কলম আবিষ্কারের আসল ইতিহাস

কলম আবিষ্কারের আসল ইতিহাস

কলম আবিষ্কারের আশ্চর্য ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমান চালকদের সামনে এক অদ্ভুত কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক সমস্যা উপস্থিত হয়েছিল। যেমনই বিমান উঁচুতে পৌঁছাত, বাতাসের চাপ দ্রুত কমতে থাকত এবং তাদের ফাউন্টেন পেন হঠাৎ লিক করতে শুরু করত, অথবা ওড়ার সময় হাওয়াতেই কালি ছড়িয়ে পড়ত। মানচিত্রে সঠিক দাগ দেওয়া, দিকনির্দেশ লেখা—এইসব অত্যন্ত জরুরি কাজ হঠাৎ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সেনাবাহিনীর এমন একটি পেনের জরুরি প্রয়োজন ছিল, যা লিক না করে এবং বাতাসের চাপের তোয়াক্কা না করে যেকোনো উচ্চতায় নির্ভরযোগ্যভাবে লিখতে পারে।

​এর সমাধান এলো এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি নিজে প্রাণ বাঁচিয়ে ইউরোপ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। লাসলো বিরো নামের এই হাঙ্গেরির সাংবাদিক ইহুদি ছিলেন এবং যখন ইউরোপে নাৎসি শাসন ও ইহুদি-বিরোধী আইনের ছায়া ঘনিয়ে আসতে লাগল, তখন তিনি তাঁর ভাইয়ের সাথে আর্জেন্টিনা পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি এমন একটি পেন তৈরি করেন, যার মুখে একটি ছোট ঘূর্ণায়মান বল বা মার্বেল লাগানো ছিল; যা ঘন ও দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া কালিকে কাগজের ওপর সমভাবে ছড়িয়ে দিত—কোনো লিক না করে, বাতাসের চাপের পরোয়া না করে। ব্রিটিশ সরকার এই ডিজাইনের স্বত্ব কিনে নেয় এবং এই উদ্ভাবনই পরবর্তীতে রয়্যাল এয়ারফোর্সের বৈমানিকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে ওঠে।

​এটি হলো কলমের গল্প। সেই সাধারণ একটি যন্ত্রের গল্প, যা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি চুক্তি, প্রতিটি বিপ্লব এবং প্রতিটি প্রেমপত্রকে কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তুলেছে। কিন্তু এই গল্প বিরোরও হাজার বছর আগে শুরু হয়—প্রাচীন মিসরের মাটি থেকে।

​খাগের পেন (Reed Pen)-এরও আগে মানুষ লেখার অন্য একটি উপায় খুঁজে পেয়েছিল, যা কাগজে নয় বরং ভেজা মাটিতে কাজ করত। মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় মানুষ একটি ত্রিকোণাকার মুখের খাগড়াকে ভেজা মাটির ফলকে চেপে তীরের মতো বা পেরেকের মতো চিহ্ন তৈরি করত, যা আজকে আমরা কিউনিফর্ম লিপি নামে চিনি। এটি কোনো কালির পেন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি স্টাইলাস (stylus), যা রং ভরার বদলে চিহ্ন এঁকে দিত। কিন্তু এটিই ছিল সেই প্রথম হাতিয়ার, যা মানুষকে নিজের চিন্তাভাবনা চিরস্থায়ীভাবে কোনো তলে ফুটিয়ে তোলার শিল্প শিখিয়েছিল।

​মিসরীয়দের লেখার জন্য এমন একটি হাতিয়ারের প্রয়োজন ছিল, যা প্যাপিরাস গাছ থেকে তৈরি কাগজের মতো পাতায় সূক্ষ্ম চিহ্ন আঁকতে পারে। তারা এর সমাধান খুঁজে পেল নদীর তীরে গজে ওঠা খাগড়া গাছে। তারা একটি পাতলা খাগড়াকে ত্যাড়ছা করে কেটে তার মুখটি চোখা করত এবং সেটিকে কালিতে ডুবিয়ে হায়ারোগ্লিফিক লিপির জটিল চিহ্ন কাগজের ওপর ফুটিয়ে তুলত। এই খাগড়ের পেন প্রায় ৫,০০০ বছর ধরে মিসর, মেসোপটেমিয়া এবং আশেপাশের সভ্যতাগুলোতে লেখার প্রধান মাধ্যম ছিল।

​প্রায় একই সময়ে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চীনে লেখার সম্পূর্ণ আলাদা একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠছিল। চীনা সভ্যতা খাগড়া বা ধাতুর মুখের বদলে পশুর চুল বা পশম দিয়ে তৈরি একটি নরম ব্রাশ গ্রহণ করেছিল, যা সাধারণত বাঁশের পাতলা কাঠিতে বাঁধা হতো। এই ব্রাশকে জমাট কালির একটি কাঠি বা বার-কে পাথরের একটি বিশেষ পাত্রে জলের সাথে ঘষে তৈরি করা কালিতে ডোবানো হতো। এই ব্রাশ, কালির কাঠি, কালি ঘষার পাত্র এবং কাগজ—এই চারটি জিনিসকে চীনা পণ্ডিতদের ঐতিহ্যে 'অধ্যয়ন কক্ষের চার ধন' বলা হয়ে এসেছে। ব্রাশ দিয়ে লেখার এই কৌশল কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি নিজের মধ্যেই একটি শিল্পের মর্যাদা রাখত; যাকে আজও ক্যালিগ্রাফি বা সুলেখ নামে একটি অত্যন্ত সম্মানিত ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয়।

​কিন্তু যেমন যেমন ইউরোপে লেখার প্রচলন বাড়ল, সেখানে প্যাপিরাস সহজে পাওয়া যেত না; কারণ এই গাছটি মূলতঃ মিসরের নীল নদ উপত্যকাতেই জন্মাত। এর পরিবর্তে ইউরোপে পশুর চামড়া থেকে তৈরি টেকসই লেখার তল 'পার্চমেন্ট' (চর্মপত্র) বেশি প্রচলিত হয়ে গেল। কিন্তু পার্চমেন্টের উপরিভাগ প্যাপিরাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত ও অমসৃণ ছিল এবং তার ওপর খাগড়ের কঠোর মুখ ঠিকমতো চলত না, প্রায়ই ছিঁড়ে যেত। এই কারণেই এক নতুন ধরনের হাতিয়ারের প্রয়োজন অনুভূত হতে লাগল—এমন একটি হাতিয়ার, যা খাগড়ের চেয়ে বেশি নরম এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে লিখতে পারে। এর সমাধান মিলল পাখির পালকে।

​ষষ্ঠ শতাব্দীর কাছাকাছি ইউরোপে পালক দিয়ে তৈরি পেন, যাকে 'কুইল' (Quill) বলা হয়, ব্যবহার হতে শুরু করল। সাধারণত রাজহাঁসের পালক ব্যবহার করা হতো; যদিও রাজহাঁসের পালককে অনেক বেশি উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান মনে করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, ডানহাতি লেখকদের জন্য পাখির বাঁ দিকের পালক ব্যবহার করা বেশি ভালো মনে করা হতো, কারণ তার প্রাকৃতিক বাঁক লেখার সময় হাতের বাইরের দিকে হেলে থাকত, যার ফলে লিখতে সুবিধা হতো। পালকের মুখকে একটি বিশেষ ছুরি দিয়ে বারবার চাঁচতে হতো, যাকে 'পেন-নাইফ' (Penknife) বলা হতো; আর এখান থেকেই আজকের পকেট নাইফের জন্য ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দটি এসেছে।

​কুইল পেন পরবর্তী প্রায় ১,০০০ বছর ধরে ইউরোপ ও তার উপনিবেশগুলোতে লেখার প্রধান মাধ্যম হয়ে রইল। ইতিহাসের বহু বড় বড় দলিল—তা ইংল্যান্ডের 'ম্যাগনা কার্টা' হোক বা আমেরিকার 'স্বাধীনতার ঘোষণা'—এই নাজুক পালকের মুখ দিয়েই লেখা হয়েছিল। এত বড় চাহিদা মেটাতে ইউরোপে রাজহাঁস পালনের একটি আস্ত শিল্প গড়ে উঠেছিল, কারণ একজন ভালো লেখকও একটি কুইল পেনকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘষে নষ্ট করে ফেলতেন। সেই যুগের কালিতে প্রায়ই লোহার উপাদান থাকত, যা কাগজে স্থায়ীভাবে বসে তো যেত, কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে কাগজকে ভেতর থেকে দুর্বলও করে দিত। এই কারণেই আজ জাদুঘরে রাখা অনেক পুরনো পান্ডুলিপি লেখার চারপাশ থেকে কিছুটা ঝলসানো বা পোড়া বলে মনে হয়। 

​কুইল পেনেরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ছিল। পালক দ্রুত ক্ষয়ে যেত, বারবার চাঁচতে হতো এবং আর্দ্রতায় বেঁকে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। ১৯ শতকের শুরুতে এই সমস্যার সমাধান বের হলো স্টিলে। ধাতুর পাতলা, নমনীয় মুখের পেন তৈরি হতে শুরু করল, যা বারবার চাঁচার প্রয়োজন হতো না এবং যা ছিল অনেক বেশি টেকসই। ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহর এই নতুন শিল্পের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠল, যেখানে জোসেফ গিলেট-এর মতো নির্মাতারা স্টিলের মুখ তৈরির প্রযুক্তিকে এত উন্নত করে তোলেন যে, ১৯ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ একা বার্মিংহাম শহরই বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি স্টিল পেনের মুখ উৎপাদন করতে শুরু করে। সস্তা ও টেকসই স্টিল পেন ধীরে ধীরে শতাব্দীর পুরনো কুইল পেনের জায়গা করে নিল।

​তা সত্ত্বেও একটি বড় সমস্যা থেকে গিয়েছিল। এই পেনগুলোকে বারবার কালির দোয়াতে ডোবাতে হতো, যার ফলে লেখার কাজ বারবার ব্যাহত হতো এবং কালির ফোটা কাগজে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকত। এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা বহু শতাব্দী ধরে চলছিল, কিন্তু আসল সাফল্য এলো ১৮৮৪ সালে; যখন আমেরিকার এক বীমা এজেন্ট লুইস ওয়াটারম্যান এমন একটি পেন ডিজাইন করলেন, যার ভেতরে কালির একটি ছোট ট্যাঙ্কি থাকত এবং একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বায়ুনালী থাকত যা কালির প্রবাহকে সমান রাখত—যাতে তা খুব দ্রুতও না বয়, আবার চলেও না থামে।

​একটি বিখ্যাত গল্প অনুযায়ী, ওয়াটারম্যান এই উদ্ভাবনের অনুপ্রেরণা তখন পেয়েছিলেন, যখন একটি জরুরি চুক্তির সময় তাঁর পুরনো ফাউন্টেন পেনটি লিক করে যায় এবং কালিতে পুরো চুক্তিপত্রটি নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে তাঁর হাত থেকে একটি বড় চুক্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। যদিও এই গল্পের পুরো সত্যতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু ওয়াটারম্যানের ডিজাইন সত্যিই ফাউন্টেন পেনকে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এবং আশির দশকের পরের দশকে এটি বিশ্বজুড়ে অফিস, স্কুল ও বাড়ির সবচেয়ে সাধারণ প্রয়োজনে পরিণত হলো।

​এখন আবার ফিরে আসা যাক সেই গল্পে, যেখান থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। লাসলো বিরো পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন এবং পত্রিকার প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করার সময় তিনি একটি চমৎকার বিষয় খেয়াল করেন। পত্রিকা ছাপানোর কালি খুব দ্রুত শুকিয়ে যেত এবং কাগজে ছড়াতও না—ফাউন্টেন পেনের কালির বিপরীতে, যা প্রায়ই ধীরে শুকাত এবং সহজে ছড়িয়ে পড়ত। বিরো ভাবলেন, যদি এই ধরনের ঘন কালি কোনো পেনে ব্যবহার করা যায়, তবে একটি উন্নততর লেখার হাতিয়ার তৈরি করা সম্ভব।

​তিনি তাঁর ভাই গিওর্গ বিরোর সাহায্য নেন, যিনি পেশায় রসায়নবিদ ছিলেন। দুই ভাই মিলে এমন একটি পেন ডিজাইন করেন, যার মুখে একটি অত্যন্ত ছোট ধাতব বল ঘুরত; যা কাগজের ওপর চলার সময় ট্যাঙ্কি থেকে ঘন কালি টেনে নিয়ে সমান স্তরে ছড়িয়ে দিত। ১৯৩৮ সালে তারা হাঙ্গেরিতে এর পেটেন্ট করান। কিন্তু সেই বছরই ইউরোপে ইহুদি-বিরোধী পরিবেশ এত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে, বিরো পরিবারকে নিজের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। প্যারিস হয়ে অবশেষে তারা আর্জেন্টিনায় পৌঁছান, যেখানে তারা তাঁদের উদ্ভাবনকে আরও উন্নত করে ১৯৪৩ সালে একটি নতুন পেটেন্ট লাভ করেন।

​ব্রিটিশ সরকার শীঘ্রই এই উদ্ভাবনের খবর পায় এবং তারা অবিলম্বে এর স্বত্ব কিনে নেয়; কারণ তাদের বৈমানিকদের উঁচুতে নির্ভরযোগ্যভাবে লেখার মতো একটি পেনের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। এইভাবে এক ইহুদি শরণার্থীর উদ্ভাবন সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে কাজে আসতে শুরু করল।

​যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই প্রযুক্তির খবর আমেরিকাও পৌঁছায়, যেখানে এক ব্যবসায়ী উপযুক্ত অনুমতি ছাড়াই এর নকশা নকল করে বিক্রি করতে শুরু করেন। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে নিউ ইয়র্কের একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যখন এই নতুন পেন বিক্রি শুরু হয়, তখন মানুষের ভিড় এত বেড়ে গিয়েছিল যে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। প্রত্যেকেই এই আশ্চর্যজনক পেনটি কিনতে চেয়েছিল, যা বারবার কালি না ভরেও সপ্তাহজুড়ে চলতে পারত। কিন্তু তাড়াহুড়োয় তৈরি এই পেনগুলো তখনও অসম্পূর্ণ ছিল, প্রায়ই দাগ ফেলে দিত বা হঠাৎ লেখা বন্ধ করে দিত; আর দামও ছিল সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। প্রাথমিক উৎসাহ শীঘ্রই থিতিয়ে গেল।

​আসল সাফল্য এলো ফরাসি ব্যবসায়ী মার্সেল বিক (Marcel Bich)-এর মাধ্যমে। তিনি বিরোর কাছ থেকে এই ডিজাইনের স্বত্ব কিনে নেন এবং এটিকে অত্যন্ত সস্তায় বিপুল পরিমাণে তৈরি করা শুরু করেন। ১৯৫০ সালে তিনি 'BIC Cristal' নামে এমন একটি পেন বাজারে আনেন, যা এত সস্তা ছিল যে সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারের পর ফেলেও দিতে পারত। এই ডিসপোজেবল বলপয়েন্ট পেন আজও পৃথিবীর প্রতিটি কোণায়—স্কুলের ব্যাগ থেকে শুরু করে অফিসের টেবিল পর্যন্ত—সবচেয়ে সাধারণ ও সস্তা লেখার হাতিয়ার হয়ে রয়েছে।

​২০ শতকে ফাউন্টেন পেন কেবল একটি লেখার হাতিয়ার হয়ে থাকেনি, বরং মর্যাদা ও কারুশিল্পের প্রতীক হয়ে ওঠে। জার্মানির মন্টব্লাঙ্ক (Montblanc)-এর মতো কোম্পানিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম নকশা করা, সোনার নিব এবং দামি ধাতুতে সাজানো ফাউন্টেন পেন তৈরি করা শুরু করে; যা প্রায়ই বড় ব্যবসায়িক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বা বিশেষ উপলক্ষে উপহার দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতে থাকে। এই পেনগুলো এখন কেবল লেখার জন্য নয়, বরং মালিকের মর্যাদা জাহির করার জন্যও কেনা হতে লাগল। কিছু বিরল ও সীমিত সংস্করণের ফাউন্টেন পেন আজ নিলামে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

​২০ শতকের শেষের দশকগুলোতে কালির প্রযুক্তিতে আরও একটি চমৎকার পরিবর্তন এলো। ১৯৮৪ সালে জাপানের 'সাকুরা কালার প্রোডাক্টস' কোম্পানি বিশ্বের প্রথম জেল পেন বাজারে আনে, যাতে জল-ভিত্তিক ঘন জেলের মতো কালি ব্যবহার করা হতো; যা বলপয়েন্ট পেনের চেয়ে মসৃণ লেখার অনুভূতি দিত এবং কাগজে রংও অনেক গাঢ় ছাড়ত। এই প্রযুক্তি বিশেষ করে তাদের মধ্যে জনপ্রিয় হলো, যারা রঙিন বা বিশেষ ধরনের কালি পছন্দ করতেন; এবং আজও জেল পেন বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের পছন্দের জিনিসগুলোর মধ্যে অন্যতম।

​আজ বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর শত শত কোটি বলপয়েন্ট পেন তৈরি ও ব্যবহার করা হয়—এত বিপুল পরিমাণ যে এর সঠিক হিসাব রাখাও কঠিন। ভারত নিজেই বিশ্বের অন্যতম বড় পেন বাজারের একটি, যেখানে প্রতিটি ছোট-বড় শহরে সস্তা বলপয়েন্ট পেন তৈরির কারখানা রয়েছে। যে জিনিসটি একসময় কেবল রাজা-বাদশা ও পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা প্রতিটি স্কুলপড়ুয়ার ব্যাগে, প্রতিটি পকেটে এবং প্রতিটি টেবিলের ড্রয়ারে কোনো বিশেষ গুরুত্ব ছাড়াই পড়ে থাকে।

​পেনের ইতিহাস কেবল প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোরও সাক্ষী। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন অবশেষে শেষ হলো, তখন আমেরিকান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার জাপানের আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য একের পর এক কয়েকটি আলাদা পেন ব্যবহার করেন—প্রতিটি কয়েকটি অক্ষরের পর পেন বদলে ফেলেছিলেন; যাতে প্রতিটি পেনকে আলাদা আলাদা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থাকে স্মারক হিসেবে উপহার দেওয়া যায়। এই ঐতিহ্য পরবর্তীতে আমেরিকার প্রধানদের মধ্যেও প্রচলিত হয়ে যায়—যখনই কোনো বড় ও ঐতিহাসিক আইন পাস হতো, রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকটি পেন ব্যবহার করতেন, যাতে প্রতিটি পেন সেই আইনের লড়াইয়ে শামিল থাকা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে উপহারস্বরূপ দেওয়া যায়।

​একটি ছোট্ট হাতিয়ার, যা হাতের তালুতে এঁটে যায়, সেটিই শতাব্দী ধরে এটি নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছে যে মানব সভ্যতার পরবর্তী অধ্যায় কোন দিকে লেখা হবে। আরও একবার উঁচুতে ওড়া সেই বিমানের কথা ভাবুন, যেখানে এক বৈমানিকের ফাউন্টেন পেন থেকে কালি ছড়িয়ে পড়ছিল। আর সেই মুহূর্তটির কথাও ভাবুন, যখন লাসলো বিরো তাঁর পরিবারের সাথে নিজের দেশ, নিজের ঘর, নিজের পরিচয়—সবকিছু পেছনে ফেলে এক অজানা মহাদেশের দিকে পালাচ্ছিলেন। তিনি হয়তো ধারণাও করতে পারেননি যে তাঁর সেই ছোট্ট ঘূর্ণায়মান বলটি, যা তিনি কেবল একটি উন্নত পেন তৈরির জন্য ডিজাইন করেছিলেন, পরবর্তীতে কোটি কোটি মানুষের হাতের সবচেয়ে সাধারণ ও নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে উঠবে।

​মাটির ফলকে আঁকা প্রথম চিহ্ন থেকে শুরু করে খাগড়া পর্যন্ত; খাগড়া থেকে পালক পর্যন্ত; পালক থেকে স্টিল পর্যন্ত; স্টিল থেকে কালির ট্যাঙ্কি পর্যন্ত; এবং অবশেষে এক শরণার্থীর পকেটে লুকিয়ে থাকা এক ছোট গোলক পর্যন্ত—মানুষের গল্প লেখার এই যাত্রা কখনো থামেনি। প্রতিটি সভ্যতা নিজের মতো করে এই একটি প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছে: নিজের ভেতরের চিন্তাকে বাইরে, কোনো তলে, চিরকালের জন্য কীভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়? হয়তো এটিই পেনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শব্দ, সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত এবং সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলো প্রায়শই সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে সাধারণ হাতিয়ারগুলো থেকেই জন্ম নেয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন