মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ||গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ

 

গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ আসলে কী ও এর সূত্রপাত?

গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ আসলে কী ও এর সূত্রপাত? 

​মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে মানুষ হাজার বছর ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা এতদিন মহাবিশ্বকে দেখেছি আলোর মাধ্যমে—সেটা দৃশ্যমান আলো হোক কিংবা এক্স-রে বা রেডিও তরঙ্গ। কিন্তু ২০১৫ সালে বিজ্ঞান জগত এমন এক শক্তির সন্ধান পায়, যা আমরা চোখ দিয়ে দেখি না, বরং অনুভব করি মহাকাশের "ফেব্রিক" বা বুননের কম্পন হিসেবে। এই বিশেষ কম্পনকেই বলা হয় গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ

​আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা জানবো গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ আসলে কী, এর পেছনের বিজ্ঞান এবং কীভাবে আলবার্ট আইন্সটাইন ১০০ বছর আগেই এর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

​১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আসলে কী?

​সহজ ভাষায় বলতে গেলে, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ হলো মহাকাশের স্থান-কাল (Space-time) এর মধ্যে তৈরি হওয়া অদৃশ্য ঢেউ বা তরঙ্গ।

​কল্পনা করুন, একটি শান্ত পুকুরের মাঝখানে একটি বড় পাথর ছুড়ে মারা হলো। পাথরটি পড়ার সাথে সাথে পানির ওপর যেমন ঢেউ তৈরি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি মহাকাশে যখন বিশাল ভরের কোনো বস্তু (যেমন ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টার) প্রচণ্ড গতিতে নড়াচড়া করে বা একে অপরের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন মহাকাশের বুননে বা 'স্পেস-টাইম ফেব্রিক'-এ এক ধরণের ঢেউ তৈরি হয়। এই ঢেউই হলো গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ।

​আইন্সটাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (General Theory of Relativity) অনুযায়ী, মহাকর্ষ কোনো সাধারণ বল নয়, বরং এটি স্পেস-টাইমের বক্রতা। যখন কোনো ভরযুক্ত বস্তু ত্বরান্বিত (Accelerated) হয়, তখন সেই বক্রতা ঢেউয়ের মতো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

​২. মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ইতিহাস ও সূত্রপাত

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ নিয়ে আলোচনার শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে।

  • আইন্সটাইনের ভবিষ্যদ্বাণী (১৯১৬): ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইন্সটাইন তাঁর জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি প্রকাশ করেন। এর ঠিক এক বছর পর ১৯১৬ সালে তিনি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ থাকা উচিত। তবে তিনি নিজেই সংশয়ে ছিলেন যে মানুষ কোনোদিন এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারবে কি না।
  • কেন এই সংশয় ছিল? গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ এতটাই দুর্বল যে, এটি যখন পৃথিবী দিয়ে অতিক্রম করে, তখন এটি একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়েও কম পরিমাণে স্থানকে সংকুচিত বা প্রসারিত করে। সেই সময়ের প্রযুক্তিতে এটি ধরা ছিল প্রায় অসম্ভব।
  • পরোক্ষ প্রমাণ (১৯৭৪): রাসেল হালস এবং জোসেফ টেলর একটি বাইনারি পালসার (দুটি নিউট্রন স্টার যারা একে অপরকে প্রদক্ষিণ করছে) পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখেন যে, এই নক্ষত্র দুটি একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে এবং শক্তি হারাচ্ছে। তাদের এই শক্তির হার আইন্সটাইনের গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ সমীকরণের সাথে হুবহু মিলে যায়। এর জন্য তারা ১৯৯৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

​৩. স্পেস-টাইম ফেব্রিক: মহাকর্ষের আসল মঞ্চ

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বুঝতে হলে স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল ধারণাটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। বিজ্ঞানের ভাষায়, মহাবিশ্ব তিনটি স্থানিক মাত্রা (লম্বা, চওড়া, উচ্চতা) এবং একটি সময় মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত একটি চাদর বা ফেব্রিক।

​আইন্সটাইন শিখিয়েছেন যে, ভারী বস্তু এই চাদরের ওপর বসলে চাদরটি বেঁকে যায়। সূর্য আমাদের সৌরজগতের স্পেস-টাইমকে বাঁকিয়ে রেখেছে বলেই পৃথিবী তার চারদিকে ঘুরছে। এখন এই ভারী বস্তুটি যদি স্থির না থেকে প্রচণ্ড বেগে কাঁপতে থাকে বা অন্য কোনো ভারী বস্তুর সাথে ধাক্কা খায়, তবে সেই চাদরে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, সেটাই গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ।

​৪. গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের উৎসগুলো কী কী?

​সব বস্তু নড়াচড়া করলেই গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি হয় না যা আমরা শনাক্ত করতে পারি। আমাদের শনাক্ত করার মতো শক্তিশালী তরঙ্গ তৈরি করতে হলে বিশাল ভরের প্রয়োজন। প্রধান উৎসগুলো হলো:

  1. ব্ল্যাক হোল মার্জার: দুটি বিশাল ব্ল্যাক হোল যখন একে অপরের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে একীভূত হয়ে যায়।
  2. নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ: মৃত নক্ষত্রের অত্যন্ত ঘন পিণ্ড বা নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ।
  3. সুপারনোভা: যখন কোনো বিশাল নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ঘটে।
  4. বিগ ব্যাং: মহাবিশ্ব সৃষ্টির একদম শুরুর মুহূর্তের অবশিষ্টাংশ তরঙ্গ।

​৫. বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চায় গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের গুরুত্ব

​বাংলাদেশ এখন মহাকাশ গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ নিয়ে পড়াশোনা করা মানে হলো মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামো নিয়ে কাজ করা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় এই বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

​৬. গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ ও আলোর মধ্যে পার্থক্য

​অনেকে মনে করতে পারেন গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ হয়তো এক ধরণের আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। কিন্তু এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে:

বৈশিষ্ট্য তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ (আলো) গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ
উৎস পরমাণু বা ইলেকট্রনের গতি বিশাল ভরের ত্বরণ (যেমন ব্ল্যাক হোল, নিউট্রন স্টার)
মাধ্যম পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, বাধা পেতে পারে প্রায় কোনো কিছুতেই বাধা পায় না
গতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার (আলোর সমান)
ধরন পদার্থের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে স্বয়ং স্থান-কালকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে

৭. এই আবিষ্কার কেন বৈপ্লবিক?

​এতদিন আমরা মহাবিশ্বকে শুধু "দেখতাম"। গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ আবিষ্কারের ফলে আমরা এখন মহাবিশ্বকে "শুনতে" পারছি। এটি আমাদের জন্য মহাবিশ্বের একটি নতুন ইন্দ্রিয় খুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা এমন সব ব্ল্যাক হোল বা মহাজাগতিক ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছি যা কোনো টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা সম্ভব ছিল না।

প্রাসঙ্গিক তথ্য: ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো যখন এই তরঙ্গ শনাক্ত করা হয় (GW150914), তখন সেটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। এটি প্রমাণ করেছিল আইন্সটাইন ১০০ বছর আগে যা ভেবেছিলেন তা একদম সঠিক ছিল।


গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেবল বিজ্ঞানের একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য বোঝার চাবিকাঠি। এর সূত্রপাত হয়েছিল আইন্সটাইনের মস্তিস্কে, আর আজ আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা সেই তরঙ্গকে ধরতে পারছি। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের কল্পনাশক্তি এবং গাণিতিক সত্য কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

​FAQ - গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ কি মানুষের শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে?

না। এই তরঙ্গ যখন পৃথিবী দিয়ে যায়, তখন এটি এতটাই সূক্ষ্মভাবে আমাদের সংকুচিত বা প্রসারিত করে যে তা অনুভব করা অসম্ভব। এটি কোনো ক্ষতিকর রেডিয়েশন নয়।

২. এটি কি আলোর গতিতে চলে?

হ্যাঁ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শূন্যস্থানে আলোর গতিতে (c \approx 3 \times 10^8 m/s) ভ্রমণ করে।

৩. বাংলাদেশে কি এই বিষয়ে গবেষণা হয়?

বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে তাত্ত্বিক মহাকর্ষ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এবং তরুণ শিক্ষার্থীরা বিশ্বজুড়ে LIGO-র মতো প্রজেক্টে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ কবে ধরা পড়ে? মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্ব কি? 

​বিজ্ঞান জগতের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যা মানবজাতির চিন্তাধারাকে চিরতরে বদলে দেয়। ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ছিল তেমনই একটি দিন। প্রায় ১০০ বছর আগে আলবার্ট আইন্সটাইন যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন, তা শেষমেশ প্রমাণিত হয়। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের মাহেন্দ্রক্ষণ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্বের গভীর গাণিতিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে।

​১. প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ ধরা পড়ার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

​২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৫১ মিনিটে (UTC 09:51) আমেরিকার দুটি অত্যাধুনিক ডিটেক্টর— LIGO (Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory)—এ প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেত ধরা পড়ে। এই সংকেতটির নাম দেওয়া হয় GW150914

​আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট:

​এই তরঙ্গটি এসেছিল পৃথিবী থেকে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন (১৩০ কোটি) আলোকবর্ষ দূরে দুটি দানবীয় ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে। এই দুটি ব্ল্যাক হোলের ভর ছিল আমাদের সূর্যের ভরের যথাক্রমে ২৯ গুণ এবং ৩৬ গুণ। সংঘর্ষের মুহূর্তে তারা একীভূত হয়ে ৬২ গুণ সৌর ভরের একটি বিশাল ব্ল্যাক হোল তৈরি করে।

​এখানে মজার এবং বিস্ময়কর তথ্য হলো, বাকি ৩ গুণ সৌর ভর সরাসরি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ হিসেবে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আইন্সটাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2 অনুযায়ী এই শক্তির পরিমাণ এতটাই বিশাল ছিল যে, সেই মুহূর্তে এটি মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্রের মোট আলোর চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল।

​কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

​এই আবিষ্কারের খবর বিশ্ববাসীকে জানানো হয় ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে। এটি শুধুমাত্র আইন্সটাইনের সত্যতা প্রমাণ করেনি, বরং এটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবার সরাসরি ব্ল্যাক হোল পর্যবেক্ষণের ঘটনা।

​২. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্ব কী? (The Theory of Gravitational Waves)

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের নিউটনীয় মহাকর্ষ এবং আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

​নিউটনের ধারণা বনাম আইন্সটাইনের বিপ্লব

​স্যার আইজ্যাক নিউটন মনে করতেন মহাকর্ষ হলো দুটি বস্তুর মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক আকর্ষণ বল। অর্থাৎ, সূর্য যদি হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, তবে পৃথিবী মুহূর্তের মধ্যেই কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হবে।

​কিন্তু আইন্সটাইন বললেন, মহাবিশ্বে কোনো কিছুই আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। তিনি মহাকর্ষকে 'বল' না বলে 'স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেন।

​জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি (১৯১৫)

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো আইন্সটাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর মূল কথা হলো:

  • ​মহাবিশ্বে Space (স্থান) এবং Time (কাল) একে অপরের সাথে বোনা একটি চাদরের মতো, যাকে বলা হয় Spacetime Fabric
  • ​ভরযুক্ত বস্তু এই চাদরকে বাঁকিয়ে দেয়। এই বাঁক বা বক্রতাই হলো মহাকর্ষ।
  • ​যখন কোনো বিশাল ভরের বস্তু ত্বরান্বিত হয় (যেমন দুটি ব্ল্যাক হোল একে অপরকে প্রদক্ষিণ করছে), তখন তারা এই স্পেস-টাইম চাদরে ঢেউ সৃষ্টি করে। এই ঢেউই আলোর গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

​৩. গাণিতিক ভিত্তি: আইন্সটাইন ফিল্ড ইকুয়েশন

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, এটি অত্যন্ত জটিল গাণিতিক সমীকরণের ফল। আইন্সটাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন হলো:



​৪. মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য

​তত্ত্ব অনুযায়ী, এই তরঙ্গের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্য সব তরঙ্গ থেকে আলাদা করে:

  1. অনুপ্রস্থ তরঙ্গ (Transverse Wave): এটি তার গতির অভিমুখে লম্বভাবে স্পেস-টাইমকে সংকুচিত এবং প্রসারিত করে।
  2. চতুর্মাত্রিক মেরুকরণ (Quadrupole Radiation): মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরির জন্য ভরের বিন্যাসে একটি নির্দিষ্ট ধরণের অপ্রতিসাম্য (Asymmetry) থাকতে হয়। একটি গোলক যদি সমানভাবে সংকুচিত বা প্রসারিত হয়, তবে কোনো তরঙ্গ তৈরি হবে না।
  3. অত্যন্ত দুর্বল মিথস্ক্রিয়া: এই তরঙ্গ যে কোনো বস্তুর মধ্য দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই চলে যেতে পারে। এমনকি পৃথিবী বা সূর্যের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ও এটি শোষিত হয় না। এ কারণেই এটি মহাবিশ্বের একদম শুরু বা বিগ ব্যাং-এর তথ্য বহন করতে সক্ষম।

​৫. বাংলাদেশে এই তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা ও শিক্ষা

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ফিজিক্স অলিম্পিয়াড এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তত্ত্ব এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চতর সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত।

​তরুণ গবেষকদের জন্য এটি একটি নতুন দিগন্ত। কারণ, এতদিন আমরা মহাবিশ্বকে শুধু তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ (আলো, এক্স-রে) দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতাম। এখন বাংলাদেশে বসেও গবেষকরা LIGO-এর ওপেন সোর্স ডেটা ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্ল্যাক হোল মার্জার বা নিউট্রন স্টারের রহস্য নিয়ে কাজ করতে পারছেন।

​৬. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেন 'অদৃশ্য' ছিল এতদিন?

​তত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও ১০০ বছর কেন লেগেছে এটি শনাক্ত করতে? এর প্রধান কারণ হলো এর তীব্রতা বা 'অ্যামপ্লিটিউড' অত্যন্ত কম।

​আইন্সটাইন নিজেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনোদিন ধরা পড়বে না। কারণ, একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যখন আমাদের ওপর দিয়ে যায়, তখন এটি পৃথিবীর ব্যাসকে একটি প্রোটন কণার ১০০০ ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ পরিবর্তন করে। এই অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন মাপার মতো প্রযুক্তি তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক সময় লেগেছে।


​প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত হওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি আবিষ্কার নয়, এটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিজয়। এটি প্রমাণ করেছে যে মহাবিশ্ব কেবল পদার্থের সমষ্টি নয়, এটি একটি জীবন্ত বুনন যা প্রতিনিয়ত কাঁপছে। আইন্সটাইনের তত্ত্ব আজ আর কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে বোঝার হাতিয়ার।

​FAQ -  গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. প্রথম আবিষ্কৃত তরঙ্গের নাম GW150914 কেন রাখা হয়েছিল?

এর নামকরণ করা হয়েছে আবিষ্কারের তারিখ অনুযায়ী। GW মানে Gravitational Wave, ১৫ মানে ২০১৫ সাল, ০৯ মানে সেপ্টেম্বর মাস এবং ১৪ মানে ১৪ই তারিখ।

২. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি শব্দ তরঙ্গের মতো?

না, শব্দ তরঙ্গ বাতাসের মাধ্যমে চলে। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সরাসরি স্পেস-টাইম বা শূন্যস্থানে চলে। তবে বিজ্ঞানীরা এই তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সিকে অডিওতে রূপান্তর করতে পারেন, যা শুনলে অনেকটা পাখির কিচিরমিচির বা 'Chirp' শব্দের মতো মনে হয়।

৩. এই আবিষ্কারের জন্য কারা নোবেল পেয়েছিলেন?

২০১৭ সালে রেইনার ওয়াইজ, ব্যারি বারিশ এবং কিপ থর্ন এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

কোথায় প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত হয়? 

​গত পর্বে আমরা জেনেছি গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গাণিতিক তত্ত্ব এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে। আজকের এই পর্বে আমরা আলোকপাত করব সেই বিশেষ স্থান এবং প্রযুক্তির ওপর, যা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। মহাবিশ্বের এই অতি সূক্ষ্ম কম্পন কোথায় ধরা পড়েছিল? এর পেছনে কোন দানবীয় যন্ত্র কাজ করেছিল? চলুন গভীরে যাওয়া যাক।

​১. প্রথম শনাক্তকরণের স্থান: লিগো (LIGO) ল্যাবরেটরি

​প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের LIGO (Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) ল্যাবরেটরিতে শনাক্ত হয়। তবে এটি কোনো একক ল্যাবরেটরি নয়, বরং এটি দুটি বিশাল এবং পৃথক ডিটেক্টরের সমন্বয়ে গঠিত।

​লিগো-র দুটি কেন্দ্র:

​১. লিগো হ্যানফোর্ড (LIGO Hanford): এটি ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের হ্যানফোর্ডে অবস্থিত।

২. লিগো লিভিংস্টন (LIGO Livingston): এটি লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লিভিংস্টনে অবস্থিত।

​এই দুটি ডিটেক্টর একে অপরের থেকে প্রায় ৩,০০২ কিলোমিটার (১,৮৬৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। মজার ব্যাপার হলো, ২০১৫ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনে তরঙ্গটি প্রথমে লুইজিয়ানা (লিভিংস্টন) কেন্দ্রে ধরা পড়ে এবং তার মাত্র ৭ মিলি-সেকেন্ড পর ওয়াশিংটন (হ্যানফোর্ড) কেন্দ্রে শনাক্ত হয়। এই সময়ের ব্যবধান থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে তরঙ্গটি আলোর গতিতে মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসছে।

​২. কেন দুটি আলাদা ডিটেক্টর ব্যবহার করা হয়?

​অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি ডিটেক্টর দিয়ে কি কাজ হতো না? এর উত্তর হলো— নির্ভুলতা (Accuracy) ও সত্যতা যাচাই।

  • ভুল সংকেত এড়ানো: পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত নানা কম্পন ঘটে—গাড়ির চলাচল, ভূমিকম্প, এমনকি সমুদ্রের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া। একটি ডিটেক্টরে কোনো কম্পন ধরা পড়লে সেটি স্থানীয় কোনো গোলমালও হতে পারে।
  • নিশ্চয়তা: যদি দুটি ডিটেক্টরেই প্রায় একই সময়ে একই ধরণের সংকেত ধরা পড়ে, তবেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে এটি পৃথিবী থেকে নয়, বরং গভীর মহাকাশ থেকে আসা কোনো মহাজাগতিক ঘটনা।
  • উৎস নির্ণয়: দুটি ডিটেক্টরের সময়ের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাকাশের কোন দিক থেকে তরঙ্গটি এসেছে, তা নির্ণয় করতে পারেন (যাকে বলা হয় Triangulation)।

​৩. লিগো (LIGO) ডিটেক্টরের গঠন: একটি বিস্ময়কর স্থাপত্য


​লিগো-র প্রতিটি ডিটেক্টর দেখতে ইংরেজি অক্ষর 'L' এর মতো। এর প্রতিটি বাহু বা আর্ম (Arm) দৈর্ঘ্যে ৪ কিলোমিটার (২.৫ মাইল)। এই ৪ কিলোমিটার লম্বা দুটি পাইপ সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য (Vacuum) রাখা হয়।

​[Image Description: Aerial view of the L-shaped LIGO Livingston observatory with 4km arms]

​এটি কেন এত বড়?

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যখন অতিক্রম করে, তখন এটি বস্তুর দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করে। এই পরিবর্তন এতই সামান্য (একটি পরমাণুর আকারের চেয়েও ক্ষুদ্র) যে, ডিটেক্টরের বাহু যত লম্বা হবে, সেই পরিবর্তন মাপা তত সহজ হবে।

​৪. কীভাবে কাজ করে এই শনাক্তকরণ যন্ত্র? (ইন্টারফেরোমেট্রি)

​লিগো যে প্রযুক্তিতে কাজ করে তার নাম লেজার ইন্টারফেরোমেট্রি (Laser Interferometry)। এর কার্যপদ্ধতি নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:

​১. লেজার বিম: প্রথমে একটি শক্তিশালী লেজার বিম পাঠানো হয়।

২. বিম স্প্লিটার: একটি বিশেষ কাঁচের মাধ্যমে এই লেজার বিমকে দুই ভাগে ভাগ করে 'L' আকৃতির দুটি বাহুতে পাঠানো হয়।

৩. প্রতিফলন: বাহুর শেষ প্রান্তে থাকা আয়নায় ধাক্কা খেয়ে লেজারটি আবার মাঝখানে ফিরে আসে।

৪. ব্যতিচার বা Interference: যদি মহাকাশ শান্ত থাকে, তবে দুটি লেজার বিম ফিরে এসে একে অপরকে বাতিল করে দেয় এবং কোনো আলো ডিটেক্টরে পড়ে না।

৫. তরঙ্গ শনাক্তকরণ: কিন্তু যখন কোনো গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ লিগোর ওপর দিয়ে যায়, তখন এটি একটি বাহুকে সামান্য বড় করে দেয় এবং অন্যটিকে সামান্য ছোট করে দেয়। ফলে লেজার দুটির ছন্দে পরিবর্তন ঘটে এবং ডিটেক্টরে আলো ধরা পড়ে। এই আলোর সংকেত থেকেই বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের খবর পান।

​৫.  বাংলাদেশ: আমাদের সম্ভাবনা

​বাংলাদেশ থেকে মহাকাশ গবেষণায় যারা আগ্রহী, তাদের জন্য লিগো-র এই প্রযুক্তি একটি বিশাল অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারে বর্তমানে লেজার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে।

​যদিও বাংলাদেশে লিগোর মতো বিশাল স্থাপনা তৈরির জন্য ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে ডাটা অ্যানালাইসিসে বাংলাদেশি তরুণরা পিছিয়ে নেই। বর্তমানে ভারতের মহারাষ্ট্রে LIGO-India তৈরির কাজ চলছে। ভৌগোলিকভাবে ভারতের এই ডিটেক্টরটি বাংলাদেশের খুব কাছে হওয়ায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গবেষকদের জন্য এটি সরাসরি গবেষণার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

​৬. এক্সপেরিয়েন্স: কেন এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা?

​লিগো-র অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একে বলেন "পরম নিস্তব্ধতা খোঁজা"।

কল্পনা করুন, আপনি ঢাকা শহরের তীব্র জ্যাম আর শব্দের মধ্যে বসে ১০০০ কিলোমিটার দূরে থাকা কোনো মশার ডানার ঝাপটানি শোনার চেষ্টা করছেন। লিগো ডিটেক্টর ঠিক ততটাই সংবেদনশীল। ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাহুতে যে পরিবর্তন এটি মাপে, তা একটি চুলের প্রস্থের চেয়ে কয়েক বিলিয়ন গুণ ছোট! এই সূক্ষ্মতা অর্জন করতে বিজ্ঞানীদের ৪০ বছর সময় লেগেছে।


​যেখানে প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত হয়েছিল, সেই লিগো ল্যাবরেটরি এখন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের 'তীর্থস্থান'। হ্যানফোর্ড এবং লিভিংস্টনের এই দুটি 'L' আকৃতির দানব আমাদের জন্য মহাবিশ্বের এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে মানুষ চাইলে প্রকৃতির সবচেয়ে গোপন রহস্যকেও বন্দি করতে পারে।

​FAQ -  গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. লিগো ডিটেক্টর কি মাটির নিচে থাকে?

না, লিগোর বাহুগুলো মাটির ওপরেই থাকে, তবে অত্যন্ত শক্তিশালী কংক্রিটের আবরণে ঢাকা থাকে যাতে বাইরের আবহাওয়া বা শব্দ ভেতরে ঢুকতে না পারে।

২. লিগো ছাড়া আর কোন ডিটেক্টর আছে?

হ্যাঁ, ইউরোপে আছে VIRGO এবং জাপানে আছে KAGRA। এগুলো লিগোর সাথে মিলে এখন একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে।

৩. লেজার কেন ব্যবহার করা হয়?

লেজারের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। সামান্যতম দূরত্ব পরিবর্তন মাপার জন্য লেজারের চেয়ে নিখুঁত আর কিছু নেই।


কোন ঘটনার কারণে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি হয়েছিল? 
গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয় যখন বিশাল ভরের বস্তু খুব দ্রুত গতিতে ত্বরণপ্রাপ্ত হয়, বিশেষ করে দুটি কৃষ্ণগহ্বর (black hole) বা নিউট্রন তারার সংঘর্ষ বা একীভূত হওয়ার সময়, অথবা কোনো বিশাল নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণের মতো মহাজাগতিক ঘটনায় স্থান-কালের (spacetime) বক্রতায় ঢেউ সৃষ্টি হলে, যা আলোর গতিতে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।  কখন তৈরি হয়? কৃষ্ণগহ্বরের মিলন (Black Hole Mergers): যখন দুটি কৃষ্ণগহ্বর একে অপরকে প্রদক্ষিণ করে ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসে এবং অবশেষে একত্রিত হয়ে একটি বড় কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়, তখন প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়ে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি হয়। নিউট্রন তারার সংঘর্ষ (Neutron Star Collisions): দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষও শক্তিশালী মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎস। সুপারনোভা (Supernova): কোনো বিশাল নক্ষত্রের অসমভাবে বিস্ফোরণ (asymmetrical supernova) ঘটলে এই তরঙ্গ তৈরি হতে পারে। নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির গতি: দুটি বিশাল তারা বা গ্যালাক্সি একে অপরকে প্রদক্ষিণ করার সময়ও এই তরঙ্গ উৎপন্ন হয়, যদিও তা অনেক দুর্বল হতে পারে।  কীভাবে কাজ করে? আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের স্থান-কালের চাদরটি ভর ও শক্তির কারণে বেঁকে থাকে। যখন এই বিশাল ভরের বস্তুগুলো প্রচণ্ড বেগে নড়াচড়া করে, তখন স্থান-কালের এই বক্রতায় ঢেউ বা কম্পন সৃষ্টি হয়, যা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নামে পরিচিত এবং আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।  মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (gravitational wave) – সহজ ভাষায় প্রাথমিক জ্ঞান Feb 12, 2016 — তেমন করে একজন আরেকজনকে চক্কর খেতে থাকে, ত্বরণও বাড়তে থাকে। যাই হোক, ত্বরণ বেড়ে গেলে স্থান-কালের ঐ চাদরে একটা ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়, যা ঢেউ আকারে আলোর...  বিজ্ঞানযাত্রা  গ্রাভিটি ওয়েভ কী? - Quora Sep 16, 2019 — সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী স্থান-কালের চাদরের এই ঢেউই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কিংবা গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ হিসেবে পরিচিত। গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের উৎপত্তি ...  Quora  0:26 What Is a Gravitational Wave?  NASA Space Place·LIGO Lab Caltech : MIT What are gravitational waves? - Space Mar 29, 2023 — Gravitational waves are ripples in spacetime. These ripples occur when mass accelerates. The larger the mass or the faster the acceleration, the str...  Space  মহাকাশের অন্ধকারে সৌন্দর্য | বিজ্ঞানচিন্তা - Bigganchinta Jan 27, 2024 — ২০৩৫ সালে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে লিসা নামে স্পেস অ্যান্টেনা পাঠাবে নাসা ছবি: সংগৃহীত. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে লাইগো সায়েন্টিফিক কোলাবরেশ...  Bigganchinta  মহাকর্ষীয় তরঙ্গ | ডিটেক্টর, আবিষ্কার, এবং গতি | ব্রিটানিকা - Britannica Translated — সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুসারে, স্থান-কালের বক্রতা ভরের বন্টন দ্বারা নির্ধারিত হয়, যখন ভরের গতি বক্রতা দ্বারা নির্ধারিত হয়। ফলস্বরূপ, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে...  Britannica  আইনস্টাইন, মহাকর্ষ তরঙ্গ ও লাইগো - শেষ পর্ব | বিজ্ঞানচিন্তা - Bigganchinta Feb 4, 2024 — গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্টর ছবি: সংগৃহীত. প্রথমবার কৃষ্ণগহ্বর একীভূত হওয়ার ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত আরও আটটি এ রকম ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে...  Bigganchinta  Gravitational Waves - Introduction - Imagine the Universe! Oct 10, 2017 — As the black holes, stars, or galaxies orbit each other, they send out waves of "gravitational radiation" that travel at the speed of light. The wav...  NASA's Imagine the Universe (.gov)  Gravitational Wave - an overview | ScienceDirect Topics General relativity is the simplest of modern theories of gravitation; it attributes the gravitational field generated by massive bodies to the curvature of spac...  ScienceDirect.com

​আমরা গত তিন পর্বে জেনেছি গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কী, এর ইতিহাস এবং এটি কোথায় শনাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আপনার মনে কি প্রশ্ন জেগেছে, মহাকাশে ঠিক কী এমন ঘটেছিল যার ফলে এই বিশাল তরঙ্গ তৈরি হয়ে ১৩০ কোটি বছর পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল? আজ আমরা সেই প্রলয়ঙ্কারী মহাজাগতিক ঘটনা এবং এর গাণিতিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করব।

​১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরির মূল কারিগর: ব্ল্যাক হোল মার্জার

​২০১৫ সালে লিগো (LIGO) যে প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছিল (GW150914), তার উৎস ছিল দুটি দানবীয় ব্ল্যাক হোল। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী বস্তু হলো ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর।

​সেই প্রলয়ঙ্কারী ঘটনার বিবরণ:

​আজ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি বছর আগে (যখন পৃথিবীতে প্রথম বহুকোষী জীবের বিকাশ ঘটছে), মহাকাশের এক গভীর প্রান্তে দুটি ব্ল্যাক হোল একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরছিল। এদের একটির ভর ছিল আমাদের সূর্যের চেয়ে ২৯ গুণ বেশি এবং অন্যটির ভর ছিল সূর্যের চেয়ে ৩৬ গুণ বেশি।

​১. ইন্সপাইরাল (Inspiral): ব্ল্যাক হোল দুটি একে অপরের চারদিকে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ কাছে আসতে থাকে। এই সময় তারা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে শক্তি বিকিরণ করতে শুরু করে।

২. মার্জার (Merger): সেকেন্ডের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে তারা একে অপরের সাথে মিশে যায়। এই সময় তারা একটি একক বিশাল ব্ল্যাক হোল তৈরি করে।

৩. রিং-ডাউন (Ring-down): একীভূত হওয়ার ঠিক পরেই নতুন তৈরি হওয়া ব্ল্যাক হোলটি তার আকার স্থিতিশীল করার জন্য শেষ কিছু তরঙ্গ নির্গত করে শান্ত হয়ে যায়।

​এই পুরো প্রক্রিয়াটি যখন ঘটে, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য যে বিপুল পরিমাণ শক্তি গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ হিসেবে নির্গত হয়, তা পুরো দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্রের মোট আলোর চেয়ে ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল!

​২. মহাকর্ষীয় তরঙ্গের দুর্বল ক্ষেত্রের সমীকরণ (Weak Field Equation)

​আইন্সটাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি অত্যন্ত জটিল। তবে পৃথিবী বা আমাদের সৌরজগতের মতো যেখানে মহাকর্ষ খুব বেশি শক্তিশালী নয়, সেখানে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা "Weak Field Approximation" বা দুর্বল ক্ষেত্রের সমীকরণ ব্যবহার করেন।

​আইন্সটাইন দেখিয়েছেন যে, যখন মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র খুব দুর্বল হয়, তখন স্পেস-টাইমের মেট্রিক (g_{\mu\nu}) কে নিচের মতো করে লেখা যায়:




​৩. কোয়াড্রুপোল ফর্মুলা (Quadrupole Formula)

​কোন বস্তু গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি করবে আর কোনটি করবে না, তা নির্ভর করে আইন্সটাইনের দেওয়া এই বিশেষ সূত্রের ওপর। আইন্সটাইন দেখিয়েছেন যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের তীব্রতা বস্তুর "কোয়াড্রুপোল মোমেন্ট"-এর পরিবর্তনের হারের ওপর নির্ভর করে।

​সহজ কথায়, যদি কোনো বস্তু পুরোপুরি গোলকাকার হয় এবং সেটি যদি নিজের অক্ষের ওপর সমানভাবে ঘোরে, তবে তা কোনো গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি করবে না। তরঙ্গ তৈরির জন্য ভরের বিন্যাসে একটি অপ্রতিসাম্য বা 'লাম্পিনেস' থাকতে হবে। দুটি ব্ল্যাক হোল যখন একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘোরে, তখন তারা এই অপ্রতিসাম্য তৈরি করে, যার ফলে শক্তিশালী তরঙ্গ সৃষ্টি হয়।

​৪. মহাজাগতিক সেই সংঘর্ষের প্রভাব: কেন আমরা তা টের পাইনি?

​এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যদি এই সংঘর্ষ এতই শক্তিশালী হয়ে থাকে, তবে আমরা পৃথিবীতে বসে কেন তা টের পেলাম না? কেন ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠেনি?

​এর উত্তর লুকিয়ে আছে দূরত্বের মাঝে। ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ পার হতে হতে এই তরঙ্গ এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে এবং দুর্বল হয়ে গেছে যে, যখন এটি পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন এর কম্পন একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়েও ছোট হয়ে গিয়েছিল। এটি কেবল লিগো-র মতো ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ লেজার ডিটেক্টরেই ধরা সম্ভব ছিল।

​৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণার সম্ভাবনা

​বাংলাদেশে বর্তমানে কম্পিউটার সায়েন্স এবং ডেটা সায়েন্সের বিপ্লব ঘটছে। গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্তকরণে এখন মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ লিগো ডিটেক্টরে প্রচুর নয়েজ বা অপ্রাসঙ্গিক শব্দ থাকে, যা থেকে আসল সংকেত খুঁজে বের করা চ্যালেঞ্জিং।

​বাংলাদেশের তরুণ প্রোগ্রামার এবং পদার্থবিদরা যদি লিগো-র ওপেন ডেটা (LIGO Open Science Center) নিয়ে কাজ করেন, তবে তারা ঘরে বসেই মহাবিশ্বের এই ব্ল্যাক হোল সংঘর্ষের রহস্য উন্মোচনে অবদান রাখতে পারেন। এটি দেশের বিজ্ঞান শিক্ষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

​৬. এক্সপেরিয়েন্স ও অথরিটি: কেন এটি ট্রাস্টেড বা বিশ্বাসযোগ্য?

​অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেন যে, আমরা ব্ল্যাক হোল সরাসরি দেখছি না, তাহলে এই তরঙ্গের তথ্য বিশ্বাসযোগ্য কেন?

এর উত্তর হলো— মডেল ম্যাচিং। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই সুপারকম্পিউটারে সিমুলেশন চালিয়ে রেখেছিলেন যে দুটি ব্ল্যাক হোল সংঘর্ষ ঘটালে তরঙ্গটি দেখতে কেমন হবে। লিগো-র ডিটেক্টরে পাওয়া সংকেত সেই তাত্ত্বিক মডেলের সাথে ৯৯.৯% মিলে গিয়েছিল। একে বলা হয় 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' প্রমাণ।

​চতুর্থ পর্বে আমরা জানলাম যে দুটি দানবীয় ব্ল্যাক হোলের প্রলয়ঙ্কারী মিলনই ছিল প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের উৎস। আমরা আরও দেখলাম যে আইন্সটাইনের গাণিতিক সমীকরণগুলো কীভাবে দুর্বল ক্ষেত্রের তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। এই আবিষ্কার কেবল একটি তথ্য নয়, এটি মহাবিশ্বের জন্ম-মৃত্যুর ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

​FAQ -  গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

১. দুটি ব্ল্যাক হোল একীভূত হওয়ার পর কী হয়?

দুটি ব্ল্যাক হোল মিলে একটি বড় ব্ল্যাক হোল তৈরি করে। এই নতুন ব্ল্যাক হোলের ভর আগের দুটির যোগফলের চেয়ে সামান্য কম হয়, কারণ কিছু ভর শক্তিতে (তরঙ্গে) রূপান্তরিত হয়।

২. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি কোনো শব্দ তৈরি করে?

মহাকাশে বায়ু নেই, তাই কোনো শব্দ নেই। তবে আমরা যখন এই তরঙ্গের কম্পাঙ্ককে স্পিকারে শুনি, তখন এটি একটি 'চিরপ' (Chirp) বা কিচিরমিচির শব্দের মতো শোনায়।

৩. দুর্বল ক্ষেত্রের সমীকরণ কেন বলা হয়?

কারণ পৃথিবী বা মহাকাশে যেখানে মহাকর্ষ খুব বেশি তীব্র নয় (যেমন ব্ল্যাক হোলের একদম ভেতর বাদে), সেখানে স্পেস-টাইমের পরিবর্তন খুব সামান্য হয়। তাই একে 'দুর্বল ক্ষেত্র' হিসেবে ধরা হয়।


 কীভাবে LIGO গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শনাক্ত করেছিল? 

​মহাবিশ্বের বিশালতায় এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। দুটি ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের ফলে স্থান-কালে (Space-time) যে কম্পন তৈরি হয়, তাকেই আমরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা গ্রাভিটেশনাল ওয়েব বলি। আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৬ সালে তার জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্বে এর অস্তিত্বের কথা বললেও, তিনি নিজেই সংশয়ে ছিলেন যে মানুষ কোনোদিন এটি শনাক্ত করতে পারবে কি না। কারণ এই তরঙ্গ এতটাই ক্ষীণ যে এটি যখন পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন এর বিস্তৃতি একটি প্রোটনের ব্যাসার্ধের চেয়েও হাজার গুণ ছোট হয়ে যায়।

​কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করেছে LIGO (Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory)। আজকের পর্বে আমরা জানব LIGO-এর সেই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি এবং কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে।

​LIGO কী এবং এটি কেন তৈরি করা হয়েছিল?

​LIGO হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সুক্ষ্ম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এটি মূলত একটি এল-আকৃতির (L-shaped) বিশাল যন্ত্র, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ইন্টারফেরোমিটার (Interferometer)

​যুক্তরাষ্ট্রে দুটি প্রধান স্থানে এই ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে:

১. হ্যানফোর্ড, ওয়াশিংটন।

২. লিভিংস্টন, লুইজিয়ানা।

​দুটি আলাদা স্থানে স্থাপনের কারণ হলো, যদি স্থানীয় কোনো কম্পন (যেমন ভূমিকম্প বা ট্রাক চলাচল) একটিতে ধরা পড়ে, তবে অন্যটি তা যাচাই করতে পারে। যদি উভয় স্থানে একই সংকেত পাওয়া যায়, তবেই সেটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়।

​লেজার ইন্টারফেরোমেট্রির মূল বিজ্ঞান

​LIGO কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে আমাদের লেজার ইন্টারফেরোমেট্রি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। সংক্ষেপে এর ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

​১. লেজার বিম বিভাজন (Beam Splitting)

​একটি শক্তিশালী লেজার উৎস থেকে আলো নির্গত হয়। এই আলোটি একটি বিম স্প্লিটার (Beam Splitter)-এর মাধ্যমে দুটি সমান ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

​২. লম্বালম্বি দুটি সুড়ঙ্গ (Vacuum Arms)

​লেজারের এই দুটি ভাগ লম্বালম্বিভাবে (৯০ ডিগ্রি কোণে) দুটি বিশাল পাইপ বা 'আর্ম'-এর ভেতর দিয়ে যাত্রা করে। LIGO-র ক্ষেত্রে প্রতিটি আর্মের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ কিলোমিটার। এই পাইপগুলোর ভেতরটা সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য (Vacuum) রাখা হয় যাতে বাতাসের অণু লেজারের পথে বাধা না দেয়।

​৩. আয়নায় প্রতিফলন

​প্রতিটি ৪ কিলোমিটার সুড়ঙ্গের শেষে অত্যন্ত মসৃণ এবং নিখুঁত আয়না বসানো থাকে। লেজার বিমটি সেখানে ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে আসে বিম স্প্লিটারের কাছে।

​৪. ব্যতিচার বা ইন্টারফারেন্স (Interference)

​ফিরে আসা লেজার বিম দুটি যখন আবার একত্রিত হয়, তখন তারা একে অপরের ওপর আপতিত হয়। সাধারণ অবস্থায় এই বিম দুটিকে এমনভাবে সেট করা হয় যাতে তারা একে অপরকে বাতিল করে দেয় (Destructive Interference)। ফলে ফটোডিটেক্টরে কোনো আলো পৌঁছায় না।

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যেভাবে ধরা পড়ে

​এখন প্রশ্ন হলো, গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আসলে কী ঘটে? মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যখন পৃথিবীর বুক চিরে চলে যায়, তখন এটি স্থান-কালকে এক দিকে প্রসারিত করে এবং অন্য দিকে সংকুচিত করে।

  • ​যখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ LIGO-র ওপর দিয়ে যায়, তখন একটি ৪ কিমি লম্বা পাইপ সামান্য লম্বা হয়ে যায় এবং অন্যটি সামান্য ছোট হয়ে যায়।
  • ​এর ফলে লেজার বিম দুটির অতিক্রান্ত দূরত্ব বদলে যায়।
  • ​আগে যে দুটি বিম একে অপরকে কাটাকাটি করে দিচ্ছিল, দূরত্বের পরিবর্তনের কারণে তারা আর মিলতে পারে না।
  • ​ফলে কিছু আলো ফটোডিটেক্টরে ধরা পড়ে।

​এই সামান্য আলোর পরিবর্তনই বিজ্ঞানীদের বলে দেয় যে, মহাবিশ্বের কোথাও বিশাল কোনো মহাজাগতিক সংঘর্ষ ঘটেছে।

​কেন এটি একটি কারিগরি অলৌকিকতা?

​LIGO-র সংবেদনশীলতা বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, পৃথিবী থেকে নিকটতম নক্ষত্র (প্রক্সিমা সেন্টাউরি)-এর দূরত্ব ৪ আলোকবর্ষ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এই দূরত্বকে মাত্র একটি চুলের প্রস্থের সমান পরিবর্তন করে! LIGO সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম।

​এই নির্ভুলতা বজায় রাখার জন্য বিজ্ঞানীদের কিছু চরম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে:

  • ভূ-কম্পন নিরসন (Seismic Isolation): ট্রাকের চলাচল বা সমুদ্রের ঢেউয়ের কম্পন যাতে ধরা না পড়ে, সেজন্য আয়নাগুলোকে বিশেষ সাত-স্তরের পেন্ডুলাম দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
  • ভ্যাকুয়াম প্রযুক্তি: LIGO-র ভেতরকার বায়ুশূন্যতা মহাকাশের চেয়েও বেশি শূন্য।
  • তাপীয় কোলাহল (Thermal Noise): আয়নার অণুগুলোর কম্পন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সর্বাধুনিক কুলিং এবং কোটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

​প্রথম শনাক্তকরণ: ইতিহাস গড়া মুহূর্ত

​১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫। দিনটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেই দিন প্রথমবার LIGO-তে একটি সংকেত ধরা পড়ে, যা GW150914 নামে পরিচিত। এটি ছিল প্রায় ১.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের ফলাফল।

​এই আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো:

১. মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে।

২. ব্ল্যাক হোলের জোড়াবদ্ধ অস্তিত্ব সম্ভব।

৩. আমরা মহাবিশ্বকে এখন আর শুধু আলো দিয়ে নয়, বরং 'শব্দ' দিয়েও অনুধাবন করতে পারি।

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণা (GEO for BD)

​বাংলাদেশি তরুণ শিক্ষার্থীরা এখন জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অনেক আগ্রহী। গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের এই আবিষ্কার আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ডাটা অ্যানালাইসিস এবং কম্পিউটেশনাল ফিজিক্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষকরাও LIGO-র সংগৃহীত ডাটা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও ছোট আকারের ডিটেক্টর বা গবেষণাগার তৈরির স্বপ্ন দেখা মোটেও অবাস্তব নয়।

​LIGO কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি মানুষের অদম্য কৌতূহল এবং বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শনাক্ত করার মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের এমন সব রহস্য জানতে পারছি যা আগে অদৃশ্য ছিল। এই তরঙ্গগুলো আমাদের জানাচ্ছে কীভাবে ব্ল্যাক হোল জন্ম নেয়, কীভাবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটছে এবং সৃষ্টির আদি মুহূর্তে আসলে কী ঘটেছিল।

প্রশ্নোত্তর (Answer Engine Optimization)

প্রশ্ন: LIGO এর পূর্ণরূপ কী?

উত্তর: LIGO এর পূর্ণরূপ হলো Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory।

প্রশ্ন: কেন গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শনাক্ত করা কঠিন?

উত্তর: কারণ এই তরঙ্গগুলো স্থান-কালের জ্যামিতিতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তন আনে, যা পরিমাপ করা সাধারণ প্রযুক্তিতে অসম্ভব।

প্রশ্ন: প্রথম গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কবে ধরা পড়ে?

উত্তর: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালে প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়।

 গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আবিষ্কার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? মহাবিশ্বকে দেখার নতুন এক জানালার গল্প

​বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু আবিষ্কার থাকে যা কেবল নতুন তথ্য দেয় না, বরং আমাদের জগত দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেই আমূল বদলে দেয়। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণীর ঠিক ১০০ বছর পর ২০১৫ সালে যখন প্রথম গ্রাভিটেশনাল বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত হলো, তখন সারা বিশ্বে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—একশ কোটি আলোকবর্ষ দূরের দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের খবর আমাদের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

​আজকের ব্লগে আমরা গভীরে গিয়ে জানব, কেন এই আবিষ্কারকে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য বলা হয় এবং এটি কীভাবে মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে।

​১. মহাবিশ্বের নীরবতা থেকে শব্দে রূপান্তর

​এতদিন পর্যন্ত আমরা মহাবিশ্বকে কেবল 'আলো' বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন (যেমন: দৃশ্যমান আলো, এক্স-রে, রেডিও ওয়েব) দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু আলোর একটি সীমাবদ্ধতা আছে—আলো কোনো অস্বচ্ছ বস্তুর ভেতর দিয়ে যেতে পারে না।

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েব হলো অনেকটা মহাবিশ্বের 'শব্দ'-এর মতো। এটি কোনো মাধ্যমে বাধা পায় না, এমনকি ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকেও এর প্রভাব অনুধাবন করা যায়।

  • কেন গুরুত্বপূর্ণ: এতদিন আমরা মহাবিশ্বকে কেবল 'চোখে' দেখেছি, এখন থেকে আমরা মহাবিশ্বের 'স্পন্দন' বা ফিসফিসানি 'শুনতে' পারছি। এটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণের সম্পূর্ণ নতুন এক ইন্দ্রিয়।

​২. ব্ল্যাক হোল এবং নিউট্রন স্টারের রহস্য উন্মোচন

​ব্ল্যাক হোল এমন এক দানবীয় মহাজাগতিক বস্তু যার ভেতর থেকে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে এদের সরাসরি দেখা অসম্ভব।

  • অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করা: গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে মহাবিশ্বে জোড়াবদ্ধ ব্ল্যাক হোল (Binary Black Holes) বিদ্যমান।
  • নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ: ২০১৭ সালে যখন দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে গ্রাভিটেশনাল ওয়েব ধরা পড়ল (যাকে বলা হয় GW170817), তখন একই সাথে আলো এবং তরঙ্গ উভয়ই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল। এটি মহাকাশ বিজ্ঞানে 'মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি' (Multi-messenger Astronomy) এর শুভ সূচনা করে।

​৩. ভারী মৌলিক পদার্থের উৎস সন্ধান: সোনা ও প্লাটিনাম এলো কোথা থেকে?

​আপনি যদি হাতে একটি সোনার আংটি পরে থাকেন, তবে জানলে অবাক হবেন যে সেই সোনা সম্ভবত কয়েক বিলিয়ন বছর আগে দুটি নিউট্রন স্টারের প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়েছে।

​বিজ্ঞানীদের আগে ধারণা ছিল যে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে ভারী ধাতু তৈরি হয়। কিন্তু গ্রাভিটেশনাল ওয়েব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে:

  • ​দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষে এত বেশি শক্তি উৎপন্ন হয় যে সেখানে সোনা, প্লাটিনাম এবং ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌল তৈরি হয়।
  • কেন গুরুত্বপূর্ণ: এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব এবং আমাদের চারপাশের মূল্যবান ধাতুগুলোর আদি উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়েছে।

​৪. আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির চূড়ান্ত পরীক্ষা

​আইনস্টাইনের 'জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি' আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারী বস্তু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়।

  • তত্ত্বের সত্যতা: গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি কেবল একটি গাণিতিক মডেল ছিল। এই তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করার মানে হলো আইনস্টাইন ১০০ বছর আগে যা ভেবেছিলেন, তা ১০০ ভাগ সঠিক।
  • চরম পরিবেশে পরীক্ষা: ব্ল্যাক হোলের মতো চরম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কীভাবে কাজ করে, তা পরীক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো এই গ্রাভিটেশনাল ওয়েব।

​৫. মহাবিশ্বের একদম শুরুর সময়ের খোঁজ (The Early Universe)

​মহাবিস্ফোরণ বা 'বিগ ব্যাং' (Big Bang)-এর ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতে মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত ঘন এবং উত্তপ্ত। সেই সময় আলো চলাচল করতে পারত না (Photon decoupling-এর আগে)। ফলে আলো ব্যবহার করে আমরা বিগ ব্যাং-এর প্রথম ৩৮০,০০০ বছরের কোনো দৃশ্য দেখতে পাই না।

  • টাইম মেশিন: কিন্তু গ্রাভিটেশনাল ওয়েব সৃষ্টির শুরু থেকেই মহাবিশ্বে বিচরণ করছে। ভবিষ্যতে যদি আমরা 'প্রাইমর্ডিয়াল গ্রাভিটেশনাল ওয়েব' (Primordial Gravitational Waves) শনাক্ত করতে পারি, তবে আমরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম ন্যানো-সেকেন্ডে কী ঘটেছিল তা জানতে পারব। এটি হবে সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনের চূড়ান্ত ধাপ।

​৬. মহাকাশ গবেষণায় নতুন প্রযুক্তির বিপ্লব (Technical Perspective)

​LIGO বা Virgo-র মতো যন্ত্রগুলো তৈরি করতে গিয়ে মানুষকে প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছাতে হয়েছে। এই গবেষণার ফলে তৈরি হয়েছে:

  • ​অত্যন্ত নিখুঁত লেজার প্রযুক্তি।
  • ​উন্নতমানের ভ্যাকুয়াম সিস্টেম।
  • ​ডেটা প্রসেসিংয়ের নতুন অ্যালগরিদম। এসব প্রযুক্তি কেবল মহাকাশ গবেষণায় নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের টেলিকমিউনিকেশন এবং ইমেজিং প্রযুক্তিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে।

​বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এর তাৎপর্য (Authority & Trust)

​বাংলাদেশ এখন ডেল্টা প্ল্যান এবং স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের মৌলিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে সহায়ক।

  • গবেষণার সুযোগ: নাসার (NASA) অনেক প্রজেক্টে এখন দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা কাজ করছে। গ্রাভিটেশনাল ওয়েব ডাটা অ্যানালাইসিস ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে বাংলাদেশের যে কেউ ঘরে বসে এই মহাজাগতিক সংকেত নিয়ে গবেষণা করতে পারে।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব: আমাদের দেশের পাঠ্যপুস্তকে এখন 'মহাকর্ষীয় তরঙ্গ' অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করছে।

​ একটি নতুন যুগের সূচনা

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আবিষ্কার কেবল একটি মেডেল জেতা বা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বিষয় নয়; এটি মহাবিশ্বের লুকানো ইতিহাসের খাতা খুলে দেওয়া। আমরা এখন জানি আমাদের গ্যালাক্সিতে কোথায় ব্ল্যাক হোল সংঘর্ষ হচ্ছে, আমরা জানি আমাদের হাতের সোনার আংটি কোথা থেকে এসেছে এবং আমরা জানি আইনস্টাইন ঠিক ছিলেন।

​এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, মানুষের অদম্য ইচ্ছা থাকলে আমরা কয়েক কোটি মাইল দূরের অদৃশ্য স্পন্দনও হৃদয়ে অনুভব করতে পারি।

গ্রাভিটেশনাল ওয়েব নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (AEO Section)

১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আবিষ্কারের জন্য কারা নোবেল পুরস্কার পান?

রেনার ওয়াইজ, ব্যারি বারিশ এবং কিপ থর্ন ২০১৭ সালে এই অসামান্য অবদানের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

২. এটি কি মানুষের শরীরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে?

না। এই তরঙ্গগুলো যখন আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে যায়, তখন পরিবর্তনের পরিমাণ একটি পরমাণুর চেয়েও ছোট হয়, যা আমরা টের পাই না।

৩. গ্রাভিটেশনাল ওয়েব দিয়ে কি সময় ভ্রমণ সম্ভব?

সরাসরি সম্ভব নয়, তবে এটি আমাদের 'টাইম-স্পেস' বা স্থান-কাল কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে সাহায্য করে, যা ভবিষ্যতে তাত্ত্বিক গবেষণার পথ খুলে দেয়।

গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি — মহাবিশ্বের দ্রুততম সংকেতের রহস্য

​মহাবিশ্বের নিয়মকানুন বড়ই অদ্ভুত। আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, আমরা আসলে অতীতের দিকে তাকাই। কারণ আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতে সময় নেয়। কিন্তু মহাবিশ্বের বুনট বা 'স্পেস-টাইম'-এ যে ঢেউ তৈরি হয়, অর্থাৎ গ্রাভিটেশনাল বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, তার গতি কত? এটি কি আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে? নাকি এর গতি সীমাবদ্ধ?

​আজকের পর্বে আমরা গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতিবেগ এবং কেন এই গতি মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

​১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি কত?

​সহজ কথায় উত্তর হলো: গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি আলোর গতির সমান।

​শূন্যস্থানে আলোর গতি সেকেন্ডে প্রায় ২,৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার (বা প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার)। পদার্থবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ঠিক এই একই গতিতে মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করে।

​আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব অনুসারে, মহাকর্ষীয় প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়। যদি সূর্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে পৃথিবী তৎক্ষণাৎ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হবে না। সূর্যের মহাকর্ষীয় সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছাতে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় লাগবে, যা আলোর পৌঁছাতে লাগা সময়ের সমান।

​২. আলো বনাম গ্রাভিটেশনাল ওয়েব: কেন গতি সমান?

​পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, মহাবিশ্বের একটি 'কসমিক স্পিড লিমিট' বা সর্বোচ্চ গতির সীমা আছে। যাকে আমরা c হিসেবে চিনি।

  • ভরহীন কণা: যেসব কণার কোনো স্থির ভর (Rest Mass) নেই, তারা সবসময় এই সর্বোচ্চ গতিতে চলতে বাধ্য।
  • ফটোন ও গ্রাভিটন: আলোর কণা বা ফোটন যেমন ভরহীন, তেমনি তাত্ত্বিকভাবে মহাকর্ষ বলের বাহক কণা 'গ্রাভিটন'-ও ভরহীন।
  • স্পেস-টাইমের বৈশিষ্ট্য: মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কোনো বস্তুর ভেতর দিয়ে যায় না, বরং এটি স্বয়ং স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক পরিবর্তন। স্পেস-টাইমের এই স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity) এমন যে, এতে তৈরি হওয়া যেকোনো ঢেউ কেবল আলোর গতিতেই সঞ্চালিত হতে পারে।

​৩. গতি নির্ণয়ের পরীক্ষা: GW170817 এর অবিশ্বাস্য প্রমাণ

​২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি আলোর গতির সমান কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে গাণিতিক যুক্তি থাকলেও বাস্তব প্রমাণ ছিল না। কিন্তু GW170817 ইভেন্টটি সবকিছু বদলে দেয়।

​এটি ছিল দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ। এই ঘটনা থেকে দুটি জিনিস নির্গত হয়েছিল:

১. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (LIGO এবং Virgo ডিটেক্টর দ্বারা ধরা পড়ে)।

২. গামা রশ্মি বা আলো (Fermi এবং INTEGRAL স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা ধরা পড়ে)।

ফলাফল কী ছিল?

প্রায় ১৩ কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে যাত্রা শুরু করে তরঙ্গ এবং আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১.৭ সেকেন্ড! এই সামান্য পার্থক্যও মূলত মহাকাশের ধূলিকণা এবং গ্যাসীয় মাধ্যমের কারণে হতে পারে। ১৩ কোটি বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর এই সামান্য পার্থক্য প্রমাণ করে যে, গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি আলোর গতির ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯% নির্ভুলভাবে সমান।

​৪. যদি গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আলোর চেয়ে দ্রুত হতো?

​অনেকেই প্রশ্ন করেন, যদি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলোর চেয়ে দ্রুত চলত তবে কী হতো?

  • কার্যকারণ সম্পর্ক (Causality): যদি কোনো সংকেত আলোর চেয়ে দ্রুত চলে, তবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী তা 'অতীত' বা সময়ের পেছনে যেতে সক্ষম হতো। এটি মহাবিশ্বের মৌলিক শৃঙ্খলা বা 'কজালিটি' নষ্ট করে দিত।
  • আইনস্টাইনের ভুল: যদি গতির এই সমতা না থাকত, তবে আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হতো এবং আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন GPS) ভিত্তি ভেঙে পড়ত।

​৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি (Authority & Trust)

​বাংলাদেশের বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড বা স্কুল-কলেজের ফিজিক্স ল্যাবে আমরা মহাকর্ষ নিয়ে পড়ি। সাধারণত আমাদের শেখানো হয় নিউটনের সূত্র, যেখানে মহাকর্ষকে 'তাৎক্ষণিক' ধরা হয়। কিন্তু ৭ম পর্বের এই আলোচনা থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে যে মহাকর্ষ আসলে 'ইনফরমেশন' বা তথ্য হিসেবে ভ্রমণ করে, যার একটি নির্দিষ্ট গতি আছে।

​বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় যারা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য এই গতির সমতা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এটিই নির্ধারণ করে দেয় আমরা মহাবিশ্বের কতটুকু দূর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে পারব।

​৬. কেন এই গতির মিল থাকা জরুরি?

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি আলোর সমান হওয়া আমাদের জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ:

  • সতর্ক সংকেত: নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের সময় গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আগে শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপগুলোকে সেই দিকে ঘুরিয়ে নিতে পারেন। একে বলা হয় 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম'।
  • মহাবিশ্বের মানচিত্র: এই গতির মাধ্যমেই আমরা মহাজাগতিক বস্তুগুলোর দূরত্ব নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারছি (Standard Sirens)।

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গতি আমাদের মহাবিশ্বের এক পরম ধ্রুবক। এটি প্রমাণ করে যে আলো এবং মহাকর্ষ—দুটো ভিন্ন জিনিস হলেও মহাবিশ্বের বুনটে তারা একই ছন্দে বাধা। আমরা যখন এই তরঙ্গ শনাক্ত করি, তখন আমরা মহাবিশ্বের সেই মৌলিক গতির সাথে সংযোগ স্থাপন করি যা সময়ের শুরু থেকে চলে আসছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (AEO - Answer Engine Optimization)

১. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি কোনো মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীর হয়ে যায়?

আলো যেমন কাঁচ বা পানির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীর হয়, গ্রাভিটেশনাল ওয়েব তেমনটি হয় না। এটি যেকোনো পদার্থের ভেতর দিয়ে আলোর গতিতেই বাধাহীনভাবে চলে যায়।

২. কেন নিউটন গ্রাভিটেশনের গতি নিয়ে কিছু বলেননি?

নিউটনের সময় মনে করা হতো মহাকর্ষ একটি তাৎক্ষণিক বল। আইনস্টাইনই প্রথম প্রমাণ করেন যে কোনো তথ্যই আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না।

৩. গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কি শব্দ তরঙ্গের মতো?

না। শব্দ তরঙ্গের চলার জন্য মাধ্যম (বাতাস বা পানি) লাগে, কিন্তু গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শূন্যস্থানে স্বয়ং মহাকাশের বুনটকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে।

আপনি কি মহাবিশ্বের এই অদ্ভুত গতির রহস্য উপভোগ করছেন? পরবর্তী পর্বটি আপনার জন্য আরও রোমাঞ্চকর হবে। কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান!

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রকারভেদ — মহাবিশ্বের বিভিন্ন সুরের ঝংকার

​আমরা গত পর্বগুলোতে জেনেছি গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কী এবং এটি কীভাবে আলোর গতিতে ভ্রমণ করে। কিন্তু মহাবিশ্বের সব মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি একই রকম? উত্তর হলো— না। যেমন একটি বেহালার সুর এবং একটি বিশাল ড্রামের শব্দ আলাদা, তেমনি মহাবিশ্বের বিভিন্ন মহাজাগতিক ঘটনা থেকে উৎপন্ন তরঙ্গগুলোর ধরন ও কম্পাঙ্ক (Frequency) ভিন্ন ভিন্ন হয়।

​আজকের পর্বে আমরা গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের প্রধান চারটি প্রকারভেদ এবং তাদের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

​১. কম্প্যাক্ট বাইনারি ইন্সপায়রাল (Compact Binary Inspiral Gravitational Waves)

​এটি বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত এবং শনাক্ত হওয়া তরঙ্গের ধরন। যখন দুটি অত্যন্ত ঘন বা কম্প্যাক্ট বস্তু (যেমন: ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টার) একে অপরের চারদিকে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকে, তখন তারা মহাকাশের বুনটে ঢেউ তৈরি করে।

  • উৎসবিন্দু: দুটি ব্ল্যাক হোল, দুটি নিউট্রন স্টার অথবা একটি ব্ল্যাক হোল ও একটি নিউট্রন স্টারের জোড়া।
  • প্রক্রিয়া: ঘোরার সময় এরা মহাকর্ষীয় শক্তি বিকিরণ করে এবং ক্রমশ একে অপরের কাছে আসতে থাকে (Inspiral)। শেষ মুহূর্তে এদের সংঘর্ষ ঘটে এবং একটি বিশাল সংকেত তৈরি হয়।
  • শনাক্তকরণ: LIGO এবং Virgo ডিটেক্টর এখন পর্যন্ত এই ধরনের তরঙ্গই সবচেয়ে বেশি শনাক্ত করেছে।

​২. অবিরাম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Continuous Gravitational Waves)

​এই ধরনের তরঙ্গগুলো একটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে একটানা বা অবিরামভাবে নির্গত হতে থাকে। এর কম্পাঙ্ক অনেকটা স্থির থাকে।

  • উৎসবিন্দু: দ্রুত ঘূর্ণায়মান একটি একক নিউট্রন স্টার বা পালসার
  • কারণ: যদি একটি নিউট্রন স্টার নিখুঁত গোলক না হয়ে এর গায়ে সামান্য কোনো উঁচু অংশ বা 'পাহাড়' (এমনকি কয়েক মিলিমিটার উঁচু) থাকে, তবে এর প্রচণ্ড গতির ঘূর্ণনের ফলে স্থান-কালে অবিরাম ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।
  • শনাক্তকরণ: এই তরঙ্গগুলো খুবই ক্ষীণ হওয়ায় বিজ্ঞানীদের কাছে এগুলো শনাক্ত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি শনাক্ত করা গেলে আমরা নিউট্রন স্টারের ভেতরের গঠন সম্পর্কে জানতে পারব।

​৩. আকস্মিক বা স্টোকাস্টিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Stochastic Gravitational Waves)

​এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় তরঙ্গ। এটি কোনো একক উৎস থেকে আসে না, বরং সারা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ছোট-বড় ঘটনার একটি মিশ্রিত প্রতিধ্বনি।

  • উৎসবিন্দু: মহাবিশ্বের একদম শুরুর দিকের ঘটনা বা 'বিগ ব্যাং'-এর ঠিক পরের মুহূর্তের অবশিষ্টাংশ।
  • তুলনা: এটি অনেকটা জনাকীর্ণ একটি রেস্টুরেন্টের পেছনের গুঞ্জনের মতো, যেখানে অনেকের কথা মিলে একটি সাধারণ শব্দের সৃষ্টি হয়।
  • কেন গুরুত্বপূর্ণ: এই তরঙ্গ শনাক্ত করা গেলে আমরা মহাবিশ্বের আদি অবস্থা বা ইনফ্লেশন (Inflation) পর্যায় সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণ পাব।

​৪. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিস্ফোরণ বা বার্স্ট (Burst Gravitational Waves)

​এটি এমন এক ধরনের তরঙ্গ যা আগে থেকে অনুমান করা যায় না। হঠাৎ করে আসা এই সংকেতগুলো খুব অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়।

  • উৎসবিন্দু: সুপারনোভা বিস্ফোরণ (একটি বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যু) অথবা মহাবিশ্বের অন্য কোনো অজানা চরম ঘটনা।
  • বৈশিষ্ট্য: এই তরঙ্গগুলোর গাণিতিক মডেল আগে থেকে তৈরি করা কঠিন। যদি আমাদের গ্যালাক্সির আশেপাশে কোনো নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ঘটে, তবে LIGO-তে এই 'বার্স্ট' সিগন্যাল ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

​কেন এই প্রকারভেদগুলো বোঝা জরুরি? (Authority & Trust)

​মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই ভিন্নতা আমাদের মহাবিশ্বকে বিভিন্ন 'ল্যান্স' দিয়ে দেখার সুযোগ করে দেয়।

  1. ব্ল্যাক হোল বাইনারি আমাদের জানায় মহাকর্ষের চরম ক্ষমতা সম্পর্কে।
  2. কন্টিনিউয়াস ওয়েব আমাদের শেখায় অতি-ঘন পদার্থের আচরণ।
  3. স্টোকাস্টিক ওয়েব আমাদের নিয়ে যায় সৃষ্টির শুরুতে।

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে (GEO for BD) আমাদের তরুণ গবেষকদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। কারণ বিভিন্ন তরঙ্গের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ডিটেক্টর এবং অ্যালগরিদম প্রয়োজন। যেমন— লিসা (LISA) নামক একটি স্পেস টেলিস্কোপ ভবিষ্যতে মহাকাশ থেকে নিম্ন-কম্পাঙ্কের তরঙ্গ শনাক্ত করবে, যা বর্তমানের ভূমি-ভিত্তিক ডিটেক্টর দিয়ে সম্ভব নয়।

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েব ডিটেক্টর বনাম তরঙ্গের ধরন


​মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেবল একটি একক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বিশাল 'মহাজাগতিক সিম্ফনি'। প্রতিটি প্রকার তরঙ্গ আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাসের একেকটি নতুন অধ্যায় শোনায়। আমরা এখন কেবল এই সংগীতের প্রথম কয়েকটি সুর শুনতে শুরু করেছি। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে আমরা যখন সব ধরনের তরঙ্গ শুনতে পাব, তখন মহাবিশ্বের কোনো রহস্যই আর আমাদের কাছে ঢাকা থাকবে না।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (AEO - Answer Engine Optimization)

১. আমাদের সূর্য কি গ্রাভিটেশনাল ওয়েব তৈরি করে?

তাত্ত্বিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু সূর্যের ভর এবং গতি এতোটাই কম যে এর মাধ্যমে তৈরি তরঙ্গ বর্তমান প্রযুক্তিতে শনাক্ত করা অসম্ভব।

২. সুপারনোভা থেকে কি সবসময় তরঙ্গ বের হয়?

যদি সুপারনোভা বিস্ফোরণটি নিখুঁত গোলকাকার না হয়ে কিছুটা অপ্রতিসম (Asymmetric) হয়, তবেই সেখান থেকে শনাক্তযোগ্য গ্রাভিটেশনাল ওয়েব নির্গত হবে।

৩. পালসার টাইমিং অ্যারে (PTA) কী?

এটি একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের দূরবর্তী পালসারগুলোর নিখুঁত সময় পর্যবেক্ষণ করে মহাকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

​ সাধারণ মানুষের জন্য গ্রাভিটেশনাল ওয়েব বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গুরুত্ব কী?

​আমরা যখন মহাবিশ্বের গভীর রহস্য, ব্ল্যাক হোল কিংবা বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের কম্পন নিয়ে কথা বলি, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— "এসব জেনে আমার লাভ কী?" বা "আমার দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব কী?" সাধারণ মানুষের জন্য বিজ্ঞানের এই জটিল আবিষ্কারগুলো অনেক সময় কেবল তাত্ত্বিক মনে হতে পারে।

​কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলো এসেছে গতকালের সবচেয়ে জটিল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার থেকে। আজকের পর্বে আমরা জানব, কেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কেবল বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, বরং আপনার এবং আমার মতো সাধারণ মানুষের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

​১. প্রযুক্তির উন্নয়ন ও দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব (Spinoff Technologies)

​LIGO-র মতো ডিটেক্টরগুলো তৈরি করতে গিয়ে এমন সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হয়েছে যা আগে কখনও ছিল না। এই প্রযুক্তিগুলো পরবর্তীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করে:

  • লেজার এবং অপটিক্স: গ্রাভিটেশনাল ওয়েব শনাক্ত করতে যে অতি-নিখুঁত লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা বর্তমানে উন্নত সার্জারি (যেমন ল্যাসিক আই অপারেশন) এবং নিখুঁত মাপজোখ করার যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
  • ভ্যাকুয়াম টেকনোলজি: LIGO-র বিশাল পাইপগুলোকে বায়ুশূন্য করার জন্য যে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়েছে, তা বর্তমানে চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে এবং উন্নত মানের ঔষধ সংরক্ষণে কাজে লাগছে।
  • কম্পিউটিং এবং ডেটা প্রসেসিং: মহাকাশের হাজারো শব্দের ভিড় থেকে একটি ক্ষীণ সংকেত খুঁজে বের করার জন্য যে অ্যালগরিদম তৈরি হয়েছে, তা বর্তমানে বড় ডেটা সেট (Big Data) বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

​২. আমাদের উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্যতা

​আমরা মানুষ হিসেবে সবসময় জানতে চেয়েছি আমরা কোথা থেকে এসেছি। গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে:

  • আমাদের দেহের সোনা-রুপা: বিজ্ঞানীরা এই তরঙ্গের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন যে, মহাবিশ্বে দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের ফলেই সোনা, প্লাটিনাম বা আয়োডিনের মতো ভারী মৌলিক পদার্থ তৈরি হয়। অর্থাৎ, আপনার হাতে থাকা সোনার আংটি বা আপনার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান আসলে কোটি কোটি বছর আগের মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফল। এটি আমাদের মহাবিশ্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত করে তোলে।

​৩. ভবিষ্যৎ যোগাযোগের নতুন পথ (Future Communication)

​একটা সময় রেডিও তরঙ্গ ছিল কেবল বিজ্ঞানীদের কৌতূহল। আজ রেডিও ওয়েব ছাড়া আমরা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের কথা ভাবতেই পারি না। গ্রাভিটেশনাল ওয়েবও হতে পারে ভবিষ্যতের যোগাযোগের মাধ্যম:

  • বাধা হীন সংকেত: আলো বা রেডিও তরঙ্গ দেয়াল কিংবা গ্রহ-নক্ষত্র দিয়ে বাধা পায়। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কোনো কিছুতেই বাধা পায় না। এটি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরাসরি চলে যেতে পারে। হয়তো কয়েকশ বছর পর এমন প্রযুক্তি আসবে যা দিয়ে আমরা গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারব, যেখানে কোনো 'নেটওয়ার্ক এরর' থাকবে না।

​৪. মহাকাশ পর্যটন এবং জিপিএস (GPS) এর সঠিকতা

​আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব ছাড়া আমাদের ফোনের জিপিএস (GPS) কাজ করত না। যদি মহাকর্ষের প্রভাব হিসাব না করা হতো, তবে জিপিএস প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার ভুল পথ দেখাত।

  • নিখুঁত নেভিগেশন: গ্রাভিটেশনাল ওয়েবের গবেষণা আমাদের মহাকর্ষ বল সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম জ্ঞান দিচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে যখন মানুষ মঙ্গল গ্রহ বা অন্য নক্ষত্রে ভ্রমণ করবে, তখন পথ দেখাতে বা নিখুঁত সময় নির্ণয় করতে অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

​৫. অনুপ্রেরণা ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ (GEO for Bangladesh)

​বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই আবিষ্কারের গুরুত্ব মূলত মানসিক ও শিক্ষাগত।

  • তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন: যখন বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী জানতে পারে যে মানুষ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে, তখন তার মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। এটি আমাদের দেশের আগামী দিনের বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রযুক্তিবিদ তৈরির মূল রসদ।
  • অজানাকে জানার সাহস: এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় যে, মানুষ চেষ্টা করলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এই আত্মবিশ্বাসই একটি জাতিকে স্মার্ট ও আধুনিক করে গড়ে তোলে।

​৬. মহাবিশ্বের রক্ষাকবচ হিসেবে

​গ্রহাণুর আঘাত বা মহাজাগতিক কোনো বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য আমাদের মহাকাশকে বোঝা খুব জরুরি। গ্রাভিটেশনাল ওয়েব আমাদের এমন সব ব্ল্যাক হোল বা মহাজাগতিক বস্তুর খোঁজ দেয় যা সাধারণ টেলিস্কোপে দেখা যায় না। এটি এক অর্থে পৃথিবীর জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।

​গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কেবল খাতা-কলমের অঙ্ক নয়; এটি মহাবিশ্বের একটি নতুন ভাষা। আজ হয়তো আমরা কেবল এর বর্ণমালা শিখছি, কিন্তু ভবিষ্যতে এই ভাষাতেই লেখা হবে মানুষের নতুন নতুন সব আবিষ্কারের গল্প। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে আপনার শরীরের ভেতরকার রাসায়নিক উপাদান—সবকিছুই মহাকর্ষের এই নাচের সাথে জড়িত। তাই সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের গর্ব করা উচিত যে, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন মানুষ মহাবিশ্বের ফিসফিসানি শুনতে শিখেছে।

সাধারণ মানুষের মনে আসা প্রশ্ন (AEO - Answer Engine Optimization)

১. গ্রাভিটেশনাল ওয়েব কি আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে?

একেবারেই না। এই তরঙ্গগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এগুলো এতোটাই ক্ষীণ যে আমাদের কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা এদের নেই।

২. এটি কি জলবায়ু পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে?

না, এটি একটি মহাজাগতিক ঘটনা যা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ বায়ুমণ্ডল বা জলবায়ুকে সরাসরি প্রভাবিত করে না।

৩. এর আবিষ্কারে বাংলাদেশের অবদান কী হতে পারে?

বাংলাদেশের গবেষকরা এখন অনলাইনের মাধ্যমে LIGO-র ওপেন ডেটা ব্যবহার করে গবেষণা করতে পারেন এবং বিশ্বমানের বিজ্ঞান গবেষণায় সরাসরি অবদান রাখতে পারেন।

Author Note: এই ব্লগটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মৌলিক বিষয়গুলো সহজে তুলে ধরার জন্য লেখা হয়েছে। মহাবিশ্ব নিয়ে আপনার যেকোনো কৌতূহল আমাদের কমেন্টে জানাতে পারেন!


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন