লন্ডন শহরের লেডেনহল স্ট্রিট। একটা বড় হলঘর। কয়েকজন মানুষ সেখানে বসে হাত তুলে তুলে ভোট দিচ্ছে। না, এটা কোনো দেশের জাতীয় নির্বাচন নয়। এরা সবাই একটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার, যাদের ভেতরে আছে ব্যবসায়ী, উকিল, জাহাজের মালিক, শ্রমিক থেকে শুরু করে পাড়ার দোকানদার এবং বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। তারা ভোট দিয়ে ঠিক করতেছে এ বছর কোম্পানির লাভের কত টাকা ঢুকবে তাদের পকেটে। আর ঠিক ওই একই মুহূর্তে লন্ডন থেকে ৮,০০০ কিলোমিটার দূরে বাংলার এক গ্রামে ওই কোম্পানিরই একজন কর্মচারী খাজনা তুলে হিসাব লিখতেছে। আরেকটু দূরে, ওই একই কোম্পানির পতাকার নিচে প্যারেড করতেছে কয়েক হাজার ভাড়াটে সৈন্য।
একটু ঠান্ডা মাথায় খেয়াল করুন। লন্ডনে এই কোম্পানিটা স্রেফ একটা পিওর কোম্পানি, যাদের আছে শেয়ারহোল্ডার, আছে বোর্ড অব ডিরেক্টরস, আছে ডিভিডেন্ড বা লাভের ভাগাভাগি। কিন্তু একই সময়ে ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে সেই একই কোম্পানি ট্যাক্স তোলে, বিচার করে, চুক্তি সই করে, আবার রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে।আমরা সবাই ছোটবেলায় পলাশী যুদ্ধের গল্প পড়ছি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমরা হয়তো সেভাবে করি না—সেটা হলো, এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জিনিসটা আসলে কি?
আট-দশটা সাধারণ কোম্পানির মতো যে নয়, সেটা সবাই বোঝে। একটা কোম্পানি যে ব্যবসা করে, আবার তার সেনাবাহিনীও আছে; আবার সে দেশ দখলও করে, সরকারও চালাতে পারে! বাহ্! তো কে ছিল এর মাথায়? সিদ্ধান্ত নিত কে? আর একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পেটের ভেতর থেকে গোটা একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো গজিয়ে উঠল কীভাবে?
আজ আমরা কোনো যুদ্ধের গল্প বলব না। আজ আমরা এই কোম্পানির মেকানিজমটা খুলে দেখব—একদম স্ক্রু বাই স্ক্রু। আর গল্পের মাঝখানে আপনি এমন একটা চরিত্রকে দেখবেন, যে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সামান্য কেরানির চাকরি নিয়ে জাহাজে উঠেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে। তার নাম রবার্ট ক্লাইভ। তার এই সিঁড়ি বেয়ে কোম্পানির ওপরে ওঠা দেখলেই আপনি বুঝে যাবেন এই কোম্পানিটা ভেতর থেকে ঠিক কেমন ছিল।
আজকের ভিডিওটা কেন গুরুত্বপূর্ণ জানেন? কারণ সামনের দিনগুলোতে Corporation will rule the world. এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কোম্পানি দেখবেন আবার ঘুরেফিরে আসবে। তো চলুন আজকের গল্প শুরু করি ১৬০০ সালের ইংল্যান্ড থেকে।
গল্পে ঢোকার আগে প্রথমে একটা শব্দ ক্লিয়ার করি, কারণ এই শব্দটি না বুঝলে সবকিছুই আপনার মাথার উপর দিয়ে যাবে। শব্দটা হলো রয়েল চার্টার (Royal Charter) বা রাজকীয় ফরমান। জিনিসটা খুবই সহজ। ধরুন, আপনি এবং আপনার কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা ব্যবসা শুরু করলেন—তেল-গ্যাস আমদানির ব্যবসা। অর্থাৎ, আপনার কোম্পানি বিদেশ থেকে তেল-গ্যাস কিনে দেশের বাজারে বিক্রি করবে। সরকারের সাথে আপনার খুব ভালো কানেকশন আছে। সরকার একটা কাগজে সিল মেরে লিখে দিল—আজ থেকে এই দেশে তেল-গ্যাস আমদানির ব্যবসা শুধু এরাই করবে, দেশের আর কেউ এই ব্যবসা করতে পারবে না। ব্যস, ওই সিল মারা কাগজটাই একটা সনদ বা সার্টিফিকেট, সোজা বাংলায় সরকারি অনুমতিপত্র। আর এই কাগজে যে জিনিসটি আপনাকে দেয়া হলো, সেটার নাম একচেটিয়া অধিকার বা Monopolies।
তাহলে এখন দেশে তেলের দাম ঠিক করবে কে? অবশ্যই আপনার কোম্পানি, কারণ মার্কেটে তো কোনো কম্পিটিটরই নেই, দরদামের কোনো সুযোগই নেই। এটাই হলো একচেটিয়া অধিকারের আসল ক্ষমতা।
এবার আসি সেই আসল ঘটনায়—১৬০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। রানি প্রথম এলিজাবেথ ঠিক এমনই একটা কাগজে সিল মেরে দিল। কোম্পানির নাম: Governor and Company of Merchants of London Trading into the East Indies। বাংলায়: লন্ডনের বণিকদের কোম্পানি, যারা পূর্ব ভারতে বাণিজ্য করে। পরে এটি সংক্ষেপে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে পরিচিত হয়।
রানির দেয়া ওই রয়েল চার্টারে কোম্পানিটিকে যুদ্ধ করার কোনো অধিকার দেয়া হয়নি, নিজস্ব সেনাবাহিনী তৈরির অধিকার দেয়া হয়নি, আর কোনো দেশ দখল করে শাসন করার অধিকার—সেটা তো প্রশ্নই ওঠে না! তাহলে ওতে কি ছিল? ছিল মাত্র ১৫ বছরের জন্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার, অর্থাৎ সেই মনোপলি। আর ছিল কোম্পানি চালানোর জন্য একজন গভর্নর সমেত ২৪ জনের একটি কমিটি—আজকের দিনের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের মতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর ছিল স্যার থমাস স্মিথ।
সেই রয়েল চার্টারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটি স্পেশাল ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কোম্পানির ভেতরের নিয়মকানুন তারা নিজেরাই বানাতে পারবে, সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করবে না। যেমন—মাসের পর মাস সমুদ্রে বা ভিন্ন দেশে থাকার সময় কোম্পানির কোনো কর্মচারী যদি চুরি-চামারি বা ক্রাইম করে, তবে কোম্পানি নিজেই তাকে শাস্তি দিতে পারবে, এবং সেই শাস্তি হবে কোম্পানির নিয়মে। মানে, নিজেদের কর্মীদের কন্ট্রোল করার একটা আইনি পাওয়ার দেয়া হলো।
ব্যাপারটা কেমন—আপনাকে বোঝানোর জন্য বলি: বাংলাদেশে তো চুরি করার সাজা হাত কাটা নয়। কিন্তু ধরুন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কোনো একটি কোম্পানিকে এরকম বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হলো, তারা তাদের নিজস্ব নিয়মে চলবে; আর সেই কোম্পানি আইন করল—কোম্পানির ভেতরে কেউ চুরি করে ধরা পড়লে হাত কাটতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এতে ইন্টারফেয়ার করতে পারবে না, ব্যাপারটা তেমন।
ব্যস, এভাবেই শুরু। স্টার্টিংটা ছিল স্রেফ একটা বণিক সমিতি হিসেবে, যার অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্ভর করে রানির ওই অনুমতিপত্র তথা ফরমানের উপরে। জর্জ ক্লিফোর্ড (Earl of Cumberland) এবং তার সাথে আরও ২১৮ জনের সম্মিলিত আবেদনের জবাবে ওই বিখ্যাত রয়েল চার্টার জারি করা হয়েছিল। জর্জ ক্লিফোর্ড ছিল রানির দরবারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর একজন লর্ড। এখানে কোনো বিরাট ষড়যন্ত্র ছিল না, স্রেফ একদল ব্যবসায়ী তদ্বির আর একটি রাজকীয় সই—এ থেকেই জন্ম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির।
এবার একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন নিজেকে করুন তো—রানি এই অনুমতি কেন দিয়েছিল? তার নিজের কি লাভ? খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়, কারণ এই জিনিসটা বর্তমান বাস্তবতার সাথেও মিলিয়ে নিতে পারবেন। ওই রাজকীয় ফরমান কোনো উপহার ছিল না, ওটা ছিল একটা পিওর লেনদেন বা ট্রানজেকশন। রাজা-রানির দরকার কাঁচা টাকা, আর কোম্পানির দরকার বাণিজ্যের অনুমতি বা মনোপলি।
প্রতিবার যখন রয়েল চার্টার রিভিউ বা নবায়ন করার সময় আসত, তখন দুই পক্ষের মধ্যে রীতিমতো দড়াদড়ি হতো। প্রমাণ? ১৬৯৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি কোম্পানির কাছ থেকে ২০ লক্ষ পাউন্ড ধার নিল, আর বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দিল বাণিজ্যের নতুন সনদ। মানে হলো, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া অধিকারে অন্য একটি কোম্পানি ভাগ বসাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেখল—এ তো মহা বিপদ! অনেক কাঠখড় পোড়াল তারা। পরে ১৭০৯ সালে এই দুই কোম্পানি মার্জ করে বা এক হয়ে যায়। তারা একসাথে মিলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ধার দিল ৩২ লক্ষ পাউন্ড। হিসাবটা বুঝলেন এবার? বোঝাই যাচ্ছে, রাজা-রানির আশেপাশে থাকা বহু সরকারি হর্তাকর্তা তথা হালআমলের ভাষায় আমলাদের ফায়দা হতো এতে। আমলারা দেখবেন আজও খুব পছন্দ করে বেসরকারি কোম্পানির উপরে সরকারি হস্তক্ষেপ করতে। আর এমনটি করলে লেনদেন তো হবেই, লেনদেন মানেই তো ফায়দা!
সে যুগে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে একটা জাহাজ আসা মানে বিশাল খরচ—জাহাজ তৈরি, নাবিকের বেতন, এক বছরের খাবার-দাবার, আর ভারতে এসে কেনাকাটার জন্য জাহাজ ভর্তি সোনা এবং রূপা। এত ইনভেস্টমেন্ট কোনো একজনের সাধ্যে কুলাত না। তাহলে উপায় কি? উপায় হলো—অনেকে মিলে চাঁদা দাও। কেউ বেশি, কেউ কম দেবে। জাহাজ যখন মালামাল সাথে নিয়ে ফিরে আসবে, তখন মালামাল বিক্রি করে যা লাভ হবে, তা ভাগ হবে। যে যত বেশি চাঁদা দিয়েছিল, সে তত বেশি ভাগ পাবে। ব্যস, ওই চাঁদার রসিদই হলো শেয়ার, আর বছর শেষে লাভের যে অংশ হাতে আসে তার নাম ডিভিডেন্ড।
কিন্তু আসল সমস্যাটা কোথায় ছিল জানেন? শুরুর দিকে ওই চাঁদা তোলা হতো প্রতিটি বাণিজ্য যাত্রার জন্য আলাদা আলাদা করে। জাহাজ ফিরল, মাল বিক্রি হলো, হিসাব চুকাল—আর সাথে সাথে সমিতি ভেঙে গেল! পরের যাত্রার জন্য আবার নতুন করে চাঁদা তোলা। এই ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী প্ল্যানিং করা কিন্তু অসম্ভব। কোম্পানি দুর্গ বানাতে পারে না, স্থায়ী কর্মী রাখতে পারে না, এমনকি কোনো বছর ব্যবসা খারাপ হলে ক্ষতি সামাল দিতেও পারে না।
তারপর এল ১৬৫৭ সাল। নিয়মটা চেঞ্জ হলো। বলা হলো—এবার থেকে চাঁদার টাকা প্রতি যাত্রা শেষে আর ফেরত যাবে না, টাকাটা কোম্পানির ভেতরে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। ফাইন্যান্সের ভাষায় এর নাম Permanent Joint Stock। পলাশী যুদ্ধের ১০০ বছর আগে, ১৬৫৭ সালের এই নতুন নিয়ম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ঠিক এই দিন থেকেই কোম্পানিটা আর এক ট্রিপের সমিতি টাইপ রইল না, সে হয়ে গেল একটা চলমান প্রতিষ্ঠান। এখন সে স্থায়ী কর্মী রাখতে পারে, দুর্গ বানাতে পারে, নেক্সট ১০ বছরের বিজনেস প্ল্যানিংও করতে পারে।
কোম্পানির মালিক কিন্তু হাজার হাজার শেয়ারহোল্ডার। যাদের কাছে শেয়ার আছে, তাদের সবাইকে নিয়ে হতো একটি বড় সভা। এই সভায় শেয়ারহোল্ডাররা ভোট দিয়ে বেছে নিত ২৪ জনের একটি পরিচালনা পর্ষদ, মানে কার্যনির্বাহী কমিটি। এবার এদের ভোটের নিয়মটি শুনুন—যার কাছে ৫০০ পাউন্ডের শেয়ার আছে তার ভোট একটা, আবার যার কাছে ৫,০০০ পাউন্ডের শেয়ার আছে তারও একটা ভোট!
এখন আপনি যদি ওই আমলের বড়লোক হইতেন, আপনার মাথায় কি আসবে? "আমার শেয়ার বেশি, তাহলে আমার ক্ষমতা বেশি নয় কেন? এটা তো কোনোভাবেই মানা যায় না!" তাহলে উপায় কি? উপায় হলো—শেয়ার ভেঙে ফেলো। বিষয়টি ক্লিয়ার করি, খেয়াল করে শুনুন। ধরুন, আপনার কাছে ১,০০০ পাউন্ডের শেয়ার আছে, আপনি সেটাকে ভেঙে ৫০০ পাউন্ডের দুটো শেয়ার করলেন। তারপর একটা টুকরা নিজের কাছে রাখলেন, আরেকটা লিখে দিলেন বিশ্বস্ত লোকের নামে—হোক পরিবারের কেউ অথবা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বা কর্মচারী। আপনার কন্ট্রোলে এসে গেল কিন্তু এখন দুটো ভোট! ঠিক এই তরীকায় কথার কথা যার হাতে কোম্পানির ২,৫০,০০০ শেয়ার আছে, সে ৫০০ ভাগ করতে পারবে এবং ৫০০ ভোট নিজের পক্ষে নিতে পারবে। এরপর ভোট শেষ হলে সব শেয়ার আবার নিজের করে নেবে।
১৭৬৭ সালে এই কারচুপি ঠেকাতে আইন হলো। নিয়ম করা হলো—ভোট দিতে হলে শেয়ারটা অন্তত ৬ মাস আগে কিনে রাখতে হবে। অর্থাৎ ন্যূনতম ৬ মাসের শেয়ারহোল্ডার হতে হবে ভোট দিতে হলে। ব্যস, ভোটের আগের দিন রাতে শেয়ার ভেঙে রাতারাতি নিজের পক্ষে ভোটিং পাওয়ার বাড়ানো এবার বন্ধ!
১৭৭৩ সালে নিয়ম আবার চেঞ্জ হয়। এবার বলা হলো—বেশি শেয়ার মানে বেশি ভোট, তবে সেটা সর্বোচ্চ ৪টি। ৪টির বেশি ভোট একজন শেয়ারহোল্ডার দিতে পারবে না।
শেয়ারহোল্ডাররা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করত ২৪ জন পরিচালক। এরপর পরিচালকেরা নিজেদের মধ্য থেকে বেছে নিত কোম্পানির চেয়ারম্যান। আপনার মনে হতে পারে, শুরুতেই তো বলেছিলাম গভর্নর—ওই সেই রয়েল ফারমানে ছিল গভর্নর, চেয়ারম্যান আসলো কীভাবে? আসলে সময়ের সাথে সাথে লন্ডনে কোম্পানির প্রধানকে বলা শুরু হলো চেয়ারম্যান, আর গভর্নর উপাধিটা ভারতে পাঠানো কোম্পানির বড় হর্তাকর্তাদের দেয়া হলো।
চেয়ারম্যান পদ ছিল মাত্র এক বছরের জন্য। ঠিক এই জন্যই এই কোম্পানির কোনো সুনির্দিষ্ট মালিক বা সিইও ছিল না। যাই হোক, তো যুদ্ধ করার বা সৈন্য রাখার ক্ষমতা কীভাবে পেল?
স্টার্টিংটা ছিল একদম সাদা-মাটা। কোম্পানির গুদামে মালামাল থাকে, সিন্দুকে টাকা থাকে—পাহারা তো লাগবেই! তাই দরকার ছিল কয়েকজন প্রহরী। এটুকু যেকোনো ব্যবসায়ীরই দরকার। এভাবেই গড়ে উঠল পাহারাদার বাহিনী।
১৬৬১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস নতুন একটি ফরমানে কোম্পানিকে দিল দুর্গ বানানোর অধিকার, আর সেই সাথে ক্রিশ্চিয়ান নয় এমন রাজাদের সাথে যুদ্ধ বা শান্তি চুক্তির অধিকার। এরপর ১৬৮৭ সালের সনদে রাজা দ্বিতীয় জেমস দিল আরও ভয়ংকর ক্ষমতা—প্রাইভেট মিলিটারি তৈরির অধিকার! ভাবতে পারেন, একটি কোম্পানিকে ইংল্যান্ডের রাজা-রানিরা কীভাবে ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রীয় রূপ দিচ্ছিল?
আর এই আইনি ক্ষমতা পেয়েই কোম্পানি কি করল জানেন? ১৬৮৬ সালে সরাসরি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসল! তবে সে সময় মুঘল সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর অন্যতম ধনী এবং শক্তিশালী, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি? কয়েকটা বন্দর এবং কয়েকটা গুদামওয়ালা বিদেশী বণিক দল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কি আর মুঘলদের সাথে তখন পারে? শোচনীয় পরাজয় হলো তাদের, নাকখত দিয়ে, ক্ষমা চেয়ে আর বিশাল জরিমানা দিয়ে তবে তাদের রক্ষা হলো।
কিন্তু মোড় ঘুরে গেল ১৭৪০-এর দশকে, দক্ষিণ ভারতে। সেখানে ফরাসীরা নতুন একটা জিনিস দেখিয়ে দিল। তারা দেখাল, অল্প কিছু ইউরোপীয় কায়দায় প্রশিক্ষিত সৈন্য এবং কামান থাকলে স্থানীয় রাজাদের ভেতরকার ইন্টারনাল যুদ্ধে যেকোনো পক্ষের হয়ে কন্ট্রিবিউট করা যায়, নির্ণায়কের ভূমিকা নেয়া যায়। আর যে রাজাকে সাপোর্ট দিচ্ছে সে যদি ক্ষমতা পেয়ে যায়, পুরস্কার তো আছেই! মানে হলো—সৈন্য এখন শুধু পাহারা দেয়ার জন্য না, সৈন্য এখন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
ইংরেজরা ঠিক এই মডেলটাই নকল করল। আমরা অনেকেই মনে করি, সেই লাল কোট পরা হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্য বুঝি ব্রিটেন থেকে ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে এসে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু রিয়েলিটি সম্পূর্ণ আলাদা! কোম্পানির সেনাবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল বেতনভোগী ইন্ডিয়ান সৈন্য, যাদের বলা হতো সিপাহী। আর অফিসার পদগুলো—সেগুলো ছিল একচেটিয়া ইংরেজদের জন্য সংরক্ষিত।
এবার নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—ইংল্যান্ডের সাধারণ মানুষ এই কোম্পানির শেয়ার কিনত কেন? শুধু কি বছর শেষে লাভের ভাগের আশায়? না, ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে এই কোম্পানির হিডেন গেম!
একবার ভাবুন তো—ওই যে ২৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হলো, তারা আসলে কি করত? তারা ঠিক করত কোম্পানির হয়ে ভারতে কাকে কাকে পাঠানো হবে। সামান্য কেরানি থেকে শুরু করে সেনা অফিসার, এমনকি ডাক্তার—ইচ অ্যান্ড এভরি নিয়োগ তাদের হাত দিয়েই হতো। সে যুগে একজন ইংরেজের কাছে ভারতে যাওয়া মানেই হলো কয়েক বছরের মধ্যে বস্তা ভর্তি টাকা কামিয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়া।
এবার পুরো হিসাবটি একটু মেলান—ধরুন আপনি একজন ইংরেজ। আপনি যদি কোম্পানির শেয়ার কেনেন, তার মানে আপনি পরিচালক নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। আর আপনি যাকে ভোট দিয়ে ডিরেক্টর বানাবেন, তার কাছে গিয়ে আপনি খুব সহজেই একটা সুপারিশ করতে পারবেন—"ভাই, আমার ভাগনেটাকে একটা চাকরি দিয়ে দিন।" তার মানে কি দাঁড়াল? শেয়ার কেনা মানে শুধু লাভের আশায় বিনিয়োগ করা নয়, শেয়ার কেনা মানে হলো তদ্বির করার ক্ষমতা পাওয়া! ইংরেজিতে এই সিস্টেমকে বলে Patronage। আর বাংলায় আমরা এই জিনিসটাকে খুব ভালো করেই চিনি—সুপারিশ, তদ্বির কিংবা মামা-চাচার লিংক!
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসত কারা? উত্তর হলো—১৬ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলেপেলেই বেশি। কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো ডিগ্রি নেই; শুধু একজন পরিচালকের সুপারিশ, একটা চুক্তিতে সই, আর একটা জাহাজের টিকিট! ব্যস, কোম্পানির চাকরিতে ঢুকতে হতো সবচেয়ে নিচের ধাপে, পদের নাম রাইটার (Writer)।
এদের কাজ ছিল সারাদিন লেখা—চিঠি লেখা, গুদামের খতিয়ান লেখা, নগদের হিসাব রাখা, আর কাপড়ের গাট প্যাক হওয়ার সময় স্রেফ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। এরপর অভিজ্ঞতা বাড়লে ধাপে ধাপে প্রমোশন—প্রথমে ফ্যাক্টর, তারপরে জুনিয়র মার্চেন্ট এবং শেষে সিনিয়র মার্চেন্ট।
এই মার্চেন্ট কিন্তু একটি পদমর্যাদা, ঠিক আমাদের দেশের সরকারি চাকরির গ্রেডের মতো। একজন সিনিয়র মার্চেন্টকে বসিয়ে দেয়া হতে পারে খাজনা আদায়ে, কিংবা বিচারকের আসনে, কিংবা নবাবের দরবারে কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে। মানে পদমর্যাদা দেখে বলা যেত লোকটি কত বছর ধরে চাকরিতে আছে।
এবার একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় বলি—এদের বেতন ছিল অনেক কম, এতটাই কম যে ওই বেতনে ভারতে টিকে থাকা অনেক কঠিন ছিল। কিন্তু আমি যে শুরুতে বলেছিলাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি অনেক লুকোভেটিভ, ভারতে আসা মানেই বড়লোক হয়ে যাওয়া? হ্যাঁ, সেটাও ঠিক, রহস্যটা বলি।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের একটা স্পেশাল অনুমতি দেয়া ছিল। বলা ছিল—এশিয়ার ভেতরে তারা চাইলে নিজেরা ব্যক্তিগত ব্যবসা করতে পারবে, সাইড বিজনেস। অর্থাৎ কোম্পানির চাকরিও করবে, সাথে নিজে যদি কোনো ব্যবসা বা ধান্দা করতে শুরু করে সেটাও করতে পারবে। তাদের মোটা টাকা আসত এসব সাইড বিজনেস থেকে!
ব্যাপারটা একটু এভাবে বলি—কোম্পানি কার্যত তার কর্মচারীদের বলতেছে, "আমি তোমাকে সামান্য বেতন দেব ঠিকই, কিন্তু তোমাকে এমন একটি চেয়ারে বসাব যেখান থেকে তুমি নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে পারবা।" মানে হলো, তাদের প্রমোশনের সিঁড়িটা আসলে বেতন বাড়ার সিঁড়ি ছিল না, ওটা ছিল একটা লুকোভেটিভ চেয়ার পাওয়ার লাইন। আমাদের দেশে দেখবেন একই চাকরি, একই বেতন, একই গ্রেড, কিন্তু তারপরও কোনো পদ লুকোভেটিভ আবার কোনো পদ পানিশমেন্ট পোস্টিং—বেতন কিন্তু একই! তাহলে একই পদমর্যাদার চাকরি একটা লুকোভেটিভ এবং অন্যটি কম লুকোভেটিভ হয় কীভাবে? উত্তর আপনি জানেন, সুতরাং আমি এখানে ভেঙে বলব না।
১৭৫৭ সালের আগে এই সিস্টেমে খুব একটা সমস্যা ছিল না, কারণ কোম্পানির কর্মচারীরা তখন অন্য দশজন সাধারণ ব্যবসায়ীর মতোই বাজারে পাল্লা দিত। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন তাদের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা চলে গেল—অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের সেই পলাশী যুদ্ধের পর।
খুব সহজ একটা উদাহরণ দেই—ধরুন আপনার এলাকায় একজন ফলমূল ব্যবসায়ী আছে। কাল যদি তাকেই আপনার এলাকার পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট বানিয়ে দেয়া হয়, তাহলে কি হবে? সে কি আর সৎভাবে ব্যবসা করবে? সে তো তার পুলিশি ক্ষমতা খাটিয়ে বাকি সব ফলের দোকানের ব্যবসা বন্ধ করে দেবে! ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের অবস্থা হলো ঠিক তেমনই। যে লোক নিজে ব্যবসা করে, সেই লোকটাই পলাশী যুদ্ধের পর হয়ে গেল বিচারক-পুলিশ, আবার তার হাতেই সেনাবাহিনী!
ইংরেজিতে একেই বলে Conflict of interest বা স্বার্থের সংঘাত। আর এই সিঁড়ি বেয়েই উপরে উঠেছিল আজকের গল্পের মূল চরিত্র—রবার্ট ক্লাইভ।
১৭৪৩ সাল, ১৮ বছর বয়সে রাইটার পদে চাকরি পেল রবার্ট ক্লাইভ। তিনি ১৭৪৩ সালে ইংল্যান্ড থেকে রওনা দিল, গন্তব্য ভারতের মাদ্রাজ। কিন্তু তার জাহাজ পড়ল ঝড়ের কবলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এবং এজন্য বাধ্য হয়ে ব্রাজিলের একটি বন্দরে প্রায় ৯ মাস থেমে রইল মেরামতের জন্য। প্রশ্ন হলো ব্রাজিল কেন? ভুলে যাবেন না, সে সময় জাহাজ আসত সেই ভাস্কো দা গামার রুট ধরে—আজকের দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে দিয়ে ঘুরে। আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এজন্য জাহাজ চলে যায় ব্রাজিলে।
যাই হোক, জাহাজ মেরামত করে এরপর মাদ্রাজ বা চেন্নাই পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১৭৪৪ সালের মাঝামাঝি সময় হয়ে গেল। মাদ্রাজে রবার্ট ক্লাইভ সেই বোরিং কেরানির কাজ করত—চিঠি লিখত, খতিয়ান, চালান এসব বানাত।
দেখুন, আমরা ইতিহাস পড়ি খুব সাদা-মাটা ভাবে। কিন্তু ইতিহাস তো এত সাদা-মাটা না! ভারতীয় উপমহাদেশের মাটি দখলের আগে ইংরেজ, ডাচ, পর্তুগিজ, ফরাসীরা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করেছে ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর আর আরব সাগরে। এদের নিজেদের ভেতরে ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা।
১৭৪৬ সালে ফরাসীরা এসে মাদ্রাজ দখল করে নিল, সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা লাটে উঠল। আর ঠিক তখন, ১৭৪৭ সালে ক্লাইভ একটা অদ্ভুত কাজ করল। সে নিজে থেকেই চেয়ে নিল কোম্পানির সেনাবাহিনীর একেবারে সবচেয়ে নিচু অফিসারের পদ!
এখানে একটা জিনিস পরিষ্কার করা খুব জরুরি। তখন ভারতে মূলত দুই ধরনের ব্রিটিশ সেনা ছিল—একদিকে ছিল কোম্পানির পোষা প্রাইভেট সেনা বা ভাড়াটে সৈন্য (অর্থাৎ কোম্পানি সেনাবাহিনী), আর অন্যদিকে ছিল ব্রিটিশ সরকারের পাঠানো সরকারি সেনা।
আপনার প্রশ্ন জাগতে পারে—ব্রিটিশ রাজার সরকারি সেনা ভারতে ঢুকল কীভাবে? উত্তর হলো—ঐ সময় দক্ষিণ ভারতে ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় রাইভাল ছিল ফরাসীরা। ফরাসীরা তাদের দেশ থেকে সরকারি সেনা এনে ব্রিটিশদের ঘাঁটিগুলো দখল করা শুরু করে। ফরাসীদের এই সরকারি সেনাকে ঠেকাতেই ব্রিটিশ রাজাও বাধ্য হয়ে তার নিজস্ব সেনাবাহিনী পাঠায় ভারতে থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাঁচাতে।
এখন প্রশ্ন হলো, স্থানীয় রাজারা বা মুঘল সম্রাট এসব অ্যালাউ করল কেন? উত্তর হলো—ঘরে যদি বিবাদ থাকে, বাইরের মানুষ তো সুযোগ নেবেই! স্থানীয় রাজারা এটা অ্যালাউ করেছিল কারণ তারা নিজেরাই তখন ক্ষমতার লোভে নিজেদের ভেতরে মারামারি করতেছিল। তারা নিজেরাই ব্রিটিশ এবং ফরাসীদের কাছে গিয়ে সামরিক সাহায্য চাচ্ছিল। যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বড় কোনো যুদ্ধ হতো, তখন কোম্পানির প্রাইভেট আর্মি এবং ইংল্যান্ডের রাজার সরকারি সেনা একসাথে যুদ্ধ করত।
রবার্ট ক্লাইভ প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাইভেট মিলিটারিতে যোগ দিল। এরপর সে কিছুদিনের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যায়। ১৭৫৫ সালে ক্লাইভ আবার ভারতে ফিরে এল। কোম্পানির প্রাইভেট সেনাবাহিনীতে তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু লন্ডনে কোম্পানির ডিরেক্টররা ব্রিটিশ সরকারের কাছে রীতিমতো তদ্বির করে ক্লাইভের জন্য সরকারি সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট কর্নেল (Lieutenant Colonel) পদটি আদায় করে নিল!
জাস্ট একবার চিন্তা করে দেখুন—একটি প্রাইভেট কোম্পানি ব্রিটিশ রাজার কাছে দরখাস্ত করতেছে যাতে তাদের কর্মচারীকে একটা সরকারি র্যাংক বা উপাধি দেয়া হয়! কিন্তু কিসের জন্য? কারণ হলো, যুদ্ধের মাঠে রাজার সরকারি সেনা অফিসাররা কোম্পানির—
...কোম্পানির প্রাইভেট অফিসারদের মানতে চাইত না। কারণ সে যুগে রাজার অফিসারের ভাবই আলাদা! কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টররা ক্লাইভকে সেই পাওয়ারফুল সরকারি র্যাংক পাইয়ে দিল, যাতে যুদ্ধের মাঠে সব ব্রিটিশ সেনা—তা সে কোম্পানির হোক কিংবা রাজার—এককথায় ক্লাইভের হুকুম মেনে চলে।
ঠিক এই জায়গাটাতেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আসল শয়তানিটা লুকিয়ে ছিল। তারা একদিকে ব্রিটেনের শেয়ারহোল্ডারদের বলত "আমরা স্রেফ একটা সাধারণ কোম্পানি", অন্যদিকে রানি-রাজাদের থেকে আইন বাগিয়ে নিত, আবার দরকার পড়লে ব্রিটিশ সরকারের সেনাবাহিনীকেও নিজেদের প্রাইভেট এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করত!
এই মাস্টারপ্যান নিয়েই ১৭৫৬ সালে ক্লাইভ এল বাংলায়। বাকি ইতিহাস তো আমাদের সবার জানা। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে চক্রান্ত করে হারিয়ে দিল ক্লাইভ। কিন্তু পলাশী জয়ের পর কোম্পানি কি করল, সেটাই হলো তাদের আসল ইনভেস্টমেন্ট গেম।
পলাশীর পর ক্লাইভ এবং কোম্পানি নবাবের খজনা খালি করে কোটি কোটি টাকা লুট করল। ক্লাইভ একাই তখনকার দিনে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার পাউন্ড উপহারের নামে পকেটে পুড়ল! আর বাংলায় বসিয়ে দিল তাদের পাপেট নবাব মীর জাফরকে। এর কয়েক বছর পর, ১৭৬৫ সালে কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাগিয়ে নিল "দেওয়ানি" বা ট্যাক্স তোলার আসল ক্ষমতা।
এবার একটু থমকে ভাবুন—দেওয়ানি পাওয়ার আসল মানেটা কি?
এতদিন কোম্পানিকে ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রূপা এনে ভারতের কাপড়, মশলা, চা কিনতে হতো। কিন্তু দেওয়ানি পাওয়ার পর আর ব্রিটেন থেকে এক পয়সাও আনতে হলো না! বাংলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই তারা জোর করে ট্যাক্স তুলত, আর সেই ট্যাক্সের টাকা দিয়েই বাংলার তাঁতিদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনে জাহাজে করে ইউরোপে পাঠাত। অর্থাৎ, আমাদের টাকায় কেনা আমাদের পণ্য বিক্রি করে লাভ করত লন্ডনের শেয়ারহোল্ডাররা!
একটি প্রাইভেট কোম্পানি একটা আস্ত দেশের ট্যাক্স ব্যবস্থা নিজের পকেটে নিয়ে নিল—পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বড় করপোরেট ডাকাতি আর কখনো ঘটেনি।
কিন্তু অতিরিক্ত লোভের পরিণতি যা হওয়ার তাই হলো। ১৭৭০ সালে বাংলায় এল এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (৭৬-এর মন্বন্তর)। কোম্পানির কর্মচারীরা ধানের একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করল, চালের দাম বাড়িয়ে দিল আকাশচুম্বী, আর লোক না খেয়ে মরলেও ট্যাক্স তোলা থামাল না। বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেয়ে মারা গেল।
দেওয়ানি পাওয়ার পর যা ঘটার কথা সেটাই ঘটল:
বাংলা ধ্বংস: দেওয়ানি পাওয়ার মাত্র ৫ বছরের মধ্যে বাংলা পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেল।
কোম্পানির কর্মচারী বনাম কোম্পানি: কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসা করে রাতারাতি ট্রিলিয়নিয়ার হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে প্রাসাদ বানাল (যাদের বলা হতো Nabob)। কিন্তু কর্মচারীরা বড়লোক হলেও অতিরিক্ত দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে কোম্পানি নিজে দেউলিয়া হওয়ার পথে বসে গেল!
১৭৭৩ সালের বেলআউট: কোম্পানি ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছে গিয়ে ১৪ লক্ষ পাউন্ড ঋণ বা বেলআউট চাইল।
ঠিক তখনই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কড়া নাড়ল। তারা বুঝল—একটা প্রাইভেট কোম্পানি এখন এত বড় রাক্ষস হয়ে গেছে যে, তাকে আর শুধু কোম্পানির নিয়মে চলতে দেওয়া যায় না। ১৭৭৩ সালে পাস হলো Regulating Act। গভর্নর জেনারেল পদ তৈরি হলো, ওয়ারেন হেস্টিংস এলেন, আর কোম্পানির প্রাইভেট রাজত্বের ওপর ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বসানো শুরু হলো।
অবশেষে আসে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ (সিপাহী বিদ্রোহ)। সিপাহীদের সেই বিদ্রোহে কোম্পানির রাজত্ব কেঁপে ওঠে। কোম্পানিকে দিয়ে আর দেশ চালানো সম্ভব নয় বুঝে ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Government of India Act পাস করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পুরোপুরি ক্ষমতাচ্যুত করে। ভারতের পুরো শাসনভার সরাসরি চলে যায় ব্রিটিশ রানির হাতে (British Crown)। আর যে কোম্পানি ২০০ বছর ধরে গোটা উপমহাদেশে তাণ্ডব চালাল, ১৮৭৪ সালে এক ডিক্রি জারি করে সেই কোম্পানিকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। মূল শিক্ষাটা কি?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের শিখিয়ে গেছে—রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা আর সৈন্যবাহিনী যখন কোনো প্রাইভেট করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তখন ব্যবসার নামে সেখানে কেবল শোষণ আর লুণ্ঠনই টিকে থাকে। আজ শত বছর পর যখন বড় বড় টেক ও গ্লোবাল করপোরেট জায়ান্টরা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন মনে রাখবেন—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেই ভূত আজও নানা রূপ ধরে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে!