পরিত্যাক্ত রাস্তা এখন পর্যটন কেন্দ্র
পৃথিবীতে কত অদ্ভুত রাস্তা রয়েছে। কিছু রাস্তা তৈরি হয় মানুষের যাতায়াত সহজ করতে। আবার কিছু রাস্তা হয়ে ওঠে রহস্যের একেকটি খোদাই করা অধ্যায়। ব্রাজিলের BR-230 বা ট্রান্স-অ্যামাজনিয়ান হাইওয়ে (Trans-Amazonian Highway) তেমনই একটি রাস্তা। এটিকে বিশ্বের অন্যতম মহাকাশজয়ী বা উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বলা চলে। আবার কেউ কেউ এটিকে বলেন এক ভয়ংকর ভুল।
এই রাস্তাটি আজ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। এর বিশাল একটি অংশ আজ পরিত্যক্ত। প্রকৃতির প্রবল শক্তি একে গ্রাস করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। চলুন, আজ এই অদ্ভুত রাস্তাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
আরো পড়ুন:৫ টি সমুদ্রের অভিশপ্ত দ্বীপগুলো
বিআর-২৩০ (BR-230) আসলে কী?
বিআর-২৩০ হলো ব্রাজিলের একটি দীর্ঘতম মহাসড়কগুলোর একটি। এটি মূলত ট্রান্স-অ্যামাজনিয়ান হাইওয়ে নামে বেশি পরিচিত। ১৯৭০ এর দশকে এই রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ব্রাজিলের তৎকালীন সামরিক সরকার এই বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেয়।
রাস্তাটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,২০০ কিলোমিটারের বেশি।
এটি ব্রাজিলের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু হয়ে বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে।
এর লক্ষ্য ছিল দেশটির ভেতরের অচেনা অংশগুলোকে সংযুক্ত করা।
কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই প্রজেক্ট শেষ পর্যন্ত এক দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। এর বহু অংশ আজ প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
কেন তৈরি করা হয়েছিল এই রাস্তা?
সরকারের পরিকল্পনা ছিল খুব বড়। তারা চেয়েছিল অ্যামাজনের ঘন জঙ্গলকে দেশের অর্থনীতির সাথে জুড়তে। ১৯৭০ এর দশকের স্লোগান ছিল— "এমন এক মানুষবিহীন জমির জন্য জমিহীন মানুষ।"
সরকার ভেবেছিল:
- দরিদ্র কৃষকদের এখানে জমি দেওয়া হবে।
- তারা জঙ্গল কেটে বসতি গড়বে।
- দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
- আন্দিজ পর্বতমালার কাছাকাছি পেরু পর্যন্ত যোগাযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু প্রকৃতি তাদের পরিকল্পনা সফল হতে দেয়নি। অ্যামাজনের উর্বর মাটি রাস্তা তৈরির জন্য উপযোগী ছিল না। তাছাড়া এখানকার আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল।
আরো পড়ুন :পৃথিবীর রহস্যময় স্থান যেখানে বিজ্ঞানী হার মেনেছে
প্রকৃতির সাথে লড়াই এবং পরাজয়
অ্যামাজনের জঙ্গল মানেই চরম চ্যালেঞ্জ। সেখানে রয়েছে অবিরাম বৃষ্টিপাত। বছরের পর বছর ধরে এখানে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তা যেকোনো পাকা রাস্তাকেও ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে।
বর্ষাকালে পুরো রাস্তাটি কর্দমাক্ত এক প্রাঙ্গণে পরিণত হয়। বড় বড় ট্রাক বা বাস সেখানে মাসের পর মাস আটকে থাকে। শুকনো মৌসুমে ধুলোবালিতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু অংশ আজ পুরোপুরি পরিত্যক্ত। গাছের শিকড় উঠে রাস্তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বুনো লতাপাতা আর ঘাস পুরো পিচ বা মাটি ঢেকে ফেলেছে।
"প্রকৃতি যেন তার হারানো জমি খুব দ্রুত নিজের দখলে ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিআর-২৩০ রাস্তাটি আজ তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।"
পরিবেশ ও আদিবাসীদের ওপর এর প্রভাব
এই রাস্তা তৈরির প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। এর নির্মাণকাজে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমিক নানা রোগে মারা যান। জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে ধ্বংস করা হয় শত শত বছরের পুরোনো ইকোলজি।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে স্থানীয় আদিবাসীদের।
- বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় তাদের সংস্কৃতি নষ্ট হয়।
- নতুন নতুন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ে আদিবাসীদের মধ্যে।
- বহু আদিবাসী সম্প্রদায় চিরতরে হারিয়ে গেছে।
পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই এই রাস্তার বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মতে, এই সড়কটি অ্যামাজন ধ্বংসের মূল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর ফলে নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণী নিধন শুরু হয়।
বর্তমান অবস্থা কেমন বিআর-২৩০ এর?
আজ বিআর-২৩০ হাইওয়ের সব অংশ একরকম নয়। এর কিছু অংশ পাকা করা হয়েছে। সেখানে গাড়ি চলে। মানুষ চলাচল করে।
কিন্তু এর ভেতরের বা পশ্চিমের বড় একটি অংশ সম্পূর্ণ অবহেলিত। সেখানে কোনো পিচের প্রলেপ নেই। পাকা সড়ক বলতে যা বোঝায়, তা সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি এখন কেবল একটি লাল মাটির সরু পথ। দুপাশে শুধু গহীন অরণ্য। কোনো সাহায্য পাওয়ার উপায় নেই শত শত কিলোমিটারের মধ্যে। ইন্টারনেট বা ফোনের নেটওয়ার্ক সেখানে কল্পনার বাইরে।
অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী ও বাইকাররা মাঝে মাঝে এই ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে ভ্রমণ করার চেষ্টা করেন। তাদের কাছে এটি এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। তবে সামান্য ভুলেই ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপত্তি।
কেন রাস্তাটি পরিত্যক্ত হয়ে গেল?
পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
- প্রচণ্ড বর্ষণ: অতিবৃষ্টির কারণে রাস্তার মাটি ধুয়ে মুছে যায়।
- অতিরিক্ত খরচ: এই বিশাল রাস্তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
- জনবসতির অভাব: রাস্তার পাশে স্থায়ী জনবসতি গড়ে তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মানুষ টিকতে পারেনি।
- অর্থনৈতিক সংকট: যে উদ্দেশ্যে রাস্তাটি বানানো হয়েছিল, তার সুফল অর্থনীতিতে আসেনি।
ফলে সরকার ধীরে ধীরে এই মেগা প্রজেক্টের পেছনের মনোযোগ সরিয়ে নেয়। একা একা ধুঁকতে থাকে বিআর-২৩০।
আরো পড়ুন : বিশ্বসেরাদের সংগ্রাম.
মানুষের অহংকার বনাম প্রকৃতির শক্তি
বিআর-২৩০ হাইওয়ে আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। মানুষ যতই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হোক না কেন, প্রকৃতির শক্তি সবসময় তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। জঙ্গলকে জোর করে কেটে রাস্তা বানিয়ে জয় করা যায় না। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে সবকিছু আবার গ্রাস করে নেয়।
আজকের দিনে বিআর-২৩০ কেবল একটি সড়ক নয়। এটি মানুষের অতিরিক্ত উচ্চাশা এবং প্রকৃতির প্রতিশোধের এক নীরব সাক্ষী। যারা এই রাস্তা দেখতে যান, তারা এর ভৌতিক ও নিঃসঙ্গ রূপ দেখে অবাক হয়ে যান।
ব্রাজিলের পরিত্যক্ত বিআর-২৩০ রাস্তাটি মানব ইতিহাসের এক আজব অধ্যায়। একদিকে এটি যেমন প্রকৌশলবিদ্যার এক বিশাল দুঃসাহসিক প্রয়াস, অন্যদিকে এটি এক পরিবেশগত ট্র্যাজেডি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির ওপর জোর করে কিছু করতে গেলে তার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
আপনি কি কখনো এমন কোনো রহস্যময় ও পরিত্যক্ত রাস্তায় ভ্রমণের সাহস করবেন, যেখানে চারদিকে শুধু অজানা বিপদ আর ঘন জঙ্গল?
