লেখক পরিচিতি — মেজর ডালিম কে ছিলেন?
ইতিহাস কি সবসময় বিজয়ীদের কলমেই লেখা হয়?
নাকি কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলো উঠে আসে এক নীরব কণ্ঠের আত্মকথায়?
“আমি মেজর ডালিম বলছি” ঠিক তেমনই এক বই—যেখানে একজন সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর অধ্যায়।
লেখকের পরিচয়
মেজর (অব.) শরিফুল হক ডালিম, যিনি সাধারণভাবে পরিচিত মেজর ডালিম নামে, ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি শুধু একজন সামরিক সদস্যই নন—তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সময়ের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী।
এই কারণেই তাঁর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “আমি মেজর ডালিম বলছি” সাধারণ কোনো বই নয়। এটি একাধারে স্মৃতিকথা, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ইতিহাসের বিকল্প বয়ান।
জন্ম ও শৈশব
মেজর ডালিমের জন্ম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, একটি শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে শৃঙ্খলা, আত্মসম্মান এবং নেতৃত্বের গুণ লক্ষ্য করা যায়। পারিবারিক পরিবেশ ও সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
এই শৈশবই তাঁকে পরবর্তীতে সামরিক জীবন বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
সামরিক জীবন ও কর্মজীবন
মেজর ডালিম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ—এই তিনটি বিষয় তাঁর সামরিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল।
কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় আসে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। সেই সময়ের কিছু ঘটনা তাঁকে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে—যা তাঁকে একদিকে বিতর্কিত, অন্যদিকে কৌতূহলের চরিত্রে পরিণত করে।
নির্বাসন ও প্রবাস জীবন
ঘটনাপ্রবাহের এক পর্যায়ে মেজর ডালিমকে দেশ ছাড়তে হয়। দীর্ঘ সময় তিনি প্রবাসে কাটান। এই নির্বাসিত জীবন ছিল নিঃসঙ্গ, বেদনাবিধুর এবং আত্মবিশ্লেষণে ভরা।
এই সময়টিই মূলত তাঁকে লেখালেখির দিকে ঠেলে দেয়। নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং অপ্রকাশিত কথাগুলো লিপিবদ্ধ করার তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় “আমি মেজর ডালিম বলছি”।
লেখক হিসেবে মেজর ডালিম
মেজর ডালিম মূলত একজন পেশাদার লেখক নন। তিনি লিখেছেন নিজের প্রয়োজন থেকে—নিজের কথা বলার জন্য। তাঁর ভাষা সরল, সরাসরি এবং আবেগঘন। কোথাও তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন, কোথাও অনুশোচনা, আবার কোথাও প্রশ্ন তুলেছেন রাষ্ট্র, ইতিহাস ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে।
এই সততাই তাঁর লেখাকে আলাদা করে তোলে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
সাহিত্যিক পুরস্কারের বিচারে মেজর ডালিম হয়তো বড় কোনো পুরস্কার পাননি। কিন্তু পাঠকের আগ্রহ, আলোচনার ঝড় এবং দীর্ঘদিন ধরে বইটির প্রভাবই তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
কারণ—এই বই প্রকাশের পর থেকেই এটি বাংলাদেশের ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের মধ্যে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কেন এই লেখক গুরুত্বপূর্ণ?
মেজর ডালিম গুরুত্বপূর্ণ কারণ—
- তিনি ইতিহাসের এক ভিন্ন বয়ান তুলে ধরেছেন
- তিনি একজন ভিতরের মানুষ, বাইরের পর্যবেক্ষক নন
- তাঁর লেখা পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্ধ বিশ্বাস নয়
আরও পড়ুন: মাস্টার অব দা গেম,সিডনি শেলডন
বইয়ের রিভিউ — কেন লেখা হয়েছিল “আমি মেজর ডালিম বলছি”?
কিছু বই লেখা হয় জনপ্রিয়তার জন্য।
কিছু লেখা হয় সাহিত্য হওয়ার জন্য।
আর কিছু বই লেখা হয়—চুপ করে থাকা ইতিহাসকে কথা বলানোর জন্য।
“আমি মেজর ডালিম বলছি” ঠিক তৃতীয় শ্রেণির একটি বই। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, কোনো রাজনৈতিক প্রচারপত্রও নয়। এটি একজন মানুষের নিজের জীবন, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের দায়বদ্ধতার কথা বলার চেষ্টা।
কেন এই বই লেখা হয়েছিল?
এই বই লেখার প্রধান কারণ ছিল নিজের কথা নিজে বলা।
মেজর ডালিম বিশ্বাস করতেন—তাঁকে নিয়ে যা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল একপাক্ষিক। রাষ্ট্রীয় বয়ান, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং প্রচলিত ইতিহাসে তাঁর কণ্ঠ অনুপস্থিত ছিল।
এই বই সেই নীরবতার প্রতিবাদ।
তিনি চেয়েছেন—
- তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করতে
- নিজের সিদ্ধান্তের পেছনের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে
- ইতিহাসের আরেকটি দিক পাঠকের সামনে আনতে
বইটি কাদের জন্য লেখা?
এই বইটি বিশেষভাবে লেখা হয়েছে—
- বাংলাদেশের ইতিহাসে আগ্রহী পাঠকদের জন্য
- ১৯৭০–এর দশকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে আগ্রহীদের জন্য
- যারা সরকারি বা পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে ইতিহাস জানতে চান
- তরুণ প্রজন্মের জন্য, যারা প্রশ্ন করতে শিখতে চায়
তবে এটি এমন পাঠকদের জন্য নয়, যারা শুধু একরৈখিক বা নিরাপদ ইতিহাস পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বইয়ের বিষয়বস্তু ও কাঠামো
বইটি মূলত একটি আত্মজীবনীমূলক বর্ণনা। এখানে পাওয়া যায়—
- শৈশব ও সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা
- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামরিক রাজনীতির ভেতরের চিত্র
- ১৯৭৫–পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলি
- নির্বাসিত জীবনের মানসিক টানাপোড়েন
- নিজের কাজ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন ও আত্মসমালোচনা
লেখক চেষ্টা করেছেন ধারাবাহিকভাবে নিজের গল্প বলতে, যদিও কিছু জায়গায় আবেগ প্রবল হয়ে উঠেছে।
লেখার সময় যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন লেখক
এই বই লেখা মোটেই সহজ ছিল না। লেখককে যে সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে—
১. রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা
এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। তাই সত্য বলার সাহস যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি ছিল ঝুঁকি।
২. ব্যক্তিগত নিরাপত্তার শঙ্কা
নিজের পরিচয় প্রকাশ করে এমন ঘটনা লেখা মানেই ছিল নতুন করে বিতর্কে জড়ানো।
৩. মানসিক চাপ
অতীতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো আবার মনে করা, সেগুলো লিখে ফেলা—এটি ছিল মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।
৪. প্রকাশনা সংকট
বইটি প্রকাশ ও প্রচারে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল বলে ধারণা করা হয়, কারণ বিষয়বস্তু ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে।
বইয়ের শক্তিশালী দিক
- লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
- ভেতরের মানুষ হিসেবে দেওয়া বর্ণনা
- ইতিহাসের বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি
- স্পষ্ট ও সরল ভাষা
এই বই পাঠককে একমত হতে বাধ্য করে না, কিন্তু ভাবতে বাধ্য করে।
সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক
এটি স্বীকার করতেই হবে—
- বইটি নিরপেক্ষ নয়
- অনেক জায়গায় আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা আছে
- বিপরীত মতের বিশ্লেষণ সীমিত
তবে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হিসেবে এটি অস্বাভাবিক নয়।
কেন এই বই আলাদা?
কারণ এই বই ইতিহাসকে প্রশ্ন করে।
এটি পাঠককে শেখায়—একটি ঘটনা কখনো একমাত্র সত্য নয়। সত্যের বহু স্তর থাকতে পারে।
উপসংহার — ইতিহাস কি কখনো একক কণ্ঠে লেখা যায়?
“আমি মেজর ডালিম বলছি” কোনো সাধারণ আত্মজীবনী নয়।
এটি একদিকে একজন মানুষের নিজের জীবনকথা, অন্যদিকে একটি সময়ের দলিল। এই বই পাঠ শেষে পাঠকের মনে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়—রাষ্ট্র, ক্ষমতা, নৈতিকতা এবং ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে।
এই বই আমাদের শেখায়, ইতিহাস সবসময় নিরপেক্ষ হয় না। ইতিহাস অনেক সময় ক্ষমতাবানদের হাতে গড়ে ওঠে। আর যাদের কণ্ঠ সেখানে জায়গা পায় না, তারা থেকে যায় নীরবতার আড়ালে। মেজর ডালিম সেই নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করেছেন।
বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো—
এটি ইতিহাসের একটি বিকল্প বয়ান হাজির করে।
পাঠ্যবই বা প্রচলিত আলোচনায় যেসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়, এই বই সেখানে আলো ফেলেছে। এতে পাঠক একমত হোক বা না হোক, প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়। আর প্রশ্ন করাই হলো সচেতন নাগরিক হওয়ার প্রথম ধাপ।
পাঠকের জন্য বার্তা
এই বই পড়ার সময় মনে রাখতে হবে—
এটি কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়।
এটি একটি ব্যক্তিগত বয়ান।
কিন্তু ব্যক্তিগত বয়ান বলেই একে অবহেলা করা যায় না। কারণ ইতিহাস বোঝার জন্য শুধু বিজয়ীদের কাহিনি নয়, বিতর্কিত কণ্ঠগুলোকেও শোনা জরুরি।
কেন এই বই এখনো প্রাসঙ্গিক?
আজও যখন ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হয়,
আজও যখন প্রশ্ন ওঠে—কে ঠিক, কে ভুল—
তখন এই বই পাঠককে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দেয়।
এটি আমাদের শেখায়—
সত্য একমাত্রিক নয়।
ইতিহাস বোঝার জন্য সাহস দরকার।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন,
আপনি যদি প্রশ্ন করতে ভালোবাসেন,
আপনি যদি একপাক্ষিক বয়ানের বাইরে গিয়ে ভাবতে চান—
তাহলে “আমি মেজর ডালিম বলছি” আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
এই বই আপনাকে উত্তর দেবে না সব প্রশ্নের।
কিন্তু এটি আপনাকে প্রশ্ন করতে শেখাবে—আর সেটাই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সমাপ্তি প্রশ্ন
ইতিহাস যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তবে কেন কিছু কণ্ঠ যুগের পর যুগ চাপা পড়ে থাকে—আর কিছু কণ্ঠই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের একমাত্র সত্য?
