দুই রুমমেটের ভ্রমণ
গাজীপুরের মাওনা থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ির ৩০-৩৫ কিলোমিটারের মত। ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটলে মনে হবে যে আমরা অতিতের পথ ধরে চলছি। আজ এই বছরের রমজানের শেষ শুক্রবার ১৩ মার্চ, ২০২৬; সকালের রোদটা বেশ মিষ্টি ছিল ও হলদে রঙের ছিল।
রাত্রে আমি আর আমার রুমমেট সজিব মিলে ঠিক করেছিলাম, অনেক দিন ধরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না।তাই আগামিকাল গাজীপুর যাব ঈদের শপিং করতে ও ভাওয়াল রাজবাড়ীটার সৌন্দর্য দেখতে।
নিচে আমাদের আজকের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাসহ ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার সেই রোমহর্ষক, রহস্যময় ও মজার কাহিনী বিস্তারিত তুলে ধরলাম।
মাওনা থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ি: একটি সকালের স্মৃতি
সকাল ঠিক ৯টা। মাওনা থেকে আমরা সজিবের বাইক নিয়ে রওনা হলাম। সজিব ড্রাইভ করছিল।আর আমি রাস্তার পাশে লাগানো সুন্দর গাছপালা দেখতেছিলাম ।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পার হয়ে রাজবাড়ির পথে প্রবেশ করা মাত্রই রাস্তার দুপাশে গজারি বনের ছায়া আমাদের কাছে মনে হল এক স্বর্গের রাস্তা ।
গাজীপুর সদরে অবস্থিত ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার রাজবাড়ি। তখন বেলা এগারোটা বেজে দশ মিনিট।কয়েক শতক আগে তৈরি এই বিশাল রাজপ্রাসাদ আজও তার জুলুস ধরে রেখেছে ।
আমি আর সজিব বাইকটা রেখে প্রাসাদের চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম। ঠিক তখন রাজবাড়ির পেছনের দিকে একটা পুরনো ও বিশাল গাছের নিচে মানুষের জটলা আমাদের চোখে পড়ল।
আগ্রহ নিয়ে এদিকে পা বাড়ালাম। এক বৃদ্ধ মানুষকে ঘিরে বসে আছেন সবাই । তার বয়স হবে আনুমানিক ৭৪ বছর ছুঁইছুঁই। নাম অভিরাম বাবু । বৃদ্ধ লোকটি আসলে সবাইকে বাউল সন্ন্যাসী রাজার ঘটনা শোনাচ্ছিলেন। আমরা যখন সেখানে আসি তখন তার গল্পটা প্রায় শেষ।
তার গল্পের শেষ অংশ শুনে অনেক আগ্রহ জাগলো পুরো গল্পটি শোনার জন্য। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি নাছর বান্দা।এক ঘটনা দ্বিতীয়বার বলতে সে রাজি নয়। তখন আমাদের কানে কানে একজন বলল মুরুব্বী কে একটা চা, বিস্কুট আরেকটি পান এনে দাও। দেখবে গল্পের আগা মাথা সব প্রথম থেকে আবার শুরু করবে। সজিব পাশে থাকা ছোট টং এর দোকান থেকে চা, বিস্কুট ও কয়েকটা পান নিয়ে এল। বৃদ্ধের হাতে গরম চায়ের কাপ বিস্কুট আর পান তুলে দিতেই তার চোখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন সেই অবিশ্বাস্য কাহিনী। এক সময় সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এই সত্য ঘটনাটি।
ভাওয়াল রাজবাড়ির ইতিহাস আসলে ভাওয়াল জমিদারদের এর রাজত্ব কেই বলা হয়। এই ইতিহাস অমর হয়ে আছে ১৯২১ সালের এক রহস্যময় ঘটনার জন্য। ইতিহাসের পাতায় এই কাহিনীটা 'ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা' নামে পরিচিত।
ঘটনাটি শুরু ১৯০৯ সালে। ভাওয়াল এস্টেটের মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড সৌখিন এবং সাহসী একজন মানুষ। সেই সময়ে তার শরীরে এক জটিল রোগ বাসা বাঁধে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি চলে যান দার্জিলিং। সেই সময় দার্জিলিং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত ছিল ।
সেখানে ১৯০৯ সালের ৭ মে, মেজকুমার মারা খবর পাওয়া যায় । শোনা যায় তাকে যখন শ্মশানে নেওয়া হয় তখন প্রচন্ড জ্বর এবং বৃষ্টি শুরু হয় । এরপর রাজবাড়ির দায়িত্ব সরকারি হস্তক্ষেপে চলে যায় (কোর্ট অব ওয়ার্ডস)।
ঠিক ১২ বছর পর, ১৯২১ সালের এক বিকেলে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে (বর্তমানে সদরঘাট এলাকা) এক জটাধারী সন্ন্যাসীকে বসে থাকতে দেখা যায়। তার গায়ে ছাই মাখা, দীর্ঘ জটা আর পরনে সামান্য কৌপিন। সেই সময়ের কিছু মানুষ যারা জমিদার বাড়িতে কাজ করতো তারা লক্ষ্য করল, এই সন্ন্যাসীর সাথে মৃত মেজকুমারের চেহারার হুবহু মিল।
তথ্যটি ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ধীরে ধীরে মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করল। ভাওয়াল পরগণার প্রজারা তো মেনে নিয়েছিল তাদের প্রিয় মেজকুমার ফিরে এসেছেন। প্রথমে এই সন্ন্যাসী টি নিজের পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে মানুষের আবেগ আর তার বোন জ্যোতির্ময়ী দেবীর জেরার মুখে সন্ন্যাসীটি স্বীকার করেন। পরে তিনি নিজ মুখেই বলেন আমি সেই হারিয়ে যাওয়া রমেন্দ্রনারায়ণ রায়।
সেই বৃদ্ধ আর দাঁত প্রায় সবটি পড়ে গিয়েছে আমাদের দেওয়া বিস্কুট চিবোতে চিবোতে বলছিলেন, "বাবা, ওই রাতে অলৌকিক ঘটনা ঘটে ছিল।" আসল ঘটনা ছিল এমন যখন মেজকুমার সৎকার করা হবে ঠিক সেই সময় প্রচন্ড জ্বর তৈরি হয়। যার ফলে সবাই মৃতদেহ ফেলে রেখে নিজ নিজ আশ্রয় খুঁজে নেয়। আর সেই বৃষ্টিতে মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় শক্তি ফিরে পায় এবং শ্মশান থেকে উঠে দাঁড়ায়। সেই সময় সেই সুসান দিয়ে যাচ্ছিল একদল সন্ন্যাসী। পরবর্তীতে সে নাগা সন্ন্যাসীরা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে এবং তাদের দলে নিয়ে নেয়।
পরবর্তী ১২ বছর মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় সেই নাগা সন্ন্যাসীদের সাথেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থানে ঘুরে বেড়ায়। তার স্মৃতিশক্তি হরিয়ে গিয়েছিল । সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে থেকে তিনি ধর্মকর্মে লিপ্ত হন। একটা সময় এই ঘুরতে ঘুরতে তার স্মৃতি শক্তি কি সেটা ফিরে আসে। যার ফলে সে আবার ঢাকায় ফিরে আসে।
সন্ন্যাসী ফিরে আসায় তার স্ত্রী বিভাবতী দেবী এবং তার ভাই সত্যেন্দ্রনাথ তাকে চিনতে পারেনি । তারা দাবি করেন, এই ব্যক্তি একজন বহুরূপী বা ভণ্ড।ইনি সম্পত্তির লোভে তার ভায়ের রূপ ধরেছে । আর তখনই থেকেই শুরু হয় ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। ১৯৩০ সালে ঢাকার আদালতে মামলা শুরু হয়।
এই মামলাটি ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে রহস্যময় মামলাগুলোর একটি। বৃদ্ধ লোকটি বললেন " এই মামলায় কয়েক শ সাক্ষী, হাজার হাজার নথি আর সন্ন্যাসীর শরীরের জন্মগত চিহ্ন পরীক্ষা করে দেখা হয়।"বৃদ্ধ লোকটি আরো বললেন" সন্ন্যাসীর স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়—রাজবাড়ির গোপন কক্ষের অবস্থান কোথায়? ছোটবেলার খেলার স্মৃতি, প্রিয় খাবার কি কি? এমনকি তার শিকার করা বাঘের চামড়া নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।"
সবশেষে ১৯৩৬ সালে বিচারক পান্নালাল বসু সকল তথ্যের উপর ভিত্তি করে রায় দেন যে, রায়। রাইটি মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণের এই হয়।এই রায় টি তার স্ত্রী অস্বীকৃতি জানায় এবং পরবর্তীতে কলকাতা আদালতে মামলা করেন। কলকাতার হাইকোর্টও মেজ রমেন্দ্রনারায়ণের পক্ষে রায় দেয়। এর ফলে এবার তার স্ত্রী মামলা করে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল।লন্ডনেও মামলার রায় রমেন্দ্রনারায়ণের পক্ষে দেয় এবং তাকে এই জমিদারের আসল মালিক ঘোষণা করা হয়।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ১৯৪৬ সালে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল তাকে চূড়ান্তভাবে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।তার ঠিক কয়েক দিন পরেই মেজকুমার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জয়ী হয়েও তিনি হেরে গেলেন মহা সত্য মৃত্যুর কাছে
বৃদ্ধের কথা শেষ হলো। চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে দিলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ঘটনাটির সমাপ্তি করলে। আমি আর সজিব রাজবাড়ির কারুকাজ করা স্তম্ভগুলোর দিকে তাকালাম। মনে হলো, এই ইটের দেয়ালগুলো যেন আজও সন্ন্যাসী রাজার দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজকের এই আধুনিক যুগে বসেও ভাওয়াল রাজার কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের জীবন উপন্যাসের চেয়েও বেশি নাটকীয় হতে পারে।
তখন প্রায় বিকাল তিনটা বেজে ছিল।রোজার দিন হওয়ায় আমাদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা ছিল না। তাই সরাসরি গাজীপুরে শপিং করে চলে আসলাম
মাওনা থেকে আমাদের এই ছোট সফরটি কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের এক গভীর গহ্বরে অবগাহন।
আমরা যখন রাজবাড়ি থেকে বের হচ্ছি, তখন ঘড়িতে বেলা দুইটা। ফেরার পথে সজিব বলল, "জাহিদ, জগতটা আসলেও বড় অদ্ভুত, তাই না?" আমি শুধু হাসলাম। সত্যি, সত্য মাঝে মাঝে কল্পনার চেয়েও বেশি অবিশ্বাস্য হয়।
ভাওয়াল রাজবাড়ির এই ইতিহাস নিয়ে কি আপনি কোনো ছোট তথ্যচিত্র বা ভিডিও স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে চান? আমি আপনাকে সেই কাজে সাহায্য করতে পারি।

