আদর্শ হিন্দু-হোটেল – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় free pdf



আদর্শ হিন্দু-হোটেল – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় free

মানুষ কখন বুড়ো হয় জানেন?বয়স বাড়লেই কি মানুষ বুড়ো হয়ে যায়?বয়স কেবলই সংখ্যা মাত্র। বরং মানুষ বুড়ো হয়ে ওঠে তখন, যখন তারা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়। যখন তাদের জীবন থেকে উদ্যম, আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়। যাদের জীবনে উদ্যম নেই, পূরণ করার মতো কোনো স্বপ্ন নেই, তাদের জীবন বড়ই কষ্টকর।

আবার একজন মাঝবয়সী মানুষের চোখেও যখন স্বপ্ন খেলা করে, সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে ছুটে চলে তার স্বপ্নের পথে, তখন তারুণ্যের শক্তি এসে ভর করে তার শরীরে।

আসলে সাফল্যের কোনো বয়স নেই।

​'আদর্শ হিন্দু হোটেল'—প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত তেমনি এক সফলতার গল্প। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত এই সময়ের পটভূমিতে লেখা তৎকালীন একজন মাঝবয়সী দরিদ্র রসুইয়ে বামুনের শূন্য থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। যার দু চোখে রয়েছে স্বপ্ন, আছে তীব্র আত্মবিশ্বাস, তারুণ্যের শক্তি আর সততাকে পুঁজি করে স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষা।

​বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে যে কত অমূল্য রত্ন লুকিয়ে আছে, সে খবর হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। বিভূতিভূষণের এই বইটাও একটা অমূল্য রত্ন। দারুণ অনুপ্রেরণামূলক এই বইটা সম্পর্কে বিস্তারিত আরও আলোচনা করব, তবে তার আগে চলুন সংক্ষেপে জেনে আসি গল্পটা সম্পর্কে।

আদর্শ হিন্দু হোটেলের কাহিনি সংক্ষেপ

​পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার একটা মহকুমা শহর রানাঘাট। এই রানাঘাটেরই রেল বাজারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বেচু চক্কোত্তি আর যদু বারুজ্জের দুইটি আদি ও অকৃত্রিম হিন্দু হোটেল। স্টেশনে ট্রেন এসে থামা মাত্রই দুই হোটেলের চাকরদের মাঝে শুরু হয়ে যায় খদ্দের ধরার প্রতিযোগিতা। চাকররা একে অন্যের আগে খদ্দেরদের বগলদাবা করার জন্য উচ্চস্বরে হাঁকতে থাকে—"আসুন বাবু গরম ভাত তৈরি, মাছের ঝোল, ডাল-তরকারি ভাত, হিন্দু হোটেল বাবু।"

অস্থায়ী এই খুচরা খদ্দেরদের নিয়ে দুই হোটেলের কাড়াকাড়ি থাকলেও বাঁধা খদ্দেরদের বেশিরভাগই কিন্তু বেচু চক্কোত্তির হোটেলেই আসে। তবে তা অবশ্য হোটেলের গুণে নয়, বরং হোটেলের খাবারের লোভে। এই হোটেলেরই একজন রসুইয়ে বামুন বা বর্তমান সময়ের চলতি ভাষায় বলতে গেলে হোটেলের রাঁধুনি হাজারী ঠাকুর। ৪৬ বছর বয়সী, জাতের ব্রাহ্মণ, কোমল স্বভাবের এই হাজারী দেবশর্মা চক্রবর্তী আমাদের এই গল্পের নায়ক।

​বছর পাঁচেক আগে এই রানাঘাটে চাকরির খোঁজে এসেছিল হাজারী ঠাকুর। গ্রামের একজন সেকালের প্রাচীনা ব্রাহ্মণ বিধবার কাছ থেকে হাজারীর মা নিরামিষ চচ্চড়ি রাঁধতে শিখেছিল। সে একটি জিনিস রাঁধবার গুণেই হাজারীর মায়ের নাম ওদিকের আট-দশখানা গ্রামে প্রসিদ্ধ ছিল। মায়ের রন্ধন প্রতিভা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিল হাজারী ঠাকুর। সেই থেকেই রান্নার কাজই তার ধ্যান-জ্ঞান।

রানাঘাটে এসে তাই সাত টাকা মাইনে, দুবেলা খাওয়া আর বছরে দুখানা কাপড়ের চুক্তিতে বেচু চক্কোত্তির হোটেলে রান্নার কাজ নেয় হাজারী ঠাকুর। মাছ, মাংস সবই রাঁধে ভালো, কিন্তু তার হাতের নিরামিষ চচ্চড়ি এতই চমৎকার যে বেচু চক্কোত্তির হোটেলে একবার যে খায়, সে আবার ঘুরে সেখানেই আসে।

​এই পাঁচ বছরে খদ্দেরদের মুখের প্রশংসা ছাড়া হাজারীর ব্যক্তিগত লাভ বিশেষ কিছু নেই। বেতন তো বাড়েনি এক পয়সাও, উল্টো নানা সময়ে অকারণে মালিক তার বেতন কাটে। হাজারীর রান্নার যে এত সুখ্যাতি সেটার কোনো যেন গুরুত্বই নেই হোটেল মালিকের কাছে। উল্টো সেই সুখ্যাতির জন্য হোটেলের ঝি পদ্মর চোখের বিষ এই হাজারী ঠাকুর।

​ভালো মানুষ হাজারী ঠাকুর দিনভর খাটুনির পরেও চাকরির উন্নতি তো দূরের কথা, তারা তার সুখ্যাতি পর্যন্ত করতে জানে না। বরং দোষগুলো সব তার ঘাড়ে চাপিয়ে পদে পদে হেনস্তা করে। পদ্ম ঝি পারে তো তাকে আঁশবঁটি পেতে কোটে।

​পদ্ম ঝিয়ের প্রতি আলাদা একটা কি যেন টান রয়েছে বেচু চক্কোত্তির। সেই ক্ষমতাতেই ঝি হয়েও পদ্ম যেন হোটেলের কর্তী হয়ে আছেন। বাজার থেকে সস্তায় কিনে আনা বাসি-পচা সবজি, রেল চালানি বরফ দেওয়া সস্তা মাছ, পচা দই কিংবা মসুরির ডালের সাথে কম দামের খেসারি ডাল কিংবা ভাতের মাড় মিশিয়ে গ্রাহকদের খাওয়াতে বাধ্য করে পদ্ম ঝি। তার ওপরে কাস্টমারদের থেকে পয়সা খসানোর নানা ধরনের ফন্দিফিকির তো আছেই। আবার হোটেলের বেঁচে যাওয়া খাবারের সিংহভাগই চলে যায় পদ্ম ঝিয়ের বাড়ি। এত যে কষ্ট করে হাজারী ঠাকুর রাঁধে, দিন শেষে সেসব খাবারের বিশেষ কিছু অবশিষ্ট থাকে না আর তার জন্য। অধিকাংশ দিনই আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় তাকে।

​পদ্ম ঝিয়ের এ সকল অপকর্ম মোটেও পছন্দ না হাজারী ঠাকুরের, কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস নেই তার। রান্না তো তার কাছে কেবল পয়সা উপার্জনের মাধ্যমই নয়, তার অনেক সাধনার প্রাপ্ত ফসল।

​হাজারীর অনেক দিনের ইচ্ছে তার একটা ভাতের হোটেল হবে। হোটেলের বাইরে লেখা থাকবে—'হাজারী চক্রবর্তীর হিন্দু হোটেল, রানাঘাট। ভদ্রলোকদের সস্তায় আহার ও বিশ্রামের স্থান। আসুন, দেখুন, পরীক্ষা করুন।' যেখানে থাকবে না হোটেল মালিকের দৌরাত্ম্য কিংবা পদ্ম ঝিয়ের মুখঝামটা। বাজারের সেরা সব পণ্য কিনে ইচ্ছেমতো নিজের হাতে মন ভরে রাঁধবে সে। সেই রান্না করা খাবারগুলো খদ্দেররা তৃপ্তি নিয়ে খাবে আর তা দেখে প্রাণ জুড়াবে হাজারী ঠাকুরের। কাস্টমারদের সাথে কোনো জোচ্চুরি করবে না সে, বাসি-পচা খাওয়াবে না তাদের। পকেটে পয়সা না থাকলেও খালি পেটে তার হোটেলে কেউ এলে ফিরে যাবে না না খেয়ে। ব্যবসাই তো সব নয়, নিজের আত্মার শান্তিই হলো বড় কথা। বিশ্রামের জন্যও জায়গা থাকবে তার হোটেলে। দূরের যাত্রীরা খাবার শেষে শুয়ে-বসে আরাম করবে সেখানে। তার হোটেলের নিয়ম থাকবে—খাও-দাও, বিশ্রাম করো, তামাক খাও, চলে যাও।

​হাজারীর দুচোখ ভরা স্বপ্ন, কর্মোদ্যম আর সুনাম থাকলেও পকেটে তার নেই কোনো মূলধন। এই মাঝবয়সী তারুণ্যে উজ্জীবিত লোকটার প্রবল ইচ্ছা নিজের হোটেল খোলার। হোটেল খুলে মরে গেলেও যে তার আর কোনো দুঃখ থাকবে না। কিন্তু সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র এই ব্রাহ্মণ কী করে খুলবে নিজের হোটেল? প্রতি পদেই যে অপেক্ষা করছে নানাবিধ বাধাবিপত্তি এই মিষ্টভাষী লোকটার জন্য। হাজারী ঠাকুরের শূন্য থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার বাকি গল্পটা জানতে হলে পড়ে ফেলুন 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'।

বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্রের পরে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সাহিত্যিক বলা হয়ে থাকে বিভূতিভূষণকে। 'পথের পাঁচালী' খ্যাত এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক তার বেশিরভাগ লেখনিতে সাধারণত পল্লিজীবনের নিসর্গ রূপায়ণ ও সমকালীন নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনচিত্র উন্মোচিত করেছেন। 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' গল্পেও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই গল্পের মূল প্লটটা শহরকেন্দ্রিক। শহরের কোলাহল, প্ল্যাটফর্মে রেলযাত্রীদের আনাগোনা, খদ্দের নিয়ে দুই হোটেলের রেষারেষি, রেলের ঘণ্টা যেমন আপনার কানে বাজবে, তেমনি আবার একই সাথে সবুজে ঘেরা পল্লিগ্রাম, মেঠোপথে পায়ে ধূলি মেখে হেঁটে চলা বহুদূর, পল্লিগাঁয়ের মানুষদের সরল জীবন আর তাদের অতিথি পরায়ণতায় আপনার প্রাণ জুড়াবে।

বিভূতিভূষণের গল্পের চরিত্রগুলো খুবই হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই চরিত্রগুলোকে বেশ আপন করে নেওয়া যায়। এই গল্পের হাজারী ঠাকুর চরিত্রটাও তেমন। গ্রামে স্ত্রী-কন্যাকে রেখে শহরে রাঁধুনির কাজ করা এই বামুন ঠাকুরের চরিত্রটা আপনাকে খুব টানবে। মানুষকে কি করে আপন করে নেওয়া যায়, দারিদ্র্যতা, গঞ্জনা, অবহেলাকে পাশ কাটিয়ে সততা আর নিজের সৎ কাজগুলো দিয়ে অন্যদেরকে কি করে প্রভাবিত করা যায়, কি করে সুনাম অর্জন করে তাকে আগলে রাখতে হয় এবং সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের লালিত স্বপ্নটাকে কিভাবে বাস্তবে রূপান্তর করা যায়—এ সবই শেখাবে আপনাকে হাজারী ঠাকুর।

​গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় হাজারী ঠাকুর আপনাকে আটকে রাখবে নিজের সাথে, বাধ্য করবে তার গল্পটা পড়তে। আপনি খুব সহজেই অনুভব করতে পারবেন হাজারীর অনুভূতিগুলো। পুরো গল্পটা জুড়ে একটা সূক্ষ্ম ভয় অনুভব করবেন—এই বুঝি হাজারীর এত কষ্টে গড়া স্বপ্নটা কেউ এসে ভেঙে দিয়ে গেল! মাঝে মাঝে মনে হবে হাজারী এত বোকা কেন!

​বিভূতিভূষণের গল্প বলার ভঙ্গি ও বর্ণনাকৌশল বেশ প্রাঞ্জল এবং এতই প্রাণবন্ত যে আপনাকে মুগ্ধ করবে। অবান্তর কোনো চরিত্র নেই, নেই অপ্রয়োজনীয় কোনো বাক্য। গল্পটা সাধু ভাষায় লেখা হলেও পড়তে কোনো সমস্যা হবে না। যারা ক্লাসিক উপন্যাস কিংবা অনুপ্রেরণামূলক গল্প পড়তে পছন্দ করেন তারা পড়ে দেখতে পারেন বইটি। আশা করি ভালো লাগবে আপনাদের।

আদর্শ হিন্দু হোটেল বইয়ের মূল্য

​'আদর্শ হিন্দু হোটেল' বইটি ১৯৪০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় একই নামের সিনেমা। যেহেতু এটা একটা চিরায়ত উপন্যাস, তাই বর্তমান সময়ে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বইটি মুদ্রিত হয়। এই আর্টিকেল লেখার জন্য আমরা যে বইটি ব্যবহার করেছি সেটা 'প্রচলন প্রকাশন' থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২১-এ প্রকাশিত। তাদের কাগজ ও ছাপার মান, বর্ণবিন্যাস এবং প্রচ্ছদ অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তাদের প্রোডাকশন কোয়ালিটি ভালো এবং দামও তুলনামূলকভাবে কম। বাজারে এর চেয়েও ভালো প্রোডাকশনের বই রয়েছে।

​বাজারে প্রাপ্ত বইগুলোর মূল্য, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও এর প্রোডাকশনের মান প্রকাশনী ভেদে ভিন্ন। সাধারণ মানের বইগুলো ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে এবং একটু ভালো মানের বইগুলো ১৫০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে কিনতে পারবেন।


আদর্শ হিন্দু হোটেল উপন্যাসের বিষয়বস্তু

​কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও বাস্তবধর্মী উপন্যাস ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ (১৯৪০)। গ্রামীণ প্রকৃতির রূপকার হিসেবে খ্যাত বিভূতিভূষণ এই উপন্যাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, সততা এবং স্বপ্নের জয়গান তুলে ধরেছেন। জাহিদ নোটস-এর পাঠকদের জন্য উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।

​উপন্যাসটির পটভূমি রানাঘাট রেলস্টেশনের কাছাকাছি অবস্থিত বেচু চক্কোত্তির ভাতের হোটেল। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়, বরং বিশ শতকের প্রথমার্ধের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের টিকে থাকার বাস্তব দলিল।

​হাজারী চক্রবর্তীর জীবনসংগ্রাম: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারী ঠাকুর একজন মধ্যবয়সী ব্রাহ্মণ রাঁধুনি। বেচু চক্কোত্তির হোটেলে তিনি সামান্য বেতনে কাজ করেন। হোটেলের পরিচালিকা পদ্ম ঝিয়ের অকারণ গঞ্জনা ও লাঞ্ছনা সহ্য করেও তিনি রান্নার কাজকে শিল্প ও উপাসনার মতো ভালোবেসে যান।

আদর্শ হিন্দু হোটেল থেকে কী শেখা যায়

​সততা ও নিষ্ঠা: হাজারী ঠাকুর বিশ্বাস করতেন ভোজনরসিক মানুষদের তৃপ্তিভরে খাওয়ানোই একজন পাচকের পরম ধর্ম। হাজারো বঞ্চনার মাঝেও তিনি কোনোদিন তাঁর পেশাগত সততা ও আন্তরিকতা হারাননি।

​স্বপ্নের বাস্তবায়ন ও উত্তরণ: হাজারীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল নিজের একটি আদর্শ হোটেল প্রতিষ্ঠা করা। সততা, রান্নার অসাধারণ দক্ষতা এবং কুসুম ও অতসীর মতো শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় তিনি রানাঘাটে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হাজারী চক্রবর্তীর আদর্শ হিন্দু হোটেল’। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি একজন অবহেলিত রাঁধুনি থেকে সফল হোটেল মালিকে রূপান্তরিত হন।

​মানবিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধ: উপন্যাসটিতে জটিল মানসিক দ্বন্দ্বের চেয়ে সহজ-সরল মানবিক সম্পর্কের টান বেশি দেখা যায়। শত অন্যায়ের শিকার হয়েও হাজারী ঠাকুর বেচু চক্কোত্তি বা পদ্ম ঝিয়ের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হননি, বরং নিজের সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও ঔদার্য ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

 কাদের এই "আদর্শ হিন্দু হোটেল" পড়া উচিত বা পড়বেন?

​বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ এমন একটি ধ্রুপদী সাহিত্য, যা যে কোনো বয়সের এবং রুচির পাঠকের জন্যই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে বিশেষ কিছু পাঠকগোষ্ঠীর জন্য বইটি পাঠের অভিজ্ঞতা হতে পারে অনন্য:

​স্বপ্নবাজ ও উদ্যোক্তা পাঠক: যারা শূন্য থেকে শুরু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য হাজারী ঠাকুরের গল্পটি এক দারুণ অনুপ্রেরণা। সততা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা ধরে রেখে কীভাবে সফল হওয়া যায়, তা বইটি চমৎকারভাবে শেখায়।

​বাস্তবধর্মী সাহিত্যের অনুরাগী: যারা জটিল তত্ত্ব বা অলীক কল্পনার বদলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন এবং জীবনসংগ্রামের গল্প পড়তে পছন্দ করেন।

​বাংলা ক্লাসিকের পাঠক: বিভূতিভূষণের বিখ্যাত গ্রামীণ প্রকৃতির বাইরে রানাঘাট ও ব্রিটিশ আমলের রেলকেন্দ্রিক সমাজের ছবি ও মানবিক সম্পর্কের রস আস্বাদন করতে চাইলে এটি আদর্শ বই।

​হতাশায় ভোগা পাঠক: যারা কঠিন পরিস্থিতি বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানসিক চাপে রয়েছেন, তারা হাজারী ঠাকুরের ধৈর্য ও সংযম দেখে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাবেন।

​মূলত যারা সহজ-সরল ভাষায় লেখা একটি আশাবাদী, নীতিবান ও মানবিক উত্তরণের গল্প পড়তে চান, তাদের সবারই বইটি পড়া উচিত।

​আদর্শ হিন্দু হোটেল মূলত দেখায় যে মানুষের মেধা, নিষ্ঠা ও কর্মের প্রতি ভালোবাসা থাকলে তীব্র দারিদ্র্য এবং সামাজিক লাঞ্ছনাকে জয় করে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করা সম্ভব। হাজারী চক্রবর্তীর জীবনযাত্রা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী বিজয়ের প্রতীক।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন