পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ

​ইতিহাস কি কেবল বীরত্ব আর বিজয়ের গল্প? মোটেও না। ইতিহাসের পাতা উল্টালে যেমন মহানায়কদের দেখা মেলে, ঠিক তেমনি পাওয়া যায় এমন কিছু মানুষের খোঁজ, যাদের নাম শুনলে আজও মানুষের রক্ত হিম হয়ে যায়। এরা এমন এক নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সম্পর্কে জানতে গিয়ে আপনি কেবল কিছু নাম জানবেন না, বরং জানবেন মানব চরিত্রের সেই অন্ধকার দিকটি, যেখানে দয়া বা মায়া বলে কিছু ছিল না।

​পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু ভয়ংকর শাসক, ইতিহাসের খুনি এবং নিষ্ঠুর শাসক আবির্ভূত হয়েছেন, যারা ক্ষমতার লোভে কিংবা স্রেফ বিকৃত মানসিক তৃপ্তির জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছেন। কেউ রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে নিজের সাম্রাজ্য গড়েছেন, কেউ আবার হাসিমুখে চালিয়েছেন অকল্পনীয় নির্যাতন।

​আমরা কি আসলেই জানি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ কারা? কেনই বা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসকদের তালিকায় সবার উপরে রাখা হয়? আজকের এই ধারাবাহিক  আর্টিকেলে আমরা জানাবো সেই ১০ জন মানুষের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, যাদের কর্মকাণ্ড মানব সভ্যতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

রক্তের আখরে লেখা সেই ১০টি নাম

ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্রদের তালিকা করা বেশ কঠিন, কারণ নিষ্ঠুরতার কোনো পরিমাপক হয় না। তবুও প্রভাব, হত্যার সংখ্যা এবং নির্যাতনের পৈশাচিকতা বিচার করে আমরা এই ১০ জন ভয়ংকর ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছি:

  1. আডলফ হিটলার (Adolf Hitler): নাৎসি জার্মানির এই একনায়ক যার নির্দেশে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যা 'হলোকাস্ট'।
  2. জোসেফ স্টালিন (Joseph Stalin): সোভিয়েত ইউনিয়নের এই লৌহমানব নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নিজের দেশেরই কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।
  3. মাও সে তুং (Mao Zedong): তার 'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' এবং অন্যান্য নীতির কারণে চীনে যে দুর্ভিক্ষ ও নিধন চলেছিল, তাতে প্রাণ হারায় অগণিত মানুষ।
  4. পোল পট (Pol Pot): কম্বোডিয়ার এই শাসক তার নিজের জাতির এক-চতুর্থাংশ মানুষকে মাত্র কয়েক বছরে হত্যা করেছিলেন।
  5. ভ্লাদ দি ইম্পেলার (Vlad the Impaler): যার নিষ্ঠুরতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে 'ড্রাকুলা' চরিত্র। মানুষকে শূলে চড়ানো ছিল তার নেশা।
  6. চেঙ্গিস খান (Genghis Khan): মঙ্গোল সাম্রাজ্যের এই প্রতিষ্ঠাতা ইতিহাসের অন্যতম দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যার অভিযানে ধুলোয় মিশে গিয়েছিল একের পর এক সভ্যতা।
  7. ইদি আমিন (Idi Amin): উগান্ডার এই স্বৈরশাসক পরিচিত ছিলেন 'আফ্রিকার কসাই' হিসেবে। তার নিষ্ঠুরতার গল্পগুলো হার মানায় ভৌতিক সিনেমাকেও।
  8. লিওপোল্ড দ্বিতীয় (King Leopold II): বেলজিয়ামের এই রাজা কঙ্গো ফ্রি স্টেটে যে পৈশাচিক শোষণ চালিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।
  9. ইভান দি টেরিবল (Ivan the Terrible): রাশিয়ার এই জার ছিলেন অত্যন্ত খামখেয়ালি এবং প্রচণ্ড নিষ্ঠুর। এমনকি রাগের মাথায় তিনি নিজের ছেলেকেও হত্যা করেছিলেন।
  10. তৈমুর লং (Tamerlane): মধ্য এশিয়ার এই দুর্ধর্ষ বিজেতা যেখানেই যেতেন, সেখানে মানুষের খুলি দিয়ে পাহাড় গড়ে তুলতেন।

কেন তারা ইতিহাসের ভয়ংকর ব্যক্তি?

​এই আর্টিকেলের  পরবর্তী অংশগুলোতে আমরা এই ভয়ংকর নেতা এবং ইতিহাসের অপরাধীদের জীবনের প্রতিটি অন্ধকার মোড় উন্মোচন করব। তাদের বেড়ে ওঠা, ক্ষমতারোহণ এবং পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের এমন সব বাস্তব ঘটনা উঠে আসবে যা আপনাকে নতুন করে ভাবাবে—মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে?

ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো কেবল সংখ্যা নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সাধারণ মানুষের কান্না আর রক্ত। আমরা একে একে দেখবো কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ। তাদের রাজত্বে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাটা ছিল একটি অলৌকিক ব্যাপার।

 আপনি কি প্রস্তুত?

​কল্পনা করুন এমন এক সময়ের কথা, যেখানে রাজপথ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, যেখানে আপনার শাসকের চোখের দিকে তাকানো মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, আর যেখানে মানুষের জীবন ছিল স্রেফ একটি সংখ্যার মতো। আমরা যখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের সত্য কাহিনী নিয়ে আলোচনা শুরু করব, তখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—এই মানুষগুলো কি আসলেই আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ ছিল, নাকি নরক থেকে উঠে আসা কোনো শয়তান?

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ নিয়ে আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার নিচের  অংশে আমরা আলোচনা করব সেই ব্যক্তিকে নিয়ে, যার এক ইশারায় কেঁপে উঠেছিল পুরো পৃথিবী এবং যার নাম শুনলে আজও মানবতার মাথা লজ্জায় নত হয়ে যায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ  আডলফ হিটলার 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ  আডলফ হিটলার

​ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম থাকে যা উচ্চারণ করলে এখনো বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সেই তালিকার শীর্ষে যার নাম অনায়াসেই চলে আসে, তিনি হলেন আডলফ হিটলার। তাকে নিয়ে কথা বলা মানেই একটি অন্ধকার সময়ের ভেতরে প্রবেশ করা, যেখানে দয়া-মায়ার কোনো স্থান ছিল না। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের আজকের পর্বে আমরা জানবো এই নিষ্ঠুর শাসক এবং ভয়ংকর নেতা সম্পর্কে, যার একগুঁয়েমি আর ঘৃণা বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল ধ্বংসের মুখে।

একটি সাধারণ ছেলের একনায়ক হয়ে ওঠা

​১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন হিটলার। ছোটবেলায় তিনি অত্যন্ত জেদি ছিলেন এবং তার স্বপ্ন ছিল একজন বড় চিত্রশিল্পী হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য তাকে ভিয়েনার আর্ট একাডেমি থেকে ফিরিয়ে দেয়। অভাব-অনটনে কাটানো সেই দিনগুলোতেই তার মনে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত ঘৃণা—বিশেষ করে ইহুদিদের প্রতি। তার মনে হতে থাকে, জার্মানির সব সমস্যার মূলে রয়েছে ইহুদিরা।

​প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে হিটলার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছিলেন কাছ থেকে। জার্মানির পরাজয় তাকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দেয়। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং তার অসাধারণ বক্তৃতার জাদুতে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করেন। এভাবেই একজন চিত্রশিল্পী হতে চাওয়া যুবক হয়ে ওঠেন ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্র এবং জার্মানির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

হলোকাষ্ট: পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ

​হিটলার যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল জার্মানিকে 'বিশুদ্ধ আর্য রক্তে'র দেশে পরিণত করা। আর এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি বেছে নেন ইতিহাসের সবচেয়ে বীভৎস পথ। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসকদের তালিকায় তার নাম আসার প্রধান কারণ হলো তার নির্দেশে পরিচালিত 'হলোকাষ্ট'।

