন্দাজ। তৎকালীন বড় ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে জগৎশেঠরা সাধারণ কোনো বাড়িতে তো থাকত না, তাদের বাড়িগুলো ছিল একেকটা দুর্গের মতো—যেগুলোকে বলা হতো 'কুঠি'। এই কুঠির সুরক্ষার জন্য তাদের নিজস্ব প্রাইভেট আর্মি বা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী ছিল, যাদের বলা হতো বরকন্দাজ। রাজস্থান এবং আফগানিস্তান থেকে আনা ভয়ঙ্কর সব ভাড়াটে যোদ্ধারা দিনরাত তাদের কুঠি পাহারা দিত।
দ্বিতীয় স্তর হলো আন্ডারগ্রাউন্ড ভল্ট। তাদের কুঠির নিচে গোপন সুরঙ্গ বা সিক্রেট টানেল এবং বিশাল বিশাল ঘর ছিল, যেগুলোকে বলা হতো 'তেরখানা'। এই তেরখানার ভেতরে লোহার বিশাল বিশাল সিন্দুক বা তিজোরিতে এসব টাকাপয়সা রাখা হতো। এখন এই তিজোরির নকশা শুধু পরিবারের প্রধান এবং একদম বিশ্বস্ত কয়েকজনের হাতে থাকত।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে স্মার্ট মুভটি ছিল মানি সার্কুলেশন। জগৎশেঠরা খুব ভালো করেই জানত টাকা যদি ভল্টে পড়ে থাকে, তবে ডাকাতি হওয়ার রিস্ক থাকে। তাই তারা ক্যাশ টাকা খুব একটা ফেলে রাখত না। ক্যাপিটালিজমের সবচেয়ে বড় নিয়মটিই হলো—টাকা মার্কেটে ছড়িয়ে দিতে হবে। জগৎশেঠরা তাদের অতিরিক্ত ক্যাশ ইউরোপীয় কোম্পানি, স্থানীয় জমিদার, এমনকি খোদ নবাবকেও লোন দিয়ে দিত। একটু লজিক্যালি ভেবে দেখুন—আপনার টাকা যদি খোদ রাষ্ট্রের শাসকের (মানে নবাবের) পকেটে ধার হিসেবে দেওয়া থাকে, তাহলে আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? নবাবের নিজের! কারণ আপনাকে কেউ যদি মেরে ফেলে, নবাবের ইকোনমি কিন্তু কলাপ্স করতে পারে। এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় প্রোটেক্টিভ শিল্ড।
এখন যার হাতে টাকা, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা তার হাতেই যায়। ব্যাংক ব্যবসার একটা অলিখিত নিয়ম আছে—ব্যবসা ভালো করতে হলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকতে হয়। কিন্তু রাজা বা নবাব যদি তাদের ব্যবসার স্বার্থের অনুকূলে পলিসি না বানায় তাহলে? তাহলে তো ব্যবসা লাটে উঠবে! তখনই জগৎশেঠরা কি করত জানেন? তারা নবাবই চেঞ্জ করে ফেলত! চলুন দেখি কীভাবে একটি ব্যাংকিং ফ্যামিলি বাংলার সিংহাসন নিয়ে রীতিমতো ‘গেম অব থ্রোনস’ খেলা শুরু করে।
অনেকেই ভাবে জগৎশেঠরা বোধহয় প্রথম বেইমানিটি করেছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে, পলাশীর প্রান্তরে। কিন্তু না, পলাশীর ঠিক ১৭ বছর আগে, ১৭৪০ সালে তারা প্রথম একটা আস্ত সরকার পাল্টে দিয়েছিল বাংলায়! তখন বাংলার নবাব ছিলেন সরফরাজ খান। তিনি ছিলেন রক্তচটা। তাঁর আমলে প্রশাসনে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না, চারিদিকে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাচ্ছিল এবং ব্যবসার জন্য এসব ছিল মারাত্মক ক্ষতিকর। এর মধ্যে সরফরাজ খান ঘটিয়ে দিয়েছিল আরেকটি কাহিনী—তা হলো, সরফরাজ খান জগৎশেঠ পরিবারের এক সুন্দরী নারী সম্পর্কে শুনে তাঁকে দেখার জন্য জোরজবরদস্তি শুরু করে। এই ঘটনাটা তৎকালীন রক্ষণশীল মারাঠা এলিটদের আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত করে। জগৎশেঠরা এক ভয়ঙ্কর প্ল্যান করেছিল। তারা ঠিক করল নবাবকে সরিয়ে এমন একজনকে বসাতে হবে যে তাদের কথা শুনবে, সম্মানও করবে। তারা বেছে নিল আলীবর্দী খানকে (সিরাজের নানা), যিনি তখন বিহারের নায়েবে নাজিম। নায়েবে নাজিম হলো নবাবের ডেপুটি; নবাবের হয়ে বিহার সামলাতেন আলীবর্দী খান। জগৎশেঠ টাকা দিল এবং আলীবর্দী খান সেই টাকা দিয়ে বিহারের সৈন্যবাহিনীকে নিজের দিকে নিয়ে এল। ১৭৪০ সালে গিরিয়ার প্রান্তরে নবাব সরফরাজ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল আলীবর্দী খান। যুদ্ধে সরফরাজ খান নিহত হলো, আলীবর্দী খান বাংলার নবাব হলেন। দিল্লির মুঘল সম্রাট তখন কি করতেছিল? জগৎশেঠ সেখানেও একটা গেম খেলে দিল! আলীবর্দী খান নবাব হওয়ার পর দিল্লির মুঘল দরবারকে শান্ত করার জন্য জগৎশেঠ নিজের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা পাঠিয়ে দিল দিল্লিতে। মুঘল সম্রাট তো খুশি হয়ে গেল টাকা পেয়ে! আলীবর্দীকে তারা নবাব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিল, আর আলীবর্দী হয়ে গেল বৈধ নবাব। অর্থাৎ, শুধু টাকা দিয়ে তারা একটা অবৈধ ক্ষমতার টেকওভারকে লিগ্যালাইজ করে নিল।
ফাতেহ চাঁদের এক ছেলে ছিল, নাম আনন্দ চাঁদ। কিন্তু আনন্দ চাঁদ তার বাবার আগেই মারা গেল। ১৭৪৪ সালে ফাতেহ চাঁদ যখন মারা গেল, তখন তার নাতি (অর্থাৎ আনন্দ চাঁদের ছেলে) মাহাতাব রাই জগৎশেঠ পরিবারের উত্তরাধিকার পেল। ১৭৫৬ সাল—বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানও মারা গেলেন। ক্ষমতায় এল তার তরুণ নাতি সিরাজউদ্দৌলা। সিরাজ ছিল তরুণ, স্বাধীনচেতা। তরুণ সিরাজ ক্ষমতায় এসেই দেখলেন তার দরবারের পুরোনো মন্ত্রীরা (মানে মীর জাফর আলী খান, রায়দুর্লভ)—এরা সবাই জগৎশেঠের কথায় ওঠে-বসে। সিরাজ চাইলেন এই মারয়ারী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে।
সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতায় বসে তার সেনাবাহিনীর জন্য এবং তার নিজের জন্য খরচ মেটাতে জগৎশেঠ মাহাতাব রাইয়ের কাছে এককালীন ৩ কোটি টাকা দাবি করে বসেন। একজন ব্যাংকার লোন দিতে রাজি, কিন্তু এভাবে চাঁদা বা এক্সটরশন দিতে রাজি নয়। মাহাতাব রাই যখন টাকা দিতে গড়িওসি করল, তখন সিরাজ তার উপরে খেপে গেল। এরপর সিরাজ যা করল, সেটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। দরবারে সবার সামনে তরুণ সিরাজউদ্দৌলা জগৎশেঠ মাহাতাব রাইকে চরম অপমান করেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, সিরাজ তাকে চড় মেরেছিল এবং সুন্নতে খাতনা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
এখন সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে নবাব তো দেশের মালিক, সে তো চাইলেই জগৎশেঠকে মেরেই ফেলতে পারত—কেন মারল না? উত্তরটি হলো ইকোনমি। সিরাজ চাইলেও জগৎশেঠকে খুন করতে পারত না, কারণ পুরো বাংলার অর্থনীতি, জমিদারদের খাজনা, হুন্ডি সিস্টেম জগৎশেঠের হাতেই তো ছিল! জগৎশেঠ মারা গেলে তার ব্যবসা ধ্বংস হলে বাংলার অর্থনীতি এক সেকেন্ডে কলাপ্স করত বা ধ্বংস হয়ে যেত। এমনকি বাংলার সেনাবাহিনীর বেতনও বন্ধ হয়ে যেত! সিরাজের করা এই অপমান জগৎশেঠ মাহাতাব রাইয়ের ইগোতে চরম আঘাত হানল। একজন ব্যাংকারের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার সুনাম বা রেপুটেশন। মানুষ যদি দেখে নবাব তাকে অপমান করতেছে, তাহলে তো কেউ তাকে আর ভয় পাবে না, সম্মানও করবে না। মাহাতাব রাই সিদ্ধান্ত নিল আলীবর্দীকে যেভাবে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, সিরাজকে ঠিক সেভাবেই ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে।
সিরাজকে সরাতে হবে ক্ষমতা থেকে, কিন্তু তার জায়গায় বসবে টা কে? তারা বেছে নিল নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানকে, কারণ মীর জাফর ছিল লোভী। কিন্তু মীর জাফর তো একা যুদ্ধ করতে পারবে না; সিরাজের বিশাল সেনাবাহিনী ঠেকাবে কে? জগৎশেঠের দরকার ছিল এমন একটা ভাড়াটে বাহিনী বা মার্সেনারি ফোর্স, যাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র আছে; কিন্তু বাংলার সিংহাসনের প্রতি যাদের কোনো লোভ নেই বলে অন্তত জগৎশেঠ মনে করত। তার চোখ পড়ল রবার্ট ক্লাইভের দিকে, অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দিকে। কেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি? কারণ ব্রিটিশরা ছিল জগৎশেঠের অন্যতম বড় কাস্টমার বা খাতক (মানে যারা ঋণ নেয়)। তাছাড়া সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে হুট করেই একটা ভুল করে—কলকাতা আক্রমণ করে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেয়। ফলে রবার্ট ক্লাইভের মনেও সিরাজের প্রতি চরম রাগ ছিল। জগৎশেঠ ক্লাইভকে ডাকল, একটা কর্পোরেট ডিল সাইন করিয়ে নিল। ডিলটা ছিল একদম সিম্পল—জগৎশেঠ বলল, "আমরা যুদ্ধের পুরো ফান্ডিং দেব। মীর জাফর, রায়দুর্লভ, নবাবের সব সেনাপতিকে টাকা দিয়ে কিনে নেব। সিরাজের সেনাবাহিনী যুদ্ধের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকবে, যুদ্ধ করবে না। তুমি শুধু তোমার অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে মাঠে একটা যুদ্ধের নাটক করবা। বিনিময়ে সিরাজকে সরিয়ে মীর জাফরকে নবাব বানানো হবে, আর তুমি (অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) পাবে বিনাশুল্কে বাংলায় ব্যবসা করার অধিকার।" রবার্ট ক্লাইভের কাছে এটা ছিল রীতিমতো লটারি! কোম্পানির একটা টাকাও খরচ হচ্ছে না, অথচ তারা পুরো বাংলায় ট্রেড মনোপলি পেয়ে যাচ্ছে।
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন, পলাশীর প্রান্তর—যেটিকে আমরা 'যুদ্ধ' বলি, সেটা আসলে কোনো যুদ্ধই ছিল না। সেটা ছিল জগৎশেঠের একটা হোস্টাইল টেকওভার। মীর জাফর বেইমানি করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বেইমানির পেছনে যে কোটি টাকার ফান্ডিং, তার পুরোটাই এসেছিল জগৎশেঠ মাহাতাব রাইয়ের নিজস্ব কোষাগার থেকে। কিন্তু জগৎশেঠ একটা হিসাব মেলাতে ভুল করেছিল—যে ইংরেজদের তারা ভাড়াটে যোদ্ধা ভেবেছিল, মনে করত এরা শুধু ব্যবসা করবে, সেই ইংরেজরা একদিন যে তাদের রক্ত চুষে খাবে, সেটা তারা হিসাবেও আনেনি।
পলাশীর মাঠে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর জগৎশেঠ মাহাতাব রাই ভেবেছিল তারা জিতেই গেছে। মীর জাফর এখন সিংহাসনে বসে আছে, সে কেবলই একটা পুতুল। রবার্ট ক্লাইভ এবং ইংরেজরা নিজেদের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত, আর পুরো বাংলার রিমোট কন্ট্রোল এখন চিরকালের জন্য জগৎশেঠের পকেটে। কিন্তু তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি এখানেই করেছিল—যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তারা ভাড়াটে যোদ্ধার দল ভেবেছিল, তারা বুঝতে পারেনি যে এই কোম্পানি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী নয়, এরা হলো আস্ত একটা সাম্রাজ্যবাদী ড্রাগন! আর ড্রাগন কখনো নিজের শিকার অন্যের সাথে ভাগ করে না।
পলাশীর পর প্রথম কয়েক বছর জগৎশেঠ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পর্ক ভালোই ছিল, কিন্তু প্রবলেম শুরু হলো কোম্পানির নীতি নিয়ে। ইংরেজরা ছিল পিওর ক্যাপিটালিস্ট। তারা দেখল বাংলার অর্থনীতি থেকে সর্বোচ্চ প্রফিট বের করতে হলে মাঝখান থেকে মিডলম্যান বা দালাল সরিয়ে দিতে হবে। আর বাংলায় সবচেয়ে বড় মিডলম্যান বা দালাল কে? জগৎশেঠ! আগে ইংরেজরা জগৎশেঠের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করত, কিন্তু পলাশীর পর ইংরেজরা বাংলার কোষাগার এমনভাবে লুট করতে শুরু করল যে তাদের আর জগৎশেঠের ঋণের কোনো দরকারই পড়ল না। অন্যদিকে ইংরেজরা নিজেদের টাকশাল বা মিন্ট তৈরি করার পারমিশন পেয়ে গেল। অর্থাৎ, জগৎশেঠের সবচেয়ে বড় টাকার কল—সেই 'বাট্টা' বা সেই এক্সচেঞ্জ ফি-এর মনোপলি ভেঙে গেল।
মীর জাফর যখন ইংরেজদের টাকার ডিমান্ড মেটাতে ব্যর্থ হলো, ইংরেজরা তাকে সরিয়ে তার জামাই মীর কাশিমকে নবাব বানাল। আর মীর কাশিম ছিল সিরাজউদ্দৌলার চেয়েও দুই গুণ চালাক। মীর কাশিম ক্ষমতায় এসেই বুঝতে পারল—যতদিন জগৎশেঠ পরিবার মুর্শিদাবাদে বসে আছে, ততদিন বাংলার অর্থনীতি স্বাধীন হবে না। কারণ জগৎশেঠ গোপনে ব্রিটিশদের সব তথ্য পাচার করত এবং তাদের ফান্ডিং দিত। তাই মীর কাশিম একটা মাস্টারস্ট্রোক দিল। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং জগৎশেঠের প্রভাব থেকে বাঁচতে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে বহু দূরে বিহারের মুঙ্গেরের কাছে নিয়ে গেল। কিন্তু জগৎশেঠ মাহাতাব রাই মুর্শিদাবাদ ছাড়তে রাজি না; তিনি সেখান থেকে গোপনে ইংরেজদের সাথে চিঠি চালাচালি শুরু করল। মীর কাশিমের গুপ্তচররা সেই চিঠি ধরে ফেলল। এটাই ছিল ট্রিগারিং পয়েন্ট—রাষ্ট্রের সাথে বেইমানি বা ট্রেজন ধরা পড়ে গেছে।
১৭৬৩ সাল—ইংরেজদের সাথে মীর কাশিমের চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মীর কাশিম জানত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যুদ্ধে তিনি ফাইনালি হারবেন। তিনি হারলে হারবেন, কিন্তু ঐ মারয়ারী জগৎশেঠ পরিবারকে তিনি দেখেই ছাড়বেন! তিনি জগৎশেঠ মাহাতাব রাই এবং তার চাচাতো ভাই মহারাজ স্বরূপ চাঁদকে বন্দি করার নির্দেশ দিলেন। তাদের পায়ে শিকল পরিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো বিহারের মুঙ্গের দুর্গে। তাদেরকে সেদিন মুঙ্গের দুর্গের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো। তাদেরকে আলাদা দুটো বস্তায় ভরা হলো, বস্তার মুখ শক্ত করে বাঁধা হলো। এরপর মুঙ্গের দুর্গের বিশাল উঁচু প্রাচীর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় ছুড়ে ফেলা হলো গঙ্গার পানিতে। পানির নিচে হাবুডুবু খেতে খেতে করুণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যাংকার জগৎশেঠ মাহাতাব রাই।
মাহাতাব রাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলে খুশাল চাঁদ ব্যবসার হাল ধরার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ১৭৬৫ সালে ঘটল বাংলার ইতিহাসে আরেকটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ডার্ক ইভেন্ট। বক্সারের যুদ্ধে জেতার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে পুরো বাংলার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লিগ্যালি কিনে নিল। খেয়াল করে দেখুন মেকানিজমটা—১৭৬৫ সালের পর ব্রিটিশরা নিজেরাই হয়ে গেল দেওয়ান, নিজেদের ক্যাশিয়ার তারা নিজেরাই! মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম পরিণত হলো ব্রিটিশদের পেনশনভোগীতে বা ভাতাভোগীতে। ফলে বাংলা থেকে দিল্লিতে আর আগের মতো হুন্ডি করে ট্যাক্স পাঠানোর কোনো দরকারই পড়ল না। ব্রিটিশরা নিজেদের ব্যাংকিং সিস্টেম বাংলায় নিয়ে এল। মুঘল সম্রাটের সাথে জগৎশেঠের যে কানেকশন তাদের 'ব্যাংকার অব দ্য ওয়ার্ল্ড' বা 'জগৎশেঠ' বানিয়েছিল, ব্রিটিশদের এক সিগনেচারে সেই কানেকশন চিরতরে ডিলিট হয়ে গেল।
ব্রিটিশরা জগৎশেঠ পরিবারকে পুরোপুরি মেরে ফেলেনি, স্লো পয়জনিং করেছিল। ইংরেজরা তাদের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সামান্য কিছু ভাতা বা পেনশনের ব্যবস্থা করে দিল। যে পরিবার এক সময় নবাবদের লোন দিত, ব্রিটিশদের শোষণে তারা এক সময় চরম ঋণের জালে আটকে গেল। ১৯ শতকের শুরুর দিকেই জগৎশেঠ পরিবার পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেল।
আপনি যদি আজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে যান, সেখানে মহিমাপুরে (নশিপুরে) জগৎশেঠের পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। বাড়িটিকে এখন একটা ছোট্ট মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস, ভেবে দেখুন! জগৎশেঠের বর্তমান বংশধরেরা আর কোনো রাজপ্রাসাদে থাকে না; তাদের কেউ কেউ সাধারণ চাকরিজীবী, কেউ কেউ ছোট ব্যবসায়ী। ইতিহাসের পাতা থেকে তাদের নাম এমনভাবে মুছে দেওয়া হয়েছে যে আজ তাদের রাস্তায় দেখলেও কেউ চিনতে পারবে না—বুঝতে পারবে না যে এদের পূর্বপুরুষেরাই একদিন আস্ত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা বিক্রি করে দিয়েছিল।
