ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ঘটনা থাকে যা কল্পনাকেও হার মানায়। গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবংশের মেজ কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়ের জীবনকাহিনি ঠিক তেমনই এক রহস্যময় আখ্যান। এটি কেবল একটি সম্পত্তি উদ্ধারের লড়াই ছিল না, বরং একজন মানুষের নিজের পরিচয় প্রমাণের এক চরম পরীক্ষা ছিল। আজ আমরা জানব কেন একজন প্রতাপশালী জমিদারকে দীর্ঘ সময় ধরে আদালতের বারান্দায় কাটাতে হয়েছিল এবং কেন তিনি নিজের মামলা নিজেই লড়াই করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
১. ঘটনার প্রেক্ষাপট: মেজ কুমারের 'মৃত্যু' ও অন্তর্ধান
ভাওয়াল এস্টেট ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্যতম বৃহত্তম জমিদারি। ১৯০৯ সালে মেজ কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চিকিৎসার জন্য দার্জিলিং যান। সেখানে থাকাকালীন হঠাৎ তার মৃত্যুর খবর আসে। বলা হয়, তিনি পিত্তশূলের ব্যথায় মারা গেছেন এবং হিন্দু শাস্ত্র মতে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরপর তার বিধবা স্ত্রী বিভাবতী দেবী এবং শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদারির ভার গ্রহণ করেন।
কিন্তু আড়ালে একটি গুঞ্জন ছিল—অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় প্রবল বৃষ্টি নামায় শ্মশানে দেহ ফেলে সবাই আশ্রয় নিয়েছিল, এবং ফিরে এসে তারা দেহটি আর খুঁজে পায়নি। মেজ কুমারের শরীর নাকি একদল নাগা সন্ন্যাসী উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল।
২. সন্ন্যাসীর প্রত্যাবর্তন: রাজবাড়ির আঙিনায় অচেনা কুমার
ঘটনার প্রায় ১২ বছর পর, ১৯২১ সালে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে (বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে) এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসীকে দেখা যায়। তার গায়ের রং, হাঁটার ভঙ্গি এবং চেহারার সাথে মৃত মেজ কুমারের অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় সাধারণ মানুষ। খবর ছড়িয়ে পড়লে সন্ন্যাসীকে জয়দেবপুর রাজবাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
সাধারণ প্রজারা তাকে দেখা মাত্রই "রাজা সাহেব" বলে চিনতে পারে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অন্দরমহলে। মেজ কুমারের স্ত্রী বিভাবতী দেবী তাকে স্বামী হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন। ব্রিটিশ সরকার এবং ‘কোর্ট অফ ওয়ার্ডস’ (যারা তখন রাজবাড়ি পরিচালনা করছিল) তাকে একজন ‘প্রতারক’ বা ‘ইম্পোস্টার’ হিসেবে ঘোষণা করে।
৩. কেন তাকে আদালতে দাঁড়াতে হয়েছিল?
একজন রাজা হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন আদালতের দ্বারস্থ হতে হলো, এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ ছিল:
- পরিচয় সংকট: আইনগতভাবে মেজ কুমার ১৯০৯ সালে মৃত। সরকারি নথিতে তার মৃত্যু সনদ ছিল। তাই কেবল চেহারার মিল থাকলেই কেউ রাজ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারতেন না। তাকে প্রমাণ করতে হতো যে তিনি ‘মৃত’ রমেন্দ্রনারায়ণ রায় নিজেই।
- সম্পত্তির দখল ও ষড়যন্ত্র: মেজ কুমারের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীকে নিজের ভাই হিসেবে চিনে নিয়েছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এবং বিভাবতী দেবীর পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন যে এই সন্ন্যাসী আসলে পাঞ্জাবের এক কৃষক, যার নাম মাল সিং। বিশাল জমিদারির মালিকানা হারানোর ভয়ে তারা এই সন্ন্যাসীকে অস্বীকার করেন।
- সম্মান ও অধিকার পুনরুদ্ধার: সন্ন্যাসী শুরুতে সম্পত্তি চাননি, তিনি চেয়েছিলেন নিজের পরিচয়। কিন্তু যখন তাকে ‘প্রতারক’ অপবাদ দিয়ে গ্রাম থেকে বিতাড়নের চেষ্টা করা হলো, তখন তিনি বাধ্য হয়ে ১৯৩০ সালে ঢাকার আদালতে মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলে ঘুম কেন আসে?
৪. মামলার গতিপ্রকৃতি: ইতিহাসের দীর্ঘতম লড়াই
ভাওয়াল রাজবাড়ির এই মামলাটি পৃথিবীর আইনি ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে পরিচিত। কেন এই মামলাটি এত জটিল ছিল?
- শারীরিক প্রমাণ: আদালতে সন্ন্যাসীর শরীরের বিভিন্ন চিহ্ন (যেমন—দাগ, জন্মচিহ্ন, কান ফোঁড়ানো) পরীক্ষা করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, মেজ কুমারের শরীরে যে ধরণের জখম ছিল, সন্ন্যাসীর শরীরেও ঠিক তাই পাওয়া যায়।
- স্মৃতি পরীক্ষা: মেজ কুমার ইংরেজি জানতেন না, উর্দুতে কথা বলতেন এবং ঘোড়ায় চড়তে পারতেন। সন্ন্যাসীকেও একই ধরণের দক্ষতার পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল।
- হাজার হাজার সাক্ষী: এই মামলায় মেজ কুমারের পক্ষে প্রায় ১০০০ জন এবং বিপক্ষে ৫০০ জনের বেশি মানুষ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। প্রজারা দলে দলে এসে সাক্ষ্য দিতেন যে, "ইনিই আমাদের রাজা"।
৫. কেন তিনি নিজেই নিজের হয়ে লড়াই করেছিলেন?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—সন্ন্যাসী রাজার পক্ষে নামী-দামী আইনজীবীরা (যেমন বি সি চ্যাটার্জি) লড়েছিলেন। কিন্তু "নিজের মামলা নিজে লড়া" বলতে বোঝায় তার ব্যক্তিগত উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা।
তৎকালীন সময়ে একজন অভিজাত রাজার পক্ষে আদালতে সাধারণ মানুষের মতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন জেরা সহ্য করা ছিল চরম অপমানের। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি জানতেন:
১. তার ব্যক্তিগত স্মৃতি ছাড়া কেউ এই মামলা জেতাতে পারবে না।
২. তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার সন্ন্যাস জীবন কেবলই এক দুর্ঘটনা ছিল, প্রতারণা নয়।
৩. ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করা কেবল তার একার লড়াই ছিল না, এটি ছিল হাজার হাজার প্রজার বিশ্বাসের লড়াই।
৬. আদালতের রায় ও চূড়ান্ত বিজয়
১৯৩৬ সালে ঢাকা জেলা জজ পান্নালাল বসু এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেন যে, এই সন্ন্যাসীই আসলে মেজ কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়। রায়ে বলা হয়েছিল, রাজত্বের চেয়ে সত্য বড়। তবে বিপক্ষ পক্ষ থেমে থাকেনি। মামলাটি কলকাতা হাইকোর্ট হয়ে প্রিভি কাউন্সিল (তৎকালীন সর্বোচ্চ আদালত, লন্ডন) পর্যন্ত গড়ায়।
দীর্ঘ ১৬ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৪৬ সালে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল সন্ন্যাসীকে মেজ কুমার হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়।
৭. ট্র্যাজিক সমাপ্তি
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দেখুন, যেদিন লন্ডন থেকে তার পক্ষে চূড়ান্ত রায় আসে, তার ঠিক দুদিন পরেই ১৯৪৬ সালের ৩০শে জুলাই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের মানসিক ও শারীরিক চাপ তিনি আর সইতে পারেননি। মৃত্যুর পর আবার তাকে শ্মশানে নেওয়া হয়, তবে এবার আর কোনো রহস্য থাকেনি।
৮. উপসংহার: গাজীপুরের ইতিহাসের এক অমলিন স্মৃতি
গাজীপুরের জয়দেবপুর রাজবাড়ি আজও সেই স্মৃতি বহন করছে। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর এই কাহিনী নিয়ে পরবর্তীতে কলকাতায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সন্ন্যাসী রাজা’ (উত্তম কুমার অভিনীত) এবং ‘এক যে ছিল রাজা’ নির্মিত হয়েছে।
এই মামলাটি আমাদের শেখায় যে, সত্য কখনও কখনও কল্পনার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর হয়। একজন রাজাকে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল—এটি কেবল একটি সম্পত্তির লড়াই ছিল না, এটি ছিল আত্মসম্মান এবং শেকড়ে ফেরার লড়াই। আজ গাজীপুরের মানুষ তাকে সম্মানের সাথে স্মরণ করে, কারণ তিনি কেবল তাদের জমিদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাদের অপরাজেয় এক লড়াকু রাজা।