​তিনি তৈরি করেছিলেন অসংখ্য 'কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প' বা গ্যাস চেম্বার। যেখানে সাধারণ মানুষকে ট্রেনের মালবাহী বগির মতো গাদাগাদি করে ভরে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে নিয়ে গিয়ে বৃদ্ধ, শিশু এবং নারীদের ওপর চালানো হতো অবর্ণনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নাৎসি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার কোনো সীমা ছিল না। বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হতো হাজার হাজার মানুষকে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বর্বরোচিত। কেবল ইহুদি হওয়ার অপরাধে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল তার ইশারায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: এক মানুষের জেদে পুড়ল পৃথিবী

​হিটলার কেবল নিজের দেশের মানুষের ওপরই নিষ্ঠুর ছিলেন না, বরং তার সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশা পুরো পৃথিবীকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে তিনি সূচনা করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুর কাজের বর্ণনা দিতে গেলে এই যুদ্ধের কথা ভুলে যাওয়া অসম্ভব।

​শহরগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া, সাধারণ জনপদে বোমা বর্ষণ এবং লক্ষ লক্ষ যুদ্ধবন্দীদের নির্মমভাবে হত্যা করা ছিল হিটলারের যুদ্ধের কৌশল। তার এই পাগলামির কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষ। ইউরোপের মানচিত্র থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রা—সবকিছুই তছনছ করে দিয়েছিলেন এই ভয়ংকর শাসক। তার ক্ষমতার মোহ এতটাই তীব্র ছিল যে, নিজ বাহিনীর জেনারেলদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি পরাজয় স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না, বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জার্মানির তরুণ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।

নিষ্ঠুরতার এক চরম রূপ: জোসেফ মেঙ্গেলের পরীক্ষা 
নিষ্ঠুরতার এক চরম রূপ: জোসেফ মেঙ্গেলের পরীক্ষা

​হিটলারের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই নাৎসি ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেল ক্যাম্পগুলোতে বন্দীদের ওপর বীভৎস সব চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষা চালাতেন। অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করা, জমজ বাচ্চাদের নিয়ে অমানবিক পরীক্ষা করা—এসবই ছিল হিটলারের শাসন আমলের প্রতিদিনের চিত্র। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ কেন তাকে বলা হয়, তা এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক জাতি তৈরি করতে যারা কেবল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে মানবিকতা থাকে, তা তিনি পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। বলা হয়ে থাকে তার এই বিশাল অপকর্মের জন্য তার নিক নেম ছিল "Angel of Death"

শেষ পরিণতি: এক অন্ধকার বাঙ্কারের সমাপ্তি

​যে মানুষটি পুরো পৃথিবীকে শাসন করতে চেয়েছিলেন এবং কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন, তার শেষ পরিণতি ছিল অত্যন্ত করুণ। ১৯৪৫ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বার্লিনের খুব কাছে চলে আসে, তখন হিটলার তার নববিবাহিত স্ত্রী ইভা ব্রাউনকে নিয়ে এক মাটির নিচের বাঙ্কারে আশ্রয় নেন। পরাজয় নিশ্চিত জেনে তিনি কোনো বীরের মতো লড়েননি, বরং বিষপান এবং নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন।

​মৃত্যুর আগে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন তার দেহ যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে। পৃথিবীর বুকে এক বীভৎস কালিমার দাগ রেখে এভাবেই সমাপ্তি ঘটেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের সত্য কাহিনীর প্রথম বড় অধ্যায়ের।

​আডলফ হিটলারের জীবন আমাদের শেখায় যে, চরম ঘৃণা এবং ক্ষমতার মোহ মানুষকে কতটা নিচ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় হিটলারের নাম চিরকাল এক সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে যাবে। তার নিষ্ঠুরতা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধ জাতীয়তাবাদ এবং জাতিগত বিদ্বেষ মানবতার জন্য কতটা বড় হুমকি হতে পারে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ  জোসেফ স্টালিন 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ  জোসেফ স্টালিন

​ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের আদর্শের দোহাই দিয়ে আস্ত এক একটি দেশকেই বধ্যভূমিতে পরিণত করেছেন। উপরে  আমরা হিটলারের নিষ্ঠুরতা দেখেছিলাম, কিন্তু আজকের পর্বে আমরা এমন এক ব্যক্তির কথা জানবো যাকে হিটলারের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী বলে মনে করেন অনেক ঐতিহাসিক। তিনি হলেন জোসেফ স্টালিনপৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ তালিকার এই দ্বিতীয় নামটি শুনলে আজও রাশিয়ার প্রবীণদের হাড় হিম হয়ে আসে। তাকে বলা হয় 'দ্য ম্যান অফ স্টিল' বা লৌহমানব, কিন্তু তার এই ইস্পাতকঠিন হৃদয়ে মানুষের জন্য কোনো জায়গা ছিল না।

এক সাধারণ ছাত্র থেকে 'লৌহমানব' হয়ে ওঠা

​১৮৭৮ সালে জর্জিয়ার এক দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন জোসেফ স্টালিন। তার বাবা ছিলেন একজন মদ্যপ মুচি, যিনি প্রায়ই ছোট্ট জোসেফকে মারধর করতেন। অনেকেই মনে করেন, শৈশবের সেই অমানবিক পরিবেশই তার ভেতরে গড়ে তুলেছিল এক চরম নিষ্ঠুর শাসক হওয়ার বীজ। মজার ব্যাপার হলো, স্টালিন প্রথমে একজন যাজক হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেছিলেন, কিন্তু মার্ক্সবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি অন্ধকার অপরাধ জগতের পথে পা বাড়ান।

​ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ আর চোরাচালানের মাধ্যমে তিনি বলশেভিক পার্টির জন্য ফান্ড সংগ্রহ করতেন। লেলিনের মৃত্যুর পর তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছান এবং শুরু করেন ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্র হিসেবে নিজের আসল রূপ প্রদর্শন।

দ্য গ্রেট পার্জ: যখন নিজের ছায়াকেও ভয় পেতেন স্টালিন

​স্টালিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার চরম সন্দেহপ্রবণতা। তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। ১৯৩০-এর দশকে তিনি শুরু করেন 'দ্য গ্রেট পার্জ' বা মহান শুদ্ধি অভিযান। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক বিভীষিকাময় প্রক্রিয়া।

​তিনি মনে করতেন তার দলের ভেতরেই শত্রুরা লুকিয়ে আছে। তাই তিনি তার নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সেনাপ্রধান, এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও রেহাই দেননি। স্রেফ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষকে গ্রেফতার করাতেন। বন্দীদের ওপর এমন অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো যে তারা স্বীকার না করা অপরাধও স্বীকার করতে বাধ্য হতো। এরপর হয় তাদের সরাসরি গুলি করা হতো, নয়তো পাঠিয়ে দেওয়া হতো সাইবেরিয়ার কনকনে ঠান্ডায় 'গুলাগ' (Gulag) নামক শ্রমশিবিরে। ইতিহাসের অপরাধীদের তালিকায় স্টালিন অনন্য কারণ তিনি শত্রুর চেয়েও বেশি নিজের দেশের নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছেন।

হলোদোমোর: কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে কয়েক কোটি মৃত্যু

​স্টালিনের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ হলো ইউক্রেনে ঘটা 'হলোদোমোর' বা কৃত্রিম মহামারি। স্টালিন চেয়েছিলেন সোভিয়েত কৃষিব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে। কৃষকরা এর প্রতিবাদ করলে তিনি তাদের সব ফসল কেড়ে নেন। গ্রামগুলোর চারপাশ সেনাবাহিনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল যাতে কেউ খাবারের সন্ধানে বাইরে যেতে না পারে।

​মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় গাছের ছাল, এমনকি মানুষের মাংস পর্যন্ত খেতে শুরু করেছিল। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে কেবল ইউক্রেনেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ কারা—এই প্রশ্নের উত্তরে স্টালিনের এই কর্মকাণ্ড তাকে নিষ্ঠুরতার চূড়ায় নিয়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, স্টালিনের শাসনকালে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

গুলাগ: বরফের নিচে চাপা পড়া কান্না

​সাইবেরিয়ার মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বন্দীদের দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটানো হতো। স্টালিনের নির্দেশ ছিল, "যদি কেউ কাজ করতে না পারে, তবে সে যেন খেতেও না পারে।" এই গুলাগগুলোতে খাবারের অভাবে এবং অতিরিক্ত ঠান্ডায় কয়েক লক্ষ মানুষ তিল তিল করে মারা যায়। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং পদ্ধতিগত নির্যাতন।

​এমনকি স্টালিনের নিজের ছেলেও যখন নাৎসিদের হাতে বন্দি হন, তখন তিনি তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেননি। তার কাছে মানুষের আবেগের চেয়ে ক্ষমতার দাম ছিল অনেক বেশি। তিনি দম্ভ করে বলতেন— "একটি মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি, কিন্তু দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান মাত্র।"

একনায়কের শেষ প্রহর

​যে মানুষটি কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তার নিজের শেষটাও ছিল বড় অদ্ভুত। ১৯৫৩ সালে এক রাতে তিনি তার কক্ষে পড়ে যান। তার রক্ষীরা এতটাই ভীত ছিল যে, বিনা অনুমতিতে তার রুমে ঢোকার সাহস পাননি কেউ। কয়েক ঘণ্টা পর যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। অবশেষে স্টালিন মারা যান, কিন্তু রেখে যান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক বিশাল সাম্রাজ্য আর কোটি মানুষের অভিশাপ।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকা থেকে কখনোই স্টালিনকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়ে গেছেন কীভাবে কমিউনিজমের আড়ালে এক বীভৎস একনায়কতন্ত্র চালানো যায়।

​জোসেফ স্টালিনের জীবন থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন কোনো বিবেকহীন মানুষ বসে, তখন পুরো দেশটাই একটা নরক হয়ে যায়। তিনি কেবল একজন ভয়ংকর নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দক্ষ খুনি যিনি কলমের এক খোঁচায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু পরোয়ানা সই করতেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : মাও সে তুং 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : মাও সে তুং

​ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম থাকে যাদেরকে কেউ বলেন ত্রাণকর্তা, আবার কেউ বলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাতক। গত পর্বে আমরা স্টালিনের লৌহ কঠিন শাসনের কথা জেনেছি। এই পর্বে আমরা এমন একজন ভয়ংকর নেতা সম্পর্কে জানবো, যার একক সিদ্ধান্তে ঘটা প্রাণহানির সংখ্যা হিটলার এবং স্টালিনের সম্মিলিত সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি আর কেউ নন—আধুনিক চীনের জনক হিসেবে পরিচিত মাও সে তুং

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই  পর্বে আমরা উন্মোচন করব সেই সত্য কাহিনী, যেখানে একটি জাতির স্বপ্ন বদলে গিয়েছিল এক দুঃস্বপ্নে।

বিপ্লবের শুরু এবং ক্ষমতার শীর্ষে মাও

​১৮৯৩ সালে চীনের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মাও। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন বিদ্রোহী আর একরোখা। ১৯৪৯ সালে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শেষে যখন তিনি চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশা জেগেছিল এক নতুন চীনের। কিন্তু সেই আশা খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যায়। মাও কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠুর শাসক, যিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নিজের দেশের মানুষকে স্রেফ দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দুর্যোগ

​১৯৫৮ সালে মাও শুরু করেন 'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' (Great Leap Forward)। তার লক্ষ্য ছিল চীনকে কৃষিভিত্তিক দেশ থেকে রাতারাতি শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করা। তিনি নির্দেশ দিলেন—সবাইকে কাজ ফেলে ইস্পাত উৎপাদন করতে হবে। এমনকি কৃষকদের লাঙল আর হাড়ি-পাতিল গলিয়েও নিম্নমানের ইস্পাত তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।

​এর ফলাফল যা হলো তা বর্ণনাতীত। চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীনে দেখা দেয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ। কিন্তু মাও পরাজয় মানতে রাজি ছিলেন না। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে তিনি তার কর্মীদের নির্দেশ দিলেন প্রতিটি গ্রাম থেকে জোর করে শস্য সংগ্রহ করতে। ফলস্বরূপ, কৃষকদের ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই রইল না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায় প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ, কিন্তু নিরপেক্ষ গবেষকদের মতে এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ কোটিরও বেশি! পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় গণমৃত্যু।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব: যখন ছাত্ররা শিক্ষকদের খুনি হয়ে উঠল

​১৯৬৬ সালে নিজের ক্ষমতা পুনরায় সুসংহত করতে মাও শুরু করেন 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব'। তিনি চীনের তরুণ সমাজকে উসকে দেন তাদের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের বিরুদ্ধে—যাদের তিনি 'বিপ্লবের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করেন। শুরু হয় ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায়।

​স্কুল-কলেজের ছাত্ররা গঠন করে 'রেড গার্ড'। তারা তাদের শিক্ষকদের রাস্তায় টেনে এনে অপমান করত, মারধর করত এমনকি পিটিয়ে মেরে ফেলত। পাড়ায় পাড়ায় চলত বিচারের নামে প্রহসন। ইতিহাসের অপরাধী হিসেবে মাও এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে সন্তান তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধেও গোয়েন্দাগিরি করত। এই সময় চীনের প্রাচীন শিল্পকলা, মন্দির এবং অমূল্য সব ঐতিহাসিক সম্পদ ধ্বংস করা হয়। মাও চেয়েছিলেন মানুষের নিজস্ব চিন্তাচেতনা মুছে দিয়ে কেবল তার 'লিটল রেড বুক' বা তার আদর্শ সবার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে।

মাও-এর নিষ্ঠুরতার ভিন্ন রূপ

ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাও একবার নির্দেশ দিয়েছিলেন চীনের সব চড়ুই পাখি মেরে ফেলতে, কারণ তারা নাকি শস্য খেয়ে ফেলে। লক্ষ লক্ষ চড়ুই মারার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং পঙ্গপাল হানা দেয়। এতে দুর্ভিক্ষ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। মাও-এর এই অদ্ভুত আর খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয়েছিল কয়েক কোটি নিরীহ মানুষকে।

​তিনি বিরোধীদের দমনের জন্য ব্যবহার করতেন 'লাওগাই' (Laogai) বা শ্রমশিবির। সেখানে বন্দীদের দিয়ে এমন অমানবিক কাজ করানো হতো যে মৃত্যুর হার ছিল আকাশচুম্বী। মাও মনে করতেন— "বিপ্লব মানে কোনো ডিনার পার্টি নয়... এটি একটি সহিংস কাজ।" আর তার এই সহিংসতার নেশায় পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছিল পুরো চীন।

শেষ পরিণতি এবং বিতর্কিত উত্তরাধিকার

​১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাও ছিলেন চীনের অবিসংবাদিত অধিপতি। মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে চীনে আজও মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। একদল তাকে আধুনিক চীনের নির্মাতা মনে করে, আর বিশ্ব ইতিহাস তাকে স্মরণ করে সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ এবং সববৃহৎ গণহত্যার কারিগর হিসেবে। তার শাসনামলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি থেকে ৭ কোটির মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয়—যা মানব ইতিহাসের আর কোনো শাসকের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

​মাও সে তুং-এর জীবনী আমাদের দেখায় যে, অন্ধ আবেগ এবং একনায়কতন্ত্র কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জাতিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যেতে পারে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় মাও সে তুং একটি বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকবেন। আদর্শের আড়ালে তিনি যে মৃত্যুপুরী গড়েছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া বিরল।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : পোল পট 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : পোল পট

​ইতিহাসের পাতায় আমরা হিটলার, স্টালিন বা মাও-এর কথা পড়ি যারা বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। কিন্তু আজকের পর্বে আমরা এমন এক ব্যক্তির কথা জানবো, যার নিষ্ঠুরতা আয়তনে ছোট একটি দেশকে আক্ষরিক অর্থেই 'নরক' বানিয়ে ছেড়েছিল। তিনি হলেন কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক পোল পটপৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই  পর্বে আমরা দেখবো কীভাবে একজন মানুষ তার নিজের জাতিকে ধ্বংস করার এক পৈশাচিক নেশায় মেতে উঠেছিলেন।

শিক্ষক থেকে খুনি: এক অদ্ভুত রূপান্তর

​পোল পটের আসল নাম ছিল সালোথ সার। তিনি ফ্রান্সে পড়াশোনা করা একজন শিক্ষিত মানুষ ছিলেন এবং এক সময় শিক্ষকতাও করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহ এবং উগ্র সাম্যবাদী আদর্শ তাকে এমন এক দানবে পরিণত করে যে তিনি পুরো কম্বোডিয়াকে এক বিশাল জেলখানায় রূপান্তরিত করেন। ১৯৭৫ সালে তার সংগঠন 'খেমার রুজ' ক্ষমতা দখল করার পর তিনি ঘোষণা করেন 'ইয়ার জিরো' (Year Zero) বা 'শূন্য বছর'। অর্থাৎ, তিনি ইতিহাস মুছে দিয়ে নতুন করে সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সমাজ গড়ার ভিত্তি ছিল কেবলই রক্ত।

শহর থেকে গ্রামে নির্বাসন: সভ্যতার কবর রচনা

​পোল পটের প্রথম কাজই ছিল আধুনিকতাকে ঘৃণা করা। তিনি মনে করতেন শহরগুলো হলো দুর্নীতির আখড়া। তাই তিনি জোর করে নমপেন (Phnom Penh) শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষকে গ্রাম অভিমুখে যাত্রা করতে বাধ্য করেন। হাসপাতালের রোগী থেকে শুরু করে শিশু—কাউকেই রেডি হওয়ার সময় দেওয়া হয়নি। ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্র পোল পট চেয়েছিলেন পুরো জাতিকে কৃষক বানিয়ে ফেলতে। যারা এই আদেশের বিরোধিতা করত, তাদের সাথে সাথেই গুলি করে হত্যা করা হতো। শহরের মানুষগুলো গ্রামে গিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি আর অনাহারে তিল তিল করে মরতে শুরু করে।

হত্যার অদ্ভুত সব অজুহাত: চশমা পরা মানেই মৃত্যু!

​পোল পটের শাসনামলে মানুষ হত্যার যেসব কারণ ছিল, তা শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে তিনি বুদ্ধিজীবীদের চরম ঘৃণা করতেন। আপনি যদি চশমা পরতেন, তবে আপনাকে শিক্ষিত বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য করা হতো এবং আপনার কপালে জুটত বুলেট। এমনকি যদি আপনার হাত নরম হতো (অর্থাৎ আপনি কায়িক শ্রম করেন না), যদি আপনি কোনো বিদেশি ভাষায় কথা বলতেন কিংবা ধর্মীয় চর্চা করতেন—তবেই আপনাকে 'বিপ্লবের শত্রু' হিসেবে গণ্য করা হতো।

​তার নির্দেশে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং ভিক্ষুদের লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুর কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা একে বলেন 'অটো-জেনোসাইড' বা আত্ম-গণহত্যা, কারণ তিনি তার নিজের ধর্মের আর জাতির মানুষদেরই সবচেয়ে বেশি হত্যা করেছিলেন।

কিলিং ফিল্ডস: যেখানে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে লক্ষ লক্ষ কঙ্কাল

​পোল পটের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে বড় সাক্ষী হলো 'কিলিং ফিল্ডস' (Killing Fields)। যেহেতু বুলেট সাশ্রয় করতে হতো, তাই খেমার রুজ বাহিনী মানুষকে মারার জন্য কুঠার, হাতুড়ি কিংবা ধারালো বাঁশের লাঠি ব্যবহার করত। মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে মাথার পেছনে আঘাত করে গর্তে ফেলে দেওয়া হতো।

​সবচেয়ে বিভীষিকাময় ছিল শিশুদের হত্যা করার পদ্ধতি। ছোট্ট শিশুদের গাছের সাথে আছাড় মেরে হত্যা করা হতো যাতে তারা বড় হয়ে প্রতিশোধ নিতে না পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে মাত্র চার বছরে কম্বোডিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ) অনাহার, রোগ আর অত্যাচারে প্রাণ হারায়।

এস-২১ জেলখানা: যেখানে ফিরে আসত না কেউ

​একটি প্রাক্তন স্কুলকে পোল পট বানিয়েছিলেন 'এস-২১' (Tuol Sleng) নামক একটি টর্চার সেল। সেখানে ২০ হাজার মানুষকে বন্দি করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে মাত্র ৭ জন বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন। সেখানে বন্দীদের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো যে তারা স্রেফ মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করত। ইতিহাসের অপরাধী পোল পট বিশ্বাস করতেন— "কাউকে বাঁচিয়ে রাখলে কোনো লাভ নেই, আর কাউকে মেরে ফেললে কোনো ক্ষতি নেই।"

পতন ও বিচারহীন মৃত্যু

​১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের আক্রমণের মুখে পোল পট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়ংকর নেতা তার কৃতকর্মের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারের সম্মুখীন হননি। ১৯৯৮ সালে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে নিজের বিছানায় মারা যান। মরার আগ পর্যন্ত তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না; বরং তিনি দাবি করেছিলেন তিনি যা করেছেন তা দেশের মঙ্গলের জন্যই করেছেন।

​পোল পটের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উগ্র আদর্শবাদ যখন উন্মাদনার পর্যায়ে চলে যায়, তখন মানুষ তার নিজের অস্তিত্বকেও মুছে ফেলতে দ্বিধা করে না। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় পোল পট এক পৈশাচিক নাম, যার ছায়ায় আজও কম্বোডিয়ার মানুষ ভয়ে সিটিয়ে থাকে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ: ভ্লাদ দি ইম্পেলার 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ: ভ্লাদ দি ইম্পেলার

​ভ্যাম্পায়ার বা ড্রাকুলার গল্প আমরা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু আপনি কি জানেন, রুপালি পর্দার সেই রক্তচোষা ড্রাকুলার চরিত্রটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল ইতিহাসের এক রক্তমাংসের মানুষের জীবন থেকে? তিনি ছিলেন রোমানিয়ার ওয়ালাচিয়া অঞ্চলের শাসক ভ্লাদ দি ইম্পেলার (Vlad the Impaler)। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের আজকে  আমরা এমন এক ব্যক্তির কাহিনী শোনাব, যার নিষ্ঠুরতা মধ্যযুগের ইতিহাসকে রক্তে রঞ্জিত করেছিল।

ভ্লাদ দি ইম্পেলার: শূলে চড়ানোর কারিগর

​১৪৩১ সালে জন্ম নেওয়া ভ্লাদ তৃতীয় ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং দক্ষ যোদ্ধা। কিন্তু তার সাহসের চেয়েও বেশি পরিচিতি ছিল তার অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার জন্য। তাকে 'ইম্পেলার' বা 'শূলে চড়ানোর কারিগর' বলা হতো কারণ তার প্রিয় শাস্তি ছিল মানুষকে জ্যান্ত অবস্থায় তীক্ষ্ণ কাঠের শূলে গেঁথে দেওয়া। ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্রদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক অনন্য আতঙ্ক, যিনি কেবল অপরাধীদেরই নয়, নিরপরাধ মানুষকেও স্রেফ শখের বসে এমন পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করতেন।

শূলবিদ্ধ বন: যখন সেনাবাহিনী ভয়ে পিছু হটেছিল

​ভ্লাদ দি ইম্পেলারের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় অটোমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের সময়। বলা হয়, একবার অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যখন তার বিশাল বাহিনী নিয়ে ভ্লাদের রাজধানী আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছিলেন, তখন তিনি রাস্তার দুই পাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান। সেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে শূলে গেঁথে রাখা হয়েছিল। মৃতদেহের সেই সারি দেখে এবং পচা মাংসের দুর্গন্ধে তুর্কি সেনাবাহিনী এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে তারা রাজধানী আক্রমণ না করেই ফিরে গিয়েছিল। ভয়ংকর শাসক ভ্লাদ এভাবেই ত্রাসের মাধ্যমে নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতেন।

মানুষের রক্তে ভোজের নেশা

​অনেকে মনে করেন ভ্লাদ কেবল একজন নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। শোনা যায়, তিনি যখন মানুষকে শূলে চড়াতেন, তখন সেই মৃতদেহগুলোর মাঝখানে বসে তিনি খাবার খেতেন। এমনকি কিছু লোককাহিনী অনুযায়ী, তিনি শূলে বিদ্ধ মানুষের চুঁইয়ে পড়া রক্তে পাউরুটি ভিজিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে তার এই বৈশিষ্ট্যই লেখক ব্রাম স্টোকারকে 'ড্রাকুলা' উপন্যাস লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে শিহরণ জাগানো অধ্যায়।

ভিক্ষুক ও দরিদ্রদের জন্য এক ভয়ংকর 'ভোজ'

​একবার ভ্লাদ তার রাজ্যের সব ভিক্ষুক, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষকে এক বিশাল ভোজে আমন্ত্রণ জানান। সবাই যখন খাওয়া-দাওয়ায় মগ্ন, তখন ভ্লাদ হঠাৎ বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেই হলরুমে আগুন লাগিয়ে দেন। তার যুক্তি ছিল— তিনি তার রাজ্য থেকে দারিদ্র্য দূর করতে চান এবং এই মানুষগুলোকে আর কষ্ট পেতে দিতে চান না। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এমন সব সিদ্ধান্ত নিতেন যা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত।

নারীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা

​ভ্লাদ দি ইম্পেলার নারীদের প্রতি ছিলেন চরম নিষ্ঠুর। বিশেষ করে যদি কোনো নারী অবাধ্য হতো বা কোনো ভুল করত, তবে তার শাস্তি হতো অমানুষিক। তিনি গর্ভবতী নারীদের পেট কেটে ভ্রূণ বের করা কিংবা নারীদের অঙ্গচ্ছেদ করার মতো কাজগুলো অত্যন্ত পৈশাচিক আনন্দের সাথে করতেন। ইতিহাসের অপরাধীদের তালিকায় তিনি এমন এক নাম, যিনি নারী, শিশু বা বৃদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতেন না।

মৃত্যু এবং রহস্য

​১৪৭৬ সালে এক যুদ্ধে ভ্লাদ নিহত হন। তার মাথাটি কেটে অটোমান সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে সেটি জনসম্মুখে টাঙিয়ে রাখা হয় যাতে মানুষ নিশ্চিত হতে পারে যে এই দানব আর বেঁচে নেই। তার কবরটি নিয়ে আজও অনেক রহস্য রয়েছে; কোনো কোনো গবেষক মনে করেন তার কবরে কোনো মৃতদেহ ছিল না।

​ভ্লাদ দি ইম্পেলার ছিলেন তার সময়ের জন্য এক ত্রাস। তিনি হয়তো তার দেশকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার মাধ্যম ছিল অমানবিক। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় তার নাম থাকবে তার বিচিত্র এবং পৈশাচিক হত্যা পদ্ধতির জন্য। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে বাস্তব জীবনের দানব অনেক সময় কাল্পনিক ভূতের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হতে পারে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : চেঙ্গিস খান 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : চেঙ্গিস খান

​ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম থাকে যারা কোনো মানচিত্র মেনে চলেননি, বরং তলোয়ারের ডগায় নতুন মানচিত্র এঁকেছেন। উপরে  আমরা রোমানিয়ার 'রক্তচোষা' শাসক ভ্লাদ দি ইম্পেলার সম্পর্কে জেনেছি। এই পর্বে আমরা কথা বলব এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে, যাকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বিজেতা বলা হলেও তার নিষ্ঠুরতা ছিল পৃথিবীর জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ। তিনি আর কেউ নন—মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের  আমরা জানবো সেই দুর্ধর্ষ যোদ্ধার কথা, যার ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট হয়েছিল কোটি কোটি মানুষের প্রাণ।

তেমুজিন থেকে চেঙ্গিস খান: প্রতিশোধের আগুনে বেড়ে ওঠা

​১১৬২ সালের দিকে মঙ্গোলিয়ার স্তেপ অঞ্চলে জন্ম তেমুজিনের (চেঙ্গিস খানের প্রকৃত নাম)। তার শৈশব ছিল অত্যন্ত কঠিন। শত্রুপক্ষ তার বাবাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে এবং তাদের পরিবারকে গোত্র থেকে বের করে দেয়। বনে-জঙ্গলে ইঁদুর খেয়ে বেঁচে থাকা সেই ছেলেটিই একদিন পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু শৈশবের সেই বঞ্চনা আর লড়াই তার মনকে পাথরের মতো শক্ত আর একরোখা করে তুলেছিল। ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্র হয়ে ওঠার বীজ বপন হয়েছিল তখনই।

খুলি দিয়ে পাহাড় বানানো: অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা

​চেঙ্গিস খান যখন কোনো শহর আক্রমণ করতেন, তখন তার সামনে কেবল দুটি পথ খোলা থাকতো— আত্মসমর্পণ নয়তো সমূলে বিনাশ। যদি কোনো শহর বাধা দিত, তবে সেই শহরের কুকুর-বিড়াল পর্যন্ত জ্যান্ত রাখা হতো না। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিজিত অঞ্চলের মানুষের কাটা মাথা বা খুলি দিয়ে পিরামিড বা পাহাড় তৈরি করা।

​নিশাপুর অবরোধের সময় তার এক জামাতা মারা গেলে, তিনি পুরো শহরের প্রতিটি প্রাণীকে হত্যার নির্দেশ দেন। বলা হয়, সেখানে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে তাদের মাথার খুলি দিয়ে আলাদা আলাদা স্তূপ বানানো হয়েছিল (পুরুষ, নারী এবং শিশুদের জন্য আলাদা স্তূপ)। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বীভৎস।

পরিবেশের পরিবর্তন: যেখানে গ্রাম ছিল সেখানে এখন জঙ্গল

​চেঙ্গিস খানের নিষ্ঠুরতা এতটাই ব্যাপক ছিল যে তা পৃথিবীর জলবায়ুতেও প্রভাব ফেলেছিল। তিনি তার অভিযানে এত বেশি শহর এবং গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এবং এত বেশি মানুষকে হত্যা করেছিলেন যে, চাষাবাদের জমিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পুনরায় জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, তার এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারিত হয়েছিল। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনা কেবল মানুষের ওপর নয়, পৃথিবীর ভূ-প্রকৃতির ওপরও স্থায়ী ক্ষত রেখে গিয়েছিল।

নিষ্ঠুরতার ভিন্ন পদ্ধতি: গলিত রূপা আর মানব ঢাল

​চেঙ্গিস খানের বাহিনী কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হতো না, তারা নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করত। ইনালচুক নামক এক গভর্নর যখন মঙ্গোল দূতদের অপমান করেন, তখন চেঙ্গিস খান প্রতিশোধ হিসেবে তার চোখ এবং কানে গলিত রূপা ঢেলে দিয়ে তাকে হত্যা করেন। যুদ্ধের সময় মঙ্গোলরা বন্দি সাধারণ মানুষকে 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করত। তারা বন্দীদের লাইনের সামনে রাখত যাতে শত্রুপক্ষ তাদের ওপর তীর ছুঁড়তে দ্বিধা করে। ইতিহাসের অপরাধীদের তালিকায় চেঙ্গিস খান এমন এক নাম যিনি যুদ্ধের ময়দানকে কসাইখানায় পরিণত করেছিলেন।

বংশগতিতে এক বিশাল প্রভাব

​চেঙ্গিস খান কেবল সংহারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চরম লম্পটও। বিজিত অঞ্চলের হাজার হাজার নারীকে তিনি নিজের হারেমে বন্দি করে রাখতেন। ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতি ২০০ জন পুরুষের মধ্যে একজনের শরীরে চেঙ্গিস খানের ডিএনএ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডও ছিল নারী জাতির ওপর এক প্রকার পৈশাচিক নির্যাতন।

মৃত্যু এবং এক অজানা সমাধি

​১২২৭ সালে এই ভয়ংকর নেতার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু এবং কবর নিয়ে রয়েছে রোমহর্ষক কাহিনী। বলা হয়, তার শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাকে এমন এক গোপন জায়গায় সমাহিত করা হয়েছিল যার কোনো চিহ্ন রাখা হয়নি। যারা তাকে দাফন করতে গিয়েছিল, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছিল। আবার যারা সেই হত্যাকারীদের হত্যা করেছিল, তাদেরও মেরে ফেলা হয়—যাতে কেউ কোনোদিন তার কবরের হদিস না পায়। আজও চেঙ্গিস খানের সমাধি এক রহস্য।

​চেঙ্গিস খান বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য এবং যোগাযোগের নতুন পথ খুলে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি যে রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছিলেন তা ক্ষমা করার মতো নয়। প্রায় ৪ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিলেন এই নিষ্ঠুর শাসকমানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় তিনি এক অবিস্মরণীয় ত্রাস।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : ইদি আমিন 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : ইদি আমিন

​ইতিহাসের পাতায় আমরা অনেক নিষ্ঠুর রাজার কথা পড়েছি, কিন্তু আধুনিক যুগেও যে কতটা পৈশাচিক হওয়া সম্ভব, তার জীবন্ত উদাহরণ উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন। তাকে বলা হতো 'আফ্রিকার কসাই'। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই পর্বে আমরা জানবো এমন এক ব্যক্তির কথা, যার নিষ্ঠুরতা কেবল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পৌঁছে গিয়েছিল বিকৃত মানসিকতার এক চরম পর্যায়ে।

একজন বক্সার থেকে উগান্ডার ভাগ্যবিধাতা

​১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া ইদি আমিন কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীতে একজন সাধারণ রান্নার সহকারী হিসেবে। বিশাল দেহ আর প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী আমিন দ্রুতই সেনাবাহিনীতে নিজের জায়গা করে নেন এবং লাইট হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। শুরুতে উগান্ডার মানুষ তাকে মুক্তিদাতা মনে করলেও খুব দ্রুতই তারা বুঝতে পারে যে, তারা আসলে এক ভয়ংকর শাসক ও নরপিশাচের কবলে পড়েছে।

নিজ দেশের মানুষকে নিয়ে যমরাজের খেলা

​ইদি আমিনের শাসনামলে উগান্ডা এক বিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি তার আট বছরের শাসনামলে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেন। তার হত্যার পদ্ধতিগুলো ছিল ভয়াবহ। তিনি তার বিরোধীদের কেবল গুলি করে মারতেন না, বরং তাদের হাত-পা বেঁধে কুমিরভর্তি নীল নদে ফেলে দিতেন। বলা হয়, নীল নদের কুমিরগুলো মানুষের মাংস খেতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে তারা সাধারণ খাবার খেতে চাইত না। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বীভৎস।

নরভক্ষণ ও বিকৃত মানসিকতা

​ইদি আমিনকে নিয়ে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো তার নরভক্ষণের নেশা। জনশ্রুতি আছে এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই দাবি করেছেন যে, আমিন তার শত্রুদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে ফ্রিজে জমিয়ে রাখতেন এবং পরে তা রান্না করে খেতেন। তিনি একবার দম্ভ করে বলেছিলেন— "মানুষের মাংস খাওয়া অনেক লবণাক্ত, যা আমি পছন্দ করি।" ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্রদের মধ্যে এমন বিকৃত রুচি আর কারো মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। তিনি তার এক স্ত্রীকে টুকরো টুকরো করে কেটে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অদলবদল করে সেলাই করে রেখেছিলেন—এমন নৃশংসতা ভাবলেও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত ও অর্থনীতি ধ্বংস

​ইদি আমিন কেবল একজন ভয়ংকর নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রচণ্ড খামখেয়ালি। ১৯৭২ সালে তিনি স্বপ্ন দেখেন যে ঈশ্বর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন এশীয়দের উগান্ডা থেকে বের করে দিতে। এরপর তিনি প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মানুষকে মাত্র ৯০ দিনের নোটিশে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। এতে উগান্ডার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ইতিহাসের অপরাধী আমিন নিজেকে 'স্কটল্যান্ডের অঘোষিত রাজা' এবং 'পৃথিবীর সমস্ত পশুপাখি ও সমুদ্রের মাছের প্রভু' হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তার আত্মম্ভরিতা ছিল আকাশচুম্বী।

রক্তের দাগ মুছে নির্বাসিত জীবন

​১৯৭৯ সালে তানজানিয়ার সেনাবাহিনী এবং উগান্ডার বিদ্রোহীদের আক্রমণে আমিনের পতন ঘটে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নিষ্ঠুর শাসক তার কৃতকর্মের জন্য কোনো শাস্তি পাননি। তিনি প্রথমে লিবিয়া এবং পরে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সেখানে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে ২০০৩ সালে তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে নিজে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করাটা ইতিহাসের এক চরম পরিহাস।

​ইদি আমিনের জীবনী আমাদের দেখায় যে, ক্ষমতা যখন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষের হাতে পড়ে, তখন সভ্যতা কতটা অসহায় হয়ে পড়ে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় ইদি আমিনের নাম এক কালিমালিপ্ত অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একবিংশ শতাব্দীর কাছাকাছি এসেও মানুষ মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড

​ইতিহাসের কিছু নিষ্ঠুরতা যুদ্ধের ময়দানে ঘটে, আর কিছু ঘটে পর্দার আড়ালে, দাপ্তরিক নথিপত্রে। গত পর্বে আমরা আফ্রিকার কসাই ইদি আমিনের কথা জেনেছি। আজকের পর্বে আমরা জানবো এমন এক ইউরোপীয় রাজার কথা, যিনি কখনো কোনো যুদ্ধে সশরীরে অংশ না নিলেও স্রেফ নিজের পকেট ভারী করার জন্য একটি আস্ত দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তিনি বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই  পর্বে আমরা উন্মোচন করব সেই সত্য কাহিনী, যেখানে মানবিকতার মুখোশ পরে চালানো হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম শোষণ।

ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে একটি দেশ দখল

​১৮৮৫ সালে বার্লিন কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজা লিওপোল্ড আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ড 'কঙ্গো' নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দখল করে নেন। তিনি বিশ্বকে বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি সেখানে সভ্যতা ছড়িয়ে দিতে এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে হাতির দাঁত এবং রাবার লুটে নেওয়া। ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্রদের মধ্যে লিওপোল্ড ছিলেন সবচেয়ে ধূর্ত, কারণ তিনি পরোপকারের আড়ালে নিজের পৈশাচিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

হাত কেটে নেওয়ার বীভৎস সংস্কৃতি

​লিওপোল্ডের শাসনামলে কঙ্গো পরিণত হয়েছিল এক বিশাল দাসখানায়। তিনি তার ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী 'ফোর্স পাবলিক' ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক রাবার সংগ্রহে বাধ্য করতেন। প্রতিটি গ্রামের জন্য রাবার সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট কোটা বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল। যদি কোনো গ্রাম সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হতো, তবে শুরু হতো অমানুষিক নির্যাতন।

ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে লিওপোল্ডের সৈন্যরা অবাধ্যদের শাস্তি হিসেবে তাদের হাত কেটে নিত। এমনকি শিশুদের হাতও কেটে নেওয়া হতো এবং সেই কাটা হাতগুলো ঝুড়ি ভরে অফিসারদের কাছে জমা দেওয়া হতো প্রমাণের জন্য। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে জঘন্য; কারণ অনেক সময় সৈন্যরা কার্তুজ সাশ্রয় করার জন্য জ্যান্ত মানুষের হাত কেটে ছেড়ে দিত। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনা হিসেবে এই 'কাটা হাতের ছবি'গুলো আজও শিউরে ওঠার মতো।

১ কোটি মানুষের নিভৃত মৃত্যু

​লিওপোল্ডের শোষণ কতটা ভয়াবহ ছিল তার পরিসংখ্যান দেখলে মাথা ঘুরে যায়। ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে তার রাবার বাগানে কাজ করতে গিয়ে এবং তার বাহিনীর অত্যাচারে প্রায় ১ কোটি কঙ্গোবাসী প্রাণ হারায়। এটি ছিল তৎকালীন কঙ্গোর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ক্ষুধা, রোগ এবং মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপে মানুষ তিল তিল করে মৃত্যুবরণ করত। অথচ বেলজিয়ামে বসে এই নিষ্ঠুর শাসক সেই রক্তমাখা টাকায় বড় বড় রাজপ্রাসাদ আর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করছিলেন। এজন্য তাকে আজও 'বিল্ডার কিং' বলা হয়, যদিও সেই ইমারতগুলোর প্রতিটির নিচে চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার মানুষের কঙ্কাল।

মানবিকতার আড়ালে শয়তানি

​লিওপোল্ড ছিলেন একজন ভয়ংকর নেতা, যিনি প্রচারণায় ছিলেন অত্যন্ত পটু। তিনি ইউরোপে নিজেকে একজন দাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, অথচ কঙ্গোতে তিনি নারীদের বন্দি করে রাখতেন যাতে তাদের স্বামীরা বাধ্য হয়ে রাবার সংগ্রহ করে আনে। যদি কেউ পালানোর চেষ্টা করত, তবে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। ইতিহাসের অপরাধীদের তালিকায় তিনি অনন্য কারণ তিনি রাষ্ট্রীয় আইনের আড়ালে একটি জাতিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। হিটলারের হলোকাস্টের অনেক আগেই লিওপোল্ড আফ্রিকায় এক নীরব গণহত্যা চালিয়েছিলেন।

বিচারহীন প্রস্থান এবং ইতিহাস থেকে আড়াল

​১৯০৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লিওপোল্ড কঙ্গোর নিয়ন্ত্রণ বেলজিয়াম সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। হস্তান্তরের আগে তিনি কঙ্গোর সমস্ত রেকর্ড পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, যাতে তার নিষ্ঠুরতার কোনো প্রমাণ না থাকে। ১৯০৯ সালে তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বহু বছর ধরে ইউরোপের ইতিহাসে তার এই নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তাকে কেবল একজন 'উদার রাজা' হিসেবেই উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু সত্য চিরকাল চাপা থাকে না।

​রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের কাহিনী আমাদের শেখায় যে, লোভ যখন ক্ষমতার সাথে যুক্ত হয়, তখন তা বর্ণনাতীত নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয়। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় লিওপোল্ডের নাম থাকা উচিত তাদের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে, যারা উন্নয়নের নামে শোষণকে জায়েজ করতে চায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : ইভান দি টেরিবল 
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ : ইভান দি টেরিবল

​ইতিহাসের কিছু মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে বীর হিসেবে অমর হন, আর কেউ কেউ অমর হন তাদের হাড়হিম করা নিষ্ঠুরতার জন্য। গত পর্বে আমরা বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের শোষণ নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমাদের তালিকার শেষ ব্যক্তিটি হলেন রাশিয়ার প্রথম জার ইভান চতুর্থ, যাকে পৃথিবী একনামে চেনে 'ইভান দি টেরিবল' (Ivan the Terrible) হিসেবে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই  পর্বে আমরা জানবো সেই শাসক সম্পর্কে, যার রাগের আগুনে নিজের আপন সন্তানও ভস্মীভূত হয়েছিল।

ট্র্যাজেডিতে ঘেরা শৈশব ও ক্ষমতার লোভ

​১৫৩০ সালে জন্ম নেওয়া ইভানের শৈশব ছিল ষড়যন্ত্র আর অবহেলায় ঘেরা। মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবাকে এবং ৮ বছর বয়সে মাকে (যাকে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল) হারান তিনি। রাজসভার ক্ষমতালোভী অভিজাতরা বা 'বোয়ার'রা তাকে স্রেফ খেলনা হিসেবে ব্যবহার করত। অনেকেই মনে করেন, শৈশবের এই চরম অনিরাপত্তা আর ভয় থেকেই তার ভেতরে এক প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ ও নিষ্ঠুর শাসক সত্তার জন্ম হয়। ১৫৪৭ সালে তিনি নিজেকে রাশিয়ার প্রথম 'জার' হিসেবে ঘোষণা করেন এবং শুরু হয় তার শাসনের অন্ধকার অধ্যায়।

ওপরিচনিনা: ব্যক্তিগত ঘাতক বাহিনী

​ইভান তার শাসনকালকে সুরক্ষিত করতে 'ওপরিচনিনা' (Oprichnina) নামক একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করেন। তারা কালো পোশাক পরত এবং কালো ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের ঘোড়ার জিনে ঝোলানো থাকত একটি কুকুরের কাটা মাথা আর একটি ঝাড়ু—যার অর্থ ছিল তারা জারের শত্রুদের কুকুরের মতো কামড়াবে এবং ময়লার মতো ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করবে।

​এই বাহিনীটি ছিল ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্রদের একটি আস্ত দল। তারা যখন তখন যার তার ঘরে ঢুকে মানুষকে অত্যাচার করত, নারীদের তুলে নিয়ে যেত এবং প্রকাশ্য দিবালোকে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করত। ইভান এই বাহিনীর মাধ্যমে রাশিয়ার হাজার হাজার অভিজাত পরিবারকে সমূলে বিনাশ করেছিলেন।

নোভগোরড গণহত্যা: যখন রক্তে জমে গিয়েছিল বরফ

​১৫৭০ সালে ইভান সন্দেহ করেন যে নোভগোরড শহরের মানুষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিনি পুরো শহরের ওপর পৈশাচিক হামলা চালান। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে তিনি হাজার হাজার মানুষকে বেঁধে বরফজমা নদীতে ফেলে দেন। যারা সাঁতরে ওঠার চেষ্টা করত, তাদের কুঠার দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হতো।

​বলা হয়, টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে সেখানে গণহত্যা চলেছিল এবং প্রতিদিন গড়ে ১০০০ মানুষকে হত্যা করা হতো। শহরের রাস্তাগুলো রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে এই নোভগোরড ট্র্যাজেডি রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে কালো দিন হিসেবে পরিচিত।

নিজের হাতে নিজের পুত্রকে হত্যা

​ইভানের নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায় ছিল তার নিজ পরিবারের ওপর আক্রমণ। ১৫৮১ সালে তিনি তার অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে মারধর করেন কারণ তিনি 'শালীন পোশাক' পরেননি, যার ফলে তার গর্ভপাত ঘটে। ইভানের ছেলে (যুবরাজ ইভান) যখন এর প্রতিবাদ করতে আসে, তখন ইভান প্রচণ্ড রাগে তার হাতের রাজদণ্ড দিয়ে ছেলের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এই এক আঘাতেই তার প্রিয় পুত্রের মৃত্যু হয়।

​পুতলুতুল্য প্রাণহীন ছেলের মাথা কোলে নিয়ে ইভানের সেই হাহাকারের দৃশ্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতিহাসের অপরাধী ইভান নিজের জেদ আর রাগের বশে নিজের উত্তরাধিকারকেও শেষ করে দিয়েছিলেন।

স্থাপত্যের আড়ালে বীভৎসতা

​মস্কোর বিখ্যাত 'সেন্ট ব্যাসিলস ক্যাথেড্রাল' ইভানের নির্দেশেই তৈরি করা হয়েছিল। এই চমৎকার গির্জাটি দেখে ইভান এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে, তিনি নির্দেশ দেন এর কারিগর বা স্থপতির চোখ উপড়ে ফেলতে। তার উদ্দেশ্য ছিল—এই কারিগর যেন পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর আর কোনো স্থাপনা আর কোনোদিন তৈরি করতে না পারে। এটিই ছিল ভয়ংকর নেতা ইভানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধরন।

মৃত্যু এবং এক পাপিষ্ঠের বিদায়

​১৫৮৪ সালে দাবা খেলার সময় আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইভানের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সময় রাশিয়া ছিল এক বিধ্বস্ত দেশ। তার মৃত্যুর পর রাশিয়ায় দীর্ঘকাল অরাজকতা বা 'টাইম অফ ট্রাবলস' চলেছিল। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলোর কারণে রাশিয়ার মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করার চেয়ে ভয়ই বেশি পেত।

​ইভান দি টেরিবলের জীবন আমাদের দেখায় যে, শৈশবের ট্রমা আর অপ্রতিহত ক্ষমতা একজন মানুষকে কতটা বিকৃত মানসিকতার অধিকারী করতে পারে। তিনি রাশিয়ার সীমানা বাড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি যে বিভীষিকা ছড়িয়েছিলেন তা আজও রাশিয়ার লোকগাঁথায় অভিশপ্ত হয়ে আছে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকায় ইভান এক রক্তমাখা নাম।

নিষ্ঠুরতার সারসংক্ষেপ ও ইতিহাসের শিক্ষা

​আমরা একে একে ইতিহাসের সেই ১০ জন মানুষের জীবন আর তাদের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে হেঁটে Can't, যাদের ছায়ায় এক সময় পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই পর্বে আমরা ফিরে তাকাব সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলোর দিকে এবং বোঝার চেষ্টা করব—কীভাবে এই মানুষগুলো সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ থেকে ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্র হয়ে উঠলেন।

নিষ্ঠুরতার এক সাধারণ সূত্র

​আমরা যদি হিটলার থেকে শুরু করে ইভান দি টেরিবল পর্যন্ত সবার জীবনী বিশ্লেষণ করি, তবে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই। এদের বেশিরভাগই ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষমতাভোগী এবং চরম সন্দেহপ্রবণ। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিরা কখনোই অন্য কারো মতামতের গুরুত্ব দেননি।

  • আদর্শের দোহাই: হিটলার, স্টালিন কিংবা মাও সে তুং—সবাই তাদের নিষ্ঠুরতাকে জাস্টিফাই বা বৈধতা দেওয়ার জন্য কোনো না কোনো আদর্শের (যেমন: নাৎসিবাদ বা সাম্যবাদ) আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, একটি 'সুন্দর ভবিষ্যৎ' গড়তে হলে এই রক্তপাত প্রয়োজন।
  • মানবিকতার অবলুপ্তি: পোল পট বা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের মতো শাসকরা মানুষকে স্রেফ সংখ্যা বা যন্ত্র হিসেবে গণ্য করতেন। তাদের কাছে লাখে লাখে মানুষের মৃত্যু ছিল স্রেফ একটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আসা বাধা মাত্র।

ইতিহাসের অপরাধী: কার প্রভাব কতটুকু?

পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর মানুষের বাস্তব ঘটনাগুলো আমাদের দেখায় যে, একেকজন শাসকের নিষ্ঠুরতার ধরন ছিল একেক রকম।

  1. গণহত্যার কারিগর: হিটলার এবং মাও সে তুং ছিলেন পরিকল্পিত গণহত্যার শিরোমণি। যেখানে একজনের লক্ষ্য ছিল জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, অন্যজনের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তন।
  2. ভয়ংকর যোদ্ধা: চেঙ্গিস খান বা তৈমুর লং (যাকে আমরা পরবর্তী বিশ্লেষণে আনতে পারি) ছিলেন বিজয়ী বীর, কিন্তু তাদের সেই বীরত্বের প্রতিটি ইঞ্চিতে লেগে ছিল নিরপরাধ মানুষের রক্ত।
  3. ব্যক্তিগত বিকৃতি: ইদি আমিন কিংবা ভ্লাদ দি ইম্পেলারের মতো ব্যক্তিরা কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং ব্যক্তিগত বিকৃত তৃপ্তির জন্য মানুষকে নির্যাতন করতেন। মানুষের মাংস খাওয়া কিংবা শূলে চড়ানো ছিল তাদের এক প্রকার পৈশাচিক আনন্দ।

কেন আমরা এই ইতিহাস জানবো?

​অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, কেন এই ভয়ংকর শাসক তালিকা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি? এর উত্তর হলো—ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইতিহাসের ভয়ংকর মানুষদের নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের ভেতরেও এক সুপ্ত শয়তান লুকিয়ে থাকে। যখন কোনো ব্যক্তি বা তন্ত্রকে প্রশ্নাতীত ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন সেই ক্ষমতা তাকে দানবে রূপান্তরিত করতে পারে।

ইতিহাসের ভয়ংকর নেতাদের কাজ নিয়ে এই গভীর বিশ্লেষণ আমাদের সচেতন করে তোলে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো 'কিলিং ফিল্ড' তৈরি না হয় কিংবা আর কোনো 'গ্যাস চেম্বার' এর জন্ম না হয়।

​আমরা এই দীর্ঘ যাত্রার একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। হিটলারের ঘৃণা, স্টালিনের সন্দেহ, মাও-এর জেদ, পোল পটের উন্মাদনা আর লিওপোল্ডের লোভ আমাদের দেখিয়েছে যে পৃথিবীটা সব সময় সুন্দর ছিল না। এই দশজন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সময়ের এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশের হলেও, তাদের রেখে যাওয়া ক্ষতগুলো আজও বয়ে বেড়াচ্ছে মানব সভ্যতা।

 অন্ধকার থেকে আলোর শিক্ষা

​আমরা এক দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের ব্লগের শেষ পর্বে এসে পৌঁছেছি। গত  পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার দম্ভ, উগ্র আদর্শ আর বিকৃত মানসিকতা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ সিরিজের এই সমাপনী পর্বে আমরা কোনো নতুন নিষ্ঠুরতার কথা বলব না, বরং জানবো কেন এই অন্ধকার অধ্যায়গুলো আমাদের মনে রাখা জরুরি।

ইতিহাসের আয়নায় মানবতা

​আমরা যাদের সম্পর্কে জেনেছি—হিটলার, স্টালিন, মাও সে তুং, পোল পট, ভ্লাদ দি ইম্পেলার, চেঙ্গিস খান, ইদি আমিন, দ্বিতীয় লিওপোল্ড, ইভান দি টেরিবল—তারা কেবল একেকটি নাম নন, বরং তারা ছিলেন একেকটি দুঃস্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষ কেন বলা হয় তাদের? কারণ তারা মানুষের জীবনের মূল্যকে তাদের ক্ষমতা বা স্বার্থের চেয়ে তুচ্ছ মনে করেছিলেন।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের উত্থান রাতারাতি হয়নি। যখনই কোনো সমাজ উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যখনই প্রশ্নাতীত ক্ষমতার সামনে বিচার বিভাগ বা জনমত স্তব্ধ হয়ে গেছে, তখনই এমন সব নিষ্ঠুর শাসক জন্ম নিয়েছে। ইতিহাসের ভয়ংকর চরিত্ররা আসলে আমাদেরই সমাজের সেই ক্ষতগুলোর ফল, যা আমরা সময়ে সারিয়ে তুলতে পারিনি।

অন্ধকারের শিক্ষা: আমরা কী শিখলাম?

​১. ক্ষমতার ভারসাম্য: ভয়ংকর নেতাদের জীবনী আমাদের শেখায় যে, একনায়কতন্ত্র সবসময় ধ্বংসের বীজ বহন করে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ আর বাকস্বাধীনতা ছাড়া কোনো সমাজ নিরাপদ নয়।

২. উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ঘৃণা: হিটলার বা পোল পটের মতো শাসকরা ঘৃণা ছড়িয়েছিলেন। ঘৃণা যখন আইনি রূপ পায়, তখন তা গণহত্যায় রূপ নেয়।

৩. বিবেকের জাগরণ: ইতিহাসের অপরাধীরা সফল হয়েছিলেন কারণ সেই সময় অনেক সাধারণ মানুষ নিরব ছিলেন। আমাদের নিরবতা অনেক সময় শোষকের শক্তি বাড়িয়ে দেয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ মানুষ কারা—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ইতিহাস বইয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে আধুনিক যুগে আর কোনো নতুন চেহারায় এদের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

শেষ কথা

​ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের নয়, ইতিহাস পরাজিত মানবতারও। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের সত্য কাহিনীগুলো আমাদের বারবার সতর্ক করে—মানুষের ভেতরে যেমন দেবতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তেমনি লুকিয়ে আছে এক বীভৎস দানবও। আমরা কোনটা বেছে নেব, তা নির্ভর করে আমাদের নৈতিকতা আর সচেতনতার ওপর।

​এই ব্লগের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য ছিল পাঠকদের কেবল রোমহর্ষক কিছু তথ্য দেওয়া নয়, বরং ইতিহাসের সেই অন্ধকার দিকগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যা থেকে শিক্ষা নেওয়া আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।

আপনার জন্য চূড়ান্ত প্রশ্ন 

​আমরা ১০ জন ভয়ংকর মানুষের কথা বলেছি, যারা বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন তছনছ করেছেন। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়েছেন, কেউ রাজনীতির, আবার কেউ স্রেফ ব্যক্তিগত লাভের।

আপনার মতে, এই ১০ জনের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি 'ভয়ংকর' ছিলেন—যিনি সরাসরি নিজের হাতে রক্ত ঝরিয়েছেন (যেমন: ইভান দি টেরিবল), নাকি যিনি একটি নিরাপদ কক্ষে বসে কলমের এক খোঁচায় কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যুর পরোয়ানায় সই করেছিলেন (যেমন: মাও সে তুং বা স্টালিন)? আপনার যুক্তিসহ উত্তরটি কমেন্টে দিন, আমরা আপনার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন