k

 

স্বাধীন আফ্রিকার ওপর ফ্রান্সের অদৃশ্য সাম্রাজ্য ও CFA Franc-এর রহস্য



ধরুন, আপনার দেশ স্বাধীন হইছে ৬৫ বছর আগে। আপনার দেশের নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সংগীত, পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট, পুলিশ—সবই আছে। কিন্তু আপনার পকেটে যে টাকাটা, সেটার কন্ট্রোল এখনো সেই সাবেক শাসক দেশের হাতে। দশকের পর দশক ধরে আপনার দেশের টাকাও ছাপা হচ্ছে সেই দেশেই। শুধু সেটাই না, আপনার দেশের ফরেন রিজার্ভের অর্ধেক বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখতে হচ্ছে সেই দেশে। অবিশ্বাস্য লাগতেছে? কিন্তু এটাই ছিল আফ্রিকার অনেকগুলো স্বাধীন দেশের রিয়েলিটি। আর সেই শাসক দেশটি হলো ফ্রান্স।

​১৭ই জুলাই ২০২৫, সেনেগালের রাজধানী ডাকারের ফ্রান্সের শেষ সামরিক ঘাটি থেকে ধীরে ধীরে নামানো হচ্ছে ফ্রান্সের পতাকা। সেনেগাল স্বাধীন হয়েছে কিন্তু ১৯৬০ সালে। তাহলে স্বাধীনতার পরের ৬৫ বছর ফরাসি সৈন্যরা সেখানে কি করতেছিল? আর প্যারিসের রাস্তায় বা ফ্রান্সের ফুটবল দলে এত আফ্রিকান অরিজিনের মানুষই বা এলো কিভাবে? এই সবগুলোর উত্তর ঘুরে ফিরে এক জায়গায় এসে মিলবে। এমন এক সাম্রাজ্য যার কোনো ম্যাপ নেই। ফরাসিরা এর নাম দিয়েছে ফ্রাঁসাফ্রিক।

​১৯৬৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ টোগোর প্রেসিডেন্ট তার দেশে নিজস্ব মুদ্রা চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এক ভোররাতে তার লাশ পড়ে রইল ভিন্ন একটি শক্তিশালী দেশের দূতাবাসের দরজার সামনে। কে মেরেছিল তাকে? আর যে মেরেছিল শেষ পর্যন্ত তার কী হয়েছিল? উত্তরটা কল্পনাও করতে পারবেন না। চলুন সেই অদৃশ্য সাম্রাজ্যের ভেতরের খেলাটা দেখি।

​১৯৬০ সাল, ইতিহাসে এই বছরটির নাম আফ্রিকার বছর বা ইয়ার অফ আফ্রিকা। সেবার স্বাধীন হলো আফ্রিকা মহাদেশের ১৭টা দেশ, যার ভেতরে ১৪টাই ছিল ফরাসি উপনিবেশ।

​নতুন দেশগুলো স্বাধীন তো হলো, কিন্তু কতটুকু স্বাধীন? জাস্ট ইমাজিন, আপনি একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন। আপনার বাড়িওয়ালা একদিন এসে বলল, "এই নাও জমির দলিল, আজ থেকে বাড়ি তোমার।" আপনি তো মহাখুশি, মিষ্টি বিতরণ শুরু করলেন। তারপর খেয়াল করে দেখলেন দলিলের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনে লেখা, বাড়ির কোনো দরজা বা গেটের তালা চাবি চেঞ্জ করা যাবে না। ডুপ্লিকেট চাবি থাকবে সেই বাড়িওয়ালার হাতে। বাড়ির গেটের দারোয়ান, কেয়ারটেকার—কাউকেই চেঞ্জ করা যাবে না। এদেরকে বেতন দেবে সেই বাড়িওয়ালা। এখন বলুন তো, বাড়ির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? ১৯৬০ সালে ফ্রান্স ঠিক এই কাজটাই কিন্তু করেছিল। দলিল দিয়েছিল, কিন্তু হাতে রেখেছিল তিনটি জিনিস: টাকা, বন্দুক এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজের লোক। এই তিন খুটির উপরেই দাঁড়িয়ে গেল ফ্রাঁসাফ্রিক।

​প্রশ্ন হলো, আফ্রিকার দেশগুলো এগ্রি করল কেন? এগ্রি না করলে কী এমন হতো? একটু পিছনে ফিরে দেখা যাক। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট দেশ হাইতি। একসময় সেখানে আফ্রিকা থেকে আনা লাখ লাখ মানুষকে দাস বানিয়ে ফরাসি মালিকদের বাগানে কাজ করানো হতো। সেই দাসরাই বিদ্রোহ করে ১৮০৪ সালে স্বাধীনতা অর্জন করল। কিন্তু ফ্রান্স হাইতির স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিল না। ১৮২৫ সালে হাইতির উপকূলে এসে দাঁড়াল ফরাসি যুদ্ধজাহাজের বহর। শর্ত দিল, স্বাধীনতার স্বীকৃতি চাইলে ১৫ কোটি ফ্রাঁ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু কাকে দেবে? সেই ফরাসি দাস মালিকদের, যাদের দাসত্ব থেকে হাইতির মানুষ মুক্ত হয়েছিল। চিন্তা করুন অবস্থা।

​যুদ্ধবিধ্বস্ত হাইতি নতুন করে যুদ্ধে গেল না, সত্য মেনে নিল। ১৮৩৮ সালে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কমিয়ে করা হলো ৯ কোটি ফ্রাঁ। এই ক্ষতিপূরণ আর ওই ঋণের বোঝা বইলো হাইতির জেনারেশনের পর জেনারেশন। নিউইয়র্ক টাইমসের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেল, সেই ঋণের শেষ কিস্তি শোধ হয়েছে ১৯৪৭ সালে। অর্থাৎ ১৮২৫ সালের সেই সেটলমেন্টের ১২২ বছর পর।

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকা মহাদেশে থাকা ফরাসি উপনিবেশগুলোতে শুরু হলো স্বাধীনতার দাবি। ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গোল আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলোকে একটি গণভোটের প্রস্তাব করলেন। হানা ভোট হবে। হা মানে ফরাসি কমিউনিটির ভেতরে থাকা। হা ভোট দিলে ফ্রান্সের অধীনে থেকেই নিজেদের সরকার গঠন করা যাবে—অর্থাৎ স্বায়ত্তশাসন। দেশের দৈনন্দিন কাজ নিজেরাই চালাতে পারবে। কিন্তু সেনাবাহিনী, বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানি সার্কুলেশনের মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো থাকবে ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনার অধীনে। মানে নিজেদের সরকার থাকবে, কিন্তু পুরো স্বাধীনতা থাকবে না। ওদিকে না ভোট মানে হলো এখনই পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু সেক্ষেত্রে ফ্রান্সের সব সাহায্য বন্ধ হয়ে যাবে। ভোট হলো, একে একে সবাই বলল, "হা!" একটি দেশ বাদে। দেশটা হলো গিনি।

​২৫শে আগস্ট ১৯৫৮, গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে শার্ল দ্য গলের সামনেই গিনির নেতা আহমেদ সেকু তুরে বলেছিল, "দাসত্বের প্রাচুর্যের চেয়ে স্বাধীনতার দারিদ্র্য আমাদের বেশি পছন্দ।" বিশাল ভারী কথা কিন্তু। ২৮শে সেপ্টেম্বরের গণভোটে প্রায় ৯৫% গিনিবাসী না ভোট দিল। এখন ফ্রান্সকে না বলার শাস্তি কেমন হতে পারে, সেটা তো দেখলেনই হাইতির বেলায়।

​গিনির বেলাতে প্রতিশোধ এল দ্রুত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফরাসি কর্মকর্তারা গিনি ছেড়ে চলে গেল, সাথে নিয়ে গেল যন্ত্রপাতি, মেশিনপত্র—যা তারা নিয়ে এসেছিল। অনেক বিবরণীতে আছে যা নিতে তারা পারেনি, তা নষ্ট করে রেখে গেল। কিন্তু আসল আঘাত এল দুই বছর পর, ১লা মার্চ ১৯৬০ সালে গিনি যখন নিজের মুদ্রা চালু করল তখন।

​ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা এসডিইসিই শুরু করল একটি গোপন অভিযান, নাম ‘অপারেশন পার্সেল’। এই অভিযানের অস্ত্র ছিল জাল টাকা। ফরাসি গোয়েন্দারা বস্তা বস্তা নকল গিনিয়ান নোট ছাপিয়ে গিনিতে ঢুকিয়ে দিল। লক্ষ্য হলো গিনির নতুন মুদ্রার ওপরে গিনবাসীর আস্থা ভেঙে দেওয়া। সেটাই হলো, দাম আকাশে উঠল। সাথে শুরু হলো গিনির ভেতরে থাকা সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেওয়া। এসডিইসিই-এর আফ্রিকান শাখার তৎকালীন প্রধান মরিস রবের ২০০৪ সালে প্রকাশিত বইয়ে তিনি নিজেই এসব স্বীকার করেছেন। তার ভাষায়, অভিযান ছিল পুরোপুরিভাবে সফল। একটা রাষ্ট্র আরেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে জাল টাকা ঢোকাচ্ছে সেই দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে—চিন্তা করেন অবস্থা।

​বাকি আফ্রিকান নেতারা মেসেজটি কিন্তু পেয়ে গেল। স্বাধীনতা নিয়ে যত খুশি উৎসব করো, কোন সমস্যা নাই। কিন্তু নিজস্ব কারেন্সি কন্ট্রোলের চেষ্টা কইরো না। কিন্তু কেন? চলুন এবার সেটাই দেখি।

​ছোট্ট একটা শহর শ্যামেলিয়ার। সেখানে আছে ব্যাংক অব ফ্রান্সের একটা ছাপখানা। দশকের পর দশক ধরে এখান থেকেই প্রিন্ট হয়ে আফ্রিকায় গেছে কোটি কোটি মানুষের পকেটের টাকা। এই মুদ্রার নাম হলো সিএফএ ফ্রাঁ। জন্ম ১৯৪৫ সালে। তখন সিএফএ মানে ছিল কোলনিয়া ফ্রসেস দাফ্রিক—মানে আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশ সমূহ। পরবর্তীতে উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা পেয়েছে, কিন্তু মুদ্রার নামে এই সিএফএ রয়েই গেছে। আজও ১৪টি আফ্রিকান দেশ এই মুদ্রা ব্যবহার করে। এই হলো সেই দেশগুলোর তালিকা:


 পশ্চিম আফ্রিকার আটটি এবং মধ্য আফ্রিকার ছয়টি। এর মধ্যে দুটো দেশ কখনো ফরাসি উপনিবেশই ছিল না—গিনি বিসাউ ছিল পর্তুগিজ এবং ইকুইটোরিয়াল গিনি ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ। তবুও তারা স্বেচ্ছায় এই ক্লাবে ঢুকেছে। কিন্তু কেন? উত্তরটা একটু পরে, তার আগে মেকানিজমটা দেখি।

​এই মেকানিজমে তিনটা কলকব্জা। প্রথমটি হলো মুদ্রা বিনিময়ের বাধা দাম। ১৯৬০ সাল থেকে ৫০ সিএফএ ফ্রাঁ ছিল এক ফরাসি ফ্রাঁর সমান। মানে হলো আপনি ৫০ সিএফএ ফ্রাঁ দিয়ে এক ফরাসি ফ্রাঁ কিনতে পারবেন। ১৯৯৪ সালে একটা ঘটনার পরে ১০০ সিএফএ ফ্রাঁ হয়ে গেল এক ফরাসি ফ্রাঁর সমান। ১৯৯৯ সালে ফ্রান্স ইউরোতে ঢোকার পরে সিএফএ ফ্রাঁ বাঁধা হয়ে গেল ইউরোর সাথে। ১ ইউরো সমান ৬৫৫.৯৫ সিএফএ ফ্রাঁ। এক পয়সাও এদিক ওদিক না।

​প্রশ্ন হলো এতে সমস্যা কোথায়? ধরুন ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দিল। মানে হলো ইউরোপের কোনো ব্যাংকে ইউরোতে টাকা রাখলে আগের চেয়ে সুদ আপনি বেশি পাবেন। এখন যেসব বিনিয়োগকারীর কাছে সিএফএ ফ্রাঁ আছে, তারা তখন সিএফএ ফ্রাঁ ছেড়ে ইউরো কিনতে শুরু করবে। কারণ ইউরো কিনে ফ্রান্সের ব্যাংকে ইউরোতে টাকা রেখে দিলে সেটা বেশি প্রফিটেবল। কিন্তু সবাই যদি সিএফএ ফ্রাঁ সেল করে ইউরো কিনতে থাকে, তাহলে এই মুদ্রার উপরে চাপ পড়বে। ডিমান্ড কমলে মূল্য কমবে। সিএফএ ফ্রাঁ মূল্য হারাবে। কিন্তু মূল্য হারাতে তো আপনি দিচ্ছেন না। কারণ আপনি নিজেই নিয়ম করে রাখছেন এক ইউরোর দাম ৬৫৫.৯৫ সিএফএ ফ্রাঁতেই ধরে রাখতে হবে। আর সেটা করতে আফ্রিকার ওই দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকেও সুদের হার বাড়াতে হবে। যাতে বিনিয়োগকারীদের কাছে সিএফএ ফ্রাঁ রাখাটা ইউরোর মতোই আকর্ষণীয় হয়ে যায়। কিন্তু সুদের হার বাড়লে কী হবে? ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। তখন ব্যবসায়ীরা ঋণ নেবে কম। এতে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে যেতে পারে। অর্থনীতি স্থবির হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ইউরোপের একটা সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়বে সেনেগালের একজন মানুষের ঋণের খরচেও। হিসাবটা এত সরল না। আরো অনেক ভ্যারিয়েবল থাকে, কিন্তু গরপরতাই এভাবেই হয়। মানে হলো সেনেগালের একজন মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতেছে ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে ওই আফ্রিকান দেশটির কোনো সে নাই।

​দ্বিতীয়টি হলো প্যারিসের সিন্দুক। নিয়ম ছিল দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ রাখতে হবে ফ্রেঞ্চ ট্রেজারিতে—একটা বিশেষ অ্যাকাউন্টে, নাম অপারেশনস অ্যাকাউন্ট। শুরুতে প্রায় পুরোটাই রাখতে হতো। সত্তরের দশকে ৬৫% এবং পরে ৫০% করা হয়। বিনিময়ে ফ্রান্স দিত একটা গ্যারান্টি—যত চাও নির্দিষ্ট রেটেই টাকা ভাঙাতে পারবা।

​তিন নম্বর পয়েন্টটি আরো ইন্টারেস্টিং। এসব আফ্রিকান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডে বসতো ফরাসি প্রতিনিধি। চিন্তা করেন, আফ্রিকার একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড মিটিং এ বসতেছে প্যারিসের লোক। এখন যেকোনো সিস্টেমের পক্ষে-বিপক্ষে কিন্তু যুক্তি থাকে। পক্ষে যুক্তি না থাকলে আফ্রিকার এতগুলো দেশ রাজি হয়েছিল কেন? শুধু কি ফ্রান্সের ভয়ে? মোটেই না। অনেকে অনেক হিসাব-নিকাশ করেই রাজি হয়েছিল। আফ্রিকার অনেক দেশ যখন লাগামছাড়া ইনফ্লেশনে কাহিল হয়ে গেল, সিএফএ দেশগুলোতে তখন জিনিসপত্রের দাম মোটে তুলনামূলকভাবেই স্থির। গিনি বিসাউ আর ইকুইটোরিয়াল গিনি কিন্তু ঠিক এই স্টেবিলিটির জন্যই ঢুকেছিল এই সিস্টেমে। স্বেচ্ছায়। কিন্তু কাগজে-কলমে লিখে কি আর সিস্টেম স্টেবল করা যায়? আশির দশকের শেষ দিকে সিএফএ ফ্রাঁ ব্যবহারকারী আফ্রিকান দেশগুলোর অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটে পড়ল। তাদের অর্থনীতি সামলাতে অনেক বেশি আর্থিক সাহায্য দরকার হয়ে পড়ল। আর এখানেই এসে গেল আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। তারা বলল, সাহায্য পেতে হলে অর্থনীতিতে সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে সিএফএ ফ্রাঁর মান কমাতে হবে। কিন্তু আফ্রিকার ওই দেশগুলোর সরকার রাজি হচ্ছিল না। ১৯৯৩ সালে ফ্রান্স জানিয়ে দিল আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের শর্ত যদি তোমরা না মানো তাহলে আমাদের কাছ থেকেও আর সাহায্য পাবা না। ব্যাস! ১১ই জানুয়ারি ১৯৯৪ সেনেগালের বসা এক বৈঠকে এক ধাক্কায় সিএফএ ফ্রাঁর মান কমানো হলো। ৫০% ডিভ্যালুয়েশন করা হলো। এক ফরাসি ফ্রাঁ কিনতে যেখানে আগে লাগত ৫০ সিএফএ ফ্রাঁ, কিন্তু এখন লাগবে ১০০ সিএফএ ফ্রাঁ। রাতারাতি কোটি মানুষের কাছে আমদানি করা জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করল।

আরো পড়ুন: আপনি ফ্রিতে AI চালান, বিল দেয় কে?

​এবার দেখি টোগোর কী অবস্থা। টোগোর প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন সিলভানুস অলিম্পিও। টোগোর স্বাধীনতার নায়ক। তিনি চাইতেছিলেন নিজস্ব মুদ্রা। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে টোগোর নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনও তৈরি হয়ে গেল। ব্যাস! ১৩ই জানুয়ারি ১৯৬৩, মধ্যরাতে একদল সৈনিক ঢুকে পড়ল তার বাড়িতে। ভোরের আগেই তার লাশ পাওয়া গেল আমেরিকান দূতাবাসের দরজার সামনে—মাত্র কয়েক হাত দূরে। তাকে মেরেছিল ফরাসি সেনাবাহিনী থেকে ফেরা একদল সাবেক সৈনিক। টোগো যখন স্বাধীন হলো, অলিম্পিও তাদেরকে টোগোর ছোট্ট সেনাবাহিনীতে নিতে রাজি হয়নি। এদের একজন ছিল এক সাবেক সার্জেন্ট—ফ্রান্সের হয়ে যিনি যুদ্ধ করেছিলেন ইন্দোচীন এবং আলজেরিয়ায়। নাম: এতিয়েন ইয়াদেমা। তিনি ছিলেন এই দলের একজন। ঘটনার পর তিনি টাইমস্ এবং প্যারিস ম্যাচ ম্যাগাজিনকে নিজেই বললেন, গুলিটা তিনিই করেছিলেন।

​এবার টুইস্ট! চার বছর পর ১৯৬৭ সালে এই লোক হয়ে গেল টোগোর প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতায় থাকল ৩৮ বছর। ২০০৫ সালে সে মারা যায়। তারপর চেয়ারে বসল তার ছেলে—ফোর ন্যাসিম্বে। ২০২৫ সালে সংবিধান চেঞ্জ করে সে এখন এমন এক পদে বসছে যার কোনো মেয়াদসীমা নাই। এক পরিবার প্রায় ছয় দশক ধরে ক্ষমতায়! আর টোগো আজও সিএফএ জনে। পরে অবশ্য ইয়াদেমা গুলি করার দাবিটা অস্বীকার করেছিল। এই হত্যায় ফ্রান্স সরাসরি জড়িত ছিল কি না আদালতে তা প্রমাণিত না। কোনো প্রমাণিত দলিল নেই, ইতিহাসবিদরা আজও তর্ক করে। বাকিটার বিচার আপনার।

​কিন্তু এবার প্রশ্ন, যে কাঠামো এত বছর ধরে টিকে রইল, ২০২৫ সালে এসে হঠাৎ সেখানেই কেন ফাটল ধরল? সেই উত্তরে যাওয়ার আগে দেখতে হবে এই অদৃশ্য সাম্রাজ্যের লাঠাই আসলে কে সামাল দিত। প্যারিসের এক ছোট্ট অফিসের এক মানুষ—নাম জ্যাক ফোকার। এই লোক কিন্তু মন্ত্রী না, জেনারেল না। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৪ ফ্রান্সের আফ্রিকান নীতির আসল মাস্টারমাইন্ড এই লোক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ এলিজির ভেতরে একটা অফিসে সে বসত। আফ্রিকার প্রেসিডেন্টরা জানত প্যারিসের দরকার হলে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফোন দিয়ে কোনো লাভ নাই, ফোন করতে হবে এই লোকটাকে। তাহলে কাজ হবে। তাকে ডাকা হতো মঁসিয়ে আফ্রিক। অপারেশন পার্সেলের নকশাতেও তার হাত ছিল। জ্যাক ফোরের হাতিয়ার ছিল সহযোগিতার চুক্তি—কোঅপারেশন এগ্রিমেন্টস। স্বাধীনতার সময় প্রায় প্রতিটি আফ্রিকান দেশের সাথে এই চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তিতে ওপরের দিকে সুন্দর সুন্দর কথা থাকত—বন্ধুত্ব, উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এসব। কিন্তু ভেতরের ধারায় থাকত ফরাসি সেনা ঘাঁটি, দরকার মতো সেনা মোতায়েনের অধিকার এবং কিছু চুক্তিতে ওইসব দেশের কৌশলগত কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের অগ্রধিকারের কথাটা লেখা থাকত—অর্থাৎ কিনতে হবে ফ্রান্সের কাছ থেকে।

​দরকারে সেনা নামানোর এই ধারাটার আসল মানে কী জানেন? এটা হলো কূ-ইনস্যুরেন্স। উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৬৪ সালের গ্যাবন। ফেব্রুয়ারির এক রাত সেনাকর্মকর্তারা সরিয়ে দিল ফ্রান্সের ঘনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট লিও এম্বাকে। কু সফল। নতুন সরকারও ঘোষণা হয়ে গেল। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পর আকাশ থেকে নামল ফরাসি প্যারাট্রুপার্স। কু উল্টে গেল। এম্বা আবার ক্ষমতায় ফিরল। এই গাবনে কী আছে জানেন? আছে তেল, ম্যাঙ্গানিজ এবং ইউরেনিয়াম। লিও এম্বার পরে এল ওমর বঙ্গো। ক্ষমতায় থাকল ৪১ বছর। তারপরে তার ছেলে আলি বঙ্গো। এই পরিবারের শাসন শেষ হলো ২০২৩ সালের আগস্টে এক সেনা অভ্যুত্থানে।

​গবেষকদের হিসাবে ১৯৬০ সাল থেকে আফ্রিকায় ফ্রান্স সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে ৫০ বারেরও বেশি। কোনো কোনো হিসাবে সংখ্যাটা আরো বড়। তাই ফ্রান্সের ডাকনামই হয়ে গেছে আফ্রিকান জ্য দান—মানে আফ্রিকার দারোগা। আফ্রিকার দেশগুলোর প্রেসিডেন্টের অফিসে ফরাসি উপদেষ্টা, সেনাবাহিনীতে ফরাসি কর্মকর্তা এবং অফিসার, এবং মন্ত্রণালয়ে ফরাসি বিশেষজ্ঞ—এসব একেবারেই কমন দৃশ্য। সেই সাথে ছিল টাকার খেলা। ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এলফ আকিতান। গ্যাবন এবং কঙ্গোসহ আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে তারা তেল তুলত। আদালতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী এসব দেশে তেল তোলার অনুমতি আর ব্যবসায়িক সুবিধা ধরে রাখতে এলফ গোপনে টাকা দিত আফ্রিকার ক্ষমতাবান নেতাদের। শুধু আফ্রিকায় নয়, এলফের গোপন তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে ফ্রান্সের রাজনৈতিক দলগুলোকেও গোপনে টাকা দেওয়া হতো। এ কথা আদালতে স্বীকার করেছিল কোম্পানির সাবেক প্রধান লোয়িক লফ্লশ প্রিজিজ।

​কিন্তু টাকার খেলা এখানেই থামেনি। কোম্পানির কর্মকর্তারা বিপুল টাকা সরিয়ে নিজেরা কিনেছে বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট আর করেছে সম্পত্তি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৩ সাল মাত্র চার বছরে কোম্পানি থেকে সরানো হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। ২০০৩ সালে প্যারিসের আদালতে বিচার হলো ৩৭ জনের। দোষী সাব্যস্ত হলো এলফের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা হলো।

​এখন প্রশ্ন, আফ্রিকা ফ্রান্সের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ফ্রান্সের লাভ কী? ফেসবুকে প্রায়ই দেখবেন নিউজ হয়—ফ্রান্স প্রতিবছর আফ্রিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কলিনিয়াল ট্যাক্স তোলে। এই সংখ্যার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সোর্স নেই। তবে ইন রিয়েলিটি সিস্টেমটা অনেক বেশি কৌশলী। সরাসরি লুটে না নিয়ে কৌশলে সুবিধা আদায় করে ফ্রান্স।

​২০২৫ সালে ফ্রান্সের বিদ্যুতের প্রায় তিন ভাগ এসেছে পরমাণু চুল্লি থেকে। চুল্লির জ্বালানি ইউরেনিয়াম। ২০০৫ থেকে ২০২২ এই ১৫ বছরে ফ্রান্স যত ইউরেনিয়াম আমদানি করেছে তার প্রায় ১৮% একটি দেশ থেকে এসেছে—নাইজার। যার কারেন্সি সেই সিএফএ ফ্রাঁ। ওদিকে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ পেয়েছে নাইজারের মাত্র ২১% মানুষ। নাইজারের মাটির নিচের ইউরেনিয়াম আলো জ্বালিয়ে রাখছে ফ্রান্সে। আর নাইজারে প্রতি পাঁচজনে চারজন থাকতেছে অন্ধকারে। আফ্রিকার দেশগুলোতে বন্দর, রেল, টেলিকম, পানি—বহু বড় বড় কন্ট্রাক্ট গেছে ফরাসি কোম্পানির হাতে। আর মুদ্রার বিনিময় হার যেহেতু বাধা ফরাসি ব্যবসায়ীদের কোনো এক্সচেঞ্জ রিস্ক নাই। তারা যেন নিজেদের দেশেই ব্যবসা করতেছে।

আরো পড়ুন: জগৎশেঠ: বাংলার ধনকুবের থেকে ব্রিটিশদের পেনশনভোগী!

​তবে সবচেয়ে দামি এবং সবচেয়ে কম আলোচিত প্রভাবটি হলো কণ্ঠস্বর। ফ্রান্স আমেরিকা বা চীনের মত পরাশক্তি না। তবুও বিশ্বমঞ্চে তার গলা অনেক বড়। কারণ তারা যখন কথা বলে, তাদের পেছনে থাকত এক ডজনেরও বেশি আফ্রিকান দেশের ভোট এবং সমর্থন। এই সম্পর্কটাকে গ্যাবনের ওমর বঙ্গো এক লাইনে বুঝিয়ে দিয়েছিল। সেটা হলো, ফ্রান্স ছাড়া আফ্রিকা চালকবিহীন গাড়ি আর আফ্রিকা ছাড়া ফ্রান্স জ্বালানিবিহীন গাড়ি। কিন্তু এই গাড়ির সবচেয়ে টেকসই জ্বালানি ইউরেনিয়াম না, তেলও না—সেটা হলো ভাষা? কিভাবে? বলতেছি।

​পৃথিবীতে যারা প্রতিদিন ফরাসি ভাষায় কথা বলে, তাদের বেশিরভাগ থাকে কোথায়? ফ্রান্সে? না। ইউরোপে? মোটেই না। আফ্রিকায়। ২০২২ সালের হিসাবে পৃথিবীতে ফরাসি বলতে পারে প্রায় ৩২ কোটি মানুষ। বিশ্বের পঞ্চম সবচেয়ে কথিত ভাষা। ফরাসি প্রায় ৩০টি দেশের সরকারি ভাষা। আর ফরাসি সরকারি ভাষা এমন দেশগুলোর ভেতরে সবচেয়ে জনবহুল কোনটি? ফ্রান্স নয় কিন্তু। দেশটা হলো কঙ্গো, যার জনসংখ্যা ১০ কোটির বেশি। মজার ব্যাপার কঙ্গো ফ্রান্সের উপনিবেশই ছিল না, ছিল বেলজিয়ামের। তবে একটা ভুল ধারণা ভাঙি, এসব দেশের বেশিরভাগ মানুষের মাতৃভাষা কিন্তু ফরাসি না। যেমন সেনেগালের উলুফ, মালিতে বামবারা, নাইজারে হাউসা। ফরাসি সেখানে অফিস আদালত, স্কুল কলেজ এবং ক্ষমতার ভাষা। আমাদের দেশে যেমন ইংরেজি যে ভালো বলতে পারে সে জাতে উঠে যায়, তেমন। তবে আইভরি কোস্টের আবিজান বা গ্যাবনের শহর লিব্রেভিলের নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে ফরাসি হয়ে উঠেছে প্রথম ভাষা। এবার প্রশ্ন, ভাষা নিজেই কেন সাম্রাজ্য হয়ে ওঠে? খেয়াল করে দেখুন, যে দেশের আইন লেখা ফরাসিতে, সেই দেশের আইনজীবীরা উচ্চশিক্ষায় যায় প্যারিসে। যে দেশের অফিসাররা প্রশিক্ষণ নেয় ফরাসিতে, তাদের সবচেয়ে সহজ দরজা প্যারিস। বই, খবর, সিনেমা—সব আসে প্যারিস হয়ে। কোনো সৈন্য লাগে না, কোনো চুক্তি লাগে না। তবে ভাষার এই শিকলও ভাঙা যায়।

​প্রথমে দেখাল রুয়ান্ডা। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডাতে গৃহযুদ্ধ হয় এবং হয় গণহত্যা। ২০২১ সালে ফ্রান্সের নিজের গঠিত কমিশন দুক্লেকের রিপোর্টে দেখা গেল, সে সময় রুয়ান্ডা সরকারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ফ্রান্সের ছিল ভারী এবং গুরুতর দায়। যদিও গণহত্যায় সরাসরি সহযোগিতার প্রমাণ মিলেনি, কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালে রুয়ান্ডার স্কুলে পড়ানোর ভাষা ফরাসি থেকে চেঞ্জ করে করা হয় ইংরেজি। এবং শুধু তাই না, ২০০৯ সালে রুয়ান্ডা যোগ দিল কমনওয়েলথে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে তার কিন্তু কোনো ইতিহাসই নাই। কিন্তু তারপরও সে কমনওয়েলথে ঢুকছে। তাদের যুক্তি ছিল অর্থনীতি আর পূর্ব আফ্রিকার সাথে মেলবন্ধন। তবে বিশ্লেষকরা ফ্রান্সের সাথে তিক্ততাকেও বড় একটি কারণ মনে করেন।

​কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্ট আফ্রিকাতে না, খোদ ফ্রান্সের ভেতরে। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতল ফ্রান্স। ২৩ জনের সেই দলে ১২ জনের শিকড় আফ্রিকায়। অনেকেই অবাক হয়ে ভাবেন, প্যারিসের রাস্তায় ফ্রান্সের ফুটবল দলে এত আফ্রিকান কেন? ফ্রান্সের ভেতরের এই ট্রানজিশন শুরু হয় কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে। দুইটা বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে লড়াই করেছে লাখ লাখ আফ্রিকান সেনা। তাদের বলা হতো তিয়ার এ সেনেগালে। নাম সেনেগালে, কিন্তু সৈন্য আসত গোটা পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসি কলোনিগুলো থেকে। বিশ্বযুদ্ধের পর এদের একটা বড় অংশ ফ্রান্সে গিয়ে সেটেল হয়। দ্বিতীয় স্রোত আসল আলজেরিয়া থেকে। আলজেরিয়া কাগজে-কলমে ফ্রান্সের উপনিবেশই ছিল না, ছিল ফ্রান্সের অংশ—ফ্রান্সের ডিপার্টমেন্ট। ১৯৪৭ সালের পর আলজেরিয়ানরা ভিসা ছাড়া ফ্রান্সে আসতে পারত। ওদিকে বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স তখন টানা তিন দশকের প্রবৃদ্ধি দেখল, যার নাম ত্রদ গ্লোরিয়ুস। গ্লোরিয়ার ৩০ বছর। কারখানা, রাস্তা, মেট্রো—সবখানে শ্রমিক দরকার। শ্রমিক এল আলজেরিয়া, মরক্কো এবং তিউনিসিয়া থেকে। পরে সাহারার দক্ষিণ অংশ থেকেও। ১৯৭৩ সালে তেল সংকটের পরে ফ্রান্সে দেখা দিল মন্দা। তেসরা জুলাই ১৯৭৪ ফ্রান্স ঘোষণা দিল বাইরে থেকে শ্রমিক আনা বন্ধ। ফ্রান্স ভেবেছিল দেশে যেসব লেবার এসেছে কাজ শেষে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু তাই কি হয়? হলো উল্টো। ফ্রান্সে যারা ঢুকেছিল তারা নিজ দেশে ফিরল না। একবার ফিরে গেলে আর ফেরা যাবে না ফ্রান্সে—এই ভয়ে বেশিরভাগ শ্রমিক ফ্রান্সে থেকে গেল। ১৯৭৬ সালের এপ্রিলে একটি ডিক্টরিতে ওসব শ্রমিকেরা পেল ফ্যামিলি রিইউনিফিকেশনের অধিকার। ব্যাস! এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এতে আফ্রিকা থেকে ফ্রান্সে চলে এল ওসব শ্রমিকদের স্ত্রী এবং সন্তানেরা। অস্থায়ী শ্রমিক হয়ে গেল স্থায়ী বাসিন্দা।

​ইতিহাসবিদরা বলেন, দরজা বন্ধ করতে গিয়ে ফ্রান্স মানুষগুলোকে ভেতরে স্থায়ী করে নিল। এখনকার ছবিটা দেখুন। ফ্রান্সের পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে ফ্রান্সে অভিবাসীর সংখ্যা ৮০ লাখ। জনসংখ্যার ১১.৬%। তাদের প্রায় অর্ধেক জন্মসে আফ্রিকায়। সবচেয়ে বেশি আলজেরিয়া এবং মরক্কোতে। আর ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এসব অভিবাসীর সন্তান আছে আরো প্রায় ৭৫ লাখ। কিন্তু কে কোন ধর্মের কোন বর্ণের এই হিসাব আপনি সরকারি পরিসংখ্যানে পাবেন না। ফ্রান্সে জাতি বা বর্ণ ধরে মানুষ গোনা আইনত প্রায় নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রের চোখে সবাই শুধু ফরাসি। তাই বিশ্বকাপজয়ী সেই দলের ২৩ জনের ১২ জনের শিকড় আফ্রিকাতে হলেও তারা সবাই ফরাসি। একদিন সাম্রাজ্য গিয়েছিল আফ্রিকায়, তারপর আফ্রিকা এসে দাঁড়াল সাম্রাজ্যের রাজধানীতে।

​কিন্তু ঠিক যখন আফ্রিকানরা ফ্রান্সের ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে, আফ্রিকাতে তখন শুরু হলো উল্টো ঝড়। সাহেল—সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে বিদীর্ণ একটা শুকনো এলাকা। ২০১৩ সাল, মালিতে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিল তিনটি জঙ্গি গোষ্ঠী—আনসার দিন, আল কায়দার আঞ্চলিক শাখা আর মুজাও। তারা অগ্রসর হচ্ছিল রাজধানী বামাকোর দিকে। মালি সরকারের অনুরোধে সেনা পাঠালো ফ্রান্স। অভিযান ‘অপারেশন সার্ভাল’। ২০১৪ সালে শুরু হলো আরো বড় অভিযান ‘অপারেশন বারখান’। সাহেল জুড়ে মোতায়েন করা হলো হাজার হাজার ফরাসি সৈনিক। কিন্তু বছরের পর বছর যুদ্ধ করেও জঙ্গি সহিংসতা থামানো গেল না। এর মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারে ক্ষমতায় এল সামরিক সরকার। তাদের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক ভেঙে পড়ল। শুরু হলো ফরাসি সেনাপ্রত্যাহার। ২০২২ সালের আগস্টে মালি, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুরকিনা ফাসো এবং ডিসেম্বরে নাইজার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চাদ এবং ফেব্রুয়ারিতে আইভরি কোস্ট। জুলাই মাসে সেনেগাল। একের পর এক দেশগুলো থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হলো। তবে সব দেশ থেকে একই কারণে ফ্রেঞ্চ সেনা সরনো হয়নি। কোথাও সামরিক সরকারের সঙ্গে বিরোধ, কোথাও বা দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে সরানো হয়েছে। আর ফরাসি সেনাদের জায়গায় এসেছে নতুন দল—রাশিয়ান বাহিনী। প্রথমে ঢুকেছিল রাশিয়ার প্রাইভেট মিলিটারি ওয়াগনার গ্রুপ, পরে এল রাশিয়ান বাহিনীর আফ্রিকান কোর। অস্ত্রের বাজারেও ঢুকেছে নতুন প্রতিযোগিতা। রাশিয়া এবং তুরস্কের অস্ত্র এখন বেশ ভালোই ব্যবসা করছে আফ্রিকাতে। ফ্রান্সের প্রভাব কমছে।

আরো পড়ুন: অ্যাগনোডিস থেকে আধুনিক নারী চিকিৎসক

​তিনটি ঘটনা তার আরো বড় প্রমাণ। ঘটনা ১: ডিসেম্বর ২০১৯। আইভরি কোস্টের আবিজানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আর প্রেসিডেন্ট আলসারা ওয়াতারা সেই সিএফএ ফ্রাঁ সংস্কারের ঘোষণা দিল। পশ্চিম আফ্রিকার সিএফএ ফ্রাঁ ব্যবহারকারী আটটি দেশের ফরেন রিজার্ভের একটা অংশ ফ্রান্সের কোষাগারে রাখার সেই বাধ্যতামূলকতা তুলে নেওয়া হলো। ওসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরানো হলো ফরাসি প্রতিনিধি। সিএফএ ফ্রাঁ নাম চেঞ্জ করে ইকো রাখার পরিকল্পনাও হলো। কিন্তু বিনিময় হার এখনো ইউরোর সাথে বাঁধা থাকবে। ফ্রান্সের গ্যারান্টি বহাল থাকবে। তবে ইকোনমির নতুন কোনো মুদ্রা এখনো কিন্তু চালু হয়নি। আর সেন্ট্রাল আফ্রিকার ছয়টা দেশে সংস্কার এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

​ঘটনা ২: জুন ২০২৫। নাইজার সরকার ফরাসি কোম্পানি ওরানোর অংশীদারিত্ব থাকা সোমাইন নামের ইউরেনিয়াম খনি জাতীয়করণ করল। পরে ঘোষণা দিল এখন থেকে তারা নিজেদের ইউরেনিয়াম নিজেরাই আন্তর্জাতিক মার্কেটে বিক্রি করবে। ওরানো এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করল আন্তর্জাতিক শালিশী আদালতে।

​ঘটনা ৩: ২০২৩ সালে মালি এবং বুরকিনা ফাসো ফরাসি ভাষার সরকারি মর্যাদা চেঞ্জ করে দিল। দেশীয় ভাষাগুলোকে সরকারি মর্যাদা দেওয়া হলো। ফরাসি থাকল কাজের ভাষা। ২০২৫ সালে নাইজারও হাউসাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়ে দিল। ফরাসি এবং ইংরেজি থাকল কাজের ভাষা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো আফ্রিকা সঙ্গে পুরনো উপনিবেশিক সম্পর্কের বদলে আরো ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্বের কথা বললেন।

​তাহলে কি ফ্রান্স আফ্রিকা ছেড়ে দিচ্ছে? এখনো না। ভারত মহাসাগরে মাদাগাস্কারের কাছে কোমরস দ্বীপপুঞ্জ। তারই একটি দ্বীপ মায়োত। ১৯৭৪ সালের গণভোটে কোমরসের অধিকাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিল। কিন্তু মায়োতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দিল ফ্রান্সের সঙ্গে থাকার পক্ষে। ১৯৭৫ সালে কোমরস স্বাধীন হলো। মায়োত রয়ে গেল ফ্রান্সের অধীনে। আজ মায়োত ফ্রান্সের একটি বিভাগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ, যার মুদ্রা ইউরো।

আরো পড়ুন:মিশরীয় সভ্যতা হঠাৎ করে হারিয়ে গেল কেন?

​বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেরিটাইম চকপয়েন্ট বাবল মান্দাবের পাশেই যে দেশ জিবুতি, সেখানে ফ্রান্সের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি আছে। গ্যাবনের পুরোনো সামরিক ঘাঁটি পরিণত হইছে যৌথ সামরিক ট্রেনিং সেন্টারে। সাম্রাজ্য মানেই ম্যাপে আঁকা রঙিন দাগ না। তাই এরপর যখন শুনবেন কোনো দেশ স্বাধীন, তিনটি প্রশ্ন করবেন—সেই দেশের টাকাটা কে ছাপে? সেই দেশের সেনাবাহিনী কার কথায় ওঠে বসে? আর সেই দেশে অফিস আদালতের ফাইলগুলো লেখা হয় কোন ভাষায়? তো আজ এটুকুই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

a