একটা নাম যাকে কেউ দেবতা বলে এবং কেউ বলে শয়তান। "Baal/Bael". Baal শব্দটি ভাষা এবং প্রেক্ষাপটভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। হিব্রু ভাষা (Hebrew) হিব্রু ভাষায় Baal (בַּעַל) একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এর মূল অর্থ হলো: মালিক বা প্রভু,স্বামী, দেবতা ইত্যাদি ।
প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যে বা লোকগাঁথায় 'Baal' বা 'Bael' কে নরকের একজন শক্তিশালী সেনাপতি বা শয়তান হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং এশিয়া মাইনরের বিস্তৃত এলাকায় শহরসমূহের রক্ষক কে বাআল নামে সম্বোধন করা হত। বাআল উপাসকগণ বা যারা বাআলের পূজা করত তারা বাআলাইত নামে পরিচিত ছিলো।প্রায় ৩০০০ বছর আগে তাকে সম্মানের সাথে পূজা করত এই বাআলাইত।
আজকের দিনে স্পেশালিস্ট সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য এই নামটা শুনলে আমাদের মাথায় আসে ভয়ংকর একটি দৃশ্য। "Baal" "Bael"কি আসলেই এমন ছিল? কিছু পুরনো ইউরোপের বইয়ে বিশেষ করে "আর্স গোটিয়া" নামে বইয়ে ''Baal " কে দেখানো হয়েছে একজন দেবতা হিসেবে এবং তাকে বলা হয় দৈত্যদের রাজা।,বর্ণনা অনুযায়ী তার তিনটি মাথা। মানুষ, ব্যাঙ আর বিড়ালের। সে অদৃশ্য হতে পারতো এবং মানুষের উপর তার প্রভাব ফেলতে পারতো। এই বর্ণনাগুলো এতই ভয়ংকর যে মানুষ ধরে নিয়েছিল "Baal" আসলেই শয়তান।
ইতিহাস একটু পিছনে গেলে ইমেজটা পুরোপুরি বদলে যায়। প্রাচীন কেনান অঞ্চলে হাজার হাজার বছর আগে মানুষ "Baal" কে পূজা করত।কারণ সে ছিল বৃষ্টি দেবতা, ঝড়ের দেবতা এবং ফসল রক্ষকের দেবতা। ভাবেন একটা সময় যখন বৃষ্টি হতো না তখন ফসল বাচাতে তাকে পুজো করা হতো।তার সবচেয়ে পরিচিত রূপ বাআল হাদাদ।একজন শক্তিশালী দেবতা যিনি বজ্রপাত কন্ট্রোল করে,ঝড় তুলত আর মানুষকে রক্ষা করতো।
প্রশ্ন হলো একজন দেবতা যে সবাইকে রক্ষা করতো হঠাৎ করে শয়তান কিভাবে হয়ে গেল? এ পরিবর্তন আসে সময়ের সাথে নতুন ধর্ম আসে নতুন বিশ্বাস তৈরি করা হয়। বিশেষ করে হিব্রু বা বাইবেলে বাআল কে দেখানো হয় ভুল দেবতা হিসেবে।তার পুজো করা নিষিদ্ধ করা হয় এবং এখান থেকে তার ইমেজ বদলাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে মানুষের তাকে ভুল বলে থামেনি তাকে ভয় পেতে শুরু করেছে। বাআল' এর আসল গল্প এখানেই শেষ না। তার সবচেয়ে সেই ইন্টারেস্টিং অংশ তার যুদ্ধ, যা আসলে মৃত্যুর প্রতীক ।
এই যুদ্ধ ছিল জীবন বনাম মৃত্যু। যখন বাল জিততো ফসল হতো আর যখন মৃত্যৃর দেবতা "মত" জিততো বৃষ্টি হতো না এবং ফসল শুকিয়ে যেত।তাদের একটি বিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনি আছে যেখানে বাআল মৃত্যুর দেবতা 'মুত' (Mot)-এর সাথে লড়াই করেন।যখন বাআল হেরে যেতেন এবং পাতালে চলে যেতেন, তখন পৃথিবীতে খরা হতো।আবার যখন তিনি ফিরে আসতেন, তখন বৃষ্টি হতো এবং ফসলে মাঠ ভরে যেত।
এই চক্রটিই ছিল সে সময়কার মানুষের কাছে ঋতু পরিবর্তনের ব্যাখ্যা।পরবর্তীতে বাআল 'বিলজিবাফ' নামই শয়তানের অন্যতম প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক প্রাচীন সভ্যতায় বাআলকে সূর্যের প্রতীক মনে করা হতো। লেবাননের বিখ্যাত বালবেক (Baalbek) শহরটি আসলে বাআলের নামেই নামকরণ করা হয়েছিল। রোমানরা যখন এই শহর দখল করে, তারা সেখানে 'জুপিটার'-এর মন্দির তৈরি করে, যা আজও বিশ্বের অন্যতম বড় পাথুরে স্থাপত্য হিসেবে টিকে আছে।এই গল্পটা প্রকৃতির গল্প।
এখন আবারো প্রশ্ন আসে বাআল আসলে কি? যার আসলে একটাও উত্তর নেই। ইতিহাস বলে সে দেবতা, ধর্ম বলে সে ভুল পথ,আধুনিক গল্পে বলা হয় শয়তান। বর্তমানে সবচেয়ে ভাইরাল ঘটনা epstein files এর সাক্ষী Jefry Epstein তার ব্যাংক একাউন্ট খুলেছিল "Baal"নামে।বাআল পূজার কারণে ইহুদি রা সঠিক পথ হারিয়ে ছিল বলেও দারনা করা হয়।
বাআল কে কেন মাছিদের দেবতা বলা হয়?
প্রাচীনকাল থেকেই পচা মাংস বা নোংরা স্থানে মাছির আনাগোনা বেশি থাকত। মাছিকে ধরা হতো রোগ এবং অপবিত্রতার বাহক হিসেবে। তাই বাআলকে মাছির দেবতা বলে ইহুদিরা বোঝাতে চেয়েছিল যে, এই দেবতার পূজা করা মানে নোংরা বা অপবিত্র কিছুর উপাসনা করা।বাআলের মন্দিরে পশুবলি দেওয়া হতো। ধারণা করা হয়, মন্দিরে পশুর রক্ত ও মাংসের কারণে প্রচুর মাছির উপদ্রব হতো। এই দৃশ্য দেখে বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে বলত, "এ তো দেবতাদের রাজা নয়, এ হলো মাছির রাজা!" বলা হয়ে থাকে অনেক গর্ভবতী নারীদের পেট চীরে সন্তান ভূমিষ্ট করা হতো এবং সেই সন্তান কে বাআল দেবতার সামনে বলি দেওয়া হত।
আজও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে শিশু বলি দেওয়া হয়। বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ফ্যাশনে এটার পরিচিত তুলে দরা হয় যেমন :Balenciaga। যারা মানুষের মধ্যে বেহায়াপনা ও শয়তানী কর্মকান্ড ছরিয়ে দিচ্ছে।
নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) গিয়ে এই 'Beelzebub' নামটি সরাসরি শয়তান বা 'Prince of Demons'-এর একটি নাম হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাহিত্যে: জন মিল্টনের বিখ্যাত মহাকাব্য প্যারাডাইস লস্ট (Paradise Lost)-এ 'বিলজিবাফ'কে শয়তানের প্রধান সেনাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিছু লিপি থেকে জানা যায় প্রাচীন আরব দেবতা হাদাদকে বাআল নামে সম্বোধন করা হত। হাদাদ ছিলেন বজ্রপাত, উর্বরতা, কৃষি এবং স্বর্গের দেবতা। কিন্তু সেই সময়ে শুধু মাত্র ধর্মযাজকগণ তার পবিত্র নাম উচ্চারণের অনুমতি পেতেন। সেজন্য জনসাধারণ তাকে বাআল নামে সম্বোধন করত।
সেমেটিক ও প্রাচীন মেসোপটেমীয় ইতিহাস
Baal' শব্দটি মূলত একটি সেমেটিক শব্দ, যার মূল অর্থ ছিল 'প্রভু', 'মালিক' বা 'স্বামী'দেবতা ইত্যাদি ।
কানানীয় সভ্যতা: প্রাচীন সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে (Canaanite) 'বাল' ছিলেন ঝড়, বৃষ্টি এবং উর্বরতার প্রধান দেবতা। কৃষিপ্রধান ওই সমাজে বৃষ্টির জন্য বালের পূজা করা হতো।
কার্থেজ ও ফোনীশীয়রা: উত্তর আফ্রিকায় এই দেবতার প্রভাব এতটাই ছিল যে, বিখ্যাত সেনাপতি হানিবাল (Hannibal)-এর নামের অর্থ ছিল "বালের অনুগ্রহপ্রাপ্ত"।
বাইবেলীয় প্রেক্ষাপট: হিব্রু বাইবেলে ইসরায়েলিদের সাথে বাল পূজারীদের দ্বন্দ্বের অনেক বর্ণনা আছে। সেখানে 'বাল' শব্দটি মূলত "মিথ্যা উপাস্য" বা পৌত্তলিকতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
কুরআনের উল্লেখ: পবিত্র কুরআনের সূরা আস-সাফফাত (আয়াত ১২৫)-এ ইলিয়াস (আঃ)-এর গোত্রের কথা বলা হয়েছে, যারা 'বাল' নামক মূর্তির পূজা করত। সেখানে বলা হয়েছে: "তোমরা কি 'বাল'-এর পূজা করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে ত্যাগ করবে?"
ইংরেজি শব্দ 'Beelzebub' (নরকের দেবতা বা শয়তান) আসলে 'Baal-Zebub' থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ছিল "মাছিদের প্রভু"। প্রাচীনকালে হিব্রু জাতিরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অন্য ধর্মের দেবতা 'বাল'কে এই নামে ডাকত।
"হাজারো মূর্তির মধ্যে কোরআন কেন শুধু এক দেবতার নাম নিল?
কে এই বাল? কেন তার নাম ইতিহাসের অন্ধকার থেকে আজও এত আলোচনায়? আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করলেন, তখন কাবার ভেতরেই কিন্তু ৩৬০টা মূর্তি ছিল। সে সময় আরবে অনেক বড় বড় আর নামকরা সব মূর্তির পূজা হতো। কিন্তু অবাক করার বিষয় কি জানেন? কোরআনে যখন শিরকের কথা বলা হলো, তখন চোখের সামনের এত পরিচিত মূর্তিদের নাম আল্লাহ নির্দিষ্ট করে নিলেন না। বরং হাজার মাইল দূরের আর হাজার বছর আগের একদম অচেনা একটা দেবতার কথা তুলে ধরলেন।
কারণটা শুনলে আপনি অবাক হবেন। এই বাল কোনো সাধারণ পাথরের মূর্তি ছিল না। এটা ছিল মানুষের রিজিক নিয়ে শয়তানের পাতা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর একটি ফাঁদ। একটু বৃষ্টির আশায়, একটু ভালো ফসলের আশায় এই মূর্তির সামনে মানুষ এমন এক জঘন্য কাজ করতো যা শুনলে যেকোনো মানুষের বুক কেঁপে উঠবে। তারা নিজেদেরই ফুটফুটে জীবন্ত সন্তানদের তুলে দিত জ্বলন্ত আগুনের মুখে। আজ আমরা জানবো ইতিহাসের সেই চাপা পড়া ভয়ংকর সত্যটা, যা আজও অনেকেই জানে না।
পবিত্র কোরআনের সূরা আস-সাফফাতের ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘তোমরা কি বালের আরাধনা করো আর শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাকে বর্জন করো?’ কোরআনের প্রতিটি আয়াতের পেছনে লুকিয়ে থাকে বিশাল এক ইতিহাস। আরবরা মূর্তি পূজা করতো ঠিকই, কিন্তু তারা মূর্তিদের মানতো আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসাবে। তারা ভাবতো এই মূর্তিগুলো আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। কিন্তু এই বাল দেবতার বিষয়টা ছিল একদম আলাদা। মানুষ মনে করতো আল্লাহ নয়, বরং এই বালি সরাসরি তাদের বাঁচিয়ে রাখে, তাদের খাবার দেয়, জমিনে বৃষ্টি দেয়। শয়তান যখন মানুষের রিজিকে বা খাবারে হানা দেয়, মানুষ তখন সবচেয়ে বেশি ভয় পায় আর বিভ্রান্ত হয়। আর ঠিক এই কারণেই আল্লাহ তাআলা সরাসরি এই মিথ্যা প্রভুর নাম ধরে মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
এই পুরো রহস্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বছর আগে। অঞ্চলটার নাম ছিল প্রাচীন কানান বা শাম অঞ্চল, যা আজকের সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন। সেই সময়ের মানুষ ছিল পুরোপুরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাদের বেঁচে থাকা, খাবার, গবাদি পশুর জীবন—সবকিছুই নির্ভর করতো আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টির উপর। বৃষ্টি হলে ফসল হবে, মানুষ বাঁচবে; আর বৃষ্টি না হলে নেমে আসবে চরম খরা আর দুর্ভিক্ষ। মানুষের মনের এই যে দুর্বলতা, না খেয়ে মারা যাওয়ার এই যে ভয়, ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করলো ইবলিশ শয়তান। সে মানুষের মনে ধীরে ধীরে একটা ধারণা ঢুকিয়ে দিল যে, আকাশের মেঘের আড়ালে এমন কোনো এক মহাশক্তি লুকিয়ে আছে যে এই বৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এভাবেই জন্ম নিল প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালী মিথ—বাল দেবতা।
প্রাচীন সেমেটিক ভাষায় ‘বাল’ শব্দের অর্থ হলো ‘মালিক’ বা ‘প্রভু’। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করলো যে বাল হলো আকাশের দেবতা। তাকে তারা উপাধি দিল ‘মেঘের আরোহী’। তাদের ধারণা ছিল আকাশে যখন মেঘ ডাকে, এটা আসলে বালের গর্জনের আওয়াজ। বাল যখন খুশি হয়, তখনই জমিনে বৃষ্টি নামে। মানুষ তাদের নিজেদের হাতে বালের এক বিশাল মূর্তি তৈরি করলো। মূর্তিটির মাথায় ছিল ষাঁড়ের শিং, যা অসীম ক্ষমতার প্রতীক। মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিজেদের হাতে বানানো পাথরের কাছে বৃষ্টি চাইতে শুরু করলো।
কিন্তু বাল পূজা শুধু ফুল আর ফল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শয়তান মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে, বাল পূজা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যখনই রাজ্যে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যেত, খরা দেখা দিত, তখন বালের পুরোহিতরা এক ভয়ংকর ঘোষণা দিত। তারা বলতো, ‘বাল দেবতা রেগে আছেন, তাকে শান্ত করতে হবে, আর তিনি সবচেয়ে প্রিয় বস্তুর রক্ত চান।’ আপনারা শুনলে শিউরে উঠবেন। সেই অন্ধকারের যুগে মানুষ তাদের নিজেদের হাসি-খুশি, নিষ্পাপ সন্তানদের জীবন্ত তুলে দিত বালের মূর্তির সামনে। বিশাল এক তামার মূর্তির ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বালানো হতো। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় তারা তাদের আদরের সন্তানদের নিক্ষেপ করতো। যখন আগুনের তাপে শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতো, তখন চারদিকে বিকট শব্দে ড্রাম আর শিঙা বাজানো হতো, যাতে শিশুদের সেই কান্নার আওয়াজ তাদের বাবা-মায়ের কানে না পৌঁছায়। একবার ভাবতে পারেন? মানুষ কেবল একটু বৃষ্টির আশায়, একটু ভালো ফসলের আশায় নিজেদের চোখের সামনে নিজেদের সন্তানদের পুড়িয়ে মারতো? শয়তান তাদের চোখে এই পৈশাচিক কাজটিকে পুণ্য বা পবিত্র কাজ হিসেবে সাজিয়ে দিয়েছিল।
এই জঘন্য বাল পূজার ব্যাধি শুধু কেনাইনদের মাঝেই আটকে থাকেনি। এটি এক সময় প্রবেশ করলো বনি ইসরাইলের মাঝেও। সময়টা ছিল রাজা আহাবের রাজত্বকাল। আহাব বিয়ে করেছিল ইজেবেল নামের এক বিদেশী রাজকন্যাকে। রানী ইজেবেল ছিল এই বাল পূজার ভীষণ কট্টর সমর্থক। রানী ইজেবেলের প্রভাবে পুরো ইসরাইলে বালের শত শত মন্দির গড়ে উঠলো। বালের সেবার জন্য নিয়োগ করা হলো হাজার হাজার পুরোহিত। যারা এক আল্লাহর ইবাদত করতো, তাদের খুঁজে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। আল্লাহর ঘরগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। পুরো একটা জাতিই এক আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়ে বালের পায়ে মাথা নত করলো।
ঠিক এমন এক দম বন্ধ করা পরিবেশে, যেখানে সত্য কথা বলার অর্থই হলো মৃত্যুদণ্ড, সেখানে আল্লাহর হুকুমে এসে দাঁড়ালেন এক মহান নবী—হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম। তিনি সোজা রাজপ্রাসাদে গিয়ে সেই পথভ্রষ্ট রাজা এবং সমাজের সামনে দাঁড়ালেন। তার হাতে কোনো সৈন্য বা অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল সত্যের আলো। তিনি তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে এমন একটি কথা বললেন, যা পবিত্র কোরআনের সূরা আস-সাফফাতে চিরকালের জন্য রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করো না? তোমরা কি বালকে ডাকো আর পরিত্যাগ করো শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাকে? যিনি আল্লাহ, তোমাদের রব এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও রব।’
হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম খুব সহজভাবে তাদের বিবেকে আঘাত করলেন। তিনি বোঝাতে চাইলেন, তোমরা এমন একজনকে বৃষ্টির মালিক ভাবছো যে নিজেই একটা পাথর, যে নিজে নড়তেও পারে না। আর যিনি আসমান-জমিন বানিয়েছেন, যিনি তোমাদের রিজিকদাতা, সেই আল্লাহকে তোমরা ভুলে গেছো? কিন্তু ইলিয়াস আলাইহিস সালামের এই যৌক্তিক কথাগুলো শুনে সেই সমাজ উল্টো হাসাহাসি করলো। রানী ইজেবেল নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো। তারা অহংকার করে বলল, বালই আমাদের দেবতা, সেই সবকিছুর মালিক, তোমার কথা আমরা কেন শুনবো?
তখন ইলিয়াস আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে এক ভয়ংকর ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, আমার রবের কসম, আমার মুখের কথা ছাড়া আগামী কয়েক বছর এই জমিনে এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়বে না, এমনকি শিশিরও পড়বে না। তোমাদের বাল দেবতা যদি সত্য হয়, তবে তাকে বলো বৃষ্টি নামাতে।
শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম এক ভয়াবহ এক খরা। টানা সাড়ে তিন বছর আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরতে লাগলো, কিন্তু এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লো না। মাঠের ফসল পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যে বালকে তারা বৃষ্টির দেবতা মনে করতো, সেই বাল তাদের এক ফোঁটা পানিও আকাশ থেকে নামাতে পারলো না। টানা সাড়ে তিন বছর আকাশে মেঘের একটা ছোট্ট টুকরোও নেই। যে জমিন এক সময় আঙুর আর জলপাইয়ের বাগানে ভরপুর ছিল, তা এখন আক্ষরিক অর্থেই একটা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একবার ভেবে দেখুন তো অবস্থাটা? বালকে তারা মানতো বৃষ্টির দেবতা হিসাবে, রানীর নির্দেশে পুরো রাজ্যে বালের নামে শত শত মন্দির গড়ে উঠেছিল, দিন-রাত সেখানে পূজা চলছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে তাদের সেই মেঘের আরোহী বাল দেবতা এক ফোঁটা পানিও আকাশ থেকে নামাতে পারলো না। মাঠের ফসল তো দূরের কথা, মানুষের খাওয়ার পানিটুকুও শেষ হয়ে গেল।
রাজা আহাব আর তার পাপিষ্ঠ স্ত্রী রানী ইজেবেল রাগে অন্ধ হয়ে গেল। তারা পুরো দেশ তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে। তাদের ধারণা ছিল এই ইলিয়াসের অভিশাপেই তাদের দেবতার এই অপমান হচ্ছে, রাজ্যে এই খরা নেমেছে। কিন্তু আল্লাহ তার নবীকে খুব নিরাপদে লুকিয়ে রেখেছিলেন। যখন খরার চরম পর্যায়, মানুষ আর পশুপাখি যখন তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে, তখন আল্লাহর হুকুম এলো। আল্লাহ ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে বললেন, যাও, এবার রাজা আহাবের সামনে গিয়ে দাঁড়াও। আমি এই জমিনে আবার বৃষ্টি দেবো।
ইলিয়াস আলাইহিস সালাম ফিরে এলেন রাজার সামনে। বুক টান করে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি আর তোমার পরিবার এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বালের পূজা করে পুরো জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছো। আজ ফয়সালা হবে। পুরো ইসরাইলবাসীকে আর বালের ৪৫০ জন পুরোহিতকে মাউন্ট কারমেল পাহাড়ের চূড়ায় জড়ো করো। আজ প্রমাণ হয়ে যাবে কার ঈশ্বর সত্য।
মাউন্ট কারমেল পাহাড়টা এমনিতেই ঐতিহাসিক। তখনকার ক্যানানাইটরা বিশ্বাস করতো এই পাহাড়টা নাকি খোদ বাল দেবতার নিজের জায়গা। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম ইচ্ছে করেই এই পাহাড়টাকে বেছে নিয়েছিলেন, যেন বালের নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েই বালের অহংকার চিরতরে ভেঙে দেওয়া যায়।
সেদিন পাহাড়ের চূড়ায় এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হলো। একদিকে রাজার পাহারায় বালের ৪৫০ জন অহংকারী পুরোহিত, তাদের পরনে রাজকীয় পোশাক। আর তাদের পেছনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যারা এতদিন বালের পূজা করে এসেছে। আর অন্যদিকে একদম একা দাঁড়িয়ে আছেন আল্লাহর এক মহান নবী হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম। তার সাথে কোনো সৈন্য নেই, কোনো পুরোহিত নেই, কেউ নেই; শুধু তার বুকে আছে আসমান ও জমিনের মালিক মহান আল্লাহর উপর পাহাড়সম বিশ্বাস।
ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সেই হাজার হাজার পথভ্রষ্ট মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার গলার আওয়াজ পাহাড়ের চারদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। তিনি বললেন, আর কতদিন তোমরা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলবে? আর কতদিন তোমরা সত্য আর মিথ্যার মাঝে বিভ্রান্ত হয়ে থাকবে? আল্লাহ যদি সত্য ঈশ্বর হন তবে তার ইবাদত করো, আর যদি বাল সত্য হয় তবে তার পিছে ছোটো। কিন্তু আজকের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে।
জনতা একদম চুপ। কেউ ‘টু’ শব্দটি ও করলো না। তখন ইলিয়াস আলাইহিস সালাম চ্যালেঞ্জের নিয়ম বলে দিলেন। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর নবী এখানে একা, আর বালের পুরোহিতরা আছে ৪৫০ জন। আমাদের দুই পক্ষকে দুটো ষাঁড় দেওয়া হোক। আমরা ষাঁড় জবাই করে কাঠের উপর রাখবো, কিন্তু কেউ কোনো আগুন জ্বালাতে পারবো না। আমরা আমাদের বালকে ডাকবো আর আমি আমার আল্লাহকে ডাকবো। যে ঈশ্বর আসমান থেকে আগুন পাঠিয়ে এই কুরবানি কবুল করবেন, তিনিই হবেন সত্য ঈশ্বর।
পুরো জনতা এক বাক্যে বলে উঠলো, হ্যাঁ, এটা একদম ন্যায্য কথা। এটাই হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা।
যেহেতু পুরোহিতরা সংখ্যায় বেশি ছিল, ইলিয়াস আলাইহিস সালাম তাদেরকেই আগে সুযোগ দিলেন। বালের পুরোহিতরা তাদের বেদীতে ষাঁড় জবাই করে রাখলো। এরপর শুরু হলো তাদের প্রার্থনা। সকাল থেকে তারা বালের মূর্তির সামনে চিৎকার করতে লাগলো, ‘হে বাল আমাদের উত্তর দাও, হে বাল আসমান থেকে আগুন পাঠাও।’ তারা বেদীর চারপাশে পাগলের মতো নাচতে লাগলো, কিন্তু কোনো উত্তর নেই, আকাশ থেকে একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গও পড়লো না। দুপুর গড়িয়ে গেল। এবার ইলিয়াস আলাইহিস সালাম এদের একটু উপহাস করতে শুরু করলেন। এটা কোনো সাধারণ উপহাস ছিল না, এটা ছিল মিথ্যার অহংকার ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত রূপ। তিনি বললেন, আরেকটু জোরে ডাকো, তোমাদের দেবতা কি ঘুমাচ্ছে? নাকি সে কোথাও সফরে গেছে? নাকি সে গভীর চিন্তায় মগ্ন? জোরে ডাকো, যেন তার ঘুম ভেঙে যায়।
এই কথা শুনে পুরোহিতরা মরিয়া হয়ে উঠলো। বালের পূজার একটা জঘন্য নিয়ম ছিল, তারা যখন খুব মরিয়া হতো, তখন নিজেদের শরীর তলোয়ার আর বল্লম দিয়ে কেটে রক্ত বের করতো। তারা সেদিন পাহাড়ের চূড়ায় নিজেদের শরীর কাটতে লাগলো। রক্তে ভেসে গেল বালের বেদী। তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা চিৎকার করলো। কিন্তু পিনপতন নীরবতা, কোনো শব্দ নেই, কোনো আগুন নেই, কোনো উত্তর নেই। যে বালকে তারা সর্বশক্তিমান ভাবতো, সেই বাল একটা শুকনো কাঠেও আগুন ধরাতে পারলো না। মিথ্যার আসল রূপ হাজার হাজার মানুষের সামনে নগ্ন হয়ে পড়লো।
এবার এলো আল্লাহর নবীর পালা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সবাইকে বললেন, এবার তোমরা আমার কাছে এসো। বনি ইসরাইলের ১২টি গোত্রের প্রতীক হিসাবে তিনি ১২টি বড় পাথর দিয়ে আল্লাহর নামে কুরবানির স্থানটি নতুন করে তৈরি করলেন। কাঠের উপর কুরবানির মাংস রাখলেন। এরপর তিনি এমন একটা কাজ করলেন, যা দেখে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেল। তিনি বললেন, বেদীর চারদিকে একটা বড় গর্ত খোঁড়ো আর চারটে বড় কলসি ভরে পানি নিয়ে এসো। সাড়ে তিন বছরের খরায় যেখানে খাবার পানি নেই, সেখানে অনেক কষ্ট করে সমুদ্র বা গভীর কূপ থেকে পানি আনা হলো। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বললেন, এই পানি কাঠের উপর আর মাংসের উপর ঢেলে দাও। তারা পানি ঢাললো। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বললেন, দ্বিতীয়বার ঢালো। তারা আবার ঢাললো। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বললেন, তৃতীয়বার ঢালো। এত পরিমাণ পানি ঢালা হলো যে পুরো বেদী, কাঠ, মাংস পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। এমনকি চারপাশের গর্তটাও পানিতে ভরে গেল।
একবার ভাবুন তো লজিকটা কি? ইলিয়াস আলাইহিস সালাম কেন এটা করলেন? কারণ শয়তানের অনুসারীরা সবসময় চালাকি খোঁজে। কেউ যেন বলতে না পারে যে কাঠের ভেতর আগে থেকেই কোনো স্ফুলিঙ্গ বা আগুন লুকানো ছিল, সেটা প্রমাণ করার জন্যই তিনি সবকিছু ভিজিয়ে দিলেন। ভেজা কাঠে তো পৃথিবীর কোনো স্বাভাবিক আগুনও জ্বলতে পারে না, আসমানী আগুন তো দূরের কথা।
সবকিছু প্রস্তুত। চারদিকে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বালের পুরোহিতদের মতো কোনো নাচানাচি করলেন না, চিৎকার করলেন না। তিনি খুব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আসমান ও জমিনের মালিকের কাছে হাত তুললেন। তার সেই ঐতিহাসিক দোয়াটি বাইবেল এবং ইতিহাসের পাতায় আজও লেখা আছে। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, ইব্রাহিম, ইসহাক আর ইয়াকুবের রব, আজ এই হাজারো মানুষের সামনে প্রমাণ করে দিন যে আপনিই একমাত্র সত্য ঈশ্বর, আর আমি যে আপনার আদেশে এই সবকিছু করেছি সেটাও প্রমাণ করে দিন। হে আমার রব, আমাকে উত্তর দিন, এই পথভ্রষ্ট জাতিকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি তাদের অন্তরকে আবার সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন।
তার এই ছোট্ট, শান্ত কিন্তু পাহাড়সম বিশ্বাসের দোয়া শেষ হতে না হতেই আসমান থেকে ধেয়ে এলো এক প্রচণ্ড আগুনের শিখা। এটা কোনো সাধারণ আগুন ছিল না। চোখের পলকে সেই আগুন নেমে এসে বেদীর উপরের মাংস, কাঠ, পাথর, মাটি সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিল। এমনকি বেদীর চারপাশের গর্তে যে পানি জমেছিল, সেই পানি পর্যন্ত মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। কোনো কিছুরই আর অস্তিত্ব রইলো না।
এই অভাবনীয়, অকল্পনীয় দৃশ্য দেখে সেই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ থরথর করে কাঁপতে লাগলো। যে বাল সারাদিন একটা স্ফুলিঙ্গও দিতে পারলো না, সেখানে আল্লাহর এক মুহূর্তের আগুনে পাথর পর্যন্ত ছাই হয়ে গেল। হাজার হাজার মানুষ যারা একটু আগে পর্যন্ত বালের নামে চিৎকার করছিল, তারা এখন ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে এক আল্লাহর সেজদায় কাঁদতে লাগলো। তারা সমস্বরে বলতে লাগলো, আল্লাহই একমাত্র সত্য ঈশ্বর, আল্লাহই আমাদের রব।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শয়তান যে মিথ্যা মূর্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানিয়ে রেখেছিল, হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামের এক দোয়ায় সেই বাল দেবতার সমস্ত অহংকার, সমস্ত মিথ্যার প্রাসাদ বালুর মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। বালের সেই ৪৫০ জন ভন্ড পুরোহিত, যারা দিনের পর দিন মানুষকে ধোকা দিয়ে আসছিল, তাদের সবাইকে সেদিন চরম শাস্তি দেওয়া হলো। সত্যের আলোয় মিথ্যা চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
কিন্তু একটা বড় কাজ এখনো বাকি। সাড়ে তিন বছর ধরে আকাশ থেকে এক ফোঁটা পানি পড়েনি। মাটি ফেটে চৌচির, মানুষ আর পশুপাখি তৃষ্ণায় ভুগছে। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন জাতি যখন শিরক থেকে ফিরে এসে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তখন আল্লাহও তার রহমতের দরজা খুলে দেবেন। তিনি পাহাড়ের আরও উঁচুতে উঠলেন। মাটিতে মাথা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর কাছে সেই প্রার্থনায় বসলেন, যে প্রার্থনার জন্য পুরো জাতি সাড়ে তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছিল। তিনি তার এক সেবককে বললেন, যাও, সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখো কিছু দেখা যায় কিনা। সেবক একবার গেল, ফিরে এসে বলল, না, আকাশ একদম পরিষ্কার। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বললেন, আবার যাও। এভাবে সে সাত বার গেল। সপ্তমবার ফিরে এসে সেবক অবাক হয়ে বলল, আমি সাগরের উপর মানুষের হাতের তালুর সমান ছোট্ট একটা মেঘ দেখতে পাচ্ছি।
ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সাথে সাথে রাজা আহাবকে খবর পাঠালেন, তাড়াতাড়ি তোমার রথ প্রস্তুত করো এবং পাহাড় থেকে নিচে নেমে যাও, নইলে প্রচণ্ড বৃষ্টি তোমাকে আটকে ফেলবে। দেখতে দেখতে সেই ছোট মেঘের টুকরোটা পুরো আকাশ কালো করে ফেললো। প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করলো, আর তারপরই সাড়ে তিন বছরের সেই ভয়াবহ খরার অবসান ঘটিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। যে বাল দেবতা সাড়ে তিন বছরে এক ফোঁটা পানি দিতে পারেনি, আল্লাহ তাআলা এক মুহূর্তের মধ্যে আসমান থেকে রহমতের অজোর ধারা বইয়ে দিলেন। জমিন আবার বেঁচে উঠলো।
কিন্তু রাজা আহাব যখন প্রাসাদে ফিরে রানী ইজেবেলকে সব ঘটনা খুলে বলল—কিভাবে আগুন নেমেছে, কিভাবে বালের পুরোহিতদের হত্যা করা হয়েছে, তখন রানী রাগে অন্ধ হয়ে গেল। সে সত্যকে মেনে নেওয়ার বদলে অহংকারে ফেটে পড়লো। সে শপথ করলো আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সে ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে হত্যা করবে। ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন এই পাপিষ্ঠা রানী আল্লাহকে ভয় পায় না। তিনি তখন আল্লাহর হুকুমে সেই জায়গা ত্যাগ করে মরুভূমির দিকে চলে যান এবং পরে অন্য আরেকজন নবী হযরত আল-ইয়াসা আলাইহিস সালামকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন। আর সেই অহংকারী রানী ইজেবেল এবং রাজা আহাবের পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত করুণ ও ভয়াবহ, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এক অভিশাপ হিসেবে লেখা আছে।
ইতিহাসের এই গল্পটা হয়তো আজ থেকে ৩০০০ বছর আগের, কিন্তু একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো, এই গল্পটা কি আসলেই পুরনো হয়ে গেছে? আমরা হয়তো ভাবি আমরা তো আর বালের মতো কোনো মূর্তির সামনে মাথা নত করি না, আমরা তো আর আমাদের সন্তানদের আগুনে ফেলে দিই না। কিন্তু পবিত্র কোরআন কেন এই বাল দেবতার কথা আমাদের শোনাল? কোরআনের তো কোনো কথাই অর্থহীন নয়। কোরআন আমাদের বোঝাতে চেয়েছে ‘বাল’ মানে শুধু একটা পাথরের মূর্তি নয়; বাল হলো এমন যেকোনো কিছু যার উপর মানুষ আল্লাহর চেয়ে বেশি নির্ভর করে। আজকের দুনিয়ায় আমাদের বাল দেবতা কারা জানেন? আমাদের চাকরি, আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স, আমাদের ক্ষমতা, আমাদের ডিগ্রির অহংকার। আমরা কি আজ একটু বেশি টাকা কামানোর জন্য, একটু প্রমোশনের জন্য, একটু দুনিয়াবী সফলতার জন্য আল্লাহর হুকুমগুলোকে হাসিমুখে কুরবানি দিচ্ছি না? আমরা ভাবছি আমার এই চাকরিটা না থাকলে হয়তো আমি না খেয়ে মারা যাবো, আমার এই ঘুষের টাকাটা না আসলে হয়তো আমার সংসার চলবে না। আহ! আমরাও তো সেই প্রাচীন ক্যানানাইটদের মতোই রিজিকের ভয়ে আল্লাহর উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছি। তারা যেমন একটু বৃষ্টির আশায় নিজেদের নিষ্পাপ সন্তানদের আগুনে ফেলে দিত, আজও তো আমরা ক্যারিয়ারের দৌড়ে অন্ধ হয়ে হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে আমাদের নিজেদের সন্তানদের হারাম খাওয়াচ্ছি। আমরা কি আমাদের সন্তানদের আখেরাতকে নিজেদের হাতেই জাহান্নামের আগুনে ফেলে দিচ্ছি না?
হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সেই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যে কথাটি বলেছিলেন, আজকে সেই কথাটি যেন আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আর কতদিন তোমরা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলবে?’ আর কতদিন আমরা মুখে বলবো আল্লাহ রিজিকদাতা, কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস করবো যে বস খুশি না হলে আমার চাকরি চলে যাবে? আর কতদিন আমরা আসমান ও জমিনের মালিককে ভুলে গিয়ে এই দুনিয়ার মায়াবী মূর্তির পেছনে ছুটে বেড়াবো? আসুন না আমরা সবাই মিলে একবার আমাদের অন্তরের দিকে তাকাই। আমাদের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত বাল দেবতাকে, সমস্ত মিথ্যা অহংকারকে মাউন্ট কারমেলের সেই আগুনের মতো ছাই করে দিই। ফিরে আসি সেই মহান রবের দিকে যিনি সাড়ে তিন বছরের খরার জমিনেও এক মুহূর্তে রহমতের বৃষ্টি নামাতে পারেন, যিনি আমাদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
ইয়া আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে তুমি শিরকের সমস্ত অন্ধকার থেকে পবিত্র করো। আমাদের ঈমানকে তুমি কারমেল পাহাড়ের সেই চূড়ার মতো মজবুত করে দাও। আমিন।"

