গাজীপুরের যান্ত্রিক ঈদ
শহর মানেই তো ইট-কাঠের খাঁচা, তাই না? গত কয়েক বছর ধরে আমি গাজীপুরের এই শিল্পনগরীতে আছি। গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করার সুবাদে জীবনের অনেকটা সময় এখন মেশিন আর কাপড়ের ভাঁজেই কাটে। কিন্তু ঈদ এলে মনটা কেমন জানি হু হু করে ওঠে। আজ কথা বলব গাজীপুরের ঈদ নিয়ে।
সকালবেলা যখন সূর্যের আলো গাজীপুরের উঁচু উঁচু দালানের ফাঁক দিয়ে আমার জানলায় এসে পড়ে, তখন প্রথম যে অনুভূতিটা হয় তা হলো—শান্তি। যে শহর সারাবছর ট্রাফিক জ্যাম আর হর্নের শব্দে কান ঝালাপালা করে দেয়, ঈদের সকালে সেই শহরটা যেন একদম অচেনা হয়ে যায়। চৌরাস্তা থেকে শুরু করে বোর্ডবাজার পর্যন্ত রাস্তাগুলো একদম ফাঁকা!। এটা আমার কাছে একটা বিরল দৃশ্য। মনে হয় যেন আলাদিনের চেরাগ ঘষে কেউ সব গাড়ি আর জটলা ভ্যানিশ করে দিয়েছে।
গাজীপুরে আমার সাথে থাকে আমার দুই রুমমেট—আবির আর সজীব মোল্লা। আমাদের ব্যাচেলর লাইফে ঈদের সকালটা শুরু হয় এক অদ্ভুত হুলস্থুল দিয়ে। গ্রামের মতো এখানে মা নেই যে ভোরে ডেকে পায়েস মুখে তুলে দেবে। এখানে নিজেই বাবুর্চি, নিজেই মেহমান।
আমরা তিনজন মিলে যখন সেমাই রান্না করতে যাই, তখন লবণের বদলে চিনি নাকি চিনির বদলে লবণ দেব—তা নিয়ে এক মহাযুদ্ধ লেগে যায়। তবে শহরের ঈদের একটা ইন্টারেস্টিং দিক হলো 'কমিউনিটি ইদগাহ'। আমরা যখন ইস্তিরি করা নতুন পাঞ্জাবি পরে গাজীপুরের ইদগাহ মাঠে যাই, তখন চারপাশের মানুষের মাঝে এক ধরনের কৃত্রিম কিন্তু রঙিন আভিজাত্য দেখা যায়। সবাই পরিপাটি, সুগন্ধিতে ম ম করছে চারপাশ। নামাজ শেষে কোলাকুলি করার সময় যদিও মানুষগুলো অচেনা, তবুও এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় আমরা সবাই যেন একই সুতোয় গাঁথা।
নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার সময় যখন দেখি রাস্তার পাশের দোকানগুলো বন্ধ, তখন একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। গাজীপুরের এই যান্ত্রিক জীবনে ঈদ মানে হলো অনেকটা নিজের খোলসে বন্দি থাকা। সজীব আর আবিরের সাথে বসে যখন আমরা বিরিয়ানি খাই, তখন আমাদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে আমাদের শেকড়।
সজীব বলে ওঠে, "জাহিদ ভাই, এই সময় আমাদের গ্রামে এখন হয়তো কোলাকুলির ধুম পড়ে গেছে!" আমার চোখে তখন ভেসে ওঠে আমার প্রিয় গ্রাম তামাই। মনে পড়ে যায় সিরাজগঞ্জের সেই বেলকুচি উপজেলার কথা। শহরের এই এসি রুমের ঠান্ডা বাতাস কেন জানি গ্রামের সেই বটতলার দখিনা বাতাসের কাছে হার মেনে যায়। শহরের ঈদে প্রচুর আভিজাত্য আছে, দামী দামী রেস্টুরেন্ট আছে যেগুলো ঈদের দিন উপচে পড়া ভিড় থাকে কিন্তু সেই প্রাণের স্পন্দন কোথায়? গাজীপুরের রাজবাড়ি বা ভাওয়াল রাজবাড়িতে ঘুরতে যাওয়াটা আনন্দের ঠিকই, কিন্তু সেখানেও যেন একটা ফরমালিটি কাজ করে। মনে একটা গভীর তৃষ্ণা জেগে থাকে—কখন ফিরব আমার সেই মাটির গন্ধে ভরা গ্রামে।
শহরের ঈদ মানে হয়তো একটু বেশি ঘুম, একটু বেশি নেটফ্লিক্স দেখা কিংবা বন্ধুদের সাথে কোনো কফিশপে আড্ডা দেওয়া। এটি আরামদায়ক, কিন্তু এটি কি আত্মার শান্তি দেয়?
আমার কাছে গাজীপুরের ঈদটা হলো 'বিশ্রাম', আর তামাইয়ের ঈদ হলো 'উৎসব'। যারা আমার মতো কর্মব্যস্ত জীবনে শহরের এই ইট-পাথরের মাঝে ঈদ কাটান, তারা হয়তো আমার এই কথাগুলোর সাথে একাত্ম হতে পারবেন।
তামাই গ্রামের প্রাণের ঈদ
গাজীপুরের সেই যান্ত্রিক ইটের দেয়াল আর ধোঁয়াটে আকাশকে পেছনে ফেলে এবার চলুন ফিরি আমার নাড়ির টানে। যেখানে ঈদের চাঁদ দেখা মানেই এক পশলা আনন্দ আর মেঠো পথের ধুলোয় মিশে থাকা একরাশ আবেগ। আমি জাহিদ, আজ আপনাদের নিয়ে যাব আমার প্রিয় গ্রাম তামাই-এ।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার এই ছোট্ট গ্রামটি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।
শহরে ঈদের দিন যখন আমরা রাজবাড়িতে ঘুরতে যাই বা কোনো শপিং মলে আড্ডা দেই, তখন মনের ভেতর একটা হু হু করা শূন্যতা কাজ করে। মনে হয়, এই চকমকে আলোর নিচে আমার শৈশবটা হারিয়ে গেছে। যেখানে মা নেই, বাবার হাতের দোয়া নেই, কিংবা ছোটবেলার সেই বন্ধুদের সাথে মেঠো পথে দৌড়াদৌড়ি নেই—সেটা কি আদেও ঈদ? শহরের ঈদ যেন অনেকটা প্যাকেজ করা খাবারের মতো; পেট ভরে, কিন্তু মন ভরে না।
কিন্তু যখন আমি তামাই গ্রামে পা রাখি, দৃশ্যপট বদলে যায়। ঈদের আগের রাত থেকেই শুরু হয় উত্তেজনা।
সকালবেলা যখন ঘুম ভাঙে কোনো অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং মায়ের হাতের সেমাইয়ের ঘ্রাণ আর উঠোনে ছোটদের কিচিরমিচির শব্দে চোখ খোলে। আমার তিন কাজিন—আমি, মোহাম্মদ আলী আর সিয়াম—সকাল সকাল চলে আসে। পাঞ্জাবি পরে আমরা যখন তামাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই বিশাল ইদগাহ মাঠের দিকে রওনা দেই, তখন মনে হয় আমি আবার সেই ছোট জাহিদ হয়ে গেছি।
মাঠের সেই ঘাসের গন্ধ, পরিচিত মুরব্বিদের স্নেহের ডাক আর কোলাকুলির সেই অকৃত্রিম উষ্ণতা—গাজীপুরের কোনো ফাইভ স্টার হোটেলও কি তা দিতে পারবেনা। নামাজ শেষে যখন আমরা দল বেঁধে পুরো গ্রাম ঘুরতে বের হই, তখন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার ঘরে আমাদের জন্য অবারিত দ্বার খোলা থাকে। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে না, লাগে না কোনো ফরমালিটি।
গ্রামের ঈদে নেই কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার শো-অফ। এখানে আনন্দ মানে হলো দল বেঁধে পুকুর পাড়ে আড্ডা দেওয়া, বটতলায় বসে স্মৃতিচারণ করা আর গ্রামের ছোট ভাইদের সাথে ফুটবল ম্যাচ খেলা।
গাজীপুরের সেই 'ব্যস্ত জাহিদ' এখানে এসে হয়ে যায় শুধুই 'জাহিদ'। এখানে আমার কোনো ইমেইল চেক করতে হয় না, নেই কোনো কাজের ডেডলাইন। শহরের সেই ক্লান্তি আর মানসিক চাপ তামাইয়ের বাতাসে মিশে এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। এটাই হলো গ্রামের ঈদের ম্যাজিক—যা একজন মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
আমি জানি, আপনাদের অনেকেরই একটা করে 'তামাই' আছে। হয়তো কাজের চাপে বা পরিস্থিতির কারণে আপনি আপনার প্রিয় গ্রামটিতে যেতে পারছেন না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও একবার নিজের শেকড়ে ফিরে দেখুন। দেখবেন, শহরের দামী উপহারের চেয়ে গ্রামের মাটির প্রদীপের আলো অনেক বেশি উজ্জ্বল। ঈদ মানেই তো ভাগ করে নেওয়া, আর সেই ভাগ করে নেওয়ার আসল আনন্দ শুধু গ্রামেই পাওয়া সম্ভব।
গাজীপুরের ঈদ আমাকে দেয় বিশ্রাম, আর তামাইয়ের ঈদ আমাকে দেয় 'প্রাণ'। যান্ত্রিক এই জীবনে আমরা সবাই হয়তো শহরকে বেছে নিয়েছি জীবিকার তাগিদে, কিন্তু আমাদের মনটা পড়ে থাকে সেই ধুলোমাখা গ্রামেই।
আমি তো আমার তামাইয়ের গল্প শোনালাম। আপনাদের ঈদ কেমন কাটে? আপনার গ্রাম বা শহর—কোন জায়গার ঈদ আপনাকে বেশি টানে? সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পীদের মাকু চালানোর শব্দের মাঝে ঈদের খুশি নাকি শহরের ডিজিটাল বিনোদন?
নিচে কমেন্ট করে জানান আপনার ঈদের সেরা স্মৃতিটি। আপনার প্রতিটি গল্প আমার ব্লগের জন্য এক একটি অনুপ্রেরণা।
