সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী।

 

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী।

​পৃথিবীটা রহস্যে ঘেরা। আমরা মানুষরা অনেক সময় মনে করি যে, বুদ্ধিমত্তার একক অধিকার কেবল আমাদেরই। আমরা দালানকোঠা বানাই, মহাকাশে যাই আর জটিল সব সমস্যার সমাধান করি। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আমাদের এই বিশাল নীল গ্রহের অন্য বাসিন্দারা কতটা বুদ্ধিমান হতে পারে? আমাদের চারপাশে এমন কিছু প্রাণী আছে যাদের বুদ্ধিমত্তা দেখে অনেক সময় বিজ্ঞানীরাও থমকে যান।

​আপনি কি জানেন, মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি? কিংবা সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি? অনেকে হয়তো মনে করেন এটি কোনো শিম্পাঞ্জি বা ডলফিন। কিন্তু উত্তরটা আপনার ধারণার চেয়েও চমকপ্রদ হতে পারে। আজ আমরা শুরু করছি এক রোমাঞ্চকর আর্টিকেল , যেখানে আমরা পর্দা উন্মোচন করব প্রকৃতির সেরা ১০ প্রতিভাধর প্রাণীর জীবন থেকে।

বুদ্ধিমত্তা আসলে কী?

​প্রাণিজগতে বুদ্ধিমত্তা মানে কেবল অংক করা বা ভাষা শেখা নয়। এটি মূলত টিকে থাকার কৌশল। সমস্যা সমাধান করা, অন্যের সাথে যোগাযোগ করা, হাতিয়ার ব্যবহার করা এবং নিজেদের আবেগ প্রকাশ করার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই আমরা এদের "বুদ্ধিমান" বলি।

​অনেক সময় আমরা মজা করে খুঁজি সবচেয়ে বোকা প্রাণী কোনটি, কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিরই নিজস্ব টিকে থাকার বুদ্ধি আছে। তবে কিছু প্রাণী বুদ্ধির দৌড়ে অন্যদের চেয়ে অনেক মাইল এগিয়ে। আজ আমরা জানব সেই শ্রেষ্ঠ ১০ জন সম্পর্কে।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর তালিকা

​নিচে ধারাবাহিকভাকে সেই ১০টি প্রাণীর নাম দেওয়া হলো যাদের নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব:

  1. শিম্পাঞ্জি (Chimpanzee): মানুষের ডিএনএ-র সাথে সবচেয়ে বেশি মিল থাকা এই প্রাণীটি বুদ্ধির দিক থেকেও সবার শীর্ষে।
  2. বোটলনোজ ডলফিন (Bottlenose Dolphin): সমুদ্রের সবচেয়ে সামাজিক এবং বুদ্ধিমান জীব।
  3. হাতি (Elephant): যাদের বলা হয় "স্মৃতিশক্তির রাজা"। আপনি কি জানেন কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি? উত্তরটি হলো হাতি।
  4. অক্টোপাস (Octopus): অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এবং বুদ্ধিমান।
  5. কাক (Crow): পাখিদের মধ্যে এরা আইনস্টাইন! জটিল সমস্যা সমাধানে এরা ওস্তাদ।
  6. ওরাংওটাং (Orangutan): চিন্তা করার ক্ষমতায় এরা মানুষের খুব কাছাকাছি।
  7. আফ্রিকান গ্রে প্যারট (African Grey Parrot): যারা শুধু কথা নকল করে না, বরং শব্দের অর্থও বোঝে।
  8. শুয়োর (Pig): শুনতে অবাক লাগলেও এরা কুকুর বা বিড়ালের চেয়েও দ্রুত শিখতে পারে।
  9. রাকুন (Raccoon): জটিল তালা খোলা বা লুকানো খাবার খুঁজে বের করায় এরা অপ্রতিরোধ্য।
  10. কুকুর (Dog): মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সে ভরপুর বন্ধু।

কেন এই সিরিজটি আপনার পড়া উচিত?

​এই আর্টিকেলে আমরা কেবল তথ্য দেব না, বরং প্রতিটি প্রাণীর জীবন থেকে নেওয়া বিস্ময়কর সব গল্প তুলে ধরব। আপনি জানবেন কিভাবে একটি অক্টোপাস কাঁচের জার খুলে বেরিয়ে আসে, কিংবা কিভাবে একটি কাক নিজের খাবার পাওয়ার জন্য আস্ত একটা যন্ত্র বানিয়ে ফেলে!

​যারা জানতে চান সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি, তাদের জন্য আমাদের এই আর্টিকেলটি হতে যাচ্ছে জ্ঞানের এক ভাণ্ডার। প্রতিটি অংশ আপনাকে প্রাণিজগৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।

​মানুষ হিসেবে আমরা শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আমাদের ঠিক পরেই কার অবস্থান? মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি—এই প্রশ্নের গভীরে যেতে হলে আপনাকে আমাদের সাথে পরবর্তী অংশগুলোতে থাকতে হবে।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: শিম্পাঞ্জি 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: শিম্পাঞ্জি

​আমরা যখন সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, তখন আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে এমন একজনের ছবি যে দেখতে অনেকটা আমাদের মতোই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন—আজকের গল্পের নায়ক হলো শিম্পাঞ্জি। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, মানুষের ডিএনএ-র সাথে এদের প্রায় ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। কিন্তু শুধু ডিএনএ নয়, তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আর কাজ করার ধরনও আপনাকে অবাক করে দেবে।

শিম্পাঞ্জির বুদ্ধিমত্তার এক বাস্তব গল্প

​আফ্রিকার গহীন এক জঙ্গলে একদল শিম্পাঞ্জি বাস করত। সেই দলের সর্দার ছিল 'বার্নি'। একদিন বার্নি লক্ষ্য করল, উইপোকার ঢিবির ভেতরে প্রচুর সুস্বাদু উইপোকা রয়েছে, কিন্তু হাত দিয়ে সেগুলো ধরা অসম্ভব। বার্নি তখন কী করল জানেন? সে কিন্তু দমে গেল না। সে পাশের একটি গাছ থেকে একটি সরু ডাল ভেঙে নিল। এরপর খুব যত্ন করে ডালটির পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং ডালটিকে লাঠির মতো লম্বা করল।

​এরপর সে ডালটি উইপোকার ঢিবির ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর যখন সে ডালটি বের করল, দেখা গেল শত শত উইপোকা সেই ডালে আটকে আছে! বার্নি কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই একটি 'হাতিয়ার' তৈরি করে নিজের সমস্যার সমাধান করল। এই যে উপকরণের ব্যবহার, এটিই প্রমাণ করে মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি—নিঃসন্দেহে সেটি শিম্পাঞ্জি।

কেন এরা এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহার: শিম্পাঞ্জিরা কেবল ডাল দিয়ে উইপোকা ধরে না, তারা পাথর ব্যবহার করে শক্ত বাদাম ভাঙে। অনেক সময় তারা পাতা চিবিয়ে স্পঞ্জের মতো তৈরি করে এবং তা দিয়ে গাছের গর্ত থেকে পানি শুষে নিয়ে পান করে। এটি কোনো সাধারণ ক্ষমতা নয়, এটি হলো উন্নত বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ।

​২. যোগাযোগ ও ভাষা: শিম্পাঞ্জিরা মানুষের মতো কথা বলতে না পারলেও, তারা ইশারা বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। গবেষণাগারে অনেক শিম্পাঞ্জিকে শত শত সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানো হয়েছে এবং তারা সফলভাবে মানুষের সাথে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পেরেছে।

​৩. স্মৃতিশক্তি ও গণনা: আপনি জানলে অবাক হবেন যে, অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যার খেলায় শিম্পাঞ্জিরা সাধারণ মানুষকেও হারিয়ে দেয়! কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, স্ক্রিনে দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া সংখ্যাগুলোর অবস্থান মনে রাখার ক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জিরা মানুষের চেয়ে বেশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই যখন প্রশ্ন আসে কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি, সেখানে ডাঙার প্রাণীদের মধ্যে শিম্পাঞ্জিদের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে।

​৪. সামাজিক রাজনীতি: এদের সমাজে রীতিমতো রাজনীতি চলে! কে দলের নেতা হবে, কার সাথে কে বন্ধুত্ব করবে, এমনকি কারো মন খারাপ হলে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো উচ্চতর আবেগও এদের মধ্যে দেখা যায়। তারা একে অপরের ওপর দীর্ঘ সময় রাগ ধরে রাখতে পারে, আবার উপহার দিয়ে ভাবও করে নেয়।

শিম্পাঞ্জি বনাম মানুষের বুদ্ধি

​অনেকেই জানতে চান সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি? যদি আমরা মানুষের বাইরে কথা বলি, তবে শিম্পাঞ্জি এমন এক জীব যারা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে। তারা আয়নায় নিজেকে চিনতে পারে, যা খুব কম প্রাণীই পারে। তারা জানে যে আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে সে অন্য কেউ নয়, বরং সে নিজেই। তাদের এই 'Self-awareness' বা আত্মসচেতনতা তাদের অনন্য করে তুলেছে।

​শিম্পাঞ্জিদের জীবন থেকে আমরা শিখি যে, বুদ্ধি মানে কেবল বড় বড় ডিগ্রি নয়, বরং হাতের কাছের জিনিস ব্যবহার করে জীবনকে সহজ করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধি। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি অংশ কত গভীর এবং রহস্যময়।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: ডলফিন 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: ডলফিন

​আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, সমুদ্রের বিশাল জলরাশির নিচে এমন কোনো প্রাণী থাকতে পারে যারা একে অপরকে আমাদের মতো নাম ধরে ডাকে? কিংবা যারা একে অপরের বিপদে দলবদ্ধ হয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? যখন প্রশ্ন ওঠে মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি, তখন বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ সরাসরি 'বোটলনোজ ডলফিন' (Bottlenose Dolphin)-এর নাম নেন। এদের মস্তিষ্কের গঠন এতটাই জটিল যে অনেক ক্ষেত্রে তা মানুষের মস্তিষ্ককেও চ্যালেঞ্জ জানায়।

ডলফিনের বুদ্ধিমত্তার এক বীরত্বগাথা

​অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে একবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। একদল সার্ফার যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলা করছিল, হঠাৎ তারা দেখল একটি বিশাল গ্রেট হোয়াইট শার্ক তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। মৃত্যু যখন নিশ্চিত, ঠিক তখনই কোথা থেকে একদল ডলফিন সেখানে হাজির হলো। ডলফিনগুলো সার্ফারদের চারপাশ দিয়ে একটি বৃত্ত তৈরি করে ঘুরতে শুরু করল এবং লেজ দিয়ে পানিতে বিকট শব্দ করতে লাগল।

​তারা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সেই হাঙ্গরটিকে ঠেকিয়ে রাখল যতক্ষণ না সার্ফাররা নিরাপদে তীরে পৌঁছাতে পারল। ডলফিনদের এই যে অন্যের বিপদ বোঝা এবং দলগতভাবে পরিকল্পনা করে রক্ষা করা—এটিই প্রমাণ করে কেন তারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি এই তালিকার প্রথম দিকে থাকে।

ডলফিন কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. নাম ধরে ডাকা (Signature Whistles): বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, প্রতিটি ডলফিনের একটি নিজস্ব 'সিগনেচার হুইসেল' বা বিশেষ শব্দ আছে, যা তাদের নাম হিসেবে কাজ করে। এক ডলফিন অন্য ডলফিনকে ডাকার সময় সেই নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে। প্রাণিজগতে মানুষের বাইরে নিজের নাম ব্যবহার করার এই ক্ষমতা অন্য কারো মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।

​২. ইকোলোকেশন বা শব্দ-দৃষ্টি: ডলফিনরা শব্দের মাধ্যমে দেখতে পায়! তারা পানি দিয়ে এমন এক উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ পাঠায় যা কোনো বস্তুতে লেগে ফিরে এলে তারা বুঝতে পারে বস্তুটি কত দূরে, কত বড় এবং সেটি কি শিকার নাকি শত্রু। তাদের এই ন্যাচারাল সোনার (Sonar) সিস্টেম যেকোনো আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও উন্নত।

​৩. হাতিয়ারের ব্যবহার (Sponging): অস্ট্রেলিয়ার শার্ক বে-তে দেখা গেছে, কিছু ডলফিন সমুদ্রের তলদেশ থেকে খাবার খোঁজার সময় তাদের নাকের ডগায় এক ধরণের সামুদ্রিক স্পঞ্জ (Sponge) পরে নেয়। এতে পাথুরে তলায় ঘষা লেগে তাদের নাক ক্ষতবিক্ষত হয় না। এই যে নিজের শরীরকে রক্ষা করার জন্য পরিবেশের কোনো বস্তুকে ব্যবহার করা, এটি উচ্চতর বুদ্ধির পরিচয়।

​৪. ঘুমানোর অদ্ভুত কৌশল: ডলফিনদের বুদ্ধির আরেকটি মজার দিক হলো তাদের ঘুমানোর স্টাইল। তারা যখন ঘুমায়, তখন তাদের মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ সজাগ থাকে এবং একটি চোখ খোলা থাকে। এতে তারা সমুদ্রের শত্রুদের হাত থেকে বাঁচতে পারে এবং শ্বাস নেওয়ার জন্য নিয়মিত পানির ওপরে উঠতে পারে।

সামাজিক জীবন ও আবেগ

​ডলফিনরা প্রচণ্ড সামাজিক। তারা একে অপরের দুঃখে শোক প্রকাশ করে এবং অসুস্থ সঙ্গীকে পানির ওপরে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে যাতে সে শ্বাস নিতে পারে। তাদের এই সহমর্মিতা প্রমাণ করে যে তারা কেবল যান্ত্রিকভাবে চলে না, তাদের মধ্যে গভীর আবেগ রয়েছে। অনেকে যখন জানতে চান সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তখন ডলফিনকে তালিকার শীর্ষে রাখার বড় কারণ হলো তাদের এই সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

​ডলফিন কেবল সার্কাসের কোনো বিনোদনের খোরাক নয়; তারা সমুদ্রের এক সুশৃঙ্খল এবং বুদ্ধিদীপ্ত জাতি। তাদের কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু—বিশেষ করে তাদের একতা এবং নিঃস্বার্থ সাহায্য করার মানসিকতা।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী:হাতি 

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী:হাতি


​যখন প্রশ্ন করা হয়, কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি? তখন একবাক্যে উত্তর আসে—হাতি। কিন্তু হাতির বুদ্ধি কি কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ? একদমই নয়। হাতি হলো এমন এক প্রাণী যারা শোক প্রকাশ করে, যারা অন্য প্রাণীর কষ্ট বোঝে এবং যাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বিজ্ঞানীদেরও অবাক করে দেয়। ডাঙার বড় প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও হাতির নাম সব সময় উপরের সারিতে থাকে।

হাতির বুদ্ধিমত্তার এক হৃদয়স্পর্শী গল্প

​আফ্রিকার এক প্রচণ্ড খরাপ্রবণ অঞ্চলের কথা। চারদিকে পানি নেই, মাটি ফেটে চৌচির। একটি বয়স্ক মাদী হাতির নেতৃত্বে (যাকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে 'ম্যাট্রিয়ার্ক' বলা হয়) একদল হাতি মাইলের পর মাইল হাঁটছে। এই বয়স্ক হাতিটি আজ থেকে ২৫ বছর আগে যখন সে শিশু ছিল, তখন একবার তার মায়ের সাথে এই পথে এসেছিল।

​তার সেই ২৫ বছর আগের স্মৃতি আজ তাকে পথ দেখাচ্ছে। সে ঠিক মনে করে এক জায়গায় গিয়ে থামল যেখানে উপরে কোনো পানির চিহ্ন নেই। কিন্তু সে তার শুঁড় দিয়ে গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে মাটির নিচ থেকে পরিষ্কার পানি বেরিয়ে এল। এই যে কয়েক দশক আগের পথ আর পানির উৎস মনে রাখা—এটাই হলো হাতির সেই কিংবদন্তীতুল্য বুদ্ধিমত্তা।

হাতি কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. অসাধারণ স্মৃতিশক্তি: হাতির মস্তিষ্ক যেকোনো স্থলচর প্রাণীর চেয়ে বড়। তারা দীর্ঘদিনের পথ, পানির উৎস এবং বন্ধু বা শত্রুদের চেহারা বছরের পর বছর মনে রাখতে পারে। কোনো মানুষ যদি কখনো কোনো হাতির সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে সেই হাতিটি বহু বছর পরেও তাকে চিনতে পারে এবং প্রতিশোধ নিতে পারে।

​২. আবেগের বহিঃপ্রকাশ: হাতিই একমাত্র প্রাণী (মানুষ ছাড়া) যারা তাদের মৃত সঙ্গীর জন্য শোক পালন করে। তারা মৃত হাতির হাড়ের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো কখনো মৃত দেহকে ডালপালা বা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের এই 'এমপ্যাথি' বা সহানুভূতি তাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি এই তর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

​৩. হাতিয়ারের ব্যবহার ও কারুকার্য: হাতিরা তাদের শুঁড়কে হাত হিসেবে ব্যবহার করে। তারা গাছের ডাল ভেঙে পিঠের মাছি তাড়ায়। অনেক সময় তারা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাথর ছুড়ে মারে। এমনকি বন্দি অবস্থায় থাকা হাতিদের রং-তুলি দিয়ে ছবি আঁকতেও দেখা গেছে, যা তাদের সৃজনশীল বুদ্ধির পরিচয় দেয়।

​৪. জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা: হাতিরা ইনফ্রাসনিক (Infrasonic) শব্দ বা এমন নিচু কম্পাঙ্কের শব্দ করতে পারে যা মানুষের কান ধরতে পারে না। এই শব্দের মাধ্যমে তারা মাইলের পর মাইল দূরে থাকা অন্য দলের সাথে যোগাযোগ করে। তারা পায়ের তলা দিয়ে মাটির কম্পন অনুভব করে বুঝতে পারে আশেপাশে কোনো বিপদ বা অন্য কোনো দল আছে কি না।

মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি?

​শিম্পাঞ্জি বা ডলফিনের সাথে হাতির বুদ্ধির লড়াইটা সমানে সমান। হাতিরা আয়নায় নিজেকে চিনতে পারে, যা বুদ্ধিমত্তার একটি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়। তারা জানে যে তাদের শরীরের আকার বিশাল, তাই তারা সাবধানে চলে যাতে কোনো ছোট প্রাণী তাদের পায়ের নিচে না পড়ে। এই যে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা, এটিই হাতিকে বিশ্বের।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় বিশেষ স্থান দিয়েছে।

​হাতি কেবল একটি বড় পশু নয়, সে হলো প্রকৃতির এক ধৈর্যশীল আর জ্ঞানী সত্তা। তাদের পরিবারিক বন্ধন আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের অনেক কিছু শেখায়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, তাদের এই বুদ্ধিমত্তা সত্ত্বেও মানুষের লালসার কারণে তারা আজ বিলুপ্তির পথে।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: অক্টোপাস 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: অক্টোপাস

​যখন আমরা আলোচনা করি সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি, তখন আমাদের মাথায় সাধারণত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের নাম আসে। কিন্তু অক্টোপাস হলো অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের জগতের একমাত্র সদস্য, যার বুদ্ধিমত্তা দেখে আধুনিক বিজ্ঞানও ভিরমি খায়। এদের শরীরে কোনো হাড় নেই, আছে তিনটি হৃৎপিণ্ড আর ৯টি মস্তিষ্ক! প্রতিটি হাতের জন্য একটি করে আলাদা ছোট মস্তিষ্ক থাকায় তারা একই সাথে আটটি হাত দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করতে পারে।

অক্টোপাসের বুদ্ধিমত্তার এক রোমাঞ্চকর গল্প

​জার্মানির একটি অ্যাকুরিয়ামে একবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। প্রতিদিন সকালে কর্মচারীরা এসে দেখত অ্যাকুরিয়ামের লাইটগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তারা ভাবল হয়তো ইলেকট্রিক কোনো সমস্যা। কিন্তু সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পর যা দেখা গেল, তা ছিল অবিশ্বাস্য।

​রাতের অন্ধকারে 'অটো' নামের একটি অক্টোপাস তার পানির ট্যাংক থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে বের হয়ে আসত। সে জানত যে উজ্জ্বল আলো তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সে তার শুঁড় দিয়ে পানির ধারা ঠিক লাইট বাল্বের ওপর ছুড়ে মারত যাতে শর্ট সার্কিট হয়ে লাইটটি বন্ধ হয়ে যায়! এই যে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের জন্য কৌশল তৈরি করা—এটিই প্রমাণ করে কেন অক্টোপাস সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় নিজের শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

অক্টোপাস কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ: অক্টোপাস কেবল রঙ বদলায় না, তারা তাদের শরীরের চামড়ার গঠনও বদলে ফেলতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে তারা নিজেকে একটি পাথর বা সামুদ্রিক শৈবালের মতো বানিয়ে ফেলে। এটি তাদের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার উচ্চতর ক্ষমতার পরিচয়।

​২. জটিল ধাঁধা সমাধান: ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, অক্টোপাসরা কাঁচের জারের ভেতরে আটকে থাকা খাবার বের করার জন্য জারের মুখ ঘুরিয়ে খুলতে পারে। এমনকি তারা গোলকধাঁধার ভেতরে পথ চিনে খাবার খুঁজে নিতে পারে এবং সেই পথ পরবর্তী সময়ের জন্য মনেও রাখতে পারে।

​৩. হাতিয়ারের ব্যবহার: 'কোকোনাট অক্টোপাস' নামে এক প্রজাতি আছে যারা সমুদ্রের তলদেশ থেকে নারিকেলের খোসা সংগ্রহ করে। তারা সেই খোসাগুলোকে পরিষ্কার করে সাথে নিয়ে ঘোরে এবং যখনই কোনো বিপদ দেখে, তারা সেই খোসা দুটির ভেতরে ঢুকে নিজেকে একটি বন্ধ বাক্সের মতো লুকিয়ে ফেলে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে হাতিয়ারের এই ব্যবহার বিস্ময়কর।

​৪. খুনসুটি ও ব্যক্তিত্ব: অক্টোপাসদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকে। কোনো কোনো অক্টোপাস খুব শান্ত হয়, আবার কেউ কেউ খুব চঞ্চল বা রাগী। অ্যাকুরিয়ামে থাকা অক্টোপাসরা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে পছন্দ করে, আবার কাউকে দেখলে পানির পিচকিরি মেরে ভিজিয়ে দেয়।

মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি?

​জলের নিচে বুদ্ধির লড়াইয়ে ডলফিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো এই অক্টোপাস। তবে অক্টোপাসের বুদ্ধিমত্তা একটু ভিন্ন ধরণের। এদের মস্তিষ্ক সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকে। আপনি যদি জানতে চান সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তবে অক্টোপাসকে পশু না বলে 'মহাবুদ্ধিমান জীব' বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। এদের শেখার ক্ষমতা এতোটাই বেশি যে এরা অন্য প্রাণীকে দেখে শিখতে পারে কীভাবে একটি কাজ সহজে করা যায়।

​অক্টোপাস আমাদের শিখিয়ে দেয় যে বুদ্ধিমান হতে গেলে হাড় বা মেরুদণ্ড থাকার প্রয়োজন নেই। তাদের রহস্যময় জগত আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক গবেষণার বিষয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই বিস্ময়কর প্রাণীগুলোর আয়ু খুব কম হয়, নতুবা হয়তো তারা সমুদ্রের ওপর একচ্ছত্র রাজত্ব করত।

​আজ আমরা জানলাম সমুদ্রের জাদুকর অক্টোপাস সম্পর্কে। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের বাড়ির আশেপাশেই এমন এক কালো রঙের পাখি উড়ে বেড়ায় যাকে আমরা প্রায়ই অবহেলা করি, কিন্তু বুদ্ধিতে সে অনেক বড় প্রাণীকেও টেক্কা দিতে পারে?

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: কাক 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: কাক

​যখনই প্রশ্ন ওঠে সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি, আমাদের তালিকায় সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নাম প্রাধান্য পায়। কিন্তু পাখিদের জগতে এমন একজন সদস্য আছে যার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা একজন সাত বছরের মানুষের বাচ্চার সমান। হ্যাঁ, আমরা কথা বলছি কাক (Crow) নিয়ে। কাক কেবল কর্কশ স্বরে ডাকাডাকি করা কোনো সাধারণ পাখি নয়; এরা জটিল সমস্যা সমাধান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামাজিক প্রতিহিংসা পরায়ণতায় অদ্বিতীয়।

কাকের বুদ্ধিমত্তার এক আধুনিক গল্প

​জাপানের টোকিও শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে একদল কাককে এক অদ্ভুত কাণ্ড করতে দেখা যায়। তারা রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলতে থাকা গাড়ির চাকার সামনে আস্ত একটা আখরোট (Walnut) ফেলে দেয়। কেন জানেন? কারণ আখরোটের শক্ত খোলসটি তারা নিজেদের ঠোঁট দিয়ে ভাঙতে পারে না।

​গাড়ি যখন সেই আখরোটের ওপর দিয়ে চলে যায়, খোলসটি ভেঙে ভেতরের অংশ বেরিয়ে আসে। কিন্তু গল্পটি এখানেই শেষ নয়! কাকগুলো কিন্তু তখনই খাবারটি খেতে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তারা ট্রাফিক লাইট লাল হওয়ার অপেক্ষা করে। যখন গাড়িগুলো থেমে যায় এবং পথচারী পারাপারের সংকেত দেয়, কেবল তখনই তারা উড়ে গিয়ে নিরাপদে সেই ভাঙা আখরোটের ভেতরের অংশটি খেয়ে নেয়। এই যে ট্রাফিক সিগন্যাল বোঝা এবং গাড়ির চাকাকে যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা—এটিই প্রমাণ করে কাক কেন সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র অন্যতম।

কাক কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. মুখমণ্ডল চেনার ক্ষমতা: বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, কাক মানুষের চেহারা নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারে। আপনি যদি একবার কোনো কাকের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন, তবে সে আপনাকে চিনে রাখবে। শুধু তাই নয়, সে তার দলের অন্য কাকদেরও আপনার সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে। পরবর্তী সময়ে আপনি যখনই সেই পথে যাবেন, দেখবেন একদল কাক আপনাকে দেখে চিৎকার করছে।

​২. জটিল যন্ত্র তৈরি: কাকেরা কেবল হাতের কাছে পাওয়া জিনিস ব্যবহার করে না, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিস বানিয়ে নেয়। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, একটি সরু পাত্রের নিচে রাখা খাবার তোলার জন্য একটি কাক সোজা একটি তারকে তার ঠোঁট দিয়ে বাঁকিয়ে 'হুক' তৈরি করেছে এবং তা দিয়ে খাবারটি টেনে তুলেছে।

​৩. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কাকেরা কেবল বর্তমান নিয়ে ভাবে না। তারা ভবিষ্যতের জন্য খাবার লুকিয়ে রাখে। যদি তারা বুঝতে পারে যে অন্য কোনো প্রাণী বা কাক তাদের লুকানোর দৃশ্য দেখে ফেলছে, তবে তারা নকল ভাবে খাবার লুকানোর ভান করে এবং পরে সুযোগ বুঝে আসল জায়গায় খাবারটি সরাই।

​৪. জলের উচ্চতা বৃদ্ধি: সেই ছোটবেলার তৃষ্ণার্ত কাকের গল্পটি মনে আছে? যেখানে কাকটি কলসিতে পাথর ফেলে পানির স্তর উপরে তুলেছিল? বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে এটি কেবল রূপকথা নয়, বাস্তব কাকেরা সত্যিই আয়তন এবং জলের উচ্চতার সম্পর্ক বুঝতে পারে।

মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি?

​পাখিদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার বিচারে কাক এবং তোতা পাখি প্রায় সমপর্যায়ের। কিন্তু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কাকেরা অনেক সময় শিম্পাঞ্জিদেরও টেক্কা দেয়। অনেক গবেষক মনে করেন, যদি পাখিদের ডানা না থেকে মানুষের মতো হাত থাকত, তবে কাকেরা হয়তো অনেক আগেই নিজেদের প্রযুক্তি গড়ে তুলত। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি বা জীব কোনটি—এই আলোচনায় কাক একটি শক্তিশালী নাম।

​কাক আমাদের শেখায় যে বুদ্ধিমত্তা কেবল আকার বা বংশমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না। একটি সাধারণ কালো পাখিও তার উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে। আমরা প্রায়ই কাককে 'অশুভ' বা 'নোংরা' ভাবি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা প্রকৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান ক্লিনার।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: ওরাংওটাং 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: ওরাংওটাং

​যখনই প্রশ্ন ওঠে মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি, তখন আমাদের নজর যায় শিম্পাঞ্জি বা গরিলাদের দিকে। কিন্তু ওরাংওটাং এমন এক প্রাণী যাদের বুদ্ধিমত্তা অনেকটা মানুষের ভেতরের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ সত্তার মতো। মালয় ভাষায় ‘ওরাংওটাং’ শব্দের অর্থই হলো ‘বনের মানুষ’। এদের সাথে মানুষের ডিএনএ-র প্রায় ৯৭ শতাংশ মিল রয়েছে। এদের বিশেষত্ব হলো এদের ধৈর্য এবং অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে কোনো সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা।

ওরাংওটাং-এর বুদ্ধিমত্তার এক দারুণ গল্প

​একবার একটি চিড়িয়াখানায় একটি পরীক্ষা চালানো হলো। একটি উঁচু খাঁচার বাইরে কিছু ফল রাখা হলো যা হাত দিয়ে ছোঁয়া অসম্ভব। সেখানে কিছু ছোট ছোট পাইপ আর তার রাখা ছিল। শিম্পাঞ্জিরা তৎক্ষণাৎ চিৎকার শুরু করল এবং খাঁচায় বাড়ি দিতে লাগল। কিন্তু ওরাংওটাংটি ছিল শান্ত।

​সে বেশ কিছুক্ষণ পাইপগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করল। এরপর সে দেখল যে একটি পাইপের ভেতর আরেকটি পাইপ ঢুকিয়ে এটিকে লম্বা করা যায়। সে ধৈর্য ধরে পাইপগুলো জোড়া দিয়ে একটি লম্বা লাঠি বানাল এবং সেই লাঠি দিয়ে খুব সহজেই ফলগুলো টেনে খাঁচার ভেতরে নিয়ে এল। এই যে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা এবং কোনো তাড়াহুড়ো না করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা—এটিই ওরাংওটাং-কে সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় অনন্য করে তুলেছে।

ওরাংওটাং কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. ঘর বানানোর অসাধারণ কৌশল: ওরাংওটাংরা প্রতিদিন রাতে শোয়ার জন্য গাছের উঁচুতে নতুন বাসা বানায়। তারা কেবল ডালপালা বিছিয়ে দেয় না, বরং খুব নিখুঁতভাবে ডালগুলো বুনে একটি মজবুত বিছানা তৈরি করে। বৃষ্টির সময় তারা বড় বড় পাতা দিয়ে ছাতা বা চাল তৈরি করে যাতে শরীর ভিজে না যায়। এই ‘স্থাপত্য জ্ঞান’ প্রাণিজগতে বিরল।

​২. অনুকরণ করার ক্ষমতা: এরা মানুষকে দেখে কাজ শিখতে ওস্তাদ। ইন্দোনেশিয়ার এক অভয়ারণ্যে দেখা গেছে, ওরাংওটাংরা স্থানীয় মানুষদের দেখে সাবান দিয়ে কাপড় কাচতে শিখে গেছে। এমনকি তারা হাতুড়ি ব্যবহার করে কাঠ ঠুকতে বা করাত দিয়ে কাঠ কাটতেও চেষ্টা করে। এই শেখার আগ্রহ তাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি এই বিতর্কে প্রথম সারিতে রাখে।

​৩. স্মৃতি ও মানচিত্র: একটি ওরাংওটাং বনের হাজার হাজার গাছের অবস্থান মনে রাখতে পারে। কোন গাছে কখন ফল পাকবে, তার একটি নিখুঁত ক্যালেন্ডার যেন তাদের মাথায় সেট করা থাকে। তারা মাইলের পর মাইল বনের ভেতর দিয়ে চলাচল করলেও কখনো পথ ভোলে না। তাই কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি এই তালিকায় হাতির পাশাপাশি এদের নামও অত্যন্ত সম্মানের সাথে নেওয়া হয়।

​৪. ওষুধের ব্যবহার: সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, আহত ওরাংওটাংরা বিশেষ কিছু ভেষজ পাতা চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে রাখে যাতে ইনফেকশন না হয়। তারা জানে কোন পাতার রস ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। এই যে নিজের চিকিৎসা নিজে করা—এটি এক উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর।

সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি: শিম্পাঞ্জি নাকি ওরাংওটাং?

​শিম্পাঞ্জিরা খুব সামাজিক এবং চঞ্চল, কিন্তু ওরাংওটাংরা একা থাকতে পছন্দ করে এবং দীর্ঘ সময় চিন্তা করতে পারে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ওরাংওটাংদের বুদ্ধিমত্তা শিম্পাঞ্জিদের চেয়েও বেশি সুশৃঙ্খল। তারা কেবল বর্তমান প্রয়োজন মেটায় না, বরং ভবিষ্যতের বিপদের কথা ভেবেও সিদ্ধান্ত নেয়। এদের শান্ত স্বভাবের কারণে এদের বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

​ওরাংওটাং আমাদের শেখায় যে বুদ্ধির মানে কেবল চিৎকার বা দাপট নয়, বরং ধৈর্য আর পর্যবেক্ষণই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস। গহীন বনে একা থেকেও তারা যেভাবে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বেঁচে থাকে, তা সত্যি বিস্ময়কর। কিন্তু বন ধ্বংসের কারণে এই ‘বনের মানুষ’রা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: আফ্রিকান গ্রে প্যারট 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: আফ্রিকান গ্রে প্যারট

​সাধারণত তোতা পাখি বললেই আমাদের মনে হয় এরা কেবল মানুষের শেখানো কথা বারবার আওড়ায়। কিন্তু আফ্রিকান গ্রে প্যারট বা ধূসর তোতা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। এরা কেবল শব্দ নকল করে না, বরং সেই শব্দের অর্থ বোঝে এবং যুক্তির সাহায্যে উত্তর দিতে পারে। যখন প্রশ্ন আসে সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি, তখন পাখিদের মধ্যে এই বিশেষ তোতাটি বিজ্ঞানীদের প্রথম পছন্দ।

আলেক্স: এক কিংবদন্তী তোতা পাখির গল্প

​আফ্রিকান গ্রে প্যারটদের বুদ্ধিমত্তা বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছে ‘আলেক্স’ (Alex) নামের একটি পাখির কারণে। ডঃ আইরিন পেপারবার্গ আলেক্সকে নিয়ে ৩০ বছর গবেষণা করেছিলেন। আলেক্স কেবল কথা বলত না, সে প্রায় ১০০টিরও বেশি শব্দ চিনত এবং ব্যবহার করতে পারত।

​একবার আইরিন আলেক্সের সামনে একটি নীল রঙের বর্গাকার প্লাস্টিক এবং একটি লাল রঙের গোল প্লাস্টিক রাখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এই দুটির মধ্যে মিল কোথায়?" আলেক্স উত্তরে বলল, "কোনো মিল নেই (None)!" এরপর যখন জিজ্ঞেস করা হলো পার্থক্য কী, সে নির্ভুলভাবে বলল "রঙ এবং আকার (Color and Shape)"। এমনকি আলেক্স মারা যাওয়ার আগের রাতে তার মালিককে বলেছিল, "ভালো থেকো, আমি তোমাকে ভালোবাসি।" এই যে বোধশক্তি এবং আবেগের সংমিশ্রণ, এটিই তাকে সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় নিয়ে এসেছে।

আফ্রিকান গ্রে প্যারট কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. গাণিতিক ক্ষমতা: এরা কেবল সংখ্যা গুনতে পারে না, বরং 'শূন্য' (Zero)-এর ধারণা বুঝতে পারে। তারা বিভিন্ন বস্তুর আকার, রঙ এবং উপাদানের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের বুদ্ধিমত্তা একজন ৫ বছর বয়সী মানুষের বাচ্চার সমান।

​২. যুক্তিনির্ভর কথা বলা: এরা যখন বলে "আমাকে আপেল দাও", তখন তারা সত্যিই আপেল চায়। যদি আপনি তাকে আপেলের বদলে অন্য কিছু দেন, সে সেটা প্রত্যাখ্যান করবে এবং আবার আপেলের কথা বলবে। এই যে শব্দের সাথে বস্তুর সম্পর্ক বোঝা—এটিই প্রমাণ করে কেন তারা মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি এই আলোচনার অন্যতম দাবিদার।

​৩. কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি? স্মৃতিশক্তির লড়াইয়ে ডাঙার প্রাণীদের মধ্যে হাতি শীর্ষে থাকলেও, তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে এই তোতা পাখিরা অবিশ্বাস্য। তারা শত শত শব্দ, মানুষের চেহারা এবং বিভিন্ন ঘটনার পরম্পরা বছরের পর বছর মনে রাখতে পারে।

​৪. কৌতূহল ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা: আলেক্স ছিল পৃথিবীর প্রথম প্রাণী (মানুষ ছাড়া), যে নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। একদিন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে তার মালিককে জিজ্ঞেস করেছিল, "এটা কী রঙ?" অর্থাৎ সে জানতে চেয়েছিল তার নিজের গায়ের রঙ কী। প্রাণিজগতে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে এই কৌতূহল বিরল।

সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি বনাম সবচেয়ে বুদ্ধিমান পাখি?

​আমরা সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বেশি বুদ্ধিমান ভাবি, কিন্তু আফ্রিকান গ্রে প্যারট প্রমাণ করেছে যে মস্তিষ্কের আকার ছোট হলেও তার কার্যক্ষমতা বিশাল হতে পারে। এরা সামাজিক সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং অন্য পাখিদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে। এদের বুদ্ধিমত্তা যেমন প্রখর, এদের একাকিত্বের আবেগও তেমন তীব্র। সঙ্গীহীন থাকলে এরা বিষণ্ণতায় ভোগে, যা উচ্চতর বুদ্ধির একটি লক্ষণ।

​আফ্রিকান গ্রে প্যারট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি অনন্য। একটি ছোট পাখিও যে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে এবং মানুষের সাথে গভীর আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এরা কেবল পোষা প্রাণী নয়, এরা হলো আকাশের ডানাওয়ালা প্রতিভাবান এক সত্তা।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: Pig

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: Pig


​অনেকে অবাক হতে পারেন যে সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় একটি খামারের প্রাণীর নাম কেন? কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, শুয়োর হলো বিশ্বের অন্যতম বুদ্ধিমান এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রাণী। গবেষণায় দেখা গেছে, এদের বুদ্ধিমত্তা ৩ বছর বয়সী একটি মানুষের শিশুর সমান। এমনকি যখন প্রশ্ন ওঠে সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তখন শিম্পাঞ্জি বা ডলফিনের পরেই তালিকায় এদের নাম চলে আসে।

শুয়োরের বুদ্ধিমত্তার এক অবিশ্বাস্য গল্প

​শুয়োররা কতটা বুদ্ধিমান হতে পারে তা বোঝার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার কথা বলা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা একদল শুয়োরকে একটি ভিডিও গেম খেলার প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। গেমটি ছিল একটি জয়স্টিক ব্যবহার করে অন-স্ক্রিন কার্সার নাড়ানো এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করা।

​অবাক করার বিষয় হলো, শুয়োরগুলো কেবল বিষয়টি বুঝতেই পারল না, বরং তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জয়স্টিক মুখ দিয়ে নাড়িয়ে গেমটি খেলতে শুরু করল! এমনকি অনেক সময় তারা এমন বুদ্ধিমত্তা দেখাল যা শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রেও কঠিন মনে হয়েছিল। এই যে একটি ভার্চুয়াল জগতের সাথে বাস্তবের নড়াচড়াকে মেলাতে পারা—এটিই প্রমাণ করে যে মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি এই প্রশ্নের উত্তরে শুয়োরকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

শুয়োর কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. অসাধারণ শেখার ক্ষমতা: শুয়োররা কুকুরদের চেয়ে অনেক দ্রুত কমান্ড বা আদেশ শিখতে পারে। একবার কোনো কাজ শিখিয়ে দিলে তারা তা সারা জীবন মনে রাখে। আপনি যদি তাদের নাম ধরে ডাকেন, তারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিজের নাম চিনে নেয় এবং সাড়া দেয়।

​২. সামাজিক রাজনীতি ও স্মৃতি: শুয়োররা একে অপরকে চেনে এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বা শত্রুতা থাকে। কোনো এক জায়গায় খাবার লুকিয়ে রাখলে তারা সেটা মাসের পর মাস মনে রাখতে পারে। তাই যখন আলোচনা হয় কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি, তখন গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে শুয়োর অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।

​৩. প্রতারণা করার বুদ্ধি: এটি খুবই মজার একটি দিক। যদি একটি শুয়োর জানে যে তার দলের অন্য একটি শুয়োর তাকে অনুসরণ করছে খাবার চুরি করার জন্য, তবে সে প্রথম দিকে নকল একটি জায়গায় যায় যেখানে কোনো খাবার নেই। যখন অন্য শুয়োরটি বিভ্রান্ত হয়ে সেখানে যায়, তখন প্রথম শুয়োরটি দ্রুত আসল খাবারের জায়গায় ফিরে আসে। এই ধরণের ‘কৌশলী চিন্তাভাবনা’ উচ্চতর বুদ্ধির প্রমাণ।

​৪. পরিচ্ছন্নতা বোধ: আমাদের ধারণা শুয়োর নোংরা থাকতে ভালোবাসে। আসলে বিষয়টি উল্টো। তারা অত্যন্ত পরিষ্কার প্রাণী এবং কখনো তাদের শোয়ার বা খাওয়ার জায়গায় মলত্যাগ করে না। তারা কাদা মাখে কেবল তাদের গায়ের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পোকা-মাকড় থেকে বাঁচতে, কারণ তাদের শরীরে ঘাম হওয়ার গ্রন্থি নেই।

সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি: কুকুর না কি শুয়োর?

​অধিকাংশ মানুষ মনে করেন কুকুর সবচেয়ে বুদ্ধিমান। কিন্তু পশুবিজ্ঞানীদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতায় শুয়োর কুকুরকে অনায়াসেই হারিয়ে দেয়। কুকুর মানুষের সাথে বেশি মিশুক হওয়ার কারণে আমরা তাদের বুদ্ধি বেশি দেখি, কিন্তু শুয়োররা স্বাধীনভাবে সমস্যা সমাধান করতে অনেক বেশি পারদর্শী। এরা আয়নায় নিজেকে চিনতে পারে, যা কুকুররা সহজে পারে না।

​শুয়োর আমাদের শেখায় যে কোনো প্রাণীকে তার বাইরের চেহারা বা প্রচলিত ধারণা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। তাদের এই অসাধারণ শেখার ক্ষমতা আর আবেগ আমাদের প্রাণিজগৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীই একেকটি বিস্ময়, আর শুয়োর সেই বিস্ময়ের এক উজ্জ্বল নাম।

সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: কুকুর 
সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: কুকুর

​যখন আমরা প্রশ্ন করি, সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তখন উত্তরটি কেবল আইকিউ (IQ) দিয়ে বিচার করলে হবে না। বুদ্ধিমত্তার একটি বড় অংশ হলো 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' বা আবেগীয় বুদ্ধি। আর এই ক্ষেত্রে কুকুর হলো পৃথিবীর অবিসংবাদিত রাজা। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সাথে থাকতে থাকতে তারা আমাদের ভাষা, চোখের ইশারা এমনকি আমাদের হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন বুঝতে শিখে গেছে।

কুকুরের বুদ্ধিমত্তার এক অসাধারণ সত্য গল্প

​'চ্যাসার' (Chaser) নামের একটি বর্ডার কলি জাতের কুকুরের কথা ধরুন। তাকে বলা হতো বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান কুকুর। চ্যাসার কেবল 'বসো' বা 'দাঁড়াও' জাতীয় সাধারণ কমান্ড জানত না, সে ১,০২২টি আলাদা আলাদা বস্তুর নাম মনে রাখতে পারত!

​তার সামনে যদি একগাদা খেলনা রাখা হতো এবং বলা হতো "চ্যাসার, ডলফিনটা নিয়ে এসো", সে নির্ভুলভাবে সেটি খুঁজে বের করত। এমনকি তাকে যদি এমন একটি নতুন খেলনার নাম বলা হতো যা সে আগে কখনো শোনেনি, সে বুদ্ধির সাহায্যে বুঝত যে পরিচিত খেলনাগুলোর বাইরে যেটি আছে, সেটিই ওই নতুন নামের খেলনাটি। এই যে 'বাদ দেওয়ার পদ্ধতি' (Process of elimination) ব্যবহার করে নতুন কিছু শেখা—এটিই প্রমাণ করে কুকুর কেন সেরা ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-র তালিকায় অপরিহার্য।

কুকুর কেন এতোটা বুদ্ধিমান?

​১. মানুষের আবেগ পড়া: কুকুরই একমাত্র প্রাণী যারা মানুষের চোখের ভাষা বোঝে। আপনি যদি আঙুল দিয়ে কোনো দিকে ইশারা করেন, তবে শিম্পাঞ্জিরা সাধারণত আপনার আঙুলের দিকে তাকায়। কিন্তু কুকুর আপনার আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে সেই নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে তাকায়। তারা মানুষের গলার স্বর শুনে বুঝতে পারে আপনি খুশি নাকি দুঃখী।

​২. বিস্ময়কর ঘ্রাণশক্তি ও স্মৃতি: কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ গুণ বেশি প্রখর। তারা ঘ্রাণের মাধ্যমে সময়ের ধারণা পায় এবং কোনো মানুষের ঘ্রাণ বহু বছর পরও মনে রাখতে পারে। তাই কোন প্রাণীর স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে বেশি, এই প্রশ্নে ঘ্রাণস্মৃতির ক্ষেত্রে কুকুর সবার উপরে।

​৩. সহায়তা ও সেবা: সার্ভিস ডগ বা গাইড ডগরা যেভাবে অন্ধ মানুষদের পথ দেখায় কিংবা কোনো রোগী খিঁচুনি হওয়ার আগে সতর্ক করে দেয়, তা উচ্চতর মস্তিষ্কের কাজ। তারা বুঝতে পারে কখন তাদের মালিকের সাহায্য প্রয়োজন। এই ধরণের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি এই তর্কের শীর্ষে রাখে।

​৪. সামাজিক শিক্ষা: কুকুররা কেবল নিজেদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে চলে না, তারা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে শেখে। তারা জানে কোন কাজটি করলে মালিক খুশি হবে এবং পুরস্কার হিসেবে খাবার দেবে। এই 'কজ অ্যান্ড ইফেক্ট' (Cause and effect) বোঝার ক্ষমতা তাদের অনন্য করে তুলেছে।

মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি: কুকুর নাকি অন্য কেউ?

​যান্ত্রিক বুদ্ধিতে হয়তো শিম্পাঞ্জি বা ডলফিন এগিয়ে, কিন্তু মানুষের সাথে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় কুকুরের কোনো জোড়া নেই। তারা মানুষের প্রায় ১৬৫টি শব্দ এবং অসংখ্য ইশারা বুঝতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরের বুদ্ধিমত্তা ২ থেকে ২.৫ বছর বয়সী একটি শিশুর সমান। তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর বুদ্ধির মিশ্রণই তাদের বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি এই তালিকার সবচেয়ে প্রিয় সদস্যে পরিণত করেছে।

​কুকুর আমাদের শেখায় যে বুদ্ধিমত্তা কেবল জটিল অংক সমাধান নয়, বরং অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং ভাষা ছাড়াই মনের ভাব বুঝতে পারাই হলো শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি। তারা আমাদের জীবনকে নিরাপদ এবং আনন্দময় করে তোলে।


 ১০ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী: বুদ্ধির মানচিত্র ও শেষ লড়াই

​আমরা যখন এই আর্টিটিকেল শুরু করেছিলাম, আমাদের মনে অনেকগুলো কৌতূহল ছিল। যেমন— সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি? কিংবা মানুষের পরে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি? ১০টি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে থাকা প্রাণীদের বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি যে, বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে সীমাবদ্ধ নয়। কারো বুদ্ধি স্মৃতিতে, কারো যন্ত্র ব্যবহারে, আবার কারো বা সামাজিক সদ্ভাব বজায় রাখায়।

এক নজরে ১০ প্রাণীর বুদ্ধির লড়াই (তুলনামূলক ছক)

​নিচের তালিকাটি দেখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কেন এই ১০টি প্রাণী অন্যদের চেয়ে আলাদা:

এক নজরে ১০ প্রাণীর বুদ্ধির লড়াই (তুলনামূলক ছক)

প্রাণীর নাম বুদ্ধির মূল শক্তি বিশেষ ক্ষমতা
১. শিম্পাঞ্জি সরঞ্জাম ব্যবহার ডিএনএ-তে মানুষের সাথে ৯৯% মিল।
২. ডলফিন সামাজিক যোগাযোগ একে অপরকে নাম ধরে ডাকে।
৩. হাতি দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি স্মৃতিশক্তির রাজা হিসেবে পরিচিত।
৪. অক্টোপাস তাৎক্ষণিক সমাধান ৯টি মস্তিষ্ক দিয়ে জটিল ধাঁধা মেলায়।
৫. কাক লজিক্যাল থিংকিং ট্রাফিক সিগন্যাল ও যন্ত্র তৈরি করা।
৬. ওরাংওটাং স্থাপত্য ও প্রকৌশল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাতা ও ঘর তৈরি।
৭. আফ্রিকান গ্রে প্যারট ভাষা ও যুক্তি শব্দের অর্থ বুঝে মানুষের সাথে তর্ক করা।
৮. শুয়োর দ্রুত শেখার ক্ষমতা ভিডিও গেম খেলা ও দ্রুত কমান্ড শেখা।
৯. রাকুন সূক্ষ্ম কাজ ও চুরি জটিল তালা খোলা ও খাবার খুঁজে বের করা।
১০. কুকুর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স মানুষের মনের অব্যক্ত ভাষা বুঝতে পারা।

বুদ্ধির লড়াইয়ে কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

​আপনি যদি জানতে চান সবচেয়ে বুদ্ধিমান পশু কোনটি, তবে ডাঙার প্রাণীদের মধ্যে শিম্পাঞ্জি এবং সমুদ্রের প্রাণীদের মধ্যে ডলফিন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু যদি আমরা 'আইকিউ' এবং 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' বা আবেগীয় বুদ্ধিকে একসাথে করি, তবে কুকুর এবং হাতি আমাদের তালিকার শীর্ষস্থান দখল করবে।

​আবার যদি আমরা বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরির পরীক্ষার কথা ভাবি, তবে শুয়োর এবং অক্টোপাস অনেক সময় বড় বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদেরও হারিয়ে দেয়। মজার বিষয় হলো, আমাদের আশেপাশে থাকা সাধারণ কাক তার ডানাওয়ালা বন্ধুদের মধ্যে বুদ্ধির মুকুট পরে আছে।

মানুষের পরেই কি এদের অবস্থান?

​হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরা মনে করেন আমরা মানুষরা আমাদের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি ঠিকই, কিন্তু এই প্রাণীরা তাদের নিজ নিজ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য যে অসাধারণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়, তা কোনো অংশে কম নয়। সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব কোনটি এই প্রশ্নের উত্তরে মানুষ সবার উপরে থাকলেও, আমাদের এই তালিকার ১০ জন জীব মানুষকে প্রতিনিয়ত অবাক করে দিচ্ছে তাদের নতুন নতুন কৌশলের মাধ্যমে।

​আমরা প্রায়ই খুঁজি সবচেয়ে বোকা প্রাণী কোনটি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিই তার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অত্যন্ত দক্ষ। তবে এই ১০টি প্রাণী বুদ্ধির সেই সীমা অতিক্রম করেছে যা আমরা সাধারণত কেবল মানুষের মধ্যে কল্পনা করি।

শেষকথা : বুদ্ধিমত্তার ভিন্ন এক জগৎ

​পরিশেষে বলা যায়, বুদ্ধিমত্তা কেবল মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়। আমরা সাধারণত বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের মানদণ্ডে বিচার করি, কিন্তু প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী তাদের নিজস্ব পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দেয়। কেউ হয়তো জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না, কিন্তু কেউ হাজার মাইল পথ মনে রাখতে পারে কিংবা সমুদ্রের অতল গহ্বরে অসাধারণ কৌশলে শিকার করতে পারে।

​এই তালিকায় থাকা ১০টি প্রাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—আমরা এই পৃথিবীতে একা নই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং এই বুদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি প্রাণীর সংরক্ষণ এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর উপহারগুলোকে যত বেশি আমরা জানবো, ততই এই পৃথিবীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বাড়বে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন