খয়রা পাপিয়া পাখি



খয়রা পাপিয়া পাখি 

​বাংলাদেশের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে নানা রঙের ও জাতের পাখির কলকাকলি মুখরিত করে রাখে চারপাশ। হাজারো প্রজাতির পাখির ভিড়ে এমন কিছু পাখি রয়েছে, যাদের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের লোকসাহিত্য, আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, ঋতু বৈচিত্র্য এবং কৃষির সাথে নিবিড় সম্পর্ক। এই পাখিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় পাখি হলো খয়রা পাপিয়া। আমাদের দেশের গ্রামীণ জনপদে এই পাখিটি তার অদ্ভুত ডাক এবং চঞ্চল স্বভাবের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খয়রা পাপিয়া পাখির বৈজ্ঞানিক নাম, ইংরেজি নাম, শারীরিক গঠন, খাবার, আবাসস্থল, প্রজনন প্রক্রিয়া, এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি ও ইতিহাসে এর অনন্য অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

​১. খয়রা পাপিয়া পাখির পরিচিতি ও মৌলিক তথ্য

​বাংলাদেশের অবিতর্কিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে পাখি বৈচিত্র্য। খয়রা পাপিয়া পাখিটি কোকিল পরিবারের (Cuculidae) অন্তর্ভুক্ত একটি মাঝারি আকৃতির পাখি। নিচে এই পাখি সম্পর্কিত কিছু মৌলিক তথ্য প্যারাগ্রাফ আকারে তুলে ধরা হলো:

​খয়রাপাখ পাপিয়া বৈজ্ঞানিক নাম কী?

খয়রা পাপিয়া পাখির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hierococcyx varius (হায়ারোকক্সিজ ভ্যারিয়াস)। এটি Cuculidae পরিবারের একটি অত্যন্ত পরিচিত সদস্য, যা তার মিষ্টি অথচ উচ্চস্বরের ডাকের জন্য বিখ্যাত।

সংরক্ষণ অবস্থা

বিলুপ্ত       বিপদগ্রস্ত       ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত
EX
EW
CR
EN
VU
NT
LC
ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত (আইইউসিএন ৩.১)

বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস

জগৎ: প্রাণীজগৎ
পর্ব: কর্ডাটা
শ্রেণী: পক্ষী
বর্গ: কুকুলিফর্মিস
পরিবার: কুকুলিডি
গণ: ক্ল্যামেটর
প্রজাতি: C. coromandus

দ্বিপদী নাম

Clamator coromandus
(লিনিয়াস, ১৭৬৬)

​খয়রাপাখ পাপিয়া ইংরেজি কি?

ইংরেজিতে এই পাখিটিকে Common Hawk-Cuckoo বা সংক্ষেপে Hawk-Cuckoo বলা হয়। এর চেহারায় শিকারি পাখির (Hawk) সাথে কিছুটা মিল থাকায় এবং এর চোখের মণি ও গায়ের রঙের বিন্যাসের কারণে ইংরেজিতে এমন নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া অনেক অঞ্চলে একে 'Brain-fever bird' বা 'মস্তিষ্ক জ্বর পাখি' নামেও ডাকা হয়, কারণ এর একটানা পুনরাবৃত্তিমূলক ডাক মানুষের মাঝে এক ধরনের বিরক্তি বা কৌতূহল তৈরি করে।

​খয়রাপাখ পাপিয়া পাখির গায়ের রং কেমন?

খয়রা পাপিয়া পাখির গায়ের রঙ মূলত খয়েরি, ধূসর এবং ছাই রঙের এক অপূর্ব মিশ্রণ। এর পিঠের দিকটা কালচে-ধূসর বা গাঢ় খয়েরি রঙের হয়ে থাকে এবং বুক ও পেটের অংশটি হালকা সাদা বা ক্রিম রঙের ওপর ছাই ও খয়েরি রঙের ডোরাকাটা বা তিলকযুক্ত নকশায় মোড়ানো থাকে। এর লেজটি বেশ লম্বা এবং তাতে স্পষ্ট আড়াআড়ি কালো ও খয়েরি ডোরা বা ব্যান্ড দেখা যায়। বিশেষ করে এর চোখগুলো উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা রঙের হয়ে থাকে, যা দূর থেকেই সবার নজর কাড়ে।

​২. শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব

​খয়রা পাপিয়া পাখির দৈহিক গঠন অন্যান্য কোকিল বা পাপিয়া প্রজাতির পাখির মতোই কিছুটা চিকন ও লম্বাটে হয়ে থাকে। এর গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪ থেকে ৩৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ডানাগুলো বেশ শক্তিশালী এবং লম্বা হয়, যার ফলে এরা খুব দ্রুত এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উড়তে পারে। এদের পাগুলো তুলনামূলকভাবে খাটো কিন্তু শক্তিশালী, যা গাছে ডাল ধরে বসে থাকতে সাহায্য করে।

​এই পাখিগুলোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের লাজুক স্বভাব। এরা সাধারণত গাছের ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। সহজে মানুষের সামনে আসে না। তবে প্রজনন ঋতুতে এরা অত্যন্ত উচ্চস্বরে একটানা ডেকে পরিবেশ মাতিয়ে তোলে। এদের ডাক সাধারণত উঁচু পিচে শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা আরও তীব্র হতে থাকে, যা গ্রীষ্মের দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়।

আরো পড়ুন : মাছরাঙা পাখি 

​৩. আবাসস্থল ও ভৌগোলিক বিস্তার

​বাংলাদেশ ছাড়াও খয়রা পাপিয়া পাখি দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চিরসবুজ বন, পাহাড়ি জঙ্গল, গ্রামীণ ফলবাগান, এবং বড় বড় পুরানো গাছের সারি রয়েছে এমন স্থানে এদের সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়।বাংলাদেশে এদের ১২ প্রজাতি দেখা যায়।তবে সব প্রজাতি পাখি মানুষের আড়ালে থাকে।তাদের মধ্যে "বউ কথা কও" পাখিটি মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়।

​বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুন্দরবন, সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল, রাজশাহী ও খুলনার গ্রামীণ আম-কাঁঠালের বাগান এবং বিভিন্ন পার্কের ঝোপঝাড়ে এরা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে। এরা সাধারণত বনের গভীর অংশ কিংবা মানববসতির কাছাকাছি বড় গাছের উঁচুদালের গোপন স্থানে থাকতে ভালোবাসে। এরা পরিযায়ী না হলেও স্থানীয়ভাবে খাবারের সন্ধানে বা আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে থাকে।বাংলাদেশ বাদে আরো ৯ টি দেশে এই পাখির উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। তা হলো: ভারত,শ্রীলংকা,ভিয়েতনাম,নেপাল,ভুটান,ফিলিপাইন,চীন,মিয়ানমার,থাইল্যান্ড।

​৪. খাবার ও খাদ্যতালিকা

​খয়রা পাপিয়া পাখির খাদ্যতালিকা বেশ বৈচিত্র্যময় এবং এটি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি পাখি। নিচে এদের প্রধান খাবারগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

​পোকা-মাকড় ও লার্ভা: খয়রা পাপিয়া পাখির প্রধান খাবার হলো বিভিন্ন ধরনের পোকা-মাকড়। এরা গাছের পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা শুঁয়োপোকা বা ক্যাটারপিলার (Caterpillar) অত্যন্ত আনন্দের সাথে খায়। অনেক পাখি যেখানে বিষাক্ত বা লোমশ শুঁয়োপোকা খেতে চায় না, খয়রা পাপিয়া সেগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শিকার করে খায়।

​উইপোকা ও পিঁপড়া: প্রজনন মৌসুম এবং সাধারণ সময়ে এরা মাটি থেকে বা গাছের গুঁড়ি থেকে উইপোকা, ঘাসফড়িং, এবং নানা প্রজাতির পিঁপড়া ও তাদের ডিম খেয়ে থাকে।

​ছোট ফলমূল ও বীজ: খাবারের সংকট দেখা দিলে বা অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজনে এরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধরনের বুনো ফল, ছোট বেরি এবং গাছের নরম কুঁড়িও খেয়ে থাকে।

​এই পাখিগুলোর পোকা খাওয়ার অভ্যাস প্রকৃতির ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ দমন করতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে বন ও কৃষিজমির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।

​৫. প্রজনন প্রক্রিয়া: ডিম দেওয়া, বাচ্চা ফোটা ও উড়তে শেখা

​খয়রা পাপিয়া পাখির প্রজনন প্রক্রিয়া অত্যন্ত চমৎকার ও রহস্যময়। অন্যান্য কোকিল গোত্রীয় পাখির মতো খয়রা পাপিয়াও নিজের বাসায় সরাসরি ডিম পাড়ে না, বরং এরা পরজীবী প্রজনন (Brood Parasitism) কৌশল অবলম্বন করে। মে থেকে আগস্ট মাসে সাধারণত এরা প্রজননে আগ্রহী হয়। এদের প্রজনন চক্রের বিভিন্ন ধাপ তুলে ধরা হলো:

​কয়টা ডিম দেয়: সাধারণত খয়রা পাপিয়া পাখি প্রজনন মৌসুমে একবারে ১টি করে ডিম বিভিন্ন পাখির বাসায় পাড়ে। তবে পুরো মৌসুমে এরা বিভিন্ন পাখির বাসায় মোট ৪ থেকে ৬টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে।

​ডিম পাড়ার কৌশল: এরা মূলত সাতকাহন বা ছটফটে স্বভাবের পাখি যেমন বিভিন্ন ধরনের বাবুই, শালিক, বা কাকের বাসার দিকে নজর রাখে। যখন মূল পাখির দম্পতি খাবার সংগ্রহ করতে বাসা থেকে দূরে যায়, তখন খয়রা পাপিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেই বাসায় গিয়ে তাদের নিজের একটি ডিম রেখে আসে এবং সমগোত্রীয় একটি ডিম ফেলে দেয় বা নষ্ট করে দেয়, যাতে বাসাটিতে যে পরিবর্তন হয়েছে তা যেন কোনো ভাবেই মূল পাখিটি বুঝতে না পারে। 

​কত দিনে বাচ্চা ফোটে: খয়রা পাপিয়া পাখির ডিমের খোসার রং এবং আকার প্রায়ই যে পাখির বাসায় ডিমটি রাখা হয় (যেমন সাতকাহন বা শালিকের ডিম) তার সাথে মিলে যায়। পালক বা পোষক পাখি (Host bird) নিজের ডিম মনে করে সেগুলো তা দিতে থাকে। সাধারণত ১২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে খয়রা পাপিয়ার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়।

​বাচ্চার বেড়ে ওঠা ও উড়তে শেখা: ডিম ফোটার পর পাপিয়ার ছানাটি অন্য ছানাগুলোর চেয়ে আকারে দ্রুত বড় হতে চায়। অনেক সময় এরা পালক পাখির আসল বাচ্চাদের বাসা থেকে ফেলে দেয় বা খাদ্যের জন্য তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। পালক পাখির দম্পতি নিজেদের সন্তান মনে করে পরম যত্নে এই পাপিয়ার বাচ্চাকে খাওয়ায় এবং বড় করে তোলে। ডিম ফোটার প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর খয়রা পাপিয়ার বাচ্চাটি পরিপক্ব ডানা মেলে প্রথমবার সফলভাবে উড়তে শেখে এবং নিজস্ব স্বাধীন জীবন শুরু করে।

​৬. বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিতে খয়রা পাপিয়ার অবদান

​বাংলাদেশের ইতিহাস, লোকসাহিত্য এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে খয়রা পাপিয়া এবং কোকিল জাতীয় পাখিরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের কবি, সাহিত্যিক ও লোকগবেষকদের লেখায় এই পাখিদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

​ঋতু পরিবর্তনের বার্তা বাহক: আবহমান বাংলায় গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এই পাখিগুলো। এদের একটানা সুমধুর বা রহস্যময় ডাক শুনে গ্রামীণ কৃষকরা বুঝতে পারতেন যে ঋতু পরিবর্তনের সময় এসেছে। প্রাচীন লোকসাহিত্যে এবং গানে পাপিয়া পাখির ডাক বিরহ, প্রেম এবং প্রকৃতির রূপ রস ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হতো।

আরো পড়ুন : সাদা ময়ূর 

​প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশগত দিক থেকে খয়রা পাপিয়ার অবদান অপরিসীম। বনের গাছে ও ফসলের ক্ষেতে ক্ষতিকর শুঁয়োপোকা এবং পোকামাকড়ের বংশবৃদ্ধি রোধে এই পাখিগুলো প্রাকৃতিকভাবে জৈবিক নিয়ন্ত্রণকারী (Biological Control Agent) হিসেবে কাজ করে। এরা যদি প্রকৃতিতে না থাকত, তবে অনেক ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণে গাছপালা ধ্বংস হয়ে যেত।

​জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ: বাংলাদেশের সুন্দর প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে প্রতিটি পাখির নিজস্ব ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। খয়রা পাপিয়া পাখি খাদ্য শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্যান্য শিকারি প্রাণী ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সরাসরি অবদান রেখে চলেছে।

​৭. সংরক্ষণ ও আমাদের করণীয়

​আধুনিকায়নের ছোঁয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় পাখি আজ হুমকির মুখে পড়ছে। খয়রা পাপিয়া পাখিও এর ব্যতিক্রম নয়। এদের নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্য সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

​এই সুন্দর পাখিটিকে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হলে দেশের বনজ সম্পদ রক্ষা করতে হবে, গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করতে হবে। পাখি শিকার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে খয়রা পাপিয়া সহ আমাদের দেশের সকল পশুপাখি নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে।

​খয়রা পাপিয়া পাখি কেবল একটি সাধারণ পাখি নয়, এটি আমাদের বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণস্পন্দন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Hierococcyx varius এবং ইংরেজি নাম Common Hawk-Cuckoo আমাদের জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের দেশের বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণ করি এবং সবুজ বাংলাদেশকে আরও সুন্দর করে তুলি।

​সাধারণ খয়রাপাখি পাপিয়া (Common Hawk-Cuckoo)



সাধারণ খয়রাপাখি পাপিয়া (Common Hawk-Cuckoo), যার বৈজ্ঞানিক নাম Hierococcyx varius, দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও কৌতূহলোদ্দীপক পাখি। এর শারীরিক গঠন ও ওড়ার ভঙ্গি অনেকাংশে বাজপাখির মতো হওয়ায় ইংরেজি সাহিত্যে একে 'হক-কুকটু' বলা হয়। কিউুলিডি (Cuculidae) পরিবারের এই পাখিটি তার অদ্ভুত এবং অনবরত উচ্চস্বরে ডাকা এক অদ্ভুত সুরের জন্য বিখ্যাত। গ্রীষ্মকালের দুপুরে যখন এই পাখিটি একটানা ডেকে চলে, তখন অনেক সময় মানুষের মনে বিরক্তির উদ্রেক ঘটে, যে কারণে একে অনেক এলাকায় 'ব্রেইন ফিভার বার্ড' বা মাথা গরম করা পাখি বলেও অভিহিত করা হয়।

​এই পাখির শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো বেশ আকর্ষণীয় ও অনন্য। সাধারণ খয়রাপাখি পাপিয়া লম্বায় সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের পিঠের দিকটা ছাইরঙা বা ধূসর-খয়েরি এবং নিচের অংশের রঙে সাদা পাতার ওপর বাদামী বা খয়েরি রঙের সুন্দর ডোরাকাটা দাগ থাকে, যা হুবহু বাজপাখির রূপ ফুটিয়ে তোলে। এদের উজ্জ্বল চোখের চারপাশে একটি হলুদ রঙের রিং বা বলয় থাকে, যা দূর থেকেও বেশ স্পষ্ট দেখায়। এই ছদ্মবেশী রূপের কারণে শিকারী পাখি মনে করে অন্যান্য ছোট পাখিরা অনেক সময় এদের ভয়ে দূরে থাকে।

​সাধারণ খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রধান বাসস্থান হলো খোলামেলা বনভূমি, চিরসবুজ গ্রামীণ বাগান, ফলের বাগান এবং বড় বড় গাছপালাঘেরা জনবসতিপূর্ণ এলাকা। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। এরা খুব সংবরণশীল ও লাজুক স্বভাবের হওয়ায় সাধারণত গাছের ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। ফলে এদের খালি চোখে দেখা বেশ কঠিন, তবে এদের পরিচিত জোরালো ডাক শুনেই বনের মধ্যে বা বাগানে এদের উপস্থিতি সহজেই শনাক্ত করা যায়।

​খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে এই পাখিটি বেশ উপকারী ভূমিকা পালন করে। সাধারণ খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রধান খাবার হলো বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, গাছের ক্ষতিকর বিটল, ঘাসফড়িং এবং বিশেষ করে লোমশ শুঁয়োপোকা (hairy caterpillars)। অন্যান্য পাখি সাধারণত শুঁয়োপোকার গায়ের বিষাক্ত লোমের কারণে এগুলো এড়িয়ে চললেও, খয়রাপাখি পাপিয়া অত্যন্ত আগ্রহের সাথে এই লোমশ শুঁয়োপোকাগুলো খেয়ে থাকে। কীটপতঙ্গ খাওয়ার মাধ্যমে এরা প্রকৃতিতে পোকার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং কৃষকদের নীরব বন্ধু হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

​প্রজনন আচরণে খয়রাপাখি পাপিয়া এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করে, কারণ এরা নিজেদের বাসা নিজেরাই তৈরি করে না। এরা 'ব্রুড প্যারাসাইট' বা পরজীবী প্রজনন পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। অর্থাৎ, এরা লুকিয়ে অন্য কোনো ছোট পাখির (যেমন ছাতারে বা বাবুই জাতীয় পাখি) বাসায় নিজেদের ডিম পেড়ে রেখে আসে। প্রজনন মৌসুম সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে হয়ে থাকে। এরা সাধারণত পোষক পাখির ডিমের সাথে হুবহু মিলে যায় এমন রঙের একটি করে ডিম পাড়ে, ফলে পোষক পাখি সহজে তা বুঝতে পারে না।

​এই পাখির ডিম ফোটার সময় এবং ছানা বড় হওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও চমকপ্রদ। সাধারণত ১২ থেকে ১৩ দিনের মধ্যেই পাপিয়ার ডিম ফুটে ছানা বের হয়ে আসে। পোষক পাখির অবচেতন স্নেহে ও পরিচর্যায় এই ছানাটি খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। জন্ম নেওয়ার প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর এই শাবকগুলো ডানা শক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে এবং নিজস্ব প্রকৃতিতে বিচরণের মাধ্যমে জীবন শুরু করে।

আরো পড়ুন : কোকিল

মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়া



প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পাখিদের জগৎ সবসময়ই দারুণ বিস্ময়কর। এর মধ্যে পাপিয়া বা কুকু পরিবারের পাখিগুলো তাদের অদ্ভুত স্বভাব এবং মিষ্টি সুরেলা ডাকের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। এমনি এক চমৎকার ও কম পরিচিত পাখি হলো মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়া (Malayan Hawk-Cuckoo)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন বনাঞ্চলে এই পাখিটির দেখা মেলে। এর জীবনযাত্রা, প্রজনন কৌশল এবং শারীরিক গঠন অন্য সাধারণ পাখিদের তুলনায় বেশ আলাদা ও আকর্ষণীয়।

বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিচয়

মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়ার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hierococcyx fugax। এটি কুকুলিডি (Cuculidae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি মাঝারি আকারের পাখি। এদের দেখতে অনেকটা ছোট আকারের চিল বা হকের মতো মনে হয়, যে কারণে ইংরেজি নামটিতে 'Hawk-Cuckoo' শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।

শারীরিক বৈশিষ্ট্য

এই পাখিটির দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটারের মতো হয়ে থাকে এবং এর ডানা বেশ ছড়ানো থাকে। মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়ার পিঠের দিকটা বাদামী ও ধূসর রঙের মিশ্রণে গঠিত। এদের পেটের অংশে চমৎকার ডোরাকাটা দাগ থাকে এবং গলার নিচের অংশে কালো ছোপ ও ডানায় সাদা রঙের ফোঁটা বা দাগ দেখা যায়। এদের চোখগুলো বেশ তীক্ষ্ণ এবং লেজটি কিছুটা লম্বা হয়। এদের গলার শিস কাটার মতো তীব্র ও স্পষ্ট ডাক বনের পরিবেশকে মুখরিত করে তোলে।

বসবাস ও আবাসস্থল

মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়া মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের ঘন বনভূমিতে বসবাস করতে পছন্দ করে। সমতলভূমির চিরহরিৎ বন থেকে শুরু করে প্রায় ১৭০০ মিটার উচ্চতার পাহাড়ি বনাঞ্চলেও এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রাকৃতিক বনের পাশাপাশি অনেক সময় এরা রাবার বাগান, কোকো বাগান কিংবা আংশিক রোপণ করা বাগানেও বিচরণ করে। মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সুমাত্রা, জাভা এবং বোর্নিও দ্বীপে এই পাখি প্রধানত পাওয়া যায়।

খাবার ও খাদ্যাভ্যাস

এই পাখিটির প্রধান খাবার হলো বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। বিশেষ করে এরা গাছের পাতা বা ডালপালা থেকে নানা ধরনের শুঁয়োপোকা শিকার করতে খুবই পছন্দ করে। শুঁয়োপোকা ছাড়াও এরা ঝিঁঝি পোকা, গোবরে পোকা বা বিটল, ছোট প্রজাপতি এবং বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ খেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পুষ্টির জন্য এরা গাছের ছোট ফল ও বুনো বেরিও খেয়ে থাকে। এরা সাধারণত গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে শিকার ধরে।

প্রজনন, ডিম ও ছানা তোলার প্রক্রিয়া

মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রজনন আচরণ অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। কোকিল পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো এরাও ব্রুড প্যারাাসাইট (Brood Parasite) প্রকৃতির হয়ে থাকে, অর্থাৎ এরা নিজেরা কোনো বাসা তৈরি করে না। এরা অন্য ছোট পরজীবী পাখি বা গায়ক পাখির (যেমন- Shama বা Flycatcher) খালি বাসায় অত্যন্ত গোপনে তাদের অজান্তে ডিম পেড়ে চলে আসে।

সাধারণত এরা পোষক পাখির বাসায় ১টি করে ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলোর ফোটার সময় বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড হলো প্রায় ১৪ থেকে ১৬ দিন। পোষক পাখির দ্বারাই ডিমটি তা দেওয়া হয় এবং বাচ্চা ফোটানো হয়। ডিম থেকে বের হওয়ার পর মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়ার ছানাগুলো অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জন্মের পর প্রায় ২ থেকে ৩ সপ্তাহ বা ১৪ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ছানাগুলো পরিপক্ব হয়ে ডানা মেলে আকাশ ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করে এবং বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মালয়ী খয়রাপাখি পাপিয়া এক অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বনের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও শুঁয়োপোকা দমন করে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে বনাঞ্চল ধ্বংস ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে আজ এই সুন্দর পাখিগুলোর অস্তিত্ব বিভিন্ন জায়গায় হুমকির মুখে পড়ছে। তাই এই রহস্যময় ও সুন্দর পাখিদের প্রকৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

আরো পড়ুন : তোতা পাখি 

ল্যান্সলেটেড খয়রাপাখি পাপিয়া



প্রকৃতিপ্রেমী ও পক্ষীবিদদের কাছে কুকুলিডি (Cuculidae) পরিবারের পাখিগুলো সবসময়ই দারুণ কৌতূহলের বিষয়। এদের মধ্যে ল্যান্সলেটেড খয়রাপাখি পাপিয়া, যা বিশ্বজুড়ে Hodgson's Hawk-Cuckoo  বা হুইসল বা শিস দেওয়া হক-কুক্কু নামে পরিচিত, এক অনন্য সৃষ্টি। এর শারীরিক গঠন, চতুর প্রজনন কৌশল এবং মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ শিসের মতো ডাক বনের পরিবেশকে এক জাদুকরী রূপ দেয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রকৃতিতে এই পাখিটির উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়।

বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিচিতি

এই চমৎকার পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hierococcyx nisicolor। বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ব্রায়ান হিউটন হডসন-এর নামানুসারে এই পাখির ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছে। দেখতে অনেকটা ছোটখাটো চিল বা বাজপাখির (Hawk) মতো হওয়ার কারণে এদের নামের সাথে 'হক-কুক্কু' যুক্ত হয়েছে, যা তাদের শিকারী 鳥য়ের মতো ভান করতে এবং অন্য পাখিদের বোকা বানাতে সাহায্য করে।

শারীরিক বৈশিষ্ট্য

ল্যান্সলেটেড খয়রাপাখি পাপিয়া আকৃতিতে মাঝারি ধরনের হয়ে থাকে। এদের পূর্ণবয়স্ক দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৭০ থেকে ৯০ গ্রামের মধ্যে হয়ে থাকে। এই পাখির মাথা, পিঠ এবং উপরিভাগ কালচে-নীলাভ ও ধূসর রঙের মিশ্রণ। লেজটি কিছুটা লম্বা এবং তাতে চারটি স্পষ্ট কালো রঙের ব্যান্ড বা দাগ দেখা যায়। এদের বুক ও গলার নিচের অংশে সাদা রঙের ভিত্তির ওপর বাদামী ও ধূসর রঙের সূক্ষ্ম বা ল্যান্সলেটেড ফোঁটা বা ডোরাকাটা দাগ থাকে। এছাড়া এদের চোখের চারপাশে হলুদ রঙের রিং এবং তীক্ষ্ণ বাঁকানো ঠোঁট থাকে।

বসবাস ও আবাসস্থল

এই পাখিটি প্রধানত ক্রান্তীয় ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় বনাঞ্চলে বসবাস করতে পছন্দ করে। প্রজনন ঋতুতে হিমালয়ের পাদদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ চীনের পাহাড়ি ও চিরহরিৎ বনে এদের সচরাচর দেখা যায়। শীতকাল এলে এরা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে (মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও সুমাত্রা) পরিযায়ী হিসেবে পাড়ি জমায়। বনের ঘন গাছপালার আড়ালে এরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসে।

খাবার ও খাদ্যাভ্যাস

ল্যান্সলেটেড খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রধান খাদ্য তালিকা জুড়ে রয়েছে নানা ধরনের পোকামাকড়। এরা গাছের পাতা ও ডালপালা থেকে বিভিন্ন ধরনের শুঁয়োপোকা এবং মথ শিকার করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এছাড়া এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ফড়িং বা ঘাসফড়িং, উইপোকা, ওড়াউড়ি করতে সক্ষম পিঁপড়া, ঝিঁঝি পোকা এবং সিকাডা (Cicadas)। অনেক সময় খাদ্যের সন্ধানে এরা গাছের ছোট ফল, বুনো ডুমুর, বেরি জাতীয় ফল এবং কদাচিৎ ছোট টিকটিকিও খেয়ে থাকে। এরা মূলত গাছের ডালেই বেশি শিকার ধরে, তবে প্রয়োজনে মাটিতে নেমেও খাবার সংগ্রহ করে।

প্রজনন, ডিম ও ছানা তোলার প্রক্রিয়া

এই প্রজাতির পাপিয়ার প্রজনন আচরণ অত্যন্ত চতুর ও আকর্ষণীয়। কোকিল পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো এরাও ব্রুড প্যারাাসাইট (Brood Parasite) বা পরজীবী স্বভাবের। অর্থাৎ, এরা নিজেরা কোনো স্থায়ী বাসা তৈরি করে না। এরা অত্যন্ত গোপনে অন্য ছোট গায়ক পাখি বা পোষক পাখির (যেমন নানা প্রজাতির ব্যাবলার বা নীলভা) ফাঁকা বাসায় গিয়ে ডিম পেড়ে আসে।

সাধারণত এরা পোষক পাখির বাসায় ১টি করে ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলো ফোটানোর জন্য ইনকিউবেশন বা তা দেওয়ার সময়কাল সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। পোষক পাখিই নিজেদের ডিম ভেবে এই পাপিয়ার ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে তোলে। মজার বিষয় হলো, ডিম ফুটে বের হওয়ার পর পাপিয়ার ছানাটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে পোষক পাখির নিজস্ব ছানাগুলোকে বাসা থেকে নিচে ফেলে দেয় এবং একা সমস্ত খাবার ও মনোযোগ দখল করে নেয়। জন্মের পর প্রায় ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে এই ছানাগুলো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ডানা মেলে আকাশ ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করে এবং পোষক পাখির বাসা চিরতরে ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

ল্যান্সলেটেড খয়রাপাখি পাপিয়া বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বনের ক্ষতিকর শুঁয়োপোকা ও পোকা-মাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এরা প্রকৃতিকে সবুজ ও সজীব রাখতে সাহায্য করে। নিভৃতচারী ও সুন্দর এই পাখিটি প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য, যা আমাদের পরিবেশের জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

আরো পড়ুন :ময়না পাখি 

লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়া



প্রকৃতিপ্রেমী এবং পক্ষীবিজ্ঞানীদের কাছে কুকুলিডি (Cuculidae) পরিবারের পাখিদের আচরণ সবসময়ই এক পরম বিস্ময়। এর মধ্যে লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়া (Large Hawk-Cuckoo), যার বৈজ্ঞানিক নাম Hierococcyx sparverioides, তার বিশালাকার গঠন, বাজপাখির মতো রূপ এবং অনন্য প্রজনন কৌশলের জন্য বেশ বিখ্যাত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন বনভূমিতে এই পাখিটির উপস্থিতি বনের পরিবেশকে সবসময় জীবন্ত ও মুখরিত করে রাখে।

বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিচয়

এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hierococcyx sparverioides। ইংরেজি পরিভাষায় একে ‘Large Hawk-Cuckoo’ বলা হয়, কারণ আকারে এটি খয়রাপাখি পাপিয়া পরিবারের অন্য সদস্যের তুলনায় বেশ বড় এবং এর গায়ের ছোপ ও ওড়ার ভঙ্গি অনেকটা ছোটখাটো বাজপাখির (Hawk) মতো। এই ছদ্মবেশের কারণে অন্য ছোট পাখিরা অনেক সময় একে শিকারি পাখি ভেবে ভয় পায়, যা এই পাখির টিকে থাকতে সাহায্য করে।

শারীরিক বৈশিষ্ট্য

লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়া মাঝারি থেকে বেশ বড় আকৃতির একটি পাখি। পূর্ণবয়স্ক একটি পাখির দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩৮ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এদের ডানা বেশ প্রসারিত থাকে। এদের পিঠের দিকটা প্রধানত ছাইরঙা ও ধূসর বাদামী মিশ্রিত। বুকের অংশটি হালকা সাদাটে বা কমলা-বাদামী আভার ওপর স্পষ্ট ডোরকাটা বা ছোপ ছোপ দাগযুক্ত থাকে। লেজটি তুলনামূলক বেশ লম্বা এবং তাতে স্পষ্ট কালো ও ধূসর রঙের সমান্তরাল ব্যান্ড বা দাগ দেখা যায়। এদের চোখ তীক্ষ্ণ এবং চোখের চারপাশে হলুদ রঙের রিং থাকে, যা এদের দেখতে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

বসবাস ও আবাসস্থল

এই পাখিটি প্রধানত ক্রান্তীয় ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় পাহাড়ি বনাঞ্চলে বসবাস করতে পছন্দ করে। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে হিমালয়ের পাদদেশ, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চীনের পাহাড়ি চিরহরিৎ বনে এদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। শীতের আমেজ শুরু হলে বা খাদ্যের খোঁজে এরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণ অঞ্চল যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা এবং ফিলিপাইনের দিকে পরিযায়ী হিসেবে পাড়ি জমায়। ঘন গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে এরা অত্যন্ত পটু।

খাবার ও খাদ্যাভ্যাস

লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রধান খাদ্য তালিকা জুড়ে রয়েছে নানা ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড়। এরা গাছের পাতা ও ডালপালার মধ্যে থাকা লোমশ শুঁয়োপোকা (Caterpillars) শিকার করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এছাড়া এদের খাদ্য তালিকায় নিয়মিতভাবে যুক্ত থাকে ফড়িং, ঘাসফড়িং, উইপোকা, বিটল বা গোবরে পোকা, ঝিঁঝি পোকা এবং নানা প্রজাতির পতঙ্গ। অনেক সময় খাদ্যের সন্ধানে এরা গাছের ছোট ফল, বুনো বেরি এবং কদাচিৎ ছোট টিকটিকিও খেয়ে থাকে। এরা গাছের ডালে বসে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে শিকারের গতিবিধি লক্ষ্য করে এবং দ্রুত তা ধরে ফেলে।

প্রজনন, ডিম ও ছানা তোলার প্রক্রিয়া

এই প্রজাতির পাপিয়ার প্রজনন আচরণ অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির। কোকিল পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়াও ব্রুড প্যারাাসাইট (Brood Parasite) বা পরজীবী স্বভাবের অধিকারী। অর্থাৎ, এরা নিজেরা কোনো স্থায়ী বাসা বা নিড় তৈরি করে না। এরা অত্যন্ত গোপনে অন্য ছোট গায়ক পাখি বা পোষক পাখির (যেমন বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাবলার বা ছাতারী পাখি) ফাঁকা বাসায় গিয়ে ডিম পেড়ে চলে আসে।

সাধারণত এরা পোষক পাখির বাসায় ১টি করে ডিম পাড়ে এবং পোষক পাখি নিজের ডিম ভেবে তা দিয়ে তা ফুটিয়ে তোলে। এই ডিমগুলোর ফোটার সময় বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার পর এই পাপিয়ার ছানাটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে পোষক পাখির আসল ছানাগুলোকে বাসা থেকে সরিয়ে দেয়। জন্মের পর মাত্র ৩ সপ্তাহের কাছাকাছি সময়ে বা ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে এই ছানাগুলো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ডানা মেলে আকাশ ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করে এবং পোষক পাখির বাসা ছেড়ে স্বাধীন জীবন শুরু করে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে লার্জ খয়রাপাখি পাপিয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বনের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় ও শুঁয়োপোকা দমন করে এরা গাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। নিভৃতচারী ও সুন্দর এই পাখিটি আমাদের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য সম্পদ, যা আমাদের প্রকৃতিকে করে তুলেছে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়।

আরো পড়ুন : দোয়েল পাখি

ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়া



প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় জীবজগতে পাখিদের আচরণ ও জীবনযাত্রা সবসময়ই গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। কুকুলিডি (Cuculidae) পরিবারের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও স্থানীয় প্রজাতি হলো ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়া (Philippine Hawk-Cuckoo)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ফিলিপাইনের ঘন ও চিরহরিৎ বনাঞ্চলে এই দুর্লভ পাখিটির মূল আবাসস্থল। এর চমৎকার শারীরিক গঠন, বাজপাখির মতো রূপ এবং অদ্ভুত প্রজনন কৌশল একে অন্যান্য সাধারণ পাখি থেকে পুরোপুরি আলাদা করে তুলেছে।

বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিচিতি

ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়ার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hierococcyx pectoralis। ইংরেজি পরিভাষায় একে ‘Philippine Hawk-Cuckoo’ বলা হয়। ‘Hawk-Cuckoo’ নামটির কারণ হলো এদের শরীরের ওড়ার ভঙ্গি ও বাহ্যিক অবয়ব অনেকটা ছোট আকারের চিল বা বাজপাখির (Hawk) মতো। এই ছদ্মবেশের কারণে বনের অন্য ছোট পাখিরা অনেক সময় এদের শিকারি পাখি ভেবে বিভ্রান্ত হয়, যা এদের বেঁচে থাকতে ও শিকার ধরতে দারুণভাবে সহায়তা করে।

শারীরিক বৈশিষ্ট্য

আকৃতির দিক থেকে ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়া মাঝারি ধরনের একটি পাখি। পূর্ণবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৮ থেকে ৩২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই পাখির পিঠের দিকটা প্রধানত ছাইরঙা ও ধূসর-বাদামী মিশ্রিত। বুকের নিচের অংশ ও পেটের অংশে সাদা পটভূমির ওপর স্পষ্ট ও সুন্দর বাদামী রঙের ডোরাকাটা বা ছোপ ছোপ দাগ দেখতে পাওয়া যায়। এদের লেজটি তুলনামূলকভাবে বেশ লম্বা এবং তাতে স্পষ্ট কালো রঙের দাগ বা ব্যান্ড থাকে। এছাড়া এদের তীক্ষ্ণ চোখ এবং চোখের চারপাশে হলুদ রঙের রিং এদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বসবাস ও আবাসস্থল

এই পাখিটি ফিলিপাইনের স্থানীয় বা এন্ডেমিক (Endemic) প্রজাতি। অর্থাৎ ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের বাইরে পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের সচরাচর দেখা যায় না। ফিলিপাইনের বিভিন্ন দ্বীপের ক্রান্তীয় ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ পাহাড়ি বনাঞ্চল, নিম্নভূমির জঙ্গল এবং ঘন ঝোপঝাড়ে এরা বসবাস করতে পছন্দ করে। অনেক সময় বনের গভীরে বড় গাছের উঁচু ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে এরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

খাবার ও খাদ্যাভ্যাস

ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়ার প্রধান খাদ্য তালিকা জুড়ে রয়েছে নানা ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড়। গাছের পাতা, ডালপালা এবং বাকলের ফাঁকফোকর থেকে লোমশ শুঁয়োপোকা (Caterpillars) শিকার করা এদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। শুঁয়োপোকা ছাড়াও এরা বিভিন্ন ধরনের ফড়িং, ঘাসফড়িং, উইপোকা, বিটল বা গোবরে পোকা, এবং নানা প্রজাতির ওড়াউড়ি করা পতঙ্গ খেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে খাদ্যের পুষ্টি জোগাতে এরা গাছের ছোট বুনো বেরি বা ফলও খেয়ে থাকে। এরা খুব নিপুণভাবে গাছের ডালে বসে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে শিকারের গতিবিধি লক্ষ্য করে এবং সুযোগ বুঝে তা ধরে ফেলে।

প্রজনন, ডিম ও ছানা তোলার প্রক্রিয়া

কোকিল পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়াও ব্রুড প্যারাাসাইট (Brood Parasite) বা পরজীবী স্বভাবের অধিকারী। অর্থাৎ, এরা নিজেদের কোনো স্থায়ী বাসা তৈরি করে না। প্রজনন ঋতুতে এরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে অন্য ছোট গায়ক পাখি বা পোষক পাখির (যেমন বিভিন্ন প্রজাতির বাবুই বা ছোট পাখিদের) ফাঁকা বাসায় গিয়ে গোপনে একটি ডিম পেড়ে চলে আসে।

সাধারণত এরা পোষক পাখির বাসায় ১টি করে ডিম দিয়ে থাকে। এই ডিমগুলো ফোটানোর জন্য ইনকিউবেশন বা তা দেওয়ার সময়কাল সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। পোষক পাখিই নিজের ডিম ভেবে এই পাপিয়ার ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে তোলে। ডিম ফোটার পর পাপিয়ার ছানাটি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত জন্মের পর প্রায় ৩ সপ্তাহ বা ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে এই ছানাগুলো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ডানা মেলে আকাশ ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করে এবং পোষক পাখির বাসা ছেড়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শুরু করে।

ফিলিপাইন খয়রাপাখি পাপিয়া ফিলিপাইনের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য রত্ন। বনের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় ও শুঁয়োপোকা দমন করে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে এই অপূর্ব পাখিগুলোর প্রাকৃতিক আবাসস্থল আজ হুমকির মুখে পড়ছে। তাই এই অনন্য জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে বনাঞ্চল রক্ষা করা এবং সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

মন্তব্যসমূহ