ভ্যানগার্ড ও ব্ল্যাকরকের আসল ইতিহাস

ভ্যানগার্ড ও ব্ল্যাকরকের আসল ইতিহাস


​ধরুন, অ্যাপেলের শেয়ারহোল্ডার। অ্যাপেলের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারদের লিস্টে দুটো নাম দেখবেন— 'ভ্যানগার্ড' এবং 'ব্ল্যাকরক'। এবার মাইক্রোসফটের শেয়ারহোল্ডার কারা সেটা দেখুন, সেই একই দুটি নাম থাকবে ওপরে। গুগলেরও একই, আমাজনের বেলাতেও একই, পেপসি, কোকা-কোলা— এসবের বেলাতেও একই নাম পাবেন।

​এমনকি এরা না, বড় বড় ওষুধ কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানি, তেল কোম্পানি, মিডিয়া কোম্পানি— যেখানেই যান, মালিকের ঘরে ঘুরেফিরে এই দুটি নামই দেখবেন। অ্যাপেল, গুগল, কোকা-কোলা— এই নামগুলো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ চেনে। অথচ যারা এদের সবার সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার, সেই দুই কোম্পানির নাম বেশিরভাগ মানুষ জীবনেও শোনেনি।

​দুটি কোম্পানি মিলে সামাল দেয় ২০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি! সংখ্যাটি কল্পনা করাও কঠিন। বাংলাদেশের মতো প্রায় ৪০টি দেশের অর্থনীতি জোড়া দিলে এই অংক হয়।

​এখন সমস্যা হলো, এই ডাটাগুলো দেখিয়ে ইউটিউবে হাজারো ভিডিও বানানো হয়েছে এবং তাতে বলা হয়েছে এরা নাকি পৃথিবীর গোপন মালিক! তারাই সরকার চালাচ্ছে, তারাই যুদ্ধ বাধাচ্ছে দেশে দেশে! আজ আমি আপনাদের এটা বলবো না যে কনস্পিরেসি তত্ত্ব সত্য নাকি মিথ্যা। আজ আমি আপনাকে পুরো বিষয়টা বিস্তারিত বলবো।

​এই কোম্পানিগুলো আসলে কী? কীভাবে কাজ করে? টাকাটা কার? আর ক্ষমতাটা কতখানি আসল? তারপর রায়টি আপনি নিজেই দেবেন। চলুন শুরু করি!

​প্রথমে বেসিকটা পরিষ্কার করে বলি। কারণ এখানেই ৯০% মানুষ ভুলটা করে। ব্ল্যাকরক বা ভ্যানগার্ড কোনোটাই ব্যাংক না। এরা হলো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। পার্থক্যটা বুঝুন। ব্যাংকে আপনি টাকা রাখলে টাকাটা ব্যাংকের খাতায় ঢোকে, ব্যাংক সেটা দিয়ে ব্যবসা করে, লাভ করে এবং সেই লাভ থেকে সামান্য কিছু সুদা আকারে আপনাকে রিটার্ন দেয়।

​আর অ্যাসেট ম্যানেজার সে আপনার টাকা আপনার নামেই ইনভেস্ট করে দেয়— শেয়ার, বন্ড বা সম্পদে। লাভ-লস সব আপনার, সে শুধু নেয় ছোট্ট একটা সার্ভিস ফি।

​একটা তুলনা দেই। ধরুন আপনি ঢাকায় যাবেন। আপনার নিজের গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই। প্রাইভেট কার রিজার্ভ নিলেও ভাড়া অনেক। তাহলে আপনি কী করেন? বাসে উঠে পড়েন। ৫০ জন যাত্রী মিলে একটা বাসের ট্রিপের খরচ ভাগ করে নেন।

​মিউচুয়াল ফান্ড জিনিসটা ঠিক এই বাসটার মতোই। হাজার হাজার মানুষের ছোট ছোট টাকা এক জায়গায় জমা হয়, আর সেই বিশাল অংক দিয়ে কেনা হয় শত শত কোম্পানির শেয়ার। আর অ্যাসেট ম্যানেজার হলো বাসের ড্রাইভার।

​এবার সবচেয়ে জরুরি শব্দটি শিখুন: AUM বা 'অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট'। খেয়াল করুন শব্দটা— 'আন্ডার ম্যানেজমেন্ট', মালিকানা নয় কিন্তু! ওই ২০ ট্রিলিয়ন ডলার ব্ল্যাকরক বা ভ্যানগার্ডের টাকা না, ওটা মানুষের টাকা। এই টাকার ভেতরে আছে আমেরিকার আমজনতার টাকা। হয়তো কোনো এক স্কুল শিক্ষকের পেনশনের টাকা, কোনো এক নার্সের সারাজীবনের সঞ্চয়, কোনো এক ফায়ারফাইটারের রিটারায়মেন্টের ফান্ড। কোটি কোটি সাধারণ মানুষের টাকা এক ছাদের নিচে জমা হয়েছে মাত্র।

​যাক, তাহলে তো মিটেই গেল! ষড়যন্ত্র ভুয়া? ওয়েট! এতো তাড়াতাড়ি না! একটা প্রশ্ন পকেটে রাখুন— বাসের স্টিয়ারিং কার হাতে? রাস্তা ঠিক করে কে? এই প্রশ্নে আমরা ফিরবো, তার আগে দেখি এই দুই কোম্পানির ইতিহাস।

​ধরুন আপনার কাছে ১০ লাখ টাকা আছে। আপনি শেয়ারবাজারে খাটাতে চান, কিন্তু কোন শেয়ার কিনবেন আপনি জানেন না। তাই আপনি গেলেন একজন এক্সপার্টের কাছে। সে আপনাকে বলল, "টাকাটা আমাকে দিন, আমি আমার বুদ্ধি খাটিয়ে সবচেয়ে সেরা শেয়ারগুলো বেছে নেব। বিনিময়ে বছরে মাত্র ২% ফি নেব।" একেই বলে 'অ্যাক্টিভ ইনভেস্টিং'। এক্সপার্ট নিজে অ্যাক্টিভলি বাছাই করতেছে কোন শেয়ার সে কিনবে আর কোনটা বেচবে।

​শুনে মনে হচ্ছে এক্সপার্ট যেহেতু আপনার হয়ে খেলবে, সেহেতু আপনার প্রফিট ঠেকায় কে! কিন্তু সমস্যা হলো, যুগের পর যুগ ধরে গবেষণায় বারবার দেখা গেছে যে, প্রতি ১০ জন প্রফেশনাল ম্যানেজারের মধ্যে প্রায় ৯ জনই বাজারের সাধারণ গড় বা 'মার্কেট এভারেজ' বিট করতে ব্যর্থ হয়।

​এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে— এই বাজারের গড় জিনিসটা আসলে কী? খুব সহজে বলি, ধরুন এ বছরে দেশের পুরো শেয়ারবাজার গড়ে ১০% ওপরের দিকে উঠেছে বা লাভ করছে। মানে আপনি যদি কোনো এক্সপার্টকে না ধরে, টাকা না দিয়ে চোখ বন্ধ করে বাজারের সব কোম্পানির শেয়ার একটু একটু করে কিনে রেখে দিতেন, তাহলে এমনিতেই আপনার ১০% লাভ হতো। মানে হলো, গোটা বাজারটা ১০% বড় হইছে। 

​এখন চিন্তা করুন, এক্সপার্ট আপনাকে কথা দিয়েছিল সে তার এক্সট্রা বুদ্ধি খাটিয়ে আপনাকে ১০%-এর বেশি লাভ এনে দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সে সেটা পারে না। কেন পারে না? লজিকটা একটু খেয়াল করুন। আজকাল শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা করে কারা? সাধারণ মানুষ? না! বেশিরভাগ কেনাবেচায় করে এই প্রফেশনাল এক্সপার্টরা। তার মানে পুরো শেয়ারবাজারে যে গড় রেজাল্ট, সেটা আসলে এক্সপার্টদের সম্মিলিত কেনাবেচার রেজাল্ট!

​এবার ওই এক্সপার্টকে যে ২% ফি দেবেন, সেটা হিসাবে ঢোকান। আপনার শেয়ারে লাভ হোক বা লস হোক, এক্সপার্ট কিন্তু তার ফি ঠিকই কেটে নেবে। ১০-২০ বছরের হিসাব করলে দেখবেন এই ছোট্ট ফি কম্পাউন্ড বা চক্রবৃদ্ধি হারে আপনার লাভের একটি বিশাল অংশ খেয়ে ফেলবে। মানে রিস্ক আপনার, টাকা আপনার, কিন্তু নিশ্চিত কামাইটা এক্সপার্টের!

​আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট এই ধোঁকাবাজির খেলা চালিয়ে গেছে যুগের পর যুগ, যতদিন না এক লোকে এসে পুরো টেবিলটা উল্টে দিল!

জন বোগল ভ্যানগার্ডের প্রতিষ্ঠাতা
চিত:জন বোগল ভ্যানগার্ডের প্রতিষ্ঠাতা


​লোকটার নাম জন বোগল (John Bogle)। জন্ম ১৯২৯ সালে। সে বছরই আমেরিকার শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছিল। সেই ধসে বোগলের পরিবারও সব হারায়।

​ছেলেটা বড় হয়েছিল হোটেলের প্লেট ধুয়ে, পেপার-পত্রিকা বিক্রি করে। মেধার জোরে পরে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছিল, সে থিসিস লিখল মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে। এরপর চাকরি পেল, তরতর করে প্রমোশন হলো এবং ৩৮ বছর বয়সে এক বিশাল ফান্ড কোম্পানির বস!

​তারপর একদিন সর্বনাশ হলো! উচ্চাভিলাষী এক ভুল সিদ্ধান্তে কোম্পানিটা ডুবলো, আর ১৯৭৪ সালে কোম্পানির বোর্ড বোগলকে বহিষ্কার করল।

​অপমানিত বোগল ঠান্ডা মাথায় নিজের পুরোনো থিসিসটা নিয়ে আবার ভাবল। যদি ম্যাক্সিমাম এক্সপার্টই বাজারের সেই গড় বা এভারেজকে হারাতে না পারে, তাহলে এই এক্সপার্টদের পেছনে টাকা ঢালার মানে কী?

​বোগলের আইডিয়াটা ছিল একদম সিম্পল! খড়ের গাদায় সূঁচ না খুঁজে, পুরো খড়ের গাদাটাই কিনে ফেলো! মানে বাজারের সেরা কোম্পানির স্টক খোঁজার ট্রাই করাই বাদ! লিস্টে থাকা সব ভালো কোম্পানির শেয়ার অল্প অল্প করে কিনে রাখো। কেউ ডুববে, কেউ উঠবে, কিন্তু দিনশেষে আপনি পাবেন পুরো অর্থনীতির এই এভারেজ গ্রোথ।

​আর যেহেতু বাসাবাসির জন্য কোনো দামি এক্সপার্টের দরকারই নেই, তাই ফি নেমে আসবে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি! ফাইনান্সের দুনিয়ায় এই বুদ্ধির নাম— 'ইনডেক্স ফান্ড'।

​বিষয়টি এভাবে চিন্তা করুন: একটি ভালো স্কুলে— আবার বলতেছি, একটি ভালো স্কুলে— কোনো একটি ক্লাসে ১০০ জন ছাত্র। অল্প কিছু ছাত্র আছে যারা ৯৯ পাবে পরীক্ষা দিলে, আবার অল্প কিছু আছে যারা টেনেটুনে ৩৩ পেয়ে পাস করবে। খারাপ ছাত্র তো সব ক্লাসেই থাকে, তাই না? সমস্যা হলো আপনি কাউকে চেনেন না— কে ভালো, কে মন্দ আপনি জানেন না। শুধু জানেন এটা একটা ভালো স্কুল। তার মানে হলো, অন এভারেজ ভালো ছেলেপেলেরাই এখানে পড়াশোনা করে।

​এখন আপনি এদের ওপরে বাজি ধরবেন। যার ওপর বাজি ধরবেন সে যত নম্বর পাবে, আপনি পাবেন তত টাকা। এখন যদি ভুল ছাত্রের ওপরে আপনি বাজি ধরেন, তাহলে পাবেন মাত্র ৩৩, আর সেরা ছাত্রের ওপরে বাজি ধরলে তো ছক্কা— পাবেন ৯৯! বড় রিস্ক, বড় লাভ, অথবা বিশাল ক্ষতি!

​এখন আপনি কোনো ঝুঁকি না নিয়ে এই ১০০ জন ছাত্রের যে গড় নম্বর হবে, সেটার ওপরে বাজি ধরলেন। দেখা গেল সবার গড় নম্বর এসেছে ৬০। খারাপ কী? ঝুঁকি কম, মডারেট প্রফিট!

​এখন এই ছাত্রগুলোকে কোম্পানি হিসেবে কল্পনা করুন, আর পুরো ক্লাসটাকে শেয়ার মার্কেট। তাহলে কী হবে?

​১৯৭৫ সালে বোগল নতুন একটা কোম্পানি খুলল। নাম রাখল এক বিখ্যাত ব্যাটেলশিপের নামে— 'ভ্যানগার্ড' (Vanguard)।

​১৯৭৬ সালে বাজারে এলো সাধারণ মানুষের জন্য পৃথিবীর প্রথম ইনডেক্স ফান্ড। ওয়াল স্ট্রিটের এক্সপার্টরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল! তারা এর নাম দিল 'বোগলের পাগলামি' বা 'Bogle's Folly'। এমনকি পোস্টার পর্যন্ত ছাপা হলো— 'ইনডেক্স ফান্ড আন-আমেরিকান'। গড় বা এভারেজ মেনে ব্যবসা করা নাকি অ্যান্টি-আমেরিকান অ্যাটিটিউড!

​যাই হোক, বোগলের টার্গেট ছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ফান্ডের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট তোলা, কিন্তু উঠেছিল মাত্র ১১ মিলিয়ন! অর্থাৎ শুরুতেই চরম ফ্লপ!

​আর এই পুরো যুদ্ধটা বোগল লড়তেছিল কোন অবস্থায় জানেন? মাত্র ৩১ বছর বয়সে তার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়, এরপর একে একে ৬টি! ডাক্তাররা সোজা বলেই দিয়েছিল, এই ড্যামেজ হার্ট বা হৃদপিণ্ড নিয়ে তার পক্ষে বেশি দিন বাঁচা সম্ভব না! মানে লোকটা ওয়াল স্ট্রিটের পুরো সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়তেছিল আক্ষরিক অর্থেই একটা ভাঙা হৃদয় নিয়ে!

​অবশেষে ৬৬ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালে তার বুকে বসানো হয় অন্য মানুষের হৃদপিণ্ড, যাকে বলে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট। সেই ধার করা হৃদয় দিয়েই সে বেঁচেছিল আরও ২৩ বছর! আর নিজের চোখে দেখে গিয়েছিল তার সেই পাগলামি কীভাবে পুরো আমেরিকাকে ওলটপালট করে দিল!

​বোগল একটা ধ্রুব সত্য জানতো— গণিত মিথ্যা বলে না। বছর যায়, ডাটা জমা হয়। দেখা গেল বোগলের সেই সস্তা ইনডেক্স ফান্ড চুপিচুপি হারিয়ে দিচ্ছে ওয়াল স্ট্রিটের দামি এক্সপার্টদের!

​এছাড়াও বোগল খেলেছিল আরেকটি মাস্টারস্ট্রোক। ভ্যানগার্ডের মালিকানা কাঠামো বা বিজনেস মডেলটাই সে বানাল একেবারে উল্টো করে। বিষয়টি বুঝিয়ে বলি।

​ধরুন একটা সাধারণ ব্যাংক বা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির কথা। এই কোম্পানির দুইটা আলাদা পক্ষ থাকে। একদিকে থাকে কোম্পানির মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা, অন্যদিকে থাকে সাধারণ কাস্টমাররা। এখন কোম্পানির মালিকদের একটাই টার্গেট— বছর শেষে বিশাল প্রফিট বা মুনাফা করা। আর এই মুনাফা আসে কোথা থেকে? কাস্টমারের জমানো টাকা থেকে বিভিন্ন ফি বা হিডেন চার্জ কেটে। মানে সোজা কথায়, কাস্টমারের পকেট কাটলেই শেয়ারহোল্ডারদের পকেট ভারী হয়। মালিক আর কাস্টমারের মধ্যে এখানে একটা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট থাকে।

​কিন্তু জন বোগল তার ভ্যানগার্ড কোম্পানিতে পুরো গেমটা চেঞ্জ করে দিল! সে এই বাইরের মালিক বা শেয়ারহোল্ডার জিনিসটাই পুরোপুরি গায়েব করে দিল তার কোম্পানি থেকে! তার নিয়ম হলো— ভ্যানগার্ডের কোনো আলাদা শেয়ারহোল্ডার থাকবে না। তাহলে কোম্পানির মালিক কে হবে? কোম্পানির মালিক ওই ফান্ড! ওই ফান্ডটাই!

​বোগল নিয়ম করল, ভ্যানগার্ডের ফান্ডে যারা টাকা ইনভেস্ট করবে, তারা অটোমেটিকভাব এই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার বা মালিক হয়ে যাবে। মানে আপনি যদি কাস্টমার হয়ে সেখানে ১০০ টাকা রাখেন, তাহলে আপনি শুধু কাস্টমার নন, আপনি নিজেই বিশাল কোম্পানির ছোট্ট একটা অংশের মালিক!

​এবার অংকটা মেলান— আপনি নিজেই কাস্টমার, আবার আপনি নিজেই মালিক! কেউ কি নিজের পকেট কেটে নিজেকে মুনাফা দেয়? দেয় না! সে তো ভ্যানগার্ডের আলাদা করে কোনো মুনাফা কামানোর দরকারই পড়ে না। কোম্পানির কর্মীদের বেতন, সার্ভার এবং অফিস চালাতে ঠিক যতটুকু খরচ হয়, সব কাস্টমারের ফান্ড থেকে ফি হিসেবে ততটুকুই কেটে নেওয়া হয়, এক পয়সাও বেশি না! মাঝখানে কোনো প্রফিট মার্জিন নেই।

​এজন্যই ওয়াল স্ট্রিটের অন্য কোম্পানিগুলোর ফি যেখানে ২%, ভ্যানগার্ডের ফি সেখানে এক ধাক্কায় নেমে আসে শূন্যের কাছাকাছি!

​বোগল নিজে শত শত বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারতো, কিন্তু মালিকানা তো সে বিলিয়ে দিয়েছে গ্রাহকদের। ২০১৯ সালে বোগল যখন মারা যান, তখন তার সম্পদ ছিল মাত্র ৮০ মিলিয়ন ডলারের মতো! ওয়াল স্ট্রিটের একজন মাঝারি মানের হেজ ফান্ড ম্যানেজারেরও ভাই এর চাইতে বেশি সম্পদ থাকে!

​ওয়ারেন বাফেটের ভাষায়, "আমেরিকার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য যদি কেউ সবচেয়ে বেশি কিছু করে থাকে, সেটা হলো এই জন বোগল।"

BlackRock C.E.O. Larry Fink on ESG Investing
চিত্র: ব্ল্যাকরকের চেয়ারম্যান Larry Fink


​এবার দ্বিতীয় গল্পটা বলি— সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চরিত্র। ১৯৮০-র দশক, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট। ল্যারি ফিঙ্ক (Larry Fink) নামের এক তরুণ কাজ করতেন 'ফার্স্ট বোস্টন' নামের একটি বড় ব্যাংকে। তার কাজ কী ছিল? খুব সহজ করে বলি।

​ধরুন আপনি ব্যাংক থেকে ২ কোটি টাকা লোন করলেন বাড়ি বানানোর জন্য। বিনিময়ে ব্যাংকে একটা কাগজ বা চুক্তিপত্র লিখে দিলেন যে, আগামী ১০ বছর ধরে আমি সুদসমেত এই টাকা শোধ করব। সুদে-আসলে ১০ বছরে ব্যাংকে দিতে হবে কথার কথা ৪ কোটি টাকা।

​স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাংকের কী করার কথা? আপনার কাছ থেকে ওই ১০ বছর বসে বসে সুদে-আসলে ৪ কোটি টাকা উসুল করার কথা, তাই না?

​কিন্তু ল্যারি ফিঙ্ক ব্যাংকে বসে একটা নতুন বুদ্ধি বের করল। সে বলল, "অপেক্ষার টাইম নাই!" সে আপনার মতো এরকম হাজার হাজার মানুষের লোনের কাগজ একসাথে করল, তারপর সব কাগজ মিলিয়ে একটা বিশাল বান্ডিল বানাল। এবার সেই বান্ডিলটাকে সুন্দর একটা নাম দিয়ে বড় বড় দেশি-বিদেশি ইনভেস্টরদের কাছে অবিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করে দিল!

​এই জিনিস কিনে ইনভেস্টরদের লাভ কী? খেয়াল করে দেখুন, তারা ওই হাজার হাজার মানুষের দেওয়া সুদ একটু একটু করে পাবে। আর ব্যাংকের লাভ কী? ব্যাংক ১০ বছর বসে না থেকে একদিনেই হাজার কোটি টাকার ক্যাশ পেয়ে গেল! ১০ বছর ধরে সুদে-আসলে ব্যাংক হয়তো ১০,০০০ কোটি টাকা পেত, কিন্তু ১০ বছর অপেক্ষা না করে যদি আজই ৭,০০০ কোটি টাকা পাওয়া যায়, তাহলে তো লাভ! ব্যাংকের প্রফিট!

​ল্যারি ফিঙ্ক ঠিক এই ব্রোকার বা মিডলম্যানের কাজটাই করতো। সে মানুষের এই ধারের চুক্তিপত্র বা কাগজগুলো বান্ডিল বানাতো, আর বড় ইনভেস্টরদের কাছে বিক্রি করে দিত। মাঝখান থেকে ব্যাংকের জন্য কোটি কোটি টাকার ইন্সট্যান্ট প্রফিট বা কমিশন বের করে আনত। ফাইনান্সের ভাষায় এই কাগজ কেনাবেচার জাদুমন্ত্রের নাম হলো— 'মর্গেজ ব্যাকড সিকিউরিটিজ' (Mortgage-Backed Securities) বা সংক্ষেপে MBS।

​কী বলতেছি বুঝতেছেন তো? একটু মাথা খাটাতে হবে আজকে!

​শেয়ারবাজারের জটিল খেলায় ল্যারি ফিঙ্ক ছিল রীতিমতো সুপারস্টার! ব্যাংকটাকে সে একাই কামিয়ে দিচ্ছিল কোটি কোটি ডলার। সবাই ধরে নিয়েছিল, এই ছেলে একদিন ব্যাংকের সবচেয়ে বড় বস বা সিইও হবে।

​তারপর এলো ১৯৮৬ সাল। ফাইনান্সের দুনিয়াতো একরকম জুয়া খেলা! সুদের হার বা ইন্টারেস্ট রেট উঠবে নাকি নামবে, তা নিয়ে ল্যারি ফিঙ্কের একটা অংকের হিসাব পুরো উল্টে গেল! এক ধাক্কায় ব্যাংকের লস ১০০ মিলিয়ন ডলার! রাতারাতি সুপারস্টার থেকে সে হয়ে গেল জিরো! যাদের কোটি কোটি টাকা কামিয়ে দিয়েছিল এতদিন, তারাই তাকে অপমান করে ব্যাংক থেকে বের করে দিল।

​ফিঙ্ক ভাগ্যকে দোষ দেয়নি। নিজেকে একটা প্রশ্ন করল— "আমি হারলাম কেন?" উত্তরটা ছিল, সে 'রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট' (Risk Assessment) ভালোমতো করতে পারেনি। পর্যাপ্ত ডাটার অভাবে এই কাজটি সে করতে পারেনি। পুরো শেয়ারবাজারই তখন শুধু লাভের পেছনে অন্ধের মতো ছুটতেছে, কিন্তু বিপদ মাপার কোনো ভালো যন্ত্র কারও কাছে নেই!

​১৯৮৮ সাল। ফিঙ্ক কয়েকজন পার্টনার নিয়ে নতুন একটা কোম্পানি খুলল— 'ব্ল্যাকরক' (BlackRock)।

​এখানে ছোট্ট একটা মজার তথ্য দিই। শুরুতে এদের মূলধন দিয়েছিল 'ব্ল্যাকস্টোন' (Blackstone) নামের আরেকটি বিখ্যাত কোম্পানি, নামটি মনে রাখবেন। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় মালিকানা নিয়ে ঝগড়ায় দুই কোম্পানির ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ব্ল্যাকস্টোন তাদের হাতে থাকা ব্ল্যাকরকের শেয়ার বেচে দেয় কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। আজকের দিনে সেই শেয়ারের দাম কত জানেন? কয়েক হাজার কোটি ডলার!

​ল্যারি ফিঙ্কের তৈরি এই কোম্পানির আসল অস্ত্র কোনো মানুষ ছিল না, ছিল একটি কম্পিউটার সফটওয়্যার— নাম 'আলাদিন' (Aladdin)!

​আলাদিনের কাজ কী জানেন? ভবিষ্যদ্বাণী করা! পৃথিবীর সব দেশের বাজারের ডাটা সে গিলে খায়, তারপর যেকোনো ইনভেস্টমেন্টকে হাজারটা 'হোয়াট-ইফ' (What-if) লুপে ফেলে পরীক্ষা করে।

​হোয়াট-ইফ আমেরিকায় সুদের হার বাড়ে? হোয়াট-ইফ তেলের দাম হঠাৎ পড়ে গেল? হোয়াট-ইফ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল? তাহলে এই ব্যবসার কী হবে— লাভ না ক্ষতি? খেয়াল করুন, এটাই কিন্তু 'রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট'! যেটা ঠিকমত করতে না পারার কারণে ফিঙ্ক ১০০ মিলিয়ন ডলার হারিয়েছিল, সেই জিনিসটাই যাতে আর না হয়, সেজন্য সে জাদুকরী সিস্টেম নিজেই বানিয়ে ফেলল!

​এই জিনিস সে ভাড়া দেওয়া শুরু করল বড় বড় ব্যাংক, ইন্সুরেন্স কোম্পানি, পেনশন ফান্ড— এমনকি কোনো কোনো দেশের সরকারও ভাড়া নিল! সবাই আজ নিজেদের রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করে এই আলাদিন দিয়ে!

​ব্ল্যাকরকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু ভ্যানগার্ড! সেই ভ্যানগার্ডও নিজেদের রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের জন্য ভাড়া নিয়েছে এই আলাদিন! গোটা পৃথিবীর ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ কোনো না কোনোভাবে এই এক সফটওয়্যারের নজরদারিতে ঘুরতেছে!

​তারপর এলো ২০০৮ সালের সেই ভয়াবহ আর্থিক মন্দা। ব্যাংকগুলো তো ওই যে— মানুষের ধার করা টাকার কাগজের বান্ডিল নিয়ে ব্যবসা করতেছিল, কিন্তু মানুষ যখন লোনের টাকা শোধ করতে পারল না, তখন এই কাগজের বান্ডিলগুলো হয়ে গেল জঞ্জাল বা টক্সিক অ্যাসেট!

​আমেরিকার সরকার চাইল ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে, কিন্তু কোন ব্যাংকের খাতায় কত টাকার আসল সম্পদ আছে আর কত টাকার এসব জঞ্জাল লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝার সাধ্য খোদ সরকারেরও ছিল না!

​তখন সরকার ডাকল ব্ল্যাকরককে। কেন? কারণ এই জঞ্জাল স্ক্যান করার মেশিন— মানে ওই 'আলাদিন' নামের সেই সফটওয়্যার বা কম্পিউটার সিস্টেম তো ব্ল্যাকরকের কাছেই আছে!

​সরকারের নির্দেশে এক উইকেন্ডের ছুটির মধ্যে ফিঙ্কের টিম আলাদিন ব্যবহার করে ধসে পড়া ব্যাংকগুলোর খাতা স্ক্যান করা শুরু করল এবং বের করে আনল কোথায় আসল টাকা আর কোথায় জঞ্জাল! এই ঘটনার পর থেকে আমেরিকার সরকারের কাছে ব্ল্যাকরক নামটা বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে গেল!

​আর ২০০৯ সালে ফিঙ্ক দিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাল। পুরো পৃথিবী যখন আর্থিক সংকটে কাঁপতেছে, সবাই ভয়ে পালাচ্ছে, ফিঙ্ক তখন শপিংয়ে বের হলো!

​সংকটে ভুগতে থাকা ব্রিটিশ ব্যাংক 'বার্কলেস' (Barclays) নিজেদের বাঁচাতে সেল করে দিচ্ছিল তাদের সোনার ডিম পাড়া হাঁস— 'আইশেয়ার্স' (iShares) নামের একটা ব্যবসা। ফিঙ্ক সস্তায় সেটা কিনে নিল।

​এই আইশেয়ার্স কী বেচতো জানেন? ইটিএফ (ETF)!

​ইটিএফ ব্যাপারটা সহজ করে বলি। শেয়ারবাজারকে একটা বিশাল শহর হিসেবে কল্পনা করুন, যেখানে হাজারো ব্যবসা আছে। আপনার ১,০০০ টাকা শুধু একটা কাপড়ের কারখানায় ইনভেস্ট করলে কারখানাটি ডুবলে আপনার বড় লোকসান হতে পারে। ইনডেক্স ফান্ডের থিওরি হলো— একটি কোম্পানির ওপরে বাজি না ধরে টাকাটি বাজারের সেরা সেরা বড় বড় কোম্পানির মধ্যে ছড়িয়ে দাও। একটি কোম্পানি খারাপ করলেও অন্য কোম্পানি ভালো করে বড় ক্ষতি সামাল দেবে।

​ধরুন, একটি বক্স হলো একটি ফান্ড, আর আমি ভ্যানগার্ড টাইপের ইনডেক্স ফান্ড ম্যানেজার। আপনি এই বক্সে ১,০০০ টাকা দিলেন, আপনার মতো আরও অনেকে দিল, সব মিলিয়ে বক্সে জমা হলো ১ কোটি টাকা। বক্সটি এখন ১ কোটি টাকার ফান্ড, যার ভেতরে ১,০০০ টাকা আপনারও। তাহলে এই গোটা বক্সের কতটুকুর মালিক আপনি? ১ কোটিকে ১,০০০ দিয়ে ভাগ করেন, পাবেন ১০,০০০। অর্থাৎ এই বক্সটির ১০,০০০ ভাগের এক ভাগ আপনার মালিকানাধীন।

​এখন চিন্তা করুন, বক্সে আছে কত টাকা? ১ কোটি টাকা। আমি এই ১ কোটি টাকা দিয়ে শহরের ১০টি বড় কোম্পানির শেয়ার কিনব। কীভাবে কিনব? একটা তালিকা বানাবো— ১০টি বড় কোম্পানির তালিকা। এই ১০টি বড় কোম্পানির সম্মিলিত মার্কেট ভ্যালু কথার কথা ১০০ কোটি টাকা। বাস্তবে তো অনেক বেশিও হবে, বোঝানোর সুবিধার্থে আমি ১০, ১০০, ১,০০০— এই টাইপের সংখ্যাগুলো ইউজ করতেছি যাতে আপনার হিসাব করতে সহজ হয়, বুঝতে সহজ হয়।

​তো, ১০ কোম্পানির মার্কেট ভ্যালু ১০০ কোটি টাকা। এখন সব কোম্পানির দাম তো সমান না! ধরুন এই ১০টি কোম্পানির ভেতরে A কোম্পানির শেয়ার ৪০ কোটি, B কোম্পানির দাম ২০ কোটি, আর বাকি ৮টির দাম ৫ কোটি টাকা করে। অর্থাৎ, আমার তালিকার ১০টি কোম্পানির মোট ভ্যালু— অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকার ৪০% হলো A কোম্পানি একাই! B কোম্পানি ২০%, এবং বাকি কোম্পানিগুলো ৫% করে করে।

​এখন আমার ওই বক্স তথা ফান্ডে আছে ১ কোটি টাকা। আমি ১ কোটি টাকার ৪০%— অর্থাৎ ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে A কোম্পানির শেয়ার কিনব, ২০ লাখ টাকা দিয়ে কিনব B কোম্পানির শেয়ার, আর ৫ লাখ টাকা করে করে বাকি ৪০ লাখ টাকা খরচ করব বাকি ৮টি কোম্পানির শেয়ার কিনতে।

​তাহলে কী হলো? বক্সের ভেতর থেকে টাকা গেল, শেয়ার ঢুকলো, ভ্যালু কিন্তু সেই ১ কোটি টাকাই! কিন্তু এই বক্সটি এখন আমার ওই তালিকার ১০টি বড় বড় কোম্পানির বাস্তব প্রজেকশন!

​এখন এক মাস পর ওই ১০টি কোম্পানির সম্মিলিত ভ্যালু বেড়ে গেল। ধরুন সম্মিলিতভাবে ১০% বেড়ে গেল, অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়ে গেল ১১০ কোটি টাকা। তাহলে আমার এই বক্সে থাকা কোম্পানির শেয়ারগুলোর সম্মিলিত ভ্যালুও ১০% বাড়লো! অর্থাৎ ১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়ে গেল ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।

​মনে আছে তো, বক্সটির ১০,০০০ ভাগের এক ভাগের মালিক কিন্তু আপনি, কারণ বক্সে তো আপনি দিয়েছিলেন ১,০০০ টাকা! এই ১ কোটি ১০ লাখকে ১০,০০০ দিয়ে ভাগ করেন, দেখবেন ১,১০০ টাকা হবে।

​এখন আপনি ফান্ড ম্যানেজার— অর্থাৎ আমার কাছে এসে বললেন, "আমার অংশীদারিত্ব নাও আর নগদ টাকা ফেরত দাও।" তখন আমি আপনাকে ১,১০০ টাকা ফেরত দিলাম। তাহলে আপনার লাভ হলো কত? ১০০ টাকা।

​এখন খেয়াল করুন, ফান্ড থেকে টাকা তুলে আপনি চলে গেছেন, সুতরাং ফান্ডের মালিকের সংখ্যা একজন কমে গেছে। সুতরাং আমি ফান্ড ম্যানেজার এখন নতুন শেয়ার কিনে হিসাবটা আবার ব্যালেন্স করব। খেয়াল করুন, আপনাকে কিন্তু টাকা ইনভেস্ট করা বা টাকা তোলা— এসবের জন্য অন্য কোথাও যেতে হচ্ছে না, ফান্ড ম্যানেজারের কাছে এলেই হয়ে যাচ্ছে। শেয়ার মার্কেটের মতো শেয়ার বিক্রি করার জন্য কোনো ক্রেতা অন্তত আপনাকে খুঁজতে হবে না, ওটা ফান্ড ম্যানেজারের মাথাব্যথা!

​ফান্ড ম্যানেজার শেয়ার কেনাবেচা করবে তখনই, যখন ইনডেক্স থেকে কোনো কোম্পানি বাদ পড়ে, বা ইনডেক্সের ভেতরে নতুন কোনো কোম্পানি ঢোকে, অথবা আপনার মতো মানুষ যখন ফান্ডে টাকা জমা দেয় অথবা তুলে নিয়ে চলে যায়। ফান্ড ম্যানেজার হিসেবে আমার উদ্দেশ্য একটাই— লিস্টে থাকা কোম্পানিগুলো ঠিক যেভাবে চলবে, ফান্ডও যেন ঠিক তাকে হুবহু নকল বা কপি করে। লিস্টের কোম্পানিগুলোর ভ্যালু যদি ১০% লাভ দেয়, তাহলে ফান্ডও ১০% লাভ দেবে। তালিকায় থাকা এই বড় কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে বাজারে কেমন করতেছে, সেই সামেশন স্কোরটাই হলো ইনডেক্স। কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মূল্য কমে গেলে ফান্ডের মূল্যও কিন্তু কমে যাবে, আর সেটা হলে ফান্ডে যাদের টাকা আছে তাদের কিন্তু লোকসান হবে।

​এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করুন। আপনি সকালে এসে ফান্ডে টাকা দিলেন, কিন্তু আপনি ফান্ডের ঠিক কতটুকু অংশ পাচ্ছেন, সকালে সেটা বলা অসম্ভব! কারণ ফান্ডের পেটের ভেতরে তো আছে অনেক কোম্পানির শেয়ার, আর লাইভ মার্কেটে সেগুলোর দাম সারাদিন সেকেন্ডে সেকেন্ডে লাফাচ্ছে! তাই নিয়ম হলো অপেক্ষা করা।

​বাস্তবে বিকেল ৫টায় বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ম্যানেজাররা খাতাকলম নিয়ে বসে। তারা ফান্ডের ভেতরে সব শেয়ারের শেষ যে ভ্যালু সেটা যোগ করে, তারপর ফান্ডের দেনা এবং পরিচালন খরচ বাদ দিয়ে বের করে দিনশেষে পুরো ফান্ডের নিট মূল্য— যাকে বলে 'নেট অ্যাসেট ভ্যালু' (Net Asset Value) বা NAV। এরপর এই মূল্যকে ফান্ডের মোট মালিকানার অংশ দিয়ে ভাগ করলে বের হয়ে যায় প্রতিটি অংশের দাম, আর এই দামেই আপনার কেনা বা বিক্রির হিসাবটা চূড়ান্ত হয়— ঠিক যেমন বলেছিলাম, ওই যে আপনি ১০০ টাকা প্রফিট করে চলে গেলেন, তেমন। এই প্রসেসটা স্লো। ধরুন দুপুর ১২টায় মার্কেট হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে গেল, আপনি চাচ্ছেন ফান্ড থেকে টাকা তুলে নেবেন, কিন্তু সেটা পারবেন না। কারণ দাম ফিক্সড হবে বিকেলে! দুপুরের সেই চড়া মূল্য বিকেলে আপনি নাও পেতে পারেন।

​এবার আসুন ইটিএফ ম্যাজিকে! ইটিএফের ভেতরেও আছে এই শত শত কোম্পানির শেয়ার। পার্থক্যটা হলো, ইটিএফ এই ফান্ডের মালিকানাকে ছোট ছোট টিকিটে ভাগ করে, তারপর সেটা সাধারণ শেয়ারের মতো সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে বিক্রি করে।

​ফলের দোকানে যেমন সুন্দর প্যাকেজিং করা মিক্সড ফলের ঝুড়ি থাকে, যার ভেতরে নানান পদের ফল অল্প অল্প করে থাকে, ইটিএফ হলো ঠিক তেমনই! ভেতরে নানান কোম্পানির শেয়ার সাজানো। আপনি গোটা রেডিমেড ঝুড়িটাকে কিনতেছেন, আবার বিক্রি করার সময় ওই প্যাকেটটা ধরে— অর্থাৎ ঝুড়িটা ধরেই বিক্রি করে দিচ্ছেন! আপনি শেয়ারবাজারে আর দশজন ইনভেস্টরের মতোই সরাসরি লেনদেন করতেছেন।

​কথার কথা, সকাল ১০টায় মোবাইল অ্যাপ খুলে দেখলেন ইটিএফ ঝুড়ির দাম ১,০০০ টাকা, কিনে ফেললেন। দুপুরে দাম বেড়ে ১,৫০০ টাকা হয়ে গেল, ক্রেতা পাওয়া মাত্রই বিক্রি করে দিতে পারেন! বিক্রির দাম এবং আপনার লাভ দুটোই সেকেন্ডেই নিশ্চিত হয়ে গেল!

​খেয়াল করুন, নতুন এই ক্রেতা কিন্তু ইটিএফ কিনলো ফান্ড কোম্পানির কাছ থেকে নয়— আপনার কাছ থেকে! ১,৫০০ টাকা আপনার পকেটে ঢুকছে। আবার যে লোকের কাছে আপনি বিক্রি করলেন, সেই লোক হয়তো আগামীকাল সেটা ২,০০০ টাকায় অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেবে!

​ইনডেক্স মিউচুয়াল ফান্ডের দাম নির্ধারিত হয় দিনে মাত্র একবার, আর ইটিএফের বাজারদর সারাদিন চেঞ্জ হয়! ভেতরের জিনিস কিন্তু একই, পার্থক্য শুধু কেনাবেচার নিয়মে।

​ল্যারি ফিঙ্ক বা ব্ল্যাকরক কিন্তু ইটিএফ আবিষ্কার করেনি। ফিঙ্কের মাস্টারস্ট্রোক ছিল ২০০৯ সালে সঠিক সময়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইটিএফ ব্যবসা 'আইশেয়ার্স' কিনে নেওয়া! তিনি জানতেন মানুষ আর দিনশেষের অপেক্ষায় বসে থাকতে রাজি না। তারা ফাস্টফুডের মতো এক ক্লিকে ঝুড়ি কিনতে চায়, আবার এক ক্লিকেই বিক্রি করে দিতে চায়! ২০০৯ সালের ওই একটি ডিলই ব্ল্যাকরককে বানিয়ে দিল পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অ্যাসেট ম্যানেজার!

​এরপর পার হয়ে গেল এক দশক— ২০২০ সাল, করোনায় পুরো আমেরিকা লকডাউনে! বড় বড় কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ, কিন্তু মাসশেষে কর্মীদের বেতন তো দিতে হবে! সুতরাং কোম্পানিগুলোর দরকার প্রচুর নগদ ক্যাশ, অন্যথায় কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। আর কর্মী ছাঁটাই করলে আমেরিকা বিপদে পড়বে, আমেরিকা সরকার বিপদে পড়বে।

​এখন কোম্পানিগুলোর তো টাকা দরকার, কিন্তু কোম্পানিগুলো এই বিপদের সময় ধার পায় কীভাবে? তারা বাজারে বন্ড বা ঋণের কাগজ ছাড়ে। ইনভেস্টররা সেই বন্ড কিনে কোম্পানিকে টাকা ধার দেবে এই আশায়। কিন্তু করোনার ভয়ে তখন পুরো পৃথিবীতে আতঙ্ক! মানুষ বন্ড কেনা তো দূরের কথা, ভয়ে সব বেচে দিয়ে ক্যাশ টাকা ঘরে রাখতেছে। কেউ কোম্পানির বন্ড কিনতেছে না! আমেরিকার বড় বড় কোম্পানিগুলো নগদ টাকার অভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে, পুরো অর্থনীতি ধসে পড়ার মতো অবস্থা!

​ঠিক এই মুহূর্তে মাঠে নামলো আমেরিকার সেন্ট্রাল ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ' (Federal Reserve)। তারা ঘোষণা দিল, " ভয় নেই! কেউ বন্ড না কিনলে আমরা কিনব! আমরা বাজারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালব!"

​কিন্তু এখানে একটা বিশাল সমস্যা ছিল। ফেডারেল রিজার্ভ টাকা ছাপাতে পারে ঠিকই, কিন্তু হাজার হাজার কোম্পানির মধ্যে কার বন্ড কেনা নিরাপদ, কোনটি কেনা উচিত আর কোনটি নয়— সেটা যাচাই করার মতো লোকবল বা সেটআপ ফেডের নেই! তাদের দরকার এমন এক সেনাপতি, যে শেয়ারবাজারের প্রতিটি অলিগলি হাতের রেখার মতো চেনে!

​ডাক পড়লো সেই ব্ল্যাকরকের! ফেডারেল রিজার্ভ ব্ল্যাকরকের হাতে টাকার বস্তা তুলে দিয়ে একটা বিশাল দায়িত্ব দিল— "যাও, আমাদের হয়ে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ কর্পোরেট বন্ড এবং বন্ড ইটিএফ কিনে নাও!"

​ব্ল্যাকরক ফেডের টাকা দিয়ে বাজার থেকে বন্ড কিনতে শুরু করল, আর সেই বন্ড কেনার টাকাটা সরাসরি চলে যাবে ডুবতে থাকা কোম্পানিগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে! কোম্পানিগুলো নগদ টাকা পাবে আর অর্থনীতি বেঁচে যাবে। সহজ কথা হলো— টাকা সরকারের, কেনাকাটা করবে সরকার, কিন্তু কী কেনাকাটা করা হবে তার সেই তালিকা প্রস্তুত করার পুরো ক্ষমতা চলে গেল ব্ল্যাকরকের হাতে!

​দেখা গেল ফেডের টাকা দিয়ে ব্ল্যাকরক বাজার থেকে যেসব ইটিএফ কিনতেছে, তার মধ্যে তাদের নিজেদের কোম্পানি 'আইশেয়ার্স'-এর বন্ড ইটিএফও আছে! মানে কী দাঁড়ালো? সরকারি টাকা দিয়ে ব্ল্যাকরক যে মাল কিনতেছে, সেটা তাদের নিজেদের কারখানাতে বানানো!

​ব্ল্যাকরক সাফাই গাইল, "আমরা নিজেদের ইটিএফ কিনলেও সেখান থেকে কোনো ম্যানেজমেন্ট ফি নেব না, আর আমরা নিজেদের ইচ্ছায় কিছু করতেছি না, ফেডারেল রিজার্ভের নিয়ম মেনেই করতেছি।" কথাটা হয়তো সত্যি, কিন্তু তাতে কি বিতর্ক থামে?

​প্রশ্ন উঠল যে, যে কোম্পানি নিজেই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়, সেই আবার সরকারের রেফারী হয়ে কীভাবে নামে? নিজেরা মাঠে খেলতেছে, আবার নিজেরাই বাঁশি বাজাচ্ছে! এটা তো 'কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট'!

​বিতর্ক আর থামলো না, কারণ করোনার এই ভয়াবহ সংকটে একটা ব্যাপার একদম স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল— ব্ল্যাকরক তখন আর শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অ্যাসেট ম্যানেজার নেই, তারা ততদিনে হয়ে উঠেছে আমেরিকা সরকার এবং সেন্ট্রাল ব্যাংকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সংকটকালীন পরামর্শদাতা!

​ইনডেক্স মিউচুয়াল ফান্ডের জন্মদাতা ছিল ভ্যানগার্ড, আর ইটিএফকে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় করেছিল ব্ল্যাকরক। আজকের দিনে দুজনেই কিন্তু দুটো জিনিসই বেচে— অর্থাৎ ইটিএফও বেচে, ইনডেক্স ফান্ডও বেচে। মেকানিজমটা সহজে বোঝার জন্য তাদের সবচেয়ে আইকনিক সিগনেচার প্রোডাক্ট দিয়ে উদাহরণটা দিয়েছি।

​এবার আসুন সেই রহস্যে— কেন দুনিয়ার প্রতিটি বড় বড় কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের লিস্টে এই দুটি নাম সবার ওপরে থাকে? উত্তরটা এখন পানির মতো সোজা! ইনডেক্স ফান্ডের নিয়ম কী? বাছাই নেই, লিস্টের ৫০০টা বড় বড় কোম্পানির শেয়ারই কিনতে হবে! কোকো কিনতে হবে, তার রাইভাল পেপসির শেয়ারও কিনতে হবে!

​দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো— এত টাকা আসে কোথা থেকে? উত্তর হলো— পশ্চিমা বিশ্বের কোটি কোটি চাকরিজীবীদের বেতনের একটা অংশ প্রতি মাসে অটোমেটিক রিটারায়মেন্ট ফান্ডে জমা হয়, আর সেই টাকার সবচেয়ে বড় অংশটা স্রোতের মতো ঢোকে ভ্যানগার্ড বা ব্ল্যাকরকের ফান্ডে! ভ্যানগার্ডে কোনো কোনো দিন ১ বিলিয়ন ডলারও ঢুকছে!

​ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড ছাড়াও এই ক্লাবের আরেকটি বড় নাম হলো 'স্টেট স্ট্রটি' (State Street)। এই তিনটি কোম্পানিকে একসাথে বলা হয় 'Big Three'। আমেরিকার সেরা ৫০০ কোম্পানির প্রায় ৯০ শতাংশেরই প্রধান মালিক এই বিগ থ্রি!

​ইউটিউবে যারা কনস্পিরেসি থিওরির ভিডিও বানায়, তাদের স্ক্রিনশট কিন্তু সত্যি! কিন্তু তাদের ব্যাখ্যা প্রায়শই ভুল থাকে। এবার আসুন ইন্টারনেটের বাকি ষড়যন্ত্রগুলো ফাটাই!

​যেমন, দাবি-১ হলো: ল্যারি ফিঙ্ক পৃথিবীর সম্রাট!

ভুল! ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার তার ক্লায়েন্টের, তার নিজের টাকা না। সে শুধু বাসের ড্রাইভার, যাত্রীদের সম্পদের মালিক সে না, সে পায় শুধু ম্যানেজমেন্ট ফি।

​দাবি-২: ব্ল্যাকরক সব বাড়িঘর কিনে ফেলতেছে!

বাড়ি কেনার ব্যবসার রাজত্ব করতেছে 'ব্ল্যাকস্টোন' (Blackstone), ব্ল্যাকরক না! মনে আছে তো সেই ব্ল্যাকস্টোন-এর কথা? ইন্টারনেটের অর্ধেক মানুষ এই দুই কোম্পানির নাম গুলিয়ে ফেলতেছে!

​দাবি-৩: তারা ক্লায়েন্টের টাকা দিয়ে যা খুশি তা করতে পারে!

আইনত এটা অসম্ভব! তারা হলো ফিন্ডুশিয়ারি (Fiduciary), ক্লায়েন্টের স্বার্থের বাইরে এক টাকাও খরচ করার ক্ষমতা তাদের নাই।

​আর সবশেষে সেই মেগা প্রশ্ন— ব্ল্যাকরকের মালিক কে?

ব্ল্যাকরক একটা পাবলিক কোম্পানি। আর ব্ল্যাকরকের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার কে জানেন? ভ্যানগার্ড!

​তাহলে ভ্যানগার্ডের মালিক কে? ভ্যানগার্ডের মালিক তো বলছি, ভ্যানগার্ডে যারা টাকা রাখে তারাই ভ্যানগার্ডের মালিক! সুতা টানতে থাকলে শেষে কোনো গোপন পরিবার বা সিন্ডিকেট পাবেন না, পিরামিডের চূড়ায় বসে আছে সাধারণ স্কুল শিক্ষক, নার্স— এদের জমানো টাকা!

​তাহলে তো সব ঠিকই আছে? ওয়েট! দাঁড়ান! এবার পকেটে রাখা সেই আসল প্রশ্নটি বের করুন— বাসে যাত্রীরা বসে আছে, কিন্তু স্টিয়ারিং কার হাতে?

​এই বিষয়টি নিয়ে আসলে ভয়ে কাঁপতেছে খোদ অর্থনীতিবিদরাও! একটা কোম্পানির শেয়ার কিনলে শুধু লাভের ভাগ আসে না, আসে 'ভোটিং পাওয়ার'! কোনো একটি কোম্পানির বোর্ডে কে বসবে, সিইও-র বেতন কত হবে— সব ঠিক হয় শেয়ারহোল্ডারদের ভোটে।

​এখন হিসাবটা মেলান— শেয়ার কেনা হয়েছে আপনার-আমার টাকায়, কিন্তু মিটিংয়ে ভোট দিতে যায় কে? ফান্ড ম্যানেজার! মানে হলো, আমেরিকার প্রায় প্রতিটি বড় বড় কোম্পানির বোর্ডরুমে এখন নির্ণায়কের ভোটটি এই দুই কোম্পানির হাতে! টাকার মালিক কোটি কোটি মানুষ, কিন্তু ক্ষমতা আটকে আছে গুটি কয়েকের হাতে! ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি!

​এর প্রভাব কেমন? ল্যারি ফিঙ্ক প্রতিবছর সিইও-দের একটা চিঠি লেখেন, ওই এক চিঠির শব্দ ধরে ধরে হাজার হাজার কোম্পানি নিজেদের পলিসি পাল্টে ফেলে! কোনো আইন না, সরকার না— জাস্ট চিঠি!

​এখানেই তৈরি হয় আরও গভীর দুটি প্রশ্ন:

​প্রথম প্রশ্নটি হলো— কোক আর পেপসির সবচেয়ে বড় মালিক যদি একই হয়, তাহলে তারা নিজেদের মধ্যে গলাকাটাকাটি প্রতিযোগিতা করবে কেন? প্রতিযোগিতা কমলে দাম বাড়ে, আর সেই বাড়তি দাম দেয় কে? কাস্টমাররা! প্রমাণ এখনো তর্কসাপেক্ষ হলেও প্রশ্নটা ভয়ংকর রকমের ভ্যালিড!

​দুই নম্বর প্রশ্নটা আরও ভয়ংকর— ইনডেক্স ফান্ড তো চোখ বন্ধ করে সব কেনে, তাহলে ভালো-খারাপ শেয়ারের সঠিক দাম ঠিক করবে কে? সবাই যদি ইনডেক্সে চলে যায়, দাম ঠিক করার মতো তো কোনো লোকই বাজারে আর থাকবে না!

​সবচেয়ে অবাক করার সত্যটিকে বলছে জানেন? স্বয়ং জন বোগল! মরণের ঠিক আগে ইনডেক্স ফান্ডের এই জনক নিজেই লিখে গেছেন— এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমেরিকার সব কর্পোরেশনের ভোট গুটি কয়েক মানুষের হাতে চলে যাবে, যা দেশের জন্য ভয়ংকর!

​একবার ভাবুন, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের স্রষ্টা নিজেই নিজের সৃষ্টি নিয়ে সাবধান করে দিচ্ছেন!

​আর শেষ ভয়টির নাম হলো— 'আলাদিন'! পুরো দুনিয়া এই একটি সফটওয়্যারের চোখ দিয়েই রিস্ক মাপতেছে। যেদিন আলাদিনের এই চোখ কোনো বিপদ দেখতে ভুল করবে, পুরো দুনিয়া একসাথে খাদের গভীরে পড়বে! একটি সফটওয়্যারের ওপরে এত মানুষ ভরসা করতেছে! এক ঝুড়িতে এত ডিম আগে কখনো রাখা হয়নি!

​তো আজ এ পর্যন্তই! এই আর্টিকেলটি আপনি হয়তো বুঝবেনই না যদি আপনি শেয়ারবাজার কী, কীভাবে কাজ করে— সেটা না বোঝেন। এমন আর্টিকেল আরও পড়তে চাইলে আমাদের সাবস্ক্রাইব করবেন, আর আর্টিকেলটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন এমন কাউকে, যে ব্ল্যাকরকের ভিডিও দেখে বা তাদের সম্পর্কে জানতে চায় কিন্তু ইনডেক্স ফান্ড কী— সেটাই জানে না!

​ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন