নতুন প্রজন্ম কেন দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না কেন

 বর্তামন প্রজন্ম কেন দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না কেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেযেদিন ড.ইসমাইল আরাফাহ তার বিখ্যাত বই "ডিপ্রেশন"এ চলুন জেনে নেই কেন বর্তমান তরুন প্রজন্ম দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না?

Why the new generation can't maintain attention for long periods of time


ক্রমাগত পরিবর্তনের একটি নেতিবাচক প্রভাব হলো, দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাদের গভীর মনোযোগ হারিয়ে যায়। চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। চতুর্মুখী বিক্ষিপ্ত অবস্থা আমাদের ঘিরে নেয়। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড মিক্সের ভাষায়, ‘এই আকস্মিক ঝড় একেবারেই নজিরবিহীন! এমনকি বিশের দশকের মানুষরাও কল্পনা করতে পারত না, এই ঝড়ের মোকাবিলা মানুষকে করতে হবে।

আধুনিক যুগে একজন যুবক বা যুবতির জীবন বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কী? সহজ উত্তর হলো স্মার্ট ডিভাইসগুলো! খালিদ উসমান আল-ফিল সর্বপ্রথম এই সংকটার কথা তুলেছিলেন। এই ডিভাইসগুলো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা বর্ণনা করতে গিয়ে


তিনি বলেন, আমরা ক্রমাগত ‘চিন্তা ও আত্মপর্যালোচনার স্থান’ হারিয়ে ফেলছি এই ডিভাইসগুলোর কারণে। ‘চিন্তা ও আত্মপর্যালোচনার স্থান’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই সময়টুকু, যা আমরা নিজেদের সাথে কাটাই। যে সময়ে আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চিন্তাভাবনা করি যে, ‘আমি কে? এই মহাবিশ্বে আমার কাজ কী? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?’ প্রশ্নগুলো আমরা সাধারণত আমাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেখে থাকি। যেমন : আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয় ও ব্যক্তিগত সমস্যা, আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য, আমাদের ত্রুটি ও ভুলসমূহ, অন্যদের সাথে আমাদের সম্পর্ক, হাস্যকর কিংবা বিব্রতকর পরিস্থিতি, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক দৃষ্টি এই প্রশ্নগুলোর ওপরই থাকত।’
সাধারণত বেশিরভাগ সময়ই আমরা নিজেদের নিয়ে চিন্তা করতাম যাতায়াতের সময় বা পরিবহনে, ঘুমানোর আগে, কখনো হাঁটতে হাঁটতে, কখনো-বা বাড়িতে বিরক্তি চলে এলে। কিন্তু আজকাল ঠিক এই সময়গুলোই আমরা ব্যয় করি ফেইসবুক স্ক্রল করতে করতে, ইউটিউবে ভিডিও দেখতে দেখতে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজগুলোর জবাব দেওয়ার জন্য!
মৌলিকভাবে আত্মপর্যালোচনার স্থান দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেটিই, যা আলান দে বতুন বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আত্মসমালোচনাই আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের গভীর জ্ঞানকে আকৃতি দেয় এবং আমাদের ব্যর্থ বা সফল অভিজ্ঞতাগুলোকে শিক্ষা ও প্রজ্ঞায় পরিণত করতে সাহায্য করে। অনুরূপ এটি নিজেদের ব্যক্তিত্ব, ইচ্ছা ও ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের সঠিক বুঝ জাগিয়ে তোলে। আমার দৃষ্টিতে নিজের ব্যাপারে গভীর জ্ঞান হলো, কোনো বিষয় সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টি ও সফল জীবনের পরিকল্পনা তৈরির চাবিকাঠি।’
আমাদের উচিত আত্মসমালোচনার জন্য নিজেদের তৈরি করে তোলা। কারণ এই আধুনিক ডিভাইসগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, আমরা কেবল অন্যদের অর্জনগুলোতে মনোনিবেশ করি এবং অন্যের সাথে বারবার নিজেদের তুলনা করি। ফলে আমাদের মনে এই ভুল ধারণার জন্ম হয় যে, তারাই কেবল সাফল্য অর্জনের যোগ্য এবং তাদের লাইকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি! এই দুটি ধারণা আমাদের জীবনে দুটি সংকট সৃষ্টি করে।
এক. আমরা নিজেদের জীবনের বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করতে পারি না।
দুই. আমরা আমাদের সক্ষমতার পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারি না।


কারণ আমরা হয়তো নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করি, অথবা অন্যের প্রশংসা ও অপছন্দের আলোকে আমাদের নিজেদের সাফল্য পরিমাপ করার চেষ্টা করি। ফলে আমরা নিজেদের একজন অনন্য ও ভিন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। অথচ এই সক্ষমতা প্রত্যেকেরই রয়েছে!

আমি মনে করি, যেসব ডিপ্রেশন, বিষণ্ণতা এবং দুঃখ আমরা আজকাল ছড়িয়ে পড়তে দেখি, তার একমাত্র কারণ হলো আত্ম-পর্যালোচনার অনুপস্থিতি! কারণ নিয়মিত আত্মপর্যালোচনার অনুশীলন কেবল ব্যথা, ব্যর্থতা এবং দুঃখকে গ্রহণ করতেই শেখায় না; বরং এগুলোর পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা-ও চিন্তা করতে শেখায়। এই আত্মপর্যালোচনা আমাদের আরও শেখায় যে, এই তিনটি অনুভূতিই হলো চরিত্র গঠনের অন্যতম স্তম্ভ। কারণ এগুলো নিজেকে শিখতে ও বিকাশ করতে একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। তাই আত্মসমালোচনা থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত নয় এবং এটাকে ভয় পাওয়াও উচিত নয়।



তাই আমি প্রায়শই নিজেকে বলি, ‘এখনই সময়! যতটা সম্ভব কাজ করো এবং ভবিষ্যতের বোকামি কমানোর চেষ্টা করো।’ ব্যথা, ব্যর্থতা এবং দুঃখের মোকাবেলা করার এই ক্ষমতাটি সময়ের সাথে সাথে একটি শক্তিশালী অটোইমিউনিটি (Autoimmunity, স্বতঃঅনাক্রম্যতা) তৈরি করে। যা মানুষের হৃদয়কে সবচেয়ে গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক ঝড়ের সামনে দাঁড়াতে সাহায্য করে। বোন ‘খানসা আহমাদ’ এই ধারণাটির ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ লিখেছেন ‘আল-ইনতিবাহু লিল আলামিদ-দাখিলিয়ি’ শিরোনামে। বাংলাতে বলা যায়, ‘অভ্যন্তরীণ জগতের প্রতি মনোযোগ।’ যারা এই ধারণাটিকে বিস্তারিত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আকারে দেখতে চান, তারা প্রবন্ধটি পাঠ করতে পারেন।
সাংবাদিক ফ্রান্সিস বুথ (Francis Booth) বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত নতুন অ্যাপ্লিকেশন এবং নতুন মিডিয়া-সাইট ব্রাউজ করি; কিন্তু এতে কোনো উন্নতি-অগ্রগতির দেখা আমরা পাই না। কেবল এই কাজগুলো করতে হবে, এই কারণেই আমরা করি। এমনকি এর কারণে আমরা নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগও পাই না। ইন্টারনেট আমাদের মনোযোগ দখল করে নিয়েছে এবং মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে।
বুথ তার পয়েন্ট অফ ভিউ ব্যাখ্যা করার জন্য একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মনোযোগ যদি ‘টাকা-পয়সা’ হতো, তাহলে আমরা অনেক আগেই থেমে যেতাম এবং ভাবতাম! কিন্তু আমরা মনোযোগের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিয়েছি যে, এটি বে-শুমার খরচের জিনিস! ফলে আমাদের মূল্যবান মনোযোগ কখনো এখানে, কখনো সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কখনো-বা এমন স্থানে আমাদের মনোযোগ আটকে যায়, যা আমাদের আগ্রহের বিষয়ও নয়! আমরা ইউটিউবে আইটেম সং, মুভি দেখি, অকারণে মেইল চেক করি, সময় কাটানোর জন্য অনলাইনে মার্কেটিং করি, স্কাইপে কলব্যাক করি, টুইটার-ফেসবুক স্ক্রল করি, গুগলে কোনো কারণ ছাড়াই একের পর এক সাজেস্টেড সার্চে ডুবে থাকি। এ ছাড়াও এমন অনেক স্থানে আমরা সময় কাটাই, আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সাথে যার কোনো মিল নেই!’
এই একই সমস্যা মার্ক ম্যানসনও (Mark Manson) লক্ষ করেছিলেন। তাই বিভ্রান্তি ও মনোযোগ হারানোর সমস্যার সমাধান দেওয়ার জন্য তিনি ‘অ্যাটেনশন ডায়েট’ নামক দুর্দান্ত আর্টিকেলটি লেখেন। কিন্তু তিনি একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করে আর্টিকেলটির সূচনা করেন এবং বলেন, এই আর্টিকেলটির মূল কাঠামো দাঁড় করাতে আমার যে সময় লেগেছে, সে সময়ে আমি তিনবার টুইটার ভিজিট করেছি, দুইবার মেইল চেক করেছি, চারটি ইমেইলের রিপ্লাই দিয়েছি, একবার স্ল্যাক (Slack) চেক করেছি এবং দুইজনকে টেক্সট করেছি! এলোমেলোভাবে ইউটিউবে ভিডিও দেখেছি। এতে আমার প্রায় ৩০ মিনিট নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়াও সম্ভবত অ্যামাজনে আমার বইগুলির রেটিং ৩.১৭২ বার চেক করেছি!
মাত্র বিশ মিনিট কাজ করার মধ্যে আমি অন্তত বাধ্য হয়ে নয়বার কাজ থামিয়েছি! এর বেশিও হয়ে থাকে। ফলে প্রবন্ধটি শেষ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছে। এ ছাড়াও আমার চিন্তাভাবনা বিক্ষিপ্ত হয়েছে। লেখার গুণমান হ্রাস পেয়েছে। ফলে লেখাটি সম্পাদনারও প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে! আমি এখন এই সময়ে যে কাজটি করছি না, তাতে আমার মনোযোগ আটকে যাচ্ছে। আমি লেখার সময় অজান্তেই ভাবছি, এই বুঝি ইমেইল এল, এই বুঝি কেউ রিপ্লাই দিল, সে কী রিপ্লাই দিতে পারে! এসব ভাবনার ফলে আমার মাথায় চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং লেখালেখির আনন্দ থেকে আমি বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছি!’

এই বিক্ষিপ্ত মনোযোগ কেবলই প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং এগুলো সৃজনশীলতা ধ্বংস করতে কাজ করে। এগুলো প্রতিস্থাপনের তুলনায় কাজ বাড়িয়ে তোলে! সম্ভবত আপনিও এভাবে বিক্ষিপ্ততায় ডুবে থাকেন। আমি মনে করি, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনোযোগ আরও নিম্নমুখী হয়। এটি খুবই আশ্চর্যের কথা, কারণ আপনি ভাবছেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। মূলত বিষয়টি এমন নয়।
ম্যানসন উল্লেখ করেছেন, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের উদ্বেগ ও স্ট্রেস বাড়ায়। তারপর তিনি বলেন, ‘যেভাবে শারীরিক ব্যায়াম ও কসরত ছেড়ে দূরে থাকলে মানুষের দেহ ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে যায়, সেভাবে মানসিক ব্যায়াম (তথা মনোযোগ) না থাকলে মানুষের মেধাও ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়ে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন