ক্যালকুলেটটে ক্রমিক সংখ্যা নিচ থেকে উপরে কিন্তু মোবাইলে উল্টো কেন

 

ক্যালকুলেটটে ক্রমিক সংখ্যা নিচ থেকে উপরে কিন্তু মোবাইলে উল্টো কেন

ক্যালকুলেটর এবং মোবাইল ফোনের ডায়াল প্যাড—উভয়ই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, ক্যালকুলেটরের সংখ্যাগুলো নিচ থেকে উপরে সাজানো (১, ২, ৩ থাকে নিচে), অথচ মোবাইলের ফোন ডায়ালারে সংখ্যাগুলো শুরু হয় উপর থেকে (১, ২, ৩ থাকে উপরে)?

​এই সাধারণ পার্থক্যের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তিগত বিবর্তন, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং ব্যবহারের সুবিধার এক দীর্ঘ ইতিহাস। নিচে এই বৈসাদৃশ্যের কারণগুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

​১. ক্যালকুলেটরের নকশা: মেকানিক্যাল লিগ্যাসি

ক্যালকুলেটরের  ডায়াল প্যাড


​ক্যালকুলেটরের বোতামের বিন্যাসটি মূলত এসেছে পুরনো দিনের মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর এবং ক্যাশ রেজিস্টার থেকে।

  • উৎপত্তি: বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর তৈরি করা হয়, তখন নকশাকাররা চেয়েছিলেন এমন একটি বিন্যাস যা দ্রুত গণনার জন্য সুবিধাজনক।
  • নিচ থেকে উপরে কেন? মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটরে '০' এবং ছোট সংখ্যাগুলো (১, ২, ৩) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো। ইঞ্জিনিয়াররা মনে করেছিলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বোতামগুলো হাতের কবজির কাছাকাছি (নিচের দিকে) থাকলে টাইপ করতে সুবিধা হবে।
  • স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন: ১৯৬০-এর দশকে ইলেকট্রনিক ক্যালকুলেটর জনপ্রিয় হওয়ার সময়ও এই পুরনো নকশাটিই বজায় রাখা হয়, যাতে ব্যবহারকারীদের নতুন করে অভ্যাস পরিবর্তন করতে না হয়।


​২. টেলিফোনের ডায়াল প্যাড: গবেষণার ফল
টেলিফোনের ডায়াল প্যাড


​টেলিফোনের ক্ষেত্রে গল্পটা একটু ভিন্ন। আগেকার টেলিফোনে ছিল 'রোটারি ডায়াল' (ঘুরিয়ে নম্বর ডায়াল করা)। ১৯৬০-এর দশকে যখন বেল ল্যাবস (Bell Labs) প্রথম 'পুশ-বাটন' ফোন বা টাচ-টোন ফোন তৈরির পরিকল্পনা করে, তখন তারা একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়।

​তারা জানত না বোতামগুলো কীভাবে সাজালে মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজ হবে। তারা বেশ কিছু বিন্যাস নিয়ে গবেষণা চালায়:

  1. ​৩x৩ গ্রিড (উপরে ১-২-৩)
  2. ​৩x৩ গ্রিড (নিচে ১-২-৩ - ক্যালকুলেটরের মতো)
  3. ​বৃত্তাকার বিন্যাস
  4. ​দুই সারির বিন্যাস

​গবেষণায় যা পাওয়া গেল:

​বেল ল্যাবসের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা উপরে ১, ২, ৩ সমৃদ্ধ বিন্যাসটি (যা আমরা আজ মোবাইলে দেখি) সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছেন এবং এটি ব্যবহার করতে গিয়ে তারা ভুল কম করেছেন।

​৩. মোবাইল এবং ক্যালকুলেটরের পার্থক্যের মূল কারণসমূহ

​ক্যালকুলেটর এবং মোবাইলের এই বিপরীতমুখী যাত্রার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে:

​ক. ব্যবহারের উদ্দেশ্য (Context of Use)

​ক্যালকুলেটর মূলত গাণিতিক কাজের জন্য। যারা প্রফেশনাল হিসাবরক্ষক, তারা নিচের দিকে হাত রেখে দ্রুত '০' থেকে '৯' পর্যন্ত টাইপ করতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে, ফোন ডায়াল প্যাড তৈরি করা হয়েছে নাম বা নম্বর খোঁজার জন্য। ফোনে ১-২-৩ উপরে রাখার ফলে এটি পড়তে সহজ হয়, কারণ আমরা সাধারণত উপর থেকে নিচেই পড়ার অভ্যাস রাখি।

​খ. বর্ণমালার বিন্যাস (Alphabetical Order)

​টেলিফোনে নম্বরের সাথে বর্ণমালা (ABC, DEF) যুক্ত থাকে। যেহেতু আমরা ইংরেজি বর্ণমালা বাম থেকে ডানে এবং উপর থেকে নিচে পড়ি, তাই '১' বা '২' এর সাথে 'ABC' যুক্ত করে উপরে রাখলে সেটি মানুষের মস্তিষ্কের জন্য বুঝতে প্রাকৃতিক মনে হয়। যদি ১-২-৩ নিচে থাকত, তবে বর্ণমালাগুলো নিচ থেকে শুরু করতে হতো, যা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর হতো।

​গ. টাইপিং স্পিড এবং ভুল কমানো

​মজার ব্যাপার হলো, বেল ল্যাবসের গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষ ক্যালকুলেটরের লেআউটে (১-২-৩ নিচে) নম্বর ডায়াল করতে গিয়ে বেশি ভুল করছিল। টেলিফোন কোম্পানিগুলো চেয়েছিল ডায়ালিং প্রক্রিয়া কিছুটা মন্থর কিন্তু নির্ভুল হোক, যাতে এক্সচেঞ্জগুলো সিগন্যাল সঠিকভাবে প্রসেস করতে পারে।

​৪. কেন আজও পরিবর্তন করা হয়নি?

​এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেন সব এক করে ফেলা হচ্ছে না? এর উত্তর হলো 'Muscle Memory' বা পেশির স্মৃতি।

  • ​হিসাবরক্ষকরা ক্যালকুলেটরে এতই অভ্যস্ত যে, যদি আজ ক্যালকুলেটরের লেআউট বদলে ১-২-৩ উপরে দেওয়া হয়, তবে তাদের কাজের গতি অর্ধেক হয়ে যাবে এবং ভুলের পরিমাণ বেড়ে যাবে।

  • ​একইভাবে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা এখন উপর থেকে নিচে নম্বর দেখতেই অভ্যস্ত।

​সংক্ষেপে বলতে গেলে, ক্যালকুলেটরের বিন্যাস তৈরি হয়েছে দ্রুত গাণিতিক হিসাবের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে, আর মোবাইলের বিন্যাস তৈরি হয়েছে মানুষের পড়ার সহজবোধ্যতা এবং বর্ণমালার বিন্যাসের কথা মাথায় রেখে। এই ভিন্নতা আসলে প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির ডিজাইন শুধুমাত্র সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট কাজের প্রকৃতি এবং মানুষের আচরণের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন